মনীষ মুখোপাধ্যায়
পরেশ ভট্টাচার্যের মুখটা বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছে। আজ এতদিন পর ছেলে মহেশ ওই মন্ত্র আর প্রলাপ বাদ দিয়ে অন্য কথা বলেছে। তাঁকে বাবা বলে ডেকেছে। মায়ের কাছে কপির তরকারি আর লুচি খেতে চেয়েছে। আর এসব হয়েছে একজনের জন্যই। হঠাৎ দেবদূতের মত এসে এই ছেলেটা তাঁর ছেলেকে রক্ষা না করলে, তিনি নিজের ছেলের সুস্থ হওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। সেই সাধুটা যেন কী বলে গিয়েছিল? হ্যাঁ, বুড়োবিবির হাত থেকে তাঁদের গ্রামকে রক্ষা করতে একজন আসবেন, তখন বুড়োবিবির প্রকোপ থেকে সবাই বাঁচবে, আর সুঁড়িদের বংশনাশ হবে। তাঁর ছেলে রক্ষা পেল ঠিকই, কিন্তু কারো বংশনাশের কথা মাথায় আসতেই শিউরে উঠলেন পরেশ। বেশ বেলা হয়েছে, প্রায় চারটে বাজতে যায়। ওই সাধককে বেশ ঘটা করে খাওয়াচ্ছেন পরেশের বৌ। সঙ্গের ছেলে মেয়ে দুটোও খেতে বসেছে তার সঙ্গে।
পরেশ পাশের ঘরে উঁকি দিলেন। ছেলেটি গন্ডুষ ভেঙে খাওয়ার পাত ত্যাগ করছে। কলতলায় আচিয়ে শঙ্খ দাওয়ায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই পরেশকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। সে জিগ্যেস করল,
“আপনি আমাকে কিছু বলবেন?”
পরেশ যেন প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন, বললেন,
“দেখুন এই ডুমুরদহের পুরানো গল্পই বলুন বা একটি সংরক্ষণ করা প্রাচীন পুঁথি, সর্বত্রই এক উদ্ধারকারী সাধকের উল্লেখ পাওয়া যায়, আপনি আমার ছেলেকে এই দারুণ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেছেন, আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে আপনাকে এই অঞ্চলের পুরানো একটা ইতিহাস বলা দরকার আর দেখানো দরকার সেই প্রাচীন পুঁথিটা।”
শঙ্খ বলতে শুরু করল,
“দেখুন আমিও এই অঞ্চলের ইতিহাসটা জানতেই এখানে এসেছিলাম, এই যে ওই ঘরে দুটো ছেলে মেয়ে বসে আছে ওরা এই অঞ্চলেই বসবাসকারী সুঁড়িদের বংশধর। বহুকাল ধরেই একটা অভিশাপ ওদের তাড়িয়ে আসছে। মা ধূমাবতীর অভিশাপ। ওদের এক পূর্বপুরুষের কোনো ভুলে ওদের জীবন নরক হয়ে উঠেছে।”
পরেশের চোখে মুখে কেমন একটা বিস্ময়ের ঘোর লেগেছে। তিনি বললেন,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, সুঁড়িরা এক সময় এখানেই থাকত, রাজেশ্বর সুঁড়ি এ অঞ্চলে ওই চরার দিকে একটা মন্দির করেছিল, সেই থেকেই বিপত্তির সূত্রপাত। দাঁড়ান আপনাকে পুঁথিটা এনে দিই, রামচরণ জ্যাঠা বলেছেন, যে এর মর্ম উদ্ধার করতে পারবে সেইই দেবীকে শান্ত করতে পারবে। আর হ্যাঁ পুঁথিটা দেখার পর আপনাকে আমার সঙ্গে একবার রামচরণ মুখুটির বাড়ি যেতে হবে।” কথা শেষ করে ঘরের দিকে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেলেন পরেশ।
শঙ্খ বসে বসে ভাবতে লাগল ছেলেটার কথা। ছেলেটা মানসিক ভাবে খুবই দুর্বল ছিল, ওই থানে হয়ত প্রায়ই এসব দেখা যায়, কিন্তু সেদিন সে সবকিছু দেখে ফেলেছিল। দেবীর বীজ মন্ত্র ছেলেটা ওই ঘোরের মধ্যেই জানতে পেরেছে। যেমন ভর পড়া মানুষে অনেক কিছু জানতে পারে। ভাগ্যিস আজ অনন্তমাতৃকা রুদ্রাক্ষ সঙ্গে ছিল ওটা ছেলেটাকে ধারণ করাতেই, আর কালিকা কবচ কানে কানে পাঠ করতেই দেবীর ভয়াবহ প্রভাব থেকে ছেলেটা বেরিয়ে আসতে পেরেছে।
একটা লাল কাপড়ে মোড়া পুঁথি নিয়ে ফিরে এলেন পরেশ, তারপর সেই কাপড়ের গিঁট খুলে সেটা মেলে ধরলেন শঙ্খের সামনে। শঙ্খ পড়তে লাগল এক একটা অধ্যায়। সে বেশ রোমাঞ্চিত বোধ করল। এত বছর আগেকার একটা পুঁথি পড়ার অভিজ্ঞতা বেশ মধুর। পুঁথির বংলায় অনুবাদ করা লেখাটা পড়তে খুব বেশি সময় লাগল না শঙ্খের।
পুঁথির মধ্যে যে দুটি যন্ত্র আঁকা ছিল তারমধ্যে প্রথম যন্ত্রটির দিকে বেশ মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগল শঙ্খ। দেবসেনাপতি ভট্টসূর্য ওই যন্ত্রটাকে ক্রিয়া করবার যন্ত্র বলেছেন। কী আশ্চর্য যন্ত্র এটা, শঙ্খ নিজের সাধনার সময় গুরু অমর ভট্টাচার্যের কাছে এই যন্ত্রের কথা কখনই শোনেনি। একাধিক উলটো ত্রিভূজ, একাধিক যোনির নির্দেশক, আবার একাধিক সোজা ত্রিভূজও দেখা যায়। যা কিনা পুরুষের শিশ্নের নির্দেশ দেয়।

এক মনে যন্ত্রটাকে দেখে যেতে লাগল শঙ্খ। পদ্মফুলের আটটা পাঁপড়ি, দুটি পরিষ্কার উলটো ত্রিভূজ আর একটিই সোজা ত্রিভূজ। এর পেছনে কী মানে থাকতে পারে? বিষয়টা বারে বারে ভাবাতে লাগল শঙ্খকে। যন্ত্রের মধ্যস্থিত ধূং শব্দটি আবার সেই বীজ মন্ত্রেরই কথা বলে! এর মধ্যে কোনো গূঢ় তত্ত্ব লুকিয়ে আছে, কিন্তু শঙ্খ সেটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ভাবার পর শঙ্খ একটা পথে আসতে পারল... এই যন্ত্রে সোজা ত্রিভূজের চেয়ে উলটো ত্রিভূজের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ প্রকৃতির কর্তৃত্বের কথা বলেছে যন্ত্রটি। এরমানে হল উদ্ধারের পথ এখানে শিব নয়, বরং শক্তি উপাসনাই হল আসল উপায়। আর ধূং অর্থাৎ ধূম্র, ধূম্রের সঠিক স্থান হল শ্মশান, সেই শ্মশানেই এর পরিণতি।
একটা ঘোরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল যেন শঙ্খ। তারপর পরেশের উদ্দেশে বলল,
“চলুন এবার আমায় আসল গল্পটা জানতে হবে। আর হ্যাঁ, আপনার বাড়িতে টেলিফোন আছে?” থামল শঙ্খ।
পরেশ মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, তাঁর বাড়িতে টেলিফোন আছে। সে এই গঞ্জের মোটামুটি ধনীই বলা চলে। পুঁথি শেষ করতে করতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেছে।
শঙ্খশুভ্র আর পরেশ বাড়ি থেকে বেরতে যাবে হঠাৎ সামনে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুকন্যা। তার মুখ থমথম করছে। যেন খুব অল্প সময়ে একটা ঝড় তার জীবনকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। শঙ্খ তার হাতটা চেপে ধরল। সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল যেন সুকন্যার।
দৃঢ় কণ্ঠে শঙ্খ জিগ্যেস করল,
“কী হয়েছে?”
কাঁদো কাঁদো মুখে সুকন্যা জবাব দিল
—“বোনুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“তুমি কী করে জানলে?” আবার জিগ্যেস করল শঙ্খ।
“বাবার জন্য চিন্তা হচ্ছিল, বৌদিকে বলায় তিনি বললেন, এ’বাড়িতে একটা ফোন আছে, আমি বাড়িতে ফোন করার পর মা ফোনটা ধরল... কাকু আর কাকি গেছে পুলিশের কাছে...মা বলল ওদের পুলকারের ড্রাইভার এসে বলেছে অনন্যাকে স্কুলে পাওয়া যায়নি।”
চিন্তার ভাঁজ পড়ল শঙ্খর কপালে। সে অম্লানকে কাছে ডাকল, তারপর ফিসফিস করে কিছু একটা বলল কানে কানে। অম্লান বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়ল।
অম্লান সুকন্যার কাছে ফিরে এসে বলল,
“দিদিয়া তুই এখানে থাক কিছুক্ষণ, আমি আধ ঘন্টায় ফিরে আসব... আর রাত আটটার পরে তুই আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবি।”
শঙ্খ আর পরেশ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল অম্লানও। সুকন্যা বোকার মত দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়াটা দেখল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন