মনীষ মুখোপাধ্যায়
—“বারো রাশির কোথায় কোন গ্রহ বসে আছে আমাকে এক এক করে বলে যাও।” ঈষৎ মাথা নুইয়ে জলচৌকিতে বসে থাকা মুখুটি মশাই বললেন কথাটা।
পরেশ বলতে শুরু করলেন— “এক) লং আর কেতু, দুই) বুধ, তিন) কিছু নেই, চার) বৃহস্পতি, পাঁচ) শনি ও মঙ্গল, ছয়) চাঁদ, সাত) রাহু, আট) শুক্র ও রবি। বাকী নয়, দশ, এগারো ও বারো নম্বর ঘর ফাঁকা।”
একটু গলা খাঁকারি দিয়ে রামচরণ মুখুটি আবার জিগ্যেস করলেন,
—“তা হ্যাঁ বাপ, লং এর জায়গায় আর কিছু লেখা আছে? কোন লং? লং এর মানে জানো তো বাপ? ওর মানে হল লগ্ন। সুজ্জি তোর ব্যাটার জম্মের সময় যেখানে বসেছিল সেটাই তার লগন। তা তোমার ছেলের লগনটা কী?”
—“লগ্নের পাশে লেখা আছে বৃষ।” দৃপ্ত কন্ঠে জবাব দিলেন পরেশ।
—“অর্থাৎ তোমার পুত্রের রাশি হল তুলা।”
—“হ্যাঁ তাই, কিন্তু আপনি কী করে জানলেন? এখানে তো তাই লেখা আছে।” ভারি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন পরেশ।
—“আহা তুমিই তো বললে, লগ্ন বৃষ আর ছয় নম্বর ঘরে বসে আছে চাঁদ। চাঁদ যেখানে বসে সেটাই তার রাশি বলে বিবেচিত হয়।”
জ্যোতিষশাস্ত্রের এসব কূটকচালি মাথায় ঢুকছিল না পরেশের, সে সরাসরি প্রশ্ন করল মুখুটি মশাইকে
—“আমার ছেলে বাঁচবে কিনা বলুন।”
মুখুটি মশাই মনে মনে কিসব বিড়বিড় করে আওড়ালেন, তারপর বললেন, অষ্টমপতি বৃহস্পতি অত্যন্ত শুভ গ্রহ সে বসে আছে কেন্দ্রে। লক্ষণ খুব ভালো এবং তা সিংহে, মিত্র ক্ষেত্রে রয়েছে সুতরাং মৃত্যু যোগ নেই। তবে লগ্নে কেতু ও পঞ্চমে শনি মঙ্গলের যোগ, সামনে খুব বিপদ। পঞ্চম ভাব হচ্ছে মন মানসিকতার ঘর, সেই ঘর পীড়িত থাকলে মনের উপর দিয়ে অনেক ঝড়-জল যায়। সেই পঞ্চম ভাবেই দেখা যাচ্ছে নাশযোগ।
—“আচ্ছা তোমার ছেলের দশা অন্তরদশা কী চলছে বলো তো?” প্রশ্ন করলেন রামচরণ মুখুটি।
জন্ম কোষ্ঠির এক জায়গায় খুব বড় বড় করে লেখা আছে ভোগ্যদশা নামক একটি কথা। সেখানে লেখা আছে— জাতক স্বাতী নক্ষত্রে রাহুর ভোগ্যদশায় জন্মগ্রহণ করেছে। জন্ম সময় থেকে পরের পর লেখা আছে কত বছর বয়সে কোন দশা চলবে জাতকের। পরপর ওই দশা অন্তরদশার সরণীতে আঙুল বোলাতে বোলাতে পরেশ নামতে লাগলেন নীচের দিকে। এক জায়গায় এসে থেমে গেল তাঁর আঙুল, সেইখানে লেখা আছে তেরো বছর এক মাস নয় দিন হইতে উক্ত দশা চলিবে এক বছর এক মাস কুড়ি দিন ব্যাপী। যা দেখলেন পরেশ তাই জানালেন বৃদ্ধ মুখুটি মশাইকে। মুখুটি মশাই আবার জিগ্যেস করলেন,
—“ওর সোজাসুজি কোন দশা কোন অন্তরদশার কথা বলা হয়েছে?” একটু ভালো করে দেখে পরেশ উত্তর দিলেন,
—“দশার স্থানে লেখা আছে রাহু আর অন্তরদশার স্থানে মঙ্গল।”
কথাটা শুনে একটুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন রামচরণ, তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“রাহুর ভোগ্য দশার একেবারে শেষ পর্যায় পৌঁছেছে তোমার ছেলে, আগত সময়ে মৃত্যুভয় রয়েছে ঠিকই কিন্তু সে বেঁচে যাবে। শনি তাকে বাঁচিয়ে দেবে। বৃহস্পতি শুভ থাকায় কোনো এক সিদ্ধপুরুষ এসে তাকে উদ্ধার করবে।” থেমে গেলেন তিনি। যেন কিছু মেলানোর চেষ্টা করছেন মনে মনে।
—“কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে মহেশের মাথায় ঝুলছে ঘোর অশনি।” কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই পরেশের দিকে তাকালেন বৃদ্ধ মুখুটি মশাই। জিগ্যেস করলেন,
—“এমন মনে হওয়ার হেতু?”
আর কিছু লুকোলেন না পরেশ, ভোর রাতে যে স্বপ্ন দেখেছেন আর তারপরেই হঠাৎ ঘুম ভাঙার পর যা যা দেখেছেন বিস্তারিত ভাবে জানলেন রামচরণ মুখুটিকে।
যেন স্বগতোক্তির মতই রামচরণ মুখুটির মুখে থেকে বেরিয়ে এল কথাটা,
—“বুড়ো বিবি জেগে উঠেছেন তা হলে।” পরেশ যেন কথাটা শুনে ভয়ে পেলেন সামান্য। ঢোক গিললেন তিনি। ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছেন তিনি বুড়ো বিবি কোনো সাধারণ দেবী নন, গ্রামের মানুষজন তাঁর থানে যেতে ভয় পায়। পরেশের নিজের জ্যাঠামশায় প্রায়ই বলতেন, বুড়ো বিবির ক্ষুধা নাকি মেটে না কিছুতেই। তিনি সভয়ে প্রশ্ন করলেন রামচরণ মুখুটিকে,
—“জ্যাঠামশাই এবার কী হবে?”
মাথা নত করে বসে রইলেন রামচরণ। এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর নিজেরও জানা নেই। তাও যদি পুঁথিটা পাওয়া যেত। তিনি মাথা নত করে বসে আছেন দেখে পরেশ আবার প্রশ্ন করলেন,
—“জ্যাঠা মশাই ওই থানের সম্পর্কে আরো কিছু জানেন আপনি? কারণ কাল রাতে আমার মনে হয়েছে গঙ্গারাম ডাকাত আর হরিসাধনের ঘটনা আপনি সম্পূর্ণ ভাবে শেষ করেননি।”
“তুমি ঠিকই ধরেছো বাবা,” একটু থেমে আবার বলতে লাগলেন রামচরণ মুখুটি।
—“উচাটনের যে অভিসম্পাত দিয়ে হরিসাধন প্রাণ দিয়েছিল, তা কার্যকরী হল এর মাস কয়েক পর। কলিকাতা শহর থেকে ফিরে এসে হরিসাধনের ভাই জানতে পারল তার দাদাকে গঙ্গারাম ডাকাত বলি দিয়ে দিয়েছে। এই হরিসাধনের ভাই রাজেশ্বর ছিল দারুণ মেজাজী মানুষ। চুনোট করা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, আতরে ভুরভুর সুবাস উড়িয়ে একটা ঘোড়াগাড়ি চড়ে সে সব সময় যাওয়া আসা করত। কিন্তু এসবই ছিল তার ভেক। আসলে সে ছিল নামকরা তন্ত্র সাধক। দাদার এমন পরিণতি তাকে পাগল করে তুলল। তন্ত্র সাধক হলেও তার ছিল নিম্ন মানের সিদ্ধি। হংসী যক্ষিণী নামের এক ভয়ানক যক্ষিণী ছিল তার দাসী। শ্মশানসাধনা করে একলক্ষ বার জপ করে সে এই যক্ষিণীর সিদ্ধি পেয়েছিল । সে সেই যক্ষিণীকে কঠিন মন্ত্রবলে ডেকে আনল। ভীষণ চেহারায় প্রকট হলেন সেই ভয়াবহ যক্ষিণী, যেন কারো রক্তপান করাই সেই পিশাচীর একমাত্র লক্ষ্য। রাজেশ্বর তাঁকে আদেশ করল, সে যেন গঙ্গারাম ডাকাত আর তার দলবলকে বিনাশ করে দেয় সমূলে। কিন্তু যক্ষিণী সেরাত্রেই ফিরে এল খালি হাতে।
স্বপ্নাদেশে যক্ষিণী তাকে জানান দিল, গঙ্গারাম আর তার দলবল শতকোটি নরবলি দিয়ে এক শক্তিধর কবচের অধিকারী হয়েছে। শতকোটি অর্থে এক্ষেত্রে একশোটা মানব শরীর। শ্মশানকালিকা দেবী এই ডাকাতকূলের কোনও ক্ষতি হতে দেবেন না। তাই যক্ষিণী, রক্ষিণী, ডাকিনী, পিশাচিনী তাদের কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না, তাই দরকার আরো শক্তিশালী কোনো বিদ্যার, নচেৎ গঙ্গারামের মৃত্যু অনিশ্চিত।
পরদিন খুব ভোরে উঠে রাজেশ্বর কলকাতার উদ্দেশে গমন করলে। কলকাতাও তখন এখনকার মতন এত ঝাঁচকচকে শহর ছিল না। আজকের চৌরঙ্গী অঞ্চল তখন ছিল বনে জঙ্গলে ভরা। কলকাতা গিয়ে রাজেশ্বর দেখা করল কালীঘাটের এক প্রসিদ্ধ তান্ত্রিকের সঙ্গে। এই কালীঘাট এখনকার মতন ভক্ত এবং পাণ্ডাদের ভিড়ে গমগম করত না, সেখানে যেতে তখন মানুষ ভয় পেত। কালীঘাটের আনাচে-কানাচে দেখা মিলত ভয়াবহ অঘোরী আর কাপালিক সাধুদের। যাঁরা বিনা বাক্যব্যয়ে নরহত্যা করে মা কালীর উদ্দেশে নৈবেদ্য নিবেদন করতেন, তাঁদের কাছে কুমারী কী আর শিশুই বা কী? যাকে পারতেন হাঁড়িকাঠে তুলে দিতেন।
কালীঘাটের প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক, রাজেশ্বরকে একটা বুদ্ধি বাতলে দিল, যাতে সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবে না। উচাটন আর বিদ্বেষণের প্রধান দেবী হলেন দশমহাবিদ্যার সপ্তম বিদ্যা মাতা ধূমাবতী। রাজেশ্বর যেন তাঁর আরাধনা করে, সেই আরাধনায় দেবী তুষ্ট হলে ফলবে অনাকাঙ্খিত ফল। গঙ্গারাম ডাকাত মরবে না এতে, কিন্তু সে উন্মাদ হয়ে উঠবে আর অতি সহজেই গোরা পুলিশ বাহিনীর জালে পড়বে সে, তারপর জেলে ঢুকে সে ভোগ করবে নরকতুল্য শাস্তি।
তান্ত্রিকের এই বিধান মনে ধরল রাজেশ্বরের, সে তান্ত্রিককে সুধালো সাধনার উপায়। তান্ত্রিক তাকে একটা পাথরের ওপর খোদাই করা মা ধূমাবতীর মূর্তি দিয়ে বলল, সেটা যেন সে একটা মন্দির নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠা করে। রাজেশ্বরকে তান্ত্রিক শিখিয়ে দিল ধূমাবতীর বীজমন্ত্র, যে মন্ত্রে শত্রুবিজয় নিশ্চিত। একটা ছাইরঙা বস্ত্র পরিধান করে উত্তরমুখে বসে রুদ্রাক্ষমালায় এক লক্ষ পঁচিশ হাজার জপে মন্ত্র সিদ্ধ হবে, এবং সাধক হয়ে উঠবে অপ্রতিরোদ্ধ। দেবীর উদ্দেশে সূরা নৈবেদ্য হিসেবে দিতে হবে এবং প্রসাদ মনে করে সাধককে তা গ্রহণ করতে হবে,এই হল উপাচার। আর যদি সত্যিই মন্ত্র সিদ্ধি হয় রাজেশ্বরের, তা হলে তার শত্রু গঙ্গারাম ডাকাতের গঙ্গা প্রাপ্তির ভাগ্যও হবে না।
রাজেশ্বর লোক-লস্কর লাগিয়ে দ্রুতনির্মাণ করে ফেলল একটা মন্দির। সে মন্দির দৈর্ঘে প্রস্থে খুব বড় নয়। ইঁট, চুন, সুঁড়কির গাথনিতে দশফুট দৈর্ঘ্য, দশফুট প্রস্থের সে মন্দিরের চালায় তৈরি হল বিরাট এক গম্বুজ। মন্দিরের ভেতর সোনার আসনে বসানো হল মায়ের সেই মূর্তি। যে মূর্তির অক্ষিকোটরে শোভা পেত বেশ দামী দুটো বৈদূর্য মণি। সেই মণি থেকে নির্গত হত আশ্চর্য এক দ্যুতি, সেই দ্যুতি এতই প্রবল ছিল যে তার ছটা ছড়িয়ে পড়ত মন্দিরের বাইরেও।
প্রতি রাতেই মদের নৈবেদ্য সাজিয়ে রাজেশ্বর বসে সিদ্ধি প্রাপ্তির উদ্দেশে, কিন্তু বিফল হয় সে। কলকাতা থেকে পালকিতে করে সে তান্ত্রিককে ডাকিয়ে আনল, কিন্তু তান্ত্রিক কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না, সিদ্ধি পাওয়ায় বিলম্বের কারণ।
—ওই যে বললাম,” রামচরণ মুখুটি একটু থেমে গলা ঝেড়ে আবার বলতে লাগলেন,
—“কলকাতার কালীক্ষেত্র কালীঘাটের তান্ত্রিকরা বেশির ভাগই ছিলেন নরমাংসলোভী। তাঁরা সাধনায় অসফল হয়েছেন কি হননি রোষ গিয়ে পড়ত সোজা সাধারণ মানুষের উপর। কালীঘাটের সেই তান্ত্রিকরা বিধান দিলেন যে, সুদূর কামরূপ থেকে বয়ে আনা এ মূর্তির সাধন-ভজন, সিদ্ধিলাভ অত সহজ না, দেবীকে তুষ্ট করার জন্য প্রয়োজন বলি।
এন্তার গরু, মহিষ, ছাগল বলি দিয়ে যখন কাজ হল না, এক প্রাচীন নৃশংস পথ অবলম্বন করল সে। ধরে আনা হতে লাগল কুমারী মেয়েদের, তারপর তাদের হত্যা করে রক্তে ভিজিয়ে দেওয়া হতে লাগল দেবীর বেদি। এতেও শান্তি হল না তাদের, অবশেষে কুমারী মেয়েদের যোনি কেটে, তা রেখে দিয়ে, নদীর চরে পুঁতে দেওয়া হতে লাগল তাদের শরীর। পূজার নামে শুরু হল ঘোর অরাজকতা।
তান্ত্রিক এক সময় ফিরে গেল তার সাধনপীঠে। অর্থাৎ এরপর যা করতে হবে, তা একাই করতে হবে রাজেশ্বরকে। সে একাই শুরু করল নির্মম উপাসনা। কুমারী তুলে আনার ভার পড়ল একদল লেঠেলের ওপর, তারা জঙ্গলের একপ্রান্তে অতি সন্তর্পণে দাঁড়িয়ে খোঁজ করত শিকারের। একলা কাউকে পেলেই তুলে এনে মন্দিরের দোরে ফেলে দিত তারা, রাজেশ্বর একের পর এক বলি দিত তাদের মায়ের নামে। সে কী করছে এ খেয়ালও তার থাকত না, মদের নেশায় এতটাই চুর থাকত সে।
অবশেষে এল সেই দিন। ঘোর অমাবস্যায় রাজেশ্বর আঁটল এক ঘৃণ্য ফন্দি, ঠিক করল সে বলি দেবে নীলমাধবের বংশের কোনো নারীকে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, তার লেঠেল বাহিনী গিয়ে ধরে আনল নীলমাধবের মেয়েকে। সে মেয়ে ততদিনে গঙ্গারাম ডাকাতের সাহায্য পেয়ে বিয়ে করে ঘরকন্যা করছে। মেয়েটা ছিল অন্ত:স্বত্ত্বা। বুঝেই হোক বা না বুঝে, রাজেশ্বর তার খাস জল্লাদ রঘুবীরকে মেয়েটাকে বলি দেওয়ার নির্দেশ দিল। যেই মেয়েটার কাটা মাথা মাটি ছুঁলো অমনি বজ্রাঘাতে মারা পড়ল জল্লাদ, পাথরের মধ্যে থেকে স্বয়ং প্রকট হলে মা ধূমাবতী। গলা টিপে রাজেশ্বরের জীবনের আলো নিভিয়ে দিলেন তিনি। এ ঘোর অনাচার বোধহয় দেবীও আর সহ্য করতে পারছিলেন না।
সকালে নীলমাধব মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে খুঁজে পেল মেয়ের মুণ্ডহীন শরীর আর মৃত রাজেশ্বরকে। মেয়ের শোকে সে পাথর হয়ে গেল। কিছু দিনের মধ্যে গ্রামে দেখা দিল ভয়াবহ প্লেগ রোগ। যে রোগকে সে সময় ‘কানউঠা’ বলা হত। তা সেই মারণ রোগ এতটাই প্রভাব বিস্তার করল, যে গ্রামের পর গ্রাম ফাঁকা হয়ে যেতে লাগল।”
একটুক্ষণ থেমে কি যেন ভেবে নিলেন বৃদ্ধ রামচরণ মুখুটি, এতক্ষণ একটানা কথা বলে বোধ হয় তিনি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু পরেশের যেন আর তর সইছে না, তিনি একটু ইতস্তত করে মুখুটি মশাইয়ের উদ্দেশে জিগ্যেস করলেন,
—“তারপর কী হল জ্যাঠামশাই?” তামার একটি ছোট ঘটি থেকে সামান্য জল গড়িয়ে খেলেন, যাতে শুকনো গলাটা কিছুটা ভেজে, আবার একটু সময় নিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন
—“ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কত্তারা এ গাঁয়ে মেডিকেল টিম পাঠালে প্লেগ দমনের জন্যে, কিন্তু সে এমনই বেয়ারা রোগ, গোরা সাহেবরাও তার কবলে পড়তে লাগলেন। সাহেবরা একটু সংস্কারাচ্ছন্ন জাত, তারাও যেন কেমন মানতে শুরু করলেন, ‘দ্য কার্স অফ উইডো গডেস’। গাঁয়ের মানুষ দল বেঁধে ধূমাবতীর মন্দিরে পুজো দিল, যে মন্দির তৈরি করেছিল রাজেশ্বর।”
সেই সময় গ্রামে এলেন এক সাধু। কৌপিন পরা ভীষণ দর্শন সেই সাধু হাতে ত্রিশূল নিয়ে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের সামনে। গাঁয়ের মানুষ তাঁর পায়ে গিয়ে পড়লে, ‘রক্ষা কর হে গুরুদেব রক্ষা কর’। গ্রামের মানুষজনের মুখ দেখে সাধুর বোধহয় মায়া হল। তিনি বললেন,
—“পাপাচারে এই পবিত্র মূর্তি কলুষিত হয়েছে, এর সংস্কার প্রয়োজন।”
মন্দিরের সামনে একটা বেদি তৈরি করে তন্ত্রমতে ষোড়শপচারে পুজো করলেন তিনি। তিনদিন ধরে টানা যজ্ঞ হল। তোমার জ্যাঠার তখন হয়েছে সে মারণ রোগ, তার বয়স তখন নয় কি দশ। বেদির থেকে এক বিন্দু ছাই চিমটা দিয়ে তুলে তোমার ঠাকুমাকে তিনি দিয়ে বললেন,
—“মা, এটা তোর ছেলেকে খাইয়ে দে।”
যেন অব্যর্থ ওষুধ পেটে পড়ল তোমার জ্যাঠার। ওষুধ পেটে যাওয়া মাত্রই সে সুস্থ হয়ে উঠল। সাধুর ক্ষমতা বলে গ্রাম থেকে চিরতরে বিদায় নিল প্লেগ।
তিনি চলে যাওয়ার সময় একখানি লাল কাপড়ে মোড়া পুঁথি তোমার জ্যাঠার হাতে দিয়ে বলে গেলেন, “আজ থেকে একশো বছর পর দেবী আবার জেগে উঠবেন, তুলা রাশির কোনো জাতক, যে কিনা তোমারই বংশের কেউ হবে সেই প্রথম দেবীর দেখা পাবে। দেবীর ক্রোধ এখনও ঠান্ডা হয়নি, মরেনি তাঁর সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। সেই সময় যে এই মন্দির নির্মাণ করেছে তার বংশ নাশ হবে দেবীর প্রকোপে, এই পুঁথিতে লেখা আছে এক সর্বত্যাগী তান্ত্রিকের গোপন কথা, তার জীবনের সংগ্রাম। সেই সময় এই পুঁথি পাঠ করে এর মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করলে দেবীর রোষ থেকে মুক্তি মিলবে। এতেই লেখা আছে মুক্তির উপায়।” এইটুকু বলে গ্রাম থেকে চিরকালের মতন চলে গেলেন তিনি।
উচাটন কার্যে সামান্য সফল হয়েছিল বোধ হয় রাজেশ্বর। সাহেব পুলিশবাহিনী এর কিছুদিনের মধ্যেই ধরে ফেলে ডাকাত গঙ্গারামকে। সে তখন কেমন যেন উন্মাদের মত আচরণ করছিল। গঙ্গায় প্রবল বান আসে এর কিছু বছর পর। ডুবে যায় মা ধূমাবতীর মন্দির। একমাস পর জল নামতেই দেখা গেল এক অলৌকিক ঘটনা। পুরো মন্দিরটা চরার মাটির তলায় চলে গেছে শুধু মাথা তুলে রয়েছে মন্দিরের মাথায় যে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছিল সেটা। আর দেবীর মূর্তি জলের স্রোতে ভেসে যায়নি, তা আটকে রয়েছে গম্বুজের গায়ে। এই ঘটনার পর গ্রামের মানুষ ভয়ে সে তল্লাটে যাওয়া বন্ধ করে দিল। গ্রামের জেলেরা কেবল মাছ ধরার পর দূর থেকে শোল মাছ পুড়িয়ে ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়ে আসত সেখান থেকে। এরপর সাপের অত্যাচারে আরো সেদিক মাড়ানো বন্ধ করল গ্রামবাসী।
কাহিনি শেষ করে পরেশের দিকে উদাস চোখে তাকালেন রামচরণ মুখুটি। তারপর বললেন,
—“এতসব ঘটনা আমি তোমার জ্যাঠামশাইয়ের কাছেই শুনেছি।”
পরেশ উদভ্রান্তের মত তাকেলেন মুখুটি মশাইয়ের দিকে। তারপর বললেন,
—“তার মানে আমার ছেলেকে বাঁচাতে গেলে সবার আগে আমায় খুঁজে বার করতে হবে সেই পুঁথি।”
ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ মুখুটি মশাই। পরেশ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন মুখুটি মশাই এর ভিটে থেকে। তাঁর এখন অনেক কাজ বাকী, তাঁকে জানতেই হবে কী লেখা আছে সেই পুঁথিতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন