তৃপ্তি সান্ত্রা
তন্ত্র বৌদ্ধ সান্ধ্যভাষা নিয়ে আলাদা বই হতে পারে। এখানে স্বল্প পরিসরে সংকেত ভাষা নিয়ে কিছু কথা বলব।
সমাজ বিন্যাসে শূদ্র ও নারীর অবস্থান ও মূল্য একই জায়গায়—তাঁরা দলিত, অবদমিত এবং অবহেলিত। নিজের প্রকাশের জন্য তাই সান্ধ্যভাষা।
তিন বছরের ছোট্ট মিঠি বারো-চোদ্দো বছরের দাদা দিদির সঙ্গে খেলবেই। এমন পোঁ ধরেছে। ‘খেলুক না ও—তবে দুধভাত’—ঘোষণা করল কোনো দাদা বা দিদি। অর্থাৎ মিঠি খেলবে তবে ওকে খেলার মধ্যে ধরা হবে না। জীবনে চলার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রয়োজনে ভাষা তৈরি করে নেয়। হেঁটমুণ্ড, উর্ধ্বপদ রূপে উলঙ্গ হয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে আবার উলঙ্গ হয়ে শুদ্ধ অগ্নিতে প্রবেশ করার মাঝে, মানুষকে সামাজিক করণের, প্রবৃত্তির জাল থেকে মুক্ত করে সুসভ্য করার জন্য যত আঁটোসাঁটো নিয়ম, অনুশাসন—তাকে ভাঙার জন্য মানুষের শুধুই লুকোচুরি খেলা, ততই অসামাজিক, অনাগরিক প্রবণতা। সমাজের চোখে ভালো থাকার জন্য যেমন নানারকম ভেক, নানারকম মুখোশ, অবদমনের যেমন নানারকম রূপ, নানা অসুখ নানা প্রকাশ। গতানুগতিক ছাঁচে না পড়ার জন্য মদমত্ত যৌবনের যেমন নানা দস্যিপনা। ভাষা যা আমাদের লীলাসঙ্গী তারও অনেক রকম দস্যিপনা। ভাষা যা আমাদের প্রতিকল্প বা অল্টার ইগোই শুধু নয়, যা আমাদের লীলাসঙ্গী তারও অনেক দস্যিপনা। ভাষার দস্যিপনার অনেক নাম—স্ল্যাং অপভাষা, ইতর ভাষা। এদেরকে অনাচারিক ভাষা বা ইনফরম্যাল স্পীচ (Informal) বলা যায়। যে বিষয়গুলি সম্পর্কে সামাজিক কোনো নিষেধ বা Taboo কাজ করে, কিংবা যে কাজগুলো সামাজিক জীবনে সহজে স্বীকৃতি পায় না, সে সমস্ত বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় সংকেত ভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়। গোপন ভাব প্রকাশ করতে, তথ্য রবরাহ করতে, গূঢ় দর্শন প্রকাশ করতে, সমাজে অনুমোদিত নয় এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে—মানুষ বিশেষ বিশেষ শব্দ বিশেষ বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেছে। এইরকম বাগধারাকে স্ল্যাং ও অপার্থ ভাষা (cant) অথবা সংকেত ভাষা (Code language) বলা হয়।
ভাষার জন্ম মুখে, ভাষা বেঁচেও থাকে মুখে মুখে। লিখিত রূপ এসেছে অনেক পরে এবং তখন থেকেই আচারিকতার, প্রাতিষ্ঠানিকতার শুরু। কারণ ভাষা তালেবর হয়ে ওঠে লিখিত রূপ পেলে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্রয় পুষ্ট হয় প্রভুর ইচ্ছায়। ভাষাকে তখন প্রসাধন শিখতে হয়, সতর্ক হতে হয়, এমনকী ছদ্মবেশ ধারণ করতে হয়। ভাষা তখন দস্যিপনা ভুলে অনাচারিকতার সঙ্গে অবস্থা বা দূরতা তৈরি করে নেয়, প্রথমে মুখের ভাষায়, পরে লেখার ভাষায়। জাতে ওঠার জন্য ভাষার ভদ্রায়ন বা মান্যায়ন এমনই একটি প্রক্রিয়া। ভাষা তখন সভ্য হয়, কিন্তু বন্দি হয়। শুধু মাত্র অপরাধীদের ভাষা অসৎ উদ্দেশ্যে দলের লোকের কাছে উচ্চারিত শব্দমালা বললে সংকেত ভাষা শব্দটি তার অভিজ্ঞান হারায়। ‘এত ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গে ভরা’—রসেবশে বাঙালির জাতীয় চরিত্রের মধ্যেই অনেক সংকেত লুকিয়ে আছে। সংকেত লুকিয়ে আছে তার ভাষায়। চর্যাপদের সান্ধ্যভাষা কবীরের উলটাবংশী, বাউল ভাষা থেকে নানা প্রবাদ প্রবচন বাগধারায়, ধাঁধায়, স্ল্যাং-এ, অপরাধ জগতের ভাষায় (Cant) মণ্ডমাল (Abbreviation), হিজড়েদের ব্যবহৃত শব্দে, বাঈ বাড়ির ভাষায় সংকেতের ছড়াছড়ি। আমরা সংক্ষেপে কিছু উদাহরণ দেব।
চর্যাপদের সান্ধ্যা ভাষা
দশম থেকে একাদশ শতাব্দী মানে চর্যাপদগুলি রচনার কালে পাল রাজাদের পতন আর সেন রাজাদের রাজত্বকাল। ধর্মবিশ্বাসে পাল রাজাগণ পরম বৌদ্ধ আর সেন ও বর্মনরা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী। কিন্তু একটি বিষয়ে এঁদের সবার মধ্যে মিল ছিল—এরা ছিলেন আর্য বর্ণবিন্যাস ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষক। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ইত্যাদি বর্ণের প্রতিষ্ঠা এবং হাড়ী, ডোম, শবর ইত্যাদি অন্ত্যজ শ্রেণির অবমাননায় এরা উৎসাহী ছিলেন। এই সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থারও বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে—বাণিজ্যপ্রধান বাংলা দেশ, কৃষিপ্রধান বাংলায় পরিণত হয়ে গেছে। বণিক শ্রেণির সামাজিক প্রতিষ্ঠা, কৌলীন্য নষ্ট হওয়ায় ব্রাহ্মণ্য একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় কারণে সফলতা লাভ করে। ব্রাহ্মণ্য প্রভাব এতটাই যে চতুর্বর্ণ নয় সমাজ ভাগ হল তিনটি বর্ণে—ব্রাহ্মণ, শূদ্র ও অন্ত্যজ অস্পৃশ্য। ব্রাহ্মণেতর ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রের কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠা ছিল না। সামাজিক পক্ষপাত ছিল প্রকট। একই অপরাধে ব্রাহ্মণের কোনো শাস্তি নেই, শূদ্রের কঠোর শাস্তি। সামাজিক বৈষম্য ও পক্ষপাত, উচ্চবর্ণের মধ্যে নানারকম অন্যায় ব্যভিচার, নিম্নবর্ণ অন্ত্যজদের মধ্যে সামাজিক প্রতিষ্ঠার অভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এই ছিল চর্যার যুগের সামাজিক অবস্থার স্বরূপ। এই যুগে বসে সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত কোনো শ্রেণি যদি সাহিত্য রচনা করে এবং তাতে যদি বাস্তব প্রতিফলন হয় তবে সে চিত্র হবে অবশ্যই দুঃখের এবং বাস্তব চিত্রের যথাযথ চিত্রণে যদি প্রভুর আপত্তি থাকে তবে গড়ে উঠবে সংকেত ভাষা—সান্ধ্যভাষা (‘যেটুকু বোঝা যায় সেটুকু খুলিয়া বলাও সর্বত্র শোভন ও নিরাপদ নহে’)।
চর্যাগীতি সাধন সংগীত, এতে আছে মায়াবাদী, সংসার বিবাগী সাধকদের সেইসব উপদেশ যার মূলকথা হল, এ জগৎ মিথ্যা: আদিতে অনুৎপন্ন। এ জগৎ তোমার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে, সে তোমার ভ্রান্তি (আই এ অনুঅণা এ জগ রে ভাবেতিএ সো পড়িহাই—৪১) এবং যাঁদের উপদেশের মূল ধুয়ো হল,—আইস সহাবেঁ জই জগ বুঝবি তুট বাষণা তোরা (জগৎকে এইভাবে বুঝতে শিখলে তোমার বাসনার বিনাশ হবে)।
মজার কথা হল, জগৎ বিমুখ এই সাধকরা তাদের তত্ত্ব উপদেশ দিতে গিয়ে কিন্তু এই জগৎকেই আঁকড়ে ধরেছেন। হয়তো জীবনের বাস্তব বিপর্যয়ের নৈরাশ্যই তাঁদের বাধ্য করেছিল বৈরাগ্যবাদকে আঁকড়ে ধরতে—মায়াবাদের মূল দার্শনিক প্রেরণা নয়।
প্রচলিত শব্দের শরীরে চর্যাগীতির কবিরা দিয়েছেন গূঢ় অর্থ: ‘চর্যায় ব্যবহৃত কিছু সান্ধ্যশব্দের তালিকা (মুনিদত্তের টীকা অনুসারে)
| সান্ধ্যশব্দ | প্রচলিত অর্থ | সান্ধ্য অর্থ |
|---|---|---|
| দুলি | মাদি কচ্ছপ | মহাসুখকমল |
| বহুড়ী | বউড়ী | পরিশুদ্ধাবধৃতি |
| বারুণী | মদ | সংবৃত্তি বোধিচিত্ত |
| হরিণী | মৃগী | জ্ঞানমুদ্রা |
| গঅন্দা | গজেন্দ্ৰ | চিত্ত |
| মুসা | মুষক | চিত্তপবন |
| তইলা বাড়ি | তৃতীয় বাড়ি | তৃতীয় মহাশূন্য |
| গঙ্গাযমুনা | নদী | গ্রাহ্য-গ্রাহক |
| হরি | বিষ্ণ | মূত্র নাড়ী |
| হর | শিব | শুক্লনাড়ী |
| নাঈ | নৌ | বোধিচিত্ত |
চর্যাপদের কিছু উদাহরণ
দিবসই বহুড়ী কাউই ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলে কামরু জাঅ।।
বাহ্য অর্থ: দিনের বেলায় বধূ কাকের ডাকে ভয় পায়,
রাত্রি হলে (কামরূপ বা) কামসেবার্থে যায়।
সান্ধ্য অর্থ: বহুড়ী = অবধূতিকা, দিবস = প্রবৃত্তি, রাতি-নিবৃত্তি, কামরু = কামরূপ বা মহাসুখ চক্র। চিত্তের প্রবৃত্তিময় অবস্থায় অবধূতিকা ভীত হয়, কিন্তু প্রকৃতি দোষমুক্ত নিবৃত্ত অবস্থায় মহাসুখচক্রে প্রবেশ করে।
বাউল ভাষা—‘ধনীরা মন্দির বানায়, দরিদ্রের সাধক দেহকে মন্দিরে পরিণত করে’—দেহ সর্বস্ব সর্বহারা বাউল সাধকদের সাধনপদ্ধতি গুরুশিষ্য পরম্পরা নির্ভর এবং স্বাভাবিকভাবেই গোপনীয়তার প্রাচীর তৈরি। ‘Secret is valuable so it needs security’. জ্ঞানকে গুপ্ত রাখার জন্য জ্ঞান ও তথ্যসংক্রান্ত সংগঠনের যে গোপনীয়তা, বিভিন্ন সাধন মার্গেও সেই রকম গোপনীয়তা। বাউল জীবনকে উপভোগ করতে চায়। ভারতীয় সামত্ত ভোগবাদ, ইউরোপীয় বুর্জোয়া ভোগবাদ, গ্রিক হেডোনিজম, ফ্রয়েডীয় বিকৃত বিলাস থেকে এ জীবনবাদ মৌলিকবাদ মৌলিকভাবে পৃথক। প্রথম এটি সাধনা সাপেক্ষ। দেহ নিয়ন্ত্রণের, রিপু-ইন্দ্রিয়-বায়ু বশীকরণের সাধনা। এ সাধনা প্রকাশ্যে হয় না, ভাষাটিও প্রচ্ছন্ন। নৃসিংহানন্দ কবিরাজ গোস্বামী এই রীতিকে বলেছেন, ‘লিখিয়া ঢাকিল’। অর্থাৎ সার্বিক গোপনীয়তা নয়।
সমকামী বা অপরাধীদের ভাষা বিশিষ্ট শব্দ নির্ভর। প্রচলিত ভাষায় তারা বিশিষ্ট অর্থ আরোপ করে এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলে। বাউল গানের ভাষা মূলত গোষ্ঠী বহির্ভূত জনের এবং স্বল্পজ্ঞাত সাধনার্থীদের জন্য যোগাযোগের ভাষা। সমাজের সমুন্নত দার্শনিক তত্ত্ব বা চরিত্রগুলিকে বাউল, সামাজিকভাবে হীন (কিন্তু তাদের কাছে মূল্যবান) বস্তুতে যুক্ত করেছে।
● আলেপ, লাম, মিম—দেহাঙ্গ বিশেষ নবী—‘আসছে নবী মাসে মাসে; বেদ/চার কালমা—চারচন্দ্র; নবরসিক—নটি দেহ দ্বারের রস যারা আস্বাদন করেন, নামাজ-দেহমার্জনা।
● প্রচলিত প্রথা ও কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল ঘৃণা প্রকাশিত হয় বাউলদের বেদ, বৈদিক, শরীয়ত, কাঠমোল্লা প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারে। যেমন ঢেকী-নামাজী।
● প্রচলিত ধর্মীয় শব্দে দেহতাত্ত্বিক বিশেষ অর্থ আরোপ–চার তারিক-চারচন্দ্র পঞ্চআত্মা-চারভূত ও রজঃবীজ; আল্লা, আদম, মহম্মদ/হরি, হর, বিষ্ণু-তিন প্রকার নিশ্বাস/তিনদিনের রজঃ ধারা; নূর-বীজ।
● নির্দিষ্ট অর্থের বিশেষ্যকে অনির্দিষ্ট বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার—নিত্যানন্দ-নিত্য আনন্দে থাকেন যিনি, অদ্বৈত-দ্বৈত জ্ঞান নেই যার; নবদ্বীপ নতন সৃষ্ট দ্বীপ (কুমারীর নারীত্ব লাভ)
● বিশেষণকে বস্তুবাচক বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহার—কালোমানিক-আফিং, গঙ্গাফল-মাছ; গৌরপটল-পেঁয়াজ।
লালন দেহের পরম সত্তার বর্ণনায় বলেছেন ‘ও তার হস্ত পদ স্কন্ধ মাথা নাইরে’ এখানে ইসলাম সম্মত নিরাকার আল্লা বর্ণিত হয়েছে। আবার নাই < নাভি হিসাবে গ্রহণ করলে, লালনের পূজ্য জীবন্ত মানুষের গুরুত্ব বর্ণিত হয়। এই বিরুদ্ধ সত্যে সাধক কৌতুক অনুভব করে উলটো ভাষায়।
ইছারোদ্দীনের একটি উলটো কথার পদের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। পদটি প্রবর্ত স্তরের, বিষয়-গুরুতত্ত্ব/বস্তুতত্ত্ব।
পদে একটি ছেলের কথা বলা হয়েছে। সে জগতের কারখানা চালায়। এ কারখানায় তৈরি হয় মানুষ। (নূতন দেহ/কাঁচা দেহ পাকা হয়)
সাংসারিক দিকে ছেলের পিতা, মাতা, ভাই, বোনের পরিচয় এবং চেহারার নির্দিষ্টতা থাকে, থাকে নির্দিষ্ট স্থানে বাসস্থান। পদকর্তা জানান যে ছেলের পিতামাতা ভাই নেই; নেই নির্দিষ্ট স্থানে বাস। নেই হস্ত, পদ, মাথা। কারখানার পরিচালক ছেলেটি সামাজিক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত শ্রেণির সুতরাং সে আত্মমর্যাদা ও শ্রেণি সচেতন হবে। পদকর্তা জানালেন যে কোনো মানুষের ডাকে ছেলেটি তাদের কাছে যায়, আহার করে। কিন্তু তার পেট নাই। সে অনঙ্গ। তার মুখে নেই। কিন্তু সে খায়। হাভাতে ছেলেটির অন্তহীন ক্ষুধা। সব কিছু খাদ্যই তার বৈধ।
দেহের এই পরিচালক সত্তাকে সকলে সন্ধান করে। সব জাতধর্মের মানুষের আত্মা খাদ্য থেকে প্রাণশক্তি গ্রহণ করে। কিন্তু সামাজিক বিচারে বংশ, কুল পরিচয় ও খাদ্যাখাদ্য বিচার গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে সকলে সকলের হাতে খায় না। তাতে জাতধর্ম চলে যায়।
বলা বাহুল্য দেহের মূল বস্তু খাদ্য থেকে সৃষ্টি হয়। মূল বস্তুর কোনো পিতা-মাতা নেই।
সে নিরাকার। হস্ত, পদ, স্কন্ধ, মাথা নেই; সে নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না। সুখরূপ খাদ্য, সেবায় আবির্ভাব অনঙ্গের। তা থেকেই আমাদের সৃষ্টি। অথচ আমরা জাত, কুল, খাদ্য বিচারে ধর্মকে যুক্ত করি। এই পরিহাস।
হিজড়েদের ছদ্মভাষা:
প্রান্তবর্তী প্রান্ত সমাজ হিজড়েদের। ব্রাত্য ঢোলের ভাঙাগলার বিকট উল্লাস আর অকথ্যভাষা দিয়ে জীবনের সমস্ত অশ্রু-সমুদ্রকে পর্বতে পরিণত করতে চায়। সুগন্ধি একাধিক সমাজে যারা কুষ্ঠরোগীর চেয়েও ঘৃণ্য, মূলস্রোতের সমাজ থেকে বাইরে থাকার তাগিদেই তারা ভাষা পালটে নিয়েছে। তাদের ছদ্মশব্দ-র কিছু নমুনা দেওয়া হল।
আকুয়া: শাড়ি বা বস্ত্রের নীচে যার পুরুষাঙ্গ বর্তমান
আড়িয়াল: দারুণ।
ইলুইলু: মোটা বেলুনে জল ভরে যে স্তন সংস্কার হয়েছে
উলেখা: উন্মত্ত হওয়া
একগজ: একশো টাকা
কোতি: নারী স্বভাবা পুরুষ
খোবরা: মাংস
রঙ্গিনী: পান, লোফা: ব্লেড
বাঈপাড়া, বেশ্যাপাড়া বা যৌনকর্মীরাও সংকেত ভাষা ব্যবহার করেন—
মাসি: বেশ্যাপাড়ার মেয়ে দালাল
পাখি: খদ্দের
নথভাঙা: প্রথম যৌনসংগম হওয়া
ছাম: মাছ, ছিবড়ি-লিকম অর্থাৎ লিঙ্গ কর্তন করা হিজড়ে
ছিয়া: বিয়া, ঝলকি: পয়সা, টোনাটুনি: ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে
ঠুংঠাং: শিক্ষিত, ডেঙ্গুর: পুলিশ
নুনে-নুন: সমকামী, পাতলি: চা
পারিক: ভাতার, রথ: পুলিশ ভ্যান
সাঁতরা জোরা: কাপড় পরা
অপরাধ জগতের লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে অনেক সময় এই ধরনের কথা ব্যবহার করেন। যেমন—“গণেশ যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘পটাশদার কোনো দোষ নেই। যত দোষ ওই বদে শালার। ওই পটাশদাকে ডেকে অপমান করেছে। বাপ তুলে খিস্তি দিয়েছে। আমি শুনেছি। পটাশদা তাই মাঝরাতে বড়ো খোকা ঝেড়ে দিয়েছে দুখানা ‘বড়ো খোকা কি?।/’জানে না না? ছ ছোত্ত! এই যে সাইজ—’ডান হাতের পাঁচ আঙুলের মুদ্রায় একটা গোলাকার বস্তুর রূপ ফুটিয়ে তুলল গণেশ।”—এখানে বোমা অর্থে বড়োখোকা। আবার কোথাও পিস্তল অর্থেও এটি ব্যবহৃত, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা আবার এটাকে ব্যবহার করে গাঁজা অর্থে। ‘মামা’ বলতে পুলিশ, ‘গাবু’ হল জুয়াখেলা, ফালতু’ মানে বাজে। ‘খোঁচড়’ হল পাবলিক পুলিশ, ‘লাপেটা’ হল পুলিশী চড়। এইভাবে ‘এক্তি’ এক টাকা, ‘থাপ্পর’ পাঁচ টাকা, ‘দয়াল’ দশ টাকা, আবার ‘পপি ও’ ব্যবহার করা হয় একশো টাকা বোঝাতে।
স্ল্যাং-এর মধ্যেও প্রচুর সংকেত—প্রচলিত শব্দকে নতুন অর্থে ব্যবহার করা হয়। চারটি ধারায় এই অর্থ পরিবর্তন: ১. অর্থের প্রসারণ ২. অর্থের সংকোচন ৩. অর্থের রূপান্তর ৪. বিপরীত অর্থে ব্যবহার
অর্থের প্রসারণ
| শব্দ | মূল অর্থ | পরিবর্তিত অর্থ |
|---|---|---|
| কারগিল | সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র | যে কোনো বিবাদ বা মারামারি |
| পোঁদ মারা | পায়ু সংগম করা | যে কোনোভাবে পিছনে লাগা |
| অর্থের সংকোচন | ||
| খাটিয়ায় ওঠা | যে কোনো অবস্থায় খাটিয়ায় ওঠা | মরে যাওয়া |
| টুপি | মাথার আবরণ | কন্ডোম |
| অর্থের রূপান্তর | ||
| অশোক ফুল | লাল রঙের ফুল বিশেষ | মেয়েদের মাসিক |
| ব্লটিং পেপার | জল বা কালি শুষবার কাগজ | স্যানিটারি ন্যাপকিন |
| বিপরীত অর্থে ব্যবহার | ||
| আদর করা | স্নেহের প্রকাশ | প্রহার করা |
| বিধবা | যে নারীর স্বামী মৃত | যে ছেলের মেয়ে বন্ধু নেই |
মুণ্ডমাল শব্দ
মুণ্ডমাল শব্দ বা abbreviation সাধারণত ব্যবহৃত হয় দীর্ঘ শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে সংক্ষেপে প্রকাশ করার জন্য। স্ল্যাং-এ এই শব্দ সংকেত শব্দরূপে ব্যবহৃত যেমন পি.এন.পি.সি—মানে পরনিন্দা পরচর্চা, ন্যালাখ্যাপা মানে যে ব্যক্তি নিয়মিত ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে খেপ মারেন। শান্তিনিকেতনে একটা প্রচলিত শব্দ ‘বোটু’ যার পূর্ণরূপ হল ‘বোকা ট্যুরিস্ট’।
বিংশ শতাব্দীর শেষ, একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বাঙালি জীবনে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে আগের মতো শ্রদ্ধা নেই। পাশ্চাত্য প্রভাব। স্যাটেলাইট চ্যানেল ও ইন্টারনেটের সৌজন্যে বাঙালি সমাজের চেহারাটা অনেকটাই অন্যরকম হয়ে উঠেছে। শুধু বাংলা বা ভারত নয় আজকের উত্তর-আধুনিক পৃথিবীর একরৈখিকতা ভেঙে জন্ম নিয়েছে বহুরৈখিকতার। অপরাধ জগতের ভাষা বা অমুক সম্প্রদায়ের ভাষা এইভাবে বোধহয় বিভাজন আর সম্ভব নয়। ভাষা ব্যবহারেও আমরা সংযমী নই। বিভাজন উঠে যাওয়ায় ভাষার পক্ষেই লাভজনক। কথ্য-ভাষার বিস্তৃতি মেখে আমাদের ভাষা হয়ে উঠছে সহজ, প্রাণবন্ত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।