মনীষ মুখোপাধ্যায়
নদীয়া জেলার মফস্বলগুলোর মধ্যে চাকদহ অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। এমনিতে জেলার আর পাঁচটা মফস্বলের সঙ্গে এই এলাকার খুব একটা পার্থক্য না থাকলেও, জায়গাটির ইতিহাস অঞ্চলটির নামকরণ সম্বন্ধে অনুসন্ধিৎসু মানুষের কৌতুহলের উদ্রেক করে বৈকি।
পুণ্যতোয়া গঙ্গা বয়ে চলেছে এই শহরের পাশ দিয়ে। বহুকাল পূর্বে সাহেবি আমলে, এই চাকদহের নদীর পাড়ে ছিল এক বৃহৎ মহাশ্মশান। বহু দূর দূর থেকে সেখানে আনা হত মৃতদেহ, তৎকালীন বাঙালি হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল যে ওই শ্মশানে মৃতদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। চাকদহের এই মহাশ্মশানে পূজিত হতেন ভয়ানক দর্শন জাগ্রত শ্মশানকালী। শ্মশানকালীর পায়ে মৃতদেহ সঁপে দিয়ে মৃতের বাড়ির লোকজনেরা অনুভব করতেন এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।
পুরাণমতেও এই চাকদহকে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বলে গণ্য করা হয়। পুরাণে লেখা আছে, ভগীরথ যখন তাঁর কঠোর তপস্যায় গঙ্গানদীকে মর্তে আনতে সক্ষম হন, তখন সেই আগমনকালে এই চাকদহের পুণ্য ভূমিতেই আটকে গিয়েছিল তাঁর রথের চাকা অর্থাৎ চক্র, সেই থেকে সৃষ্টি হয় দহের। সেই ‘চক্রদহ’ থেকেই নাম হল চাকদহ, তারপর লোকমুখে চাকদা।
এই চাকদহের সাড়ে পনেরো বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে প্রচুর গ্রাম। এরই মধ্যে একটি হল, ডুমুরদহ। ডুমুরদহের ইতিউতি বাস করে নানা সম্ভ্রান্ত পরিবার। ডুমুরদহ চাকদহ থেকে বেশ কিছুটা দূরে হলেও তা চাকদহেরই তফসিলভুক্ত। হিন্দু, মুসলিম সব জাতেরই মিলেমিশে সহাবস্থান এই স্থানে। গ্রাম না বলে মফস্বল গঞ্জ বলাই যেতে পারে জায়গাটাকে, কেননা দিন দিন উন্নয়নের জোয়ার লাগছে এখানেও। এই ডুমুরদহের সামনাসামনি সরাটি গ্রামপঞ্চায়েতের অধীনে ডুমুরদহচরেই ঘটল ঘটনাটা।
গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যার আলো ফুরোতে সেদিন আর খুব বেশি সময় বাকি নেই, দিনান্তে পাখির দল ফিরে যাচ্ছে যে যার বাসায়। নদীর দিক থেকে বইছে মিঠে হাওয়া, তাই প্রখর দাবদাহের পরেও সে হাওয়ার জন্য কষ্ট মালুম পড়ছে না। দিনমণি অস্তাচলে যাওয়ার এই সময়টায় শঙ্খে ফুঁ পড়ে ঘরে ঘরে।
গোধুলির সময় মাঠের থেকে ফুটবল খেলে ফিরছিল বছর তেরোর মহেশ। বিতান, কাজল, রতন, দীনুরা একটু তফাতেই এগিয়ে গেছে। নদী পারের জংলা জায়গাটায় এসে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হল মহেশের। হাওয়ার চলাচলটাও যেন এই জায়গাটায় এসে গুম মেরে গেছে, গাছের ডালে পাখিদের কলতানও তেমন শোনা যাচ্ছে না। মহেশ তাকিয়ে দেখল রাস্তার বাঁপাশে ঝোপের কাছে কেমন যেন বেমানান ভাবে বসে আছে বিরাট আকারের একজোড়া দাঁড়কাক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে তারা কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ ভাবে ডাকাডাকি করছে না, বরং যেন একদৃষ্টে দেখে যাচ্ছে মহেশকে! হাঁ করে রয়েছে তারা, তাদের মুখের ভেতরের অংশটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লালপানা। অনেক কাকের মুখের ভিতরটা ওরকম লালই থাকে, কিন্তু এই কাকদুটোর মুখের ভিতরটা এত লাল, দেখে যেন মনে হয় কোথাও থেকে রক্ত খেয়ে এসেছে! স্বাভাবিকভাবেই কিশোর মহেশের মনে জন্ম নিল কৌতুহল, ভাবল একবার এগিয়ে গিয়ে দেখবে নাকি, জঙ্গলের ওই দিকটায় কী আছে! ওদিকে সন্ধে হয়ে আসছে, মহেশের বাবা এই সময়টা একবার বাড়ি ফেরেন দোকান থেকে, ফিরে যদি তাকে না দেখতে পান খুব ঝামেলা করেন। কিন্তু কিশোর মনের কৌতুহল বড় বাজে জিনিস, মহেশ এগিয়ে গেল ঝোপটার দিকে, যেদিকে কাক দুটো বসে ছিল।
ঝোপ জঙ্গলে ভর্তি জায়গাটা। এদিক ওদিক ইতস্তত ফুটে আছে বুনো ফুল। মহেশকে এগিয়ে আসতে দেখে কাক দুটো খানিকটা সরে গেল। কাকগুলোর দিকে মনোযোগ থাকায় এতক্ষণ ভাল করে দেখতে পায়নি মহেশ, সামনের ঝোপটার আড়ালে দেখা যাচ্ছে একটা ছোট গম্বুজের মত। মাটি থেকে ফুট চারেক উচ্চতার গম্বুজটার প্রায় অর্ধেকটাই ভেঙে গেছে। মহেশ আস্তে আস্তে এগোতে লাগল গম্বুজটার দিকে। ভয়ে ভয়ে লতানে গাছগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে মহেশ একেবারে গম্বুজটার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঝোপের চার পাশে কাঁটাগাছে ভর্তি, একবার পায়ে ফুটে গেলে আর রক্ষে নেই।
গম্বুজটার চারপাশটা অস্বস্তিকর ভাবে ভীষণই নিস্তব্ধ। ভাল করে চারপাশে চেয়ে মহেশ দেখল কয়েকটা মাটির প্রদীপ ইতিউতি পড়ে আছে মাটিতে। এদিক ওদিক ভাল করে দেখতেই আরেকটা আশ্চর্য জিনিস চোখে পড়ল তার, আর সেদিকে দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল কিশোর মহেশের— এ জিনিস এখানে এলো কী ভাবে! নিজেকেই যেন নিজে প্রশ্নটা করল সে।
কতগুলো পোড়া শোল মাছ গম্বুজটার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে! সন্ধে নেমে আসার জন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে এসেছে চারপাশ, দিনের আবছা শেষ আলোয় পরিষ্কার করে কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। এদিকটাতে আবার ভীষণ সাপের ভয়, শিয়ালের আক্রমণের ভয়ও আছে, কিন্তু মহেশের ভেতরের তীব্র কৌতুহল তাকে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে গম্বুজটার কাছে আর তার কানে ফিসফিস করে কেউ বলছে— যা, আরও এগিয়ে যা… আরও এগিয়ে গিয়ে দেখ, কী আছে ওই গম্বুজে!
গম্বুজের নীচের দিকটায় আলো ফেলে দেখলে ভাল হত, কিন্তু আলো সে পাবে কোথায়? তার চেয়ে বরং বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো, কাল একটু সকাল সকাল এসে না হয় দিনের আলোয় দেখা যাবে গম্বুজের নীচটা, আর খুঁজে দেখতে হবে এখানে পোড়া মাছ কে রেখে গেছে সেটাও।
মহেশ বাড়ি ফেরার জন্য পিছন ফিরতেই কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল দাঁড়কাকগুলো। আর মহেশের গায়ে শিরশিরানি তুলে পেছন থেকে খুনখুনে একটা গলা যেন মহেশকে ডাকল
—“এই ছেলে… একবার ফিরে দেখ।”
ভয় করতে লাগল মহেশের। নিজেকেই সে নিজে দুষতে লাগল, কেন সে এই ভরসন্ধেবেলায় এদিকে এল। একেই নানান লোকের মুখে এসব তল্লাট নিয়ে শোনা যায় নানা কথা। এক সময় এই চাকদহ ছিল খুনে ডাকাতদের আস্তানা। তারা লুঠপাট করেই শান্ত হত না, নরবলি দেয়া তাদের একটা রীতির মত ছিল। ইচ্ছামতো মানুষ ধরে গঙ্গার পাড়ে শ্মশানকালীর থানে তারা বলি দিত মায়ের উদ্দেশে। অকালে যারা ডাকাতের হাতে প্রাণ দিত তাদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ঘুরে বেড়ায় এই গঙ্গার চরে। অনেকের কাছেই এই গল্প শুনেছে মহেশ।
এবার গলাটা স্পষ্ট শুনতে পেল মহেশ, অনেকটা এক বৃদ্ধার খুনখুনে গলা,
—“কী রে দ্যাখ একবার ফিরে।”
সে তো গলা নয়, যেন একটা প্রবল টান, আর যে টানকে অমান্য করার ক্ষমতা তেরো বছরের মহেশের নেই। সর্বাঙ্গ ভিজে যাচ্ছে তার ঘামে, ইচ্ছে করছে এক দৌড়ে পার করে দেয় সামনের মাঠ, মাঠ পেরলেই গ্রামের রাস্তা। কিন্তু অসাড় একটা পুতুলের মতই দাঁড়িয়ে রয়েছে মহেশ। পালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা যেন হারিয়ে গেছে। কেউ যেন তাকে টেনে ধরে রেখেছে, বাধ্য করছে পেছন ফিরে দেখতে।
পিছনে নুটু বুড়ি দাঁড়িয়ে নেই তো? মনে হল মহেশের। নুটু বুড়ি এই গাঁয়েরই এক পাগলী, লোকের বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে খায়। গ্রামের বাচ্চারা তার পেছনে লাগে, জ্বালায়, মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচল টেনে দৌড়ও দেয়। আর সে রেগে গিয়ে গাল দেয়, ঢিল ছোড়ে। মহেশ ভাবল নুটু বুড়িই বোধ হয় তাকে একলা পেয়ে ভয় দেখাচ্ছে। এই কথাটা মাথায় আসতেই সাহস ফিরে এল তার। সে এক ঝটকায় পেছন ফিরে তাকাল—
নাঃ, পিছনে কেউ কোথাও নেই তো। তাহলে কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলল কে? সন্ধে পার হয়ে কখন যেন ঝুপ করে নেমে এসেছে অন্ধকার। ঝোপের চারদিকে টিমটিমে আলো জ্বেলে উড়ছে জোনাকিরা। কিন্তু কোনও মানুষজন চোখে পড়ল না মহেশের! বুকটা কেঁপে উঠল তার। তবে চারপাশটা ভাল করে দেখতে গিয়ে, মাটির দিকে তাকিয়ে হাড় হিম হয়ে গেল মহেশের।
এখন মাটিতে আর একটাও শোল মাছ পড়ে নেই, ভোজবাজির মত যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সেগুলো। কাঁপা বুকে গম্বুজটার দিকে তাকিয়ে মহেশ দেখল, গম্বুজটার নীচে এখন দেখা যাচ্ছে দুটো আলোর বিন্দু, যেমন অন্ধকারে শ্বাপদের চোখ জ্বলে ঠিক তেমন। অতি ধীর পদক্ষেপে, চিন্তা ভীতি, সব কিছুকে উপেক্ষা করে মহেশ এসে দাঁড়াল গম্বুজের সামনে।
হঠাৎ করেই মহেশের হৃদস্পন্দনকে থামিয়ে দিয়ে চারপাশের পরিবেশটা একেবারে পাল্টে গেল—
অপ্রত্যাশিত ভাবেই কানে তালা লাগিয়ে বেজে উঠল একশো ঢাক, কাঁসর-ঘন্টা। জায়গাটাতে জ্বলে উঠল হাজার হাজার আলো। কারা যেন আসছে— দলে দলে আসছে এদিকেই। একটা মহিলাকে টেনে নিয়ে আসছে তারা। পেটটা বীভৎস রকমের উঁচু হয়ে আছে সেই মহিলার। গম্বুজের সামনের বেদিতে শোয়ানো হল তাকে, মহিলাটি বিকট আর্তনাদে প্রাণ ভিক্ষা চাইছে
—“আমায় আপনারা ছেড়ি দ্যান… আমি পোয়াতি… আমায় মারলি পরে মা আপনাগো মাপ করবেননি কত্তারা।”
মহিলার মিনতিতে কর্ণপাত না করে বিকট শব্দে কেউ যেন হেসে উঠল, আর এরপরই নেমে এল শমন— স্ত্রী লোকটির ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিল এক প্রকাণ্ড চেহারার জল্লাদ। কাঁপতে থাকা মহিলাটির মুণ্ডবিহীন শরীরটা নিথর হয়ে যাওয়ার আগেই, প্রকৃতির রোষ যেন নেমে এল দলটার উপর।
প্রচন্ড একটা বজ্রপাত হল জল্লাদটির শরীরের পাশে, দাউদাউ করে জ্বলে উঠল সেই বিশালাকায় শরীরটা। সেই বীভত্স দৃশ্য দেখে ভিড়টা যে যেদিকে পারল দৌড়ে পালাতে লাগল।
আর ঠিক তখনই গম্বুজের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন বিকটদর্শন এক বৃদ্ধা। যে লোকটা বলির আগে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল, সে দু’হাত জোড় করে বলে উঠল— “ওঁ ধুং ধুং ধূমাবতী স্বাহাঃ।”
কিন্তু সেই বৃদ্ধা তার অর্পণের দিকে ভ্রক্ষেপ করলেন না, এগিয়ে এসে দু’হাতে টিপে ধরলেন লোকটার গলা। বৃদ্ধার হাতের চাপে লোকটার দু’কষ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে। লোকটার শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে না পড়তেই কাছেই কোথাও ডেকে উঠল কয়েকটা শিয়াল।
শিয়ালের ডাকে যেন চটক ভাঙলো মহেশের, অবাক হয়ে চেয়ে দেখল কোথাও কিচ্ছু নেই। কোথায় গেল সেই স্ত্রী লোকটির মুন্ডুহীন দেহ? কোথায় গেল বজ্রপাতে বিদ্যুতপৃষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জল্লাদটা, আর কোথায়ই বা গেল সেই লোকটার দেহ যাকে একটু আগেই গলা টিপে হত্যা করেছে এক বৃদ্ধা? লোকটার কথাটা যে এখনো কানে বাজছে মহেশের, কী যেন… হ্যাঁ, মনে পড়েছে— ওঁ ধুং ধুং ধূমাবতী স্বাহাঃ। তাহলে কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল মহেশ!
মহেশ তার সামনের দিকে তাকিয়ে ভাল করে দেখে বুঝতে পারল যে গম্বুজটার নীচে জ্বলন্ত দুটো বিন্দু কোনো শ্বাপদের জ্বলন্ত চোখ নয় বরং তার থেকে যেন বেরিয়ে আসছে একটা আলোর ছটা। অন্ধকারে এতক্ষণে চোখ সয়ে এসেছে মহেশের, আর চাঁদের আলোতে যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পাথরের উপর খোদাই করা মূর্তিটাকে— রথের উপর আরোহণ করে আছেন এক দেবী, কোনো সাধারণ দেবীর মত রূপ তাঁর নয়, বরঞ্চ বলা যায়, বয়সের ভারে নুব্জ এক বৃদ্ধা। রথের বাহন একটা বিরাট দাঁড়কাক। পাথরের মূর্তির দেবীর রূপ ভীষণ, আর ওই জ্বলন্ত বিন্দু দুটি হল তাঁর জ্বলন্ত দুই চোখ।
দেবীর এই ভয়ানক মূর্তি সহ্য করতে পারল না বছর তেরোর ছেলেটা, মাথাটা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে, যেন এক্ষুনি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মহেশ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন