মনীষ মুখোপাধ্যায়
“অনেকের কাছে আপনার কথা শুনে ছুটে এলাম, আমার ছেলেটা নির্ঘাত কারোর জীবন নিয়ে নেবে। ওর আচার আচরণ মোটেই সুবিধের নয়। আমার সঙ্গে চলুন একবার।” কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলে হাঁপাতে লাগলেন ভদ্রলোক।
“কী হয়েছে কী ছেলের?” মিষ্টি হেসে যে এ প্রশ্নটা করল, তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের বেশি নয়।
রবীন্দ্র সরণির উপর দিয়ে ভেসে আসছে ঘড়ঘড়ে ট্রাম যাওয়ার শব্দ। আজকাল ট্রাম গেলে এ বাড়িটা একটু কাঁপে,এতে অবশ্য তার কিচ্ছু এসে যায় না। বড়মামা ছোটমামা মারা যাওয়ার পর বড়মামিকে সে বহুবার বলেছে বাড়িটা সারাই করার কথা, মামি কানে তোলেনি। তোলেনি যখন তখন কী আর করার, এই অল্প পরিসরেই তার সাধন ভজন করে বেশ চলে যাচ্ছে। একেই অন্য কারণে লোকটা ঘাবড়ে আছে, ঘরের এই আকস্মিক কম্পনে ভদ্রলোক বেশ চমকেই গেছেন
ভদ্রলোক একটু আমতা আমতা করে বললেন,
—“মানে আমরা থাকি হাবড়ার দিকে। প্রতি শনিবার আমার ছেলে কোচিং এ পড়তে যায়, গত শনিবারও গিয়েছিল, কিন্তু যখন ফিরে এলো ওকে যেন ঠিক চিনতে পারলাম না আমরা। গায়ের অমন ফরসাপানা রংটা কেমন যেন কালচে মতন হয়ে গেছে।
এরপর সেদিন রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে রাক্ষসের মতন খেতে লাগল। তারপর থেকে খাবার চেয়েই যাচ্ছে, আর না দিলেই যা হাতের সামনে পাচ্ছে তা দিয়ে আক্রমণ করছে সবাইকে! কলকাতায় এসেছি ডাক্তার দেখাতে অনেক কষ্ট করে গাড়ি নিয়ে। এখানের ডাক্তাররা বলছেন মৃগী রোগ হয়েছে আমার ছেলের, কিন্তু আমার এক মামা দেখে বললেন, ওকে ভূতে ধরেছে। সেই মামাই এখানে এসে আপনার সঙ্গে দেখা করতে বললেন।”
হাতলভাঙা আরামকেদারাটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শঙ্খশুভ্র মুখোপাধ্যায়। তারপর বলল,
—“মনে হচ্ছে বেশ দেরি হয়ে গেছে, তবুও চলুন, দেখি কী করা যায়।”
গোধূলি পার করে সন্ধ্যার প্রথম প্রহরে প্রবেশ করছে কলকাতা শহর। শিয়ালদার এই পুরানো বাড়িটায় যেন সন্ধ্যা পার হয়ে অনেক আগেই নেমে এসেছে রাতের অন্ধকার। সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা পচা গন্ধ ধাক্কা মারল শঙ্খশুভ্রের নাকে। এ গন্ধ তার অচেনা নয় বরং অনেক দিনের চেনা। বলতে গেলে আজকাল বিষয়টা গা সওয়া হয়ে গেছে, মৃতের শরীরের গন্ধে তাই আর কষ্ট হয় না তার। সে তার পাশের ভদ্রলোকটিকে প্রশ্ন করল,
—“কোন ঘরে আছে, আপনার ছেলে?”
—“উপরে উঠে বাঁদিকের প্রথম ঘরটায়।” উত্তর দিলেন ভদ্রলোক, দ্রুত পায়ে তারা পৌঁছে গেল সেই ঘরে।
দরজাটা খুলতেই পচা গন্ধটা বেশ জোরালো হয়ে উঠল, কেমন যেন একটা অস্বস্তি হল শঙ্খশুভ্রের। সে দেখতে পেল একটা বছর চোদ্দ-পনেরোর ছেলে দড়ি দিয়ে শক্ত করে একটা চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা। ছেলেটা মাথা নীচু করে রেখেছে। শঙ্খশুভ্র ভদ্রলোককে ফিসফিস
করে জিগ্যেস করল,
“ওর নাম কী?” উত্তর এল
—“অরিত্র।”
শঙ্খশুভ্র ডাকল
—“অরিত্র?”
সেকেন্ডেরও হাফ সময় নিয়ে ঝট করে মাথা তুলল ছেলেটা। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল শঙ্খশুভ্রের। ছেলেটাকে পুরো কবজা করে ফেলেছে মনে হচ্ছে। না হলে এমন হাত-পা বেঁকে যাওয়ার কথা না। তবে কালভৈরব আর গুরু অমর ভট্টাচার্যের আশীর্বাদ যতক্ষণ মাথার ওপর আছে সে লড়াই চালিয়ে যাবে যে কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে।
ছেলেটা পৈশাচিক একটা হাসি হেসে উঠল— খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক…। করাত দিয়ে দিয়ে কিছুকে কাটলে যেমন জান্তব শব্দ হয়, তেমন শব্দে বলে উঠল
—“ওরে শালা, শুয়োরের বাচ্চাটা আবার ওঝা ধরে এনেছে। তবে জেনে রাখ এই শরীর আমি ছাড়ছি না, একে নিয়ে তারপরেই যাব।”
ছেলেটার বাবার দিকে তাকাল শঙ্খশুভ্র। তাঁকে কেমন চিন্তিত আর ভয়ার্ত দেখাচ্ছে। নিজের ছোট্ট ব্যাগটা খুলে একটা কাঁচের শিশি বার করল শঙ্খশুভ্র। গঙ্গাজলের কিছুটা ছিটিয়ে দিল ছেলেটার দিকে। লাফিয়ে উঠল ছেলেটা
—“জ্বলে গেল রেএএএএ…জ্বলে গেল।” অস্বাভাবিক ছটফট করতে লাগল ছেলেটা।
শঙ্খশুভ্র বলতে শুরু করল,
—“তুই কে? ঝামেলা না করে বলে ফেল, না হলে নরক যন্ত্রণা ভোগ করাবো তোকে।”
“করেই দেখা” —খুব সাহস নিয়েই বলল ছেলেটা।
একটা কৌটো থেকে একটা গুঁড়ো নিয়ে ছেলেটার চেয়ারের চারদিকে আলপনা দিতে শুরু করল শঙ্খশুভ্র। ছেলেটা আগের থেকেও জোরে ছটফট করতে লাগল, ঘরের দরজা-জানলাগুলো এক ঝটকায় খুলে গেল, দুমদাম শব্দে বাড়ি খেতে লাগল সেগুলো। ছেলেটার গা ফেটে বেরোতে লাগল রক্ত। শঙ্খশুভ্র জপ শুরু করল
—“ওঁ ত্রয়ম্ভকম যজামহে সুগন্ধীম পুষ্টি বর্ধনাম।। উর্বারুক মীব বন্দনা মৃত্যোমুক্ষিয়ো মামৃতাৎ।।”
পাগলের মত করতে লাগল ছেলেটা। জিভ বেরিয়ে এলো বাইরে,কেমন একটা পৈশাচিক ভঙ্গিতে লম্বা জিভটা নাড়াতে লাগল সে। তারপর সেই জান্তব গলায় বলে উঠল,
—“আমাকে ভাগিয়ে কিচ্ছু হবে না... কিচ্ছু হবে না। আমি তো চলে যাব... কিন্তু সাউ বাড়িতে তোর জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যু... তুই মরবি... তুই মরবি।”
কথাটা শুনে ক্ষণিক থমকে গেল সে, তবে তা বেশীক্ষণের জন্য নয়, নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল শঙ্খশুভ্র,
—“ছেড়ে দে ছেলেটাকে। না হলে তোর আত্মাকে কেমন করে কষ্ট দিতে হয় আমার জানা আছে। বল তোর নাম-ধাম?”
“বলছি... বলছি... সব বলছি।” হাঁপাতে লাগল ছেলেটা। তারপর বলল,
“আমি সিরাজ... থাকতাম হাবড়াতেই, একটা মারপিট করতে গিয়ে বোমার আঘাতে মারা যাই। আমার কবর দেয়া হয়েছিল যে গোরস্থানটায়, তার পাশ দিয়ে এই ছেলেগুলো প্রায়ই যাওয়া-আসা করত। এক শনিবার এই ছেলেটা যাচ্ছিল, ওকে দেখে খুব ভাল লাগল, ইচ্ছে হল ওর শরীরে বাসা বাঁধি, তারপর চলে এলাম এর সঙ্গে।”
“এবার যে যাওয়ার সময় হয়েছে।” শক্তভাবে বলল শঙ্খশুভ্র।
“হ্যাঁ চলেই যাব, কিন্তু একটা কথা রাখবে বাবা?”
“কী কথা?” জিগ্যেস করল শঙ্খশুভ্র।
“আমি তো গুন্ডা ছিলাম, বোমার আঘাতে মরেছিলাম। আমার ঘরের লোক কেউ এসে আমার গোরে একটা ফুল পর্যন্ত দেয় না। তাদের আমার প্রতি এতই ঘেন্না। তুমি একটু তাদের বলো, আমাকে ঘেন্না না করে জুম্মাবারে আমার গোরে যেন একটা ফুল দেয়, তাহলেই আমার আত্মার শান্তি পাবে।”
চুপ করে গেল সে জান্তব স্বর। পরিবেশ শান্ত হয়ে গেল।
শঙ্খশুভ্র বলল, “ঠিক আছে তাই হবে।”
ছেলেটার ভেতর থেকে সিরাজ বলল,
“আচ্ছা বাবা এতেই হবে, তবে তোমার সামনেও অনেক কঠিন সময় আসছে। সাবধানে থেকো।” একদম শান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়ল ছেলেটা।
শঙ্খশুভ্র বলে উঠল,
“নিন বিপদ কেটে গেছে, আপনার ছেলে এখন ভালো হয়ে গেছে, পারলে বাড়ি ফিরে সিরাজের বাড়ি গিয়ে ওর পরিবারকে এই কথাগুলো বলুন।”
মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক, তিনি সিরাজকে চিনতেন। একসময় ওই অঞ্চলের ত্রাস ছিল এই গুন্ডা। শেষে রাজনৈতিক দাঙ্গায় মারা যায়। যাই হোক ভদ্রলোক বাড়ি ফিরেই সিরাজের পরিবারকে ওর আত্মার শান্তির উপায় বলবেন বলে সম্মত হলেন। ভদ্রলোক একটা পাঁচশ টাকার নোট শঙ্খশুভ্রের পকেটে ভরতে গেলে বাধা দিল সে। সে বলল,
“আমি যে সাধনায় নেমেছি সেখানে লোভ করা অনুচিত, তাই কোনো রকমে পেট চালানোর জন্য আপনি আমায় একশোটা টাকা দিলেই হবে, এতে কয়েকদিন চলে যাবে।”
শিয়ালদার অন্ধকার এঁদো গলি থেকে বেরিয়ে রাজপথে নামল শঙ্খশুভ্র। প্রতিবারই এই আলো ঝলমলে পথে নেমে ভারি অবাক হয় সে। প্রতিবারই হয়। অবাক হয় এই ভেবে যে এই আলোর অপরদিকেই লুকিয়ে আছে একটা অন্ধকার জগৎ, যেটা এই আলোর বাসিন্দারা কেউ জানে না।
কিন্তু কী যেন বলল, আত্মাটা? বিপদ ধেয়ে আসছে! কিন্তু কী বিপদ কীসের বিপদ কিছুই মাথায় ঢুকছে না শঙ্খশুভ্রের। আজ একবার আশ্রমে যাওয়ার কথা আছে। সে নিজে এই আশ্রমের সদস্য না হলেও ওই কালীমূর্তির পায়ের কাছে বসে থাকতে বড় আরাম হয় তার। মনের সব চাপ, সব ভার যেন নিয়ে নেন মা কালী। শিয়ালদা ব্রিজের কাছে পৌঁছে একটা প্রায় চলন্ত ট্রামে লাফিয়ে উঠে পড়ল শঙ্খশুভ্র।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন