মনীষ মুখোপাধ্যায়
গঙ্গার ঠিক অপর দিকেই ডুমুরদহ গ্রাম খুঁজে বের করতে বেশি অসুবিধা হল না শঙ্খদের। এই ডুমুরদহকে গ্রাম বলা হলেও, বেশ আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে চারিপাশে। গাছ-গাছালী, মাঠ, পুকুর এইসব বেশি থাকার কারণেই বোধ হয় এখনও এটাকে গ্রাম বলা হচ্ছে। গঙ্গার ধার ঘেঁসে একটু এগিয়ে যেতেই একটা জটলা মত দেখা গেল। ওরা থামতে বাধ্য হল। ভীড়ের দিকে এগিয়ে গেল অম্লান। ভীড়টা ঠেলে এগিয়ে গেল সে সামনের দিকে। সামনে পৌঁছেই আঁৎকে উঠল অম্লান। এত বীভৎস মড়া সে তার জীবনে দেখেনি।
ভীড়ের ঠিক মাঝখানে পড়ে রয়েছে একটা মড়া। একটা বুড়ির লাশ সেটা, বুঝতে অসুবিধা হয় না। অম্লান খেয়াল করেনি কখন যেন শঙ্খ আর সুকন্যা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“দেখেছ শঙ্খ দা... কী... বীভৎস... কী বিশ্রী ভাবে চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে।” শঙ্খ কিছুই বলল না, চুপ করে সব দেখতে লাগল। কে কী বলছে শোনার চেষ্টা করল, কাজ হল এতেই।
ভীড়ের থেকে আলাদা, একটু দূরে দুটো লোক নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে,
—“বুড়ো বিবির আছড় বড়ো সাংঘাতিক, এই কয়দিন আগেই পরেশ ভট্টাচার্যের ছেলেটা পাগল হয়েগেল, গ্রামে বে-থা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সব ঘরে, হিজরারা ভয়ে এ তল্লাটে ঢুকছে না। আর এই দেখো আজ... নুটু পাগলিটাও কেমন মরল।” আরেকটা লোক মাথা নেড়ে সায় দিল,
“হ্যাঁ গো দিবাকর দাদা ঠিকই বলেছ।”
লোক দুটোর দিকে দৌড়ে গেল শঙ্খ। হাতজোড় করে নমস্কার করল তাঁদের, তারপর বলল,
—“আমি শঙ্খশুভ্র মুখোপাধ্যায়, ওই বুড়োবিবির থানটা কোথায় একটু বলতে পারবেন?” অবাক চোখে তার দিকে তাকাল লোকদুটি। তারপর বলল,
“তা সাধ করে সেখানে মরতে যাবে কেন বাপু?”
“মরতে যাচ্ছি একথা আপনাকে কে বলল।” হেসে উত্তর দিল শঙ্খ।
“তাহলে ও চরের গম্বুজে কেন যেতে চাইছেন?” আবার প্রশ্ন করল লোকটা।
“যদি বলি, রাজেশ্বর সুঁড়ির মন্দিরটা একবার চোখের দেখা দেখতে চাই।” বার একটু দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল কথাটা।
“আপনি কে যে এত ভ্যাজর ভ্যাজর করছেন? আর সুঁড়িদের আপনি চিনলেনই বা কী করে?’ লোকটাকে এবার একটু বিরক্তই দেখাল।
“আমি হলাম শঙ্খশুভ্র মুখোপাধ্যায়, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার নিজের পরিচয় দিলাম। আমি একজন সাধক, কী সাধক কেন সাধক সেসব বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। আর এঁরা হলেন— ওই রাজেশ্বর সুঁড়ির বংশধর।” অম্লানের দিকে আঙুল তুলে দেখাল শঙ্খ। আবার বলতে শুরু করল,
—“এদের পরিবার বড়ো অশান্তিতে আছে, তাই ওই মন্দির খুঁজে ওই দেবীকে আমায় শান্ত করতেই হবে।” এরচেয়ে বেশি আর কিছু বলার প্রয়োজন অনুভব করল না শঙ্খ এই অপরিচিত লোকটাকে।
লোকটা কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন তার দিকে, তারপর বললেন,
—“আপনি শিগগির করে একবার পরেশ ভট্টাচার্যের বাড়ি যান, ওখানে গিয়েই সব বুঝতে পারবেন।” তারপর গলা তুলে ডাক দিলেন
—“এই হারাণ এই বাবুকে একটু পরেশ খুড়োর বাড়ি নিয়ে যা।”
লাশের কাছে যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে বছর তেরো-চোদ্দর একটি ছেলে দৌড়ে এসে শঙ্খের সামনে দাঁড়াল। তারপর বলল,
“চলেন বাবু।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন