মনীষ মুখোপাধ্যায়
যদিও ডাক্তাররা সব রিপোর্ট দেখে বলেছেন এখন আর চিন্তার কোনও কারণ নেই, তবুও আইসিইউ থেকে এখনও জেনারেল কেবিনে সরানো হয়নি কুমারেশ সাউকে। তাই যতক্ষণ না কেবিনে পাঠানো হচ্ছে তাঁকে, মহীতোষ আর অম্লান পালা করে থাকবেন হাসপাতালে, এই সিদ্ধান্তই নিয়েছে তারা।
সন্ধে সাতটা থেকে রাত দশটা অবধি থাকছে অম্লান। ততক্ষণ মহীতোষ দোকানের কাজে ব্যস্ত থাকে। কুমারেশের, ব্যবসার জায়গাটা থেকে এই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালটা খুব দূরে নয়। দোকান হয়ে হাসপাতাল আসার সময়ই তাই আশিয়ানা বারের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে আসে মহীতোষ। রাতের ডিনারটা ওখানেই সেরে নেয় সে, তারপর চলে আসে হাসপাতাল। বাবা আসলে অম্লান তখন বেরিয়ে যায়।
মহীতোষকে ভিজিটার্স কেবিনে বসে দেখতে পেল না অম্লান। আজ মহীতোষের হাসপাতালে ঢুকতে সাড়ে দশটা বেজে গেছে। বারে বারে ঘড়ি দেখছিল অম্নান, বাবার তো এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা। পেছন থেকে এসে কাঁধে একটা টোকা দিল মহীতোষ, অম্লান পেছন ঘুরে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হল— যাক বাবা! এই হাসপাতালে পেশেন্টের বাড়ির লোকজনরা খুব একটা থাকে না। নিয়ম নেই, তেমন নয়। দরকার পড়ে না থাকার। যা কিছু হয় মেডিকেল টিমই বুঝে নেয়। প্রথম দিনই ডাক্তার তাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, খুব এমারজেন্সি হলে আপনাদের ফোন করে ডেকে নেওয়া হবে, এমনিতে রাতে এখানে থাকার দরকার হবে না। কিন্তু মন মানেনি অম্লানের, যদি দিদিয়া এসে ভাবে তারা ওর বাবার জন্য ঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। তাই সে বলেছিল, সে জেঠুর জন্য রাতটা হাসপাতালেই থাকবে।
এতক্ষণ সে একাই বসেছিল ভিজিটার্স কেবিনে। তার থেকে কয়েকটা বেঞ্চ আগে বসেছিলেন এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা। ন’টার পর আস্তে আস্তে হাসপাতালের ব্যস্ত কম্পাউন্ড ফাঁকা হতে লাগল। দশটার পর পুরোই ফাঁকা হয়ে গেল চারিদিক। তখনই এসে বসলেন সাদা নোংরা শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা। অম্লান অনুমান করল, এই সব পেশেন্ট পার্টিরা আসেন গ্রাম থেকে। হয়ত খুবই গরিব এই মহিলা, কাপড়ের দশাটা দেখে তাই মনে হচ্ছে। ভদ্রমহিলা কথা বলছেন না দেখে সেও আর আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যায়নি তাঁর সঙ্গে।
অম্লান আর মহীতোষ ভিজিটার্স কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়ালো। চাপা স্বরে মহীতোষ বলল,
“বিকেলে এসে দেখলাম দাদা অনেক ভালো আছে, কালই সম্ভবত কেবিনে শিফট করিয়ে দেবে আইসিইউ থেকে— ওয়ার্ড বয়টা যা বলল আমায়।” হাসল অম্লান, বলল,
“বাহ্, বেশ ভাল খবর, কাল দিদিয়াও এসে পড়বে। আমাদের পার্ট থেকে তা হলে কোনও খামতি নেই, কী বল বাবা?” দুজনে হাঁটতে হাঁটতে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল। সকালে জয়নন্দন এসে মহীতোষকে নিয়ে যাবে। ঐ সময় প্রভাদেবী একবার আসেন।
মহীতোষ অম্লানকে জিগ্যেস করল,
“একটু চা খাবি নাকি? অনেক্ষণ তো বসে আছিস।” মাথা নাড়ল অম্নান, সে চা খাবে না।
“বাবা আমি এখন বেরোই, খুব খিদে পেয়েছে, বাড়ি গিয়ে একেবারে ভাত খেয়ে ঘুমাবো।”
বাইকে উঠে স্টার্ট দিল অম্লান। তারপর মহীতোষকে জিগ্যেস করল,
”বাবা, আজ কি কোনো নতুন পেশেন্ট এসেছে ? দেখে তো একটু গ্রামের দিকেরই মনে হল। আমার কয়েকটা রো আগে বসেছিল।” মহীতোষ মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, তিনি লক্ষ করেননি। রাত হয়ে আসছে, বাইপাস ধরে বেশ খানিকটা গিয়ে সাউথের রাস্তায় ঢুকতে হবে। আর দাঁড়ালো না অম্লান হুস করে স্পিড বাড়িয়ে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে মহীতোষ গলা চড়িয়ে বললেন,
—“সাবধানে যাস।”
এখন বসে বসে ঢোলা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। গত রাতটায় তবুও একটু টেনশনের কারণ ছিল। কিন্তু আজ দাদা অনেকটাই সুস্থ, ভাবল মহীতোষ। ছেলে প্রত্যাখ্যান করলেও তার খুব চা খেতে ইচ্ছা করছে। হাসপাতালের মেশিনের চা কাল সন্ধে থেকে রাত অবধি খেয়ে মুখ মরে গেছে। বাইরে একটা দোকান এখনও খোলা আছে, দেখে এসেছে সে।
বাইরে এসে আরাম করে এক ভাঁড় চা খেল মহীতোষ। আহ্, মাটির ভাঁড়ে চা খাওয়ার আলাদা মজা আছে, মনে মনে ভাবল সে। সময় নিয়ে একটা কিং সাইজ সিগারেট শেষ করল সে। তারপর এগিয়ে গেল ভিজিটার্স কেবিনের উদ্দেশে। গতরাতে অম্লান ছিল অনেক্ষণ, আজ তাকে একাই থাকতে হবে। কুচ পরোয়া নেহি, ভাবল সে, সঙ্গে আছে একটা দুর্দান্ত থ্রিলার উপন্যাস। লেখকের নাম নীহাররঞ্জন গুপ্ত। বেশ টানটান প্লট। নামটাও রাখা হয়েছে অত্যন্ত যত্ন সহকারে— ‘কালো ভ্রমর।’
ভিজিটার্স কেবিনের একদম শেষের দিকের রোয়ের একটা সোফায় গা এলিয়ে দিল মহীতোষ। আরাম করে এবার বইটা পড়া যাবে। বুকমার্ক করা ছিল শেষ পড়া পাতাটায়। সেখান থেকে পড়া শুরু করল সে। আহ্, বেশ জমে উঠেছে উপন্যাস, কিরীটী রায় অসাধারণ ভাবে জাল বিস্তার করছেন। একমনে মহীতোষ পড়ে যেতে লাগল, কোনও দিকে খেয়াল নেই।
হঠাৎ একটা গোঁ…গোঁ শব্দ তার কানে এল। মহীতোষের মুখ থেকে বিরক্তির একটা শব্দ বেরিয়ে এল, ওফফ্।
বুকমার্ক আবার চলে গেল বইয়ের মধ্যে। ঘরটা একেবারে শুনশান ফাঁকা, মাথার উপর চলছে চার ব্লেড ওয়ালা ফ্যান, বিল বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আলোও কম ব্যবহার করে এই ঘরটায়। কিছু বলারও নেই, হাসপাতাল আগে থেকেই জানিয়ে দেয়, পেশেন্টের জন্য কাউকে থাকার দরকার নেই।
এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে মহীতোষের চোখ গেল সামনের রোয়ের দিকে। ময়লা সাদা কাপড় পরা একজন মহিলা বসে আছেন রোয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে। বসে বসে কেমন যেন দুলছেন তিনি। মহীতোষ তাঁকে জিগ্যেস করল,
“এই যে শুনছেন, আপনার কি শরীর খারাপ করছে?”
কোনও উত্তর এল না। শুধু শোনা যেতে লাগল, বিশ্রী একটা গোঁ… গোঁ… শব্দ। মহীতোষ ভাবল হয়ত কোনও বৃদ্ধাই হবেন সামনের রোয়ে বসে থাকা মহিলা, আপন কাউকে ভর্তি করাতে এসে শেষে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
মহীতোষ উঠে দাঁড়ালো, তেমন হলে কাউকে ডাকতে হবে, এমারজেন্সি তো সারারাত খোলা। রো-টার সামনে এসে দাঁড়ালো সে। ঘোমটার আড়ালে চাপা পড়ে আছে ভদ্রমহিলার মুখ। তিনিই করছেন এই বিশ্রী শব্দটা বুঝতে অসুবিধা হল না মহীতোষের। বেশ জোরের সঙ্গেই আবার মহীতোষ জিগ্যেস করল,
”আপনার কি শরীর খারাপ করছে, অন্য কেউ কি আছে আপনার সঙ্গে?”
ঘোমটার নীচে মাথা নাড়লেন ভদ্রমহিলা। তাঁর সঙ্গে কেউ নেই বোঝাতে চেষ্টা করলেন। একটা কেমন গুমোট ভাব লাগছে কেবিনটার মধ্যে। একটা দমকা হাওয়া দিল হঠাৎ করেই, তাতে সরে গেল সাদা নোংরা শাড়ি পরা ভদ্রমহিলার মাথার ঘোমটাখানা।
একটা সপাটে ধাক্কা খেল যেন মহীতোষ। তাঁর সামনে যে ভদ্রমহিলা বসে আছে আদৌ কি সে মানুষ! কালো মিশমিশে গায়ের রঙের সঙ্গে কুমিরের মত এবরো-খেবরো চামড়া লেগে আছে। কোনও রকমে চামড়াটা যেন হাড়ের সঙ্গে লেগে আছে মহিলার। মাথার চুলে জট তৈরি হয়েছে, কোটরের মধ্যে জ্বল জ্বল করছে লোভাতুর দুটো চোখ। মুখ একটু ফাঁক করল সে, কয়েকটা ক্ষয়াটে দাঁত লেগে রয়েছে মাড়ির সঙ্গে। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল সে।
“কে আপনি?” আতঙ্কে মহীতোষের মুখ থেকে বেরিয়ে এল কথাটা।
খিক্খিক্ খিক্খিক্, বীভৎস একটা নারকীয় হাসি ছত্রখান করে দিল পরিবেশ। চিৎকার করে সাহায্য চাইতে ইচ্ছে হল মহীতোষের, কিন্তু কোনও এক অজানা কারণে গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না তার।
হিস্হিসে স্বরে বিকট দর্শন মহিলা বলল,
“একজনকে নিতে এসেছি... তারপর এক এক করে সবাইকে নেব।”
শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু সঞ্চয় করে মহীতোষ প্রশ্ন করল,
“কাকে নিতে এসেছেন?”
আবার শোনা গেল নরকের গভীর অন্ধকার থেকে ভেসে আসা সেই গলা—
“কুমারেশশশশ।”
তারপর চোখের সামনে থেকে ভোজবাজির মত সব কিছু কেমন যেন মিলিয়ে গেল মহীতোষের। ভয়ে সে কেবিন থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল, তারপর ছুটতে লাগল হাসপাতালের বাইরের দিকে। নাইটগার্ডরা যেন একটু অবাক হল এমন ভাবে একজনকে দৌড়তে দেখে।
দিকবিদিক্ জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে এসে বড় রাস্তায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা গাড়ি এসে ব্রেক কষল ঠিক মহীতোষের সামনে। আর একটু হলেই ঘটে যেত বিরাট অঘটন। গাড়ির ড্রাইভার মুখ বের করে একটা নোংরা গালাগালি দিল তাকে। তখন তিনি দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন। শরীর যেন আর চলতে চাইছে না। ওঃ কী ভয়ঙ্কর সেই মহিলা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন