তৃপ্তি সান্ত্রা
বিপিএল রূপকথা
হাতে এসেছে এক গোছা চিরকুট। জীবন সিরিয়ালের চেয়ে অনেক প্রিয় বিজ্ঞাপনের ফ্যানা। কোন বিজ্ঞাপন ভালো লাগে, বিজ্ঞাপন দেখে কি মনে হয়—এই সব গোপন ইচ্ছে মেয়েরা জানিয়েছে চিরকুটে নিজ বানানে—নিজস্ব ভাষায়।
♦ নিহারিকা সিং তার একটা পন্ড-এর অ্যাড আছে, যাতে দেখায় যে স্কুল থেকে বেরিয়ে মিস্ ওয়ার্ল্ড হওয়ার পর স্কুলের দেওয়ালে বিখ্যাত সবার নামের মধ্যে নিজের নাম খুঁজে পেয়ে নিজেকে সে গর্বিত বোধ করে এবং অনেক দিন পরেও তার বৃদ্ধা শিক্ষিকা তাকে চিনতে পারে। আমি সেইরকমই কিছু করে স্কুলের নাম উজ্জ্বল করে সবাইকে দেখাতে চাই।
শ্রাবন্তী
♦ ভিট্-এর অ্যাড দেখে আমার শরীর আরো মলিন (মসৃণ) করতে ইচ্ছে হয়, জন-এর স্যামসুং-এর মোবাইল অ্যাড দেখে তার মতো মোবাইল নিতে ইচ্ছে হয়।
♦ Ayur-এর অ্যাড দেখে আমার ইচ্ছে হয় সেই মেয়েটির মতো মুখটি করে তুলতে।
♦ Ponds-এর বিজ্ঞাপনটি দেখে আমার দাগমুক্ত ফর্সা হওয়ার ইচ্ছা করে।
♦ আমাকে ক্যাটারিনার Veet-এর বিজ্ঞাপনটি দেখে লোমমুক্ত চামড়া পাওয়ার ইচ্ছা করে।
♦ পি. সি. চন্দ্র এই বিজ্ঞাপনে হিরে মুক্তোর হার, কানের ডিজাইনগুলো খুব ভালো লাগে এবং সেগুলো কিনতে ইচ্ছে করে।
♦ রানি মুখার্জির টাইটান ঘড়ির অ্যাড খুব ভালো লাগে এবং ইচ্ছে করে তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর একটা ছোট্ট মডেলের ঘড়ি কিনতে।
♦ জুনিয়র হরলিক্স-এর অ্যাড দেখে আমার ইচ্ছে করে বাচ্চাটিকে নিয়ে নিতে।
♦ ডাবর হজমোলাতে আমার সব থেকে বেশি ভালো লাগে বচ্চনের শ্লোক।
♦ Whrilpool-এর এই অ্যাড দেখে আমার ইচ্ছে করে ছোট্ট মেয়েটিকে আদর করতে।
♦ চুলের সমস্যা দূর করতে ইচ্ছে করে এবং গ্লেস বাড়ানোর ইচ্ছে হয়। মুখের দাগ দূর করার ইচ্ছে করে।
♦ পন্ডস পাউডারের অ্যাডটি আমার খুব ভালো লাগে এবং সেখানে সেই মেয়েটি বাঙালি হবার পরিচয় দেয় এবং সে বিশ্বসুন্দরী হয়ে বাংলার গর্বিত মেয়ে হয়ে ওঠে এই বিজ্ঞাপনটি দেখে আমার সেই মেয়ের মতো সুন্দরী হতে ইচ্ছে করে।
দুই-একজনকে বাদ দিলে এরা অধিকাংশই নিম্নবিত্ত। বিশ্বসুন্দরী হবার ইচ্ছে জানিয়েছে দুজন। একজন নাম গোপন রেখেছে, অন্যজন রাখেনি। নাম যে গোপন করেনি সে চাকুরিজীবী বাবা-মার সন্তান—এ রকমই অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে উঠে এসেছিল না ঐশ্বর্য বা সুস্মিতা! মালদার নবাবগঞ্জ, কোচবিহারের ঘুঘুমারি, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর বা পুরুলিয়ার অখ্যাত গ্রামের সুন্দরীরা বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে। তথ্য সমৃদ্ধ হচ্ছে, গণতান্ত্রিক অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হচ্ছে—মুক্ত বাজার বেছে নেবার গণতান্ত্রিক অধিকার!
বিশ্বসুন্দরী হবার স্বপ্ন যারা দেখে না তাদেরও স্বপ্ন আরো উজ্জ্বল আর মসৃণ চামড়া, স্কুটি চালিয়ে বা হিরো হোন্ডার পেছনে বসে স্বপ্নের উড়ে যাওয়া, মনিবন্ধে টাইটান উচ্ছ্বাস হাতে ধরা মোবাইলে জন আব্রাহামের দুরন্ত স্পর্শ। এরপর বিবাহ পর্বটি ডি ডি এল জি (দিলবালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে) বা কে কে কে জি (কভি খুশি কভি গম)-এর মতো স্বপ্নের সাম্পান...। লেহেঙ্গা দোপাটা জিন্স ডিভাইডেড স্কার্ট ক্যাপ্রির ফাস্টফুড করিডোর ছেড়ে সিঁদুর সাঁস বহু শ্বশুরালের শাকসুক্তো অন্দর মহল। গুঁড়ো গুঁড়ো স্বপ্নের মাদকতায় ভিজছে কিশোরী, তরুণী।
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। মুখে ঢেকে যায় বিশ্বায়নে। তথ্য প্রযুক্তি কত খবর সরবরাহ করে বিনোদনের, বিজ্ঞাপনের। কম্প্যুটার এবং ইন্টারনেট দুনিয়াকে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক করে তুলছে তথ্য সরবরাহ করে। কিন্তু এরা যে নিম্নবিত্ত—কীভাবে পৌঁছাবে ফেনার জগতে? সত্যি কথা হল এরা কক্ষনো সেই মায়াময় বিজ্ঞাপন জগতে পৌঁছাতে পারবে না। এদের চোখের সামনে জিন্স-কোলা-চিপসের জগতের নির্মোক নৃত্য এক রঙিন জগতের হাতছানি। ক্রয়ক্ষমতাহীন নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত মানুষ সম্বন্ধে কোনো আগ্রহ নেই পুঁজির। স্বয়ং বিল গেটসের ভাষায়—ইনফরমেশন হাইওয়ের যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, কয়েক কোটি গরিব মানুষ স্রেফ পেছনে পড়ে থাকবে, পৃথিবীর কোটি কোটি গরিবের কথা তো ভাবাই যাচ্ছে না।’
ভাবা হচ্ছে তাদের কথা যাদের অভাব নেই অথচ সর্বদাই অনন্তক্ষুধায় জ্বলছে ও সকলকে জ্বালাচ্ছে। আরো পণ্য আরো উন্নয়নের ক্ষুধা—পুঁজির চোখে এরা অত্যন্ত ব্রাইট ও ইন্টারেসটিং। এরা এদেশের স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষ। উৎসবে, ব্যসনে রাজদ্বারে শ্মশানে সর্বোপরি যাপনে এদেরকে বিজ্ঞাপিত করা হবে এমন কায়দায় যে এরাই হয়ে উঠবে আমজনতার আরাধ্য। এদের দুর্ভিক্ষ নেই। রাষ্ট্র বিপ্লবের প্রশ্নই আসে না। জীবন একটাই। ব্যক্তির আছে অসীম ভোগবাসনা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যক্তি তা অর্জন করতে সক্ষম হয় না। যে উন্নয়ন মানুষের এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সাহায্য করে, পূরণ হয় তার ভোগবাসনা। সুতরাং আর্থিক উন্নয়নের জন্য পরিশ্রম আর পরিশ্রম দিয়ে ভোগবাদের, কেনার যে আশ্চর্য জগৎ সিনেমায় টেলিভিশনে দেখানো হয় সেখানে প্রবেশ করার ‘খুল যা সিম’ সিম মন্ত্র জানে মুষ্টিমেয় কিছুজন।
আগেও কত মধুবালা, কত সুচিত্রা সেন, রেখা হবার স্বপ্ন। স্বপ্নে কত উত্তম দেবানন্দ রাজেশ খান্না দেখিয়াছি। তারপর সীমিত আয়ের পরিমিত স্বপ্ন। রোগা হেঁসেল। রোগা সংসার। ছোটো ভূগোল। ছোটো পৃথিবী। শারীরিক ভাবে প্রত্যন্ত গ্রামে আটকে থেকেও খোলামেলা আনন্দের জীবন, কাজের জীবন দেখতে দেখতে আজ একটি সাদামাটা মেয়েরও তৈরি হচ্ছে অন্যরকম চাহিদা। ইশকুল বা কলেজে পড়ার পর সাধারণ ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়া এবং বাকি জীবনটা খুব সাদামাটা ভাবে কাটিয়ে দেওয়া এই রকম একটা ভবিষ্যৎ তার জন্য অপেক্ষায়। কিন্তু দূরদর্শনে তার বিশ্বদর্শন ঘটেছে। পণ্য দুনিয়ার মায়া কাজলে ভোগবাদী পণ্যে তার আকর্ষণ এমন বাড়তে পারে যে সাদামাটা জীবন সে মেনে নাও নিতে পারে। এইভাবে নিজের কাছে এবং অন্যের কাছে সে সমস্যা আবার কখনও বিপদ।
বিচ্ছিন্ন ছেলে বা মেয়ের নয় পরিবারের, সংসারের তৈরি হচ্ছে অন্যরকম চাহিদা—ভোগের বাজারে নিত্য নতুন পণ্য সরবরাহ তৈরি করছে অন্যরকম জীবন দর্শন। উপহার আর বিনিময়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা, মানবিক সম্পর্কহীন ভোগ্যপণ্যের জগতে বিবাহ ও একটি ব্যাবসা চুক্তি। যত সহজে লেখা হল সাধারণ ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়—ব্যাপারটা তত সহজে ঘটে না। বউমা ঘরের শ্রী, লক্ষ্মী। সুতরাং চমৎকার বাজার ক্রয় করে, সম্পদ বাড়িয়ে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ ভাবী বহু বা কনে পক্ষের। পাত্রের চাকরি অনুযায়ী, ভারী হয় পণের ঝুলি। ঠিকঠাক ঝুলি ভরাতে না পারলে, নববধূটি জানে ঘরে ঢের কেরোসিন আছে।
কন্যাসন্তান কোনো কালেই আদরের ধন ছিল না—বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় দামি পণ্য উপহার দেবার প্রতিযোগিতায় তার অবস্থা আরো শোচনীয়। গরিবের সুন্দরী কন্যাও এখন উপযুক্ত বিনিময় ছাড়া উদ্ধার হয় না। সীমাহীন লোভ ও ভোগবাসনার পরিবর্তিত দুনিয়ায় মূল্যবোধ পালটে যায়, নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে বেড়ে যায় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য। সমাজে অপর্যাপ্ত অর্থ যাদের হাতে তারা ভেসে চলে পণ্য, আরো পণ্যের ফেনায়। অর্থহীন সম্পদহীন অক্ষম বাবা মা মেয়েকে বেচে দেয়। বেড়ে যায় কন্যা ভ্রূণ হত্যা।
আর যদি তুমি একটি নারীকে শিক্ষিত করো
অথচ বিজ্ঞাপন জুড়ে শুধু মেয়েদের রমরমা। বিড়ি থেকে দাদের মলম—সর্বত্র নারী। বাজার তাহাদের চায়। বিজ্ঞাপনে মেয়েদের মুখ দেখানো নতুন কিছু নয়। পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বহুদিন ধরেই মেয়েদের যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বিশ্বায়নের নতুন পৃথিবীতে তাদের পদোন্নতি ঘটেছে। এখন তারা শুধু ব্যবহৃত বিজ্ঞাপনের মডেল নয়, প্রথম সারির ক্রেতাও বটে। আগের চেয়ে অনেক বেশি মেয়ে পড়তে আসছে, চাকরিতেও ঢুকেছে, তাদের হাতে কিছু পয়সা এসেছে, এসেছে খরচের স্বাধীনতা। ফ্যাশন প্রসাধনের ওপর খরচ করার একটা সামাজিক স্বীকৃতি তৈরি হয়েছে। শ্যাম্পু, পাউডার, পারফিউম, ক্রিমের কোটি কোটি টাকার বাজারের প্রধান লক্ষ্য মেয়েরা। পাউচে ভরা গুঁড়ো গুঁড়ো প্রসাধন নেশা নিয়ে বাজার ছুটে যায় সর্বস্তরের কিশোরী তরুণীদের দিকে। শিক্ষিত হওয়া অর্থনৈতিক দিকে স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আজকের পৃথিবীতে মা হিসেবে মেয়েদের ভূমিকাও পালটে গেছে। শুধু প্রজনন নয়—বাচ্চাকে বড়ো করা, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাজারের উপযুক্ত ক্রেতা তৈরি করা মায়ের পরম দায়িত্ব। ‘যদি তুমি কোনো পুরুষকে শিক্ষিত করো, তুমি একজন ব্যক্তিকে শিক্ষিত করলে। আর যদি তুমি একজন নারীকে শিক্ষিত করো, তুমি একটি পরিবারকে শিক্ষিত করলে’—এই প্রবাদ মেনে, বাজার তৈরি করে আদর্শ মায়ের পাঠক্রম। আমার মা সব জানে। জানে কখন জুনিয়র হরলিক্স, কখন কমপ্ল্যান, কখন চুলে সানসিল্ক কখন গার্নিয়ার, কখন লাকসর কলম কখন অ্যাডজেল, চোখ ঠিক রাখার জন্য ঘরে কোন রং কোন এলজি টিভি, বন্ধুদের কখন দুমিনিট ম্যাগি আর তিন মিনিট বিরিয়ানি মশলা—জীবনের কোনো ওঠাপড়া গায়ে লাগতে না দিয়ে শিক্ষিত মা বড়ো করবেন সন্তানকে। দীক্ষিত হবেন আদর্শ পরিবারের স্বপ্নে। সেই পরিবার ছোটো হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে তথ্য সমৃদ্ধ প্রযুক্তি নির্ভর পরিবার। তারা সামসুং ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কাচে, মাইক্রোওভেন খাবার গরম করে, শপিং মলে বাজার করে দামি রেস্তোরায় লাঞ্চ সারে, ছুটির দিনে নিকোপার্ক বা অ্যাকোয়াটিকায় যায়।
মেগা ক্রেতা হবার এই যে পাঠক্রম, সেখানে মেয়েদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে অনেক। কোটি কোটি মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মায়েদের দায়িত্ব তাদের ছেলেমেয়েদের বড়ো করা এবং এই বাজারের উপযুক্ত ক্রেতা তৈরি করা। বিজ্ঞাপনে তাই মেয়েদের ছড়াছড়ি।
আদর্শ মা হওয়ায় পাঠক্রমে মেয়েদের ওপর চাপ বাড়ে। চাপবাড়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের। বাজারের উপযুক্ত হয়ে তৈরি হওয়ার জন্য সবাই প্রাণপণ দৌড়ায়। বিশ্বায়নের পৃথিবী এবং পণ্যসংহিতা এদের মনে লোভ জাগিয়ে তোলে, যে কোনো মূল্যে সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জন করার মন্ত্র শেখায়। সবুজ হয়ে আসে পৃথিবী। ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সবুজ নয়, ঈর্ষার সবুজ দৈত্য ড্রয়িংরুম থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে যায়। ওর ওনিডা টিভি, ওর কোয়ালিস....
আমাকেও হতে হবে ওর মতো, ওর চাইতে ভালো, দ্য বেস্ট। আই অ্যাম দ্য বেস্ট।
শ্রেষ্ঠ হবার প্রতিযোগিতায় আমি আর বাজারের মধ্যে কেউ থাকে না। নিজের দক্ষতায় কেউ সেখানে পৌঁছায়—আবার কেউ পৌঁছাতে চায় অন্যের ঘাড়ে পা দিয়ে। উন্নয়নের হাজার ফানুশ উড়লেও আমাদের দেশে এখনও ছেলেরা বিয়ে করে এবং মেয়েদের বিয়ে হয়। মেয়েকে পার হতে হয়, পার হতে হয় বিপুল পণের বিনিময়ে।
চাকুরিজীবী মেয়েরা পণের বাইরে। তারা ঘর ও বাহির সামলায় দশভুজার দক্ষতায়। মেয়েরা দশভুজা, পৃথিবীর কোটি কোটি পরিবারের হাল ধরেন মেয়েরাই। হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো উন্নয়ন সংস্থা ধরতে পেরেছেন যে পরিশ্রমী এইসব মেয়েদের হাতেই আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। সুতরাং মেয়েদের স্বয়ম্ভর করে তুলে তারা নতুন সমাজ তৈরি করতে উদ্যোগী। লাউ কুচোনো বা দ্রুত মশারি ভাঁজ করার দক্ষতায় রোজগেরে গিন্নির যেমন উপার্জন তেমনই মূলধন বঞ্চিত মেয়েদের কিছু ঋণের সাহায্যে তিনটি মুরগি চারটি ছাগলের মালিক করে দেওয়া। সাময়িক সাহায্য হিসেবে এই পথ চলতে পারে কিন্তু এ দিয়ে সমাজ বদলানো যায় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্রের হাতগুটিয়ে নেওয়া, দায়িত্ব অস্বীকার করার ফল মারাত্মক। এ ব্যবস্থায় বড়োলোকের আরো বড়োলোক হয়ে যাওয়া।
একশো কোটির দেশে প্রায় ২০ কোটি লোক বিশ্ব বাজারের উপযুক্ত ক্রেতা হওয়ার জন্য তৈরি। তাদের জন্যই অর্থনৈতিক সংস্কার। বাকিদের সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ কমে গেছে। পুরুষের কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, কাজ হারিয়ে ফেলা মানে মেয়েদের উপর চাপ বেড়ে যাওয়া। বাজার কম মজুরিতে ধরে ফেলে এই বিরাট শ্রম সম্পদকে। ছেলেদের চেয়ে কম মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদির অভিজ্ঞতা কম, ধৈর্য ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করার দক্ষতা—বাজার মেয়েদের পছন্দ করছে শ্রমিক হিসেবে। ঘরের কাজে মজুরি নেই, স্বল্প মজুরিতে হাসিমুখে কাজ করছে মেয়েরা। তার চোখে নিজের রোজগারে সংসার সাজানোর স্বপ্ন। নিজেকে সাজানোর স্বপ্ন। মেগা ক্রেতা হবার স্বপ্ন।
পাউচ সুখ। পাউচ স্বপ্ন। পাউচ অভিষেক। পাউচ ঋত্বিক
খুব জোরে হাত চলছে মেয়েদের। যারা চিরকুট লিখেছে তারাও আছে কেউ কেউ। ধূপের গুঁড়ো, পাথর কয়লা গুলের গুঁড়ো সেন্ট আর তেল দিয়ে মাখা মণ্ড তৈরি হচ্ছে ধূপকাঠি। ১ কেজি বানালে মজুরি ১১ টাকা ১ কেজি সুপুরি কাটলে ২.৫০ টাকা আর বিড়ি বাঁধার রেট হাজারে ৩৫ টাকা। এ দিয়ে সমস্যা মেটে না। সমস্যা বড়ো, সমাধান নেই। তো? কিছু সুখ তো নাগালের মধ্যেই পাউচে। পাউচ শ্যাম্পু। পাউচ ক্রিম। পাউচ অভিষেক। পাউচ ঋত্বিক। আশেপাশের ছেলেগুলো বড়ো সাদামাটা। রুপোলি পর্দার নায়কের মতো নয়। যে ভাবে সাধারণ স্বামীও সঙ্গিনীকে ডায়মন্ড জুয়েলারি প্রেজেন্ট করে শাহরুখ হতে পারে, সেই অসামান্য মুহূর্ত তৈরি করতে পারে না তাদের স্বপ্নের নায়করা। হিরের জুয়েলারিতেই সেই অপার্থিক মুহূর্ত তৈরি হয়—’দ্যাট্ রেয়ার মোমেন্ট ইওর ওয়াইফ থিংকস্ ইউ লুক্ বেটার দ্যান শাহরুখ’—
হিরে যাক্। পি. সি. চন্দ্র, অঞ্জলি জুয়েলারির চোখ ধাঁধানো অলংকারের ডালি নিয়েও তার জন্য কেউ বসে নেই। ফেয়ার এবং লাভলি হবার জন্য তার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নিতান্ত সাদামাটা রিমেক শাহরুখ বা অভিষেক পেতেও তার দরকার বিপুল পণ্য মূল্য।
সমাজ ও পরিবার স্বপ্ন ও বিবাহ এসবে কি শুধুই হিসেব আর বাজার? কিউ টু কিউ-র মতো প্রেম হয় না? মুঠি মে দুনিয়ায় প্রেম পদাবলিও পালটে যায়। প্রেম মোটা মানিব্যাগ দেখে। প্রেম পাউচ সুখ দেখে। উড়ুচুল আর আঁচল বা দোপাট্টা সামলে মেয়েটি পরম নিশ্চিন্তে অজানা হংসগিরি লেন বা হারকাটা গলিতে পা রাখে। দুজনে ঢোকে। বেরিয়ে আসে একজন। শুধু ছেলেটি। রীতু জানেজা, অপর্ণা হালদার, বেবি দাস এরকম অজস্র নাম। সীমান্ত শহর আর সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেয়েরা উধাও হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত জীবনের সীমাবদ্ধতায় হাঁপিয়ে কেউ পাড়ি দিচ্ছে ফ্যানার জগতে।
বাড়ি পুরানো পন্থী। যে ভূগোলে চিরকুটের মেয়েরা আটকে সেখানে কোথাও কোথাও মধ্যযুগের অনুশাসন। স্বামী কাজে গেলে একটি ছেলে আসত এই অপরাধেও সলিশি সভায় নগ্ন করে ঘোরানো হয় মালদহের কালিয়াচক এলাকার ব্রহ্মোত্তর গ্রামের বত্রিশ বছরের নাজিমা বিবিকে। মেয়েটি আত্মহত্যা করে। প্রাইভেটে পড়তে গিয়ে কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে কারো যেমন পড়া বন্ধ করে বিয়ে ঠিক হয়ে যায়—তেমনই সামান্য মেলামেশার রেষারেষি নিয়ে খুন ধর্ষণ ও আকছার ঘটে। খোলামেলা যে যৌনতার আভাস বিজ্ঞাপনের ফ্যানায়, ক্রিম মেখে আরো ফর্সা হওয়া এবং বান্ধবীর প্রেমিককে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া, চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে জাঙিয়া পরা পুরুষ শরীর উপভোগ, একা বাথরুমে তাকে পেয়ে সারা শরীরে লিপস্টিক ঠোঁট এঁকে দেওয়া—যা কিছু অধরা ইচ্ছের অবদমন নিয়ে হেঁটে চলেছে মেয়েরা পুরানো সেকেলে ভূগোলে। পাঠক্রমে আত্মিক সৌন্দর্য, আত্মিক উন্নতি। বাইরে শরীর আর চামড়ার উন্নতি—কে মেলাবে দুই পৃথিবীকে? উত্তর জানা নেই।
নাথিং ফর সেল ইন স্টুপিডিটি স্ট্রিট
শ্রেণি কক্ষের বাইরেও এত চ্যানেল আছে, এত শিক্ষক—ক্লাসরুমের শিক্ষক শিক্ষিকা আজ বড়ো অসহায়। সাহিত্য ক্লাসে তিনি পড়ান, গান গাওয়া পাখিকে যারা মেরে ফেলে, খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে, কবি মানস চক্ষুতে দেখেন তাদের খাদ্যের মধ্যে, শস্যের মধ্যে কিলবিল করছে পোকা। পরিবেশবিদ্যা ক্লাসে তিনি পড়ান গাছ কাটতে নেই পশুপাখিকে ভালোবাসতে হয়, বর্জ্য পদার্থ যেখানে সেখানে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করতে হয় না। গাছপালা, মাটিজল পশুপাখি, আকাশ, বাতাস মানুষ সবাই সবার উপর নির্ভরশীল। শেখান বাস্তুশাস্ত্র। আর জীবনশৈলী ক্লাসে বোঝান বয়ঃসন্ধিকাল একটি আলোছায়ার রোমান্টিক জগৎ। এই সময় সঠিক দেখার চোখ কান তৈরি না হলে, জীবনের মানেটাই পালটে যেতে পারে। পালটে যেতে পারে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে ধারনা। পঠন আর তার মাঝে মাঝে পরিবেশ আর জীবনশৈলী গুঁজে দিতে দিতে কীরকম যেন অসহায় হতে হয়। ফুরিয়ে আসছে সর্বংসহা পৃথিবী। সীমিত সম্পদের পরিমিত ব্যবহার মারফৎ জনকল্যাণের কর্মসূচি চাই—এই রকম দাবি কি ফাঁকা ফাঁকা ঠেকে? ৮০-র দশকের প্রথমেই ক্রমাগত অবিবেচক শিল্পোন্নয়নের ফলে পৃথিবীর পরিবেশ বদলে যাবার জন্য গ্লোবাল ইকলজি দায়ী করেছে উন্নয়নের দালাল রাষ্ট্রগুলোকে। পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে এই গ্রহ জুড়ে জলবায়ু বদলে যাবে—শোনা গেছে নিউক্লিয়র উইন্টারের কথা। এসব সত্ত্বেও আরো উন্নয়ন। বারবার যুদ্ধ। খোলা বাজারের প্রতিযোগিতায় পলক ফেলতেই প্রোডাক্টে পালটে যাওয়া। কি সূক্ষ্ম সব মেশিন—কি চমৎকার তার উপযোগিতা। অজয় দেবগণের জামায় সস পড়ে গেল, চট করে ওয়াশিং মেশিন চালিয়ে পরিস্কার করে দিল কাজল ও তার মেয়ে। ড্রায়ার চালিয়ে ঝটপট শুকিয়ে দেয় এমন সব ওয়াশিং মেশিন। মেশিনের কেরামতি দেখাতে আবার গায়ে হড়হড় করে সস ঢেলে দেয় অজয়।
যেভাবে ২০ শতাংশ স্টেডি ক্রেতা হড়হড় করে পণ্য কেনে, ফেলে ছড়ায়-হাতের মুঠোয় দ্রব্যর ঘন শিহরন। ৮০ শতাংশ-এর ঝুলি শূন্য, পায়ের তলায় মাটি নেই, এদের সম্বন্ধে বাজারের কোনো আগ্রহ নেই তবু তারা মন্ত্রমুগ্ধ বিজ্ঞাপনের ঝলকে। বাজার, ডিসকাউন্ট, ক্রেডিট—এইসব সংক্রান্ত তথ্যে বোঝাই হয় মস্তিষ্ক।
অসহায় কবি স্বপ্নে প্রতিবাদ দেখেছেন: নাথিং ফর সেল ইন।
কল সেন্টার, ট্যুরিস্ট রিসর্ট, রাত পাখিদের পানশালা, মোহময় রেস্তোরাঁয় ফ্রেশ প্রোডাক্ট হিসেবে কোনো ঘর হারানো মেয়ে নেই। চুল, চামড়ার উন্নতি ছাড়াও জীবনের অন্য অর্থ হয়। লিঙ্গ রাজনীতির শিকার না হয়ে, ছোটো ছোটো আবর্তে ঘুরপাক না খেয়ে মেয়েরা অন্য রকম কিছু ভাবছে।
১১৫টি মেয়ের মধ্যে চিরকুট জমা দেয় মাত্র ১২টি মেয়ে আরও ২০-২৫ জনের বাড়িতে টি. ভি. আছে—তারা চিরকুট লেখেনি। বাকি ৮০ জনের বাড়িতে টি.ভি. নেই। এদের নিয়ে বিকল্প দর্শন ভাবা যাবে না? মুষ্টিমেয়র স্বপ্ন জগতে ভেসে যেয়ে নয়, নিজেদের অবস্থান গত জায়গা থেকেই তাদের মনে সম্পদ বণ্টন ও সুযোগ বণ্টনের অসাম্য নিয়ে কী প্রশ্ন জাগবে না?
Look দেখা
ক্লাস টেনের ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের চিরকুট নিয়ে এ প্রতিবেদন লিখেছিলাম, বেশ কয়েক বছর আগে। এর মধ্যে পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। ঘরে ঘরে টিভির পাশাপাশি, হাতে হাতে এসেছে মোবাইল। সে যন্ত্র বয়ঃসন্ধির কিশোর-কিশোরীদের নীল ছবি দেখিয়ে তাতায়, ঘর ছাড়া করে। আবার কখনও তারা ফোনে ফোনে থানা, অফিস করে নাবালিকা বিয়ে আটকায়। পাচার বন্ধ করে।
স্থায়ী চাকরির সুখী পরিবার কোনো ব্যাপারেই সংঘাতে যেতে না চেয়ে একটা কল্পিত গণতন্ত্রের স্বপ্নে নিয়ম করে ভোট দেয়। তাদের বাচ্চারা থাকে নানা রকম ব্র্যান্ডের সুরক্ষায়। ‘জীবনের ওঠা পড়া যেন গায়ে না লাগে’—এই তাদের যাপনের মূলমন্ত্র।
এর বাইরে অন্য জগতের কথা তারা জানে না, জানতে ভালোওবাসে না। নবাবগঞ্জ হাট দিয়ে নদী পেরিয়ে আনন্দীপুর গ্রাম থেকে মাইল চারেক উজিয়ে ইস্কুলে আসছে সাহানা রসিদা, সীমা চৌধুরি, জয়শ্রী চৌধুরী। ওরা মরশুমে ধান রোয়। মাঝি না থাকলে নিজেরাই নৌকা চালিয়ে আসে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। কত আর বয়স—এগারো-বারো।
নিন্দুকেরা কত কী বলে। ইস্কুলে আসে কী আর পড়তে। কত রকম লালচ দিছে ইস্কুল। ড্রেস। খাবার। সাইকেল। টাকা। না পড়ালিখা শিখে ঝুরি ঝুরি ডিগ্রি। এতে কী কিছু সমাধান হবে। কিছুদিন বাদে ব্যাগ ভর্তি ডিগ্রি নিয়েও কিছু না পেয়ে হতাশায় ভুগবে ছেলেদের মতো। বিয়ের বয়সও পেরিয়ে যাবে। হয়েও এম. এ.― হবে না বিয়ে।
কীসে যে কী হবে বলা মুশকিল। এই যে তেরো-চোদ্দোতে বিয়ে হয়ে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বোঝা বইতে হল না, এই বা কম কী! আর বিয়ে না হলে বাচ্চা না হলেই বা কী হয়। তপু পিসি, নিন্তুদি, ডলিদি এরা তো বিয়ে বাচ্চা না করেও দিব্যি ফুর্তিতে আছে। ডিভোর্স হলেই বা কী হয়। রোজ রোজ মারপিটের চেয়ে সেটাই তো ভালো! একটুও বনিবনা নেই। প্রেম নেই। তিতাস তবু অর্ঘ্য-কে ডিভোর্স দেবে না। কেন? তিতাস তো চাকরি করে, এত দখলদারি মনোভাব কেন তার? ডিভোর্সের পর নীলার মেয়ে তৃষা বাবার সঙ্গেই থাকে। তার জন্য মা হিসাবে নীলা ডাইনি হয়ে যায় না। তৃষা তো বরাবরই বাবার কাছে ভালো থাকত। যেভাবে স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণের পাঠ। একটু না হয় তার থেকে বেরিয়ে আসুক মেয়েরা। অন্য দৃষ্টিতে দেখতে শিখুক পৃথিবীকে।
রাঙামাটির অনিমা মণ্ডল ক্যারাটে জানে না। এই যে অর্পিতা দিদিভাই, সীমা দিদিভাই তাদের মেয়েদের ক্যারাটেতে দিয়েছে এটা তার কাছে খুব হাস্যকর। নিজেকে লড়াকু শক্ত হিসাবে তৈরি করে, পরিবেশের মোকাবিলায় একটা বিপ্লব আনার এই প্রচেষ্টা। খুব গোলমেলে।
চাঁই মণ্ডলদের ঘরে খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়। ক্লাস সেভেন থেকে তার জন্য পাত্র দেখছিল বাড়ি, সে সব ঠেকিয়ে অনিমা যে এইচ.এস. দিল—এটা একটা বড়ো লড়াই। শুধু তাই নয়। রাখী মণ্ডল, সাকিয়া মণ্ডল নামে চোদ্দো বছরের দুটি বালিকার বিয়ে আটকে খবরের শিরোনামও হয়েছিল অনিমা। একটা এন.জি.ওর সঙ্গে যুক্ত। ছবি টবি দিয়ে ওর সাহসিকতা তুলে ধরে, চিহ্নিত করে দেওয়া। বিপদ বাড়ল নাতো মেয়েটার? একটু ভয়ই পেয়েছিলাম আমরা।
মেয়েরা ভয় পেতে ভালোবাসে। ভয় দেখতেও ভালোবাসে। ভালোবাসে হিংস্রতা দেখতে। নায়ক দমাদম মেরে প্রতিপক্ষকে শুইয়ে দিচ্ছে। নানাভাবে রক্তাক্ত করছে। কুস্তি। বক্সিং। অসিযুদ্ধ। বন্দুক স্টেনগান মর্টার। এই যে মেয়েরা হিংসা দেখে উত্তেজিত। পুরুষদের হিংসা আমোদ চেটে পুটে খাচ্ছে, এটা যদি বন্ধ হয়। যদি বলে, আর ভালো লাগছে না এসব। কেমন হয়?
ঠিক, এইভাবে বলেনি অনিমা। খুব ছোট্ট করেই বলেছিল,—আমার না ছেলেদের এই সব হিংসা, মারামারি দেখতে ভালোলাগে না দিদিভাই।
—HEMAN’ পুরুষ ওরা। সবাই তো পাগল, তোর ভালো লাগে না?
—মাঠে ঘাটে কাজ করা আমার বাবা, কাকারা না খুব জোয়ান দিদিভাই। লাঙল দেওয়া, ফসল কাটা-হাসুয়া হাতে আলে মাছুয়া আলাদের সঙ্গে মোকাবিলা...জানি। মিছিমিছি বানানো হুড়পার দেখতে ভালোবাসি না...
সাবাশ! অনিমা! তুই জানিস না নতুন পৃথিবীর, নতুন পাঠক্রমে কী একটা বজ্রবিদ্যুৎ খাতা খুলে ফেললি, অজান্তেই।
নারী পুরুষ অনুপাত, একটু কম বেশি করে প্রায় সমান সমান। পথে ঘাটে, ডান্স বারে, গ্যালারিতে পুরুষের দাদাগিরি, হিংস্রতা বন্ধ করা যায় না? পোস্ট মডার্ন ওয়েভের নতুন মেয়েরা তো অনেক সাহসী। তারা যদি বলতে পারে—দ্যাখো বাপু, তোমাদের এই হিংস্র আগ্রাসী রূপ আমাদের মোটেও ভালো লাগে না—এই রক্তলোলুপ রূপে দেবত্ব আরোপ করে পূজা করতে পারবনা।
মেয়েরা কুস্তি দেখতে যাচ্ছে না। বক্স অফিস হাউসফুল করে রাফ অ্যান্ড টাফদের জন্য গলা ফাটাচ্ছে না। দেশপ্রেমের নামে যুদ্ধজয়ী বীরদের গলায় বরমাল্য দিতে যাচ্ছে না—দেখা যাবে, বীরধর্ম তার গ্ল্যামার হারিয়েছে।
পুরুষদের ম্যাগাজিনগুলো যতই দেখাবার চেষ্টা করুক অন্য দেশ জয় করে এলে বিজয়ী সেনাদের বিনা পয়সায় সেবা বিলোবার জন্য শরীর হাট করে খুলে দাঁড়িয়েছে নগর সুন্দরীরা, কেউ আর ওসব গল্প খাবে না।
এসব না বলার সময় হয়েছে। মেয়েরা হুরিপরী হতে চায় না। চায় না যুদ্ধবিজয়ীদের পুরস্কার হতে।
কাজটা সহজ নয়। মেয়েদের দাবিয়ে রাখার জন্য ভয় ভীতি হিংসা বিকৃতি খুউব প্রয়োজন, ‘যতই চেষ্টা কর, তোদের নীচেই থাকতে হবে’...এই ইঙ্গিতপূর্ণ ঠাট্টা পুরুষের এক প্রিয় বিষয়। পুরানো কৃষি সভ্যতায় লাঙল, বাঁশ, নোড়া—এরা পুরুষাঙ্গের প্রতীক, যন্ত্র যুগে তা অবশ্যই বন্দুক।
‘Shoot me’—একটি ইংরেজি স্ল্যাং। চরম উত্তেজনায় পুরুষকে মুক্ত করার আহ্বান, কামোদীপ্ত নারীর।
বন্দুকের ক্ষমতা পেলেই নারী তার প্যাসিভ ভূমিকা, কামশীলতা থেকে মুক্তি পাবে এমন নয়। যদিও সে পুরুষের মতোই বন্দুক চালাতে জানে। একটা বিশেষ মিশন নিয়ে মেয়েদের হাতে বন্দুক তুলে দেওয়া হয়। কেড়ে নিলে দেখা যায়, তারা আগের থেকেও হীনবল।
এর ঠিক বিপরীত পথ হল: শিশুকে মানবিক রূপ দিক মেয়েরা। এর থেকে বের করে নিক ধাতব নিষ্ঠুরতা। কীভাবে ক্ষমতাপ্রিয় পুরুষ আধিপত্য বিস্তার করেছে আর তার ফলে মেয়েদের কী ফল ভোগ করতে হয়েছে এ ব্যাখ্যায় না গিয়ে শিশ্ন নিয়ে যাবতীয় ভুল ব্যাখ্যাকে দেখে উপহাস করুক আজকের স্বাধীনচেতা নারী। শৌর্য বীর্য নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা দেখে মজা করুক।
একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরুষকে দেখার অভ্যাসও পালটাক। যৌনতার সমস্ত দায় বহন করে, পুরুষ ক্লান্ত। সময় এসেছে তাকে সেই দায়মুক্ত করার। সবাই লেসবিয়ান হয়ে যাবে এমন নয়। পুরুষের শিশ্নত্বের ওপর থেকে ঝোঁক কমিয়ে এনে মানবিক যৌনতার ওপর জোর দিতে হবে।
মেয়েরা যৌন অভিযান নিয়ে বিস্তারিত লিখছে, বাংলাতেও। ‘মন্থন’ পত্রিকার ডিসেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় পড়লাম প্রিয়াঙ্কা গুহর ‘শ্বাস প্রায় আটকে যায়’...। খুব স্মার্ট লেখা, ঝরঝরে, সাহসী। যৌনতা নিয়ে সব ট্যাবু প্রিয়াঙ্কা ভেঙে দিতে চেয়েছে বিভিন্ন জনের সঙ্গে বিভিন্ন শরীরী প্রতিক্রিয়ায়। আমরা এখানে (৭) নং অনুচ্ছেদটি পড়ব:
“বেশ কিছুদিন ধরে দীপ্ত-র কথা মনে পড়ছে। দীপ্ত-র কথা বলা ভুল, ওর গন্ধহীন শরীরটার কথা। ও যেভাবে আদর করে তার কথা। খুব পারদর্শী স্পর্শ ওর থেকে পাইনি। কিন্তু আমার উপদ্রব, আমি দানবটাকে ও যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে তা আমাকে এখনও মুগ্ধ করে রেখেছে। ওর সঙ্গে অনেকদিন লাগাইনি, মাঝে দু-তিনবার ফোন করেছিল, ‘আর পারছে না’ জানিয়েছিল, কিন্তু আমার তখন একেবারে ভালো লাগছিল না। তাই গিয়ে ওঠা হয়নি। ভাবতে থাকি, একবার করব, ফোন করি। সেই রাতে একসঙ্গে থাকি, কিন্তু ও কিছুই করতে পারে না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর যেন ক্রমে ও ছোটো হতে থাকে, ওর মুঠোর মধ্যেই লুকিয়ে যায়। সারারাত ও কাঁদে, আর আমার এক আনন্দ হয়। কোনো পুরুষ না করতে পেরে কাঁদছে, আহা, এরকম কান্না আমার এই প্রথম দেখা! ‘ফাটাও ফুচকা, ঢোকাও আলু’ এই ধারণাটা তো বদলে গেল অন্তত ওর। ওহ্ ঢোঁড়া!”
এই খোলামেলা সাহসী উচ্চারণ বাংলায় খুবই নতুন। কিন্তু এটা পড়ে আমার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া..এত চড়াই উতরাই পেরিয়ে শেষ অব্দি আগ্রাসনই কী স্থানাঙ্ক হবে পরমা প্রকৃতি আর পুরুষের এ লীলা খেলার? প্রতিক্রিয়া, বিপ্লব নয়। নিপীড়িত জন যদি নিপীড়কের ভূমিকা গ্রহণ করে তবে আর কেমন বিপ্লব।
চিরকুটের মেয়ে আর তার বাইরের মেয়েদের নিয়ে কথা বলতে বলতে কত প্রসঙ্গ চলে এল। বিশ্বায়নের ছাতার নীচে কেউ আর প্রোলেতারিয়েত নয়, সবাই ভাড়া করা ক্রেতা-দাস, এইরকম মায়া। ভ্রম।
এর বাইরে অনেক দূরে দারিদ্র্য সীমার নীচে থাকা মানুষদের আছে এক সাদা কালো বিপিএল রূপকথা জগৎ, হারিয়ে যেতে যেতেও আছে, পুরানো মূল্যবোধ, আছে হৃদয়ের উত্তাপ, ‘কোনো এক শীতের রাতে একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে/কোনো এক মুমূর্যের বিছানার কিনারে’ দাঁড়াবার সাধ আছে।
বিজ্ঞাপনের চোখ নেই এ স্বপ্ন দেখার। অসংখ্য কিশোর কিশোরী যাদের শরীর জুড়ে অলৌকিক মৌমাছি আর জোনাকির ভিড়, শুধু তারাই দেখবে এই রকম অলৌকিক রূপকথা। এমন একটা বাড়াবাড়ি স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা তাদেরই। বিকল্প স্বপ্ন। বিকল্প পৃথিবী। বিকল্প যাপন। দামি ইরেজার দিয়ে স্মৃতি হননের যে পাঠক্রম, যে স্রোত—তার বিরুদ্ধে হাঁটাও তো এক ধরনের বিপ্লব। শিল্প নিয়ে বিপ্লব তো অনেক হল, এখন ফেরা যাক মাটি সংলগ্ন জীবনের কাছে।
এই দেশ, এই মাটি, এই জল-এ আমার জাতীয় সম্পদ নয় আমি এই প্রকৃতির ভূগোলের, অংশ মাত্র। প্রকৃতিকে আমরা ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারি না। পারি না বশ করতে।
চারিদিকে অগণন মেশিনের ভিড় স্তব্ধ হয়। বন্ধ কারখানা। উদ্ধত চিমনিগুলো ভঙ্গুর। নির্বীজ।
কোটি কোটি মানুষ দশ হাজার বছর ধরে মাটি-শিকড় সংলগ্ন থেকে যে কৃষি জেনেছে তাই তার হৃদিজল। তাই তার মাতৃভাষা। তাকে ‘অনুন্নত’ চাপ মেরে, উন্নয়নের নামে নতুন এক পণ্য অধ্যুষিত বিকল্পের আমদানি চায় ক্ষমতার রাজনীতি।
সেজ-হাব-মল-মূত্র শোভিত, মিডিয়া শাসিত এক পণ্যপৃথিবী।
এসব কেন মেনে নেবে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ?
শেকড়ের কাছে ফেরার প্রতিজ্ঞা নিয়ে, নতুন পাঠক্রমের নতুন উচ্চারণ:
‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম শান্তির মন্ত্রে গেয়ে উঠো শ্রেণির উচ্ছেদ
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।’
আরশিনগর, ২০১৬, অক্টোবর
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।