মনীষ মুখোপাধ্যায়
সকালের ঝরঝরে রোদে হেঁটে এসে মজা আছে, যেন নতুন প্রাণ ফিরে পাওয়া যায়। লেকটাকে একচক্কর দিয়ে আর হাঁটতে ইচ্ছে হল না কুমারেশের। ড্রাইভার জয়নন্দন ফলের রস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মালিকের জন্য। কুমারেশ বোতলের ঢাকনি খুলে হাফ বোতল ফলের রস গলায় ঢেলে বাকীটা এগিয়ে দিলেন জয়নন্দনের দিকে, তারপর বললেন,
—“তুই খা।” জয়নন্দন একরাশ লজ্জা নিয়ে বাড়ানো বোতলটা ধরে গাড়ির আড়ালে গিয়ে ঢক্ঢক্ করে শেষ করে দিল বাকীটা। সে আজ পঁয়ত্রিশ বছর গাড়ি চালাচ্ছে কিন্তু এমন মালিক পায়নি কখনও।
সকালে হইহই করে সকলে এসে বসলেন ডাইনিং হলে।
কাল রাতে ভাল ঘুম হয়েছে কুমারেশের। ঘুম আসছিল না দেখে আবার তিনি গ্লাস বোতল সাজিয়ে বসেছিলেন। বোতলের অর্ধেকটা নামতেই গভীর নেশা ঘিরে ধরেছিল তাঁকে। তারপর আর ওইসব চিন্তা মাথায় আসেনি, পাননি সেই গন্ধও।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য শ্রীলা একটা প্রস্তাব তুলল ব্রেকফাস্টের আসরে।
—“এবার থেকে অমু দোকানে যাবে,” কথাটা বলে সে দেখার চেষ্টা করল ভাশুর আর বরের মুখ।
হাসি খেলে গেল কুমারেশের চোখে মুখে। তিনি বললেন,
“এত দিনে কাজের কাজ হল বৌমা, অমু দোকানে গিয়ে ব্যবসা বুঝে নিক ধীরে ধীরে। আমি আর ক’দিনই বা? আমাদের এই ব্যবসা একশো কুড়ি বছরের পুরানো। কলকাতা শহরে এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন আমাদের এক পূর্বপুরুষ শ্রী রাজেশ্বর সুঁড়ি। সেই থেকে চলে আসছে এই ব্যবসা। যদিও বাবা জ্যাঠাদের মুখে শুনেছি, এই ব্যবসার উৎস ছিল চক্রদহ, মানে বর্তমানের চাকদা জেলা।” থামলেন কুমারেশ।
তারপর হঠাৎ ডাইনিং হলের একটি চেয়ার ফাঁকা দেখে তিনি সকলের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, “ছোড়দিভাই কোথায় গেল?” অম্লান হাসি মুখে উত্তর দিল,
—“দেখো ছাদে বসে ছবি আঁকছে বোধ হয়, এই তো ওর কাজ, পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন শুধু ছবি আঁকবে।“ কথাটা শুনে একটু গর্ব অনুভব করলেন কুমারেশ সাউ। তাঁর বাবা জ্যাঠারা ব্যবসায় উন্নতি করে সাহেবদের থেকে সুঁড়ি থেকে সাউ উপাধি লাভ করেছিলেন। আজ তাঁর বংশধর ছবি এঁকে আবার তাঁদের বংশের নাম উজ্জ্বল করবে।
“থাক। ওকে মনের সুখে ছবি আঁকতে দে, মা আমার দশ জনের একজন হবে, কথা মিলিয়ে নিস আমার।“ কথাটা শেষ করলেন বেশ গর্বের সঙ্গে কুমারেশ। অম্লান ফুট কাটলো,
“দিদিয়া বলে না, তুমি ওকে আদরে বাঁদর বানাচ্ছ, ঠিকই বলে।” অম্লানের কথা গায়ে মাখলেন না কুমারেশ, শুধু হাসলেন।
আজ ব্রেকফাস্টে দারুণ আয়োজন, শ্রীলা নিজের হাতে তৈরি করেছে কড়াইশুঁটির কচুরি আর কাশ্মীরি আলুর দম। এত তেলের রান্না ভাশুর ঠাকুরের বয়স হচ্ছে বলে, জা আর খেতে দেন না। আজ কুমারশের স্ত্রী বাড়ি না থাকায় শ্রীলা জমিয়ে রান্না করেছে এসব।
কুমারেশ পাতে কচুরির টুকরো নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। আলুরদমে মাখিয়েও মুখে তুলছেন না। শ্রীলার একটু ভয় হল বিষয়টা দেখে। গতরাতে কুমারেশ যে কথাটা বলেছেন, তারপর শ্রীলা একটু চিন্তায়ই আছে। সে একটু মজা করেই ভাশুরের উদ্দেশে বলল,
“দিদির মত গন্ধ বের হয়নি না আলুরদমে? আপনি খাচ্ছেন না।” হাসলেন কুমারেশ। বললেন,
—“না না খুব সুন্দর গন্ধ আসছে, ছোড়দিভাইটা এলেই খাওয়া শুরু করব।”
শ্রীলাও মনে মনে ভাবছিল, অনেক্ষণ ছাদে কাটিয়েছে মেয়ে, এবার তাকে ডাক দেবে। দেরি করলে কচুরি আর খাওয়ার অবস্থায় থাকবে না। শ্রীলা হাঁক পাড়লেন,
—“তুতাইইইইই?”
এ বাড়িতে অনন্যা মা ছাড়া কাউকেই ভয় পায় না তেমন ভাবে। ততক্ষণে অনন্যার আঁকা শেষ হয়ে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে আঁকার খাতাটা হাতে নিয়ে এক দৌড় মারল সে নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। তাকে নীচে নেমে আসতে দেখে কুমারেশের মুখেও একটা চাপা হাসি খেলে গেল। অনন্যা যাই আঁকে, প্রথমে এসে দেখায় জ্যাজ্যাকেই। হাতে আঁকার খাতা নিয়ে অনন্যাকে এগিয়ে আসতে দেখে কুমারেশ বললেন,
“কই আজ ছোড়দিভাই কী এঁকেছে দেখি? আঁকা ভালো হলে কিন্তু সারপ্রাইজ আছে।” আনন্দে চক্মক করে উঠল অনন্যার চোখ-মুখ। সে লাফাতে লাফাতে জিগ্যেস করল,
“কী সারপ্রাইজ জ্যাজ্যা?” চোখ নাচিয়ে কুমারেশ উত্তর দিলেন,
“আরে সারপ্রাইজের নাম কি বলতে আছে নাকি?”
খুশিতে সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে ডাইনিং টেবিল অবধি ছুটে এল অনন্যা। তারপর কুমারেশের দিকে তার আঁকার খাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে সে বলল,
“এই দ্যাখো জ্যাজ্যা এটা এঁকেছি আজ আমি।” কুমারেশ হাসি মুখে আঁকার খাতাটা হাতে তুলে নিলেন, তারপর তাকালেন ছবিটার দিকে।
আঁৎকে উঠলেন তিনি, এটা কীইইই!
চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠছে কুমারেশের, বুকের মধ্যিখানে অনুভব করছেন অসহ্য যন্ত্রণা। ঘামে ভিজে যাচ্ছে সারা শরীর। থরথর করে কাঁপছে হাত-পা। মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটা বীভৎস গোঁ গোঁ শব্দ। জ্ঞান হারাতে হারাতে তিনি দেখতে পেলেন একজন বিধবাবেশী মহিলা অনন্যার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কুমারেশকে চেয়ার থেকে পড়ে যেতে দেখে খাওয়া ফেলে উঠে দাদাকে ধরলেন মহীতোষ। অম্লানের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে বসে জ্যাঠা ভাইঝির রঙ্গ তামাশা দেখছিল, সেও হতভম্ব হয়ে গেল ঘটনার আকস্মিকতায়। খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও ধাতস্ত হতে বেশি সময় লাগল না অম্লানের। সেও দৌড়ে গিয়ে ধরল জ্যাঠাকে।
মুখ-নাক থেকে গ্যাঁজলা বেরচ্ছে কুমারেশের। মহীতোষ না বুঝতে পারলেও অম্লানের বুঝতে দেরি হল না, অনেক বড় সমস্যা আছে।
রান্না ঘরের থেকে মেয়ের জন্য খাবার বেড়ে আনতে গেছিল শ্রীলা, সে সেই মুহূর্তে ডাইনিং ঢুকে ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কী হল ওঁর?” চোয়াল শক্ত হয়ে গেল অম্লানের, সে কঠিন স্বরে বলে উঠল,
—“এক্ষুনি অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিতে হবে, মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক।“
দ্রুত ফোন করা হল অ্যাম্বুলেন্স আর হাউজ ফিজিসিয়ানকে। ডাঃ ব্যানার্জিও সিম্পটম শুনে অনুমান করলেন হার্ট অ্যাটাক, শীঘ্রই কোনও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হোক পেশেন্টকে, নির্দেশ দিলেন তিনি। পাড়ার ছেলেরা দ্রুত জোগাড় করে আনল অ্যাম্বুলেন্স। দশ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল সবাই।
অনন্যা কেমন যেন পাথরের মত হয়ে গেল, একই কথা বারবার বলতে লাগল,
“আমার আঁকা দেখে জ্যাজ্যার শরীর খারাপ হয়ে গেছে… আমার আঁকা দেখে…।” বিরক্তির চোটে একটা চড় কষিয়ে দিলেন শ্রীলা, মেয়ের গালে। বড্ড জেদি মেয়ে অনন্যা, মার খেয়ে আরও খেপে গেল সে। দৌড়ে গিয়ে ছাদে উঠল। ইস্, মেয়েটার গায় হাত না দিলেই হত, ভাবতে ভাবতে শ্রীলা তাকালেন টেবিলেন দিকে। চোখ স্থির হয়ে গেল তার। এটা কী এঁকেছে তার মেয়ে! কী ভয়ানক, কী বীভৎস!
ছবির চারপাশে ধূসর রঙের প্যাস্টেল ব্যবহার করা হয়েছে, মনে হচ্ছে ছবিটার মধ্যে জমা হয়েছে রাশি রাশি ধোঁয়া। এত নিখুঁত করে রঙের ব্যবহার করা হয়েছে, ধোঁয়াগুলো আসল মনে হচ্ছে। একটা বাচ্চা মেয়ে লাল ফ্রক পরে আছে আর হলুদ স্কার্ফ জড়িয়ে আছে গলায়, একজন সাদা শাড়ি পরা কঙ্কালসার চেহারার মহিলা সেই স্কার্ফের দুদিক ধরে টান দিচ্ছে। বাচ্চাটার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে সে। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা সোনালি বর্ণের রথ, যার মাথায় বসে আছে একটা প্রকাণ্ড দাঁড়কাক।
আঁৎকে উঠলেন শ্রীলা, এর মানে কী? এই বীভৎস, বিকৃত, বিশ্রী ছবি দেখেই বোধ হয় সহ্য করতে পারেননি তার ভাশুর ঠাকুর।
রাত দশটার দিকে বাড়িতে ফোন করল অম্লান। এর আগে শ্রীলা স্বামী আর ছেলেকে বার দুয়েক ফোন করেছে, কিন্তু তারা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত থাকায় শ্রীলাকে বেশি কিছু জানাতে পারেনি।
অম্লান যা জানালো তাতে আঁৎকে উঠল শ্রীলা। ইতিমধ্যে কুমারেশের স্ত্রী প্রভাদেবী বাড়ি চলে এসেছেন। চিন্তায় তিনিও ঘর-বার করছেন। অম্লান জানালো, ডাক্তারেরা বলছেন হার্টে সেভেন্টি পারসেন্ট ব্লকেজ আছে। ইলেক্ট্রো এঞ্জিওগ্রাম করে দেখা গেছে, হার্টের অবস্থা খুব খারাপ। ইমিডিয়েট বেসিসে ডাক্তাররা এঞ্জিওপ্ল্যাস্টি করতে চাইছেন। তাতে যদি কাজ না হয় ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হতে পারে।
এই সমস্ত বিষয় ডাক্তারেরা বেশি সময় নেন না, উনি যেহেতু সমাজের প্রভাবশালী মানুষ, তাই ডাক্তার অন্য রাস্তা বের করার চেষ্টা করছিলেন। “এবার জেঠিমা আর দিদিয়ার কনসেন্ট লাগবে মা।” বলল অম্লান।
কালবিলম্ব না করে জায়ের ঘরে ছুটে গেল শ্রীলা। লাইনে তখনও অম্লান আছে।
“দিদি অম্লান কী বলছে দেখো, ওঁকে এঞ্জিওপ্ল্যাস্টি করতে হবে,” কাঁদো কাঁদো মুখে বলল শ্রীলা।
শ্রীলা মানসিক ভাবে কিছুটা দুর্বল হলেও প্রভাদেবী কিন্তু বেশ শক্ত। দ্রুত তিনি কানে টেনে নিলেন ফোন। কথপোকথন চলতে লাগল তারপর। শ্রীলা শুধু হ্যাঁ-হুঁ ছাড়া কিছুই বুঝতে পারছিল না। শেষ কথাটা শুধু বোঝা গেল। প্রভাদেবী বললেন,
“নাঃ, এই মুহূর্তে ওকে জানিয়ে কোনো লাভ নেই, তোরা যা ভাল বুঝিস কর, যে কোনও পরিস্থিতির জন্য আমি তৈরি।”ফোন ছেড়ে দিলেন তিনি।
শ্রীলা বুঝতে পারল, এই অপারেশনে জা একাই মত দিলেন। মেয়ে সুকন্যাকে জানানোর এই মুহূর্তে প্রয়োজন মনে করলেন না তিনি।
শেষ রাতের দিকে ফোন এল শ্রীলার ফোনে। অম্লান জানালো,
—“জেঠু এখন ঠিক আছে মা, চিন্তার কারণ নেই আর। ওপেন হার্ট সার্জারি করার দরকার হয়নি, তবে শরীরের ডানদিকে সামান্য সমস্যা থাকবে জেঠুর।”
শ্রীলা এতক্ষণ সমানে কালীঘাটের মা কালীকে স্মরণ করে গেছে, তার ভাশুরকে রক্ষা করার জন্য। এই বংশে একটা শাপ আছে, দিদি সেটা না জানলেও সে জানে, মৃত্যুর আগে তার শ্বশুর মশাই বলে গিয়েছিলেন তাকে।
তাদের বংশের এক পূর্বপুরুষ কালীঘাটের এক তান্ত্রিকের দেয়া একটা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদের আদি গ্রাম চাকদায়। সেই মূর্তি তান্ত্রিক পেয়েছিলেন কামরূপ ফেরত এক সিদ্ধযোগী মহাসাধকের কাছ থেকে। কিন্তু উপাচারের কোনো ভুলে তাদের বংশে নেমে এসেছিল এক ভয়ানক অভিশাপ। তার জ্যাঠশ্বশুর, শ্বশুর সকলে মারা গেছেন সেই ভয়াবহ শাপে।
কাল রাতে যে তার ভাশুরও সেই কথাই বলছিলেন,যা কোনো এক সময় তার শ্বশুর বা জ্যাঠশ্বশুর বলতেন।
—“রজনীগন্ধার গন্ধ পাচ্ছেন তিনি।”
নাঃ কাল একবার গুরুদেবের কাছে যেতেই হবে, শীর্ণকায় এই গুরুদেবটি বৃদ্ধ হয়েছেন বটে কিন্তু তাঁর বিশেষ কিছু শক্তি এখনো তিনি প্রয়োগ করতে সক্ষম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন