মনীষ মুখোপাধ্যায়
চাকদহ, ২০০০ সাল
সমস্ত ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না পুঁথিটা। তবুও আশা ছাড়েননি পরেশ ভট্টাচার্য। তাঁর জ্যাঠা ছিলেন অবিবাহিত কাজেই তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ব্যবহারের সবকিছুই ভাইপো পরেশের ভাগ্যেই জুটেছে। তাঁর ঘর খানাও এখন পরেশের পরিবার ব্যাবহার করে বাড়ির বৈঠকখানা হিসেবে। পরেশ, জ্যাঠার ব্যাবহারের আলমারি, তোরঙ্গ, ট্রাঙ্ক সবকিছু খুঁজে দেখেছেন, কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি কিছুই। সেখানে পড়ে আছে কতগুলো পুরানো ধুতি, পাঞ্জাবি আর জামা আর যা দুয়েকটা জমিজমার কাগজ। আর দামি জিনিসের মধ্যে কেবল একজোড়া সোনার বোতাম ব্যস আর কিচ্ছুটি নেই।
ওদিকে মহেশের উপসর্গ বাড়ছে দিন দিন। সে মাঝে মাঝেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছে, আর প্রলাপের মত বলে চলেছে মন্ত্রটা। সেই, কাকে কে মেরে ফেলল, একই কথা বলে চলেছে। চিন্তায় পরেশের দোকান, বাজার, ব্যবসা সব লাটে ওঠার জোগাড় হয়েছে।
গ্রামের মানুষের মুখে মুখেও ছড়িয়েছে ভয়ের কথা। বুড়ো বিবির ভয় তারাও রাতে ঘুমোতে পারে না। সন্ধ্যে হলেই জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে আসে কাদের যেন কান্নার শব্দ। তার চেয়েও অবাক কাণ্ড হল, কোনও এক অজানা কারণে কারো বাড়ি কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না, ঠিক একটা না একটা বাধা পড়ছেই। এই তো দিন দুই আগের কথা, হারু সমাদ্দারের মেয়ের বিয়ে ছিল, কিন্তু সে বিয়ে গেল বন্ধ হয়ে । বরের বাবাকে নাকি বিয়ের আসরেই সাপে কাটলো! সেই নিয়ে পড়ে গেল দৌড়দৌড়ি। প্রাণে বেঁচে গেলেন ভদ্রলোক, কিন্তু বিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। বিয়ের লগ্নে সাপে কাটা নাকি বিরাট অলক্ষণে ব্যাপার।
গাঁয়ে দু ঘরে বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু হিজড়েরাও ঢুকতে ভয় পাচ্ছে এ তল্লাটে। একদিন সকালে এক হিজড়ে বাচ্চা নাচাতে গ্রামে ঢুকতে গিয়ে দেখে এক খুনখুনে বিধবা বুড়ি গ্রামের সীমায়, নেড়া তেঁতুল গাছতলায় বসে পোড়া শোল মাছ চিবিয়ে খাচ্ছে। সেই যে তারা পালালো, আর আসেনি।
পরেশ যে পুঁথিটা খুঁজে পাচ্ছেন না, সেটা তিনি জানালেন রামচরণ মুখুটি আর বিহারীকে। হতাশ পরেশ এও বললেন, আদৌ তেমন পুঁথি কখনও তাঁদের বাড়িতে ছিল কিনা এনিয়েও সন্দেহ আছে বিস্তর। কিন্তু বৃদ্ধ রামচরণের মন কিছুতেই মানছে না। বিহারী বৃদ্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার জন্ম ওই সময় হয়নি, সে গঙ্গারাম ডাকাতকে দেখেছে কিন্তু রাজেশ্বরের ওই মন্দির কখনই দেখেনি। তাই তার মনেও পুঁথির অস্তিত্ব নিয়ে যথেষ্টই প্রশ্ন আছে।
কপালের কাছে মানুষের ক্ষমতা কিচ্ছু না। এই বিশ্বাসে এক সপ্তাহের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর পরেশ পুঁথি খোঁজার চেষ্টা ছেড়ে দিলেন। যদি বুড়ো বিবির এই ইচ্ছা হয়, সে গ্রাস করুক গোটা গ্রামকে। নিজের ছেলের সুস্থ হওয়ার আশাও ছেড়ে দিলেন তিনি এক সময়।
গ্রামে পূজা পার্বণের ঘটা কমে আসতে লাগলেও, সন্ধে হলে নিত্য শাঁখে ফুঁ দেয়ার রেওয়াজ কিন্তু উঠে যায়নি। এদিকে সামনে এগিয়ে আসছে পূর্ণিমা। ভট্টাচার্য বাড়ির প্রতিষ্টিত রাধা-গোবিন্দের সেবা দেওয়ার সময় হয়েছে। এরজন্য ঠাকুর সরিয়ে বেদি পরিষ্কার করা আবশ্যক। সন্ধ্যা প্রদীপ দিয়ে, শাঁখ বাজাবার সময় পরেশ ভট্টাচার্যের মায়ের মাথায় এল এই খেয়াল। ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে ছেলেকে তিনি জানালেন সেই কথা।
পরেশের মেজাজ আজকাল ভীষণ খিটখিটে থাকে। তিনি বিরক্ত হয়ে মায়ের ওপর চেঁচাতে গিয়েও থেমে গেলেন। ঠাকুর দেবতা নিয়ে বেঁচে থাকা এই বয়স্কা মানুষটার আর কী দোষ। তিনি ছোট উত্তরে কাজ সারলেন, বললেন,
“কাল দেখছি।”
সকালে উঠে স্নান সেরে আহ্নিকের পূর্ব্বে পরেশ বেদি থেকে নামালেন বিগ্রহ, বেদিটা এইবার সারানোর সময় হয়েছে, মনে হল পরেশের। বেশ বড়-সড় একটা ফাটল ধরেছে বেদিতে। কাপড় দিয়ে বেদি পরিষ্কার করতে গিয়ে চমকে গেলেন পরেশ। এ কী! বেদির ভেতরটা যে ফাঁপা। আলো পড়েছে ফাটলের মধ্যে। পরেশের মনে হল, ওর মধ্যে কিছু যেন একটা আছে। লালরঙের একটা কিছু যেন দেখা যাচ্ছে।
কাটারির পেছন দিয়ে দু’তিন বার আঘাত করতেই ভেঙে পড়ল তিরিশ বছর আগে মাটি আর লাল সিমেন্টে দিয়ে বাঁধানো বেদিটা। তার মধ্যে উঁকি দিল বেশ কয়েকটা লাল কাপড়ের গাঁঠরি। আনন্দে চোখ চকচক করে উঠল পরেশের। এর মধ্যে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে সেই পুঁথি। রাধা-গোবিন্দকে অন্য একটা সিংহাসনে সরিয়ে, আহ্নিক সেরে বেরিয়ে এলেন তিনি পূজার ঘর থেকে।
এক এক করে খুলতে লাগলেন কাপড়ের গাঁঠরিগুলো। প্রচুর পুঁথি বের হচ্ছে এক একটা গাঁঠরি থেকে। ইতিহাস, গণিত, ভাষা বিষয়ক সে সব পুঁথির কদর পরেশের করার ক্ষমতা নেই। জ্যোতিষ ও তন্ত্রশাস্ত্র নিয়েও রয়েছে বেশ কয়েকটা। পাওয়া গেল কালিকাপুরাণের একটি পুঁথিও। সঙ্গে রয়েছে জ্যাঠার নিজের হাতে করা অনুবাদের খসড়া। বাঁশ থেকে প্রস্তুত একরকম কাগজে সেইগুলো অতি যত্ন সহকারে করা হয়েছে। আর এমন কোনো কীটনাশক ব্যাবহার করা হয়েছে যাতে কাগজগুলি অক্ষত রয়েছে এখনও। যদিও পুঁথিগুলোর অবস্থা শোচনীয়।
শেষ লাল কাপড়ের গাঁঠরির গিঁট খুলে আনন্দে ঝলমল করে উঠলেন পরেশ ভট্টাচার্য। এই তো সেই জিনিস, পাওয়া গেছে অবশেষে।
কাপড়ের গিঁট আবার বন্ধ করে, কোনও রকমে গায়ে একটা জামা চাপিয়ে পরেশ বেরিয়ে পড়লেন মুখুটি মশাইয়ের বাড়ির উদ্দেশে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন