২০

মনীষ মুখোপাধ্যায়

হরিদ্বার, ২০১৮ সাল


—“শক্তি বাবা আপনার একটা টেলিফোন এসেছে আমার মোবাইলে।”

হরিদ্বারের গঙ্গার ঘাটের আরতী দেখছিলেন শক্তি তান্ত্রিক। এই আরতী দেখতে বেশ ভাল লাগে। মনটা কেমন অন্যরকমের ভাল হয়ে যায়। তাঁর নিজের চালচুলো নেই, এই দুহাজার আঠেরো তে দাঁড়িয়ে নিজের একটা মোবাইল ফোন পর্যন্ত নেই। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো দু এক জনের কাছে আছে সেই আধুনিক যন্ত্র। তাদের মধ্যেই একজন এই কৃষ্ণ ঘোষ। কৃষ্ণের নম্বরটা কলকাতার অনেক পরিচিত জনকেই সে দিয়ে রেখেছে যাতে আপদে বিপদে তাঁর সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ করতে পারেন।

মুঠোফোনটা কৃষ্ণের হাত থেকে নিয়ে কানে চেপে ধরলেন শক্তি তান্ত্রিক। ওপাশ থেকে ভেসে এল একটা মেয়েলি কণ্ঠ।

—“হ্যালো, শঙ্খ আঙ্কেল? আমি... অনন্যা বলছি... শ্রীলা সাউয়ের মেয়ে... অনন্যা...”

—“হ্যাঁ বলো।”

—“চিনতে পারছেন তো? মা মাঝে মাঝেই আপনার কাছে যায়।”

—“হ্যাঁ চিনতে পারছি। কেমন আছো তোমরা?”

—আমরা ভালো আছি আঙ্কেল... আমি কালই বেঙ্গালুরু থেকে এসেছি... এসে শুনছি... বাড়িতে!”

—“কী হয়েছে বাড়িতে? হ্যালো... হ্যালো... অনন্যা শুনতে পাচ্ছ? কী হয়েছে বাড়িতে?”

—“মা আপনাকে বলতে বলল, বাবা এই কয়েকদিন ধরে কেমন কেমন করছে... সারাক্ষণ শুধু বলছে— রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছ?”

লাইনটা কট্ শব্দ করে কেটে গেল।

আঠেরো বছর আগেকার সব কথা যেন এক ঝটকায় মনে পড়ে গেল শঙ্খশুভ্রের... ওহ্ এখন তো সে আদ্যপান্ত শক্তি তান্ত্রিক। কিন্তু অতীত যেন এক ঝটকায় ফিরে এলো আবার। সে আর কঙ্কালী দাদা মিলে কামাখ্যা যাওয়ার ট্রেনে উঠে বসেছিল। টিকিটের ব্যবস্থা করেছিলেন সাউ পরিবারের লোকেরাই। কুমারেশ সাউ তখন বেশ সুস্থ। কঙ্কালী দাদাকে সঙ্গে নেওয়ার কারণ ছিল, কঙ্কালী দাদাই বলেছিল, যজ্ঞ ও হোম ছাড়া মূর্তিটাকে অভিষেক ও পুনর্বার স্থাপন করা একটু শক্ত হবে।

তারা কামাখ্যায় পৌঁছে দেখেছিল সেখানে মেলা ভিড়। ওই ভিড়ের মধ্যেও তারা কামাখ্যা মন্দিরের অদূরে পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ধূমাবতীর মন্দিরটি খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু বাধ সাধল ওই চরম ভিড় আর পান্ডাদের নিষেধাজ্ঞা, ধূমাবতীর ওই মন্দিরে তাঁরা যজ্ঞ করার অধিকার কাউকে দিতে চান না। মূর্তিটি তাঁরা ফেরত নিয়ে বলেছিল, তাঁদের নিয়মেই তাঁরা সেটা প্রতিষ্ঠা করে নেবেন। ফিরে এসেছিল সে আর কঙ্কালী দাদা।

মূর্তি নিশ্চয়ই সঠিক নিয়মে প্রতিষ্ঠা পায় নি। অথবা কোনও ভুল ত্রুটি হয়ে গিয়ে থাকবে। না হলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। বিহারির পরিবারে কোনও প্রতিশোধের সুপ্ত বীজ এখনও লুকিয়ে আছে নিশ্চয়ই! তাকে খুঁজে বার করতে হবে। মহীতোষ কেন এমন করছে দেখতে হবে আর খুঁজে বার করতে হবে কঙ্কালী দাদাকে। ঈশ্বরই জানেন সে বেঁচে আছে কিনা? নিজেকেই প্রশ্নটা করল শঙ্খ।

তারপর অঞ্জলী ভরে গঙ্গাজল তুলে নিজের মাথায় দিল। আগে তো একবার কলকাতা যাওয়া যাক তারপর দেখা যাবে সমস্যা কোথায়? কলকাতা গেলেই দৈবের নির্দেশ সে পাবে।

কৃষ্ণর উদ্দেশে বেশ গলা চড়িয়েই সে বলে উঠল—“চলো কলকাতা ফেরার সময় হয়েছে।”

অধ্যায় ২০ / ২০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%