মেয়েরা হল দেশলাই বাক্স

তৃপ্তি সান্ত্রা

আসছে বছর আবার হবে

জুলহাস ধান সেদ্ধ করবে। টগর নারায়ণ পুজো দিয়ে ইন্দিরা যোজনার পাওয়া টাকায় তৈরি বাড়িতে গৃহপ্রবেশ করবে। জ্বরজ্বর শরীর নিয়েও ১ ঘণ্টায় ৭০ টাকার বিনিময়ে অর্চনাদিকে ম্যাসাজ করাবে শিখা। হাজারে ৪০ টাকা হিসাবে বিড়ি বাঁধবে পাথার মাধাইতলা বলাতুলি পারশিবপুরমালদা, দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদের অসংখ্য বউ-বিটি। ৫ বছরের গুড্ডু থেকে ৭৫ বছরের বুধনি মাছ ধরা জালের গিঁট বাঁধবে কেজিতে ১০ টাকা হিসাবে। এঁরা ক্লারা জেটকিন জানেন না। অর্থনৈতিক রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু হয়েছিল তাকে স্মরণ করে ১৯৯০ সালে ৮ মার্চ শুরু হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক নারীদিবস—সে কথাও এঁরা জানেন না।

কমিটি, উদ্‌যাপন কমিটি, নারীর সার্বিক মূল্যায়ন এসবের মধ্য দিয়ে দিবসটির পালনের কিছু সরকারি, কিছু বেসরকারি প্রচেষ্টা দেখা যাবে। এই উপলক্ষ্যে ব্লকে প্রাইমারি এবং প্রি-প্রাইমারি গার্জেনদের জন্য থাকবে কবিতা, আলপনা, শাঁখ বাজানো—এরকম নানা কর্মসূচি। কোথাও আবার এনজিও-র উদ্যোগে বস্ত্র, অর্থ বা দ্রব্য বিতরণের হাওয়া। শুধু নারীদিবস নয়, যে কোনো দিবস পালন মানে ধূপধুনো ঘণ্টা বাজিয়ে ‘আসছে বছর আবার হবে’ বলে মণ্ডপে দেবীমূর্তির কাঠামো তুলে রাখা নয়, যাপনে দর্শন-কে ছড়িয়ে দেওয়া। না, নবনীতা, অনুরাধা, মিঠু, দীপ্তি কেউই এই একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বাস করেন না।

ছাড় পাবার দিন

পুঁজির আবার এদিকে তীক্ষ্ণ নজর। ইন্টারন্যাশনাল পুঁজি দেখে যত রকম দিবস বা ‘ডে’ আছে, সেইরকমভাবে বরণডালা সাজিয়ে নানারকম অফার নিয়ে বিশাল বাজার ধরতে সে ব্যস্ত। নারী দিবসে যেমন শাড়ি। কসমেটিকস্। পার্লার-অফার। জুয়েলার্স। গাড়ি। চৈত্র মলমাস, বিয়ে হয় না। কিন্তু ৮ মার্চ, ২৩ ফাল্গুন—পুরো ফাল্গুন আর বৈশাখ থেকে শ্রাবণ...বিবাহ ধামাকা। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (১৯৫৬, ২০০৫) অনুযায়ী বসতবাটি বা পৈতৃক জমির অধিকার মেয়েদের দিলেও চলতি সামাজিক ধারণার বশবর্তী হয়ে মেয়েরা মনে করেন যে বসতবাটি বা কৃষিজমি নয়, তাঁর সামাজিক ন্যায্য অংশ হল পণ। সুতরাং নারীর বিবাহের জন্য জন্মের আগে থেকে স্বর্ণলোনের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিশেষ ছাড়ের অফার থাকলে শাইনিং ইন্ডিয়ার আলোকপ্রাপ্ত নারীরা অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়বেন। ঘরোয়া আলোচনায় তারা ভ্রূণ হত্যা, কন্যা সন্তান হত্যা, অনার কিলিং-এর বিরোধিতা করার সাহস রাখেন। আবার কন্যাদান পর্ব আর ইঁদুর মাটি ফেলে বাবার বাড়ির ঋণ শোধ করার ঐতিহ্য পরম্পরাতেও তারা স্থিতিশীল।

চিত্রনাট্যর কৃষি, শিল্প-ভিত্তি ভবিষ্যৎ

জুলহাস বা ধনেশ্বরী বর্মন বীজতলা তৈরি, জমি রোয়া, বীজ বোনা, ফসল তোলা, শুকনো, মাড়াই, ধান সেদ্ধ ইত্যাদি যাবতীয় কাজ করলেও লাঙল দেয় না। লাঙল যার, জমি তার প্রবাদটি তবে কী তাঁদের ক্ষেত্রে খাটবে না? কিষানির বৈষম্য দূর করার জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ, উপার্জন এইসব হাতিয়ার নয়। প্রয়োজন কৃষিজমিতে বাস্তব অধিকার প্রতিষ্ঠা। মেয়েরা এই বিষয়ে সচেতন নন। আইন চালু হলেও বাস্তব প্রয়োগে সমস্যা আছে।

‘খেরোর খাতায়’, লীলা মজুমদার ‘মেয়ে-চাকরে’ রচনায় লিখছেন ‘ঢের বেশি কাজ করত মেয়েরা, ওপর-ওয়ালারা খুব খুশি হতেন। পুরুষ সহকর্মীরা হিংসে করে বলত, ‘মেয়েদের বুদ্ধি কম কিনা, না খাটলে ওদের চলবে কেন! আমরা কেমন ম্যানেজ করে নিই দেখেননি’।

এই বুদ্ধিকম বা মুখবুজে কাজ করার দক্ষতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষীহীন, ইউনিয়ন বিমুখ, কম মজুরির মেয়েরাই বাজারের টার্গেট। এদের কাছে স্কিলড লেবার হল ১৬-৩৫ বছরের কর্মক্ষমী মেয়েরা। বয়স্কদের ছাঁটাই করার অজুহাত থাকেই আর বিয়ের অপরাধে বা বাচ্চা হওয়ার ছুতোয় এদেরকে ছাঁটাই করাও সহজ।

জল জমি থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে কারখানার স্বপ্ন, কারখানা হলেও উন্নত প্রযুক্তিতে কর্মী ছাঁটাই, ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা ঋণ আর শ্রমিকদের পি এফ গ্র্যাচুইটির টাকা মেরে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যাওয়া—এই চিত্রনাট্যে গার্হস্থ্য জীবন টালমাটাল হয়ে যায়। পুরুষ হয় পরিযায়ী শ্রমিক। ঘরের কাজ সামলে পেটের ধান্দায় মেয়েদের নামতে হয় পথে। ভাতের থালাটি সবার জন্য সাজিয়ে অন্নপূর্ণা সাজতে হয় মেয়েদেরই। তাই শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয় সমস্ত ভারতবর্ষে জল-জঙ্গল-জমি রক্ষার যে লড়াই চলছে সেখানে মেয়েদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

‘দে কান্ট রিপ্রেজেন্ট দেম সেলভস্, দে মাস্ট বি রিপ্রেজেন্টড’। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রিফ্লেক্স অ্যাকশন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, যে যাঁর নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে গর্জে উঠছেন নিজের মতো করে। মার্কসবাদ, নারীবাদ কোনো কিছু না জেনেই। ৮ মার্চ ২০০৯ সালে, জঙ্গল মহলের মেয়েরা যখন মহিলা শাখা তৈরি করেন, তা শুধু রাষ্ট্রের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহ্বান নয়, সমাজ জীবনে পরিবর্তনেরও আহ্বান।

দ্রোহী যখন হই, আইনটা রক্ষা করি

আইন সংক্রান্ত অধিকার জানে না মেয়েরা, সেটা জানা জরুরি। এই যে প্রতিদিন পথেঘাটে মেয়েদের বিপদ, হিংসা, মেয়ে-পাচার, কন্যা ভ্রূণ হত্যা, অনার কিলিংস, পণ, বধূহত্যা—এসবের জন্য, যে আইন তার সম্বন্ধে ক-জন সচেতন? নাগরিক কী কী অধিকার আমরা পেতে পারি, কী কী প্রকল্প চালু হচ্ছে তাও জানেন না অনেকে।

একদিনের আনুষ্ঠানিক পালনে নয় প্রতিদিন সচেতন শিক্ষিত মানুষকে এইসব অসংগঠিত মানুষের আইনের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে।

এক দিনের আনুষ্ঠানিকতায় যাঁরা বিশ্বাস করেন না তারা কিন্তু জানেনও না কীভাবে এইসব অধিকারের কথা বলে মেয়েদের সচেতন করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে, অসংগঠিত শ্রমিকের মতো পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে তার বেতনের ফারাক নেই, প্রান্তীয় মানুষের কথা তিনি নাই বুঝতে পারেন। কিন্তু নারীর প্রতি হিংসা বেড়েছে, প্রতিদিনের সংবাদমাধ্যম থেকে তা তো বোঝাই যায়। কী ব্যাখ্যা তার? নারীর স্বনির্ভর হবার চেষ্টা এবং সমানাধিকার অর্জনের চেষ্টাই কী দায়ী? কেউ কেউ এক্ষেত্রে মেয়েদের রাত্রে রাস্তাঘাটে চলাফেরা, স্বল্প পোশাক, রাত্রে চাকরির ডিউটির প্রসঙ্গ টেনে যৌন হেনস্তার মান্যতার কথা বলেন। যৌনতার জটিল মনস্তত্ত্ব বিষয় এখানে টানার পরিসর নাই। শুধু এটুকু পরিষ্কার করে বলা যে অনিচ্ছুক পুরুষকে দিয়ে সর্বসমক্ষে নারী কিছু করতে পারে না, পুরুষ কিন্তু নারীকে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। আইন আছে। আবার আইন নেই। আইন দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদল, সামাজিক প্রতিরোধ, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোচনা, এসবের মাঝেই ক্রম মুক্তির আভাস।

মন, মন। তোমার শরীর নাই কুসুম

গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ১২-১৩ বছর থেকেই শরীর পূর্ণতা পেতে থাকে। কৃষি-বুনিয়াদ, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ভেঙে গেছে। মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮। ছেলেদের ২১। খুড়োর কলে যে ডিগ্রি আর চাকরির টোপ ঝোলানো তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বয়স ২৭-৩০-৩৫ পেরিয়ে যাবে। টিভি, সিডি, কম্পিউটার, মোবাইলে সেক্স, ব্লু-ফিলম, অফ্ শপে জাতীয় বীরদের দাপাদাপি, কমফোর্ট গার্লস থেকে চিয়ার গার্লস সবই রমরমিয়ে চলবে। শুধু একবিংশের অবলা, চোখের জলে ভেসে জানবে তার শুধু মন আছে, শরীর নাই। সে জানবে না প্রতিরোধ। সুরক্ষা। অনিচ্ছুক গর্ভলোপের সাবধানতা। হাতুড়ে পাল্লায় পড়ে মৃত্যু হবে তাঁর। আর কুকুর কামড়ালে, শেয়াল হায়নার কামড়ে বিশেষ অঙ্গহানি হলে ‘ধর্ষিতা’ শব্দের লজ্জা গ্লানিতে ডুবে যাবে অন্ধকারে। নতুন পৃথিবীতে শাসকের ভাষার পাশাপাশি আসুন আমরা খুঁজে নিই নতুন ভাষা! ধর্ষিতা শব্দ পালটে লিখি ধর্ষণে-আহত। আমরা, আমাদের মা, বোন, মেয়েরা কেউ ধর্ষিতা নই—ধর্ষণে-আহত।

চারিদিকে কংক্রিট আর শিশ্ন সভ্যতার দাপট। কমে আসছে নদী, জল, জলাভূমি। নুন দিয়ে, বালিশ চেপে, যে ভাবেই হত্যা করা হোক না কেন জলাভূমি না থাকলে, থাকবে না পৃথিবী। আমাদেরও আগুন আছে, অকারণে ব্যবহার করব না তা। বীরধর্ম নয়। আজকের পৃথিবীর প্রয়োজন Effeminacy, একটু মেয়েলি ভাব। আশাপূর্ণা যেমন বলেছেন: ‘মেয়েরা হল দেশলাই বাক্স—উপযুক্ত বারুদের সঞ্চয় ভেতরে রেখেও নিরীহ চেহারায় পড়ে থাকে রান্নাঘরে, ভাঁড়ারে, শোবার ঘরে, আর এখানে সেখানে।’ অপ্রয়োজনে নয়, প্রয়োজনে যেন তারা জ্বলে উঠতে জানে, নারী দিবসে এইটুকু চাওয়া।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ৬ মার্চ ২০১১

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%