মনীষ মুখোপাধ্যায়
শ্রীলা বসে অপেক্ষা করছে আশ্রমের বসার ঘরটাতে। গুরুদেব বলেছেন আজ সেই লোকটা আসবে, যাঁর হাতে রয়েছে তাদের বিপদমুক্ত হওয়ার চাবিকাঠি। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে শ্রীলার মাথায়, কাল রাতে তার নিজের স্বামীর উপর দিয়ে বয়ে গেছে বড় একটা ঝড়। ভগবানের অশেষ করুণা যে এখনও প্রাণে বেঁচে আছে মহীতোষ, না হলে তো তাঁর গাড়ির তলায়ই চলে যাওয়ার কথা ছিল।
অনেক রাতে একটা ট্যাক্সি নিয়ে টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছিলেন মহীতোষ, তাঁর হাত পা তখনও ভয়ে ঠান্ডা ছিল। অত রাতে বেলের শব্দে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভাশুরের যা অবস্থা, কোনো খারাপ খবরই হয়ত নিয়ে এসেছে এ মাঝরাতের কলিং বেলের ধ্বনি, মনে করেছিল সব্বাই। কিন্তু মহীতোষকে দেখে সবাই আরও অবাক হয়েছিল। সবাইকে চিন্তা মুক্ত করতে মহীতোষ সেই মুহূর্তে বলেছিলেন, কোনো সমস্যা হয়নি, হাসপাতালের পরিবেশে তাঁর একটু দমের সমস্যা হচ্ছিল বলে তিনি বাড়ি চলে এসেছে।
কিন্তু সবাই ঘুমিয়ে পড়তেই আসল কথাটা শ্রীলাকে খুলে বলেছিলেন মহীতোষ। ভিজিটার্স কেবিনে ওই ভয়ানক মহিলার কথা, সে নাকি দাদাকে নিতে এসেছে! আর তারপর ছুটে পালাতে গিয়ে গাড়ির সামনে এসে পড়া। আর একটু ভুলচুক হলে তিনি আর বেঁচে ফিরতেন না।
ওদিকে আজ সকালে হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল, কুমারেশের শরীরের অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়েছে। শ্বাস কষ্ট হচ্ছে খুব। ডাক্তারেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। না হলে আবার অ্যাটাকের সম্ভাবনা আছে।
সকাল সকাল কুমারেশের মেয়েও এসে পৌঁছেছে বিদেশ থেকে। এমনিতে মেয়েটা ভালই, কিন্তু তার প্রধান সমস্যা হল, সে সবেতেই একটু বেশি বোঝে। মা কাকীমার কাছে ওই ছবি বা অভিশাপের কথা শুনে সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে
—“অল রাবিশ। মেডিকেল সায়েন্সের উন্নতির যুগে দরকার প্রপার ট্রিটমেন্টের আর তোমরা কোথাকার কোন পুরানো আমলের ধ্যানধারণা নিয়ে বসে আছ।”
এখন অম্লান আর সে গেছে হাসপাতাল। আর শ্রীলা এসেছে আশ্রমে, দেখা যাক যে ভদ্রলোকের কথা গুরুদেব বলেছেন, তিনি কোনও রাস্তা বার করতে পারেন কিনা!
গুরুদেব এসে পাশে বসলেন শ্রীলার। মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“চিন্তা করিস না রে মা। মহামায়া আদ্যাশক্তি কারো ক্ষতি হতে দেন না। আর তিনি ভক্তের মনবাঞ্ছা পূরণ করেন। ডাক তাঁকে মন দিয়ে, তিনি বিপদ থেকে উদ্ধার করবেনই।”
ইতিমধ্যে একটা বছর ছাব্বিশ-সাতাশের ছেলে এসে গুরুদেবকে প্রণাম করল। হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন গিরিজানন্দ মহারাজ। ছেলেটি অসম্ভব সৌম্যকান্তি, উচ্চতা দেখে লম্বা বলা চলে না, তবে বেঁটেও নয়। একটা সাদা পাঞ্জাবি আর একটা সস্তার টেরিকটনের প্যান্ট পরে আছে ছেলেটা। গিরিজানন্দ স্নেহের গলায় বললেন,
“বোসো শঙ্খ, তারপর শরীর ভালো তো?” ছেলেটি লাজুক ভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো যে সে ভালো আছে। গুরুদেব হেঁকে বললেন,
“এই কে আছিস? শঙ্খ এসেছে একটু জল বাতাসা দিয়ে যা না।” তারপর শ্রীলার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন,
“তোকে যার কথা বলেছিলাম, এই সে!”
শ্রীলা একমনে তাকিয়ে দেখল ছেলেটির দিকে। এতো একটা বাচ্চা ছেলে, এই ছেলেটা কীভাবে তাদের শাপমুক্ত করবে? যে শাপ এত কাল ধরে তাদের বংশের মাথার উপর কালরূপী মৃত্যুর মত ঝুলে আছে। যার প্রভাব প্রতিবারই শক্তিশালী ঝঞ্ঝার মতই কাউকে না কাউকে গ্রাস করেছে।
“ইনি কি পারবেন?” একটা অবিশ্বাস নিয়ে গুরুদেবের কাছে প্রশ্নটা করল শ্রীলা।
গিরিজানন্দের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসির রেখা দেখা দিল। তারপর তিনি বললেন,
“ওর চেহারা দেখে ওকে বিচার করাটা বিরাট ভুল হবে। সাধক মানেই তাকে পট্টবস্ত্র ধারণ করতে হবে, লাল বা সাদা বা গেরুয়া বসন পরতে হবে এ চিন্তা করা ভুল। এই ছেলেটা তান্ত্রিক গুরু অমর ভট্টাচার্যের শিষ্য। যিনি একাধিক যোগিনী ও যক্ষিণী সিদ্ধ ছিলেন, আর ছিলেন মহাকালভৈরবের উপাসক। এই ছেলেটি সেই মহাকালভৈরবের দীক্ষাই গ্রহণ করেছে, আর এত কম বয়সেই বিরজা হোম করে নিজের যজ্ঞোপবীত আহুতি দিয়ে কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ করেছে।”
তারপর তিনি আবার শব্দ করে হেসে বললেন,
“যদি কেউ পারে এই পারবে।”
শঙ্খশুভ্র হাত জোড় করে নমস্কার করল শ্রীলাকে।
গুরু গিরিজানন্দ শ্রীলার পরিবারের সঙ্গে যা যা ঘটছে সব ঘটনা খুলে বললেন শঙ্খশুভ্রকে। বাধ্য ছাত্রের মতই মাথা নীচু করে সবটা শুনল শঙ্খশুভ্র। তারপর শ্রীলার দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“দেরি করে লাভ নেই, চলুন দেখি আপনার বাড়ি। দেখি কোন শক্তির অভিসম্পাত ঝরে পড়ছে সেখানে।”
আশ্রম থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে বসল শ্রীলা আর শঙ্খ।
গাড়ি এগোতে লাগল হাজরা মেন রোড ধরে। শ্রীলা মাথা নীচু করে বসে আছে, ভয়টা তার ভেতর থেকে কিছুতেই বেরচ্ছে না। পরিস্থিতি সহজ করার জন্য শঙ্খ প্রশ্ন করল,
“আপনারা কলকাতায় কতদিনের বাসিন্দা?” যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা ভাবছিল শ্রীলা, শঙ্খের প্রশ্নে কেমন যেন চমকে উঠল সে। তারপর বলল,
”কিছু বললেন আমাকে?”
শঙ্খ আবার প্রশ্নটা করল।
শ্রীলা একটু সময় নিয়ে উত্তর দিল,
“যতদূর শ্বশুরমশাইয়ের কাছে শুনেছি, প্রায় একশো বছর আগে একটা দুর্ঘটনার পর তাঁদের পরিবারের সকলে কলকাতা চলে আসেন চাকদা থেকে। সেই থেকেই শ্বশুর বাড়ির স্থায়ী আস্তানা হয় গড়িয়াহাট। ওঁদের যেহেতু পূর্বপুরুষের ব্যবসা ছিল মদের, কলকাতা এসেও সেই ব্যবসা শুরু করেন শ্বশুর মশাইয়ের এক কাকা। সেই থেকে এখানেই…।”
ট্রাফিক খুব বেশি না থাকায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ি পৌঁছে গেল গড়িয়াহাট। সাউ বাড়িতে ঢুকে, তার সৌন্দর্য দেখে তাক লেগে গেল শঙ্খশুভ্রের। আনাচে-কানাচে আভিজাত্য আর ধনসম্পদের চিহ্ন চোখে পড়ে। একটুকুও খারাপ কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে গিরিজানন্দ বলেছেন শঙ্খকে, এ’বাড়িতে সপ্তম মহাবিদ্যা ধূমাবতীর অভিশাপ আছড়ে পড়েছে! অবাক হচ্ছে সে, এখনও কেন তার দৈব ক্ষমতা তাকে জানান দিচ্ছে না, কোনও অপার্থিব ইঙ্গিতের কথা? তাহলে কি এ’বাড়িতে কিছু নেই? নাকি যার প্রাণ নেবে তার সঙ্গেই ছায়ার মত ঘুরে বেড়ায় সেই মহাশক্তিশালী বিদ্যা? অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে ভীড় করতে লাগল শঙ্খশুভ্রের মাথায়।
“কিছু বুঝতে পারলেন?” শ্রীলার হঠাৎ করা প্রশ্নে চটকা ভাঙল শঙ্খের। সে মিষ্টি হেসে উত্তর দিল, “আর একটু ভালো করে দেখতে হবে ম্যাডাম, সব ঘরগুলো।” শ্রীলা হাঁক পাড়ল—
“দয়ালদা, এই বাবুকে সব ঘরগুলো একটু ঘুরিয়ে দেখাও।” মহীতোষ-শ্রীলার ঘর, প্রভাদেবীর ঘর, ছাদ, ঠাকুরঘর সব এক এক করে দেখল শঙ্খ, কিন্তু তেমন কোনও অশুভ কিছুই চোখে পড়ছে না। প্রভাদেবী শ্রীলার কানে ফিসফিস করে বললেন
—“ওই একরত্তি ছেলে, ও কি উদ্ধার করবে আমাদের?” তাঁর চোখে মুখে যেন স্পষ্ট বিস্ময়ের ঘোর। শ্রীলা আলতো করে হাতটা চেপে ধরল জা’এর, সেও একই ভাবে উত্তর দিল
“গুরুদেব বলেছেন, এই ছেলেটার নাকি অনেক ক্ষমতা।”
হচ্ছে নাহ্, এভাবে হবে না, মনকে শূন্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এবার কোনও সাধারণ শক্তির সঙ্গে লড়াইটা নয়। লড়াইটা এক মহাবিদ্যার সঙ্গে। অমর ভট্টাচার্য, শঙ্খের তান্ত্রিক গুরু, যিনি বলেছিলে, মহাশক্তির সঙ্গে লড়াই করবার আগে মনটাকেও মহাশক্তিশালী বানিয়ে নিবি রে হারামজাদা…। তারপর খুব একচোট খ্যাঁক…খ্যাঁক করে হেসেছিলেন। মনটাকে চিন্তা শূন্য করার চেষ্টা করল শঙ্খ। এই কাজে আজকাল আর বেশি সময় লাগে না তার। এটা একটা ব্যায়ামের মত। ব্রহ্মতালুর উপর সব চেতনভার মুক্ত হয়ে ক্রমাগত জোর দিয়ে যেতে হবে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস চলবে খুব স্বাভাবিক ভাবে। এইতো হচ্ছে, সে পারছে। আনন্দ হল শঙ্খের।
প্রত্যেকটা ঘরেই যেন জমেছে রাশি রাশি ধোঁয়া। কয়লার উনান ধরালে যেমন জমে ঠিক তেমন। শঙ্খ মনোনিবেশ করার চেষ্টা করল। এবার বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সব কিছু। ধোঁয়ার মধ্যে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন একজন ভয়ঙ্কর দর্শন স্ত্রীলোক, বিধবার বেশ তাঁর। চোখ, মুখ, কান, নাক ভয়ঙ্কর বিকৃত। ক্ষুধার জ্বালায় তাঁর ঠোঁটের কষ থেকে গড়িয়ে পড়ছে লালা। চোখের নিমেষে সেই স্ত্রীলোকটি সামনের দিকের একটি ঘর থেকে হাত ছয়েক দূরের একটি ঘরে ঢুকে গেলেন। ঘাবড়ে গিয়ে শঙ্খ হঠাৎ প্রশ্ন করল
—“ওই… ওইদিকে… কার ঘর?”
শ্রীলার একটা চাপা টেনশন কাজ করছিল এতক্ষণ। শঙ্খের হঠাৎ প্রশ্নে সেও যেন একটু হতচকিত হয়েই উত্তর দিল
—“ওটা আমার ভাশুরের ঘর… কেন মানে… কিছু কী?”
“আর ঠিক একটু দূরেই ওই ঘরটা কার?”
“ওটা আমার মেয়ের…।” একটা চাপা উত্তেজনায় বুকটা কামারের হাপরের মত ওঠানামা করতে লাগল শ্রীলার।
চোখ সরু করে কিছুক্ষণ ওই ঘরটার দিকে তাকিয়ে দেখল শঙ্খ। ততক্ষণে ওই ঘোরের অবচেতন জগতটা থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। যার সাহায্যে এক্ষুণি সে দেখতে পেয়েছে একজন বিধবা বিকট দর্শন স্ত্রীলোক ওই ঘরটার দিকে ঢুকছে। ঘোর কাটতেই অবাক হল শঙ্খ, সেই ঘরের দরজা যে বন্ধ! তাহলে ওই স্ত্রীলোকটি ঘরে ঢুকল কী ভাবে? বিপদের একটা গন্ধ পাচ্ছে শঙ্খ। ঠান্ডা, শীতল একটা অনুভূতি গ্রাস করছে তাকে… আস্তে আস্তে… খুব সন্তর্পণে। এই পরিবারটা যেন একটা মেঠো ইঁদুর আর তাকে কেন্দ্র করে পাক খেতে খেতে উড়ছে মৃত্যুরূপী পাহাড়ি বাজ, সুযোগ খুঁজছে, যে কোনো সময় ঝপ করে তার বিষাক্ত নখর থাবায় তুলে নেবে শিকারকে।
“ওই ঘরে কি কেউ আছে?” প্রশ্ন করল শঙ্খ।
শ্রীলার উত্তেজনা যেন কিছুতেই কমছে না, ছেলেটার হেঁয়ালি তাকে বিরক্ত করছে।
বিরক্তি চাপা দিয়ে সে বলল,
“হ্যাঁ আমার মেয়ে পড়ছে ওই ঘরে… কেন?”
ধীর পায়ে শঙ্খ এগোতে লাগল ঘরটার দিকে। এতক্ষণ সে শুধু একটা ভালো শক্তির ইঙ্গিত পাচ্ছিল, যেটা মহাবিদ্যা হতেও পারে! কিন্তু এখন আর একটা শক্তিরও ইঙ্গিত পাচ্ছে সে, যেটা খুব খারাপ, আর সেই শক্তি এই বংশের সঙ্গে বহুবছর ধরে রয়েছে। শঙ্খ হাতে তুলে নিয়েছে রুদ্রাক্ষের মালা, ছোট ছোট পুঁতির মত রুদ্রাক্ষে সে জপ করে চলেছে মহাকালভৈরবের মন্ত্র।
হঠাৎ পেছন থেকে শোনা গেল একটা নারীকণ্ঠ।
–“কী হচ্ছে এসব, কে ডেকে এনেছে এই উদ্ভট লোকটাকে? দে আর চিপ অ্যান্ড ব্লাডি ব্লাডসাকার ক্রিমিনালস। বাড়িতে ঢুকে অং বং চং করে সব টাকা খিঁচে নিয়ে চলে যাবে।”
তড়িৎ গতিতে পেছন ফিরল শঙ্খ। শ্রীলা আর প্রভাদেবী ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে চুপ করানোর চেষ্টা করছেন মেয়েটিকে। শঙ্খ দেখল, একটা বছর চব্বিশ-পঁচিশের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীলার ঠিক পাশেই। সাজ-পোশাকে চূড়ান্ত আধুনিকতার ছাপ, দেখতেও মন্দ নয়, মুখের প্রত্যেকটা রেখায় খেলা করছে অহঙ্কার।
শঙ্খ এমনিতে খুবই শান্ত, তবে মাঝে মাঝেই শোভাবাজার রবীন্দ্র সরণির বাজে ছেলেটা বেরিয়ে আসতে চায় ভেতর থেকে। মেয়েটার কথা তাকে অপমানিত করেছে, এর জবাব আগে দেয়া দরকার। সে শঙ্খশুভ্র মুখার্জি, কেষ্ট গুন্ডার ভাগনা, সাপের গর্ত থেকে ডিম বের করে আনত সে। ভূতনাথের মেলায় গলায় সাপ জড়িয়ে ঘুরে বেড়াত নির্ভয়ে। আর তাকেই কিনা এত বড় অপমান, ব্লাডসাকার ক্রিমিনালের ক্ষমতা দ্যাখ এবার...।
তার খুব কাছে এগিয়ে এলো শঙ্খ। তারপর তার সামনে কে বা কারা দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটা উপেক্ষা করেই বলতে লাগল।
“বাবা অসুস্থ, মেয়ে সারাদিন বাবার চিন্তাই করবে। কিন্তু না, আপনার মধ্যে চলছে অন্য চিন্তা। এখানে আসার একমাস আগে আপনার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে ফারুক নামের একটা পাকিস্তানী ছেলের, কারণটা সম্ভবত আপনি ইসলাম কবুল করতে চাননি আর ওর দেশে যেতে চাননি। যদিও গিয়েও কোনো লাভ হত না, রিসার্চ করা বন্ধ করিয়ে দিত তার পরিবারের লোক। সেই শোকে রোজ বালিশ ভেজাচ্ছেন, ইদানিং আবার রাতে মদও ধরেছেন, আর সিগারেট তো ছেড়েই দিন।”এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে চুপ করল শঙ্খ।
ফুঁসছে মেয়েটা, মুখটা লাল হয়ে উঠেছে তার। অভিমানী অহঙ্কারি মেয়েদের অহঙ্কার ভাঙলে তাদের ভীষণ কান্না পায়। কান্না পাচ্ছে মেয়েটির। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সে শঙ্খের দিকে, এই বদমাইশ পাজি লোকটা এত কথা জানল কী করে? মুখে সে শুধু বলল,
“স্কাউন্ড্রেল...জানোয়ার একটা।” তারপর কান্না চাপা দিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে চলে গেল সে। মদ সিগারেটের কথাটা যদিও খুব আস্তেই বলেছিল শঙ্খ, যাতে মেয়েটি বাদে অন্যরা শুনতে না পান।
শ্রীলা বিনয়ের সঙ্গে বলল,
“ওর কথায় কিছু মনে করবেন না, একটু রগচটা আছে। ওর সম্পর্কে যা বললেন, তা কি সত্যিই?”
হাসল শঙ্খ,
“ওকেই জিগ্যেস করে নেবেন।”
শঙ্খের পাঞ্জাবির খুঁট ধরে পেছন থেকে টান দিল কেউ। শঙ্খ পেছন ঘুরে তাকাল। একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকে বলে ফুলের মত সুন্দর দেখতে, শঙ্খ আজ অবধি ফুলের মত সুন্দর দেখতে কাউকে দেখেনি। কিন্তু এই বাচ্চাটাকে দেখে সেই উপমাই মাথায় আসছে শঙ্খের। কিন্তু বাচ্চাটাকে কেমন আড়ষ্ট দেখাচ্ছে, দেখে মনে হচ্ছে খুব ভয়ে আছে সে। শঙ্খ তার গালে হাত ছোঁয়ালো, তারপর জিগ্যেস করল
—“কী হয়েছে মামণি, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন, তুমি কি ভয় পেয়েছো?”
মেয়েটি কিছু বলার আগেই শ্রীলা পাশ থেকে বলে উঠল,
“ও আমার মেয়ে অনন্যা...ওকে ভালোবেসে আমারা তুতাই বলি, ওই সেই ছবিটা এঁকেছিল যেটার কথা গুরুদেব আপনাকে বলেছেন।”
মেয়েটি হাতের ইশারায় তার উচ্চতায় শঙ্খকে নামতে বলল, ঝুঁকল শঙ্খ। মেয়েটি কানের কাছে মুখ এনে ফিস্ফিস্ করে বলল,
“তুমি কি ম্যাজিক ম্যান?”
হেসে মাথা নাড়ল শঙ্খ। বাচ্চাটা আশ্বস্ত হয়েছে যেন কিছুটা তার ম্যাজিক ম্যানকে পেয়ে। শঙ্খও ফিস্ফিস্ করে বলল,
“তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাও?”
“আমার ঘরে না একটা জটাবুড়ি আর একটা ন্যানো মেয়ে থাকে। ওরা খুব ডিসটার্ব করে জানো? জটাবুড়িটা বেশি ডিসটার্ব করে না, কিন্তু ওকে এত বাজে দেখতে, যে আমি ভয় পেয়ে যাই।” কথা বলতে গিয়ে হাঁপাচ্ছে মেয়েটা।
চোখটা বিস্ফারিত হয়ে গেল শঙ্খের। এই বাচ্চাটা বলছে কী? তার মানে এ সব দেখতে পাচ্ছে। শঙ্খ আবার তাকে জিগ্যেস করল,
“আর ন্যানো মেয়েটা ডিসটার্ব করে না?”
মেয়েটা আরও হাঁপাতে লাগল, “হ্যাঁ, সে তো আরও ডিসটার্ব করে, চুল টেনে দেয়, এই তো আজ একটু আগেই আমায় খিমচে দিল...।”
“তারপর জটাবুড়িটা যেই ওর সামনে এসে দাঁড়ালো অমনি পালিয়ে গেল।” মেয়েটি হাতটা মেলে ধরল শঙ্খের সামনে। স্পষ্ট দেখা গেল তিনটে নখের আঁচড়ের দাগ। শ্রীলা মেয়ের হাতের ক্ষতটা দেখে দৌড়ে এলো। প্রভাদেবী ছুটলেন মলম আনতে।
শ্রীলা চিৎকার করে উঠল,
“এসব কীইইই শঙ্খবাবু?”
“আমি ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম, এই বাড়িতে শুধু মহাবিদ্যা নেই...। তার সঙ্গে আছে একটা অশুভ শক্তিও। আমার মনে হচ্ছে সে এই বংশেরই কারো পোষ্য কোনো যক্ষিণী ছিল কোনও কালে। তারপর জায়গা বদল হওয়াতে সে চিনে এখান অবধি এতদিন আসতে পারেনি। অন্য কেউ আবার তাকে চিনিয়ে এখানে এনেছে। তাই এতদিন পর সে আবার বিরক্ত করতে এসেছে। যক্ষিণী পোষণ করলে মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিসর্জন করে দিতে হয়। এক্ষেত্রে মনে হচ্ছে কারো অকালমৃত্যুতে সেই সময় পাওয়া যায়নি।” থামল শঙ্খশুভ্র।
“এবার উপায়?” উদ্ভ্রান্তের মত প্রশ্ন করল শ্রীলা।
“আমি আধঘন্টা এই বাচ্চা মেয়েটির ঘরে থাকব। ততক্ষণ আমাকে কেউ ডাকবেন না। আর বাড়িতে শাঁখ আর ঘন্টা থাকলে আমাকে দিন, শব্দ তরঙ্গকে এরা ভীষণ ভয় করে। তাই আদিকাল থেকে সন্ধ্যার সময় শাঁখ বাজানো হয়, যাতে অপশক্তিরা গৃহে প্রবেশ না করতে পারে। মনে করে দেখুন আপনার ভাশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এ বাড়িতে শাঁখে ফুঁ পড়ে না।”
ঝরঝর করে কথাগুলো বলে গেল শঙ্খ।
মাথা নেড়ে সম্মতি দিল শ্রীলা, শঙ্খ ঠিকই বলেছে। ভাশুর ঠাকুর অসুস্থ হওয়ার পর সত্যিই এ বাড়িতে পূজা-আচ্চা হচ্ছে না।
বাচ্চা মেয়েটির হাতে ততক্ষণে মলম লাগিয়ে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন প্রভাদেবী। মেয়েটিকে শঙ্খ জিগ্যেস করল— “আর কেউ ডিসটার্ব করছে তোমায়?”
মেয়েটি সামনে পেছনে মাথা দোলালো। শঙ্খ জিগ্যেস করল
—“কে সে?”
“সেই লোকটা বাড়িতে থাকে না, স্কুল যাওয়া আসার সময় ওকে দেখতে পাই। একটা বুড়ো লোক, ধুতি পরে। দাঁড়িয়ে থাকে মদনদার দোকানে। আর আমাকে দেখলেই বলে, খুকি... লজেন খাবে? আমি না বললেও শোনে না, পেছন পেছন বাড়ি অবধি আসে। তারপর দয়াল দাদাকে দেখলেই পালিয়ে যায়। আর পুলকারের ড্রাইভার দাদাকে দেখলেও পালায়।” কথাটুকু বলে কি একটা যেন দেখে কেঁপে উঠল মেয়েটি
—“ওই যে ওই যে ন্যানো মেয়েটা আবার আমার ঘরে ঢুকল।” আবার সে ভয় পেতে লাগল।
শ্রীলা দৌড়ে গিয়ে একটা ঘন্টা আর শাঁখ, শঙ্খকে এনে দিল। বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে শঙ্খকে। জীবনে এই দ্বিতীয়বার আবার যক্ষিণীর সামনা করতে হবে। অমর ভট্টাচার্যের পোষা যক্ষিণী মহানটী তাকে কতসুখই না দিয়েছে এ জীবনে। সে থেকে আর নারী সম্ভোগের বাসনা তারমধ্যে নেই। গুরুদেব মৃত্যুর আগে মহাসাম্রাজ্য দীক্ষা দিয়ে বিরজা হোম করিয়েছেন তাকে। সে বাসনার ইচ্ছা ত্যাগ করেছে সে দিনই।
শঙ্খ এগিয়ে গিয়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। বাইরে থেকে শোনা যেতে লাগল ঘন্টাধ্বনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন