মনীষ মুখোপাধ্যায়

কলকাতা, ২০০০ সাল

কলকাতা শহরের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে যেই না এই নতুন শতাব্দী পড়েছে অমনি মানুষ দৌড় শুরু করেছে একে অপরকে টপকে যাওয়ার আর তার ফলস্বরূপ পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস। তবে এতে করে লাভের লাভই হয়েছে কুমারেশ সাউ এর। আগে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতা মিলিয়ে দুটো মাত্র মদের দোকানের মালিক ছিলেন তিনি। সপ্তাহে বিক্রিবাটাও কম ছিল। যাদের মদ খাওয়ার রোজকার নেশা আছে একমাত্র তারাই এসে দাঁড়াত প্রত্যহ, সন্ধে হলেই গ্রিলের গেটের এপাশ থেকে ওপাশে চলে যেত—পাঁ ইট অথবা নিপ। সারা সপ্তাহে হয়ত পাঁচ কি ছ’হাজারের ব্যবসা হত এক একটা দোকানে। এই ওয়াইটুকে যেই না পৃথিবীর মাটি ছুঁল, অমনি বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার।

ওই লাভের টাকায় শহরের ঘিঞ্জি এলাকা ছেড়ে একটু তফাতে, তবে শহরের মধ্যেই একটা বার কাম রেস্তোরাঁ খুলে বসেছেন কুমারেশ সাউ। সন্ধে হলেই অফিস ফেরত বাবুরা অফিসের দশটা-পাঁচটার অবসাদ দূর করতে ঢুকে পড়েন কুমারেশ সাউ এর বারে। বারের নামটিও বেশ সুন্দর রেখেছেন তিনি। বারের নাম— আশিয়ানা। কুমারেশ আর মহীতোষ ভাল ভাবেই চালাচ্ছেন তাঁদের পূর্বপুরুষের মদের ব্যবসাটা। দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরাট ভাব-ভালবাসা। অন্য পরিবারে দেখা যায় দুই জা’য় মুখ দেখাদেখি বন্ধ, কিন্তু সাউ বাড়ির গৃহলক্ষ্মীদের মধ্যে সে ঝামেলা নেই।

উত্তর কলকাতার মদের দোকানটা দেখে মহীতোষ আর দক্ষিণেরটার ভার কুমারেশের কাঁধে। কুমারেশের সন্তান বলতে, এক মেয়ে যে থাকে নিউ জার্সিতে। সেখানে সে পড়াশোনা করতে গেছে স্কলারশিপ পেয়ে। আর মহীতোষের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে অম্লান বড়, সে এখন কলেজে পড়ছে ইংরাজিতে অনার্স নিয়ে। আর মহীতোষের মেয়ের সবে ক্লাস ফাইভ, ভীষণ দুষ্টু সে। যেমন দুষ্টু সে তেমনই ভালো ছবি আঁকার হাত। এরই মধ্যে দুটো ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশনে বসে, একটায় সেকেন্ড আর একটায় ফোর্থ হয়েছে সে। যদিও প্যাস্টেল আর ওয়াটার কালারের বাইরে এখনও সে দৌড় শুরু করেনি।

মোটমাট এই বাজারে সুখী পরিবারই বলা চলে সাউ পরিবারকে। মহীতোষের মেয়ে অনন্যা তার জ্যাঠা, জেঠিমার মেয়েকে কাছে না পাওয়ার দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। কুমারেশ আর তাঁর স্ত্রী, অনন্যা বলতে পাগল। কুমারেশ অনন্যাকে আদর করে ডাকে ছোড়দিভাই। ছোড়দিভাই কী খাবে, কী পরবে, কী সাজবে, সেই চিন্তায় সারাদিন অস্থির থাকেন তিনি। নিজের মেয়ে নিউ জার্সি থেকে ফোন করে মজা করে বলে, “এখন আমার কথা আর ভাববে কেন বল বাপি, এখন তো ছোড়দিভাইকে পেয়ে গেছ।” কর্ডলেস ফোনটা জেঠুর কান থেকে নিয়ে অনন্যাও হিংসের সুরে বলে, “এই দিদিয়া, জ্যাজ্যা আমাকে বেশি ভালোবাসে, তুই একদম হিংসে করবি না আমার সঙ্গে, এখানেও আসবি না আর। ওখানে সাহেব বিয়ে করে থাক তুই।” এই কথা শুনে একচোট খুব হাসেন কুমারেশ। ওপার থেকে মেয়ে ধমক দিয়ে বলে, “বাপি তুমি হাসছ? দিন দিন পাকা বুড়ি হচ্ছে মেয়েটা। হ্যাঁ দাও দাও আরও লাই দাও ওকে।” ছোড়দিভাই এর জ্বর এলে, জেঠু জেঠিমাও সারা রাত জেগে বসে থাকেন। যেন বহুদিন পর মৃত মাকেই খুঁজে পেয়েছেন কুমারেশ।

সম্প্রতি কুমারেশ সাউ চেষ্টা করছেন রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে। সে চেষ্টায় সারাদিন দৌড়-ঝাঁপ চলছে তাঁর। বিরোধী দলের একটা ভালো পদ পাবেন সেই আশায় জনসেবার ত্রুটি করছেন না তিনি। অনেক তো অর্থ রোজগার হল, এবার একটু সেবা করা যাক গরিব দুঃখীদের, সেই আশায় বুক বেঁধে ময়দানে নেমে পড়েছেন তিনি। বাড়িতে সারাদিন নানা মানুষের ভিড় লেগে রয়েছে। মুক্ত হস্তে টাকা বিলোচ্ছেন তিনি। বিচক্ষণ ব্যবসাদার কুমারেশ জানেন, টাকা না ছড়ালে কিচ্ছু হয় না এযুগে। টাকা ছড়ানোর ফলে তাঁর হাত দিনদিন শক্ত হচ্ছে। মুক্ত হস্তে দানের ফলে যে উপকারটা হয়েছে তা হল, বেশ শক্ত সমর্থ কিছু ছেলেদের একটা দল তৈরি হয়েছে, যারা কুমারেশের কথায় ওঠে বসে। বার বা মদের দোকানে কোনও ঝামেলা হলেও, এই বাহিনী গিয়েই পরিত্রাতার ভূমিকা পালন করে। এই শক্তির কারণেই হয়ত রাজনৈতিক দলের লোকেরাও তাঁকে আজকাল একটু বেশিই সমীহ করে চলছে।

শুক্রবার রাত আটটা থেকে কুমারেশ একটু আসরে বসেন। মদ তিনি খান ঠিকই, কিন্তু আজ অবধি তাঁকে কেউ মেজাজ হারাতে বা মাতলামি করতে দেখেনি। সারাদিন পার্টির কাজে প্রচণ্ড দৌড়-ঝাঁপ গেছে। শরীর বেশ ক্লান্ত। একটু আগেই পার্টির এক নেতার সঙ্গে মিটিং সেরে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। স্নান, পুজো সেরে, ব্ল্যাক লেবেল, সোডা,জল আর গ্লাস সাজিয়ে বসেছেন সবে। ছোট বৌমা আজকাল আর ভাশুর ঠাকুরকে শুধু মদ খেতে দেয় না, কিছু না কিছু রান্না করে দেয় শুক্রবার এলেই। প্লেটের ঢাকা সরাতেই আনন্দে চকচক করে উঠল কুমারেশের চোখ। বৌমা আজ কাবাব রান্না করে রেখেছে তাঁর জন্য। এই পরিবার পেয়ে সত্যিই তিনি সুখী বোধ করেন ভেতর ভেতর। একটা কাবাব তুলে মুখে দিলেন তিনি। আহ্, আরামে চোখ বুঝে এল তাঁর, কী অপূর্ব স্বাদ, মনে মনে বললেন তিনি। বহুদিনের চাকর দয়াল প্রথম পেগটা বানিয়ে নিজের কাজে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। সে আবার ফিরবে ঠিক আধঘন্টা বাদে। কুমারেশ দয়ালকে বললেন,

—“দরজা বাইরে থেকে ভিজিয়ে দিয়ে যাস।”

বন্ধঘর, দামি সিডিপ্লেয়ারে গজলের সুরের মিঠে তাল ঘরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবলচি মাতিয়ে দিচ্ছেন সুরের প্রত্যেকটা বিভাজিকাকে। চোখ বন্ধ করে গান শুনতে শুনতে গ্লাসে হালকা হালকা চুমুক দিচ্ছেন কুমারেশ। গরমের কারণে এসি চালানো হয়েছে। ঘরের তাপমাত্রায় বেশ একটা হিম হিম ভাব।

হঠাৎ প্রচণ্ড গরম লাগতে শুরু করল কুমারেশের। তিনি ভাবলেন রক্তে মদ মেশার কারণেই বোধ হয় এটা হচ্ছে। তিনি পাত্তা না দিয়ে চুমুক দিলেন গ্লাসে। এসির তাপমাত্রা আঠারো ডিগ্রিতে আছে, গরম লাগার কথা না তবুও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যেন। যেন ঘরে কোনও হাওয়া চলছে না। কুমারেশের মনে হল চোখ খুললেই তিনি দেখতে পাবেন ঘোর অন্ধকার। কেমন অজানা একটা ভয় গ্রাস করল তাঁকে। বন্ধ চোখের পর্দায় হঠাৎ ভেসে উঠল একটা ছবি। একটা গলা কাটা মেয়ে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে, তার মুণ্ডুহীন শরীরটা অবিরত কাঁপছে। মেয়েটির পাশে ওটা কে দাঁড়িয়ে আছে! মেয়েটা পাশে নিজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয় আরও বেড়ে গেল কুমারেশের। দুটো কালো, জীর্ণ, খয়াটে হাত তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কুমারেশের, ওঃ... আর পারছেন না তিনি। চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলেন।

দৌড়ে ঘরে ঢুকল দয়াল, পেছন পেছন ভাইয়ের বৌ শ্রীলা। কুমারেশের স্ত্রী বিশেষ কারণে বাপের বাড়ি গিয়েছেন।

শ্রীলা প্রশ্ন করল, “কী হল দাদা? শরীর খারাপ করছে?”

মাথা নাড়লেন কুমারেশ, জানাতে চাইলেন তিনি ঠিকই আছেন।

এইটুকু সময় চোখ বুঝে কোনও দুঃস্বপ্ন দেখা সম্ভব না, আর মাত্র তিন চুমুকেই আজ অবধি নেশা হয়নি কুমারেশের। তা হলে এসব কী দেখলেন তিনি?

যে তাঁর গলা টিপতে আসছিল, ওঃ ভয়ঙ্কর দেখতে তাকে। শরীরে হাড় ছাড়া আর কিছুই নেই, তাতে কোনোরকমে জড়ানো একটা সাদা শাড়ি, মাথায় ঘোমটা টানা। আর চোখগুলো, ওঃ কী ভয়ঙ্কর সেই দৃষ্টি! যেন গিলে খাবে তাঁকে।

—“থাক দাদা ওইসব ছাইপাঁশ আজ আর খেতে হবে না,” বলল শ্রীলা। পাশ থেকে ফুট কাটলো দয়াল,

—“বৌদিমণি ঝকুন বলতিছেন, আজ আর খায়েননি গো বড়বাবু।”

আজ একটু নেশা না হলে বোধ হয় ঘুম আসবে না কুমারেশের। স্নেহ জারানো কন্ঠে তিনি শ্রীলাকে বললেন,

—“শরীর আমার ঠিকই আছে, আজ যা দৌড়-ঝাঁপ গেছে তা থেকেই বোধ হয় একটু নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়েছে, চিন্তা কোরো না মা, আমার কিছু হবেনা।“

ভাশুরের সঙ্গে তর্কে যেতে চাইল না শ্রীলা, মাথা নীচু করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দয়ালের দিকে ফিরে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন কুমারেশ,

—“তোকে জ্ঞান দিতে বলেছি হারামজাদা? যেই না বৌমা মানা করল ওমনি উনিও জ্ঞান দিতে শুরু করলেন, বেশি সাহুগারি করবি না, পেগ বানা।”

দ্বিতীয় পেগ বানিয়ে দয়াল যথারীতি আবার রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

আর চোখ বন্ধ করলেন না কুমারেশ, তিনি চান না আবার ওইসব উদ্ভট জিনিস দেখে নেশাটা মাটি হোক। ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ বেরোচ্ছে। গন্ধটা নাক ভরে নেয়ার চেষ্টা করলেন কুমারেশ। তিনি একটু অবাকই হচ্ছেন। এই গন্ধ এই ঘরে আসা সম্ভব না। রজনীগন্ধা ফুলের গন্ধ তিনি চেনেন। এই বাড়িতে সেই ফুল নিষিদ্ধ। তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার আগে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, যাকেই সামনে পেতেন প্রশ্ন করতেন,

—“রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছিস? এই তোরা কেউ রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছিস।”

ডাক্তারের নির্দেশে এ বাড়িতে তাই রজনীগন্ধা বন্ধ হয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর সেই ফুলের প্রতি দুই ভাইয়েরই একটা বিতৃষ্ণা জন্মায়। আর কখনও ঢোকেনি সে ফুল এ বাড়িতে। রজনীগন্ধার গন্ধ নাকে আসতে আবার ভয় হল কুমারেশের। চোখ বুঝলেই দুঃস্বপ্ন দেখছেন, রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছেন, এর মানে কী? তিনিও কি পাগল হয়ে যাচ্ছেন তা হলে!

রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে প্রায় কিছুই খেলেন না কুমারেশ। রুটিগুলো ঝোলের বাটিতে একটু নেড়ে-চেড়েই উঠে পড়লেন। মহীতোষ আর অম্লান সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো তাঁর দিকে। অম্লান প্রশ্ন করল মাকে,

—“জেঠুর কি শরীর খারাপ মা?”

শ্রীলা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে দেখল ভাশুর ঠাকুরের ঘরের দিকে। তারপর উত্তর দিল,

—“কে জানে বুঝতে পারছি না তো! সন্ধেবেলা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, আমি আর দয়ালদা শরীরের কথা জিগ্যেস করতে, বললেন সারাদিনের দৌড়াদৌড়িতে নার্ভাস ব্রেক ডাউন।”

মহীতোষ ইশারায় স্ত্রীকে বললেন,

—“দেখো না একবার, হয়ত এখন সত্যিই শরীর ভাল লাগছে না, তাই খাবার ফেলে উঠে গেলেন।”

শ্রীলা উত্তর দিল,

—“হ্যাঁ দাঁড়াও খেয়ে উঠে দেখছি, দেখি জ্বর-টর এলো কিনা।”

খেয়ে উঠে টেবিল থেকে খাবারদাবার গুছিয়ে আধঘন্টা পর শ্রীলা কুমারেশের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল কুমারেশ তখনও জেগে। শুক্রবার, কিন্তু এই জিনিস কখনও দেখেনি শ্রীলা এর আগে। ওই দিন তার ভাশুর ঠাকুর খেয়ে উঠেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এক বছর হয়ে গেল কুমারেশ সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। ঘরের এক কোণে একটা কাঠের বুককেসের উপর এখনো সাজানো রয়েছে তাঁর শখের বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেটের কার্টনগুলো।

শ্রীলা ঘরে ঢুকেই একটু অবাক হল। কুমারেশ ইজি চেয়ারে বসে সিগারেট খাচ্ছেন, তাও এক বছরের পুরানো। শ্রীলার ভেতর একটু দোনামোনা চলছে, তবুও সে ডাকলো,

—“দাদা?”

কুমারেশ ফিরে তাকালেন শ্রীলার দিকে। কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। যেন কোনো গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। শ্রীলা জিগ্যেস করল,

—“দাদা আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? কিছুই খেলেন না।”

সিগারেটের শেষটুকু ছাইদানে গুঁজে কুমারেশ আরেকটা সিগারেট ধরালেন। তাঁকে কেমন যেন একটা চিন্তিত দেখাচ্ছে। শ্রীলা যে একটা প্রশ্ন করেছিল সেটা তাঁর কানেই পৌঁছায়নি। সেই সময়ই বাড়ির থেকে অনতি দূরে রেললাইন দিয়ে শব্দ করে একটা ট্রেন বেরিয়ে গেল, যেন কিছু একটা বলতে গেলেন কুমারেশ, যা ট্রেনের শব্দে শুনতে পেল না শ্রীলা।

শ্রীলা যেন স্পষ্ট দেখেছে ভাশুর ঠাকুর মুখ নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেছিলেন তাকে।

সে আবার জিগ্যেস করল,

—“দাদা খিদে পেয়েছে, কিছু খাবেন?”

এবার শ্রীলা শুনতে পেল, পরিষ্কার শুনতে পেল, কুমারেশ তাঁকে প্রশ্ন করছে,

—“আচ্ছা বৌমা ঘরের ভেতর তুমি রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছ?”

বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল শ্রীলার! এ কী অলুক্ষুণে কথা শুনল সে! তার শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার আগেও ঠিক একই কথা বলতেন। ছোট বৌমা রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছ? তবে কী? হাত-পা কাঁপতে শুরু করল শ্রীলার। সে কোনো রকমে বলল, “দাদা আপনি শুয়ে পড়ুন।” তারপর উন্মাদিনীর মত ছূটে গেল নিজের ঘরের দিকে। ডাইনিং-এ দয়ালের সঙ্গে দেখা হল তার, সে দয়ালকে বলে গেল আজ রাতটা যেন দয়াল ভাশুর ঠাকুরের ঘরের বাইরে শোয়।

শ্রীলার মুখ দেখে একটু যেন চিন্তায় পড়লেন মহীতোষও। শ্রীলা তখন নিজের ঘরের দোর দিয়ে আতঙ্কে হাঁপাচ্ছে।

—“কী হয়েছে?” একটু রূঢ় ভাবেই জিগ্যেস করলেন মহীতোষ।

হাঁপাতে হাঁপাতে শ্রীলা উত্তর দিল,

—“কিছু একটা করো, দাদাও বাবার মত কথা বলছেন।” খানিকটা বিরক্তির ভঙ্গিতেই মহীতোষ বললেন,

—“মানে?”

—“সেই এক কথা গো, সেই এক কথা— রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছ।” কথাটা বলে আরো হাঁপাতে লাগল শ্রীলা। মহীতোষও যেন কথাটা শুনে একটু হকচকিয়ে গেছে। সে জানে অনেক কথা যা শ্রীলা জানে না। এ বাড়ির কোনো একটা দোষ আছে, শেষ বয়সে সবাই কেমন একটা উন্মাদ হয়ে যায়।কেবল যে শেষ বয়সে তাই নয়, এই পাগলামি দেখা দেয় মৃত্যুর আগে!”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%