১৪

মনীষ মুখোপাধ্যায়

গাড়ি ঠিক সময়েই রওনা দিয়েছে। হাইওয়ের উপর খুব মনযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে জয়নন্দন। তার ঠিক পাশের সীটে বসে বাইরের প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে চলেছে শঙ্খশুভ্র। পেছনে বসে আছে অম্লান আর সুকন্যা। শঙ্খ চায় আজ রাতের মধ্যেই একটা ব্যবস্থা করে ফিরে আসতে। তবে যক্ষিণী বিসর্জন বা মহাবিদ্যার শাপমোচনের থেকেও তাকে সবচেয়ে যেটা বেশি ভাবাচ্ছে তা হল, একটা বুড়ো লোক, একজন গুপ্ত শত্রু, যে কিনা এই সাউদের ক্ষতি চায়। কী ভাবে পাওয়া যাবে তাকে, এই প্রশ্নটা এঁটুলির মত আটকে গেছে মাথায়।

সুকন্যা হঠাৎ বলে উঠল,

—“জয়নন্দন দাদা, সামনে কোনো ধাবা পেলে দাঁড় করিও, খুব খিদে পেয়ে গেছে।” পাশ থেকে ফুট কাটল অম্লান,

—“দিদিয়া তুই এমনি এমনি মোটা হচ্ছিস না, কি বল?” সুকন্যা সশব্দে একটা কিল অম্লানের পিঠে বসিয়ে দিল। হেসে উঠল দুজনে। কিন্তু শঙ্খ বিন্দুমাত্র হাসল না। বরং এই জেদী অসভ্য মেয়েটাকে দেখে তার রাগই হচ্ছে, হাজারবার বারণ করা সত্ত্বেও মেয়েটা কাল ছাদে উঠেছিল। মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে আজীবন নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকত সে।

রাস্তার বাঁদিকে গাড়ি দাঁড় করালো জয়নন্দন। বেশ ভিড় আছে ধাবাটায়, সবে নৈহাটি পার হয়েছে এখনও অনেকটা পথ। সুকন্যা আর অম্লান টোস্ট, চা, ডিম এসবই নিল। কিন্তু শঙ্খ যেন আজ একটু বেশিই সিরিয়াস রয়েছে। সে কিছুই নিল না এককাপ চা বাদে।

আজ বড় বাজে একটা নক্ষত্রে তারা বেরিয়েছে। আজ অশ্লেষা নক্ষত্র বিরাজ করবে প্রায় সারা দিনই। এই নক্ষত্র কোথাও যাওয়ার জন্য বড় খারাপ।

চা টোস্ট শেষ করে আবার গাড়ি চলতে শুরু করল। কল্যানী এক্সপ্রেস ওয়ে ধরল গাড়ি। জ্যাম না থাকলে আর ঘন্টা–দেড় ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে, মনে মনে ভাবছিল শঙ্খ। মেয়েটি তাকে বহুবার লক্ষ্য করেছে দেখতে পেয়েছে সে। কিন্তু কাজ না শেষ হওয়া অবধি এই মেয়েটার কোনও প্রশ্নের উত্তর সে দেবে না বলে ঠিক করেছে। রাস্তা ফাঁকা থাকায় মঝে মাঝেই ভালো স্পিড তুলছে জয়নন্দন।

গাড়ি কালিন্দি পার করার পর জয়নন্দন গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিল, প্রায় একশো পঁচিশে চলছে গাড়ি। হঠাৎ শঙ্খ প্রায় আদেশের স্বরেই বলে উঠল

—“স্পিড কমান।” স্পিড কমাতে চেষ্টা করল ড্রাইভার জয়নন্দন, সেই মুহূর্তেই রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর দেখা গেল একটা বিরাট ট্রলারকে। কোনো কারণে ব্যাক করে গাড়ি লাগাচ্ছে ট্রলারের ড্রাইভার। শঙ্খদের গাড়ি যে স্পীডে আছে সোজা গিয়ে ট্রলারের পেটে মারবে।

ব্রেকে পায়ের চাপ বাড়িয়ে ঈশ্বরকে ডাকতে লাগল জয়নন্দন। পেছনে চিৎকার করে উঠল সুকন্যা আর অম্লান। শঙ্খকে দেখে ততটা বিচলিত মনে হল না। কোনো এক দৈববলে গাড়িটা ট্রলারের দু’হাত আগে গিয়ে থেমে গেল।

যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল জয়নন্দনের। সে বলে উঠল,

—“রামজি রাখিয়ে দিলেন বাবু সাহাব।”

পেছন থেকে উড়ে আসতে লাগল পরের পর ধমক। শিমুরালি পার করে চাকদহ টাউন ঢুকতে ঢুকতে বেজে গেল সাড়ে এগারটার কাছাকাছি। শঙ্খ আর অম্লান জনে জনে ধরে ধরে জিগ্যেস করতে লাগল সেই অঞ্চলে বেশ পুরানো মদের কারবারি যাঁরা তাঁদের বাড়ি কোথায়? এইভাবে প্রায় কেউই বলতে পারল না তাদের কোনও কিছুই। প্রত্যেকটা মদের দোকানে নেমে তারা জানার চেষ্টা করল, তাঁদের নাম, ধাম, ঠিকুজি-কুলুজি কিন্তু কিছু থেকেই কিছু হওয়ার নয়। পুরো চাকদহ টাউন চষে ফেলেও যখন কিছুই পাওয়া গেল না সেই মুহূর্তে শঙ্খের মাথায় এল একটা বুদ্ধি। টাউনের বাইরে বেরিয়ে গঞ্জ এলাকায় কাউকে জিগ্যেস করলে কেমন হয়?

গঞ্জ এলাকা অবধি যেতে হল না। চাকদহ যারা গেছেন তারা হয়ত জানবেন ওই অঞ্চলে কালী আর শিব মন্দিরের ছয়লাপ। তেমনই একটা কালী মন্দির হল, চাকদহ রেল বাজারের পাশে সিংহের হাট কালী মন্দির। দুপুরবেলা মেলা রোদ মাথায় করে তার কাছে পৌঁছাল গাড়ি। শঙ্খ নেমেই প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে দেখা করতে গেল। কিন্তু তার থেকেও জানা গেল না কিছুই। কিন্তু নিরাশ করলেন না পুরোহিত। তিনি অপেক্ষা করতে বললেন শঙ্খকে কিছুক্ষণ। অদূরে আছে কামাখ্যা মন্দির, সেখান থেকে এক বুড়ো রোজ আসে দুপুরের দিকে এই মন্দিরে, যাঁর কাছে জানা যেতে পারে পুরানো চাকদহের অনেক ইতিহাসই।

শঙ্খকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট কুড়ির মধ্যেই হাজির হল আশির কাছাকাছি বয়সের এক বুড়ো। শঙ্খ, বুড়োকে বলতে শুরু করল সেই মদের ব্যবসায়ী পরিবারের আগের ইতিহাস, যেটুকু সে জানত। অপঘাতে এক মদের ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছিল, যিনি মহাবিদ্যার উপাসনা করতেন। সবটা শুনে বুড়ো বললেন,

‘ওহ, আপনি হরিসাধন সুঁড়ি আর তার ভাই রাজেশ্বরের কথা বলতিছেন। হ্যাঁ পেরায় একশ বছর আগে এই তল্লাটে তারা থাকত বটে। এই বেলিয়াডাঙ্গাতেই তাদের বাড়ি আর কারবার ছিল। ওদের একটা পুরানো বাড়ি আছে ওইখানে, কিন্তু সে তো ভেঙে পড়েছে গো। ওই পাড়ে ডুমুর দহে কীসব সাধনা-টাধনা করতে গিয়ে ওই ব্যাটা রাজেশ্বর পেরাণ দিয়েছিল বলে বাপ কাকার মুখে শুনেছিলাম। সেখানে সে একটা মন্দিরও করেছিল, যাকে ওখানের লোকেরা বলে বুড়োবিবির থান। আর ওর দাদা হরিসাধন মরেছেল ডাকাতের হাতে।”

শঙ্খ, বুড়োকে দেখিয়ে দিতে বলল হরিসাধন সুঁড়ির বেলিয়াডাঙ্গার বাড়ির রাস্তা। গাড়িতে উঠে বেশ মজা পেল বুড়ো। বেশ আনন্দ সহকারেই অল্প সময়ের মধ্যেই সে খুঁজে বের করে দিল হরিসাধন আর রাজেশ্বরের ভাঙা বাড়িটা। তারপর গাড়ি থেকে নেমে সে আপন মনেই হেঁটে কোথাও চলে গেল।

“এই হল তোমাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি।” অম্লানকে ডেকে বলল শঙ্খ। লতা পাতা ঝোপ জঙ্গলে ছেয়ে আছে চারপাশ, বাড়িটার ছাদ ভেঙে পড়েছে বহুকাল আগেই। শঙ্খ গলা থেকে খুলে নিল স্ফটিকের মালাটা, এটাই ওই যক্ষিণী মূর্তির নির্দেশ দেবে তাকে। ইঁট পাথরের চাঙর এর মাঝখান দিয়ে অতিসাবধানে চলতে লাগল সে। এত জঙ্গলের মধ্যে প্রায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মেঝে নষ্ট হয়ে লম্বা ঘাস জমিতে ছেয়ে রয়েছে চরাচর। এখন গরমকাল তাই সাপের ভয়টাও এড়িয়ে যাওয়ার নয়। মালাটা হঠাৎ বাঁ দিকে ভার হতে লাগল। আদ্দিকালের একটা দরজায় তালা দেওয়া ঘর চোখে পড়ল শঙ্খের। সামনে গিয়ে তালায় চাপ দিতেই সেটা কড়াসুদ্ধ খুলে পড়ে গেল।

ঘরের বাইরে তালা থাকলেও ছাদের কিছু অংশও আর বেঁচে বর্তে নেই। ঘরের মধ্যে ঝলমল করছে দুপুর বেলার কড়া রোদ্দুর। সত্যি সত্যিই একটা লোহায় বাঁধান কুলুঙ্গি চোখ এড়িয়ে গেল না শঙ্খের। মর্চে ধরে অবস্থা খুব খারাপ হলেও ভেঙে পড়েনি এখনো। হাতল ধরে টান দিল শঙ্খ, বিন্দুমাত্র টলল না সে দরজা। এতকালের জমে থাকা মর্চেয় এই দরজার অবস্থা এত শক্ত থাকার কথা না, ওদিকে চাবির কোনো গর্তও দেখা যাচ্ছে না।

একটু দন্ধে পড়ে গেল শঙ্খ, হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলল তার মাথায়, এটা কোনো মন্ত্র শক্তি দিয়ে বন্ধ নেই তো। যেই না ভাবা, কাজ হল সেই মাত্রই। গুহ্যকালিকার এক গোপন মন্ত্র প্রয়োগ করল শঙ্খ দরজার উপর, জান্তব একটা শব্দ তুলে সেটা খুলে গেল।

এতকাল পরেও জিনিসটার সামান্যও ক্ষতি হয়নি। কুলুঙ্গির ভেতর জ্বল জ্বল করছে পেতলের অদ্ভুত সুন্দর একটা যক্ষিণী মূর্তি। সেটা এগিয়ে গিয়ে হাতে তুলে নিল শঙ্খ। তারপর পেছনে এসে দাঁড়িয়ে থাকা অম্লানের উদ্দেশে সে বলল,

—“চল, এবার এটা গঙ্গায় বিসর্জন করতে হবে।”

মনে মনে খুব বিরক্তই হচ্ছে সুকন্যা। সকাল থেকে শঙ্খের সঙ্গে সে আকারে ইঙ্গিতে বহুবার কথা বলতে চেয়েছে। চোখগুলো করুণ করে ক্ষমা চাইবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ছেলেটা তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। একটু নয় রগচটাই সে, কী বলতে কী বলে ফেলে নিজেরই খেয়াল থাকে না। কাল নয় একটু বাজিয়েই দেখতে গিয়েছিল ছেলেটাকে, ছেলেটার বারণ থাকা সত্ত্বেও ছাদে উঠেছিল সে। তা বলে পাশে আর একটা মানুষ আছে, সেই জ্ঞানটুকুও করছে না। হুমহাম করে এই ভাঙা বাড়িটাতে নিয়ে এলো, বলছে এটা নাকি তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি, আবার এখন কোথা থেকে এত সুন্দর একটা অ্যান্টিক মূর্তি এনে বলছে জলে বিসর্জন করতে গঙ্গা চল। কী আবদার! এই ছেলের সঙ্গে বেশিক্ষণ সময় কাটালে আরও কী কীই না দেখতে হয় কে জানে? গাড়ির পেছনের সীটে বসে এক মনে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাতে লাগল সুকন্যা।

গাড়ি এসে দাঁড়ালো গঙ্গার পাড়ে। সামনের আসন থেকে নেমে শঙ্খ এগিয়ে গেল গঙ্গার ঘাটের দিকে। হাঁটু সমান জলে নামল সে তারপর একটা মন্ত্র পড়তে পড়তে মূর্তিটাকে জলে ডুবিয়ে দিল। অম্লান আর সুকন্যা, এমন কি ড্রাইভার জয়নন্দনও একটা জিনিস দেখে একটু হকচকিয়ে গেল। প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও একতাল কালো মেঘ এসে জমা হয়েছে গঙ্গার উপর। মূর্তিটা ডুবিয়ে দেয়া মাত্রই মেঘগুলো গঙ্গার জলের সঙ্গে কেমন মিলিয়ে গেল। শুধু শঙ্খের গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শোনা গেল,

—“মম… ক্ষমস্ব… ক্ষমস্ব।”

তিনজনেই চোখ চাওয়া চাওয়ি করল, কেউ ভুল কিছু দেখেছে কিনা এটা বোঝার জন্য। কিন্তু কেউই যেন কোনও কথা বলতে পারল না।

ওদিকে প্রায় চারটে বেজে গেছে। চাকদহ রেল বাজারের সামনের একটা চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে পরের পদক্ষেপ সম্পর্কে ভাবছিল শঙ্খ। সিংহের হাট কালীবাড়ির ওই বুড়ো যেন কী বলেছিল, হ্যাঁ, এই সাউ, মানে রাজেশ্বর সূঁড়ির বংশের একটা মন্দিরের কথা। আর সেটা কাছেই ডুমুরদহের সঙ্গে কোন যোগাযোগ আছে, এরপর ডুমুরদহ গেলেই মনে হচ্ছে অনেক কিছু জানা যাবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%