মনীষ মুখোপাধ্যায়
আজ আশ্রম ফাঁকা, যাদের আশ্রমের চারিদিকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়, অর্থাৎ সেই কমলা বা হলুদ বসন পরিধানকারী লোকজনদের আজ দেখা যাচ্ছে না। শ্রীলা চুপ করে বসে আছে একটা ফাঁকা ঘরে, গুরুদেব পুজোয় বসেছেন,পুজো শেষ হলেই তিনি এসে দেখা করবেন। শ্রীলার হাতে ধরা মেয়ের আঁকার খাতাটা। মানুষ বিপদে পড়লে, এক এক সেকেন্ডকেও মনে হয় এক একটা দিন পার হচ্ছে যেন। আশ্রমে একলা বসে বসে সেই অনুভূতিটাই যেন হচ্ছে শ্রীলার!
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পুজো শেষ করে গুরুদেব প্রবেশ করলেন মন্দিরের পাশের ঘরটিতে। যে ঘরে অপেক্ষা করছিল শ্রীলা।
শ্রীলাকে দেখে একগাল হাসলেন বৃদ্ধ মানুষটি। হেসে বললেন,
“কী হয়েছে মা, এত মনমরা দেখাচ্ছে কেন রে তোকে?” পায়ের নখ দিয়ে শ্বেত পাথরের মেঝেতে আঁচড় কাটতে কাটতে, মাথা নীচু করে শ্রীলা উত্তর দিল,
“আমাদের পরিবারে বিরাট বিপদ বাবা, কোনো এক ভয়ানক শাপের প্রভাব আমাদের পরিবারের পুরুষদের মাথার উপর ঝুলে আছে, মৃত্যুর আগে তাঁরা রজনীগন্ধা ফুলের গন্ধ পান। আমার শ্বশুর, জ্যাঠশ্বশুর সকলেই সেই গন্ধ পেতেন মারা যাওয়ার আগে থেকে, এখন আমার ভাশুর সেই গন্ধ পাচ্ছেন। তিনি ভীষণ অসুস্থ, কাল রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।” থামল শ্রীলা।
“কেমন শাপের কথা বলছিস মা?” আবার প্রশ্ন করলেন গুরুদেব।
“আমার শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার আগে আমায় বলে গিয়েছিলেন, অনেক বছর আগে তাঁর এক পূর্বপুরুষ, চাকদায় আমাদের শ্বশুর বাড়ির আদি গ্রামে, কালীঘাটের এক তান্ত্রিকের নির্দেশে একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরের বিগ্রহের সঙ্গে কামরূপের কোনো একটা যোগাযোগ ছিল।”
“কীসের মন্দির রে মা?” গুরুদেব জানতে চাইলেন।
একটু সময় নিয়ে শ্রীলা উত্তর দিল,
“কীসের মন্দির, আমার শ্বশুরমশাই আমাকে বলে যাননি। অভিশাপের কারণে তাঁরা এতটাই ভীত ছিলেন যে ওই পূর্বপুরুষের মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানেরা সেই গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। আর কোনও দিনও তাঁরা সেই গ্রামে যাননি।”
“মা মহামায়ার উপর ভরসা রাখ মা, তিনি সর্ববিঘ্ননাশকারী, তাই তো তিনি দশভূজা।” শ্রীলার হাতে কয়েকটা ফুল বেলপাতা তুলে দিলেন গুরুদেব। তারপর বললেন,
“এই প্রসাদী ফুল ভাশুর ঠাকুরের মাথায় ছুঁয়ে গঙ্গায় বিসর্জন করে দিবি।”
শ্রীলার হঠাৎ মনে পড়ল আঁকার খাতাটার কথা। গুরুদেবের সামনে সে মেলে ধরল, যে ছবিটা কাল অনন্যা এঁকেছে সেটাকে তারপর বলল,
“আমার মেয়ের আঁকা এই ছবিটা দেখেই কাল ভাশুর ঠাকুরের শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”
ছবিটা দেখেই আতঙ্কে লাফিয়ে উঠলেন গুরুদেব। চিৎকার করে বলে উঠলেন,
—“রক্ষা কর রক্ষা কর হে আনন্দময়ী।”
শ্রীলাও ভয় পেয়ে গেল গুরুদেবের এই আচরণ দেখে। চিন্তান্বিত হয়ে সে প্রশ্ন করল,
“কী হল বাবা, আপনি এরকম বললেন কেন?”
একটু সময় নিলেন গুরুদেব, যেন আতঙ্কটাকে আয়ত্ত্বে আনার চেষ্টা করছেন। তারপর বললেন,
“সৃষ্টির আদি আর প্রলয়ের পরে যে ঘোর অমানিশা, সেই চাপ চাপ গভীর কালো অন্ধকারে অধিষ্ঠান করেন এই দেবী— এঁর নাম... মাতা ধূমাবতী।”
এই ধরনের কোনও দেবদেবীর নাম কখনো শোনেনি শ্রীলা, সে অবাক হয়ে গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করল
—“ইনি কোন দেবী বাবা? এরকম কোনও দেবীর কথা তো আমরা কখনো শুনিনি!”
—“সংসারী মানুষের এনার নাম না শোনারই কথা, সর্বত্যাগী না হয়ে যে এঁর উপাসনা করা যায় না রে মা! নচেৎ পূজারী ও তার পরিবারের ওপর নেমে আসে মৃত্যু, জ্বরা, মহাপ্রলয়, অকাল বৈধব্য। আমার মনে হচ্ছে এই কারণেই তোর বাড়ির সকলেরই এই মূহুর্তে ঘোর বিপদ।”
শ্রীলার কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কী বলবে আর কীই বা করবে সে ভেবে পাচ্ছে না। গুরুদেবের কাছে সে এসেছিল পরিত্রাণের পথ খুঁজতে। তিনিও কোনও পথ তো বলতে পারছেনই না উপরন্তু তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বেশ ভয়ই পেয়েছেন।
শ্রীলা নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। তারপর প্রশ্ন করল,
—“কোনো রাস্তাই কি নেই দেবীর রোষ থেকে বাঁচার? আর এতদিন তো কেবল পরিবারের মাথাদের উপরেই পড়েছে এই অভিশাপের খাঁড়ার ঘা। কিন্তু ছবিতে যে আমার মেয়ের গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ধরেছেন দেবী, যেটা দেখে আরও চিন্তায় পড়েছি আমি। আপনি দয়া করে একটা রাস্তা বলে দিন বাবা।”
একটু যেন স্বাভাবিক হয়েছেন গুরুদেব। তিনি বললেন,
“বাঁচানোর আমি কেউ না রে, মা মহামায়ার যা ইচ্ছা তাই তিনি করবেন। আমি বুড়ো হয়েছি, বয়সের ভারে হারিয়েছি অনেক ক্ষমতাই। আর আমি সর্বত্যাগীও হতে পারিনি। ঘোর সংসার করেছি এক সময়। এই কাজের মুক্তির জন্য এমন এক মানুষের প্রয়োজন যাঁর কোনও মোহমায়া নেই, যে হবে প্রকৃতই ত্যাগী আর বিরজা হোমের দ্বারা যে নিজের কুল বংশ অবধি ত্যাগ করেছে এমন কেউই উদ্ধার করতে পারবে তোদের।”
“কিন্তু সেই মানুষ পাবো কোথায় বাবা?” শ্রীলার চোখে মুখে হেরে যাওয়ার চিহ্ন ফুটে উঠছে যেন।
অভয় দিলেন গুরুদেব
—“কাল আমার আশ্রমে একটি ছেলে আসবে, যার বয়স বেশি নয়। যতদূর শুনেছি সে বিরজা হোম করে সব কিছু ত্যাগ করেছে। সে কখনও সংসারী হবে না। তার সঙ্গে একবার কথা বলে দেখি সে যদি তন্ত্রের এই গুহ্য সাধনার কিছু মাত্র জানে, সেই বাঁচাতে পারবে তোদের। পারলে তুই কাল আসিস দুপুরের দিকে।”
আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন গুরুদেব। বিশ্রামের সময় হয়েছে তাঁর।
শ্রীলা মাথা নীচু করে বেরিয়ে এল আশ্রম থেকে। একটা আশার আলো তবুও দেখা গেছে। এখন কাল অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন