মনীষ মুখোপাধ্যায়

পরেশ ভট্টাচার্যের বাড়ির দাওয়ায় জমা হয়েছে প্রতিবেশী জনা দশেক লোক। পরেশের স্ত্রী কেঁদে কেঁদে মাঝে মাঝেই মুচ্ছো যাচ্ছেন। যাবেন নাই বা কেন, তাঁদের একমাত্র ছেলে বিকেলে বাউরির মাঠে ফুটবল খেলতে গেছিল, এখনো বাড়ি ফেরেনি! ছেলেটির বাবা পরেশ গাঁয়ের লোকেদের সঙ্গে চিন্তিত মুখে শলা-পরামর্শ করছেন কোন দিক ধরে খুঁজতে যাবেন সেই নিয়ে। খবর পাঠানো হয়েছে পরেশের ছেলের বন্ধুদের, তারা এলে অন্তত কিছুটা বোঝা যাবে। আজ মহেশ, মানে পরেশ ভট্টাচার্যের ছেলে ঠিক কোনদিকে খেলতে গিয়েছিল!

খানিকক্ষণ পর রতন আর দীনু এসে দাঁড়াল ভটচাজ বাড়ির উঠোনের বকুল গাছটার সামনে। পরেশের প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে, কিন্তু নিজেকে যতটা সম্ভব সামলে নিয়ে তিনি রতনের দিকে এগিয়ে গেলেন। দীনু আর রতনের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করলেন,

—“আজ কোন পানে গেছলি তোরা?”

পরেশের অগ্নিশর্মা রূপ দেখে কিছুটা যেন ভয় পেয়ে গেল ছেলে দুটো। দু’পা সরে দাঁড়ালো দীনু, তারপর মাথা চুলকে উত্তর দিল

—“বাউরির মাঠে আজ অন্যরা ফুটবল খেলছিল, তাই আমরা গেছিলাম চরার দিকে খেলতে।”

চরার নাম শুনে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমল পরেশের মাথায়। এই বোশেক মাসে ওইদিকে যাওয়ার মানে তো সাক্ষাত মৃত্যু! নানা রকম সাপের আড়ত সে জায়গা।

—“তা একবার পেছন ফিরে দেখবি না, তোদের স্যাঙাত তোদের সঙ্গে আছে কিনা?”

বিরক্ত হয়েই প্রশ্নটা করলেন পরেশ। প্রশ্ন শুনে দীনু অবাক চোখে তাকাল পরেশ ভট্টাচার্যের দিকে।

—“খুড়ো বলে কী, মহেশ এখনও ফেরেনি? নিজের মনকে নিজেই প্রশ্নটা করল সে।

গোকুল মাঝি পরেশের উদ্দেশে বলল

—“চলেন খুড়ো আর দেরি কইরা লাভ নাই, চরার দিক আমার হাতের তেলোর মতই চিনা, ওদিকে গ্যে দেখি… যদি না!”

গোকুলের ‘যদি না’, কথাটা শোনায় আরেক প্রস্থ কান্নার রোল উঠল ভিতর বাড়িতে। এই ‘যদি না’-র অর্থ বুঝতে কারো সময় লাগে না, কারণ সবাই জানে ওদিকে শঙ্খচূড়ের আড্ডা।

সবাই যখন সাপের ভয়ের কথা ভাবছে, একটু দূরে আম গাছের তলায় বসে থাকা বিহারীর একটা অন্য ভয় হতে লাগল। কিন্তু না, এই অবস্থায় সে কথা কাউকে বলা যাবে না। বিহারীর বয়স এখন প্রায় সাড়ে তিনকুড়ি তো হবেই। এই গাঁয়ে গঙ্গারাম ডাকাতের সময়ের যেসব লোকেরা এখনো শ্বাস নিচ্ছে, বিহারী তাঁদের মধ্যেই একজন।

দলটাকে গাঁয়ের সীমান্তের দিকে মিলিয়ে যেতে দেখল বিহারী, সে যেমন করে বসে তামাক খাচ্ছিল সে ভাবেই তামাক খেতে লাগল। যদি প্রয়োজন হয় তখনই সে কথা কইবে। কী দরকার আগ বাড়িয়ে কথা কওয়ার, আজকাল গাঁয়ের ছেলেপিলেরা লায়েক হয়েছে, সবাই যাচ্ছে শহরে পড়াশোনা করতে। তার কথা এরা পাত্তা দেবে না, গাঁজাগপ্প বলে উড়িয়ে দেবে। গাল বাড়িয়ে চড় খাওয়ার চেয়ে চুপ থাকাই ঢের ভাল।

ঘন্টাখানেক খোঁজাখুজির পর গোকুলের মনে পড়ল একবার বুড়ো বিবির থানের দিকটা দেখলে হয় না? বুড়ো বিবির থানের দিকে গিয়ে হয়ত ছেলেটার লাশই পাওয়া যাবে, কারণ ওই দিকেই কেউটে আর শঙ্খচূড়ের বাসা। বিবির থানের দিকে যাওয়ার কথা পরেশ ভট্টাচার্যের কানে কানে বলল গোকুল। কাঁধের গামছাটা দিয়ে মাথার ঘাম মুছে মাথায় হাত ঠেকালেন পরেশ, তারপর বললেন,

—“চল একবার ওদিক পানেই দেখি, মা শ্মশানকালীর যদি ইচ্ছে হয় আমার সন্তানকে তিনি অবশ্যই রক্ষে করবেন।“

দলটা চরের জঙ্গলের দিকে হাঁটতে লাগল। এতগুলো আগুন আর আলো দেখে নিশ্চয়ই সাপেরা এগিয়ে এসে তাড়া করবে না।

জোরালো টর্চের আলোয় পরেশ দেখতে পেলেন তাঁর ছেলেকে। বুড়ো বিবির গম্বুজের নীচে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সে। কে জানে ছেলের ধড়ে প্রাণ আছে কিনা! অশনি সংকেতে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল পরেশের ।

দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে দৌড়ে গিয়ে পরেশ কোলে তুলে নিলেন ছেলের শরীরটা। নাঃ! হাতের পাতা তো গরম, নাড়ী চলছে। ঠোঁটের কোণ থেকে গড়িয়ে শুকিয়ে আছে ফেনা। আবার ভয় পেলেন পরেশ, ঠোঁটের কোণে ফেনা কেন? সাপ কামড়ায়নি তো? টর্চের আলোয় তিনি ছেলের শরীরে আতিপাতি করে খুঁজতে লাগলেন দু’টো দাঁতের ক্ষতচিহ্ন। নাঃ! কোত্থাও নেই। নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। ওদিকে দুটো লোক দৌড়ে গিয়ে নদীর জলে গামছা ভিজিয়ে নিয়ে এল। ভিজে সপসপে গামছা নিংড়ে জল ফেলা হল মহেশের চোখে মুখে। কিন্তু জ্ঞান ফেরার কোনও লক্ষণই নেই। অবশেষে পালোয়ান সইফুদ্দিন চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে চলল মহেশের অসাড় শরীরটা।

অনেক রাত অবধি জ্ঞান ফিরল না মহেশের, কপালে ভাঁজ পড়ল বাড়ির লোকজনদের। এমনিতেই গ্রাম-গঞ্জে সহজে ডাক্তার পাওয়া যায় না, তার জন্য যেতে হয় চাকদহ শহরের দিকে। পরেশ ভট্টাচার্যের ছোট ভাই অজয় ওই রাতেই সাইকেল নিয়ে বের হল শহর থেকে ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসতে। শক্ত কাঠের মত বিছানার এক কোণে পড়ে আছে মহেশ, কোনো মতে চলছে শ্বাস-প্রশ্বাস। এলাকার কিছু লোক তখনও বসে আছে পরেশ ভট্টাচার্যের বাড়ির দাওয়ায়। সকলের ঔৎসুক্য, ছেলেটার জ্ঞান কখন ফিরবে !

এতক্ষণ কিচ্ছুটি বলেনি বিহারী, কিন্তু এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। গলা খাঁকারি দিয়ে পরেশের উদ্দেশে সে বলল,

—“তা ও পরেশ, একবার রামচরণ মুখুটিকে ডেকে আনলে হয় না? আমার কিন্তু লক্ষণ মোটে ভালো ঠেকছে না, বুড়ো বিবির থান থেকে তোর ব্যাটাকে পাওয়া গেছে, ও যে মহা অভিশপ্ত জায়গা!”

বুড়ো বিহারী দাদার কথাটা শুনে চোখ সরু করে পরেশ একবার তাকালে তার দিকে। কথাটা বিহারী খুড়ো মন্দ বলেননি। তবে মুখুটি মশায়েরও তো বিস্তর বয়েস হয়েছে, তিনি কি আর আগের মত আছেন?

এই রামচরণ মুখুটি হলেন এই গ্রামের একমাত্র কবিরাজ, কবিরেজ বিদ্যের সঙ্গে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য আছে জ্যোতিষ শাস্ত্রে। আজ থেকে বছর চারেক আগেও তিনি অব্যর্থ চিকিৎসা করতে পারতেন যে কোনও রোগের। আর করতে পারতেন নির্ভুল কুষ্টি বিচার। কিন্তু এখন দু’চোখে চালশে পড়ায় কাজকম্ম ছেড়ে দিয়েছেন। স্বপাক আহার করে এই নিঃসন্তান, বিপত্নিক মানুষটার কোনো রকমে দিন চলে যায়। পরেশের কাছে বহুদিন আগে একটা আর্জি নিয়ে এসেছিলেন এই বৃদ্ধ মানুষটি। পরেশের জ্যাঠামশাই এর আমলের একটা গোপন পুঁথি নাকি আছে এ বাড়িতেই, সেটা তাঁর চাই। কোনো এক তান্ত্রিকের লেখা পুঁথি সেটি, যার মধ্যে অনেক গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে। কথাটা পরেশ হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিন, কারণ অমন কোনো পুঁথি থাকলে তার সন্ধান অবশ্যই দিয়ে যেতেন তাঁর জ্যাঠামশাই। কিছুটা মনক্ষুণ্ণ হয়েই সেদিন এ বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন মুখুটি মশাই, আর আসেননি।

আজ বিপদে পড়ে তাঁর শরণ নিতে কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকছিল পরেশের। তবুও বিহারীর পীড়াপীড়িতেই তাঁকে বাধ্য হয়ে এসে দাঁড়াতে হল রামচরণ মুখুটির দরজায়। এত রাতেও কেরোসিনের কূপি জ্বলছে মুখুটি মশাইয়ের ঘরে, বাইরে থেকে বেশ আঁচ করা যাচ্ছে সেটা। তার মানে তিনি জেগেই আছেন। পরেশ এগিয়ে গিয়ে হাঁক দিলেন,

—“মুখুটি মশাই আছেন নাকি?” কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না। আবার একটু গলা চড়িয়েই দ্বিতীয় হাঁক দিলেন পরেশ,

—“বলি মুখুটি মশাই বাড়ি আছেন নাকি?”

এবার ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলা শোনা গেল ভিতর থেকে

—“কে ডাকে, কী চাই এত রাতে?”

—“আজ্ঞে আমি পরেশ ভটচায, বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি জ্যাঠা।”

দরজা খুলে দাঁড়ালেন রামচরণ মুখুটি, এক সময়ের গৌড় বারেন্দ্র ভূমির দাপুটে ব্রাহ্মণ বিজয়শরণ মুখুটির একমাত্র বংশধর। তারপর পরেশের উদ্দেশে জিগ্যেস করলেন,

—“পুঁথিটা পেয়েছো নাকি?”

পরেশ মাথা নামিয়ে উত্তর দিলেন,

—“আজ্ঞে না জ্যাঠামশাই, ও আমি কখনো খুঁজেই দেখিনি। আপনার আজও মনে আছে সে পুঁথির কথা, জেনে আশ্চর্য হচ্ছি। কিন্তু আমি আজ এসেছি অন্য কারণে, আমার ভয়ানক বিপদ, আমার একমাত্র সন্তান আজ সন্ধ্যার সময় খেলতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, অবশেষে তাকে উদ্ধার করেছি বুড়ো বিবির থানের থেকে… জ্যাঠামশাই, সেই থেকে তার জ্ঞান নেই।”

রামচরণ মুখুটি কিছু একটা বললেন বিড়বিড় করে তারপর বললেন,

—“চলো তো দেখি কী হয়েছে”

দরজাটা সপাটে বন্ধ করলেন তিনি তারপর একটা বেতের লাঠিতে ভর দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলেন বাড়ির বাইরে। পরেশের সঙ্গে হেঁটে তাঁদের বাড়ির দিকে যেতে যেতে আনমনা ভাবেই বলে উঠলেন

—“তবে লক্ষ্মণ সেনের আমলের পুঁথি যতক্ষণ তোমাদের পরিবারের সঙ্গে আছে, বুড়ো বিবির শাপ তোমাদের গায়ে লাগবে না।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%