তৃপ্তি সান্ত্রা
ওয়েটিং ফর বনমালী। সর্বমঙ্গলা মোড়। বাস আসছে না। অপেক্ষারত যাত্রিনীদের খুচরো আলাপ চলছে। ওয়েটিং-এ ঠোঁটকাটা সবিতাদি আছেন। দোলের বউ চক্কোত্তি বাড়ির ছেলের সঙ্গে পালিয়েছে। দু-দুটো বাচ্চা আছে তাও। এই নিয়ে ছি-ছিক্কার চলছে। গীতা, মঞ্জু, ইলা সবাই সুরসিকা কিন্তু একটু রক্ষণশীল—সতীসাধ্বী প্যাটার্ন। দোলের বউয়ের এই অনাচারে তারা রীতিমতো উত্তেজিত। দেশ জাতি সমাজ গেল এই নিয়ে তাদের ছি-ছিক্কার। দুই ছেলের মা দোলের বউ ঝুমা, তবু সে কীভাবে পারল, এই নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা। শুনতে শুনতে সবিতাদি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, থামতো। লাগাবার সময় ফুস্স করে পড়ে যাক না তোদের বরদের, তোরাও পারবি।...বলার সময় আঙুল দিয়ে ফুস্স করে পড়ে যাবার অ্যাকশানও দেখায় সবিতাদি।
উফ্! সবিতাদি! কী মুখ তোর!—সবাই চাপা আমোদে ফেটে পড়ে।
ফুটও কাটে কেউ—তুই কেমন ভাবে জানলি। ওদের দুটো বাচ্চাও তো হয়েছে।
সে, যখন পারত তখন বাচ্চা হয়েছে। বাচ্চা হলেই তো সব শেষ হয়ে যায় না। দোলটাকে দেখিস না কেমন একটা সখী সখী ভাব, ম্যাদামারা। ভালো থাকতে বলা খুব সোজা। বললাম তো ‘বিসি’ মার্কা বর হলে কে কত তার সাথে পড়ে থাকে তা দেখতে হবে!
কৃষ্ণচূড়ার তলায় যেখানে বাঁধা মাচায় উঠতিদের ঠেক সেখানে অবিশ্রান্ত বাল-বোকাচোদা আর বাঁড়ার স্রোত। কেউ ফালতু ঘরের ছেলে না, অধিকাংশের মা বাবা শিক্ষকতার সাথে জড়িত। গুচ্ছ মহিলাগণ প্রধানত দিদিমণি। তাদের মা, মাসি, দিদির বয়সি। তবু তাদের গ্রাহ্যের মধ্যে না এনেই ছেলেদের বাক্যালাপ চলে। তাদের মুখে ফুলফর্ম আর সবিতাদির মুখে সংক্ষিপ্ত ‘বিসি’ শুনে একটা দর্শন উঁকি-ঝুঁকি মারে। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘বিসি’—এই সারসত্যটি উপলব্ধি করে যারা, তাদের যেতে হয় সেই চরম নিদারুণ পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে, তারা কিন্তু এই বিশেষণটি ব্যবহারে সড়োগড়ো নয়। কথায় কথায় একটি ছেলে অন্য ছেলেকে বোকাচোদা বলছে। অর্থাৎ বলছে, তুই ওই কম্মোটি পারিস না, মানে করতে পারিস না।...তাতে তার তো কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়। বরং অন্যকে হীনম্মন্য করার একটি প্রয়াস। মানবজন্ম তোর, অথচ সেই জন্মের শ্রেষ্ঠ আনন্দের কাজটাই তুই করতে পারিস না। আমি পারি। আমি ‘বিসি’ নই বলা হচ্ছে না বটে, কিন্তু চোরা ইঙ্গিত যেন সেইখানে। আমি আমরা সবাই পারি। তুই পারিস না। এতে যার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি, কষ্ট—স্বামী, প্রেমিক সেরকমটি হলে জীবন মাটি যে নারীর, সে কিন্তু চুপচাপ। কোনো নারী পুরুষকে বোকাচোদা বলবে, এমন রেওয়াজ নেই। কোথায় থামতে হয়, শাসকের ভাষায়, তা নির্দিষ্ট।
পুরুষে-পুরুষে খিস্তি চলুক। ‘বিসি’ চলুক। বাল, বাঁড়া চলুক। কারণ যে কথার নেইকো বাঁড়া/সে কথা ন্যাড়া ন্যাড়া। সতী নারী পতি তরে/ সব সহে অকাতরে। বনেদি বাড়ির বংশরক্ষার ব্যাপার হলে ধ্বজভঙ্গ স্বামীর অক্ষমতা ঢাকতে গুরুদেব-ভাগ্যে সন্তানলাভ। ভাশুর বা শ্বশুর-ভাগ্যেও হতে পারে। অনুমোদন গৃহ নামক প্রতিষ্ঠান সাপেক্ষ। স্বামী অক্ষম বলে স্ত্রীর স্বনির্বাচিত পুরুষগমন বা বিবাহের স্বীকৃতি মিলবে না। কী বর্ণহিন্দু সমাজে, কী বিভিন্ন উপজাতি পরিকাঠামোয়, পুরুষের বহুগামিতা স্বীকৃত হলেও নারীর বহুবিবাহ অনুমোদিত নয়। একই সঙ্গে দ্রৌপদীর মতো পঞ্চস্বামী নিয়ে কেউ ঘর করেছেন বলে দেখা যায়নি, যদিও একাধিকবার বিবাহের নজির দেখা যায়।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ বিহানি। যে এককুড়ি তিনটা মরদের সঙ্গে ঘর করেছে। সব স্বামীকে তার মনে আছে। বাঁ হাতে বাইশটা পেতলের চুড়ি, ডান হাতে একটা কাচের চুড়ি। বাঁ হাত অতীত। কাচের চুড়ি ভেঙে যাবে বলে পেতলের। কজন মরদ সাঙ্গ করা হল, মনে রাখতে হবে তো! ডান হাতে কাচের চুড়ি। ভঙ্গুর।...বর্তমান স্বামী রতিয়া উরাওঁ তাকে খুব পিটিয়েছে। বুকে জ্বলন্ত বিড়ি চেপে ধরেছে। নীচেও ছ্যাঁকা দিতে পিছপা হয়নি। বিহানি চা বাগানে বিশরাম বুড়ার কুলি। গোয়া বাবুর কাছে নালিশ জানাতে এসেছে। রতিয়া যদি নিজেকে না শোধরায়, খুব শিগগিরই সে বাঁ হাতের চুড়ি ডান হাতে চালান করে দেবে। চোমংলামার এই গল্প কোনো কল্প-গল্প নয়। চা বাগানের স্মৃতিকথা নিয়ে ‘এই জন্মের বৃত্তান্তের’ এক বাস্তব কাহিনি।
বিহানি আপাতত মুলতুবি থাক। ফিরে যাওয়া যাক বনমালীর জন্য অপেক্ষারত সেই সব দশভুজা ছটফটে তুখোড় নারীদের আড্ডায়। দেবী দশভুজা, কিন্তু রাবণের মতো দশানন নেই! দশ হাতে কাজ। একই সাথে একাধিক কাজের দক্ষতা। কিন্তু মুখ তো একটাই। একই মুখে শতনাম। ছেলেমেয়ে ভাশুরপো ভাশুরঝি ভাগ্নেভাগ্নি সকল কনিষ্ঠের সাথে স্নেহের বাক্যালাপ। গুরুজনে শ্রদ্ধাভক্তি। সংসারের যাবতীয় হাঁকডাক, আদেশ-উপদেশ, রাগ-ঝাল ওগরানো, সময়ে প্রেমালাপ, ক্লাসরুমের দ্বিজত্ব। ব্রহ্মা বলেন, চতুর্মুখে গাও রে হরিনাম। মহেশ্বরও পঞ্চানন। ইন্দ্রের সহস্র। বিষ্ণু তো বহুরূপী—সুতরাং একটা মুখ ঠিক একটাই মুখ নয়। দেবীদের হাতটাত বাড়তি থাকলেও, মুখ তো দেখি একটাই। সেই মুখের বাণী অমৃত হলেই ভালো। শুভ। মঙ্গল।
কিন্তু দুহাতে যে দশহাত, চারহাতের কাজ করবে, সে কীভাবে সুহাসিনী, সুমধুরভাষিণী হবে।
হবে না। হবে না। হয় না। পছন্দের কাজ, আট কেন আঠারো ঘণ্টা ধরে করে সৃষ্টির আনন্দ লাভ করা যায়। আর যাকে অপছন্দের কাজ মুখ বুজে, নিজেকে বিস্মৃত থেকে করে যেতে হয়, তার খিস্তিই বিনোদন। অবসর। গুমোট ঘরে বাতাস। শীতের রাতে লেপ। ঠান্ডা বিছানায় আগুনের সেঁক। হাঙরের হুটোপুটি। সে বনগাঁ লোকালের কাজের মাসি হোক, হেসেল-ঠেলা জেরবার মধ্যবিত্ত হোক, গলায় বকলস আঁটা আইটি সেক্টর বা প্রোজেক্ট ওয়ার্কর। সরু থেকে মোটা— ঢাকনা খোলা বা ঢাকনা ছাড়া...অফুরন্ত কাঁচাপাকা বাক্যস্রোত।
দেখছি হুল্লোড়বাজ দিদিমণিদের। দুহাতে দশজনের কাজ সেরে (আট-নয়ের দশকে দুজনের সংসারে চার-পাঁচ জন স্পেশালিস্ট কাজের লোক রাখার রেওয়াজ চালু হয়নি) বনমালী সওয়ারী হয়ে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে। বাসের অপেক্ষায়, বাসের ভেতরে, অফ পিরিয়ডের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডার স্বাদ। ক্লাসরুমে বা নিজের রুটিরুজির জায়গার সঙ্গে যদি প্যাশন মিলে যায় তো চরম প্রাপ্তি। ক্লাসের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রোজকার পাঠদানে একান্ত ভালোলাগাটুক ছড়িয়ে যাবে। কিন্তু যদি চাকরির জন্য চাকরি, শুধুই টাকার জন্য চাকরি, সারকুলারের বিভিন্ন নির্দেশ মেনে শিক্ষকসত্তা ছাঁটতে হাঁটতে চাকরি, তখন খুশকির মতো, শায়ার আঁটো দাগে চুলকুনির মতো, সবার সামনে গোপন অঙ্গ না চুলকোবার অস্বস্তিতে, দুর বাল দুর বাঁড়া কি উঠে আসবে না ভল্কে ভল্কে! সবাই কি বাংলা দেশের শ্যামলী বা রাঢ়বাংলার সবিতাদির মতো মুখ খুলে বলতে পারবে?
ওয়েটিং ফর বনমালী। কে জানে বনমালী কে! কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে টুকরো টুকরো হয়ে কৃষ্ণ-কান্হা-কানাই-কানু-মদন-মোহনের সঙ্গে রাসলীলা খেলার স্বপ্ন দেখতে দেখতে ফিচেল গলায় কি তারা বলতে পারবে, ও আমার মদন, ও আমার মোহন! মদন, মদনা—গালাগাল। মোহন—দস্যু সিরিজ।...এই সব রঙ্গ পারবে? পারবে না। পারবে না। তারা খিটখিটে হবে। সাইকি হবে। ডিপ্রেসড হবে।
মোটেও না দিদিমণি। খিস্তিখাস্তা না করলে সবাই ডিপ্রেসড হবে, কি খিটখিটে হবে এসব আপনার ধারণা। এটা নির্ভর করে শ্রেণিচরিত্র, সামাজিক বা পারিবারিক গঠনের ওপর। পরিবেশ তো আছেই।
কোনো কোনো চলতি সাহিত্যে যে খিস্তির বন্যা—বলা হয় জীবনের সহজ ছবিটি দেখা যাচ্ছে।...আরে বাবা সেটা তো আর সবার ছবি নয়। গুবোর মুখে মেয়েছেলে শুনে আপনি তেড়ে যাননি? ব্যাটা শুনলে বৈশাখীর কান লাল হয় আপনি জানেন না?
তেড়ে আসছে বিরোধী স্রোত।
মিনমিনে জবাব বেরিয়ে আসে—জানি। এক জাগায় গালি, অন্য জাগায় বুলি। স্ল্যাং সর্বদা ভাষানির্ভর নয়, সংস্কৃতিনির্ভর।
অনুর উচ্ছ্বাস মনে পড়ল। লাফাতে লাফাতে বাড়িতে এসে জানতে চাইছে, পিন্টু কী হল রে, ব্যাটাছেলে না মেয়েছেলে?
ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের নতুন কমিটি গঠন হচ্ছে।
কী রে মেম্বার সবাই দাদা কেন! দিদিমণি তো অনেক, তাদেরও রাখ!
ক্লাবের সক্রিয় কর্মী গুবো জানাল, হ্যাঁ হ্যাঁ এবার মেয়েছেলেও রাখা হবে।
উফ! মেয়েছেলে আবার কী!
কেন মেয়েছেলে আর ব্যাটাছেলে। কি বলব তবে?
গুবোকে কীভাবে বোঝানো যায়। হাল ছাড়তে হয়। যেমন বৈশাখী যখন বলে, ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে তো আমি, কী বলব, একেবারেই অন্যরকম পরিবেশ। ব্যাটা শব্দটা শুনলে কান-টান লাল হয়ে মূর্ছা যেতাম। শ্বশুরবাড়িতে দেখি ওই শব্দটা হরদম বলা হচ্ছে। কী যে অস্বস্তি হত।
তো, ব্যাটা কী এমন ম্লেচ্ছ শব্দ তাও তো বোধগম্য হচ্ছে না আমাদের। সাতের দশকে রাজনৈতিক রং পরিবর্তন করেছিল বলে সাগরকে হাফগেরস্ত বলে গালি দিয়ে পাপু খুব কেত্ নিল। হাফগেরস্ত শব্দটা কীরকম গালাগালি গুরু? তাও জানো না—মানে লাইনের, ছেনাল।
ওমা, কেন! এক রাজনৈতিক দল ছেড়ে অন্য দলে গেছে বলে? ও তো দশক না পেরোতেই বহুমাত্রিক সহবাস দক্ষতা বলে স্বীকৃত হবে। ওই সব ভিক্টোরিয়ান সতী সাধ্বী নায়িকা, একপ্রেমনিষ্ঠ নায়ক ভেঙেচুরে আইটেম গার্ল আর গাইবাছুরে ভরে যাবে তৃণভূমি। লেটস্ ওয়েট অ্যান্ড সি।
তো নানা জায়গায় নানা কথা নিয়ে মহা খিটকাল। ব্লাডি কথাটা যে কী এমন খারাপ আমেরিকা জানে না অথচ ইংল্যান্ড মুচ্ছো যাচ্ছে সে কথা শুনে। এসব আমরা কিছু কিছু জানি।
জানি। ভদ্দর লোকের টপোগ্রাফি শোভন, মঙ্গলময়। জানি হর্ম্যপ্রাসাদ। তোরণ। ফিলটারড্ লুব্রিকেন্ট চমৎকার সাজানো পৃথিবী। জানি শোভন-সাহিত্য। বর্ণশাসিত, কুলীন অধ্যুষিত। দক্ষ কলম, শিল্পিত মনন। কাদামাটি গুমুত কফকাশি শ্লেষ্মা রক্ত পিত্ত বমি হত্যা কান্না সব কলমের আয়নায় মায়া ধূপছায়া হয়ে যায়।
পরিশ্রুত না হলে, ক্লিবিলে থিকথিকে আর্সেনিক জল পান করবে কৌন মা কা লাল? অযুত বিজ্ঞাপন সত্ত্বেও বোতলের জল যেমন খুব কম সংখ্যক মানুষের সাধ্য-পানীয়, সাহিত্যও তেমনি। সবজান্তা গুগল বিষয় যতই জানুক, জানে কি কে কার আশয়?
মলমূত্র বিপণনশোভিত পৃথিবীর বাইরে যে জল মাটি আগাছা বেপথ ঘুরপথ রাস্তা ছোটোরাস্তা ঘিঞ্জিপথ গলি কানাগলি আমরা তার কতখানি জানি। কিছুই প্রায় জানি না। ঘরবন্দি জীবন থেকে কজন বা রোদজলের সাহস। কজন বাইরে যেতে পারে। লেন্স যতই শক্তিশালী হোক, জুম করেও কি সবটুকু ধরা যাবে! শ্রেণিচরিত্র, সামাজিক বা পারিবারিক গঠনতন্ত্র এসব মেনে নিয়েই দমবন্ধ বেলফুল-রাতে বুলির ছোটো ছোটো সাম্পান, গলির অবিশ্রান্ত ধারাপাত। চুটকির মজুত ভাঁড়ার কঠোর শাসন আর অবদমনের ফাঁকে ফাঁকে জমে ওঠা রুদ্ধকামনার পাঁজা পাঁজা গ্লেসিয়ার ভেঙে বেরিয়ে আসছে কথামৃত।
একথা শুনলে কী হয়? নির্ধনের ধন হয়, নিষ্পুত্রের পুত্র হয়। ধন কি আর সোনা দানা, টাকা-পয়সা? জীবনধন, পথ পেরোবার কানাকড়ি।
স্বামী বিসি হলেও কী করে সন্তানলাভ—তার জ্ঞানগম্যি হয়। বন্ধুভাগ্যে হতে পারে, আত্মীয়ভাগ্যেও হতে পারে। জড়িবুটি কবজ-তাবিজে নয়। সন্তান হবার পরও কী ভাবে স্বামীসুখ পাওয়া যেতে পারে—দোলের বউ ঝুমার মতো অন্য কারো সাথে চলে না যেতে হয়। শরীর শরীর, তোমার মন নাই কুসুম! নাকি মন মন, তোমার শরীর নাই কুসুম! কোন ফরমুলা, সে নিয়ে বিস্তর গবেষণা। তবে একটা কথা বলতে ভুলে গেছিরে মঞ্জু। প্রতি মাসের ঝঞ্ঝাট নিয়ে মেয়েদের তো খুব হয়রানি।
কোন ঝঞ্ঝাট? পিরিয়ডের কথা বলছিস!
হ্যাঁ, রাঙাদির কথা।
রাঙাদি?
দেখো, মা-ঠাকুমারা আগে কেমন বলতেন মাসিক, আমরা বলি পিরিয়ড। আবার কেউ বলে রাঙাদি। অনেকে মিলে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ বলল, যাই রে রাঙাদি এসেছে। তো জয়াটা এমন বোকা, বুঝতে পারে না কী বলছে। চাপা হাসি, ইঙ্গিত দেখেও কিছু বোঝে না। অনেক পরে বুঝতে পেরে আমায় বলেছিল।
হুঁ...। রাঙাদি এসেছে, ভারি নতুন কথা। কিন্তু ঝঞ্ঝাটের কথা কী যেন বলছিলি?
না, ঝঞ্ঝাট তো বটেই। এই কষ্ট তো ছেলেরা বুঝবে না!
ছেলেদের সঙ্গে যেন কষ্ট ভাগ করতে যেয়ো না।
দুর! তাদের কাছে কি আর প্রতি মাসে রাঙাদি আসবে!
নানা, রাঙাদির কষ্ট নয়, এই ধর দশ মাস সন্তান ধারণ তো হল, পুরুষের তো আর গড্ভো নেই যে ধারণ করবে। কিন্তু গড্ভো-যন্ত্রণা যেন ছেলেদের হয়—এইরকম বর-টর চেয়ে টেয়ে বোসো না কখনো!
কোনো দুষ্টুমি আছে এর মধ্যে তাই না রে?
নানা, সিরিয়াস!
সেই রাজার গল্প তো? ভগবানের কাছে বর চেয়ে রানি নিজে নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন—
ভগবান কিন্তু বারণ করেছিলেন, জানো!
হ্যাঁ, অনেক বার। বলেছিলেন, এরকম বর চেয়ো না। কিন্তু রানি প্রচণ্ড নারীবাদী। আমি একা কেন সব সইব! দশ মাস বহন করেছি, ঠিক আছে। কিন্তু গভ্ভো-যন্ত্রণা বাবাকেই পেতে হবে।
তারপর কী ফ্যাসাদ বল। রাজা মশাই ডাক্তার-বদ্যি নিয়ে বসে আছেন, কখন ব্যথা উঠবে। শেষে রাজার নয়, ব্যথা উঠল সেনাপতির। উফ্! কেস একদম জন্ডিস!
এই গল্পের মজা লোটার জন্য কোনো কঠোর বিধি-নিষেধ নেই। বিবাহিত মানেই অ্যাডাল্ট। এবং যাবতীয় শাসন-অনুশাসনের বন্ধনে নারীর চরিত্র দেবতারাও জানেন না, এই গভীর ইঙ্গিতের অপার রহস্য খোঁজার জন্য তৈরি সহস্র রজনীর গল্প। এবং অবশ্যই প্রেজেন্টেশান। উপস্থাপনা। বাচনভঙ্গি। মঞ্জু, গীতার খুব মনে পড়বে বাণীদির কথা। ভারি সুন্দর গল্প বলেন বাণীদি।
মোদ্দা কথা, খুব হাওয়া খাও, জলচল হও, কুঠুরি থেকে বেরিয়ে এসো।
আমি ব্রাহ্ম বাড়ি। ব্যাটা শব্দটাও বাড়িতে কখনো শুনিনি। আমি বিসি শুনিনি। শ্বশুরবাড়ির খোলা মুখ। তো?
নাথ হে, প্রেমপথে সব বাধা ভাঙিয়া দাও। মাঝে কিছু রেখো না। এসব না বুঝেই গেয়েছি নাকি?
‘ঢিসাও রে বারা ঢিসাও রে ঢিসাও’—শুনিনি? ঢেকিতে ধান ভানতে ভানতে বউ ঝি-রা এই ধুয়ো ধরে। এই সব ছিলকা গানের সুতো দিয়ে রাতভর তৈরি করিনি যৌনগল্প—আকাশে ভাসার জাদু কার্পেট?
মোক্ষলাভের পথে কতসব বাধা। পাঁকাল মাছটি হয়ে থাকতে হবে। সব শুনবে কিছু বলবে না। কর্মময় জগৎ। জানি। একটিই মুখ। মঙ্গলগান শুনতে চায় জগৎসংসার। জানি। বলি মিঠি মিঠি বাত।
কিন্তু ওই যে বললাম। শুধু শুনতে শুনতে মুখ বুজে থাকলে শরীরে বড়ো আটকাট হয়। রাগ দুঃখ কষ্ট কান্না লুকিয়ে রাখলে বড়ো গ্যাস হয়। নানাবিধ অনুশাসনে উর্ধ্ব গ্যাস বাত হয়ে বেরোতে পারল না, তো নিম্নগ্যাস। বাতকর্ম
সাইকি হবনা।
ডিপ্রেসড্ হবো না।
খিটখিটে হবো না।
বাতকর্মটিও কর্মযোগ। নাকি!
বিনির্মাণ ১১, নভেম্বর ২০১১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।