১৩

মনীষ মুখোপাধ্যায়

ঘন্টার শব্দে কানে হাত চাপা দিয়ে বসে আছে যক্ষিণীটা, ঘরের ঠিক মাঝখানে। এতক্ষণ সে অনেক জারিজুরি দেখিয়েছে, কিন্তু এখন সে বেশ শান্ত।

তার রূপ পুরুষ পাগল করা। সুডৌল স্তনবৃন্ত দুটি উত্তেজনার ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিকন কোমরের ঢালে নেমে এসেছে লম্বাচুল। সে উলঙ্গ, গায়ে একটা সুতো অবধি নেই। যে কোনো পুরুষেরই এমন নারীমূর্তি দেখলে সম্ভোগ ইচ্ছা জাগতে বাধ্য। কিন্তু শঙ্খর সে ইচ্ছা জাগছে না। সে বছর দেড়েক আগেই এইসবের ঊর্ধে উঠে এসেছে।

যক্ষিণীটা চিৎকার করে বলে উঠল

—“ওই শব্দ থামাও... না হলে... না হলে...।”

—“নাহলে তুই কিচ্ছু করতে পারবি না আমার।” হাসল শঙ্খ।

—“তোর মাথাটা আমি ছিঁড়ে নেব।”

ঘর কাঁপিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল শঙ্খ। বলল

—“তোর হয়তো জানা নেই, বিরজা হোম যে তান্ত্রিক করে ফেলে তাকে যক্ষ, রক্ষ, ডাকিনী, যক্ষিণী, পিশাচিনী কেউ স্পর্শ করতে পারে না। তাও আমি শব্দ থামাচ্ছি, তুই চেষ্টা করে দেখ। হটাত্‍ই ঘন্টাটা থামিয়ে দিল শঙ্খ।”

আর ঠিক তখনই নিজের আসল রূপ ধরল যক্ষিণী, হাওয়ার গতির চেয়েও দ্রুত বেগে এসে দাঁড়ালো শঙ্খের সামনে। ততক্ষণে লম্বা ধারালো নখ বেরিয়ে এসেছে তার, প্রবল আক্রোশে নখ বসিয়ে দিল সে শঙ্খের বুকে।

কিন্তু কী আশ্চর্য, যেন হাওয়ার শরীরে হাত চালিয়েছে সে! কিচ্ছু মাত্র ক্ষতি হল না শঙ্খের বরং সে অট্টহাসি হাসতে লাগল।

আক্রোশে মাথা ঝাঁকাতে লাগল যক্ষিণীটা। আঁ...আঁ...আঁ করে প্রচণ্ড চিৎকার করতে লাগল। সেই শব্দ বাইরে অবধি শোনা যেতে লাগল।

ভয়ে ইষ্ট মন্ত্র জপ করতে লাগলেন প্রভাদেবী। শ্রীলা তাঁকে শক্ত করে ধরে আছে। অনন্যা শ্রীলাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সুকন্যাও এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পাশে। সায়েন্সের দর্প আর অহঙ্কার যেন চুরমার হয়ে গেছে তার। এরকম মেয়েলি ভয়ানক গলায় কে চিৎকার করছে বোনুর স্টাডি থেকে সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। ওই পাজি লোকটার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, একটু আগেই সে টের পেয়েছে। সেই লোকটা নিজেও গলা পালটে এইভাবে চেঁচাতে পারে। কিন্তু কোনো পুরুষ ওই ফ্রিকোয়েন্সিতে নারীকন্ঠে চেঁচাতে পারবে না বলেই মনে হয় সুকন্যার।

শঙ্খ বেশ শব্দ করে পড়তে লাগল একটা মন্ত্র। যে মন্ত্রের জোরে ডামর-ডামরি, যক্ষ-রক্ষ সবাই শক্তিহীন হয়ে পড়ে। মা দক্ষিণাকালীর কবচ মন্ত্র এটি। শব্দ করে বলতে লাগল শঙ্খ,

“তন্ত্রান্তরে। ভৈরব উবাচ। কালিকা যা মহাবিদ্যা কথিতা ভুবি দুর্লতা। তথাপি হৃদয়ে শল্যমস্তি দেবী কৃপাং কুরু…।”

যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল যক্ষিণী

—“চুপ করো… চুপ করো… ত্রাহিমাম… ত্রাহিমাম…।”

কাজ হয়েছে। হাসল শঙ্খ, তারপর প্রশ্ন করল,

“তুমি কে, কোথা থেকে এসেছো তুমি? ওই বাচ্চাটাকে কেন কষ্ট দিলে?”

“আমি… আমি… হংসী যক্ষিণী… এই বংশেরই এক পূর্বপুরুষ আমায় লাভ করেছিল কঠিন সাধনা করে। সে মারণক্রিয়া করতে আমায় পাঠিয়েছিল এক ডাকাতের ডেরায়, সেও ছিল তোমার মত কালীসাধক। তাকে আমি হত্যা না করতে পারায় ফিরে আসি। সে অন্য এক কঠিন সাধনায় লিপ্ত হয় এরপর। সেই সাধনায় কোনো ভুল করেছিল সে, তাই তার প্রাণ যায়। আর আমি বিসর্জন না পেয়ে তার বাড়িতেই চিরকালের মত আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। শেষে একজন বৃদ্ধলোক আমায় মুক্ত করে তার উত্তরপুরুষের এই বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছে।”

বিকট দর্শন লাগছে এখন যক্ষিণীকে, সে যেন যন্ত্রণায় ছটফট করছে ভেতরে ভেতরে। আগের সেই পুরুষ ভোলানো রূপ আর নেই তার।

“তুই কী চাস?” বেশ দৃঢ় কন্ঠে প্রশ্ন করল শঙ্খ।

“আমি… আমি… মুক্তি চাই…। আমায় বিসর্জন দাও।”

যক্ষিণী যেন করুণ আর্তি জানাল।

“কী ভাবে তোর বিসর্জন সম্ভব?”

“এদের পূর্বপুরুষের ভিটেয় রয়েছে অতি প্রাচীন এক দেউল, সেখানে আমার একটা খুব গুপ্ত মূর্তি লুকানো আছে কুলুঙ্গির ভেতরে। সেই মূর্তি নিয়ে জলে ভাসান দিয়ে দিও। তাহলেই আমার মুক্তি।”

“এই বাড়িতে আর একটা শক্তিশালী কিছু আছে, তুই নাকি সেটায় ভয় পাস, সেটা কী?” আবার প্রশ্ন করল শঙ্খ।

“তাঁর কথা আমাকে জিগ্যেস কোরো না, তাঁর তল খুঁজে পাওয়া অতি কঠিন। তিনি সাক্ষাৎ সতীর একটা গুপ্ত রূপ। যে বুড়োটা আমাকে এখানে পাঠিয়েছে, সে তাঁকে কাজে লাগাতে চাইছে।“

আবার হাঁপাচ্ছে যক্ষিণী।

“কে সেই লোকটা।“

“আমি আমার গুপ্তবিদ্যা দিয়ে তার নাম জানতে পারিনি। সে নিজেও যথেষ্ট শক্তিশালী। ছাগ, মোষ, সাপ এবং নরবলি দিয়ে তার বেশ কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা হয়েছে। ডামর-ডামরিরা তার সঙ্গে ক্ষমতায় পারে না, আমিও তাই পারিনি। সে আমাকে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ করিয়ে এখানে পাঠিয়েছে মাত্র।”

“কিসের প্রতিশ্রুতি?” শঙ্খকে বেশ চিন্তিত দেখাল।

“বলির অভিপ্রায় এ বাড়ির একজন সদস্যকে তার চাই। আমি মোহিনী জাল বিছিয়ে তুলে নিয়ে যাব শিকার। তারপর তার হাতে তুলে দেব।”

“আচ্ছা... আচ্ছা...। তোকে একটি মাত্র কারণেই মুক্তি দিতে পারি, তুই এ বাড়ির কারো কোনো ক্ষতি করবি না। আর তুই এদের ভিটেটা আমায় চিনিয়ে দিবি।” শঙ্খ কথাটুকু বলে উত্তরের আশায় সামনে তাকিয়ে রইল।

“আমি এদের ভিটে তোমায় চেনাতে অক্ষম— সাধক, সে শক্তি আমার নেই। যার বিরুদ্ধে কোনো ক্রিয়া করতে হয় তাদের ভিটের মাটি বা ব্যবহারের কিছু আমায় সমর্পণ না করলে আমি অন্য স্থানে যেতে পারি না। যেমন এ বাড়ির বড়ছেলের পায়ের ধুলো আমায় ওই লোকটা সংগ্রহ করে দিয়েছিল, তাই আমি এখানে আসতে পেরেছি। তবে এ বাড়ির কারো কোনো ক্ষতি আমি করব না। শুধু কথা দিতে হবে...।”

“কী কথা?” ভ্রু কুঁচকে গেল শঙ্খের।

“যতদিন আমার মুক্তি না হচ্ছে এ বাড়ির ছাদে কেউ যাবেনা। ওখানেই আমি থাকব।”

“আচ্ছা, তাই হবে।” যক্ষিণীকে আশ্বস্ত করল শঙ্খ।

ঘরের মধ্যে একটা কালো কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ার জাল তৈরি হল। সজোরে খুলে গেল বন্ধ জানালার কপাটটা। চোখের নিমেষে ধোঁয়াটা মিলিয়ে গেল। আর দেখা গেল না তাকে। যক্ষিণীটা কেমন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

শাঁখ আর ঘন্টাটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল শঙ্খশুভ্র। সাউ পরিবারকে যদি এই যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পেতে হয়, তাহলে অবশ্যই চাকদা যাওয়ার দরকার, আর সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

সকলে বেশ কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শঙ্খের দিকে। সবার মুখ থমথমে, তাদের মুখের রেখাগুলো যেন শঙ্খকে প্রশ্ন করছে, ভেতরে কে ছিল? শঙ্খ সবার উদ্দেশে বেশ গলা চড়িয়েই বলল,

“বেশ কিছুদিন কেউ ছাদে যাবেন না, ছাদে খুব খারাপ একটা জিনিস রয়েছে। আপনাদেরই কোনো পূর্ব পুরুষ ছিলেন যক্ষিণী সিদ্ধ, তাঁর মৃত্যুর আগে সে এই যক্ষিণীকে বিসর্জন দিয়ে যেতে পারেননি, সেই এসেছে মুক্তি লাভের আশায়। আর আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চাকদা যেতে চাই।”

অম্লান আর মহীতোষ ঠিক সেই সময়ই বাড়িতে ঢুকছিল। শঙ্খশুভ্রকে দেখে মহীতোষ কিছু বোঝার আগেই চমকে গেল অম্লান। এতবছর পর, তা প্রায় পাঁচ বছর তো হবেই। এই ছেলেটার ফুটবল খেলা দেখেছিল অম্লান। শোভাবাজার সবুজসাথীর মাঝমাঠে খেলত ছেলেটা। অম্লান একগাল হাসি নিয়ে প্রশ্ন করল,

“আরে... শঙ্কু দা না? সবুজসাথীর ডেভিড বেকহ্যাম!”

হাসল শঙ্খ। তারপর বলল,

“তুমি অম্লান তো, কালীঘাট জুনিয়রে রাইটব্যাক খেলতে, কিছুই ভুলিনি, সবই মনে আছে।”

অম্লান জিগ্যেস করল,

“তা দাদা, তুমি এখানে?”

উত্তরটা শঙ্খকে আর দিতে হল না, শ্রীলাই সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিল সবকিছু। শঙ্খ মহীতোষকে উদ্দেশ করে বলল,

“যদি আপনার দাদাকে বাঁচাতে হয়, কালই আমাদের চাকদা যেতে হবে, খুঁজে বার করতে হবে আপনাদের আদিপুরুষের ভিটে, বিসর্জন করতে হবে যক্ষিণীকে আর... আর...”

“আর কি? মিস্টার মুখার্জি!” বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে মহীতোষকেও।

“আর শান্ত করতে হবে, সপ্তম মহাবিদ্যা ধূমাবতীকে।”

শঙ্খ, মহীতোষ আর অম্লান নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল, পরদিন আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে বেরিয়ে পড়বে তারা চাকদার উদ্দেশে।

শঙ্খ বেরিয়ে আসতে গেলে শ্রীলা অনেক সাধাসাধি করল খাওয়ার জন্য, কিন্তু সে জানে এটা খাওয়ার সময় নয়। মহাবিদ্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রাচীর তৈরি করতে সে এখনও ততটা পটু নয়। ও দিকে গুরু অমর ভট্টাচার্য দেহ রেখেছেন বেশ কিছু সময় হল। এবার সে কী করবে সেটাই ভাবতে ভাবতে পথ চলতে লাগল।

গড়িয়াহাট থেকে বাসে শোভাবাজার যাওয়া যায়, কিন্তু শঙ্খের বাস ধরতে মন চাইল না। তার চেয়ে বরং হেঁটে হেঁটে রাসবিহারী মেট্রো পর্যন্ত যাওয়া যাক, মনে মনে ভাবল শঙ্খ। সাউ বাড়ি থেকে অনেক বলেছিল তাকে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসবে, সে নিজেই গাড়ি নেয়নি। এর একটাই কারণ এই রাতের দিকের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে একটু ভাবতে ভাবতে হাঁটা যাবে।

একটা একটা করে কথা ভাবার চেষ্টা করতে লাগল শঙ্খ। সম্ভাব্য পদ্ধতিগুলো কী হতে পারে তার একটা ছক সাজিয়ে নিচ্ছে সে মনে মনে। কিন্তু এই পূজা পদ্ধতির প্রায় কিছুই জানে না সে, দেবীর বীজমন্ত্রও তার জানা নেই।

একটা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীতার সম্মুখীন হতে চলেছে সে,এটা বুঝতে তার এতটুকু অসুবিধা হচ্ছে না। গুরুদেবের নির্দেশগুলো মনে করার চেষ্টা করল সে। তার মনে পড়ল গুরুদেব বলছেন, যে কোনও বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ মা মহামায়াই দেখিয়ে দেবেন। যে কোনো প্রলয়ঙ্করী শক্তির বিনাশ বাবা মহাকালই করবেন। মাথার মধ্যে তালগোল পাকাতে লাগল শঙ্খের। ঠিক তখনই, যেন গুরু অমর ভট্টাচার্যের আশীর্বাদেই একটা নাম মনে পড়ল তার। একটা লোক সহযোগিতা করতে পারে, গুরুর সঙ্গে চক্রে বহুবার দেখেছে শঙ্খ লোকটাকে। তার বাড়িও তো খুব বেশি দূর নয়, এই তো কাছেই কালীঘাট মন্দিরের দিকে। নামটাও মনে পড়ল শঙ্খের, কঙ্কালী দাদা। শঙ্খ সহজে কিছুই ভোলে না, তার বাড়িটাও মনে পড়ে গেল ওর।

কালীঘাটের দিকে হাঁটতে লাগল শঙ্খ, পেছনে ছেড়ে এল মেট্রো স্টেশন। অন্ধকার দুটো গলি পার করে তৃতীয়টায় ঢুকে পড়ল সে। গলিগুলো এতটাই সরু যে দুটো মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারবে না। পনেরো-কুড়ি গজের মধ্যেই শুরু হচ্ছে আদি গঙ্গায় নামার সিঁড়ি। বাড়িটা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না শঙ্খের। সে কড়া নাড়ল, ভেতর থেকে বেশ গমগমে একটা গলার স্বর ভেসে এল—“কেএএ?”

“আজ্ঞে আমি শঙ্খশুভ্র, কঙ্কালী দাদা! শ্রী অমর ভট্টাচার্যের শিষ্য।”

“কী চাই এত রাতে?” আবার প্রশ্ন ভেসে এল।

“আজ্ঞে একটা কথা বলতে চাই, খুব বেশি সময় লাগবে না।”

দরজা খুলে গেল। প্রায় অন্ধকার ঘরের এককোণে একটা জলচৌকি পাতা। তার উপর বসে আছেন একজন বেশ শক্তপোক্ত চেহারার মানুষ। লাল টিমটিমে আলোয় দেখা যাচ্ছে, দেয়ালে টাঙানো একটা বিরাট মা কালীর ছবি, তাতে বেশ তাজা টকটকে রক্তজবার মালা পরানো হয়েছে। ঠিক তার পাশেই একটা দশমহাবিদ্যার হাতে আঁকা একটা ছবি। লোকটি, মানে কঙ্কালীদাদা, শঙ্খকে ঘরের ভেতর ডাকলেন ঠিকই, কিন্তু সে যে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে দিকে ভ্রুক্ষেপই নেই।

একটা তরল ঝাঁজালো জিনিস ছোট্ট একটা কাঁচের গ্লাসে রয়েছে, সেটাতেই হালকা হালকা চুমুক দিচ্ছেন কঙ্কালী নামক লোকটি। শঙ্খের বুঝতে অসুবিধা হল না ওটা কী জিনিস, তার নিজেরও দু’বছর আগে এই জিনিস সেবনের অভ্যাস ছিল। সে প্রস্তুত হয়েনিল, কথাটা পাড়বে বলে, তারপর বলতে শুরু করল সাউ বাড়ির সমস্ত বৃত্তান্ত। যক্ষিণী থেকে মহাবিদ্যার অভিশাপ কিছুই বাদ দিল না, যতটুকু সে শ্রীলার থেকে শুনেছিল।

মন দিয়ে সবটুকু শুনলেন কঙ্কালী। তারপর বললেন,

—“তোমার গুরুদেব শ্রী অমর ভট্টাচার্য আমাকে তাঁর চক্রে বারবার ডাকতেন কেন বল তো?”

মাথানীচু করে রইল শঙ্খ, সে এই উত্তর জানেনা।

আবার বলতে শুরু করলেন কঙ্কালী, এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল আমার কৌল সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়া। এই কৌলরা শক্তি সাধনার প্রায় সমস্ত আটঘাট জানে। তারপর কিছুক্ষণ থেমে বলল,

—“তুমি প্রত্যঙ্গীরা মন্ত্র জানো?”

মাথা নাড়ল শঙ্খ, এই মন্ত্র সে জানে। গুরু তাকে শিখিয়ে ছিল যে কোনো খারাপ ক্রিয়াকে ফেরত পাঠাতে হলে প্রত্যঙ্গীরা মন্ত্রের ব্যবহার করতে হয়। বৌদ্ধদের বজ্রযানী তন্ত্র সাধনায় আবার প্রত্যঙ্গীরাকে আলাদা ভাবে দেবীর মাহাত্মও দেয়া হয়েছে।

—“প্রথমে মহাবিদ্যা ধূমাবতীর যন্ত্র আঁকবে, ওতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবে দেবীর মূল মন্ত্র বলে, তারপর যথাসাধ্য ভোগ নিবেদন করে দেবীর ষোড়শপচারে পূজা করবে। ভোগ মদ্য আর মাংস হলে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। এবার দেবী সন্তুষ্ট হলে তুমি প্রথা মাফিক যন্ত্র ও যদি কোনো মূর্তি থেকে থাকে, সেই মূর্তির বিসর্জন করবে। আর কোনো খারাপ উদ্দেশে দেবীর আরাধনা করা হলে দেবী শাস্তি দেন, সে ক্ষেত্রে তুমি প্রত্যঙ্গীরা প্রয়োগ করে ওই ক্রিয়া আটকাবে।”

মাথা নেড়ে সায় দিল শঙ্খ, সে এই কাজগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।

—“এই কালীঘাটেই নাকি বহুকাল আগে এক তান্ত্রিকের ঘরে পূজা পেতেন মা ধূমাবতী।” হেসে বললেন কঙ্কালী। একটু থেমে আবার বলতে লাগলেন,

—সেই মূর্তি নাকি ছিল বহু বহু প্রাচীন কালের। তাঁর চোখ দুটো খুব দামি বৈদূর্য মণি দিয়ে তৈরি ছিল। সেই মূর্তির কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল কিনা সেটা অবশ্য কারো থেকে জানা যায়নি, কিন্তু বহু বছর আগে তান্ত্রিকের ওই মূর্তিকে লোকে ভয় করত। তখন নাকি আদি গঙ্গার পাড়ে এক বিধবা মহিলাকে প্রায়ই দেখা যেত, প্রচুর কাকের মাঝখানে বসে থাকতে। এই গল্প কথাই শুনেছি আমার আগের সাধুদের থেকে।”

আজ কঙ্কালী অনেক কথা বলে ফেলেছেন, এবার তিনি চুপ করে আবার পানে মনোনিবেশ করলেন।

মোটামুটি যা তথ্য পাওয়া গেল, তা দিয়েই অনেকটা কাজ হবে,ভাবল শঙ্খ। একটু তাড়াতাড়ি হাঁটলে শেষ মেট্রোটা পাওয়া যাবে... সে দ্রুত হাঁটতে লাগল যতীন দাস পার্ক মেট্রোর দিকে।

অপরদিকে...

ঘড়িতে রাত সাড়ে ন’টা বাজে। হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল, কুমারেশের শরীর বেশ খারাপ হয়েছে আগের থেকে। ডাক্তাররা অবিলম্বে ওপেন হার্ট সার্জারি করতে চাইছেন। ডাক্তারেরা সাসপেক্ট করছেন, একদিকের একটা ভালভ কার্যত অকেজো হয়ে গেছে কুমারেশের। পরদিন ভোরে চাকদার দিকে বেরোবার কথা ছিল। মহীতোষ যেতে পারবেন না। তার বদলে সুকন্যা যাবে বলেছে। ওই লোকটা কী করতে চায়, তার দেখার ইচ্ছা আছে। ভুল কিছু দেখলেই হাটে হাঁড়ি ভাঙার সুযোগ সে হারাতে চায় না। আর তার বাবার অপারেশন তো আর পরেরদিনেই নয়।

কানে ওয়াকম্যানের হেডফোনটা গুঁজে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠল সুকন্যা। তাকে কেউ দেখতে পায়নি! বোনকে নিয়ে এই মুহূর্তে সবাই ব্যস্ত। মন মেজাজ খারাপ হলে সে ছাদে উঠে গিয়ে গান শোনে, এ তার বহুদিনের অভ্যাস, বিদেশে থাকতেও মিসেস ডরোথীর যে ছোট্ট বাড়িটায় সে ভাড়া থাকত তার ছাদে উঠে যেত গান শোনার জন্য।

কী যেন বলে ছিল, ফোর টোয়েন্টিটা? মনে মনে হাসল সুকন্যা। ঠোঁটটা সামান্য বেঁকালো সে, তারপর বিড়িবিড় করেই বিকৃত ভাবে বলল,

“ছাদে যক্ষিণী আছে, যাবেন না, ব্লাডি ইডিয়ট।” ছাদের দরজা খুলে ঢুকে গেল সে, তারপর, একটা বেতের মোড়ায় শরীর এলিয়ে দিয়ে ফুল স্পিডে গানটা ছাড়ল ও। বন জোভি তারস্বরে চ্যাঁচাচ্ছেন— ইটস্ মাই লাইফ…। চোখ বুঝে এল সুকন্যার, বন্ধ চোখের পাতায় এসে ওই বদলোকটা ধরা দিচ্ছে। একটু যেন বিরক্ত হচ্ছে সে।

“ওঁয়ায়ায়া… ওঁ… ওঁ… উয়াঁ… আ… আ…আ…আ।” একটা বিশ্রী শব্দ হয়েই যেন থেমে গেল।

ওটা কীসের শব্দ? এতো জোরে গান বাজছিল, সেই শব্দকে ছাপিয়েও এই শব্দটা কানে এসে লেগেছে সুকন্যার। দূরের গ্লো-সাইনবোর্ডগুলোর আলো এসে ছাদে পড়েছে, মোটামুটি পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে সব কিছু।

সুকন্যা ভাবল বিড়ালটিড়াল হবে, কাঁদছে কোনো কারণে, হয়ত খেতে পায়নি। সুকন্যা আবার হেডফোনটা পরে নিতে গেল। আর ঠিক তখনই আবার শোনা গেল শব্দটা।

“উয়াঁয়ায়ায়া… আ… আ… আ… আ… আ।” ঠিক যেন একজন মেয়েমানুষ কাঁদছে।

বুকটা ধড়ফড় করে উঠল সুকন্যার—

ওই পাজি লোকটার কথা ইগনোর করা ঠিক হয়নি। ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এল সুকন্যা। বিপদ বুঝলে তেড়ে দৌড় তো দেওয়া যাবে।

গ্লো-সাইনবোর্ড আর চাঁদের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত আলোর আলপনা বুনেছে ছাদে। ডানে দেখা যাচ্ছে চিলছাদের সিঁড়ি। ওই অদ্ভুত আলো-আঁধারিতে স্পষ্ট চোখে পড়ল সুকন্যার, একজন নগ্ন মহিলা মাথা নীচু করে বসে আছে। আর মাঝে মাঝেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে।

সুকন্যা জিগ্যেস করল, “আপনি কে?”

উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল মহিলা। মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই। এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগল সে সুকন্যার দিকে। সুকন্যা দৌড়ে গেল নীচে নামার সিঁড়ির দিকে, তারচেয়েও বেশি গতিতে তার সামনে এসে দাঁড়ালো সেই মহিলা। এক ঝটকায় মুখটা তুলল সে। সুকন্যা পিছন দিকে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। কি বীভৎস মুখ, চোখের কোটরে ধক ধক করে আগুন জ্বলছে যেন। বাঁকানো নখগুলো সুকন্যার পেট লক্ষ্য করে চালিয়ে দিল সে। আর রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই, কেন যে ওর কথা শুনল না সুকন্যা!

সেই মুহূর্তে একেবারে তড়িৎ গতিতে একটা হাত এসে একটা হ্যাঁচকা টান মারল সুকন্যার হাত ধরে। চোখ বুজে এল তার। সে শুধু শুনতে পেল ছাদের দরজা সজোরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান ফিরতেই সে দেখল শ্রীলা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ শ্রীলা না থাকলে তার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%