১৯

মনীষ মুখোপাধ্যায়

মারা যায়নি বিহারী। পরেশের তৎপরতায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। জয়নন্দন তার বাবু কুমারেশের থেকে একটা ভাল শিক্ষা পেয়েছিল, অপরকে সাহায্য করার শিক্ষা। সুকন্যাও মত দিয়েছিল এ ব্যাপারে, যে আপাতত বিহারীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হোক। অসহায়ের সাহায্য করাই মানবধর্ম। একটু আগে যে লোকটা পশুর মত হত্যা করতে গিয়েছিল সুকন্যার ছোট বোনকে, সে পশুর ক্ষতি চাইতে মন সায় দিল না।

এখন বেলা দশটা। একটু আগেই বিহারীকে বাড়ি আনা হয়েছে। এখন তার জ্ঞানও আছে। তার খাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রামচরণ মুখুটি, পরেশ ভট্টাচার্য। বিহারীর বাড়ির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল শঙ্খ আর সুকন্যা। ওরা কলকাতা ফিরে যায়নি। অনন্যাকে নিয়ে অম্লান সক্কাল সক্কাল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে কলকাতার উদ্দেশে। ওরা বেলার ট্রেন ধরে ফিরবে। কিছু প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে ফেরা যাবে না।

সুকন্যাকে দেখে চোখের কোণ সিক্ত হল বিহারীর। এই মেয়েটাও তো সেই সুঁড়িদেরই মেয়ে। কাল এই মেয়েটা সহযোগিতা না করলে সে কি আর বাঁচত? ফুঁপিয়ে উঠল বিহারী। রামচরণ মুখুটি মাথায় হাত রাখলেন বিহারীর, সমবেদনা জানিয়ে বললেন, “যে পাপ তুমি করেছ তার যথেষ্ট শাস্তি ঈশ্বর তোমাকে দিয়েছেন, এখন কেঁদো না।”

বিহারী বলতে শুরু করল,

“অনেক পাপ আমি করেছি। নীলমাধব দাস ছিল আমার জ্যাঠা, সুঁড়িদের অত্যাচারে আমাদের পরিবারটা ছারখার হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবাও দাদার পরিবারের শোক নিতে পারেননি, আমি তখন মায়ের পেটে, বাবা মারা যান। মা আমাকে জন্ম দিয়েই মারা যান কিছুদিনের মধ্যে। আমি বড় হয়ে উঠতে থাকি অবহেলা, অনাহারের মধ্যে। বড় হওয়ার পর আমার জীবনে একটাই উদ্দেশ্য প্রধান হয়ে দাঁড়ালো, সুঁড়ি বংশের বিনাশ। আমি শিষ্য হলাম আদিনাথ ভট্টাচার্যের, তাঁর সেবা করতে করতে সেই গোপন পুঁথির কথা জানতে পারলাম, যে পুঁথিতে মা ধূমাবতীকে জাগিয়ে তুলে, বিদ্বেষণ, উচাটন ক্রিয়া করে কারো বংশকে শেষ করে দেওয়া যায়।

আমি ওই পুঁথি গুরু আদিনাথের কাছ থেকে একবারের জন্য দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, ওতেই অভীষ্ট সিদ্ধি হয়েছিল আমার। মায়ের গম্বুজ মন্দিরে রোজ শোলমাছ পুড়িয়ে দিয়ে আসতে লাগলাম, ক্রিয়া করতে লাগলাম। কলকাতায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে এলাম, কোথায় থাকে সুঁড়িদের বংশধরেরা। অভিচার ক্রিয়া করলাম, উচাটনের দ্বারা উন্মাদ করে দিলাম রাজেশ্বরের ছেলেদের, বৌয়েদের। এরপর সময় মত আমার ইচ্ছায় এই ক্রিয়া আমি করতাম। মৃত্যুর আগে সবাই উচাটনের কারণে উন্মাদ হয়ে যেত, আর ভয়াবহ এক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আমার জ্যাঠা নীলমাধবের মেয়েকে বলি দিয়েছিল রাজেশ্বর, সেই কারণেই তার বংশের একটি মেয়েকে মায়ের উদ্দেশে বলি দিয়ে আমি প্রতিশোধের এ আগুনে শেষ আহুতি দিতে চেয়েছিলাম। আমাকে নুটু পাগলি দেখে ফেলেছিল সাধনা করতে তাই আগে ওর চোখ উপড়ে নিয়েছিলাম তারপর ওকে মেরেছি। কিন্তু আমি পাপী তাই ঈশ্বর আমাকে যথেষ্ট শাস্তি দিয়েছেন, আজ আমি সারা জীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেলাম, তাও এই বৃদ্ধ বয়সে এসে।” হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল বিহারী।

শঙ্খ বলে উঠল,

“যে পাপ আপনি করেছেন তার শাস্তি হাজতবাস, কাউকে হত্যা করার চেষ্টা এবং ঠান্ডা মাথায় কাউকে হত্যা করা একটা বড় ধরণের অপরাধ। যাইহোক ঈশ্বর স্বয়ং যাকে শাস্তি দিয়েছেন, তাকে আর কষ্ট দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। সকলে ভালো থাকবেন...। দশটা কুড়ির ট্রেনটা হয়ত পেয়ে যাব। আমরা এখন আসি। আর হ্যাঁ, আমি গম্বুজের উপর থেকে দেবী মূর্তিটা সঙ্গে নিলাম, ওটাকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিতে হবে। আশা করি এখানে আর কারো ক্ষতি হবে না।”

ঘর থেকে বেরিয়ে এল শঙ্খ আর সুকন্যা। পিছন পিছন পরেশ।

পরেশ কিছুদূর এগিয়ে এলেন ওদের সঙ্গে। খেয়াঘাট অবধি ওদের ছেড়ে দিলেন তিনি। তারপর পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললেন,

“আবার আসবেন ঠাকুর মশাই।”

মিষ্টি হাসল সুকন্যা। একদৃষ্টে সে চেয়ে আছে শঙ্খের দিকে। শঙ্খ তার চোখের ভাষা বুঝতে পারছে। সুকন্যা তাকে প্রশ্ন করল,

“আচ্ছা আপনার আসলেই কি কোনো ক্ষমতা আছে? আপনি ফারুকের ব্যাপারটা জানলেন কী করে? আর যদি সত্যিই আপনি মনের কথা বুঝতে পারেন, বলুন তো আমার এখন কী মনে হচ্ছে?”

স্টেশনের দিকে যাওয়ার জন্য একটা রিক্সা ডাকল শঙ্খ, তারপর তাতে উঠে উত্তর দিল

—“মানুষের মস্তিষ্ক... কনসাস আর সাবকনসাস মাইন্ডের খেলা অবিরত চলছে... এছাড়াও রয়েছে সুপার কনসাস আর কালেক্টিভ কনসাস মাইন্ড। কেউ যদি নিজের ভেতরটাকে সম্পূর্ণ চিন্তা শূন্য পর্যায় নিয়ে যেতে পারে, তাহলে ওই কালেক্টিভ কনসাস মাইন্ডের খেলায় অন্যের চিন্তাকে সহজেই পড়ে ফেলা যায়। এতে তন্ত্র মন্ত্র ভুজুং-ভাজুং কিচ্ছু নেই। এছাড়াও আছে কসমিক কনসাস মাইন্ড, যার সাহায্যে সাধুরা একই সঙ্গে অনেকের মনের কথা পড়তে পারেন। ইহা বিশুদ্ধ বিজ্ঞান। আর কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলছে, আমরা প্রত্যেকটা স্বত্বা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যাই হোক... আমি ক্লাস সিক্স পাশ, বেশি জ্ঞান দিয়ে ফেললাম, আর এই মুহূর্তে আপনার ভেতর কী চলছে জানার জন্য নিজেকে চিন্তা শূন্য পর্যায় নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। আপনার চোখই বলে দিচ্ছে আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু এটাও সত্যি আমার প্রেম করার অধিকার নেই, আমি বিরজা হোম করে সংসার বন্ধন মুক্ত হয়েছি। আমি কোনও সম্পর্কের জালে জড়াতে চাই না।‘

কথাটা শোনার পর বেশ আহত দেখালো, সুকন্যাকে। নিজেকে গুটিয়ে নিল সে, তারপর বলল,

“মোটেই আপনার প্রেমে পড়িনি। নিজেকে কী ভাবেন আপনি।”

শঙ্খ হেসে উত্তর দিল—“শক্তি তান্ত্রিক... আর, প্রেমে না পড়াই ভালো আমার।”

“এবার আপনি কোথায় যাবেন, ওই মূর্তিটা নিয়ে?” ছোট্ট প্রশ্ন করল সুকন্যা।

শঙ্খ উত্তর দিল,

“আপাতত কলকাতা, তারপর যদি আপনার বাবা বা কাকা আমাকে টিকিট কেটে দেন তো, যাব কামরূপ কামাখ্যা। এই মূর্তি যেখান থেকে এসেছে ফিরিয়ে দিতে হবে সেখানে।”

রিক্সা থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে এগিয়ে গেল টিকিটি কাউন্টারের দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%