মনীষ মুখোপাধ্যায়
—“ওতে কী লেখা আছে তুমি পড়তে থাক।” বললেন রামচরণ মুখুটি
একটু ইতস্তত করে পরেশ বলে উঠলেন, “এতে কী লেখা আছে সে কি আমি বুঝতে পারব জ্যাঠা মশাই? এই পুরানো পুঁথির প্রায় কিছুই বুঝব না আমি। জ্যাঠা মশাইয়ের বাংলায় করা অনুবাদটি এর সঙ্গে থাকায় তবুও এই পুঁথিই যে সেই পুঁথি এটুকু বুঝতে পেরেছি।”
হাসলেন রামচরণ মুখুটি। তারপর বললেন, “তা সেই অনুবাদটাই নয় পড়ো। দেখ, আমি আজকাল আর চোখে ভাল দেখি না। তাই তোমার কথা থেকেই বুঝতে হবে এই পুঁথির বক্তব্য।”
একটা ঝুরঝুরে প্রায় নষ্ট হয়ে আসা পুঁথি, তালপাতা বা অন্য কোনও পাতায় কালি দিয়ে লেখা হয়েছে। ভাষা, চলিত বাংলার মত নয়, এমন কি সাধু ভাষাও নয় সেটি। সেটি যে আদৌ কোন ভাষা তা বোঝার ক্ষমতা পরেশের হল না। ভাগ্যিস জ্যাঠামশাই সহজ বাংলায় এর অনুবাদ করে গিয়েছিলেন তাই পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে, মনে মনে ভাবলেন পরেশ ভট্টাচার্য।
পরেশ পড়া শুরু করলেন—
তন্ত্রশাস্ত্র নিয়া মানুষের আগ্রহ সীমাহীন, আর তেমনই ভীতিও। আমার দশ বৎসর বয়স কালে আমি আক্রান্ত হইয়াছিলাম প্লেগ রোগে, যাহাতে জীবন সংশয় হইয়াছিল বলিয়াই শুনিয়াছি। সেই সময় চরের নিকট অবস্থিত বুড়া বিবির থান নিয়া মানুষের মধ্যে এক ভীতির উদ্রেক হয়। এক সাধু আসিয়া বুড়া বিবির ক্রোধ হইতে গ্রামের মানুষকে রক্ষা করেন। যাইবার পূর্ব্বে এই পুঁথিখানি আমার হাতে দিয়া যান তিনি। ভাষা শাস্ত্রের উপর একাধিক পুঁথি ঘাটিয়া এই পুঁথির মর্মোদ্ধার করা সম্ভব হইয়াছে আমার দ্বারা। এবং যাহা বুঝিয়াছি তাহা হইল, এই পুঁথির আবশ্যকতা প্রভূত। ইহা কোনও এক সময় জীবন রক্ষার্থে কাজে লাগিবে।
এই পুঁথি যিনি লিখিয়াছেন, সর্বাগ্রে নিজ পরিচয় প্রদর্শন করিয়াই লেখা শুরু করিয়াছেন। আমি কেবল ভাষার সংশোধন পূর্বক পুঁথির নবীন সংস্কার করিলাম।। ধন্যবাদ।। আদিনাথ ভট্টাচার্য।।
[এক]
।। ১১২৭ শাকের সাতাশ বৎসর পূর্ব্বে বাঙ্গালার সিংহাসন আরোহণ করে অরিরাজ মদনশঙ্কর লক্ষ্মণ সেন। শাক কথার অর্থ হইল শকাব্দ। বল্লান সেন পরবর্তী সময় বাঙ্গালা এই রূপ প্রতাপশালী নরপতিরই খোঁজ করিতেছিল। তাহার ন্যায় দানি নৃপতি তাহার পিতা বল্লালও ছিলেন না। কিন্তু পুত্র পিতার একখানি অসম্পূর্ণ কার্য সম্পাদনের তাগিদে অনুরক্ত হইয়া পড়েন তান্ত্রিক সাধনার গভীর বেড়াজালে। একটি প্রচণ্ড দর্শন দেবী মূর্ত্তি তিনি স্থাপন করেন তাহার একটি অতি গোপন প্রকোষ্ঠে।।
[দুই]
।। দেবী মূর্ত্তি নিত্য পূজা পাইত। তান্ত্রিক আচার মানিয়া পূজা সম্পন্ন হইত সে মন্দিরে। বলা বাহুল্য বল্লাস সেনের গুরুদেব সিংহগিরিই সেই অদ্ভুত মূর্ত্তির কল্পকার। যাহার অনুপ্রেরণায় বল্লান অদ্ভুতসাগর রচনা আরম্ভ করেন। মূর্ত্তিটি ছিল কালিকাদেবীর, কিন্তু তাহাতে চীন দেশীয় কারুর ছাপ স্পষ্ট ছিল। ইহার পশ্চাতে কারণ হিসেবে বৌদ্ধ তন্ত্র সাধনার প্রভাবকে দর্শানো যাইতে পারে।।
[তিন]
।। আমি দেবশঙ্কর বর্মা। নিবাস তাম্রলিপ্ত। একটি বিশেষ কারণে আমার ডাক পড়িয়াছিল রাজ দরবারে। রাজাধিরাজ অরিরাজ মদনশঙ্কর লক্ষ্মণ সেন— ব্রাহ্মণ, বিপ্রদের প্রচুর জমি দান করিতেন। রাজদরবারের আমন্ত্রণ পাইয়া প্রথমটায় ভাবিয়াছিলাম, বোধ হয় কোনো সুসংবাদই প্রতীক্ষা করিতেছে এই অধমের জন্য। কিন্তু সভা মধ্যে প্রবেশ পূর্বক ধারণা স্বচ্ছ হইল, তাহা মোটেও নয়। তাহার আমাত্যরা সভা মধ্যে চিন্তিত হইয়া বসিয়া ছিল। অদূরে দণ্ডায়মান ছিলেন আমারই ন্যায় এক অভাগা বিপ্র সন্তান। উহার নাম দেবসেনাপতি ভট্টসূর্য। ভট্টসূর্য উহার উপাধি ছিল। অচিরেই জানিতে পারিলাম আমি। এই সভায় আমাদিগের আমন্ত্রণের একটি শর্ত ছিল, তাহা হইল— আমাদিগের জন্ম কোষ্ঠি পূর্ব্বেই দরবারে প্রেরণ করা। আমি তাহাই করিয়া ছিলাম। ভট্টসূর্যের কথা আমি বলিতে পারি না। সভা মধ্যে উপস্থিত আমাত্যদের মধ্য হইতে হলায়ুধ ও উমাপতিধর আসন ত্যাগ করিয়া উঠিয়া আমাদের উদ্দেশে একটি বার্তা প্রেরণ করিলেন, যাহা ছিল অত্যন্তই চমকপ্রদ।।
[চার]
।। তাঁহারা বলিলেন, রাজাধিরাজ অরিরাজ মদনশঙ্কর লক্ষ্মণ সেন বৃদ্ধ হইয়াছেন। এ দিকে রাজ্যের উপর নামিয়া আসিতেছে ঘোর অমঙ্গল। তুর্কি সম্রাট মোছলমান ফৌজ লইয়া অগ্রসর হইতেছেন রাজ্য আক্রমণের অভিপ্রায়ে। সেই শক্তিকে ঠেকাইবার ক্ষমতা আমাদিগের সৈন্যের নাই। সেই কারণে কোনো গোপন আলোচনা করিতে চান আমাদিগের সহিত রাজার প্রধান তন্ত্র উপদেষ্টা।।
[পাঁচ]
।। পরদিন সূর্য অস্তাচলে যাইবার পশ্চাতে আমাদিগের ডাক পড়িল গোপন মন্দির কক্ষে। এক ভয়ানক দর্শন তান্ত্রিক কক্ষ মধ্যে ব্যাঘ্রচর্ম আসনে উপবেশন করিয়া ছিলেন, আমরা প্রবেশ করিয়াই প্রণাম করিলাম তাঁকে। তাহার আত্মপরিচয় তিনি জ্ঞাপন করিলেন নারায়ণ দাস নামে। কালিকা দেবী, যিনি মন্দিরে অধিষ্ঠান করছেন, সেই মূর্ত্তি দেখিয়া সত্যই ভয়ের উদ্রেক হয় মন মধ্যে। খনিক প্রতীক্ষা করিয়া তান্ত্রিক কথা বলিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, শক্তি কম হইবার কারণে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়িবে না এ রাজ্যে। গৌড়ে লক্ষ্মণ সেনের শাসন অটুট থাকিবে। মারণ ক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত এক মহা শক্তিশালী অস্ত্র তিনি নিক্ষেপ করিয়াছেন খান শিবিরের উদ্দেশে। কিন্তু তিনি আরও শক্তিশালী কিছু ক্রিয়া করিতে চান। শত্রুর মৃত্যু ঘটিলে তো কর্ম শেষই হইয়া গেল, প্রয়োজন তাহাকে নরক যন্ত্রণা অনুভব কারানোর। যাহাতে সে কদাচিৎ অন্যের রাজ্যের দিকে লালসার দৃষ্টিনিক্ষেপ না করিতে পারে।।
[ছয়]
।। উচাটন আর বিদ্বেষণই হল সে পথ, বলিলেন তিনি। তাহার জন্য এই বিপ্র সন্তানদের মহাবিদ্যার উপাসনা করিতে হইবে। যে দেবীকে তুষ্ট করিতে হইবে তাহার নাম মাতা ধূমাবতী। কিন্তু সাধন পথ অতি কঠিন, তাই আমাদিগকে গমন করিতে হইবে প্রাগজ্যোতিষপুর। সেই স্থানে মহামায়ার যোনি পতন হইয়া এক মহা শক্তিশালী শক্তিপীঠের অবস্থান আছে। তাহার বাম পাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁসিয়া নামিয়া গেলেই মাতা ধূমাবতীর শক্তিপীঠটি পরিলক্ষিত হইবেক। সেই স্থানেই দেব কারুশিল্পী বিশ্বকর্মা নির্মিত মাতা ধূমাবতীর একটি মূর্ত্তি দর্শিত হইবেক। সেই মূর্ত্তি সংগ্রহ করিতে হইবে আর একটি ভয়াবহ, প্রায় অসম্ভব কাজ করিতে হইবে। তাহা হইল, ওই গুহারই অদূরে বাস করেন সূর্পনখ নামক চণ্ডাল এক তান্ত্রিক, তাহার নিকট তন্ত্র সাধনা অধ্যয়ন করিতে হইবে।।
[সাত]
।। আদ্রা নক্ষত্র জাত, যাহাদের জন্মদাত্রী জন্মের পশ্চাতেই গত হইয়াছেন, আর যাহাদের গণ্ড যোগে জন্ম এমন দুইজনকেই বাছিয়া লওয়া হইয়াছিল অনেকের মধ্যে। আমি আর দেবসেনাপতি ছিলাম সেই দুজন। আমরা দুইজনই ছিলাম দরিদ্র ব্রাহ্মণ। অন্ন জোগাড় করিবার চিন্তায়ই দিন পাত হইত আমাদিগের। শ্রীবিষ্ণু ও গণপতির ধ্যান ব্যাতীত কোনোরূপ সাধনারই সূত্র আমাদিগের জানা ছিল না। তাই চিন্তায় পড়িলাম আমরা। আমাদের ভাব সম্ভবত তন্ত্রাচার্যের দৃষ্টি এড়াইয়া যায় নাই। তিনি কাল বিলম্ব না করিয়াই বলিয়া উঠিলেন— তন্ত্রবিদ্যা অধ্যয়ন করিয়া আমরা যদি আমাদের কর্মে সফল হই, নরপতি আমাদিগকে দুইটি আবাদি গ্রাম প্রদান করিবেন। ইহা প্রভুত সুখকর সংবাদ ছিল আমাদিগের কাছে, যাহা বলিবার অবকাশ থাকে না।।
[আট]
।। এক শুক্লা পঞ্চমীর পবিত্র প্রাতেঃ আমরা প্রাগজ্যোতিষপুরের উদ্দেশে রওনা হইলাম। পথিমধ্যে নানা সঙ্কট উপেক্ষা করিয়া আমরা দুটি স্বাস্থ্যবান অশ্বের পৃষ্ঠে আরোহণ পূর্বক চলিতে লাগিলাম। একরাত্রে জঙ্গল মধ্যে একটি জলার নিকট আস্তানা লইলাম দুইজনে। শরীর পরিশ্রান্ত ছিল উভয়েরই। অশ্ব দুটিকে ক্ষুধা নিবারণের অভিপ্রায়ে ছাড়িয়া দিলাম নিকটস্থ বনে। কাঠ-কুটা জোগাড় করিয়া রন্ধনের তোড়-জোড় করিতেছি, এমত অবস্থায় একদল দস্যু আক্রমণ করিল আমাদিগকে। দ্রব্যসামগ্রী কিছুই না পাইবার রোষে উহারা বনমধ্যে এক অতি প্রাচীন দেউলের নিকটে লইয়া গেল দুইজনকে। আমরা বারংবার বলিতে লাগিলাম, আপনারা ব্রহ্ম হত্যার পাপ মাথায় লইবেন না। কিন্তু উহাদের তখন উন্মাদপ্রায় অবস্থা। দেউলের মধ্যে চাহিয়া দেখিলাম সেথায় কোনো বিগ্রহ নাই। কেবল রক্তিম বর্ণের একখানি মাটির স্তুপ যাহার মাথায় স্বর্ণমুকুট শোভা পাইতেছে। দস্যুদের প্রধান অতি আড়ম্বরে দেবীর উদ্দেশে ভোগনিবেদনের প্রয়াস করিতে লাগিল। উহারা দেবসেনাপতিকে বলপূর্বক হাত-পা বাঁধিয়া দেউলের সম্মুখের বেদিতে তুলিল, এক অতি প্রচণ্ড চেহারার নবযুবক খড়্গ হস্তে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহাদের প্রধান নির্দেশ করা মাত্রই খড়্গটি নামিয়া আসিল দেবসেনাপতির মস্তক লক্ষ্য করিয়া। কিন্তু অত বলশালী খর্ড়্গের আঘাতেও কিচ্ছু মাত্র হইল না তাহার। নবযুবক দ্বিতীয়বার প্রয়াস করিতে গেলে, তাহার শরীর কম্পিত হইতে লাগিল। দস্যুরা ভীত হইল, তাহাদের ধারণা জন্মিল আমরা সাধারণ মনুষ্য নই। জীবন রক্ষা পাইল দুইজনার। দস্যুরা আমাদিগকে প্রচুর সম্পদ দিয়া বিদায় করিল।।
[নয়]
।। ওই ঘটনা ঘটিবার দশম দিনে আমরা পৌঁছিলাম ব্রহ্মপুত্রের তীরে। এত প্রবল উত্তাল নদ আমি পূর্ব্বে কখনও দেখি নাই। ব্রহ্মপুত্রের বক্ষে প্রবল স্রোতের কারণেই সম্ভবত কোনও তরী অথবা নাও দৃষ্টি গোচর হইল না। প্রাগজ্যোতিষপুর প্রবেশ করিবার এই একটিই মাত্র পথ। সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র না পার করিলে প্রাগজ্যোতিষপুর গমন করা অসম্ভব। দেবসেনাপতিকে উদ্বিগ্ন দেখাইল, সে প্রশ্ন করিল, এখন উপায় কী সুহৃদ? ততক্ষণাৎ লক্ষ্য করিলাম, আমাদের অদূরে দাঁড়াইয়া আছে একটি তরী। তাহার কান্ডারি ভীষণ দর্শন এক যুবক। কেশ, শ্মশ্রু-গুম্ফে মুখ দেখা যায় না, তেমনই দৈত্যের ন্যায় চেহারা আর ভয়ঙ্কর কালো বর্ণ। আমারা পার হইবার ইচ্ছা প্রদর্শন করিতে সে একটি শর্ত দিলে, দুটি ঘোটকের একটিকে বিসর্জন দিতে হবে ব্রহ্মপুত্রে। আমাদের করিবার কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, অগত্যা তাহার কথা মানিতে বাধ্য হইলাম। দুইটি অশ্ব ও দুইজন মানুষ নিয়া তরীটি ঘাট ছাড়িল। নদের মধ্যভাগে পৌঁছিয়া একখানি অশ্বকে জলের মধ্যে ঠেলিয়া ফেলে দিল মাঝিটি। এবং প্রবল অট্টহাস্য করিতে লাগিল। আমরা ভীত হইয়া অন্য অশ্বটির দিকে সরিয়া আসিলাম। অবশেষে পার হইলাম আমরা। দেবসেনাপতি বিচলিত হইয়া নাম জিগ্যেস করিল ওই মাঝির। বিকট হাসিয়া সে উত্তর করিল— আমার নাম, ভৈরব। তারপর চক্ষের নিমেষে সেও যেন হাওয়ায় মিলাইয়া গেল।।
[দশ]
।। আমাদিগের সহিত ঘটিয়া যাইতেছে একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। নারায়ণ দাস আমাদিগকে বলিয়া দিয়াছিলেন, প্রাগজ্যোতিষপুরে প্রবেশ করিয়া কোন পথে অগ্রসর হইতে হইবে, নীলপর্বত যাইতে হইলে। নরকাসুরের মায়ার কারণে পর্বতটিকে নীল দেখায় সূর্য কিরণ পতিত হইলে। পুরানের গল্পগাথায় বর্ণিত আছে, একবার দেবাদিদেবকে কামদেব মদন বাণ মারিয়াছিলেন যাহাতে তিনি কামাতুর হইয়া পড়েন। কিন্তু দেবাদিবেদ রুষ্ট হইয়া তাহাকে তৃতীয় নয়নের তেজে ভস্ম করিয়া দেন। দেবী মহামায়ার নির্দেশে এই কামরূপে আসিয়া মদন মহাদেবকে সন্তুষ্ট করিবার অভিপ্রায় তপস্যা করেন। এতে দেবাদিদেব প্রীত হইয়া তাহার রূপ তাহাকে ফিরাইয়া দেন। সেই থেকে স্থানটির নাম কামরূপ।।
[একাদশ]
।। কামদেব মদন শাপমুক্ত হইয়া জানিতে পারেন এই স্থানে আছে সতীর যোনিপীঠ। দেব কারুশিল্পী বিশ্বকর্মার সহায়তায় এই স্থানে তিনি নির্মান করেন দেবীর বিশাল মন্দির। দেবীর নাম হয় কামরূপ কামাক্ষ্যা। পরবর্তি কালে নরকাসুর আসিয়া বসবাস করিতে লাগিলেন এই পর্বতে। স্থানটি কলুষিত হইতে লাগিল অপবিদ্যা ও জাদুবিদ্যার দ্বারা। বশিষ্ট দেব সাধনার অভিপ্রায়ে আসিয়া নরকাসুর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হইলে স্থানটিকে তিনি অভিসম্পাত দেন। তন্ত্রের যতেক খারাপ ক্রিয়া এস্থানে সিদ্ধ হইবে। এক সময় মহাকালের গ্রাসে চলিয়া যায় মন্দিরটি। কিন্তু অপতন্ত্র সিদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র এটিই।।
[দ্বাদশ]
।। দিনের প্রথম সূর্য তেজ পর্বতগুলির মস্তক চুম্বন করিবার সঙ্গেই দৃশ্যমান হইল নীল পর্বত। অপরূপ সৌন্দর্য দেখিয়া আনন্দের সীমা রহিল না এই দুই বিপ্র সন্তানের। অশ্বটিকে ছুটাইয়া দিলাম পর্বত চূড়ার উদ্দেশে। বেশ কিছু পথ অতিক্রম করিয়া লক্ষিত হইল নরকাসুর নির্মিত প্রস্তর সোপানগুলি। এই সোপান দিয়া উঠিয়া গেলেই আমরা পোঁছিব আমাদিগের কাঙ্খিত স্থানে। অশ্বটিকে একটি বৃক্ষশাখার সহিত শক্ত করে বাঁধিয়া সোপান বেয়ে উঠিতে লাগলাম আমরা। অবশেষে অরণ্য মধ্যে একটি সমভূমি খুঁজিয়া পাইলাম। ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াও এখনো বেশ কিছু নিদর্শন রাখিয়াছে এই স্থানটি। ইহার নিস্তব্ধতা জানান দেয়, ইহার গর্ভেই শায়িত আছেন মা মহামায়ার যোনিপীঠ। ইহার পুণঃ সংস্কার করিবার অত্যন্ত প্রয়োজন, কিন্তু তাহা রাজারা করিবেন, আমরা দরিদ্র ব্রাহ্মণ, ইহা সংস্কার করিবার অর্থ সংগ্রহে অপারগ বটে।।
[ত্রয়োদশ]
।। আমরা নতজানু হইয়া প্রণাম করিলাম পীঠটিকে। নারায়ণ দাস তান্ত্রিকের নিকট শুনিয়াছিলাম, এ স্থানটি তন্ত্রসাধকে পরিপুর্ণ। কিন্তু তেমন কাহাকেও দেখা যাইতেছে না। সমতল ভূমিটির বাম দিক বরাবর যে ঢাল নামিয়া গিয়াছে সেই দিকে চলিতে লাগিলাম দুইজন। সেই স্থানেই আছে মাতা ধূমাবতীর গুপ্ত মন্দিরটি। আমরা বহু কষ্টে একটি পাথরের স্তুপকে সরাইলাম। বহুকাল এ পথে কেহ গমন করে না তাহার নিদর্শন স্পষ্ট। আমরা যখন পাথর সরাইতেছি এক বিধবা বেশী অল্প বয়সি কন্যা আসিয়া প্রশ্ন করিল, আমরা কী খুঁজিতেছি? দেবসেনাপতিকে বিচলিত দেখাইল, উত্তর দিতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব করিল সে। তারপর আসল কথাটাই বলিল, আমরা আসিয়াছি ধূমাবতী মাতার মন্দির তল্লাশ করিতে। কথা শুনিয়া একচোট খুব হাসিল কন্যাটি। বলিল, পথিক তোমরা এইভাবে তাঁর মন্দির পাবে! তিনি গুপ্ত বিদ্যা, লুকাইয়া থাকাই তাঁর কাজ, আর প্রকৃতি তাঁর মন্দিরকে আপন গর্ভে লুকাইয়া রাখিয়াছে। আমরা প্রশ্ন করিলাম, এখন উপায়? তিনি হাসিয়া বলিলেন, আইস আমার সঙ্গে।।
[চর্তুদশ]
।।তাহাকে অনুসরণ করিলাম আমরা। চলিতে চলিতে এক গুহা মুখের সামনে উপস্থিত হইল সেই নারী। গুল্ম লতায় ছাইয়া আছে চারিপাশ। গুহা মধ্যে দুর্ভেদ্য অন্ধকার। কন্যাটি বলিতে লাগিল, তোমরা আসিয়াছো নিজ দেশের রাজাকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিতে, ঠিক নয়? আমরা হতবাক হইয়া তাহার পানে চাহিয়া রহিলাম। এই বিধবা কন্যাটি আমাদিগের অভিসন্ধি জানিতে পারিল কী করিয়া? আমাদিগের চোখের ভাষায় হয়ত মনের কথাখানি ফুটিয়া উঠিতেছিল। সে বলিল, মাকে তোমরা নিয়ে যেতে চাও তো? সে আশা তোমাদের পূর্ণ হবে, তবে কিনা মা বড় তেজী, তাই সাধন মার্গ জানিয়া তবেই তাহাকে টলাইতে পারিবে। আমরা প্রশ্ন করিলাম, সাধন মার্গ কী? উত্তরে সে বলিল, মহামায়ার যোনিপীঠটি পার করিয়া এক ভয়াবহ অরণ্য আরম্ভ হয়, তাহাতে কিছুদূর যাইতে পারিলেই দর্শিত হইবে সূর্পনখ তান্ত্রিকের গুহা, সে স্থানেই প্রকৃত সাধন মার্গ জানিতে পারিবে। কন্যাটির কথা শুনিয়া আশ্চর্য হইলাম, নারায়ণ দাসও এই তান্ত্রিকের নামই বলিয়াছিলেন।।
[পঞ্চদশ]
।।তাহার পশ্চাৎ অনুসরণ পূর্বক আমরা গুহা মধ্যে প্রবেশ করিলাম। জলাধারের ন্যায় একটি বিশালাকার কুণ্ড সে স্থানে পরিলক্ষিত হইল। আমাদের ওই কুণ্ডের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়া কন্যা বলিল, আমার বিস্তর কার্য পড়িয়া রহিয়াছে, আমি আসি। বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করিয়া চলিয়া গেল সে। স্কন্ধের ছোট্ট ঝোলায় ছিল কাষ্ঠের মশাল, তাহাই প্রজ্জ্বলিত করিলাম আমরা। সবকিছুই দৃষ্টিগোচর হইতে লাগিল এইবার। কুণ্ডের এক পার্শ্বে অবস্থান করছে একটি প্রস্তর নির্মিত মূর্ত্তি। মশালের আলোকে রেখা তাহার উপর পতিত হইয়া অদ্ভুত দেখাইতেছে মূর্ত্তিটি। জোনাকি কীটের ন্যায় জ্বলিতেছে তাহার দুখানি চক্ষু। অক্ষিকোটরে দেবতারা না জানি কত মূল্যবান রত্নই না লাগাইয়াছেন।।
[ষোড়শ]
।।দেবসেনাপতি বলপূর্বক মূর্ত্তিটি জমি হইতে তুলিবার চেষ্টা করিল। ইহাতে তাহার গাত্র হইতে তুশনাটি খসিয়া পড়িল। লক্ষ্য করিল না সে। আমিও হাত লাগাইলাম তাহার সঙ্গে। কিন্তু মহীরুহ যেমন মৃত্তিকাকে কেন্দ্র করিয়া তাহার আধিপত্য বিস্তার করে, এই মূর্ত্তিটিও যেন বহুদূর শাখা বিস্তার করিয়াছে তাহার। অবশেষে সিদ্ধান্ত লওয়া হইল, সূর্পনখের নিকটেই মার্গ জানিতে যাইতে হইবে আমাদিগকে।।
[সপ্তদশ]
।। ঐ কন্যার নির্দেশিত পথে আসিয়া সত্যই একখানি গুহামুখ দর্শিত হইল। গুহার বাহিরে মৃতের অস্থির হাড় জমিয়া এক কৃত্রিম পাহাড় রচনা করিয়াছে। ঢুকিতে ভয় হয়। রাজকার্যের ন্যায় মহান কার্য আর কিছুই নহে, এই কথা ভাবিয়া ত্রস্ত পায়ে আমরা গুহা মধ্যে প্রবেশ করিলাম। মশালের আলোকে গুহাটির প্রায় সমস্ত কিছুই দেখা যাইতেছে। সম্মুখের দৃশ্যটি দেখিয়া ভয় স্থির হইয়া গেলাম দুইজনেই। অস্থি চর্মসার, ব্যাঘ্রের ছাল পরিহিত এক উপাসক নিজ মস্তক ভূগর্ভের নীচে প্রবেশ করাইয়া শীর্ষাসনে পদযুগল উত্থিত করাইয়া গভীর ধ্যানযোগে মগ্ন।।
এই পর্যায় থামলেন পরেশ, অনেকখানি পড়ে তাঁর ক্লান্ত লাগছে। মুখুটি মশাইয়ের কাছে তিনি জল চাইলেন। মুখুটি মশাই তামার জলের পাত্রটা এগিয়ে দিলেন তাঁর দিকে। পরেশের নিজের ভেতরেও যেন জ়েগে উঠেছে বাকীটা জানার একটা প্রবল খিদে। সূর্পনখ তান্ত্রিক দেবসেনাপতি আর দেবশঙ্করের সঙ্গে কী করল জানতেই হবে তাঁকে। আবার পড়া শুরু করল সে।
[অষ্টাদশ]
।। অদ্ভুত ব্যাপার, সকাল হইতে সন্ধ্যা পার হইয়া এখন রাত্রি নামিয়া আসিয়াছে, অদূরেই অরণ্যে ভয়াবহ শ্বাপদদের হুংকার শোনা যাইতেছে, কিন্তু এই সাধকের শীর্ষাসন এখনও ভঙ্গ হয় নাই। ওদিকে দেবসেনাপতি ধৈর্য রাখিতে না পারিয়া নিদ্রা নিয়াছে। একা এই গুহামধ্যে ভয়ে আমার প্রাণ সংশয় হইল। হঠাৎ যেন আকস্মিক ভাবেই দৈব বলে আমার ঐ কন্যার কথা মনে পড়িল। সে কহিয়াছিল, পারিলে সূর্পনখই পারিবে। এখন প্রতীক্ষা ব্যতীত কোনো পথ নাই। কিছুকাল পার হইল এ ভাবেই। গুহার বাহির হইতে এক গগনবিদারী গর্জন ভাসিয়া আসিল। ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া কেমন জানি নিজেকে সংজ্ঞাহীন মনে হইল এই শব্দে। গুহামধ্যে যিনি প্রবেশ করিলেন, তিনি কোনো সাধারণ রমণী নন। বিকট দর্শন এক রাক্ষসীই বলা চলে ইহাকে। তাহার হস্তে শোভা পাইতেছে একটি কারুকাজ করা স্বর্ণের পাত্র, যাহাতে রাখা কাঁচা মাংস এবং অস্থি। মাংসের গাত্রে লাগিয়া আছে তাজা রক্ত। তাহা হইতে কটূ একপ্রকার ঘ্রাণ বাহির হইতেছে। পাত্রটি সূর্পনখ তান্ত্রিকের নিকটে নামাইয়া আমাদিগের দিকে ছুটিয়া আসিল সে রাক্ষসী, তাহার বক্র নখের ডগায় এখনও লাগিয়া আছে রক্তকণা। এইবার বোধ করি আমরাই তাহার শিকার হইতে চলিয়াছি। হঠাৎ, গুহা খানখান করিয়া শব্দ আসিল,
প্রস্থান…।
রাক্ষসী বাতাসে মিলাইয়া গেল চক্ষের নিমেষে।।
[উনবিংশ]
।। সূর্পনখ আমাদের দেখিয়া মোটেও প্রীত হইলেন না। তিনি চণ্ডালের ন্যায় ব্যবহার করিতে লাগিলেন। থালার মাংসগুলি আমাদের দিকে ছুঁড়িয়া মারিতে লাগিলেন। আমরা মাথা নত করিয়া একই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিলাম। এ দৃশ্য দেখিয়া থামিয়া গেলেন তিনি। হুঙ্কার দিয়া বলিয়া উঠিলেন,
কী চাস তোরা? দেবসেনাপতি অগ্রসর হইয়া বলিল,
—আমরা আসিয়াছি সুদূর গৌড় হইতে, অভিপ্রায় উচাটন ও বিদ্বেষণের শিক্ষা অর্জন এবং মাতা ধূমাবতী সিদ্ধ হওয়া। একথা শুনিয়া চটিয়া উঠিলেন সূর্পনখ। গর্জন করিয়া বলিলেন
—পামর! ধূমাবতী সিদ্ধ হওয়া অত সহজ কার্য নয়। আমার ন্যায় কঠিন পথে কঠোর সাধনা করিতে হইবে, সে পথে সূচিতা অসূচিতা বলিয়া কিছু নাহি, অপরিশোধিত মাংস ও মদ্য ভক্ষণ করিতে হইবে। আর দুইজনের মধ্যে কেবল একজনই সেই সাধনায় সিদ্ধ হইতে পারিবে। সাধন সমাপ্ত হইলেও নানা ভাবে জীবন সংশয়ের ভয় থাকিবে। আমাকে অবাক করিয়া দিয়া দেবসেনাপতি পুনর্বার অগ্রসর হইয়া সম্মত হইল সে প্রাণের ভয় করে না, সেই সাধন পথে এগিয়ে যেতে চায়।।
[বিংশতি]
।। পরদিন প্রাতঃকাল হইতে সাধনা শুরু হইল দেবসেনাপতির। আমাকে সেই গুহামধ্যে থাকিতে দিলেন না সূর্পনখ তান্ত্রিক। অদূরেই অন্য একটি গুহায় আশ্রয় লইলাম আমি। সূর্পনখ তান্ত্রিক নির্দেশ দিলেন, আমি যেন কোনও প্রকারেই আমার সঙ্গীটির সহিত সাক্ষাৎ না করি। এতে অনর্থ হইতে পারে। তারপর হইতে আমার দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল অরণ্যের নানা প্রান্তে ঘুরিয়া। দিনে একবার করিয়া যাইতাম ওই সমতল ভূমিটিতে, যে স্থানে আছে কামদেব মদনের পূজিত শক্তিপীঠ খানি। সেই স্থানে যাইয়া গা ছমছম করিত ঠিকই। কারণ স্থানটি ছিল অত্যন্ত নিঃস্তব্ধ, সে স্থানে দাঁড়াইলে মনে হইত নরকাসুরের আজ্ঞাবহ প্রেতরা আমাকে দেখিতেছে। তবুও এক অদ্ভুত প্রশান্তি আসিত সে স্থানে পৌঁছিয়া মাত্রই।।
[একবিংশ]
।। প্রায় রাতই আমি কাটাইতাম বিনিদ্র। অরণ্যের মধ্য হইতে ভাসিয়া আসিত নানা প্রকারের জীব-জন্তুর ডাক। দিনের একটি সময় এই পাহাড়ের উপর উড়িয়া বেড়াইত একপাল অদ্ভুত দর্শন গৃধ্র। মনে একদিন উদয় হইল এক প্রবল বাসনা, এই পাহাড় চূড়ায় এই গৃধ্রের দল মৃতদেহ পায় কোথা হইতে, তাহা জানিতেই হইবে আমাকে। উহারা যে স্থানে উড়িতে থাকে সে স্থান অনুসরণ করিয়া পৌছাইলাম। সে স্থানে যাহা দেখিলাম তাহা বর্ণনা করিতে গিয়াও আমার হস্ত কম্পিত হইতেছে।
অরণ্যর মধ্যভাগে একটি ফাঁকা স্থানে হাওয়া বাতাস চলিতেছে না, সেই স্থানে একদল মৃতদেহ, আর একদল মৃতদেহর হাড়-মাস চিবাইয়া খাইতেছে। শরীরের অভুক্ত অংশ বিশেষ টানিয়া ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিতেছে তাঁরা, কিছু পরে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। দেখিলাম দেবসেনাপতি নগ্ন শরীরে দৌড়াইয়া গেল সেই মড়ার ভিড়ে এবং একজনের নিকট হইতে একটি মড়ার শরীরে কিছু অংশ টানিয়া লইয়া খাইতে লাগিল। তাহার মুখ দেখিয়া মনে হইল, সে যেন অদ্ভুত তৃপ্তি লাভ করিতেছে এই মাংস ভক্ষণ করিয়া। উহাকে ডাকিলাম না, মন বলিল, একবার ডাকিলেই আমার মৃত্যু অনিবার্য। জীবন রক্ষার তাগিদে আমি আমার গুহার উদ্দেশে দ্রুত পদচালনা করিয়া দিলাম।।
[দ্বাবিংশ]
।। আমার সহিত যে মিত্র আসিয়াছিল, যাহার অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশে ভয়াবহ দস্যু হইতে প্রাণ বাঁচিয়া ছিল, তাহার এই করুণ পরিণতি দেখিয়া, অধিকাংশ সময়ই আমার উদাস ভাবে কাটিতে লাগিল। সঙ্গে আনা খাদ্যের উপকরণ বহুদিন পূর্ব্বেই শেষ হইয়াছিল, দস্যুদের দেয়া খাদ্য সামগ্রীও শেষ হইয়া আসিতেছে। অরণ্যের ফলমূল খাইয়া দিনপাত করিবার কথা ভাবিতে লাগিলাম। এক সন্ধ্যায় বসিয়া আছি গুহামধ্যে, বাহিরে প্রবল ঝঞ্চা আরম্ভ হইল। যেন প্রকৃতি আজই মহাপ্রলয় দেখাইয়া শান্ত হইবেন। উন্মত্ত বাতাসে গুহার মধ্যস্থিত আগুনখানি নিভিয়া গিয়াছে, অগত্যা বসিয়া আছি তমিস্রার মাঝে। কিছুই দেখিতে পাইতেছি না, মধ্যে মধ্যে অশনির প্রবল আলোকে দৃশ্যাইত হইতেছে বাহিরের অরণ্যখানি। হঠাৎ সেই বজ্রের ঝলকের মধ্যেই দেখিতে পাইলাম একটি কালো ছায়াকে। ভয় অসাড় হইয়া আসিল সর্ব শরীর। এই গুহায় আশ্রয় লইয়াছি আজ ত্রয়োদশ দিবস, আজ অবধি এই গুহার মধ্যে বা বাহিরে কাহাকেও দেখি নাই। তাই অলৌকিক কিছুর ইঙ্গিতেই প্রাণ যাইবার উপক্রম হইল। তখনই একটি শব্দ ভাসিয়া আসিল,
“ভয় পাহিও না মিত্র, আমি ভট্টসূর্য। আমার সাধনা আজ শেষ হইয়াছে, আমি ধূমাবতী সিদ্ধ হইয়াছি, উচাটন বিদ্বেষণ ক্রিয়ায় আমার ন্যায় সমতুল্য আর কেহই নাই।।
[ত্রয়োবিংশ]
।। ঝঞ্ঝা কমিতেই আমি পাথর ঠুকিয়া আলো জ্বালাইলাম গুহামধ্যে। দেবসেনাপতিকে দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেলাম। তাহাকে আর জীবিত মানুষের মত দেখিতে নাই। তাহার শরীরের সমস্ত শোণিত কেহ টানিয়া লইয়াছে, চোখের নীচ অঙ্গারের ন্যায় কালো বর্ণ ধারণ করিয়াছে। সে হাঁপাইতেছে। যমরাজ যেন গুহার দ্বারে দাঁড়াইয়া আছেন তাহাকে লইয়া যাইবেন বলিয়া। তাহার শরীর স্পর্শ করিয়া বুঝিলাম তাহা অগ্নি শলাকার ন্যায় তপ্ত। সেবা প্রয়োজন তার, অবিলম্বেই সেবা শুরু করিয়া দিলাম। দুইদিন ধরিয়া জীবন মৃত্যুর মাঝে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলিল যেন।।
[চতুর্বিংশ]
।। দুইদিন ক্রমাগত মৃত্যুর সহিত লড়াই করিয়া, তৃতীয় দিবসে উঠিয়া বসিল সে। ওই অসুস্থ শরীরেই বলিল, চল এইবার যাইবার সময় হইয়াছে। যদিও আমি ফিরিতে পারিব কিনা বলিতে পারি না। তাহার কথা শুনিয়া মায়া হইল আমার। সে আবার বলিতে লাগিল, সূর্পনখের দেয়া বিদ্যা আমি তোমাকে বলিতেছি, তুমি উহা লিপিবদ্ধ করিয়া রাখ, আমার যদি কিছু হিতাহিত হইয়াও যায় তুমি তাহার প্রয়োগ করিতে পারিবে। আমি মন দিয়া শুনিতে লাগিলাম তাহার কথা। সে বলিল, ক্রীং বীজ মন্ত্র দ্বারা কালিকা দেবীর আবাহন পূর্ব্বক আরম্ভ করিতে হইবে সাধনা। দশমহাবিদ্যার প্রথমা দেবী তিনিই, তিনি প্রীত হইলেই অন্যান্য সাধনা কালে কোনো বাধা-বিঘ্ন ঘটিবে না। এবং আপদ বিপদের ভয়ও থাকিবে না।
ইহার পর আসল সাধনায় প্রবেশ করিতে হইবে। জেনে রাখো ধূমাবতী দেবীর ক্ষুধানির্বৃত্তি করা সাধারণ কর্ম নয়। দেবাদিদেবের কাছে উমা একবার প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়া পৌঁছিলেন, তাঁহার নাকি ক্ষুধাই মিটিতেছে না। এমত অবস্থায় মহাদেবও যখন তাহার ক্ষুধার নির্বৃত্তি করিতে অক্ষম হইলেন, তিনি তাহাকেও গিলিয়া ফেলিলেন। পরে শিবকে পুনরায় উগরাইয়া দিলেন মহামায়া। কিন্তু ততক্ষণে মহাদেব ক্রোধাহ্নিত হইয়াছেন। তিনি মহামায়াকে বলিলেন যে নারী ক্ষুধার ইচ্ছায় নিজ স্বামীকে ভক্ষণ করে সে আজ হইতে বিধবা। আর মহামায়ার ভয়ঙ্কর বিধবা রূপটিই হইল এই মাতা ধূমাবতী।
যাহার সূচিতা-অসূচিতা বলিয়া কিছুই নাই। তিনি কেবল বোঝেন ক্ষুধা। যে সাধক তাহাকে তুষ্ট করিতে সক্ষম হন, তাহাকে তিনি নির্বাণ লাভ করান। প্রতুল শক্তির অধিকার জন্মে সেই সাধকের। এই ক্ষুধা নিবারণের পথে বৃদ্ধ শিশু নারী পুরুষ কিছুই নাই। তিনি সবই খান।
যে সাধক উত্তরমুখে উপবেশন করিয়া, দেবীর ধ্যান আবাহনাদির পর উপাচারের সহিত শোধিত মদ্যের দ্বারা এবং একলক্ষ পঁচিশ হাজার মন্ত্র জপে মন্ত্র সিদ্ধ করিয়া পূজার্চনা করিবে তাহাকে দেবী কাঙ্খিত বরদান করিবেন।
দেবীর মূল বীজমন্ত্র হইল ‘ধূং ধূং ধূমাবতী স্বাহাঃ’। যাহার অর্থ হইল ধূম্রজাল হইলে আগত, হে মাতা ধূমাবতী তোমার নিকট আহুতি দিতেছি।
শ্মশান হইতে ভস্ম আনিয়া মূলমন্ত্রে শত্রুর গৃহমধ্যে প্রোথিত করিলে শত্রুর উচাটন হইয়া থাকে। শ্মশান ভস্মদ্বারা শিবলিঙ্গ প্রস্তুত করিয়া, তাহার আরাধনা করিতে করিতে দুইটি কাক পক্ষী একত্রিত করিয়া তাহার উপরি অষ্টোত্তরশতবার মূলমন্ত্রে জপের পর শত্রুর নাম উল্লেখ করিয়া ”অমুকং দ্বেষয়” এইরূপ বাক্যের পর বীজ মন্ত্র জপ করিলে শত্রুদের মধ্যে মহাবিদ্বেষ উপস্থিত হইবে।
ইহা ব্যাতিত, যজ্ঞডুমুর ও ক্ষীরীবৃক্ষের কীলক প্রস্তুর করিয়া তদুপরি শত্রুর নাম লিখিয়া বীজ মন্ত্র জপ করিয়া মাটিতে প্রোথিত করিতে হইবে। তাহার উপর শত্রুর পদধূলি এবং ঘৃতদ্বারা মন্ত্র জপ করিতে হইবে এবং বলি প্রদান করিতে হইবে। সেই বলির চিতাভস্ম উপর আচার করিয়া সেই ভস্ম শত্রুর গৃহ মধ্যে প্রোথিত করিলে উচাটন হইবেই হইবে।
উচাটন হইল সেই ক্রিয়া যাহার দ্বারা মানুষের বিচার বুদ্ধিকে হত্যা করা যায়। ইহা অভিচার বা পাপক্রিয়া। ইহার দ্বারা মানুষকে অশান্ত ও অস্থির করিয়া তোলা যায়। উন্মাদ হয়ে উঠে মানুষ। আর বিদ্বেষণ হইল দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে কলহ বা বিবাদ সৃষ্টি করা। ইহাও অভিচার, প্রয়োজন ব্যাতীত ইহা করাও অনুচিত।
দুইটি যন্ত্র দেবসেনাপতি আঁকিল গুহাগাত্রে প্রজ্বলিত কাষ্ঠের কালি দ্বারা। তাহার পর বলিল, ইহাই হইল মাতার যন্ত্র। যন্ত্রে মধ্যে স্বয়ং শক্তি বিরাজ করেন। তুমি যদি ক্রিয়া করিতে চাহ অবশ্যই এই যন্ত্র পূর্ব্বে সিদ্ধ করিয়া লইবে। যন্ত্র দুইটি আমিও আঁকিয়া লইলাম একটি পত্রের উপরিভাগে।


দেবসেনাপতি পুনরায় বলিল, উপরিভাগে যে যন্ত্রটি আঁকিলাম, ওই যন্ত্রের সাহায্যে করিতে হইবে গুহ্যাতিগুহ্য ক্রিয়াগুলি। আর নিম্নের যন্ত্রটি ধূমাবতীর আসল যন্ত্র, উহাকেই দেবী কল্পনা করিয়া পূজা করিলে এবং ষোড়শপচারে আরাধনা করিলে অভিষ্ট সিদ্ধ হইয়া থাকে।
তবে এই সাধনা বড় কঠিন, এই সাধনার সাধকের বিন্দুমাত্র সংসার বা কামিনীকাঞ্চনের চিন্তা মাথায় আসিলেই ঘোর অনর্থ হইবে।
আমরা এক্ষণে সেই শক্তির অধিকারী হইয়াছি, যাহার দ্বারা ধূমাবতীর গুহা হইতে বিগ্রহটি উঠাইয়া লইয়া যাইতে পারি। আর দেরি না করিয়া কাল প্রাতেই উহা তুলিয়া লইয়া যাইব চল। দেবসেনাপতি আর কথা বাড়াইল না, ক্লান্তিতে শয্যা লইল।।
[পঞ্চবিংশতি]
।। প্রাতেঃ উঠিয়াই দেখিলাম কালোমেঘে ছাইয়া আছে আকাশ। দেবসেনাপতি বিলম্ব করিতে চাহিল না। অনেক সময় লাগিয়া যাইবে ফিরিতে। তাহার মধ্যে মাত্র একটি অশ্বই ভরসা। দেবসেনাপতি নিজের অসুস্থ শরীরের কথাও ভাবিল না। হাঃ ঈশ্বর তাহা যদি সে ভাবিত, তাহা হইলে ঘোর বিপদ এড়ানো যাইত।
আমরা দ্রুত পদচালনা করিয়া পৌঁছাইলাম ধূমাবতী মাতার গুহায়, যেথায় কোনো এক সময় মন্দির ছিল। বিনা বাধায় ভট্টসূর্য তুলিয়া লইল মাতার নাতিদীর্ঘ প্রস্তর মূর্ত্তিখানি। অথচ দুইজনে মিলিয়াও একদিন এ মূর্ত্তি তুলিতে পারি নাই।
পথে চলিতে চলিতে আমি দেবসেনাপতিকে প্রশ্ন করিলাম, আচ্ছা মিত্র, ধর সাধনায় কোনো ভুলত্রুটি হইয়া গেলে দেবীর প্রকোপ পড়ে যদি তাহা হইলে পরিত্রাণের উপায় কিছু আছে? সে হাসিয়া জবাব দিল, আছে সখা আছে। একজন সিদ্ধ পুরুষ, যাহার এ বিশ্বসংসারের সকল কামনা-বাসনা ত্যাগ করা হইয়া গিয়াছে। ভূত, পিশাচ, যক্ষ, রক্ষ, গন্ধর্ব যাহার বশীভূত, যিনি একাধারে ঘোরের ঊর্ধ্বে উঠিয়া গিয়াছেন এবং প্রথমা মহাবিদ্যা কালিকার স্বরূপকে পূজা করেন, তিনি এই যন্ত্রের প্রকৃত বিসর্জন করাইয়া এই মূর্ত্তিটি যথাস্থানে পুনরায় ফিরাইয়া দিলেই দেবীর প্রকোপ শান্ত হইবে। ইহাই গুরু সূর্পনখের বচন।।
পরেশ ভট্টাচার্য থামলেন এখানে। তারপর বললেন,
“জ্যাঠা মশাই এখানেই পুঁথিটি শেষ বলে দাবী করছেন। পুঁথির আর কোনো অধ্যায় অবশিষ্ট নেই বলেছেন তিনি।” রামচরণ মুখুটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন পরেশের দিকে, তারপর প্রশ্ন করলেন—“দেবসেনাপতি আর দেবশঙ্করের পরিণতির কথা কিছুই লেখা নেই? তাঁরা বাংলায় ফিরলেন কিনা, লক্ষ্মণ সেনের কাছে সেই শক্তি পৌঁছাল কিনা কিচ্ছু লেখা নেই?”
“নাহ্! দাঁড়ান আরও কয়েকটা লাইন লেখা আছে বটে, কিন্তু সেটা অধ্যায় আকারে নেই।” বললেন পরেশ।
পরেশ বলতে শুরু করলেন—
“আমি দেশে ফিরিয়া আসিয়াছিলাম। কিন্তু আমাদের এই সাধনা কোনো কর্মেই লাগে নাই। দেশে ফিরিয়া দেখিলাম মুহম্মদ-বিন-বক্তিয়ার খিলজির সেনা বঙ্গদেশ আক্রমণ করিয়াছে এবং রাজাধিরাজ জীবন রক্ষার্থে অন্যত্র চলিয়া গিয়াছেন। আমি একাই ফিরিয়াছিলাম প্রাগজ্যোতিষপুর হইতে। ব্রহ্মপুত্র পার হইবার মুহূর্তে ভয়াবহ এক প্রলয় উপস্থিত হইল। দেখিতে পাইলাম সেই বিকট দর্শন মাঝিটিকে। এবার আর পারাপারের অভিপ্রায় সে কারো প্রাণ দাবী করিল না। কিন্তু নদের মধ্যভাগে পৌঁছাইবার পূর্ব্বেই আমাদের তরীটি কাত হইয়া গেল, অসুস্থ শরীরে টাল সামলাইতে পারিল না দেবসেনাপতি। সে পড়িয়া গেল জলে। স্রোতের এত ভয়াবহ টান ছিল যে তাহার ভাসিয়া যাইতে বেশি সময় লাগিল না। বিকট শব্দে হাসিয়া উঠিল নৌকার মাঝিটি। আমি জ্ঞান হারাইলাম। জ্ঞান ফিরিতে দেখিলাম আমি অন্যপারে, আর অশ্বটি অদূরে কচি তৃণ সেবন করিতেছে। উহারে লইয়া আমি দেশের উদ্দেশে গমন করিলাম। আমার ঝোলাখানি সঙ্গেই ছিল, যাহাতে ছিল দেবী মূর্ত্তিখানি। আর পত্র অঙ্কিত যন্ত্রদ্বয়। তাহা লইয়া তাম্রলিপ্ত হইতে পশ্চিমে গমন করিলাম। এবং পুঁথি আকারে লিখিয়া রাখিলাম যাত্রার কাহিনি। ভবিষ্যতের কোনও সাধক ইহা পাইলে তাঁর নিকট আমার আবেদন রহিল, সঠিক ভাবে এই মূর্ত্তির সাধনা করিবে, নচেৎ ঘোর বিপদ।
এইখানেই লেখা শেষ,” থামলেন পরেশ। এতক্ষণে রামচরণ মুখুটিরও সব প্রশ্নের নিরসন হয়েছে। পরেশকে ভাবিত দেখাল। পুঁথিটি পাঠোদ্ধার করেও, ছেলের সুস্থ হওয়ার রাস্তা তিনি খুঁজে পাননি। তাঁকে নিরাশ দেখে তাঁর পিঠে হাত রাখলেন মুখুটি মশাই। বললেন,
”চিন্তা কোরো না, তোমার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠবে। তোমার জ্যাঠাকে রক্ষা করতে যেমন একজন সাধু এসেছিলেন, তোমার ছেলেকে রক্ষা করতেও কেউ না কেউ নিশ্চয়ই আসবে।”
পরেশ একটু নড়ে-চড়ে বসলেন, তারপর বললেন, “
“একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে জ্যাঠা মশাই, দেবশঙ্করের কাছে পুঁথি ও মূর্তি দুটোই ছিল, তাই লেখা আছে এই পুঁথিতে, তবে মূর্তি পাওয়া গেল কালীঘাটের এক তান্ত্রিকের কাছ থেকে আর পুঁথি দিয়ে গেলেন এক অন্য সাধু, এটা কী করে সম্ভব?”
“সে প্রশ্ন আমাকেও ভাবাচ্ছে, এর পেছনে নিশ্চয় কোনও গূঢ় রহস্য আছে!” কথাটা বলে শূন্য আকাশের দিকে তাকালেন রামচরণ মুখুটি।
“তবে এখন অপেক্ষা করতে হবে সেই সাধকের, যে পরিত্রাতা হয়ে আসবে।” উঠে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে এগোলেন তিনি। মালতির চারাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে একটু জল দেওয়া দরকার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন