১৭

মনীষ মুখোপাধ্যায়

গঙ্গারাম ডাকাত, নীলমাধব, হরিসাধন সুঁড়ি, রাজেশ্বর সুঁড়ি, তান্ত্রিক, সাধু সব কথাই বেশ মন দিয়ে শুনল শঙ্খ। রামচরণ মুখুটিও শঙ্খের আগমনে বেশ আনন্দিত। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস এই সাধকের আসার ফলে গ্রামের সব শাপ, পাপ, তাপ দূর হবে।

গল্প শেষ করে ব্যগ্র চোখে তাকালেন রামচরণ শঙ্খের দিকে, তারপর জিগ্যেস করলেন

—“কী বুঝলেন ঠাকুর মশাই?” লজ্জিত হাসল শঙ্খ। তারপর বলল,

“আমায় দয়া করে ঠাকুর মশাই বলবেন না।”

মুখুটি মশাইও হাসলেন।

শঙ্খ বলতে শুরু করল,

“আপনার এ গল্প, গল্প হিসেবে ভালো হলেও কিছু গোলমাল খুঁজে পাচ্ছি যেন।”

মুখে হাসিটি একই রকম রেখে মুখুটি মশাই বললেন, “যেমন?”

শঙ্খ একটু যেন তৈরি হয়ে নিল, তারপর বলল, “যেমন ধরুন সময়কাল। প্লেগ বাংলাদেশে মহামারির আকার নেয় ১৮৯৬-৯৮ সালে। একশো বছর আগের অন্তত দুই থেকে চার বছর আগে। আর দ্বিতীয় বিষয় হল, ওই সময় আপনার বা আপনি যার নাম বলছেন বিহারী নাকি, তাদের কারোরই জন্ম হওয়ার কথা না।”

হাসলেন মুখুটি মশাই, তারপর বললেন,

“ঠিকই ধরেছেন আপনি। ওই সময় আমাদের কারোরই জন্ম হয়নি। পরেশের জ্যাঠার কাছে শোনা গল্পই আমরা সকলের কাছে করি, আর যাতে এই গল্প আসল মনে হয় তাই আমি বা বিহারী বলি ওই ডাকাত বা সাধুকে আমরা দেখেছি।”

“আরেকটা জিনিস সম্ভবত আপনারা লুকিয়ে যান, তা হল, পরেশ বাবুর জ্যাঠা আদিনাথ ভট্টাচার্য মশাই নিজেও একজন তন্ত্র সাধক ছিলেন। আর তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন আপনারা দুইজন। আপনি আর বিহারী। যদিও এটা আমার অনুমান মাত্র।” থামল শঙ্খ।

মুখুটি মশাই তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,

“আপনার অনুমান কিছুটা ঠিক... আমি ওঁর শিষ্য ছিলাম বটে, কিন্তু বিহারির কথা বলতে পারব না। আয়ুর্বেদ আর জ্যোতিষ শাস্ত্রে ছিল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। তন্ত্রে তিনি এক এবং অদ্বিতীয়ম ছিলেন। তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ বড় গর্বের ছিল। তবে বুড়োবিবির রহস্য তিনি সমাধান করতে অক্ষম ছিলেন, আর এই পুঁথি তিনি আমাদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।” কথাগুলো বলে মুখুটি মশাইকে অনেকটা বিধ্বস্ত দেখাল।

শঙ্খ বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল,

“আমার তা মনে হয় না! তিনি সে রহস্য সমাধান করেন, এবং কোনো এক অযোগ্য শিষ্যকে তার পথ বলে দিয়ে যান। এই শিষ্য পরে কোনো উদ্দেশ্য সাধন করতে মা ধূমাবতীর ভয়াবহ ক্রিয়াগুলি করে।”

মুখুটি মশাই বেশ রাগত স্বরেই বললেন,

“এমন ভাবার কারণ?”

“কারণ বড় সোজা, মুখুটি মশাই।” হাসল শঙ্খ, তারপর আবার বলল,

“আপনার গল্পকে যদি মেনে নিই, সাধু বলেছিলেন, একশো বছর পর দেবী জেগে উঠবেন, তাঁর ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়নি, তিনি সুঁড়ি বংশকে নাশ করবেন। ওদিকে প্রায় প্রত্যেক প্রজন্মেই দেখা গেছে ওই বংশে কারো না কারোর ভয়াবহ মৃত্যু হয়েছে! এটা তো হওয়ার কথা ছিল না মুখুটি মশাই, তন্ত্রের অপক্রিয়া ছাড়া।”

“আর কথা বাড়াবেন না, আপনি এই মুহূর্তে বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে।” প্রায় গর্জে উঠলেন রামচরণ মুখুটি।

হাসতে হাসতে শঙ্খ বলল,

“মনে রাখবেন, মা ধূমাবতী আজ রাতেই ধূম্রজাল বিস্তার করবেন, বাঁচতে পারবেন তো তা থেকে।”

পরেশ ভট্টাচার্যের দিকে একবার তাচ্ছিল্যের চোখে তাকালেন রামচরণ মুখুটি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%