আমার যোনিগ্রাম

তৃপ্তি সান্ত্রা

১৬ ডিসেম্বর ২০১৩। দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। দিল্লি-কামদুনি-বারাসত-কেন্দপুকুর-ধূপগুড়ি—নারী শরীরের উপর হিংসার এই ধারাবাহিকতার ইতিহাস অতি সুপ্রাচীন। জমি দখল দেশ দখল ক্ষমতা দখলের অলিখিত আবশ্যিক ছাড়পত্র বিজিত পক্ষের নারী দখল। শুধু দখল ভোগ নয়। শত্রুপক্ষের বীজক্ষেত্রকে নষ্ট করা—পুড়িয়ে দেওয়া, বেয়নেটে ফালাফালা করা, মারণ বিষ ঢুকিয়ে শুধু জন্মস্থান নয়, নারীর আনন্দের স্থানকে পোড়ো জমি করে দেওয়া।

যুদ্ধে এমন হয়। জাতিদাঙ্গায় এমন হয়। যখন যুদ্ধ নেই, দাঙ্গা নেই, তখনও এমন হয়। তৃণ গাছপালা পশুপাখি নিয়ে জলজ-পৃথিবী মানুষের লোভে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। রাষ্ট্রশক্তি তাকে রক্ষা করে না। ধাতব বেয়নেট ফালাফালা করে। যোনির গভীরে শুধু পাথর, লোহা, নোংরা বীর্য। জলগ্রাম হারিয়ে যায়। ব্যক্তি হিংসা, বিকৃতকামনা যাই বলে ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’—এই তত্ত্বকে উসকে দিয়ে কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়। কত তত্ত্ব। কত তথ্য। কত ব্যাখ্যা। কত মোমবাতি। কত প্রতিবাদ। সবাই কত কী বলে। কিন্তু ধর্ষণে আঘাতপ্রাপ্ত মেয়েরা কী বলেন তাঁদের মন নিয়ে, শরীর নিয়ে, যোনি নিয়ে?

The Vagina Monologues-এ Eve Ensler বসনিয়ার নির্যাতিতাদের জন্য যে মনোলগ লেখেন সে যেন সমস্ত পৃথিবীর নির্যাতিতাদের স্বগতকথন—নাকি ফুরিয়ে যাবার আগে জলজ পৃথিবীরও স্বগতকথন!

কোন পরিস্থিতি Eve-কে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে এই স্বগতকথনটি আসুন পড়ে নেওয়া যাক:

‘১৯৯৩ সাল। ম্যানহাটনের রাস্তায় হাঁটছি। একটা নিউজস্ট্যান্ড পেরোবার সময় হঠাৎ ‘নিউজ ডে’ পত্রিকার একটা অস্বস্তিকর ছবিতে চোখ আটকে গেল। বিমূঢ় হয়ে গেলাম ছবিটা দেখে—বসনিয়ার ধর্ষিতাদের ক্যাম্প থেকে সদ্য ফিরে আসা ছ’জন যুবতীর ছবি। যন্ত্রণা আর নিরাশার ছবি সে মুখে কিন্তু সবচেয়ে অস্বস্তিকর অনুভূতিটা এই যে তাঁদের জীবন থেকে কিছু সুখ কিছু পবিত্রতা চিরদিনের মতো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমি পড়তে শুরু করলাম। খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় যুবতিদের অন্য ছবি। সম্প্রতি তাঁদের নিজেদের মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। একটা জিমন্যাসিয়ামের মধ্যে অর্ধবৃত্তাকারে তাঁরা দাঁড়িয়ে। অনেকে আছেন, বেশ বড়ো দল। কিন্তু মা বা মেয়েদের কেউ একজনও ক্যামেরার দিকে তাকাতে পারছেন না।

“আমি বুঝলাম আমাকে ওখানে যেতে হবে। এই মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ১৯৯৪ সালে, ক্রোয়েশিয়া আর পাকিস্তানে দু’মাস কাটালাম, বসনিয়ার উদ্বাস্তু মেয়েদের সাক্ষাৎকার নিলাম।

“আমি এইসব মেয়েদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি—ক্যাম্পে, কাফেতে আর উদ্বাস্তু শিবিরে। তাঁদের গায়ে গায়ে সেঁটে থেকেছি। এরপর দু’বার বসনিয়া গিয়েছি। প্রথম যাত্রার পর যখন নিউ ইয়র্কে ফিরে আসি, এক উন্মত্ততার মধ্যে ছিলাম। যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত, কারণ যুদ্ধের কৌশলগত কারণেই ১৯৯৩ সালে মধ্য ইউরোপে ২০,০০০ থেকে ৭০,০০০ নারী ধর্ষিত হন। কিন্তু কেউই এটা বন্ধ করার জন্য কিছু করছেন না। আমি এটা বুঝতে পারি না। আমার এক বন্ধু বলেন, এতে আশ্চর্য হবার কী আছে। তিনি বলেন, এই দেশে প্রতিবছর ৫০,০০০ নারী ধর্ষিত হন এবং তত্ত্বগতভাবে আমরা যুদ্ধরত নই।

“এই স্বগতকথনটি একজন নারীর গল্পের ভিত্তিতে তৈরি করা। তিনি যে তাঁর অভিজ্ঞতা আমাকে বলেছেন এর জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তাঁর উদ্দীপনা এবং শক্তি আমাকে বিস্ময়ে শ্রদ্ধায় আবিষ্ট করেছে যেমনভাবে পূর্ব যুগোস্লাভিয়ার চূড়ান্ত আধিপত্যবাদে নিগ্রহের পরও বেঁচে থাকা নারী, যাঁদের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম, তারা মুগ্ধ করেছেন।

এই লেখাটি বসনিয়ার নির্যাতিতাদের জন্য।

আমার যোনিগ্রাম

দূর্বাদল সবুজ আমরা যোনি। জলে ভেজা গোলাপি মাঠ। গরু চরে, সুয্যি ঠাকুর বিশ্রাম নেয়। মিষ্টি প্রেমিক আলতো করে নরম ঘাস ছুইয়ে দেয়।

দু’পায়ের মাঝখানে কিছু যেন আছে। ঠিক কী আমি জানি না। কোথায় তাও জানি না। আমি ছুঁয়ে দেখিনি। এখনও দেখি না। আর কখনও না। তখন থেকে না।

খুবই বকুনতুড়ে ছিল আমার যোনি। অপেক্ষা করতে পারে না। কথা বলে। এত, এত, কথা বলে, চেষ্টা করেও বকবকানি থামাতে পারে না। বকবক করে—করেই যায়।

আমার স্বপ্ন দেখার আগে থেকে নীচে আমার দু’পায়ের ফাঁকে, মোটা কালো মাছ ধরার জাল দিয়ে একটা মৃতপশু সেলাই করা আছে। সেই মরা পশুর গন্ধ মুছে ফেলা যায় না। তার গলা ফালা করে কাটা। সেখান দিয়ে রক্ত ঝরে। ভিজে যায় আমার হালকা পোশাক।

সব মেয়ের গান গায় আমার যোনি, ছাগলের গলার ঘণ্টা বাজার গান, হেমন্তের ভরা ফসলের গান। যোনি গান গায়। যোনিপীঠ গান গায়।

যতদিন না সৈন্যরা আমার ভিতর ঢুকিয়ে দেয় তাদের লম্বা মোটা রাইফেল। এত ঠান্ডা সেই স্টিলের রড আমার হৃৎপিণ্ড ছিন্ন হয়। জানি না, তারা আগুন জ্বালাতে চায় না কি আমার পাকানো মস্তিষ্কের মধ্যে দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিতে চায়। ছ’জন দানব ডাক্তার, কালো মুখোশ পরে আমার ভিতর সজোরে বোতল ঢুকিয়ে দেয়। ভিতরে লাঠি ছিল আর ছিল ঝাঁটার টুকরো।

সাঁতরাবার মতো স্রোতস্বিনী আমার যোনি। রোদে পোড়া পাথরের উপর স্বচ্ছ তিরতির জল। পাথরের উপর শ্যাওলা। শ্যাওলা আর পাথরে মাখামাখি।

তখন থেকে আমার চামড়াকে কাঁদতে শুনিনি, চটকানো লেবুর মতো খরখরে কর্কশ শব্দ করতে শুনিনি, তখন থেকে আমার হাত যোনির ঠোঁট ছুঁতে পারে না। ঠোটের এক অংশ, এক দিকটা সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছে।

আমার যোনি। এক জলজ প্রাণময় গ্রাম। আমার যোনি। আমার নিজের শহর।

সাতদিন ধরে একের পর এক তাদের পালা শেষ করে তারা চলে গিয়েছে—মলের দুর্গন্ধ রেখে, পোড়া মাংসের গন্ধ রেখে। আমার ভিতর তাদের নোংরা বীর্য রেখে। আমি এখন রক্তপুঁজ ভর্তি বিষ নদী। কোনো শস্য ফলবে না। খেলবে না মাছ।

আমার যোনি জলে ভেজা প্রাণবন্ত গ্রাম। তারা এটা দখল করেছিল। কষাইয়ের মতো খণ্ড খণ্ড করেছিল আর পুড়িয়েছিল।

আমি আর ছুঁই না।

দেখি না।

আমি এখন অন্য কোথাও থাকি।

জানি না সেটা কোথায়।”

সংবাদ প্রতিদিন, রবিবার, ২ মার্চ ২০১৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%