ঋতু

তৃপ্তি সান্ত্রা

‘Mircea Mircea Mircea I have told my mother that you have kissed me only forhead,,,’

লিপিকা একটু লাজুক মুখে বলে, দিদি আপনি একটু কথা বলবেন প্রিয়ার সঙ্গে?

প্রিয়া ক্লাসে আসেই না। কত আশা করে আছি ওর ওপর, স্কুলেও আসে না।

এসেছে আজ। আপনি একটু কথা বলুন।

প্রিয়া হাসিখুশি সুন্দর চেহারার বুদ্ধিমতী মেয়ে। চেষ্টা খুব। ভালো রেজাল্টও করছে। কিন্তু মাস দুয়েক ধরে ওর একটা ভীষণ পরিবর্তন লক্ষ করছি। অন্যমনস্ক। বাউন্ডুলে ভাব। পড়া করে না। স্কুলে অনিয়মিত আসে। আমরা ওকে নিয়ে খুব চিন্তিত। লিপিকা, অবিবাহিত—একটু লাজুক। প্রিয়া ওকে কিছু বলতে চেয়েছে। স্পষ্ট করে বলেনি।

একলা ঘরে প্রিয়া যে প্রশ্নটা আমায় করে, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কী হয়েছে তোমার, স্কুলে আসছ না, পড়ায় মন নেই—কী হয়েছে। উত্তর না দিয়ে ও উলটে আমায় প্রশ্ন করে—দিদিভাই, স্বপ্নে কেউ ছুঁলে কী বাচ্চা হয়?

—কেন, তা হবে কেন? কার বাচ্চা হবার কথা বলছো?

—আমার, আমার যদি হয়ে যায়।

—তোমার প্রতি মাসে শরীর খারাপ হয় না?

—হয় তো।

—তবে?

সে অবাক হয়ে তাকায়। আমিও অবাক হই খুব। গর্ভবতী হলে যে ঋতুবন্ধ হয়, এটুকু সে জানে না। এবং এই কথাগুলো প্রিয়া বাড়ির কাউকে বা বন্ধুদের বলতেও পারেনি। তবে বাচ্চা হবে, তার এই ভয় হল কেন?

ঘটনাটা এইরকম। মাস আটেক আগে সে তপনে, মাসির বাড়ি যায়। কার যেন বিয়ে ছিল। রাতে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। হঠাৎ মাঝ রাতে সে স্বপ্ন দেখে কে যেন তার বিছানায় উঠে পড়েছে। সে চিৎকার করায়, সেই লোকটি পালিয়ে যায়। না, কিছু ঘটেনি। কিন্তু তারপর থেকে, এই আটমাস ধরে তার মনে হয়েছে, তার বুঝি বাচ্চা হয়ে যেতে পারে।

প্রিয়ার মনের ভয়, সংশয় দূর করার যথাসম্ভব চেষ্টা করি। বুঝি, সেটা অত সহজে সম্ভব নয়।

সে ঠিকঠাক বলতে পারেনি। বা চায়নি। মেসোও উঠে পড়তে পারে বিছানায়। কিছু ঘটে যেতেও পারে। বিয়ের আগে কোনো পুরুষকে ছুঁতে নেই। ছুঁলে শরীর ভীষণ খারাপ করে, এমনকী মৃত্যুও হতে পারে—এইরকম সাবধান বাণী নিশ্চয়ই সে শুনেছে। প্রথম ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা শুধু প্রেমিকের কাছ থেকে নয় নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকেও হতে পারে। তীব্র অনীহা, আপত্তি থাকলেও তা নিয়ে মুখ খোলা যাবে না—কেউ বিশ্বাস করবে না। প্রিয়ার কথায় ‘মেসো’ শব্দটা বার কয়েক এসেছে। কিছু একটা অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল, শরীরের মৃত্যু হয়নি কিন্তু মেয়েটির মানসিক জগৎ তছনছ হয়ে গেছে। সে কাউকে কিছু বলতেও পারেনি। পাপবোধ থেকে বিশ্বাস করেছে শাস্তি স্বরূপ তার গর্ভসঞ্চার হবে। প্রতিমাসে ঋতুমতী হলেও, ভাবনার এই বিষচক্র থেকে সে বেরোতে পারেনি।

একবিংশের প্রথম দশকেও এমন ভাবনা থাকে। পোশাকে, সাজগোজে কত নতুন ঢেউ। আসলে এখনও তারা পর্দাবিহীন হয়েও পর্দানশীন।

উচ্চশিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত নারীও নিজের শরীর সম্বন্ধে কত কম জানেন। স্তনে গোটা হল। ব্যথা হল। পুঁজ হল। রক্ত হল। উনি কাউকে কিছু জানালেনই না। সহ্য করলেন। সহ্য করলেন। সৌভাগ্যবতী কেউ কেউ এর পরে অপারেশন করে বেঁচে গেলেন। কেউ মারা গেলেন।

জীবনশৈলী পাঠ এসেছে। বিশ্বজুড়ে অন্তর্জাল ফাঁদ। জলজমি মাঠ সংলগ্ন বৃহৎ যে একান্নবর্তী পরিবার পরিবেশ ভূগোল তা বদলে নিউক্লিয়ার পরিবার এবং সমাজ। এইখানে সবচেয়ে অসহায় বয়ঃসন্ধিক্ষণের ছেলে মেয়েরা। বড়ো চালচিত্রে অনেক মানুষ মানুষির বৈচিত্র্যময় যাপন—ভোর সকাল দুপুর বিকেল রাত্রির মহড়া দেখার সুযোগ তাদের নেই। তারা ছোটো যন্ত্রে অনেক দগদগে শরীরী মহড়া দেখে ফেলে। কৈশোরের আলোছায়া ভুবনে শুধুই শরীরী কসরত। সেখানে সঠিক তথ্য নেই, বিজ্ঞান নেই।

যৌনতা ঠিক জন্মদান নয়। শরীরী সখ্যতার ফলে সন্তান সৃষ্টি হয়, এ কথা সত্যি। নারীর গর্ভ হয়, সুতরাং তার ভয় ও দায়িত্ব বেশি। যৌনতা মানে সে জানে গর্ভধারণের দায়। শরীরী আনন্দের আগে ছোটো মেয়েরা জানে গর্ভসঞ্চারের ভয়ের কথা। প্রিয়ার ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে। বয়ঃসন্ধিক্ষণে বালিকার ঋতুমতী হওয়ার ট্রমা এবং তার যদি নিজের ওপর লাগাম না থাকে, যদি তার স্খলন হয় তবে গর্ভবতী হওয়ার আশঙ্কার ওপর জোর এত বেশি যে যৌবনের আগমনের উল্লাসকে অনুভব করা, বরণ করা যে প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন, তা তারা বুঝতে পারে না। বয়ঃসন্ধির মেয়েরা নিজের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে খুব কম জানে, জানে জরায়ুর কথা—এটা খুব ভালো কথা নয়।

জরায়ু সম্বন্ধে এই জ্ঞানও অব্যাবহারিক। অধিকাংশ মেয়েই ডিম্বাশয়, জরায়ুর কার্যক্রম সম্বন্ধে কিছু জানে না যতদিন না এই সব অঙ্গে কোনো অসুবিধা সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ মেয়েই মারা যায় দেহযন্ত্রের নানারকম অসুখে, যাকে তারা সারা জীবন অবহেলা করেছে। বিশেষত গলা, যোনিমুখ, যোনি এবং জরায়ুর অসুখে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসুখটা ধরতে দেরি হয়ে যায় কারণ রোগের যে সব লক্ষণ প্রাথমিক ভাবে দেখা দেয় তাকে উপেক্ষা করা হয় লজ্জার কারণে। লজ্জা নারীর ভূষণ—এই বিশেষণের অন্ধকার ভেঙে নিজের শরীরকে দেখতে ও দেখাতে প্রচণ্ড অনীহা অধিকাংশ নারীর। আদি অন্তকাল থেকে জরায়ু ঝামেলা প্রবণ। গোপন এই অঙ্গের অসুবিধা নিয়ে মেয়েদের উদ্বেগকে ডাক্তাররা খানিকটা পারিবারিক প্রভাব বলেই মনে করেন। নারীর যৌনশীতলতাকে দুর্ভাগ্য এবং অপটুতার ফল বলেই মনে করা হয়। পুরুষের যৌন অক্ষমতা কিন্তু সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। পুরুষাঙ্গর যে কোনো সামান্য আঘাতকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে সে নপুংশকতার ভয়ে না ভোগে। বেচারি নারীর গুরুত্বহীন জরায়ু যথেষ্ট মনোযোগ না পেয়ে রক্তক্ষরণ করে, শরীর থেকে বাদ যায়। ভগাঙ্কুরের তো কোনো গুরুত্বই নেই। বাচ্চা হওয়ার সময় এমনও হয়েছে, যৌনচুল পরিষ্কার করতে গিয়ে নার্স সে অঙ্গ কেটে ফেলেছে অন্যমনস্কতায়।

জন্ম নিয়ন্ত্রণে, ভেসেকটমি করলে পুরুষের মানসিক সমস্যা নিয়ে যে গল্প, যে উদ্বেগ তা চিরন্তন পুরুষতান্ত্রিকতার একপেশে ন্যাকামো। জন্ম নিরোধক পিল যে ডাক্তাররা আবিষ্কার করলেন, নারী মনস্তত্ত্বে তারা এতটাই উদাসীন যে মাত্র কয়েক বছর আগে তারা খেয়াল করলেন যে এই পিল ব্যবহার করলে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন মানসিক ভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

পুরুষদের জন্য অতিযত্ন, অতি মনোযোগ আর নারী শরীরে চরম উদাসীনতা অবহেলা সবটাই নারী শরীর ঘিরে, জরায়ু ঘিরে শতাব্দী লালিত হয়। রাজনৈতিক পদক্ষেপ, পাবলিক মিটিং করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। মেয়েদের নিজের শরীর জানতে হবে। জানতে হবে স্ত্রী শরীরবিদ্যা, ধাত্রীবিদ্যা। পুরুষ ডাক্তারদের প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্বের সংস্কার থেকে বেরিয়ে আসাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষতন্ত্র কি খুব বুঝবে নারী শরীরের ও মনের সমস্যা?


বয়ঃসন্ধিকালে রজোদর্শন থেকে রজোনিবৃত্তি পর্যন্ত মেয়েদের যে কোনো সমস্যাকে ‘হিস্টোরিয়া’ বলে দেগে দেওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়।

একজন নারীর একমাত্র সার্থকতা মাতৃত্বে। কত গল্প জরায়ুকে নিয়ে। ভাসমান জরায়ু শরীরে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে গলায় ওঠে তারপর দমবন্ধ করে ফেলে। শুরু হয় খিঁচুনি-হিস্টোরিয়ার লক্ষণ। এটা বন্ধ করতে হাতুড়ে আর ডাকিনীরা ঝাড়ফুঁক করেন। নাস্তিক শরীরবিদদের এই হাতুড়ে বিদ্যায় বিশ্বাস নেই, কিন্তু তারাও বিশ্বাস করেন যাবতীয় ‘ফাউল’ প্লের উৎস জরায়ু। তারা আবার এর সঙ্গে শ্রেণিচক্রে অস্বাভাবিক রক্তসঞ্চয়ের গল্প শোনান। হিস্টোরিয়া এরই ফলশ্রুতি। অবিবাহিত কুমারী আর বিধবাদের এটা বেশি হয় আর একমাত্র যোগ্য স্বামীই এই রোগ সারাতে পারেন।

লোকবিশ্বাসে যা ছিল ‘গ্রীন-সিকনেস’, ডাক্তারদের পরিভাষায় তা হল ‘Chlorosis’। রক্তাল্পতার জন্য চামড়ায় সবজে হলদে ভাব—রক্তে আয়রনের অভাব। সাধারণত অল্পবয়সি মেয়েদের বেশি হয়—আঁটো বক্ষবন্ধনী, কোষ্ঠবদ্ধতা, ঘন ঘন গর্ভধারণ, দুর্বল স্বাস্থ্য এবং সঠিক খাদ্যের অভাবে। কিন্তু আগে ভাবা হত কুমারীর যৌন আকাঙ্ক্ষার অতৃপ্তি এবং ঠিক সময়ে সন্তান ধারণ করতে না পারার জন্য এই ‘গ্রীন-সিকনেস’।

কেউ কেউ আবার এর সঙ্গে ‘হিস্টিরিয়া’কে যোগ করে দিয়ে ব্যাপারটাকে জটিল করে দিলেন। কিছু ডাক্তার সত্যি সত্যি মনে করতেন যাবতীয় স্ত্রীরোগের উৎস তার জরায়ু।

এইভাবে অতৃপ্ত জরায়ুর বিশ্বাসঘাতকতায় মেয়েদের ব্যক্তিত্ব, জীবন তছনছ। খুব দুর্বল সে। নিজেকে রক্ষা করার সামর্থ্য নেই। সে আবার নিজের জীবনকে চালিত করবে কীভাবে!


পাড়ায় মিলিদের বাড়িতে কাজ করত বাসন্তী। কী যে হয়েছে। কাজে মন নেই। মাথা ঘোরে। হাঁপিয়ে যায়। বিড়বিড় করে। আলুথালু পোশাক। পরিচিত বন্ধু ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। আমাকে একটু বাইরে দাঁড়াতে বলে, মিনিট খানেকের মধ্যে আবার ডাকল।

—কি হয়েছে বাসন্তীর?

—এই বয়সে এরকম হয়। বিয়ে দিতে বলো।

নিতান্ত অভাবের কারণেই বাসন্তীকে কাজ করতে আসতে হয়েছে। মা, মাঝে মাঝে আসত। মা আবার বিয়ে করেছে, সুতরাং অনিয়মিত আসা যাওয়া। গ্রাম থেকে এসে শহরের বদ্ধ নতুন পরিবেশে বাসন্তীর অসুবিধা হচ্ছিল। মায়ের বিয়েটা মেনে নিতে পারেনি। হাপালো শরীর, সুতরাং অপুষ্টি বোঝা যায় না। কিন্তু কারণ যাই হোক, কোনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নেই। সবটাই কুমারী থাকার অসুখ। ঠিক সময়ে বিয়ে না হলে, ওরকম হয়।

‘এগারোয় পা’—বইয়ে শ্রদ্ধেয় শেফালি মৈত্র নিজের এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে পেটের ব্যথার কাতর হয়ে এক প্রখ্যাত শল্যচিকিৎসককে দেখালেন। তাঁর নিদান এই রকম: ‘অবিবাহিতা মহিলা, চল্লিশের ঘরে বয়স, মা হতে পারেনি তাই সাইকোসোম্যাটিক সমস্যা হচ্ছে।’ অর্থাৎ তাঁর ব্যাধি মানসিক। ঠিক দুমাস পরে শেফালিদির অ্যাপেনডিক্স অপারেশন করতে হয়েছিল। তারপর আর পেটে ব্যথা হয়নি।

লেখাপড়া না জানা গরিব প্রান্তবাসী একটি মেয়ের যে অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত, মেধাজীবী নারীরও সেই একই অভিজ্ঞতা।

মেয়েদের নির্মাণপর্ব এমন যে তাদের আবর্তন, পরিক্রমণ ঋতুমতী হওয়া আর রজোনিবৃত্তির অক্ষ ধরে। বালিকা বয়সেও সে গুরুত্বহীন। আবার ঋতুবন্ধ হয়ে যাবার পরও যেন তার অস্তিত্ব নেই।

মেয়েদের সব আলোচনাতেই এই বিষয়গুলি গুরুত্ব পায়।

তার আছে প্রথম ঋতুমতী হবার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। ভয়, লজ্জা, ঘেন্নায় লুকোনো, ছুপানো—এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি যে পুষ্পিত যৌবনবতী হয়ে উঠছি, তা নিয়ে কোনো উদযাপন পর্ব নেই। বাচ্চা হয়ে যাওয়ার ভয়। কী করলে বাচ্চা হয় না তা নিয়ে অজ্ঞতা। জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা জীবনসঙ্গীকে তৃপ্ত করা। রজঃনিবৃত্তি হলে যৌবন চলে যাবে, হারিয়ে যাবে আকর্ষণ এই নিয়ে অকারণ দুশ্চিন্তা।

কিন্তু ব্যাপারটাকে অন্যভাবেও দেখে নেওয়া যেত। অনেক পাপ করেছি, তাই মেয়ে হয়ে জন্মেছি, যার জন্য প্রতিমাসে এইসব উটকো ফল ভোগ করতে হচ্ছে—এর মধ্যে একটা পরাজয়। একটা অভিশাপ, হা হুতাশ আছে। প্রকৃতির নকশা, সৃষ্টিতত্ত্বের বিরুদ্ধে আমার যাওয়ার ক্ষমতা নেই সুতরাং সেটিকে আত্মস্থ করে উপভোগ করা ভালো। সমাজ তো মেয়েদের দাবিয়ে রাখার জন্য অনেক নিয়ম সৃষ্টি করেছে সেই আদিম কালে। আজ একবিংশের উন্নত পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আমি সে সব মেনে নেব কেন?

ঋতুমতী হলে ঠাকুর ঘরে যেতে নেই। মসজিদে, চার্চে কোথাও যেতে নেই। ওই তিনদিন শুভ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা বারণ। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, কতজন এই নিয়মের বিরোধিতা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন?

ঋতুমতী আমি অশুচি নই, কতজন এই বোধ থেকে বেরিয়ে এসেছেন? বিয়ের মধ্যে ‘ঋতু’ হওয়ার ডেট পড়লে, ওষুধ খেয়ে সেই ডেটকে পিছিয়ে দিতে হয়। প্রথম মিলনে অশুচি শরীর নিয়ে স্বামীর কাছে না যাওয়াই ভালো। টক খাওয়া বারণ, দৌড়াদৌড়ি বারণ এসবের চেয়ে বেশি জরুরি ‘সত্যরে লও সহজে’, এই আপ্ত উক্তি মেনে স্বাভাবিক যাপনের মহড়া নেওয়া। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, খাওয়া দাওয়া ঠিক রাখা, স্বাভাবিক জীবন যাপন করা।

বিরাট বড়ো পরিবারে, বড়ো পাড়ায় বাস করার সুবাদে যে আশ্চর্যময়ীদের দেখেছি তারা প্রতি মাসের ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে খুব কাহিল ছিলেন এমন মনে পড়ে না।

পরবর্তী কালে আমাদের চেয়ে ছোটো কাউকে কাউকে দেখেছি ওই দিনগুলিতে প্রচুর কাহিল হতে। সে-কদিন অফিস, ইস্কুল ছুটি। বিছানায় বালিশ জড়িয়ে শুয়ে থাকা।

প্যাড ছিল না। কাপড় মেলা নিয়ে অনেক সমস্যা। কাপড়ের অভাব। কাপড়ের অভাবে কেউ কাপড়ের গুটলি করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তা নিয়ে আরো এক রক্তপাত কাণ্ড। রজোনিবৃত্তির হটফ্লাশ, খিটিমিটি এসব খুব দেখিনি। ঋতুবন্ধে বড়দি বলেছিল—শরীরের নদী শরীরেই মিশে গেছে...

রক্তস্রোতের তীব্র গন্ধ। যা কারো কাছে আঁশটে। বোঁটকা গন্ধে তীব্র বিবিমিষা। কেউ আবার সে গন্ধ ভালোবাসে। ফেলে আসা দেশি মাছের ভেড়ি, নোনা গন্ধ মনে আসে তার।

এসব নিয়েই লিখেছিলাম ‘ঋতুগন্ধ’ আর ‘রাত রোয়াকে’। ঋতুগন্ধে শিল্পী মাতন এঁকে ছিল: ‘চাপ চাপ রক্ত ছবি জুড়ে। যেন বসন্তের মাতাল সমীরণ অথবা ছিন্ন পলাশ। মাসিক ঋতু, তার স্রোত, তার গন্ধ, তার যন্ত্রণা আর আনন্দ উপভোগ করে মাতন।... সেই নোনাজল মাখামাখি জৈব আঁশটে সৃষ্টি গন্ধ কারও কাছে শুধুই বোঁটকা। আর মাতন তাতে আদি পাণ্ডুলিপি পায়। অনন্ত কাল থেকে ভেসে আসা অস্তিত্বের রক্তাক্ত স্রোতে—জীবনের তীব্র গন্ধ।’

রজঃনিবৃত্তির কালে ‘রাতরোয়াক’-এর মঞ্জরী এইরকম ভাবে...‘দূরে হারিয়ে যাওয়া তমালতাল বনরাজি-লীলার মতো তারও বিলীয়মান রজঃস্রোত রেখা। চটচটে আঠালো আঁশটে উচাটন ঋতুগন্ধ বড়ো প্রিয় তার। শেষ হয়নি, কোথাও হারিয়ে গেছে স্রোত—এমন ভাবলে খুঁজে পাওয়ার আগুনটুকু থাকে।’

মোদ্দা কথা খুব সহজভাবে হন্যমান শরীরের বিভিন্ন পাঠ নেওয়া। রজঃস্বলা হওয়ার পরেও যেমন রজঃনিবৃত্তি পরও খাওয়া দাওয়া ওষুধ কী রকম কী করা দরকার তা জানা এবং যে সব নিয়ম মেনে চলা। মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার তরুণ অস্থি-ভর কমে যাওয়া ও চট করে হাড় ভেঙে যাওয়া রোগ ‘অস্টিওপোরেসিস’ দেখা দেয়। এটি রুখতে ক্যালসিয়াম গ্রহণ, ব্যায়াম খুব উপযোগী।

পুরুষের মতো আমি কেন ঝাড়াঝাপ্টা নই, এই ভেবে কাঁদুনি না গেয়ে, পিছিয়ে না পড়ে বরং নিজের আত্মশক্তিতে পূর্ণ বিশ্বাস রাখা। প্রতিমাসে তিন-চার দিন মেয়েদের এই যে রজঃস্রোত তার অজুহাত দেখিয়ে কিছু কিছু চাকরিতে মেয়েদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিয়োগে বিতর্ক তোলা হয়। মদ্যপ্রীতি, হাইপারটেনশন, আলসার রোগ আর পুরুষত্বহীনতার দুঃস্বপ্নে পুরুষ কর্মক্ষমতায় যতটা হতোদ্যম—ঋতুমতী নারী কিন্তু তেমন উদ্যমহীন, অকেজো নন।

যতই অস্বাচ্ছন্দ্যের দোহাই দিয়ে বেঁধে ফেলার চক্রান্ত হোক, মেয়েরা মোটেও ওই কয়দিন ছুটি চাইবে না। ঋতুস্রোতের বিরক্তিতে গজগজে ক্ষেপি হবে না আবার পুরোপুরি নুলো হয়ে বিছানায় আটকেও থাকবে না।

এটা হয়। প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। আবার এটা না হলেও আমরা দিব্যি চলতে পারি। তৈরি হোক এই রকম মনোভাব।


মৈত্রেয়ী দেবীর বিখ্যাত উপন্যাসে রুয়ের মা মেয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন—কী কী করেছিল তারা। গন্ধর্ব বিয়ে টিয়ে করেনি তো। সেটা করলে মা হয়তো মেয়ের জন্য আরো একটু চেষ্টা করতে পারতেন। চুম্বনের অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছিল। তবু রু মার কাছে শুধু কপালে চুম্বনের কথা স্বীকার করে। মির্চাকেও চিঠিতে সে কথা বলতে লেখে।

মান্য সমাজের রীতি নীতি সংস্কার অতি উচ্চ তারে বাঁধা কেউ চুমু খেলে, বিয়ের প্রতিজ্ঞা করলে—বিয়ে করতেই হয়। শরীর এত পবিত্র এই শরীর যখন পুষ্পিত হয়, তখন কী উদ্‌যাপনের কোনো উৎসব আছে।

নেই।

জার্মেন গ্রিয়ার তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ফিমেল ইউনাখ’ বইয়ে মেয়েদের ঋতুমতী হওয়ার দিনটিকে জন্মদিনের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেছেন এবং তাঁদের সমাজে সেই দিনটিকে লুকোনো ছুপানো প্রয়াসের সমালোচনা করেছেন।

কুইন্সল্যান্ডের Pennefather নদীর ধারে আদিম মানুষরা তাদের মেয়েদের প্রথম রজোদর্শন কীভাবে উদ্‌যাপন করত সে কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম সংক্রমণের সময় মেয়েটিকে কোমর অব্দি বলিতে পুঁতে রাখা হত। তারপর পবিত্র স্থানে তার মা তাকে খাওয়াত, যত্ন করত। ধুমধাম করে তাকে বিবাহ উপযুক্ত কন্যাদের শিবিরে নিয়ে যাওয়া হত। এই যে পদ্ধতি, এতে মনে হয় প্রথম রক্তপাতের ভয় ভীতি দূর হত। ট্রমা থাকত না।

মিস্টু অনুরাধার কাছে প্রথম রজোদর্শনের উৎসবের কথা শুনেছি। আত্মীয় পরিজনদের নেমন্তন্ন করেছিলেন ওর ঠাকুমা। ঘরোয়া আনন্দময় পরিবেশ।

আসামে প্রথম রজঃদর্শনে হয় তুলনী বিয়ে। সেটা কী রকম? আসামের বনগাঁইগাও থেকে আমার ছাত্রী চৈতালি ভাদুড়ি জানিয়েছে—

‘শরীর খারাপ হওয়ার সাথে সাথে স্নান করিয়ে একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়। চাঁদ, সূর্যের মুখ দেখতে পারবে না, কোনো ছেলের মুখ দেখতে পারবে না। তাদেরকে তিনদিন কিছু খেতেই দেওয়া হয় না, যদি পায়খানা হয়। শুধু একটু করে জল। হিসু সেই ঘরেই করানো হয়। এমন কী প্যাডগুলো পর্যন্ত ঘরে রেখে দেওয়া হয়। তিনদিন পার হলে যে দিন ঘর থেকে বার হয় সেদিন সব পরিষ্কার করে। স্নান সেরে ১০৮টি কলার খোলের মধ্যে দুধ ঢেলে পুজো করে, চালের গুঁড়ো দিয়ে পিটুলি বানিয়ে পুজো করে। মেয়েরা একজন একজনকে চালের গুঁড়ো মাখিয়ে দেয়। তিনদিন পর মেয়েটিকে ফল, দুধ এইসব খেতে দেওয়া হয়। পাটের শাড়ি, সব গয়না পরিয়ে, তুলুনি বিয়ে হয়। সব আত্মীয়স্বজন আসে। পরে পাড়াপড়শিদের নিয়ে বড়ো উৎসব হয়। মেয়ের মা তাম্বুল পান বা পান মশলা নিয়ে এসে একটা সরায় ঢেলে নেমন্তন্ন করে যায়। এসে বলে, ‘মোর ছোয়ালী ডাঙোর হল, তার তিলনী বিয়া, আপনালোকে যাবে।’

মাসিক হওয়ার সাথে সাথে পঞ্জিকা দেখে। সময় যদি খারাপ থাকে বা সেই সময় মেয়ে যদি কালো পোশাক পরে থাকে, তবে পুরোহিত ডেকে, সোনারূপা দান করে দোষ কাটাতে হয়। ১৫-১৬ দিন উপোস করে থাকতে হয়। ওদের যখনই শরীর খারাপ মানে মাসিক হয় ওরা আলাদাভাবে থাকে। কাউকে ছোঁয় না, কারো ঘরে যায় না, এমনকী কেউ শরীর খারাপ নিয়ে ওদের বাড়ি গেলেও, ওরা খারাপ পায়। কোনো গদি আঁটা চেয়ারে বসতে দিতে চায় না, কোনো গাছে হাত দেয় না।’

ঋতুস্রাব নিয়ে মেয়েদের এত ভয়ভীতি ঘেন্না যে ঋতুমতী থাকাকালীন সংগমের চিন্তায় তারা গুটিয়ে যায়। এই রক্ত খুবই বিশেষত্বপূর্ণ বলেই কী তারা আপত্তি জানান? কারণটা তো অন্য। সংস্কার। গ্রিয়ার ঠাট্টা করে বলেন, যে মেয়েরা নিজেদের যথেষ্ট স্বাধীন বলে মনে করেন, তারা ঋতুস্রাব খেয়ে দেখতে পারেন। খেয়ে অসুস্থ হলে, বুঝবে।

তারই এই মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের ঝড় ওঠে।

আমরা কী বিতর্ক হবার মতো অবাক কিছু শুনি? শিক্ষিত বাবু আমরা ঋতুস্রাব পান করার কথায় হইহই করে উঠতে পারি। কিন্তু আমাদের বৈষ্ণব সাধকদের মধ্যেই রজঃ পান করার রেওয়াজ আছে, আমরা জানি না।

রজঃপানের কথা আমি শুনি বৈরাগী সবিতার কাছে। গুরুর কাছে গুপ্ত দীক্ষা নিতে হয় বৈরাগীকে। সে সব বলা বারণ। তবু সবিতা জানিয়েছিল, স্বামীর সঙ্গে বিবাহিত জীবন শুরু হবার আগে স্ত্রীকে দান করে শিষ্য। গুরু প্রসাদ করে দেন স্ত্রীকে। তারপর স্বামী-স্ত্রীর মিলন। দীক্ষার সময় নারী রজঃস্বলা থাকলে সে গুরুকে রজঃদান করে। গূঢ়তত্ত্ব কথা সবিতা এত বলতে পারেনি তবে রজঃপান যে খুবই স্বাস্থ্যপ্রদ এ কথা বারবার বলেছিল।

সহজিয়া বৈষ্ণব সাধনায় এই প্রথা রয়েছে। রজঃ পানে জরা থেকে মুক্তি পেয়ে অখণ্ড যৌবন লাভ করা যায়—এইরকম বিশ্বাস তাঁদের। পুরুষের রজঃ নেই। কর্মে কোনো নারী সাহায্য এবং রজঃদান করলে, সাগরের জোয়ারে মণি-মানিক উর্ধ্বে ওঠে; রজের সাহায্যে ঊর্ধ্বরেতা—শুক্রতা ঊর্ধ্বে ওঠে। পুরুষ নারী ভাব নিয়ে নারী সত্তাকে বাড়াবে, আর নারী পুংসত্তা বাড়াবে পুরুষ ভাব নিয়ে—এই সংস্কৃত দু’সত্তার মিলনে তৈরি হবে মানুষ বা সহজ মানুষ।

অর্ধনারীশ্বরের ধারণা ছিল আমাদের দেশে। রজঃ, শুক্র নিয়ে সাধনার গূঢ় তত্ত্ব। তার স্বামী নরেন দীর্ঘ সময় ধরে বীর্য ধরে রাখতে পারে, স্খলন হয় না। একথাও বলেছিল সবিতা। দেহতত্ত্বের এও এক সাধনা।

তারা জানে জন্ম নিয়ন্ত্রণের গূঢ় রহস্য।

রজঃ শুধু পান নয়, রজঃ মাখলে শরীরের মেচেতা দাগ দূর হয়, কথা আমায় জানিয়েছে চায়না। যৌবনে মুখে মেচেতা হয়েছিল খুব। পাড়াতুতো এক দিদি তাকে মাসিকের রক্ত মাখতে বলে—‘নিজেরই তো রক্ত। ঘেন্না পেয়ো না।’

‘দিদির কথা শুনে মেখেছিলাম জানেন। বাড়িতে তো শুধু আমি আর মা। মা চোখে ভালো দেখে না। অত বুঝতে পারত না। প্রথম যে দিন মাসিক শুরু হত, সেদিন থেকেই মাখতাম। প্রথম প্রথম একটু কেমন লাগত। তারপর ভাবতাম ঘেন্না কী! আমার শরীর থেকেই তো বেরোয়। আর তিন-চারদিন মাখার পর যখন মনে হল একটু যেন হালকা হচ্ছে দাগগুলো—আর কোনো খারাপ লাগা ছিল না। কী বলব দিদি, সব দাগ চলে গেল। পরেও আমি দাগ হলে, ওটা লাগিয়েছি। তারপর এখন দেখেন কিছু নাই...’

রক্তস্রাব মুখের দাগ তোলে। আমাদের মনের শতাব্দী লালিত দাগ তুলবে কে?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%