মনীষ মুখোপাধ্যায়

—“যদিও রাতের বেলায় তুলসীপাতা ছেঁড়া ঠিক নয়, তবুও কিছু তুলসীপাতা ছিঁড়ে আনো বৌমা।”

গুরুগম্ভীর নাদে ঘোষনা করলেন রামচরণ মুখুটি। আশ্চর্যজনক ভাবে এখন আর গলার স্বর ফ্যাঁসফ্যাঁসে শোনাচ্ছে না তাঁর। পরেশ ভট্টাচার্যের বৌ দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এল একগোছা তুলসীপাতা। একটা শিল আর কিছু গোলমরিচ চেয়ে নিলেন মুখুটি মশাই, তারপর তুলসীপাতাগুলো শিলে ভালো করে বেটে নিলেন। বেশ কিছুটা রস বেরোনোর পর সেটার মধ্যে মেশালেন গোল মরিচের গুঁড়ো। শ্বেত পাথরের খলে তুলসীর রস আর মরিচের গুঁড়ো গুলতে গুলতে তিনি পরেশের স্ত্রীয়ের উদ্দেশে বললেন,

—“এবার বাপধনের মুখটা হাঁ করিয়ে দাও তো।”

বিনা বাক্যব্যয়ে মুখুটি মশাইয়ের আদেশ পালন করল পরেশের স্ত্রী। একটা রুপোর ঝিনুকে করে মুখুটি মশাই আস্তে আস্তে রসটা ফেলতে লাগলেন মহেশের হাঁ করা মুখের ভেতর। এক সময় সবটুকু রস চলে গেল মহেশের গলায়। আর সবাইকে অবাক করে সে চোখ মেলে তাকালো। যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল সকলের। বাড়ির সকলে ঈশ্বরের উদ্দেশে মাথায় হাত ঠেকাল।

মহেশ চোখ খুলল বটে কিন্তু চোখ খুলেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোরগ্রস্তের মতন বলতে লাগল,

—মানুষ বলি দিচ্ছে, মেয়েমানুষকে বাচ্চা সমেত বলি দিয়ে দিতে যাচ্ছে, ওদের বাঁচাও… ওদের বাঁচাও… ওঁ ধুং ধুং ধূমাবতী স্বাহাঃ। ওঁ ধুং ধুং ধূমাবতী স্বাহা…

বার বার একই কথা বলতে লাগল সে। অজানা এক আতঙ্কের সঙ্গে সকলের চোখে মুখে দেখা দিল উৎকন্ঠা। আতঙ্কিত হয়ে পরেশের স্ত্রী শুভময়ী ছেলেকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। সবটাই এতক্ষণ যেন খেয়াল করছিলেন বৃদ্ধ রামচরণ আর বিহারী। মূর্চ্ছা রোগের অব্যর্থ দাওয়া কাজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এ যে বুড়ো বিবির আছড় লেগেছে! এর ঔষধ রামচরণ মুখুটির জানা নেই। এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধ তান্ত্রিকের আর সেই গোপন পুঁথির। মোড়া থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দরজার দিকে অগ্রসর হলেন। পরেশ দৌড়ে গিয়ে পায়ে পড়ল তাঁর,

—“জ্যাঠামশাই বাঁচান… এ’সব কী বলছে মহেশ!”

কোনো উত্তর দিলেন না রামচরণ। পরেশের চোখের জল পায় ঠেকল রামচরণের, কেঁপে উঠল তাঁর শরীর। এত কষ্ট বোধ হয় নিজের স্ত্রীর বিয়োগেও তিনি পাননি।

পরেশের উদ্দেশে তিনি বললেন,

—“দেখো বাবা, আমি একজন কবিরাজ, ওষুধপথ্যের ব্যাপারে আমি সাহায্য করতে পারি, আর চোখে ভালো না দেখলেও তুমি তোমার ছেলের জন্মকোষ্ঠির বারো ঘরে গ্রহের অবস্থান ঠিক ঠিক বললে, ওর আয়ু আছে কিনা তাও নির্ভুল গননা করে বলতে পারি। কিন্তু দেব-দেবীর আছড় থেকে কাউকে মুক্ত আমি করতে পারি না।”

পরেশ অবাক হয়ে তাকালেন বৃদ্ধ রামচরণের দিকে,বললেন

—“দেব-দেবীর আছড়!”

—“হ্যাঁ বাবা তোমার ছেলের বুড়ো বিবির আছড় লেগেছে,” বৃদ্ধের কথা শুনে চাপা গুঞ্জন চালু হয়ে গেল পরেশদের দাওয়ায় জমে থাকা ভীড়টার মধ্যে। মুখুটি মশাই লক্ষ্য করলেন সবটাই, কিছুক্ষণ থেমে তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়লেন বাড়ির দাওয়ায়, তারপর উপস্থিত লোকজনদের দিকে তাকিয়ে আনমনেই বলতে শুরু করলেন

—“এই চক্রদহে এক সময় বসবাস করত কুখ্যাত সব ডাকাতেরা। পথ চলতি মানুষের থেকে লুটপাট করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের পেশা। এই ডাকাতেরা ছিল চক্রদহ শ্মশানের কালীমায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত। দেবীকে তুষ্ট করতে তারা প্রচুর নরবলি দিয়েছে এক সময়। কোম্পানির গোরা পুলিশ যাতে জানতে না পারে, তার জন্য বলি প্রদান করার পর মৃতদেহ এই ডুমুরদহ চরে পুঁতে ফেলত তারা। সেই থেকেই এই চর অতৃপ্ত পিশাচ-প্রেতের আড্ডা। একসময় বহু তান্ত্রিক, পিশাচসিদ্ধি পেতে এই চক্রদহের শ্মশানে এসে সাধনা করতেন, যদিও এই বুড়ো বিবির থান কিন্তু তখন ছিল না। বুড়োবিবিকে প্রতিষ্ঠা করা হয় অনেক পরে।”

একটু থামলেন বৃদ্ধ রামচরণ, বয়সের কারণেই সম্ভবত বেশিক্ষণ কথা বললে হাঁপিয়ে যান। আবার শুরু করলেন তিনি।

—“এই বিহারীও জানে সেই সময়কার সব কথা। সেই সময় গঙ্গারাম ডাকাতের নামে ভয় কাঁপত দশটা গ্রামের মানুষ। তবে তার ভীতি কেবল এই চক্রদহেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এই নদীয়া জেলার বাইরেও গঙ্গারামের নামে সবাই ভয়ে থরহরিকম্প ছিল। বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান থাকলে আগে কিছু দান সামগ্রী সরিয়ে রাখা হত গঙ্গারামের জন্য। মজার ব্যাপার হল পয়সাওয়ালা বাবুদেরই কেবল লুঠ করত ডাকাত গঙ্গারাম, গরিবকে কখনো সে লুট করেনি, গরিবের কাছে সে ছিল মহাদানী পুরুষ মানুষ। যে সব ধনী জোতদাররা গরিবের অর্থে নিজেদের ব্যবসা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলত, তাদের এই চক্রদহের শ্মশানে এনে বলি দিতেও পিছপা হত না গঙ্গারাম ডাকাত।

সেই সময় হরিসাধন সুঁড়ি দেশী মদের ব্যবসা করে খুব টাকা পয়সা করেছিল। হরিসাধনের সেই সুরার কারখানায় কাজ করত একটি লোক,তার নাম নীলমাধব দাস। মেয়ে বেলার বিবাহের বয়স হওয়াতে নীলমাধব দাস বেলার জন্য পাত্র দেখার জন্য তোড়জোড় শুরু করল। বেলা সুলক্ষণা, স্বভাব চরিত্রও ভাল, কিন্তু গোল বাঁধল অন্য জায়গায়, সুরার কারখানার শ্রমিকের মেয়ের সঙ্গে কেউ ছেলের বিয়ে দিতে চায় না। যাই হোক অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে পাওয়া গেল পাত্র।

তবে পাওয়া গেলে কী হবে, নীলমাধবের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে আদি বর্ধমাননিবাসী সেই পাত্রের পিতা অনেক টাকা পণ হাঁকল তার কাছে। অনেক চেষ্টা করেও পণের টাকা যোগাড় করতে না পেরে নীলমাধব তার সমস্যার কথা জানালো তার মনিব হরিসাধনকে। কিন্তু পাপিষ্ঠ হরিসাধন সাহায্য করার বদলে নোংরা ইঙ্গিত করল নীলমাধবের মেয়েকে নিয়ে, প্রস্তাব দিল বেলাকে তার রক্ষিতা বানিয়ে রাখবার। এই অপমান সইতে না পেরে মনের দুঃখে নিরীহ নীলমাধব কী করবে ভেবে না পেয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে গেল।

কাকতালীয় ভাবেই সেইদিন ওই তল্লাটে ডাকাতি করে ফিরছিল গঙ্গারাম আর তার দলবল। নীলমাধব যেই নদীতে ঝাঁপ দিতে যাবে ঠিক তখনই তাকে উদ্ধার করল একজন ইয়া ষণ্ডা চেহারার ডাকাত।

ভিজে চরায় তাকে দাঁড় করিয়ে ডাকাত জিগ্যেস করল

—“মরতে গেছিলি কেন রে?”

নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ল নীলমাধব, সে তার সব দুঃখের কথা খুলে জানালো ডাকাতটাকে। সব শুনে ষণ্ডা চেহারার ডাকাতটির খুব মায়া হল, সে নীলমাধবকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল তাদের সর্দারের কাছে।

ডাকাত গঙ্গারাম সর্দার সব কথা মন দিয়ে শুনল নীলমাধবের। সেই রাতেই তার দল হানা দিল হরিসাধন সুঁড়ির বাড়ি, যথাসর্বস্ব লুটে নিল তার এবং শেষে হরিসাধনকে এনে ফেলল চক্রদহ শ্মশানের কালী মায়ের সামনের হাড়িকাঠে। হরিসাধন সুঁড়ির গলা লক্ষ্য করে যখন শমনরূপী খড়্গ নেমে আসছে, তখনই সে চিৎকার করে বলে উঠল,

—“আমার ভাই এর প্রতিশোধ নেবে, মা হংসীর আশীর্বাদে সে উচাটনে শ্রেষ্ঠ, তার উচাটন ক্রিয়ার কাছে তুই খড়-কুটোর মত উড়ে যাবি। মহাসর্বনাশ হবে তোর।”

হরিসাধনের কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল গঙ্গারাম, তারপর ইঙ্গিত দিল তার স্যাঙাৎ যেন দ্রুত বলির কাজ সম্পন্ন করে।

এতটুকু বলে থামলেন মুখুটি মশাই। একটু হাঁপাচ্ছেন তিনি, ভিতর বাড়ি থেকে তাঁকে পরেশের ভাইয়ের বৌ জল এনে দিল, জলটুকু একনিশ্বাসে শেষ করলেন তিনি। তারপর বললেন

—“আজ অনেক রাত হয়েছে, তোমার ছেলের মাথায় চন্দনের প্রলেপ দাও, ওর ঘুম এসে যাবে। কাল প্রাতে একবার ওর জন্মকোষ্ঠি নিয়ে আমার বাড়ি এসো দেখি কী লেখা আছে ওর কপালে, আর হ্যাঁ… যতক্ষণ ওই পুঁথি এ বাড়িতে আছে কোনো ক্ষতি হবে না তোমাদের।”

বেতের লাঠি ঠুকতে ঠুকতে রাত বিরেত অগ্রাহ্য করে পরেশ ভট্টাচার্যের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন বৃদ্ধ রামচরণ মুখুটি। পরেশের মনে হল এখনো অনেক কিছু বলার আছে এই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটির। যাই হোক মাথায় চন্দনের প্রলেপ দেয়ায় সত্যিই কাজ হল। প্রলাপ বকতে বকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল মহেশ, রাত তখন দুটো কি আড়াইটে।

ছেলেকে এতক্ষণে ঘুমোতে দেখে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলেন পরেশ। ছেলের সামনে একটা আরামকেদারায় তিনিও একটু আয়েসে শরীর এলিয়ে দিলেন। চোখের পাতা ভারি হয়ে এল ঘুমে। ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন দেখলেন তিনি ঘুমের মধ্যে—

একটা বহু প্রাচীন মন্দির, তার ভেতর এক ভয়ানক চেহারার সাধু প্রবেশ করলেন। সাধুর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই মন্দির থেকে বেজে উঠল কাঁসর ঘন্টার শব্দ। মন্দিরের বাইরে একটা বিশালাকার কাঠের পাটাতনের সঙ্গে একসঙ্গে ছয়জন পুরুষকে বেঁধে রাখা হয়েছে। সাধু মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন, তারপর একটা থালা থেকে মুঠো মুঠো সিঁদুর তুলে লেপে দিতে লাগলেন পাটাতনে বাঁধা লোকগুলোর মাথায়। এরপর মন্দিরের ভেতর থেকে একটা বিশাল খড়্গ নিয়ে এসে, একের পর এক ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিতে লাগলেন পাটাতনে বাঁধা লোকগুলোর। ভয়ে ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন পরেশ।

কিন্তু ভীষণ আশ্চর্য হলেন তিনি! ঘরের মধ্যে এত ধোঁয়া এল কোথা থেকে? যেন ধূম্রজাল বিস্তার করেছে অশনি। প্রথমেই তাঁর নিজের ছেলের কথা খেয়াল হল, চকিতে তাকালেন ছেলের খাটের দিকে। বিস্ময়ে তাঁর চক্ষু স্থির হয়ে গেল! অঘোরে ঘুমোচ্ছে মহেশ, তার খাটের উপর বসে আছে এক বৃদ্ধা, শীর্ণকায়া সেই বৃদ্ধার জেগে উঠেছে শরীরের সব হাড়, তাঁর বেশবাস বিধবার ন্যায়, মাথায় ঘোমটা টানা। বৃদ্ধার ডান হাত মহেশের বুকের বাঁ দিকে।

ভয়ে দিশেহারা হয়ে লাফিয়ে উঠলেন পরেশ। চিৎকার করে উঠলেন

—“আপনি কে? কী চাই?”

পরেশের চিৎকারে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল সেই মূর্তি। এক নিমেষে মিলিয়ে গেল ঘরের ভেতরের ধূম্রজাল। কোথাও কিচ্ছু নেই।

মানুষ কি স্বপ্ন থেকে স্বপ্নান্তরে যেতে পারে? এটা কি আদৌ স্বপ্ন ছিল? ভেবে ভেবে বাকী রাতটা আর ঘুম এল না পরেশের। তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন এবার, সামনে ঘোর বিপদ। খুঁজে বের করতে হবে সেই পুঁথি। আধো ঘুম আধো জাগা অবস্থায় পরেশ নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইলেন আরামকেদারায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%