তৃপ্তি সান্ত্রা
হড়হড়ে বমি পিচকিরি পায়খানা গলগলে রক্ত দাউদাউ খিধে ঘ্যাচঘেচে চুলকানি চিড়বিড়ে রতি সব গণতান্ত্রিক পথে চলছে—নো প্রবলেম।
এখন শরৎ। ওপরে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নীচে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ দুগ্গা পুজো। সেল অফার ক্রেডিট কার্ড শপিং মল মূত্র ফুটপাথ হকার ঘরবাড়ি গেরস্থালি গাড়ি শাড়ি গয়না—বায়ুপিত্তশ্লেষ সব নিয়ে একেবারে মারকাটারি কাণ্ড। থইথই হাবুডুবু বিশ্বায়ন।
এর মাঝে বাংলা সিনেমা আবার সাবালক হয়েছেন। সেই সাবালকত্বের স্বাদ পাবার জন্য নাবালক বাঙালি জাতির কী হ্যা হ্যা উন্মাদনা। ইউটিউব সার্চ। মোবাইলে ডাউনলোড। রাস্তায় রাঙা গাইয়ের পুসি চাটছে ধন্মের ষাঁড়—তা দেখে পাবলিকের কী আমোদ। ছেলে ছোকরাদের চটজলদি চুটকি—আয়রে দেখে যা ইউটিউবের নায়িকাকে—নায়ক কেমন হেয়ারি পুসি-তে মুখ ঘষে ঘষে ওরাল সেক্স করছে...
এই আমোদে ঠান্ডা ঠান্ডা পানি ঢেলে মুঠো ফোন এল:
DODHICHI MOBILE NEWS LETTER
‘আজ জঙ্গল মহলে আমাদের প্রথম সম্মেলন করতে দিল না প্রশাসন। গ্রামে গ্রামে যৌথ বাহিনীর টহল চলল। আমাদের ওপর এই অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ সোচ্চার হোন’
—Sent by জ্যোৎস্না মাহাতো, সম্পাদিকা, নারী ইজ্জৎ বাঁচাও কমিটি। ৪টা ৩৫, ২৯-৯-১১
নে বাবা! এ আবার কী উৎপটাং কথা। এই তো পরিবর্তন হয়ে সব গ্লানিজরাটরা ধুয়ে মুছে মৃত্যুদিনে শ্রাদ্ধ শতবর্ষের জন্মদিন হল রবীন্দ্রনাথের। দৈববাণী হয়েছিল—মহামায়া জাগছে। মহামায়া জাগছে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আর জঙ্গল মহলের আগুন ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গে। গজে দেবী এলেন। স্ত্রী শক্তির উত্থান হল। এখন সবুজে আবিরে ফুলে ঘাসে বিশ্বজোড়া বিশ্বময়ীর আঁচল পাতা। স্ত্রী শক্তির জয় জয়কার। সেখানে নারী ইজ্জৎ বাঁচাও কমিটি নামটা কেমন আঠারো শতকের পর্দানশীন পর্দানশীন ফ্লেভার নিয়ে আসে না! ইজ্জৎ নিয়ে চিরন্তন নারীর স্টিরিয়োটাইপ, মিথ আর তাকে রক্ষা করার শিভ্যালরি নিয়ে কলার উঁচু করা পিতৃতান্ত্রিকতা। তা ছাড়া, এই রাজ্যে নারী নির্যাতন হয় নাকি! যাঃ!!
এইসব বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলের মধ্যে পার্ক স্ট্রিট। বারাসাত। দিল্লি। কামদুনি। মুম্বই। আরো কত কত গুঁড়োগুঁড়ো ধূপগুড়ি কেন্দপুকুর এপিসোড।
আর এর পাশাপাশি খোলা হাওয়ায় আরব সাগরের রুপোলি নায়িকাদের ঝাপট
Girl
Whirl smokes pot
Raunchy and & Hot!
Boy
Coy
Running after the
Broken Toy
কেমন কথাগুলো। ওয়াও! ইংরিজি ছড়া লিখে ফেললাম যে আনন্দে!
কথাটা কী না—এত সব কেলো কীর্তির মধ্যেও হিন্দি ফিল্মের নায়িকাদের ঐতিহাসিক বিবর্তন ঘটে গেছে। তারা আর মোটেও লক্ষ্মী শান্ত ছাঁচে ঢালা সনাতনী ভারতীয় নারী নন। পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য আর ছায়ানুগামিনী ছাদ ভেঙে তারা সাহসী, ডাকাবুকো—ঘরে বাইরে পার্টিতে বিছানায় অনেক রূপান্তরিত। অনেক ধারালো।
শঠে শাঠ্যাং-না কি মিলে সুর মেরা তুমহারা।
পরিচালকরা স্টিরিয়োটাইপ ব্রেক করে ধবধবে সাদা বা রঙিন প্রিন্টের সঙ্গে আনছেন কুচকুচে কালো বা ধূসর নেগেটিভ। দর্শকরা পছন্দ করছেন। অভিনেত্রীরাও খাঁজকাটা চরিত্র পেয়ে খুশি। পতি পতিত হলেও ‘পূজা করুঙ্গি ম্যায়’ এই প্যাটার্ন ভেঙে গেছে। তুমি দশটি মেয়ের সঙ্গে লাবন্ধুস খাও আমিও দশটি টয় বয় নিয়ে খেলি।
শুধু গৃহবন্দি বধূ না থেকে, শরীর আর মেধার ঐশ্চর্য নিয়ে ছুঁতে চাই খ্যাতির আকাশ। এই আমি পেলব মধুর সতীসাধ্বী নই—খরখরে, ডাকাবুকো, নটখট এবং তেজী।
বলা বাহুল্য এইসব ছবি শহরকেন্দ্রিক—মাল্টিপ্লেক্স ফিল্ম। দুনিয়া পালটাচ্ছে, স্বাভাবিক ভাবেই পালটাবে সিনেমা। উঠে আসবে বাস্তব জীবন থেকে। এক ঝাঁক তরুণ লেখক তৈরি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গল্প লেখায়। গল্প আরো ধারালো, আরো সাহসী যে হতে পারছে তার কারণ দৃশ্য বা পোশাক নিয়ে নায়িকাদের আর কোনো ছুঁৎমার্গবৃত্তি নেই। শিল্পের, সিনেমার প্রয়োজনে তারা একশো শতাংশ দিতে পারে। উত্তর-আধুনিক ডিসকোর্সে কেউ নিরেট সাদা বা কালো নয় বা সাদার বিপরীত ঠিক কালো নয়। কিছুটা ধূসর পাটকিলে, ছোপছোপ কিছু, কাটাকুটি কিছু...
তাই কী সনাতন সতীসাধ্বী নায়িকার মতো ভ্যাম্প নায়িকারাও উধাও! এক ও অদ্বিতীয়া নায়িকার বদলে আইটেম গার্লদের দাপাদাপি। বক্স অফিস হিটের জন্য এই Raunchy Item নাম্বাররাই যথেষ্ট সুতরাং বাদ যাচ্ছে দমবন্ধ একঘেঁয়ে রেপ সিন। মেয়েদের প্যাসিভ দেখিয়ে হি-ম্যান শিপ আর শিভ্যালরি দেখাবার বদলে অ্যাক্টিভ ‘ডুয়ার’ এই ভূমিকায় নতুন নারীরূপ পাবলিক বেশি খায়। শুধু বিছানায় নয়, কর্পোরেট লাইফে, এজেন্ট হিসাবে সে পুরুষের মতো স্মার্ট, শারীরিক ভাবে দক্ষ এবং অ্যাকশানের উপযুক্ত। নায়কের প্রাধান্য এর ফলে ক্ষুণ্ন হয়েছে ভাবা ভুল। মূল চরিত্র হিসাবে নায়িকারা কিছু কিছু ছবিতে দাপিয়ে অভিনয় করেছে বটে কিন্তু আইটেম গার্লরা মাংসের মশলা মাত্র—আসল কাবাব নায়করা। ছবির সাফল্যের মূলে তারা। প্যাসিভ রেপসিনের বদলে অ্যাক্টিভ ফুর্তি মেয়েদের ঝলমলে স্বতঃস্ফূর্ততায় নায়কদের অ্যাডভান্টেজ।
বেচারি পাবলিক। এসব চরম আমোদ স্ক্রিনে দেখেই খুশি হতে হয়। পোশাক পালটালেও মেয়েরা ধ্যাড়ধেড়ে সতীত্বে আটকে। সবাই নায়িকা হতে চায়—আইটেম গার্ল নয়। তো কখনও গর্মে গেলে, পুরুষ মানুষ কত কী করে। ঘাবড়ে গেলে। ভয় পেলে। একা না পারলে তো কত সব নাম, কী যেন বলে—গণধর্ষণ। তাতে কেউ মরে টরেও যায়। তো মেয়েরা এখন এমনই যে ইজ্জৎ রক্ষার রাখঢাক নেই। ঝুমার মতো নির্লজ্জ! মেলার মধ্যে, ‘আমার বুক টিপে দিল, আমার বুক টিপে দিল’ বলে চ্যাঁচায়। জানে না, এসব লজ্জার কথা বলতে নেই। মেয়েগুলো যেমন বেহায়া হয়েছে এইসব লজ্জা টজ্জার ধার ধারে না। পয়সা কড়ি পেলে বানিয়ে বানিয়ে মিছে কথাও বলে।
হ্যাঁ। এমন অভিযোগও আসছে। কসবা ব্রিজে রাত্রি আটটায় এক মহিলাকে সাত-আটজন তুলে নিয়ে ধর্ষণের যে অভিযোগ—পরে বলা হচ্ছে, সেটা রাজনৈতিক বিদ্বেষজনিত বদলার জন্য সাজানো—গট আপ কেস। নিজেদের প্রয়োজনে, রাজনীতি খেলায়, অস্তিত্ব রক্ষার তাড়নায়, প্রচ্ছদ রক্ষার ব্রতে মেয়েরা বহু ব্যবহৃত। রামায়ণে সীতার পাতাল প্রবেশ, অহল্যার পাষাণ হয়ে যাওয়া, মহাভারতে কুরুপাণ্ডবের জন্মবৃত্তান্ত থেকে সভাপর্ব—সবখানেই মেয়েরা ক্রীড়নক মাত্র।
এই যে মাল্টিপ্লেক্স হিট নায়িকা—তাদের দর্শন এবং ঝাঁঝালো উপস্থিতি সে কি সত্যি সত্যিই সত্যি? আজকের সমাজের বাস্তব চিত্রায়ণ? নাকি একটা পার্সেন্টেজ। যে পার্সেন্টেজ ইন্ডিয়া—প্রিভিলেজ ক্লাসের ইন্ডিয়া—আর বাকিটা ভারত, দগদগে ভারত।
তর্ক থাকবে। সিল্কি স্মিতা ভারত না ইন্ডিয়া? ঐশ্বর্যময় শরীর নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি মেয়ে তার পরিণতি তো এমনই হবে। এমনই হয়। দর্শক কী তার দুঃখে কাঁদে, অনুভূতি প্রবণ আর সমব্যথী হয়ে ওঠে নাকি সে শুধুই তার যৌনতা, শৃঙ্গার রস উপভোগ করে...
প্রডিজি ছাড়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবার স্পর্ধা এক-এক জনকে মেটাতে হয়েছে এক-এক ভাবে। একলব্যকে দিতে হয়েছে ডান হাতের বুড়ো আঙুল, শম্বুককে নিজের প্রাণ, অপ্সরা উর্বশী নাম নিয়ে রম্ভা মেনকাদের থাকতে হয়েছে মূলস্রোতের বাইরে। অহল্যা পাথর হয়েছে। শূর্পনখার নাক কাটা গেছে। রোজ রাতে হাতে হাতে পালটাতে পালটাতে কত কত মেয়েরা শহরের পল্লিতে বাহারি ফুল সেজে ঝরে গেছে। কাঁচামাল দিয়ে তো আর প্রোডাক্ট হয় না। সেটাকে কেটে ঝেড়ে তৈরি করে নিতে হয়। তার জন্য প্রডিজির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান-টপোগ্রাফি-গ্রুমিং মোটকথা প্যাকিজিং, মার্কেটিং—এখানে দিশি কর্পোরেট ভালো না এফ ডি আই। এ নিয়ে তর্ক হবে। এও এক ইঁদুর দৌড়। বাজার যেমন চায় তেমন ভাবেই নির্মাণ পর্ব। ঝাঁ চকচক প্রোডাক্ট দিয়ে বাজার সাজায়—আমরা সাজি। কিন্তু উলটে দেখুন—পালটাইনি। আইটেম গার্ল আর ইউটিউবের আমোদের বাইরে আমাদের মূল্যবোধের সংস্কৃতি সনাতনপন্থী। সেখানে মেয়েদের স্পষ্ট করে বলতে মানা। প্রেম ও মিলন পর্যায়ে পুরুষেরই মুখ্য ভূমিকা। সে নায়িকার মন জয় করবে গান দিয়ে, কবিতা লিখে, নেচে কুঁদে, ডুয়েট লড়ে নানা ভাবে। নারী লজ্জা পাবে, ঘোমটা টেনে ঘোর রহস্য হয়ে থাকবে। প্রথম সংগমে সতীচ্ছদ ছিন্ন হবার রক্তপাত দেখার জন্য বিছানায় সাদা কাপড় পেতে রেখে কৌমার্য পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয়ে আনন্দে ডগমগ করবে। আর নিজের কামনা বাসনা খোলাখুলি ব্যক্ত করবে যারা তারা গৃহস্থ মেয়ে নয়। নষ্ট মেয়ে। ভ্যাম্প নায়িকা। বা ওই আইটেম গার্ল। বা রাক্ষসী।
হিড়িম্বা যেমন। ‘রাক্ষসী কাময়ামাস রূপে ণা প্রতিমং ভুবি’ ভীমের শালপ্রাংশু দেহ দেখে রাক্ষসী হিড়িম্বার হৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠল কামনায়। নিজেদের কামনা বাসনার কথা মেয়েদের বলতে মানা। হিড়িম্বা মনে মনে হলেও বলেছেন। রাক্ষসী কাময়ামাস—রাক্ষসী বলেই কামনার কথা বলতে পেরেছেন। চিত্রাণী, শঙ্খিনী, হস্তিনী, নাগিনী নয়—রাক্ষসীপণা যার আছে সেই তবে যৌন কামনা অনুভব করতে পারে, বলতে পারে।
স্কন্দগুপ্তর আমল থেকে পঞ্চাশ বছর আগে পর্যন্তও অনেক পুরুষই হয়তো মনে মনে রাক্ষসী-রমণীর কল্পনা করেন। তা না হলে সংস্কৃত দেবভাষায় এ জাতীয় শ্লোক লেখা হত না—কার্যে দাসী রতৌ বেশ্যা ভোজনে জননী সমা। এমন একটা বউ সত্যিই দুর্লভ যে আদর করে খাওয়ানোর সময় মায়ের মতো, ঘরের কাজে দাসীর চেয়েও দড়ো আর বিছানায় শুলে আগ-বাড়ানো বেশ্যার মতো।
ভীমকে দেখে রাক্ষসী পাগল। সোজা কথাটা সে সোজা ভাবে বলে—তোমার মতো এক পুরুষ দেখে কামনায় আমার শরীর এবং মন আকুল হয়ে উঠেছে এবং আমি চাই—আমি যেহেতু তোমাকে এই ভাবে চাইছি, তুমিও আমাকে এই ভাবেই চাইবে ও-কামোপহত চিত্তাঙ্গীং ভজমানাং ভজস্বমাম্। কামনার দ্বারা উপহত, দগ্ধ-পীড়িত হইয়াছে যাহার চিত্ত, মন এবং অঙ্গ, শরীর-কামোপহত চিত্তাঙ্গী-নিজেকে নিজেই এই রকম একটা কামনার বিশেষণে বিশেষিত করেছে এক যুবতি মেয়ে, এমন ঘটনা মহাভারতে আরও দু-চার জায়গায় আছে, মহাভারতের কবি এটা অস্বাভাবিক মনে করেন না। তবে রমণীর মুখে কামনার এই উচ্চারণ আর্যজনোচিত নয় বলেই মহাকবি রাক্ষসকে বেছে নিলেন। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির কথা অমৃত সমান-এর হিড়িম্বা প্রসঙ্গ ধরেই মেয়েদের কামনা বাসনার উচ্চারণ নিয়ে আমরা অন্য কথায় যাব।
সত্যি সত্যিই কী মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না? তারা ছলাবলা শৃঙ্গার যাই করুক—কামনা বাসনার কথা মুখ ফুটে তেমন বলবে না। কিন্তু মেয়েরাও বলেন। রবীন্দ্র সার্ধ শতবর্ষ শেষ হল। দুই একজন রবীন্দ্র শিল্পীর কথা দিয়েই শুরু করি। ছোটোবেলা থেকে নানা ধরনের ভাবনার একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়। কিছু অর্থোডক্স ধারণা থাকে। রবীন্দ্র সংগীত মানেই আগে যেমন ছিল ধুতি, লালপেড়ে শাড়ি আর যারা রবীন্দ্রসংগীত গান তারাও চিন্তা ভাবনার উচ্চকোটির আর্যজন। সৌরিমা আর পারমিতা দুজনেই খুউব উচ্চাঙ্গের সংগীত শিল্পী। সুর তাল লয় এসব বাদে শব্দের উচ্চারণ ও ব্যঞ্জনায় তাদের দক্ষতা অতুলনীয়। কিশোরী বেলায়, পাড়ার মাঠে আর সংলগ্ন কলেজ মাঠের বাগানে আর পুকুরে ছিল আমাদের প্রকৃতি পাঠ। অঝোর বৃষ্টিতে জল জমে গেলে—মাঠে ব্যাঙ আর কেঁচো। সাপও ছিল। সৌরিমা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখাত জোড়া ব্যাঙ। নারীকে দেখে দিঘি মনে হয় কারো, অবগাহন করতে চায় কেউ। প্রাপ্তবয়স্ক এই উপমার গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছিল সৌরিমা এক সাহেব মেমের গল্পে। সংগম শেষে সাহেব তার টুপিটি রেখে গেছে মেমের যোনির ওপর। পরের জন ঘরে ঢুকে উপগত হতে চেয়ে টুপি দেখে ভাবলেন—বাব্বাঃ, এত গভীর সাহেব তো ডুবে গেছে, শুধু মাথার টুপিটাই বাইরে। ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। তবু সৌরিমা যখন দমফাটা হাসতে হাসতে চোখে জল বের করে বলেছিল—একদম ভেতরে চলে গেছে বুঝলি তো! তখন কী বোকার মতো ওর মধ্যে ‘প্রথম আদি তব শক্তি’ আর ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’—গাইতে থাকা মগ্ন মেয়েটিকে খুঁজে না পেয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম। পরমা-র ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছিল।
তরাইয়ের সবুজ, রাস্তা পেরিয়ে আলিপুরদুয়ার ফিরছিল পরমা। পাশে পথসঙ্গী এক অচেনা যুবক। পাশে বসে হাত হাত ছুঁয়ে যায়, কথায় কথায় গল্পে আড্ডায় পথ চলতে চলতে শরীরে শরীরে ঠেকে, প্রতি অঙ্গ লাগি কাদে প্রতি অঙ্গ-এই অনুভূতিটুকু প্রকাশের যে ভাষা, যারা শুনছে তাদের সবার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে; ঘটনা সত্যি হলেও তো সবার সামনে ওই ভাবে প্রকাশ করা রেওয়াজ নয়। পরমার আলুথালু উচ্চারণ—এতটা রাস্তা একসঙ্গে পাশাপাশি বুঝলি তো। দুজনেরই একটা মাখো মাখো ভাব হয়ে গেছিল। বাসস্ট্যান্ড নামতে হবে। কী নামব আমি তো একদম ভিজে গেছি।
শরীর নিয়ে একটা উলঙ্গ স্বীকারোক্তি। হয় এমন হয়। শরীরের এমন পরিবর্তন হয়। সংযমের বাঁধ দিয়ে নিজেকে ফিরিয়ে আনা অথবা বাঁধ ভেঙে দুরন্ত জলোচ্ছ্বাস। কিন্তু আমাদের কেন যে এত খারাপ লেগেছিল, সে কী ও ‘আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে ফুল ফুটবে’ এত ভালো গাইত বলে?
‘শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার ওই খোলা, আড়াল থেকে দেয় দেখা কোন পথভোলা’ কী দাপটের সঙ্গে গাইত পরমা! ‘ওই যে পূরব গগন জুড়ে, উত্তরী তার যায় যে উড়ে। সজল হাওয়ার হিন্দোলাতে দেয় দোলা’—
প্রকৃতিকে নিজের মধ্যে এমন শরীরী ভাবে উপলব্ধির জন্যই কী সুরে এমন সাবলীলতা ছিল পরমার?
পাশে বসা ছেলেটির সঙ্গে তিনঘণ্টার জার্নিতেই হয়তো একটা ওয়েভ তৈরি হয়েছিল। ওরা বৃষ্টিতে ভিজেছিল। এরকম হয়। সবার হয় না, কারো কারো হয়। সবাই ওরকম ভাবে প্রকাশ করে না। ও করেছিল। এসব শুনতে অভ্যস্ত নয় যে কান, তার খারাপ লেগেছিল। আর্যায়িত ভাষার বাইরের ভাষাকে যতই ব্রাত্য করে দূরে সরিয়ে রাখা হউক না কেন, মূলস্রোতের বাইরে যে সহস্রধারা সেখানে সে পুষ্ট ফেনিল। রাক্ষসী হোক, ভ্যাম্প হোক, নষ্ট মেয়ে হোক—তার প্রতি পুরুষের আকর্ষণ বেড়েছে বই কমেনি। রাখ ঢাক করে নিজেকে প্রকাশ না করে, ভালোবাসার ক্ষেত্রে মুখে এক আর মনে এক, মনে মনে বলছে আমাকে ভালোবাসুক। আদর করুক মুখে বলছে, ইস্! কী অসভ্য তুমি—এই আর্যায়িত ভব্যতার ফল যে খুব ভালো হয়নি, রোজকার ঘটনায় তা প্রমাণিত। মেয়েদের যাবতীয় ‘না’ তো ‘হ্যাঁ’-এর ইঙ্গিত—সুতরাং তার জন্য যেমন, আবার পালটে না যাওয়া জগতে মেয়েদের খোলামেলা বা স্বাধীনচেতা ব্যবহারকে গ্রীন সিগন্যাল ভেবেও যৌন হেনস্থার অবাধ ছাড়পত্র।
ইজ্জৎরক্ষা, সতীত্ব, পৌরুষ, শৌর্যবীর্য—এসবের প্রচ্ছদ আর মোড়ক ছিঁড়ে লীলাময় জগতের পুরুষ প্রকৃতির একে অন্যকে জানার চেনার পরিসরের বিস্তার ঘটা দরকার। ভিড়ের হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, প্রয়োজন মুখোমুখি বসিবার শিল্পিত অন্ধকারটুকু। জীবন, প্রেম ভালোবাসা সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো পালটে যাবে। ছিঁড়ে যাবে রোমান্স, কল্পনার ফানুসের আকরণ শব্দতন্তুজাল। কিন্তু একজন বেদিতে আর অন্যজন মাটিতে নয়, তৈরি হবে একই আসনে নিজস্ব পরিচয়ে মুখোমুখি বসার কাঙ্ক্ষিত পরিসর। আনন্দময় প্রজ্ঞার পরিসর।
অন্তঃসার, সেপ্টেম্বর ২০১৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।