মেয়েদের চোরাগোপ্তা স্ল্যাং

তৃপ্তি সান্ত্রা

আমাদের এক্কাদোক্কা বেলায় সে-অর্থে কোনো স্ল্যাং নেই। জাতীয় পতাকা উড়লে যেমন কোনো সমস্যা নেই, দারিদ্র্য নেই। ডগডগে সিঁদুরের ক্যামোফ্লেজে যেমন সম্পর্কের শীতলতা নেই। বিজ্ঞাপনের ঢেউয়ে যেমন ভেসে নেই নিয়োগের লাশ।

পাঁচমিশেলি কলোনির খোলা কণ্ঠ থাকে। ভাষা থাকে। আর বাবু-কলোনির তক্তপোশের খাবলা-খাবলা তোশক ঢাকা রঙিন তাঁতের চাদরে, আর ওপরে ফুলতোলা জয়পুরী বেডসিটে। কালেক্টরেট-ট্রেজারি-সাড়েদশ পাঁচ, ঝোলেভাত-খড়কে কাঠি বিড়ি হুঁকো, ধুতি-পাঞ্জাবী, পাটপাট সফেদ পিতৃতান্ত্রিকতায় আদর্শ মানুষের পাঠক্রম। সেখানে যৌনতা দূরস্থান—যৌবন শব্দটাও বাড়াবাড়ি। নিমা পরা ল্যাপ্টানো বুকের মেয়েদের সতীত্ব আর বুকটুক বেশ ডাঁশা হলে বয়স্থা মহিলাদের ঈর্ষাজনিত উদ্বেগ।

ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুগোষ্ঠীর বাইরে বিহার সন্নিহিত পাঁচমিশেলি জনগোষ্ঠী–বক্ষটুলি, পাঁজরা পট্টি, ফুলবাড়ি, পেঁয়াজি মোড়ের আখাস্তা তেলেভাজা ভাষা। এসব ছোটোলোকদের গালাগাল শুনতে নেই তবু ছেলেদের মুখ চুঁইয়ে কিছু শব্দ—গানের ধুয়োর মতো ‘বাল’-’বোকাচোদা’, শিক্ষিত নিয়ন্ত্রণে রেখেঢেকে বলে, কারো কারো সে বালাই নেই। যৌনতার মতো স্ল্যাংও সামাজিক ভাবে অপাঙ্‌ক্তেয়। এটাই মফস্‌সল শহরের কলোনির একাধারে চিত্র তথা চরিত্র। পুরানো যুগে যৌনতা নিয়ে মানুষের আড়ষ্টতা ছিল না। ‘কামসূত্র’ রচনা করেছিলেন ভারতীয় মনন, ভিক্টোরীয় নীতিবাগীশ ক্ষুদ্রতা স্বচ্ছ যৌনতাকে করেছিল বৃত্তবন্দি। উপনিবেশের ভাষাসাহিত্যে আধুনিকতার নামে ইউরোপীয় সাঁজোয়া বাহিনীর আক্রমণ এমনি তীব্র যে আমাদের সোমত্ত সংস্কৃতিকে পূর্বপুরুষহীন মনে হয়। ভাষায় চলে আসে শিক্ষিত সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। শুধু যৌনতা-বিষয়ক স্ল্যাংই নয়, সাধারণ স্ল্যাংয়েও লাগাম লাগাতে চায় এই ভণ্ড সমাজ। লেখ্যভাষায় প্রয়োগ করতে কুণ্ঠা বোধ করায় ‘ছেলেভুলানো ছড়া’য় দু-একটি শব্দ বদল ক’রে রবীন্দ্রনাথ ছড়াটিকে ভদ্র সমাজে চলনযোগ্য চেহারা দেন–‘বোন কাঁদেন, বোন কাঁদেন খাটের খুরা ধরে,/সেই যে বোন গাল দিয়েছেন স্বামীখাকি বলে।’ ‘ভাতারখাকি’র পরিবর্তে ‘স্বামীখাকি’। শব্দান্তরটা কি রবিবাবু নিজে করেছিলেন, নাকি তাঁর ভক্তকুল? ‘যজ্ঞকুণ্ড উপরেতে হনুমান মোতে’ এই খাটো কথাটিকে পেচ্ছাপ করে বলে দীর্ঘ ভদ্রভাষায় প্রকাশ করি। এরকম দৃষ্টান্ত প্রচুর। ইংরেজি ভাবধারায় শিক্ষিত সমাজের পাঠ্যবই শোভনচর্চিত রূপটিকে আদর্শ মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের ছবি বলে ভাবার শ্লাঘা বোধ করি। যদিও তথাকথিত মুষ্টিমেয়ের ভদ্রসমাজের বাইরে বৃহত্তর লোকসমাজ সত্যিসত্যি এমন শোভনচর্চিত নয়।

ইউরোপীয় রেনেসাঁস-চোয়ানো সৌন্দর্যবোধ বঙ্গীয় রেনেসাঁসের খাত বেয়ে আমাদের সাহিত্য-শিল্প আর জীবনদর্শনকে শাসন করার সময় থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। সৌন্দর্যের বোধ কোনো অখণ্ড বা শ্রেণি-উত্তীর্ণ ধারণা নয়। শ্রেণিতে শ্রেণিতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, সমাজে সমাজে—এমনকী, হয়তো, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সৌন্দর্যবোধ পৃথক। সাহিত্য-সৌন্দর্যের দখলদারি যেহেতু রাষ্ট্রের হাতে, সেখানে রাজশক্তির প্রভাব অনস্বীকার্য। উপনিবেশিক ভারতবর্ষে ইউরোপীয় উচ্চশ্রেণির সৌন্দর্যতত্ত্ব আমাদের মাথায় ছড়ি ঘুরিয়েছে, এবং আজও ঘোরাচ্ছে। যদিও এ-দেশের বেশিসংখ্যক নিরক্ষর, গরিব, কিষাণ-মজুরের সৌন্দর্যতত্ত্ব এখনো অনেকখানি নিখাদ রয়ে গেছে। মুষ্টিমেয়ের সৌন্দর্যতত্ত্বের সেখানে কোনো দাম নেই। কিন্তু, তবু, মুষ্টিমেয়ের তত্ত্বকেই এ সমাজে ‘সবার’ বলে চালানো হয়। রুচি, প্রথা ও সংস্কারের ক্ষেত্রেও এই জোর-জবরদস্তি। বৈচিত্র্যময় পেগান সংস্কৃতি ভেঙে, নানান পৌত্তলিক আচরণকে ধিক্কার জানিয়ে যেমন খ্রিস্টধর্মের প্রচার হয়েছে; তেমনি এক্ষেত্রে শিক্ষিত বর্ণ-হিন্দুদের দাপট। পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায়, শিল্পবিপ্লবে, বিশ্বায়নে, কৃষিজীবী মানুষের স্থানাঙ্ক পালটে যায়—ডায়াসপোরিক বা শেকড়-হারানো মানুষের সংস্কৃতি, গান, যাপন সবকিছুতেই টান পড়ে। নাগরিক নন্দনতত্ত্বের বাইরে যে বিরাট লোকসমাজের অস্তিত্ব, primitive বা unenlightened men-এর সৃষ্টি বলে একটা অনুকম্পা মিশ্রিত ধারণা নন্দনতত্ত্বের লোকেরা পোষণ করেন। নন্দনতত্ত্বের খাঁচাকলে ‘ভাতারখাকি’র ‘স্বামীখাকি’তে রূপান্তর। এবং, রেখেঢেকে প্রমাণ করা যে ‘হারামজাদা’ বা ‘মাগভাতার’ গোছের দু-একটা মুখ-ফসকানো অভব্য শব্দ বাদে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তর শিক্ষিত অন্দরমহলে কোনো স্ল্যাং বা খিস্তি নেই।

নিম্নবর্গের ধুলোপড়া পোকাকাটা মেয়েদের মুখে অনর্গল খিস্তি মানালেও, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীর ঠোঁটে খিস্তি একেবারেই বেমানান। অথচ ব্যাবহারিক জীবনে পুরুষদের মতোই কোনো কোনো মহিলার মুখে ‘বাল’ বা ‘বোকাচোদা’ খুবই অনায়াসে নির্গত হতে শুনতে পাওয়া দুর্লভ নয়। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদ, গৃহঅশান্তি, যৌনমিলনে ব্যর্থতা ইত্যাদি যাবতীয় অপূর্ণতার শূন্যস্থান পূরণ ঘটে অনর্গল খিস্তিতে। ছেলেদের মুখে যেমন ‘তোর মাকে চুদি’, মহিলারাও বিরাগভাজন ব্যক্তির শিশ্ন কাটার অভীপ্সা জাহির করে বা ‘বাল’ ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে’ দেবার ইচ্ছে প্রকাশ করে। এগুলো সাধারণত সবই আসলে বিরক্তি বা হতাশার দ্যোতক। যৌনতা কেন্দ্রিক বা যৌনাঙ্গ বিষয়ক শব্দ অনেক ক্ষেত্রেই নিছক মুদ্রাদোষে পর্যবসিত। যেভাবেই হোক, এ ধরনের বাক্যবন্ধ সমাজে প্রচলিত। চুলের স্বল্পতা বোঝাতে ‘ভাদিবুড়ির বালের মতো চুল’ বয়স্কা মহিলাদের মুখে শুনেছি। ছেলের জন্য মেয়ে পছন্দের সময় মা-কাকিমা-মাসিমা যেমন ‘গতরভারি কন্যা’ খোঁজেন, দেখে এসে মন্তব্য: ‘আমাগো খোকার লগে ঠিক হইব, টিইপ্যা-টুইপ্যা আরাম হইব।’ বিয়ের পরপরই সোনার চাঁদ সেই ছেলের কামাখ্যার ভেড়া হয়ে যাওয়া দেখে মন্তব্য: ‘বউ হল গলার মালা, মা হল মাগী’। অত্যধিক বউপ্রীতির জন্য বউয়ের বাপের বাড়ির মা-বোনেরা রেহাই নেই। ছেলে ‘বউ-ভেড়ুয়া’ মানে বউ ছলাকলায় পটু এবং তার মা-ও কামক্রীড়ায় পটু। অর্থাৎ ‘ছেনাল’, সবার কাছেই তারা ‘নাংমারানি’। যে নদীর এ-কূল ভাঙা ও কূল ভাঙা—‘গাং মারানি’। নাংমারানি অর্থাৎ মায়ের সঙ্গেও শুয়েছে, মেয়ের সঙ্গেও শুয়েছে।

বাংলা স্ল্যাংয়ে মেয়েদের নিয়ে নানারকম শব্দের যে প্রাচুর্য, তাতে মেয়েদের ‘মাল’ বা উপভোগের জিনিস হিসেবে দেখার প্রবণতাই বেশি। সমাজে পুরুষের যেহেতু অগ্রাধিকার, যৌনক্ষেত্রেও তা-ই। স্ল্যাং তৈরি ও ব্যবহারেও সেই আধিপত্য স্পষ্ট। পুরুষের স্ল্যাংয়ের যে ব্যাপ্তি, তা মেয়েদের স্ল্যাংয়ে নেই। ক্বচিৎ স্ল্যাং-এর মাধ্যমে কারো অকল্যাণ কামনা করা কিংবা অন্যের অসতীত্বের ইঙ্গিত করা—মেয়েদের স্ল্যাংয়ের ব্যাপ্তি এর বেশি কিছু নয়। ‘ভাতারখাকি’ ইত্যাদির মধ্যে আছে অমঙ্গলের কামনা, ‘পেটফোলানি’ ‘খানকি’ ইত্যাদিতে রয়েছে অসতীত্বের আরোপ।

আমার মতে, স্ল্যাংয়ের সাধারণত দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়ে থাকে— (১) যৌনতা, এবং (২) অবৈধ সম্পর্ক। দুটির মধ্যে একটা মিলের ব্যাপার আছে, দুটিতেই ‘যৌনতা’ রয়েছে। যৌনতামূলক গালাগালি অপেক্ষাকৃত ভালো অভিপ্রায়বাচক, কেননা সেখানে অপমান করা ছাড়া অন্য কিছু থাকে না। অনেক সময় ‘অবৈধ’ ইঙ্গিত ছাড়াই সেসব গালি ব্যবহৃত হয়। ‘বে’ শব্দটি বাংলায় প্রভূত ব্যবহৃত হয়। এটি ‘বেজন্মা’র অপভ্রংশ হলেও বাক্যে প্রয়োগের সময় কোনো গূঢ় অর্থ থাকে না। বাংলা প্রবাদে যৌনতার প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। ‘আহারমৈথুন-ভয়, যত বাড়াবে তত হয়’—একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ। ‘আদেকলার হল ব্যাটা, নাড়ি কাটতে চ্যাট কাটা’। দৃষ্টান্ত প্রচুর। মোদ্দা কথা, আমাদের জীবনের শিক্ষিত শোভন সংস্করণে স্ল্যাংয়ের কোনো পাঠ না থাকলেও আমরা জানি এর চোরাগোপ্তা স্রোত আছে। কোনো কোনো দাম্পত্যের নিরীহ শোভন সংস্করণে স্ল্যাং তো একটি নিত্য-ব্যবহার্য আসবাব। আমাদের জীবনে যুগপৎ যৌনতা আছে এবং একটা ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি গোছের ন্যাকান্যাকা ভাবও আছে।

জীবন যাদের গোলগোল নয়, পাঁউরুটি-মাখন নয়, তাদের সামনে গোলগোল মানুষের চরম আদিখ্যেতা ধরা পড়লে প্রতিবাদে ও তাচ্ছিল্যে স্বতঃস্ফূর্ত আখাম্বা খিস্তি ছাড়া আর কিছু আসে না। কনকনে শীতের সকালে ঠান্ডা জলে যে মেয়েটি বাসন মাজছে, তাকে যদি কেউ হটওয়াটার ব্যাগে পশ্চাৎদেশ গরম করতে করতে উপদেশ দেয় ‘পায়ে মোজা, হাতে গ্লাভস পরে কাজ করো না কেন’ তখন তার নাভি থেকে খিস্তির ব্রহ্মনাদ উঠে আসা স্বাভাবিক। শুকনো রুটি ছেড়ে কেক খাওয়ার মতো এরকম গাঁড় জ্বলুনি কথাবার্তা বললে ‘পুটকি-মারা’ কথা বলিস না বা ওই ধাঁচের অন্য যে-কোনো খিস্তি ফিট করে যায়। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে এল। ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় পশ্চিমের পুরো রোদ্দুরটা মুখের ওপর এসে পড়ে। সাতখানা পিরিয়ড, প্র্যাক্টিক্যাল ইত্যাদি সেরে এক কাঁড়ি বইপত্র বুকদাবা করে (তখন ব্যাগের চল হয়নি) ঘরে ফিরছে আমার সুস্তনী ছোড়দি। শুধু মেয়েদের বুকের দিকে তাকিয়ে কথা বলে একরকম এক দাদার খেজুরে আলাপ—‘কী ইস্কুল থেকে ফিরছিস?’ এই প্রশ্নের উত্তরে দেড় মাইল হেঁটে আসা ক্লান্ত শ্রান্ত ক্ষুধার্ত ছোড়দি জবাব দিয়েছিল: ‘থামেন তো, আপনার মুখ না তো, পোদ’, প্রচণ্ড অপমানিত সেই দাদা ‘মেয়ের কী মুখের ছিরি’, ‘এ কী পরিণতি’ এসব বলে মুখ কালো করে পালায়।

ভদ্র সমাজেরগ নান্দনিক ভাষার বাইরে সাধারণের ভাষা এবং যাপন অনেক উদার। বৃহৎ লোকসমাজের গাথা, কথা, গান, ছবি নিয়ে যে লোকসাহিত্য তা কিন্তু উচ্চশ্রেণির ভাষা বা তত্ত্ব নিয়ে আক্রান্ত নয়। চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসন অথবা মূল্যবোধের ভারে ন্যুব্জ নয়। বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায়, বিষম অর্থনীতিতে, বিষম সম্পর্কের সংঘাতে যে ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়ার হিসেব তা নিয়ে অযথা ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। উদাহরণ প্রচুর। লালমণির হাট (মৈমনসিংহ) অঞ্চলের মুসলমান মেয়েদের বিয়ের গান, নবযৌবনা তরুণীর স্তনকে ‘মুষরী কালাইর আগা ডলমল’ বলে বর্ণনা করে তার সম্ভাব্য ব্যবহার বিষয়ে সোল্লাসে গাওয়া হচ্ছে, অন্তঃপুরিকার মেয়েরাই গাইছে এই জীবনোল্লাসের গান—

একে তো মুষরী কালাই আগা ডলমল করে রে

হায় রে মজার ডলন কে ডলিতে পারে রে।

কইয়ার মাক বান্দিয়া থুনু আড়িয়া গোরুর মাঝে রে

চপুরাইতে আড়িয়া শালায় হিকরিশ মারিয়া থাকে রে।

কইয়ার বইনোক বান্দিয়া থুইচোবে ঘোড়াশালার মাঝে রে

চপুরাইতে ঘোড়াশালা চেহে চেহে করে রে।

কইয়ার মশিক বান্দিয়া থুইচোবে পাঁঠা ঘরের মাঝে রে

চপুরাইতে পাঠশালা ম্যালম্যালায়ে আছে রে।

বরপক্ষের মহিলারা কইয়া (কন্যা) পক্ষের মহিলাদের উদ্দেশ্যে এই গান গায়। নাগরিক মধ্যবিত্ত রুচির পথে অতি অস্বস্তিকর আরেকটা গানের উদাহরণ দিই। কন্যার মায়ের দীর্ঘ ও কুঞ্চিত (থোবরা-থুবরি) গোপনাঙ্গের কেশ দিয়ে বড়ো ঘরের চাল ছাওয়া হবে, সেই উল্লসিত অভিলাষ প্রকাশ করা হয়েছে এই গানে—

‘বিন্দানাল কি নাল রে

কইনারে মায়ের থোবরা থুবরি বাল

কি বিন্দা নাল কি বিন্দা নাল রে

তাকে দিয়া ছান দিমো বড়ো ঘরে চাল রে।’

এসব পর্ণোগ্রাফি নয়, খণ্ড জীবনাচরণের উল্লাস। এখানে কোনো ব্যক্তিগত গোপন যৌনকল্পনা ও তার তৃপ্তি বিধানের আয়োজন নেই। এর চেয়ে অনেক বেশি অশ্লীল লেগেছিল অনুচ্চারিত একটি যৌন-ইঙ্গিত। বি.এড. পাঠরতা অবস্থায় সদ্য বিয়ে করে ফিরছে এক বান্ধবী। ছোটো একটি কাগজ ভাঁজ করে কর্নারে ফুঁটো করতে বলে জনৈক প্রতুল। সরল মনে কোণের কাগজ কাটে সেই বান্ধবী— কাগজ খুললে স্বাভাবিক ভাবেই সেই ফুটো অনেক বড়ো দেখায়— বিবাহের আগে ও পরে নারীর যৌনাঙ্গের পরিবর্তনের ইঙ্গিতময় হাসি হাসে প্রতুলদের দল। বান্ধবী হতবাক, পালিয়ে বাঁচে। তেমনি অশ্লীল লাগে ‘কাটামাছের স্বাদ বেশি’ জানিয়ে মহিলাদের হেসে গড়িয়ে পড়ায়— হিন্দু বাঙালির সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ইঙ্গিত।

সাধারণ সহজ যাপনের পাশে আমাদের খিস্তি খাওয়ার মতো অজ্ঞানতার একটা দৃষ্টান্ত দিই। বারো বছরের কাঙাল ষাঁড়ের মূত্ররন্ধ্রে ন্যাকড়া লাগিয়ে নালুই বানাচ্ছে। ‘নালুই’ কী? কাঙাল কী বলেছে, তার মুখেই শোনা যাক:

‘আমাদের গাই বাছুরটা ডাকছে বটে। এখন উয়ার পাল খাবার টেইম। গঞ্জের গোরুর হাসপাতালে নে গেলে কলের পিচকিরি দে পাল খাওয়ালে বড়ো জাতের গাই হবে। কিন্তুক আমার গাইটা বড়ো ছেঁচড়া। কলের পিচকিরির ইনজিকশনের সময় খুব নাপানাপি করে। এই নালুইটা গাইয়ের বুকির সামনে ধইরলে আর নাপাবেনি, চুম্‌মেরে যাইক্‌বে।’

এর পাশে আমাদের প্রায়ক্ষেত্রে দেখা অন্য একটি সিনের কথা ভাবা যাক। ২৮ বছরের শিক্ষিতা চাকুরিরতা মহিলার লেবার পেইন উঠেছে—দু-বছরের বিবাহিত জীবন, অথচ উনি নাকি সত্যি জানেন না কোথা দিয়ে বাচ্চা বের হয়। কুমারী মেরীর মা হবার মতো পবিত্র-পবিত্র ব্যাপারে উনি বিশ্বাসী এবং সতীপনা। এর জন্যে সঠিক খিস্তি কী হতে পারে পাঠক ভাবতে পারেন, আমার জানা নেই।

স্ল্যাং সর্বদা ভাষা-নির্ভর নয়, সংস্কৃতি-নির্ভর। ‘এক জায়গায় গালি, অন্য জায়গায় বুলি’ কথাটা তো সবারই জানা। ‘বাস্টার্ড’ কোথাও গালি, কোথাও বা ‘সখা’ সম্বোধনের সমতুল। ‘ব্লাডি’ কথাটা ইংরেজিভাষী ব্রিটিশদের কাছে যতই তীব্র অর্থ বহন করুক, ইংরেজিভাষী আমেরিকানদের কাছে তা মূল্যহীন। বার্নার্ড শ’র ‘পিগম্যালিয়ন’ যেদিন লন্ডনে প্রথম মঞ্চস্থ হয়, সেদিন ওই নাটকে শ্রীমতী প্যাট্রিক ক্যাম্বেলের মুখে ‘ব্লাডি’ কথাটা শোনার জন্য প্রচুর ভিড় হয়েছিল। কথাটা শুনে কেউ কেউ মূর্ছাও যায়। কোন শব্দ কার কাছে কী অর্থ বহন করে বোঝা মুশকিল। তেঁতুলতলার হরিজন পরিবার ভাদুলাল আর তার বউ। বউ বেশ যুবতী, গরম ও জাঁদরেল। নেশা-ভাঙ করে ভাদুলাল ঘরে ফিরলে বউ প্রচণ্ড গালিগালাজ করে, যেজন্যে ‘খিস্তিবাজ মাগী’ বলে পড়শিমহলে তার ঢিটি আছে। আশ্চর্যের কথা, সব গালাগাল ভাদু চুপচাপই হজম করে। কিন্তু বউ যদি বলে ‘তোর মুছ পর মুতি’—তবে আর রক্ষে নেই। পিটিয়ে তক্তা বানায় সে বউকে।

শুধু যে কিছু শব্দই সংবেদনশীল, তা নয়। অনুচ্চারিত কিছু ক্রিয়াভিত্তিক আচরণও অন্যকে তাতিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। হায়দারপুর এলাকার জমজমাট কলতলা। একটি কল দিয়ে সুতোর মতো জল এবং অগণিত কলসির ভিড়। কাজিয়া চালু রয়েছে। সবেরা বিবির চিল-চিৎকারে কান পাতা দায়। যার উদ্দেশ্যে গালি; সেই কবীরা বিবি নির্বিকার, কিছুই বলছে না। শুধু সরু গলার কলসির মধ্যে হাত ঢোকাচ্ছে আর বের করছে। আর এই আপাতদৃষ্টিতে নিতান্ত নিরীহ এই কাজটি দেখেই রাগে ফেটে পড়ে সবেরা। আসলে, দেখতে নিরীহ হলেও কাজটি গভীর ইঙ্গিতবাহী। অপরপক্ষের (এখানে কবীরার) বিধবা বা বেওয়া হওয়ায় অভিসম্পাত আছে এতে। হাতে চুড়ি না থাকলে তবেই কলসির মধ্যে স্বচ্ছন্দে হাত ঢোকানো যেতে পারে। চুড়ি, বালা এসব এয়ো স্ত্রীর অলংকার। হাতে চুড়ি থাকবে না, হাত সহজেই কলসিতে ঢুকবে—অর্থাৎ ‘ভাতারখাকি’ হবে সে।

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ফালতু চেষ্টা আছে বটে, কিন্তু এটা সত্যি যে সাধারণের জীবনে জল হাওয়ার মতো, যৌনতা-স্ল্যাং নিয়ে খেলা করতে দেয় না শিক্ষিত সমাজ। কত যে ট্যাবু এই নিবন্ধ রচনা করতে গিয়ে, তার একটি বিবরণ দিয়ে আমার লেখা শেষ করব। ‘শহর’-এর আগের কিছু বিশেষ সংখ্যা দেখে অনুমান করা যায়, স্ল্যাং নিয়েও বিদগ্ধজনেরা অনেক ভালো লেখা লিখবেন। আমার বলার কথা এই যে, ভদ্রসমাজে ছেলেদের যেমন স্ল্যাং-এর চোরাগোপ্তা দুর্দান্ত স্রোত আছে, মেয়েদের মধ্যেও তা প্রবল ভাবে আছে। কারো কারো মুখ দারুণ ‘পাশ করা’।

রাজার তিন রানি, এই রাজাকে নিয়ে একটি চুটকি বলি। রাজামশাই দ্বিপ্রহরে আহারে বসে খাবার পাতায় কুঞ্চিত কেশ পেলেন—বুঝলেন সেটি যৌনকেশ। কিন্তু, কার? বড়ো ধন্দে পড়লেন তিনি—

বড়ো রানির বৃদ্ধকাল

তার হল পক্ক বাল।

অতএব এ বাল সে বাল নয়।

তবে এ বাল আসিল কেমনে?

মেজরানির ছেলে কোলে

তার বালে চামর দোলে

অতএব এ বাল সে বাল নয়।

তবে এ বাল কার বাল?

একে তো গ্রীষ্মকাল

তার ওপর রন্ধনশাল

চুলকাইতে চুলকাইতে আসিল নখাগ্রে

লবণ সম্বারিত পড়িল ব্যঞ্জনে

চুটকিতে ইঙ্গিত আছে সেটা ছোটো রানির। এটি যাঁর কাছে শোনা, তাঁর বিশাল স্টক, তিনি স্বচ্ছন্দে সেগুলি পরিবেশন করেন। লিখেই দিয়েছেন তিনি। শুধু বাল শব্দটি উহ্য রেখে গেছেন। সত্যি তো, লম্পট কাদা এড়িয়ে আমরা সবাই সফেদ সাদা। আমাদের সবার একটাই পুরুষ, একজন নারী। অবিবাহিতদের রাত মাগুর মাছের মতো খলবল করে না আঁশবটিতে টুকরো টুকরো হওয়ার জন্য। আমাদের কারো মাস্টারবেশন নেই—গামলা ভরা বীর্য নিয়ে গাম্ভীর্যময় ব্রহ্মচর্য জীবন। তাই না? লেখার বাইরে অনেক কালো কথা থাক। সাদা-কালোর এই জীবনে আমাদের সব লেখা সাদা।

শহর ২০০৪, ২৯তম সংখ্যা

অধ্যায় ১ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%