নতুন পৃথিবী পুরানো পাঠক্রম

তৃপ্তি সান্ত্রা

পণের দাবি না মেটানোয় জয়িতাকে গলা টিপে ‘হারপিক’ খেতে বাধ্য করেছিলেন স্বামী শান্তনু হাজরা। অ্যাসিডের তীব্রতায় খাদ্যনালি এমনই সংকুচিত হয়ে গেছে, যে ক্ষুদ্রান্ত্র ফুটো করে নল লাগিয়ে তরল খাদ্য চলছে ১৭ আগস্ট থেকে। (আনন্দবাজার, ৩০ অক্টোবর ২০১৩)

জয়িতা কোনো নিম্নবিত্ত দরিদ্র পরিবারের অশিক্ষিত মেয়ে নয়। বাবা প্রাক্তন নৌসেনা। জয়িতা নিজে কম্প্যুটার অ্যাপ্লিকেশনে মাস্টার্স। ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি বিয়ে হয়েছিল সেক্টর ফাইভে একটি তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত বিদেশ ফেরত শান্তনুর সঙ্গে। বিয়েতে নগদ দু’লক্ষ টাকা ছাড়াও ৩০ ভরি গয়না, ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন সহ নানা জিনিসপত্র দেওয়া হয়েছে। বিয়ের দুমাস পরে আরও চারলক্ষ টাকা চায় জামাই। বাপের বাড়িতে জয়িতা বলতে না পারায় অত্যাচার শুরু। পাশের বাড়িতে যাতে আওয়াজ না যায়, তার জন্য মুখে লিউকোপ্লাস্ট আটকে দিত ওর শাশুড়ি। জয়িতার কথায়, ‘জানতাম, একমাত্র মেয়ের এই পরিণতি শুনলে বাবা-মা ভেঙে পড়বেন, তাই প্রথমে কিছু বলিনি।’

গল্পের মতো করে সংবাদ প্রতিবেদন লেখা হয়। আর এসব পড়ে অসম্ভব রাগ হয়। খুড়োর কলের ডগায় ডিগ্রির মুলো ঝুলিয়ে ছুটিয়ে দেওয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েরা শূন্যেই দাঁড়িয়ে।

উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন তো স্বামীর গৌরববৃদ্ধির জন্য—বাস্তবে কোনো কাজে লাগবে না। শ্বশুর বাড়িতে অত্যাচারের কথা শুনে বাবা-মা ভেঙে পড়বেন কেন? তারা বিয়ে ‘দিয়েছেন’ সুতরাং বিয়ে ভাঙলে, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে এই কারণে? মেয়েরা তবে ‘কন্যারত্ন’ হয়ে উঠছে না শুধুই ‘মাটির ঢিবি। রাখলেও খরচ, বিদায় দিতেও খরচ’—এই ছাপ নিয়ে থেকে যাবে? নিজের আত্মসম্মান, স্বনির্ভরতা তৈরি হবে না—শুধুই আত্মহত্যা, হত্যা অথবা অত্যাচারের ধারাবাহিকতা। মুখে অ্যাসিড, পাকস্থলী পুড়ে যাওয়া, ধর্ষণ, নৃশংস উল্লাসে গোপন অঙ্গকে ছিন্নভিন্ন করা। ব্যক্তিহিংসা, লোভ, বিকৃত কামনা যাই বলে ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’—এই তত্ত্বকে উসকে দিয়ে কেবলই দৃশ্যর জন্ম হয়।

দৃশ্যগুলি আমরা জানি। স্থান বিভিন্ন। কখনও রাজধানী দিল্লি। কখনও কামদুনি মধ্যমগ্রাম ধূপগুড়ি সুজাপুর। এইরকম রোজ নিত্যনতুন অগণিত...।

অপরাধীদের আমরা জানি। আমাদের বেটার হাফ। আমাদের লাডলি ব্যাটা। আমাদের গুরু মস্তিষ্ক। আমাদের খেপ পঞ্চায়েত। আমাদের অফশপ-মৌতাত, আমাদের কান্ট্রিলিকার কলিজা, আমাদের নটখট কানাই প্রীতি। কিন্তু জানি না যবনিকার আড়ালে ঠিক কারা। কোন সুতো। কোন বাজিগর। কোন খেলা। কারা খেলায়। কিন্তু খেলি তো নারীপুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই। অর্বাচীন আমরা বাজারের সূক্ষ্ম নেটওয়ার্কে অবিশ্রান্তি নাচি। দাঁড়ি ভুলে যাই। কমা ভুলে যাই। প্রশ্ন ভুলে যাই।

পৃথিবী বদলে গেছে। বিজ্ঞানের টেকনোলজির বাড়বাড়ন্ত আর বাঁধভাঙা বিশ্বায়নের জোয়ারে পালটে যাচ্ছে যাপনরীতি।

বাড়িঘর খাওয়া দাওয়া পোশাক অলংকার নাচগান বাজনা ব্রতপার্বণ জন্ম মৃত্যু বিয়ে সবই বাজার নিয়ন্ত্রিত। বিজ্ঞাপনে ঘরবাড়ি, খাবার দাবার, গয়নাগাঁটি কাপড় চোপড় দেখে আম জনতার কী হ্যা-হ্যা আমোদ। কিন্তু আমি যে আম-আদমি। আমি তো কিছু কিনি না। বাজার মুখ ভেংচে বলে—কেনো না? তবে তো তোমাকে চিনি না। কিন্তু কোটি কোটি টাকার বাজার ধরার প্রস্তুতির মধ্যে আম-আদমিকে ধরার জন্যও কিছু পাউচ-প্রয়াস থাকে। কোটি কোটি জনসংখ্যার দেশগুলি বাজারের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড। পাউচ তেল, শ্যাম্পু, ওয়াশিং পাউডারের অফার দিয়ে তারা পাবলিকের চোখে লোভের মায়া-অঞ্জন পরিয়ে দেয়, ছুটিয়ে দেয় অসম প্রতিযোগিতার। বাজারের নেশায় পাগল হয় পাবলিক।

অটোতে আসতে আসতে কথা হচ্ছিল জলি পালের সঙ্গে। তার দু’বছরের বাচ্চার চোখে রঙিন চশমা। চমৎকার করে সাজিয়েছে মেয়েকে।

—অ্যাতো ছোটো মেয়েকে সানগ্লাস পরিয়েছ...

—না হলে কাঁদবে। চেঁচামেচি করবে জানেন তো! খুব সাজতে ভালোবাসে।

পাশে আরও এক তরুণী মা। এ-কথা সে-কথার পর ডায়পার (হাগিস্) পরা নিয়ে কথা।

জলি বলে—হ্যাঁ। অনেকক্ষণ পরে থাকলে র‍্যাশ বেরোয়...

ঋতুকালে, ন্যাপকিন পরার অভিজ্ঞতা কারোরই খুব সুখপ্রদ নয়। ঘন ঘন পালটাতে হয় এই যা, নইলে কিন্তু বাড়ির কাপড়ের ন্যাকড়া অনেক আরামপ্রদ। সে সুবিধার কথা কে জোরগলায় বলবে! বড়ো বড়ো কোম্পানি ঝকঝকে বিজ্ঞাপনে দেখাতে ব্যস্ত তাদের তৈরি ন্যাপকিন ব্যবহার না করলে পিলাপনে কিরা হয়। ন্যাপকিনের কথা মনে আসল এই কারণে—যে মেয়েরা তো জানে ওসব পরে কষ্ট হয়, তবে প্রয়োজন না থাকলে বাচ্চাদের ওসব পরাবেন কেন। তারও একটা জবাব পাওয়া গেল জলির কাছে—ওর বাবা বেশি জল ঘাঁটতে বারণ করে।

বউয়ের খেয়াল রাখে সেটা খুবই ভালো। কিন্তু সামান্য অস্থায়ী শ্রমিক স্বামী এইসব বাড়তি বোঝা টানতে পারে ভেবে খুবই অবাক হই।

জলি পলি রানি রেশমা কারোরই কোনো দোষ নেই। তাদের স্থূল শরীর আটকে রাহুত গ্রাম, ডউরাকুড়ি কী সজনেখালিতে কিন্তু স্বপ্নে তো তারা বিপণনের দু চাকা চারচাকায় চেপে লাল কার্পেট পাতা কোনো স্বপ্নের পার্টিতে পৌঁছে যায়...ত্বচা, চুল, খোলামেলা পোশাক নিয়ে প্রিয় পুরুষের সান্নিধ্যে এক নতুন জগতের আবিষ্কার।

বিবাহিত জীবন চাইলে তারা জনপ্রিয় সিনেমার DDLJ (দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে)—এর ছাদে ধামাকা বিয়ের স্বপ্ন দেখে। তারপর পরিবার মঙ্গলের নেটওয়ার্কে ভালো মা হওয়ার জন্য বাচ্চার ফুড থেকে ন্যাপকিন, দাঁত থেকে ঘুমপাড়ানি গানে ব্র্যান্ড-সুরক্ষার স্বপ্ন তাদের চোখে।

এইসব স্বপ্ন, গুচ্ছেক ডিগ্রি, সৌন্দর্য আর শরীর নিয়ে এখনও মেয়েদের বিয়ে হয় আর ছেলেরা বিয়ে করে। বাজার নির্ধারিত জীবিকার যারা সফল তারা যেমন, যারা সফল নয় তারাও পণ্য ভিত্তিক মুখের সামগ্রী পেতে চায়, বিয়ে করে। চাকরি করা বউ হলে তো কথাই নাই। অন্যথায় শ্বশুর বাড়ি প্রয়োজন মেটায়। দামি যৌতুকে মোড়া স্বর্গীয় বিবাহের বিজ্ঞাপনে ডুবে যায় আমাদের ক্রেতা-চৈতন্য। কন্যাপণ, বধূহত্যা আর নির্যাতনের সারি সারি উদাহরণ তৈরি হয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রেও বাপের বাড়ি শ্বশুর বাড়ি সব নিয়ে রসেবশে বিজ্ঞাপনের মতো জীবন হলেই ভালো। ফ্লেক্সিবেল অ্যাকিউমুলেশন বা যেখান থেকে যখন সস্তা, সেখান থেকে ধন আহরণের ধনতান্ত্রিক দর্শনে ইট বওয়া শ্রমিক থেকে হাইটেক মগজাস্ত্রের আইটি শ্রমিকরা ক্রমাগত অস্থায়ী চুক্তিপত্রের ভেলায় টলমল করে। জীবিকায় টান পড়লেই ছিঁড়ে যায় স্বপ্নতন্তু জাল। ফ্যানার বুদ্বুদ।

আর যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী দু চোখে স্বপ্ন নিয়ে তারা রঙিন পৃথিবীতে ডানা মেলে। উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরির মায়া কুহক থাকে। কিন্তু সে তো অনেক লম্বা পথ। রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নেই। জীবনেও নেই। জীবন মানে সেলিব্রেশন। সেখানে কাল নেই। শুধু আজ আছে। বাজার সেই সেলিব্রেশনের মঞ্চ খুঁজে দেয়। মডেল খোঁজে। নায়িকা খোঁজে। চিয়ার গার্লস, Raunchy Item Girls, রিয়ালিটি শোয়ের ধুকপুক। সব আছে। শুধু ঠিকঠাক পৌঁছানো চাই।

এইখানে নতুন পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের পা মেলে না। পুরানো পাঠক্রমে আমরা আটকে যাই। বিবাহ করে সংসারী মেয়েটির ক্ষেত্রে যেমন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়েটির ক্ষেত্রেও আমাদের তেমন সনাতনী মনোভাব। দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙানো থাক ‘মেয়েও হবে কন্যারত্ন/পেলে শিক্ষা, নিলে যত্ন’—যত্ন নেওয়া হল। শিক্ষা দেওয়া হল। তারপরে কী হবে?

কেন কন্যাদান হবে। তার মতো মহৎ কর্ম কিছু নেই। সেই কন্যা মহান পরিবারের কর্ত্রী হবে। জননী হবে। ছেলে মানুষ করবে। এত যে লেখাপড়া শিখল? বাঃ! শিক্ষিত মা-ই তো পারবে বাজারের উপযুক্ত ছেলেমেয়ে তৈরি করতে—সেই জন্যই তো ডিগ্রি। শিক্ষা।

আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়েরা কী করবে? যা রয়সয় তাই করবে। আমাদের পছন্দসই ডিউটি আওয়ারে মেলে, এইরকম কাজ নেবে। টিচার, প্রফেসর হলেই ভালো। মুখ থুবড়ে বউমার ODL-এ পাঠক্রমের অ্যাসাইনমেন্ট লিখে দেবে শ্বশুর বাড়ি—কী করবে শিক্ষিকা বউমার তিনমাসের বাচ্চা, চাকরি, উইক এন্ডে ক্লাস, প্রোজেক্ট—সব নিয়ে বেচারি জেরবার। ৪৯৮-এর ভয়ে নয়, চাকরি করা বউয়ের জন্য এটুকু করেই থাকে সচেতন বাঙালি। কিন্তু উলটোপালটা চাকরি নিলে। রাতবিরেতে কাজ করে ফিরলে—যা হবার তাই হয়। বিয়ের আগে শরীর সখ্যতা হলে যা হবার তাই হবে। কী হবে? রোজ কাগজ খুলে দেখছ না? খুন হবে। ধর্ষণ হবে। এই যে প্রতিহাতে বই—কন্যাশ্রী—যুবশ্রী—মধ্যমেধা, নিম্নমেধা সবাইকে উচ্চশিক্ষার ট্র্যাকে লড়িয়ে দেওয়া—কর্মহীন জীবনে ডিগ্রির উৎকর্ষতা বাড়াতে গিয়ে আমরা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে মিস্ করছি না তো!

বন্ধ-কারখানা, বন্ধ চা-বাগান, মন্দা অর্থনীতির স্রোতে এখন বাজারের সবচেয়ে স্টেডি লাইফবেল্ট শিক্ষা। কৃষিকে অলাভজনক করা গেছে। কারখানা নেই। কত স্বাধীনবৃত্তি ছোটো কাজ বন্ধ হয়ে গেল। ডিগ্রির মোহে যুবশক্তিকে অনেক দিন আটকে রাখা গেল। তারপর কী প্রতি হাতে কাজ হবে? বিয়ে হবে?

বিয়ে মানে যদি হয় স্থায়ী অর্থনৈতিক রোজগারের পর দাম্পত্য জীবনের চুক্তিপত্র তবে তো এদেশে কারোরই বিয়ের বয়স হবে না—মেয়েদের ১৮ আর ছেলেদের ২১ বছর ক্রমশই পিছোতে থাকবে।

কিন্তু তাদের শরীর থাকবে। মন থাকবে। বয়সকালে গ্রাম্য ভাষায়, ‘গা গর্মে গেলে’ বিবাহ দাওয়াই দেওয়া যাচ্ছে না, দেওয়া যাচ্ছে না বিবাহ বহির্ভূত শরীর-সখ্যতার অনুমোদন। কিন্তু ইউটিউবে, মোবাইলে, খোলা চ্যানেলে, বিজ্ঞাপনে প্রবল ভাবে শরীর আছে, ইশারা আছে, রগরগে আহ্বান আছে। অনিবার্যভাবেই মেয়েরা ধর্ষিতা হবে। খুন হবে। মার খাবে।

জয়িতার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সে তো সাধারণ পরিবারের মেয়ে। আমাদের সেলিব্রিটি বিশ্বসুন্দরী যুক্তামুখী বা গ্ল্যামার অভিনেত্রী জিয়া রহমানের জীবনেও এই রকম কিছু হয়।

বিয়ে বাচ্চা এসবের পরেও যুক্তা স্বামী দ্বারা নির্যাতিতা। খবর হয়: পণের দাবিতে নির্যাতন বিশ্বসুন্দরী যুক্তামুখীকে। জিয়া আত্মহত্যা করেছিল। তার প্রেমিক তাকে ধর্ষণ করেছে। গর্ভপাত করিয়েছে।

সব প্রতিবেদনের ভাষায় মেয়েরা এখনও কী আশ্চর্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয়। তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। জোর করে প্রেম করানো হয়। ধর্ষণ করা হয়। গর্ভপাত করানো হয়। শা এবং বহু শতাব্দী লালিত পরিবার মঙ্গল পাঠক্রমের এমনই নির্মাণ-শৈলী। ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’—নারীর তাই নিজস্ব কামনা বাসনা নেই। যতই ডিগ্রি বা সুবিধাজনক অবস্থান থাক না কেন মা হবার এবং না হবার, নিজের জীবনকে নিজের মতো চালানোর সিদ্ধান্ত নেবার ছাড়পত্র নেই। অথচ বাইরে থেকে দেখলে পৃথিবী কত পালটে গেছে। কত খোলামেলা পোশাক। স্বাধীন বৃত্তি। নতুন পেশা। নতুন জীবিকা।

পুরুষের মতো পেশীবহুল নারী ‘বডি বিল্ডার’। দূরপাল্লার মহিলা ম্যারাথন রানার, পাওয়ার টেনিস আর ফুটবল প্লেয়ার যারা গতি আর দক্ষতায় পুরুষের সমকক্ষ। এসেছেন পুরুষের থেকে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মহিলা প্রশাসক।

স্বামীর সম্পত্তি ভোগকারী স্ত্রী আবার স্বামীকে খোরপোশ দেওয়া স্ত্রী। সমকামী মহিলা বিবাহ স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছেন—কৃত্রিম প্রজননের সন্তান চাইছেন। পুরুষরা পুরুষাঙ্গ ছিন্ন করে মহিলা হতে চাইছেন। রূপোপজীবীরা তৈরি করছেন তাদের বৃত্তিগত সংস্থা। পৃথিবীর যে কোনো শক্তিশালী বাহিনীর সম্মুখ সারিতে আছেন মহিলা যোদ্ধারা। রয়েছেন লিপস্টিক রঞ্জিত জুসি ফ্রুটি ঠোটের আর পালিশ করা নখের কর্নেল। যৌন অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ—প্রেমিকদের নাম, অবস্থান, শরীর ও বিশেষ অঙ্গের মাপজোখ নিয়ে বই লিখছেন মেয়েরা। এইসব অলৌকিক মহিলাদের কথা সাতের দশকে ভাবাই যেত না। যেমন ভাবা যেত না রাতবিরেতে ক্যামেরা নিয়ে মহিলা সাংবাদিকদের উপদ্রুত অঞ্চলে ছুটে যাবার কথা। গর্ভনিরোধক ও ঋতুসংক্রান্ত ঔষধ তৈরিতে ব্যাপক লাভের পর ওষুধ কোম্পানিগুলো তাকিয়েছে ঋতুজরা আক্রান্ত মহিলা বা ঋতুজরা আক্রান্তের পূর্ব অবস্থায় স্থিত মহিলাদের দিকে। এই মহিলারা অনাঘ্রাত বাজারের টাটকা প্রতিনিধি। নারীরা এর চাইতে বেশি আর কী চাইতে পারে?

চাইতে পারে স্বাধীনতা। Look। দেখা। যেভাবে দেখার অভ্যাস তার বাইরে গিয়ে তার মতো করে দেখার স্বাধীনতা। নারী চায় ক্ষুধার অন্ন, বিলাস ব্যাসন এবং যৌন কামনার তৃপ্তি; নারী মানে উত্তেজক পোশাক, হাইহিল পরে পাছা দুলিয়ে হাঁটা, যেন তেন ভাবে পুরুষের লীলাময় সঙ্গিনী হওয়া—এর বাইরে গিয়ে মেয়েরা কী নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা পেতে পারে না? ‘Man shall not live by bread alone.’—এ কথা তো শুধু পুরুষের জন্য নয়, তারজন্যও সত্য। মেয়েরা তবুও শুধু রোমান্সের কিংখাব জড়িয়ে এক জায়গাতেই আটকিয়ে। তার জীবনের সব কিছুই অন্য প্রভুর ইচ্ছেয় হয়—শুধু নিজে সে একটা কাজই করতে পারে—আত্মহত্যা। প্রান্তিক নারীদের পুড়িয়ে মারা হয়। জয়িতার মতো শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েদের হারপিক খেতে হয়। হিয়ার মতো বা আর কারো মতো মেয়েরা কেরিয়ারের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আবার ঘর সংসারেও সুগৃহিণী হতে চাইলাম। হল না। তার জন্য যদি আত্মহত্যা করতে হয়, তবে তো পুরানো জায়গাতে আটকে থাকা ভালো ছিল। গ্রুমিং নেই, খোলামেলা পোশাকে র‍্যাম্পে হাঁটার পাঠক্রম জানে না—আটটা দশটা বা তিন-চারটা বাচ্চা সামলেও আপন ফুর্তিতে পাগলপারা মা মাসিমা কাকিমা জেঠিমার দল...। সোজা করে বললে, উলটে দেখুন, পালটায়নি। পৃথিবী পালটে গেছে। কিন্তু নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পালটায়নি, নারীর দৃষ্টিভঙ্গিও পালটায়নি। নিষ্ঠা, ক্ষমতার অভাব নয়—দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। জীবন, প্রেম, ভালোবাসা সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজবিচ্ছিন্ন জীবন-জিজ্ঞাসাহীন পাঠক্রমে অ্যাকাদেমিগুলো শুধুমাত্র দোকান যেখান থেকে ডিগ্রি কেনা যায় এবং বিয়ের অপেক্ষায় থেকে তাই কেনা হচ্ছে। দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতার জন্য এখনও তার কণ্ঠ নেই। তার হয়ে কথা বলে অন্য কেউ।

মালদহ বি.এড. কলেজ, সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষপূর্তি
সংখ্যা, ২০১৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%