১৮

মনীষ মুখোপাধ্যায়

চাকদহ শ্মশান, ২০০০ সাল

গভীর মনোযোগ নিয়ে সাধনায় বসেছে শঙ্খ। পরেশ তাকে নিজের স্বপ্নের কথাটা বলেছেন, সেই স্বপ্ন যেখানে একজন সাধু এসে ছজনের গলা কেটে দিচ্ছে। শঙ্খ জানে এই ইঙ্গিত সাউ বংশনাশের ইঙ্গিত। অনন্যাকে যে তুলে নিয়ে গেছে সে কী করতে চায়, তাও শঙ্খ জানে।

গঙ্গার ফুরফুরে হাওয়ায় বড় আরাম হচ্ছে শঙ্খের। শ্মশানটা এখন খুব ফাঁকা। আজ অশ্লেষা নক্ষত্রের উদয় হয়েছে আকাশে, আজ শয়তানদের মহা আনন্দের দিন। আজ অপক্রিয়া বড় সহজেই হবে। কিন্তু গুরু অমর ভট্টাচার্যের আশীর্বাদে শঙ্খ তা কিছুতেই হতে দেবে না।

এই মুহূর্তে কাছে পিঠে কোনো চিতা না জ্বললেও কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে শঙ্খের। একটা তাপ এসে গায় লাগছে। অদূরে দুটো লোক আধ-পোড়া মড়ার মাংসগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে! শঙ্খের বুঝতে অসুবিধা হল না ওরা কারা। এই শ্মশানে অঘোরি কোথায়? ওরা যে ডামর।

একবারের জন্য তিনি এলেই এ সাধনা সফল হয়। শঙ্খ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি না এলে মূর্তি আর পুঁথির ধাঁধা থেকে বেরোনো সম্ভব হবে না। তাঁর মৃত্যু নেই, তিনি কালাকালের ঊর্ধ্বে। যজ্ঞ করার জন্য শঙ্খ সামনে জ্বালিয়েছে একটা আগুন। তার থেকে কাঠ ফাটার একটা ফট্ ফট্ শব্দ হচ্ছে। মা ধূমাবতীর দ্বিতীয় যন্ত্রটা, যেটা শুধু সাধনার জন্যই ব্যবহার করতে হবে বলে পুঁথিতে আঁকা ছিল, সেই যন্ত্রটা শঙ্খ বড় যত্ন করে এঁকেছে আলতা দিয়ে। লেখনী হিসেবে ব্যবহার করেছে লাল চন্দন কাঠ। কালীর বন্দনা, আবাহন ইত্যাদি ক্রিয়া করে এখন সে মন দিয়েছে এই গুহ্যাতিগুহ্য ধূমাবতী সাধনায়।

ওই লোকটাকে সে কিছুতেই জিততে দেবে না। শঙ্খ আন্দাজ করতে পারছে, লোকটা অনন্যাকে তুলে নিয়ে গেছে বলি দেওয়ার জন্য। লোকটা পুঁথি সম্পর্কে জানে। সেই লোকটা দেবসেনাপতি ভট্টসূর্যের বলে যাওয়া বিদ্বেষণের পথটা বেছে নিয়েছে । যেখানে বলির কথা বলা হয়েছে। যেই অভিচার ক্রিয়া করলে সাউ বংশের প্রত্যেকটা লোক নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লড়াই করেই মরবে। তার জন্য লোকটা সাউ বংশের একটি বাচ্চা মেয়েকেই মায়ের বলি হিসেবে বেছে নিয়েছে।

“ওঁ ধূং ধূং ধূমাবতী স্বাহাঃ।। ওঁ ধূং ধূং ধূমাবতী স্বাহাঃ।।” নিরলস ভাবে শঙ্খ পড়ে চলেছে মন্ত্র। কঙ্কালী দাদা তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল মন্ত্রটা।

বেশ কয়েকটা মিশমিশে কালো কুকুর এসে ঘিরে ধরল তাকে। কুকুরগুলোর হাঁ মুখের ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে রক্তমাখা লাল টকটকে জিভ। আর্তনাদ করছে কুকুরগুলো, শ্মশানের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ছত্রখান করছে তাদের মেঘের মত গর্জন। একই সঙ্গে অতগুলো কুকুর বীভৎস শব্দ করছে—‘গরররর...গরররর...’ কী ভয়ানক, কী পাশবিক। বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।

শঙ্খ ভ্রুক্ষেপ না করে একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে তাদের দিকে ছুঁড়ে দিল।নিমেষে সব উধাও, কোথায় কুকুর? কোথায় কী? একযোগে একটা বিশ্রী কান্নার শব্দ ভেসে আসতে লাগল—“আঁআআআ...আঁআআআ...”

কতগুলো লাল আগুনের শিখা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না শঙ্খ। শিখাগুলো ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। একটু যেন কেমন করে উঠল শঙ্খের ভেতরটা। এরা কারা?

তন্ত্র সাধনার নিয়ম হচ্ছে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে সাধনায় বসতে হয়। শঙ্খ সে নিয়মের অন্যথা করে না কখনই। এই কারণে বহুবার প্রাণ বেঁচেছে তার। এই আলোর শিখাগুলো, বড় খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেসব প্রেত এই সংসারের মায়া কাটিয়ে অন্যত্র যেতে পারে না, তারা এই শ্মশানেই থেকে যায়। সর্বভুক এই অসূচি আত্মাদের কাছে জীবিত মৃত বলে কিছুই নেই। যাদের ভেতর প্রাণ আছে তাদের এরা ভুলিয়ে শ্মশানে নিয়ে আসে তার পর হাড় মাংস ভেঙে গুঁড়িয়ে আনন্দ করে খায়। মানুষ থেকে পশু সবাই এদের শিকার।

গণ্ডি ভেদ করে ওই আলোক শিখারা প্রবেশ করতে পারছে না। বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হাহুতাশ করছে তারা, আর শোনা যাচ্ছে সেই বিশ্রী কান্নার শব্দ। গণ্ডির ভেতর একটি কাঠের পাটাতনের সঙ্গে একটা বেশ বড় কালো পাঁঠা বাঁধা আছে। জপ সংখ্যা একলক্ষ পঁচিশ হাজার পার করলেই,ছাগলটাকে বলি দিতে হবে। ছাগলটা এতক্ষণ ওই আলোর শিখাগুলো দেখে ভয়ে মাটির সঙ্গে সিঁটিয়ে বসেছিল। গণ্ডীতে বাঁধা পেয়ে আলোগুলো মিলিয়ে যেতেই তে আবার ছটফট শুরু করল। তার ম্যাঁ...ম্যাঁ...ডাকে মুখরিত হতে লাগল শ্মশান। ভাগ্যিস এই শ্মশানটা পরিত্যক্ত, না হলে এত শোরগোলে বিরাট বিপত্তিতে পড়তে হত।

রুদ্রাক্ষের মালাটা শেষবারের মত ঘুরল শঙ্খের হাতে। অর্থাৎ একলক্ষ পঁচিশ হাজার জপ শেষ। একটা বেশ চক্চকে ইস্পাতের খড়্গ তুলেনিল শঙ্খ। পাটাতনটার পাশে এসে দাঁড়ালো। সে জীবহত্যার বিরোধী, কিন্তু যে দেবীর যা উপাচার। সদা সর্বদা ক্ষুধার্ত দেবী ধূমাবতী এই ভোগেই প্রীত হবেন। পাঁঠাটা বোধ হয় বুঝতে পারল, তার সময় হয়ে এসেছে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে চাইল সে। তার করুণ ম্যাঁ...ম্যাঁ..., ডাক যাতে নিজের কানে এসে না পৌঁছায় সেই কারণে শঙ্খ গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—“ওঁ ধূং ধূং ধূমাবতী স্বাহা।।”

হাওয়ার থেকেও দ্রুত গতিতে নেমে এল খড়্গ টা। পাঁঠার মুন্ডুটা তীরের বেগে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে পড়ল যন্ত্রটার ঠিক মধ্যিখানে। শঙ্খ মাথা তুলেই তাঁকে দেখতে পেল। একশো দুই বছর পর তিনি আবার ফিরে এসেছেন। এসে দাঁড়িয়েছেন শঙ্খের সামনে। একটা কালো নোংরা কৌপিন তাঁর লজ্জাকে ঢেকে রেখেছে। যদিও তিনি যে মার্গের সাধক, তাতে লজ্জা ঢাকার প্রয়োজন হয় না। হাতে একটা বিশাল ত্রিশূল নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন যন্ত্রের ডানদিকে। মহাত্মাদের গণ্ডি দিয়ে আটকে রাখা যায় না।

সাধু গমগমে গলার স্বরে নির্দেশ দিলেন—“প্রত্যঙ্গীরার প্রয়োগ করো।”

শঙ্খ শব্দ করে মন্ত্র বলে উঠল,

—“ওঁ প্রত্যঙ্গিরায়ৈ নমঃ।। প্রত্যঙ্গিরে সকল সত্ত্বানি সাধয় সাধয় মম রক্ষাং কুরু কুরু সর্ব্বান্ শত্রূন্ খাদয় খাদয় মারয় মারয় ঘাতয় ঘাতয় ওঁ হ্রীং ফট স্বাহা।” একবার নয় বারবার বলতে লাগল একই মন্ত্র।

যজ্ঞের নিভে আসা আগুন থেকে হঠাৎ উঠে এলো বিকট দর্শন নারীমূর্তি। মুখটা সিংহের মত আর শরীরটা সুন্দর ভাবে সজ্জিত কোনও নারীর। বিকট শব্দ করতে করতে সে ডুমুরদহ চরের দিকে চলে গেল, যেখানে আছে সেই গম্বুজ, বুড়োবিবির থান।

সাধু এবার নির্দেশ দিলেন,

“এবার মাকে আহবান করো।”

ভূতসুদ্ধি, করসুদ্ধি, আসনসুদ্ধির পর দেবীকে কল্পনা করে দেবীর যন্ত্রের উপর তাঁর আবাহন চিন্তা করে শঙ্খ, ফুল আর নৈবেদ্য দিতে লাগল, সেই ক্রিয়া শেষ হওয়ার পর একটি লোহার পাত্রে মদ ঢেলে যন্ত্রের ঠিক মাঝে রাখল সেটা শঙ্খ।

হঠাৎ আকাশ ছেয়ে গেল হাজার হাজার কাকে। তাদের কা কা শব্দে সাধুর কোনও নির্দেশই শোনা যাচ্ছে না। প্রবল ঝোড়ো হাওয়ায় উলোট-পালট হতে লাগল চারদিক। চোখ তুলে তাকাতেই প্রায় আঁতকে উঠল শঙ্খ। ইনি কে! সাদা অতি নোংরা কাপড় পরা এক নারী মূর্তি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সাদা রুক্ষ চুলে জটা ধরে গেছে, চোখে অত্যধিক পাশবিকতা, তাঁর এক হাতে কুলো ধরা। মুখের মধ্যে ভাঙা দাঁত উঁকি দিচ্ছে, গায়ের রঙ ধূসর। প্রবল আক্রোশে ফুঁসছেন তিনি।

সাধুর নির্দেশ এল,

“ওঁকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করো।‘

শঙ্খ ভক্তিভরে নৈবেদ্য তাঁর দিকে এগিয়ে দিল। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল তাঁকে। কিছুটা যেন শান্ত হলেন দেবী। একটি হাত তুলে তিনি অভয় মূদ্রা দান করলেন। তারপর অতি যত্নে বলি দেয়া ছাগটি শঙ্খ দেবীকে নিবেদন করল। অনন্ত ক্ষুধা যেন দেবীর, নিমেষে শেষ করে ফেললেন সে নৈবেদ্য।

দেবীর গলা শোনা গেল এবার

—“সাধক আমি তোমার সাধনায় তৃপ্ত, তুমি আমাকে লোভের বশবর্তী হয়ে আরাধনা করনি। কারো প্রতি অন্যায় করে তুমি আমার বলি প্রদান করনি, তুমি ছাগবলি দিতেও মনে কষ্ট পাইয়াছো। তোমার নির্বাণ লাভ হবে। তুমি কী চাও, সাধক?”

শঙ্খ বলে উঠল,

—“বারবার পাপাচার, অভিচারকে প্রশ্রয় দিতেই আপনাকে ডাকা হয়েছে। আপনি মা মহামায়া। এই পাপাচার থেকে আমি আপনাকে মুক্ত করতে চাই। আপনি আপনার সন্তানদের ক্ষমা করুন।”

শঙ্খের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তথাস্তু বলে অন্তর্হিত হলেন দেবী। ধড়ে প্রাণ এলো শঙ্খের। আর কেউ প্রাণ হারাবে না দেবীর প্রকোপে, বেঁচে যাবে সাউ পরিবার। সাধুর দিকে ফিরে তাকালো শঙ্খ। তারপর মিষ্টি হেসে বলল,

—“নিন আপনার আত্মারও এবার মুক্তি লাভ হবে দেবশঙ্কর বর্মা। প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে আপনাদের পাওয়া সেই মূর্তি, পরে যখন এক কাপালিকের কাছে চলে যায়, আপনার আত্মা, আত্মা জগতের এক পুণ্যস্তর ভেদ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। আপনাদের মত মহাত্মার শক্তি বেশি থাকায় আপনি আপনার শিষ্য সেবকদের ভেতর বিলিয়ে দেয়া সেই পুঁথিটি খুঁজে বার করেন। তারপর একশো দুই বছর আগে যখন আপনার আনা মূর্তির কারণে এই গ্রামে মহামারি লাগে আপনিই এসে তাঁদের উদ্ধার করেন। পুঁথিটি তখন সৎ ব্রাহ্মণ আদিনাথ ভট্টাচার্যকে দিয়ে যান, যিনি দেবসেনাপতির বংশধর। আপনি অপেক্ষা করতে থাকেন এমন একজন সাধকের যে এসে এই মূর্তির সৎগতি করবে, ওই পুঁথিটি পড়ে। আজ এই একশ দুই বছর পর আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হল। কিন্তু ওই পুঁথি পড়ে এক দূর্বৃত্ত তার প্রতিশোধ নিতে চাইবে এটা আপনি বোঝেননি! যাক, আপনারই নির্দেশে আমি প্রত্যঙ্গিরা জাগিয়েছি এবং তার বিনাশের উদ্দেশে পাঠিয়েছি, যদিও আমার এই প্রয়োগে তার জীবনহানী হবে না।”

সাধু হাসলেন তারপর মিলিয়ে গেলেন হাওয়ায়।

অপরদিকে ডুমুরদহ চরে বেশ কিছুক্ষণ আগে...

একটা বাচ্চাকে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে একটা হাতে আঁকা যন্ত্রের ঠিক মাঝখানে। বাচ্চাটা ছটফট করছে, তার চোখের কোল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মাতা ধূমাবতীর এই ক্রিয়াযন্ত্রের মাঝে আজ এই কুমারীকে বলি দিতে পারলেই নেওয়া হবে প্রতিশোধের মত প্রতিশোধ। মহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা মাত্র।

গম্বুজের মধ্যেকার দেবীর বৈদূর্যমণির চোখ চকচক করছে। আহা কী দারুণ আনন্দ। এই বলি মা গ্রহণ করলেই সুঁড়ি পরিবারের আর কেউ বেঁচে থাকবে না। আহ্... একটা আত্মতুষ্টির শব্দ করল সে।

চিৎকার করে সে বলে ইউঠল,

“ওঁ ধূং ধূং ধূমাবতী স্বাহা...।”

সে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল বাচ্চাটার দিকে। বাচ্চাটার স্কুলের ইউনিফর্মটা খুলিয়ে একটা লালপেড়ে শাড়ি পরানো হয়েছে তাকে। মাথায় লেপে দেয়া হয়েছে তেল-সিঁদুরের ফোঁটা। সে এতদিন ধরে মায়ের মন্ত্রশক্তিকে জিইয়ে রেখেছে। লোকে ভাবে ওই পোড়া শোল মাছগুলো জেলেরা দেয়, ভুল ভাবে সবাই। এই ভেটটুকু না দিলে যে মা এই এতদিন ধরে তার সঙ্গে থাকত না। তার অভিচার ক্রিয়ার ফলে মারা গেছে রাজেশ্বর সুঁড়ির ছেলেরা, বৌয়েরা এবার তাদের ছেলে বৌদের পালা।

সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

“নে মা আমার শেষ বলি গ্রহণ কর মা।”

আকাশের দিকে তাকালো সে, ওই তো সিংহ রাশির উদয় হয়েছে। নাক্ষত্রিক যোগ অশ্লেষা পার করে মঘায় প্রবেশ করছে। এই তো এই তো... এই সময়ের জন্যই তো সে অপেক্ষা করছিল। কত টোপ দিয়ে মেয়েটাকে তুলে এনেছে সে। মিথ্যে বলেছে, তোমার জ্যাঠা খুব অসুস্থ, এক্ষুণি তোমায় দেখতে চাইছেন। আর বোকা বাচ্চা মেয়েটা তার সঙ্গে অমনি চলে এসেছে।

শান দেয়া খাঁড়াটা দুহাতে শক্ত করে ধরল সে। ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এলো বাচ্চাটার দিকে। খাঁড়াটা তুলে ‘জয় মা’ বলে একটা পৈশাচিক চিৎকার করে উঠল সে। অমনি ঝোপের ভেতর থেকে অম্লান লাফিয়ে পড়ল তার উপর। সুকন্যা দৌড়ে গিয়ে অনন্যাকে চক্রের ভেতর থেকে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। কোনো এক দৈববলে যেন অনন্যা আটকে গেছে যন্ত্রটার সঙ্গে।

সেই লোকটার মধ্যে তখন আসুরিক শক্তি ভর করেছে যেন। একহাতে খাঁড়াটা ধরে অন্য হাতে অম্লানকে শূন্যে তুলে এমন ভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে, যেন একটা কাঠের পুতুলকে ছুঁড়ে ফেলল। সুকন্যা চিৎকার করে উঠল

—“ভাইইইই।”

ডান পায়ে গুরুতর চোট পেল অম্লান, যেন আর কখনো উঠেই দাঁড়াতে পারবে না।

সেই লোকটা বীভৎস চিৎকারে বলে উঠল

—“আজকের এই তিথি বারবার আসে না, মূর্খ...,আমি আজ আমার প্রতিশোধ নেবই।”

ঝোপের ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এলেন পরেশ ভট্টাচার্য, কী করবেন ভেবে পেলেন না। খড়্গ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে দেখে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন।

শুধু মুখ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের গোঙানির মত একটা নাম বেরিয়ে এলো

—“বিহারী খুড়ো... তুমি?’’

হঠাৎ চরের পরিবেশ যেন কেমন বদলে যেতে লাগল। একটা ঘোর কালো অন্ধকার ঝড় উঠল চরাচর কাঁপিয়ে। তার প্রবল দাপটে নদীর জল উত্তাল হয়ে উঠল। যেন এক্ষুনি বান ডাকবে। ভাসিয়ে নেবে সব কিছু। মেঘের ডাকের মত একটা প্রবল গর্জন শোনা গেল।

মাটিতে পড়ে থাকা অম্লান, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুকন্যা আর পরেশ, এমনকি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা অসহায় অনন্যা অবধি কেঁপে উঠল একটা জিনিস দেখে। এত বীভৎস জিনিস তারা আগে কখনও দেখেনি। ঝড়ের বেগের মধ্যে এগিয়ে আসছে এক নারী মূর্তি, যার মাথাটা সিংহের আর শরীরটা নারীর। প্রবল আক্রোশে সে চেপে ধরল বিহারীর হাত দুটো, তারপর মড়মড় শব্দ করে সে দুটো ভেঙে দিল।

ঝড় যেমন উঠেছিল সে ভাবেই যেন মিলিয়ে গেল মুহূর্তে। মাটিতে পড়ে কাটা পাঁঠার মত ছটফট করতে লাগল বিহারী।

পরেশ এগিয়ে গেলেন তার দিকে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে বিহারীকে, না হলে যন্ত্রণায় প্রাণ হারাবে লোকটা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%