পার্বতী

নির্বেদ রায়

'আমার বোধহয় একটু তন্দ্রার ভাব এসে গিয়েছিল, বাহাদুর সিং-এর হাতের চাপে চমকে উঠলাম।

খড়ের গাদার ঠিক পেছনেই গজ কয়েক দূরে, যেন একটা মৃদু শব্দ! কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর কানে এল একটা ক্ষীণ গর্জন—এবার আমাদের পাঁচ-ছ'গজের মধ্যেই একেবারে।

'জন্তুটা তবে কি আমাদের আবিষ্কার করতে পেরেছে?' কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে একটা ঠান্ডা স্রোত যেন নেমে গেল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। প্রশ্নের উত্তরের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, পরের মুহূর্তেই গাদাটার ঠিক উপরে অনুভব করলাম একটা ভারী শরীরের শব্দহীন চলাফেরা, সেইসঙ্গে একটা উগ্র বুনো গন্ধ! মাথার উপরেই সাক্ষাৎ মৃত্যু!

'লাফিয়ে পড়ো বাহাদুর সিং!' চিৎকার করে উঠলাম আমি আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই দুজনে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সামনের কঠিন পাথুরে মাটির উপরে। পরক্ষণেই একটা বিরাট কালো থাবার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল আমাদের এক মুহূর্ত আগের বাসস্থানের উপরের খড়গুলো।

ততক্ষণে জ্বলে উঠেছে বাহাদুরের হাতের টর্চ। সেই আলোর রশ্মিতে দেখা গেল খড়ের গাদার উপর যেন খানিকটা অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠেছে আর সেই জমাট-বাঁধা আঁধারের মাঝখানে মৃত্যুর শীতলতা নিয়ে জেগে আছে দুটো সবুজ চোখ। ব্ল্যাক প্যান্থার! কালো চিতা!

খানিকটা সম্মোহিতের মতো যেন গুলি ছুড়লাম আমি। পরপর দুটো। দুটো গুলিই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল, তার উপর যথেষ্ট সতর্ক না থাকার জন্য রাইফেলের ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম কঠিন মাটিতে।

জীবনটাও বাঁচল সেইজন্য। কারণ শুয়ে শুয়েই বেশ লক্ষ্য করলাম যে একটা বিরাট শরীর শূন্য দিয়ে উড়ে চলে গেল আমাকে টপকে—দাঁড়িয়ে থাকলে আর রক্ষা ছিল না।

সম্বিত ফিরতে উঠে দাঁড়ালাম। বাহাদুরের টর্চও আবার জ্বলে উঠেছে। বন্দুক আবার 'লোড' করে শুরু হল খোঁজাখুঁজি। কিন্তু সামনে নিরেট আঁধারের বুক ঘুরে ঘুরে চক্র দিয়ে আলোর রশ্মি কিছুই আবিষ্কার করতে পারল না। খানিকক্ষণ চেষ্টা করার পরই বুঝলাম—আজ আর তাকে পাবার নয়, প্যান্থারটা আমাদের ফাঁকি দিয়েছে।'

এতক্ষণ যে বিবরণটুকু আমরা শুনলাম তার কথক হলেন একজন বিদেশি শিকারি—ডেভিস সাহেব। ব্রিটিশ শাসনের আমলে আরও বহু সাহেবের মতো তিনিও একটা 'শিকার অভিযানে' এসেছিলেন সেবার হিমালয়ের কোলে। এই ধরনের ছোট সাদামাটা 'শিকার-অভিযান' যাওয়ার চলটা তখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল অর্থাৎ হাতি-ঘোড়া, লোক-লস্কর নিয়ে জঙ্গল খেদিয়ে নয়, বরং এক-দুজন সঙ্গী কি পথপ্রদর্শক সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়া। তাতে ঝুঁকি বেশি কিন্তু আনন্দ প্রচুর। ডেভিস সাহেবের নিজের ভাষায় বলতে গেলে—

'সেবার স্যুটিং-ট্রিপে গেছিলাম হিমালয়ের সানুদেশে একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে। সবুজ উপত্যকার মাঝখানে হঠাৎ একগুচ্ছ বাহারী ফুলের মতো গ্রাম এই 'ওয়ান'। আমার ছোট দলটার মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর ওস্তাদ শিকারি ছিল বাহাদুর সিং। জাতে নেপালি, ভালো পথপ্রদর্শকও বটে। বন্দুক, রাইফেল ছাড়াও বাহাদুরের শিকারের আরেকটি প্রিয় অস্ত্র হল তার 'কুকরি' বা ভোজালি।

ওয়ান গ্রামে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল। ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘর ছুঁইছুঁই। তাঁবু খাটিয়ে সবে একটু চায়ের আয়োজন করছি, এমন সময় কয়েকজন গ্রামবাসী এসে হাজির। বিশেষ প্রয়োজনে নাকি তারা আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। বাধ্য হয়ে দেখা করতে হল বিশ্রামে ইস্তফা দিয়ে।

লোকগুলো খুবই উত্তেজিত। তাদের সেই এলোপাথারি কথাবার্তা থেকে যা বোঝা গেল, তার মর্মার্থ : ক'দিন ধরে একটা প্রকাণ্ড চিতাবাঘ তাদের গ্রামের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, এবং গত দু-দিনে তার শিকার হয়েছে দুটি স্থানীয় যুবক। ফলে গভীর আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে গোটা গ্রামটার উপরে। এখন সাহেব যদি বাঘটাকে মেরে তাদের উদ্ধার করেন এই আশায় তারা ছুটে এসেছে তাঁর কাছে।

শরীর সায় দিচ্ছিল না বটে, কিন্তু বিবেকের দায়েই খানিকটা, বাহাদুরকে সঙ্গী করে আমি গ্রামবাসীদের, অনুসরণ করলাম।

ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর এসে পৌঁছলাম একটা পার্বত্য অধিত্যকার বুকে। অধিত্যকার পাদদেশ বেষ্টন করে চলে গেছে খরস্রোতা এক পাহাড়ি নদী। অধিত্যকার উপরে এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো কয়েকটা মাটির ঘর। বুঝতে দেরি হল না, এই সেই জনপদ—'ওয়ান' গ্রাম। গ্রাম না বলে বরং ক'টা ঘর বললেই ভালো হয়।

'ওইখানে বাঘটা প্রথম লোকটাকে মেরেছিল।'—গ্রামের প্রান্তে একটা মাঠ দেখিয়ে বলল একজন অধিবাসী। ওটাই গরু মোষ চরাবার জায়গা।

সে রাতটা কোনোরকমে কাটালাম একটা নড়বড়ে দোচালা ঘরে। বাঘটা সম্বন্ধে সেদিন আর বিশেষ কিছুই করার নেই, কারণ হিমালয়ের কোল ছুঁয়ে তখন রাত্রি নেমে এসেছে।

পর দিন সকালে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে জানতে পারলাম যে, বাঘটার প্রথম শিকার এক রাখাল।

মাত্র দুদিন আগেকার ঘটনা। অন্য দিনের মতো সেদিনও ছেলেটা ছাগল চরাতে মাঠে গিয়েছিল। পিছনদিকের একটা টিলার উপর থেকে বাঘটা কখন তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে টেরও পায়নি। মারা যাওয়ার আগে বড় জোর একটা মৃদু চিৎকার করতে পেরেছিল ছেলেটা, কিন্তু ছাগলগুলো তাতেই সাবধান হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পালিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়ে।

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে তার পর দিন, অর্থাৎ গতকাল রাতে। গরু-ছাগলগুলো পাহারা দিতে প্রতি রাতের মতো গতকালও দুজন গ্রামের লোক মাঠে মোতায়েন ছিল! আগের দিনের ঘটনার জন্য দুজনেই বেশ সতর্ক হয়ে পাহারা দিচ্ছিল। মাঝরাতে তাদের মধ্যে একজন হঠাৎ যেন একটা হালকা গর্জনের শব্দ শুনতে পায়, কিন্তু সঙ্গীকে সাবধান করে দেওয়া দূরে থাক সে নিজেও আর সাবধান হওয়ার সুযোগ পায়নি। বাঘটা আক্রমণ করে একজনকে টেনে নিয়ে যায় জঙ্গলের মধ্যে।

এই দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের পর গ্রামজুড়ে প্রচণ্ড ত্রাস আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে একান্ত স্বাভাবিকভাবেই। ফলে এখন পাহারা দেবার জন্য চারণক্ষেত্রে যেতে আর কেউ রাজি নয়।

গ্রামবাসিদের বিদায় দিয়ে সবে আমরা একটু শোওয়ার উদ্যোগ করছি, এমন সময় হঠাৎ শোনা গেল মেয়েলি গলার আর্তনাদ। রাইফেল তুলে নিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি, বাহাদুর আগেই উঠে বসেছে। দুজনে তাড়াতাড়ি খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, কিন্তু বাইরে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। শুধু মনে হল, দূরে একটা গর্জন যেন ক্রমশ ক্ষীণ থেকে আরও ক্ষীণ হয়ে শেষে মিলিয়ে গেল।

নীচের থেকে স্ত্রীলোকটির আর্তনাদ কিন্তু তখনো ভেসে আসছে। সেই শব্দ লক্ষ্য করে দুজন মিলে নেমে গিয়ে দেখলাম যে, দরজা বন্ধ একটা ঘরের ভেতর থেকেই আসছে আওয়াজটা। বিস্তর ধস্তাধস্তিতে যখন দরজা খুললো না, তখন দরজা ভেঙেই ঘরে ঢুকতে হল। ঘরে ঢুকে কিন্তু আমরা অবাক! ধারণা ছিল, চিতাবাঘটা বোধহয় আরেকজন গ্রামবাসীকে নিয়ে ভোজ লাগাতে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকেছে। কিন্তু কোথায় কি? ঘরে সেরকম কোনো কিছুর চিহ্নমাত্র নেই। আসল ঘটনাটা বুঝলাম পরে।

বাঘটা এসেছিল ঠিকই, তবে শুধু দরজায় আঁচড় কেটে আর দু-একটা চাপা গর্জন করেই ক্ষান্ত হয়ে বিদায় নিয়েছে। বাঘেরও নেহাত দোষ দেওয়া যায় না, কারণ চাপা গোঙানির আওয়াজ শুনেই ভেতর থেকে যেরকম তারস্বরে আর্তনাদ শুরু হয়ে গেছিল তাতে পৃথিবীর যে-কোনো বাঘেরই কান ঝালাপালা হয়ে যেত, রণে ভঙ্গ দিয়ে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে তাই স্থানত্যাগ করেছে এই বাঘটাও। যা হোক, বাকি রাতটুকু পাহারা দেব বলে অভয় দিয়ে আমরা চলে এলাম। বাকি রাতটুকু জেগে কাটল।

পর দিন সকালে গত রাতের ঘটনাস্থল আর গ্রামের আশপাশটা ভালো করে দেখে শুনে নেওয়ার জন্য ঘরটার কাছে হাজির হয়ে দেখি, কাছেই মাটির উপর বাঘটার পায়ের ছাপ বেশ পরিষ্কার ভাবেই চেপে বসেছে। বাহাদুর সিং খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করল পায়ের ছাপগুলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'বাঘটার বাঁ-পায়ে জখম আছে বাবুজি, ওই দেখুন ছাপটা কত হালকা। রাতে ওই জন্যই গোঙাচ্ছিল।' জঙ্গলের ভাষা পড়তে বাহাদুরের বিশেষ ভুল হয় না। বাঘটার নরখাদক হওয়ার কারণ এবার বোঝা গেল।

খানিকক্ষণ বাদেই জনাকয়েক গ্রামবাসীর সঙ্গে গরু-ছাগল চরাবার মাঠটার উপর এসে পৌঁছলাম। মাঠটার তিন দিক বেড় দিয়ে পাঁচিল তৈরি করেছে ঝোপ-ঝাড়ের ঘন জঙ্গল, বড় গাছের অবশ্য দেখা মিলল না একটাও আওতার মধ্যে। অন্যদিকে একটা ছোট পাথরের টিলা খাড়া দাঁড়িয়ে। টিলাটার পাশ দিয়ে একখণ্ড পাথর শূন্যে ঝুলে রয়েছে আর তার প্রায় দুশো ফুট নীচে ভীমগর্জনে বয়ে চলেছে প্রবলগতি পাহাড়ি নদী। মাঠটার প্রান্তে একটা খড়ের ঘর চোখ পড়ল, এই ঘরটিই বোধহয় রাখালদের রাতের আশ্রয়। বেশ মজবুত বলেই মনে হল ঘরটাকে। ঘরটার ঠিক পাশেই কিছু খড় গাদা করে রাখা।

বাহাদুর সিং সেই গাদার পাশে মাটির উপর কিছু একটা এতক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল বেশ মনোযোগ দিয়ে। আমি কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে যেতে বললে, 'বাঘটার পায়ের ছাপ। এইখানেই শিকার ধরেছিল জন্তুটা।' আমিও দেখলাম, মাটির উপর টাটকা প্রায় চারজোড়া থাবার ছাপ। বড়জোর দিন দুয়েকের পুরোনো, কিন্তু এখন বেশ স্পষ্ট।

আশেপাশের অবস্থাটা বুঝতে গিয়ে এবার একটু বিপাকে পড়লাম। আগেই বলেছি জায়গাটার চারদিকে ঘন ঝোপ-ঝাড়, কিন্তু মাচা বাঁধার মতো একটা মাঝারি গোছের গাছেরও খোঁজ পাওয়া গেল না। তবে কি মাটিতে দাঁড়িয়ে শিকার করতে হবে? অসম্ভব। তাহলে উপায়? আমার অবস্থাটা বোধহয় বাহাদুর বুঝতে পেরেছিল। সে বললে, 'বাবুজি, ওই খড়ের গাদার ভিতরটা ভালো জায়গা নয়?'

প্রস্তাবটা মন্দ নয়। গাদাটা প্রায় ফুট পাঁচেক উঁচু, চওড়ায় চারফুটের মতো। আমাদের দুজনের পক্ষে যথেষ্ট। আর তাছাড়া উপায়ই বা কি? সুতরাং মনস্থির করে গ্রামের দিকে ফিরলাম।

রাত জাগতে হবে বলে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিছানায় গড়িয়ে নিয়েছিলাম। বিকেলে যখন চারণভূমির কাছে পৌঁছলাম তখন পশ্চিমের আকাশ লাল করে আস্তে আস্তে সূর্যটা ডুবে গেল। একটু পরেই লাল আভাটুকু মিশে গিয়ে নেমে আসবে রাত্রির কালো ওড়না। বাতাসে শীতের ছোঁয়া লেগেছে এর মধ্যেই। ছাগলগুলো এদিক-সেদিক চরে বেড়াচ্ছে, অন্যমনস্ক হয়ে কখন সেই ছাগলগুলোর কাছে গিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই, হঠাৎ চমকে উঠলাম ভীষণভাবে!

প্রকাণ্ড একটা কালো পাহাড়ি ছাগল আমার দিকে তেড়ে আসছে শিং বাগিয়ে। কেন যে সে আমাকে তার শত্রু ঠাহর করে নিল বুঝতে পারলাম না, আর বুঝবারও সময় তখন আর নেই, কোনোরকমে লাফ দিয়ে একপাশে সরে জন্তুটার জোড়া সঙিনের মতো প্রকাণ্ড শিং-দুটোর নাগাল এড়ালাম। লাগলে আর রক্ষা ছিল না, একেবারে শিকে গাঁথা কাবারের মতো অবস্থা হত।

সঙ্গে যে গ্রামের লোকগুলো ছিল, ততক্ষণে তারা ধাতস্থ হয়েছে। তাদেরই একজন ছাগলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল। অপর একজনের মুখে শুনলাম ক'দিন আগেই এই ছাগলটার বাচ্চা হয়েছে, তাই সবসময় বাচ্চা আগলে আগলে থাকে। কেউ বাচ্চার কাছাকাছি গেলেই বিশ্রী ভাবে তেড়ে আসে। যাক, তবু স্বস্তি। কারণটা অন্তত বোঝা গেল; নইলে বাঘের চেয়ে এইরকম একপাল বুনো ছাগল অনেক বেশি বিপজ্জনক বলেই আমার ধারণা।

অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হয়ে নামছে। ছাগলগুলোকে রেখে গ্রামের লোকগুলো বিদায় নিয়ে চলে গেছে প্রায় মিনিট দশেক হতে চলল। বাহাদুরকে বললাম, 'আর বোধহয় খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না, কি বলো? চলো, এবারে খড়ের গাদাটার মধ্যে গিয়ে ঢুকে বসা যাক।'

আমার সঙ্গে রয়েছে দোনলা বন্দুক আর বাহাদুরের কাছে একটা জোরালো টর্চ। সঙ্গের অস্ত্র বলতে তার শুধু কুকরি।

খড়ের গাদার ভিতরে পাশাপাশি শুয়ে আছি আমরা। অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে উঠেছে, ছাগলগুলোকে আর স্পষ্ট দেখা যায় না। যেন কতগুলো ছায়া নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে শুধু। একদৃষ্টে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার বোধহয় একটু তন্দ্রার ঘোর এসে থাকবে। বাহাদুর সিং-এর হাতের চাপে সেই ঘোর কেটে গেল। পিছনে একটা অস্পষ্ট মৃদু শব্দ...।

এরপরের ঘটনা আমরা প্রথমেই শুনেছি। শুনেছি কীভাবে কালো চিতাটা শিকারিদের টর্চ আর বন্দুককে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে পড়েছে গাঢ় অন্ধকারের বুকে। তারপর? তাহলে আবার ফিরে যাই ডেভিস সাহেবের বিবরণে।

'... নিশ্ছিদ্র, নিরন্ধ্র অন্ধকার। শুধু তার মধ্যে বাহাদুরের হাতের টর্চ জ্বলে উঠছে থেকে থেকে। বুঝলাম, এই অবস্থায় ফাঁকা মাঠের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। চিতার চোখ মানুষের চেয়ে ধারালো। বাহাদুরকে লক্ষ্য করে চাপা গলায় বললাম, 'শিগগির টিলার দিকে চলো।' দুজনে খুব সতর্ক হয়ে এগোলাম টিলাটার দিকে।

টর্চ তখনো জ্বলছে। হঠাৎ টর্চের আলো টিলাটার গায়ে একটা চক্র দিয়ে ঘুরে এসেই স্থির হয়ে গেল। স্থির হয়ে গেলাম আমরাও। আলোর আওতার মধ্যে পরিষ্কার চোখে পড়ছে একটা বিরাট কালো দেহ। আক্রমণের উদগ্র আগ্রহে সেই দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, মাথাটা ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। না, কালোচিতা নয়, সেই ছাগলটা।

কিন্তু তার আক্রমণের লক্ষ্য কে? আমরা যে নই, সেটা ভঙ্গি দেখেই পরিষ্কার বোঝা যায়। উত্তর পেতে দেরি হল না। বাহাদুরের টর্চ ছাগলটাকে পেরিয়ে খানিকদূর এগিয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম।

ঝুলন্ত পাথরটার একেবারে শেষ প্রান্তে একজোড়া সবুজ চোখ জ্বলছে। গুঁড়ি মেরে বসা শরীরের প্রত্যেকটা মাংসপেশি যেন ঠেলে উঠেছে কালো চামড়ার মধ্যে দিয়ে। লাফ দেবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে চিতাবাঘ।

এক মুহূর্ত দেরি না করে বন্দুক তুললাম। কিন্তু গুলি আর ছোঁড়া হল না। বন্দুকের ট্রিগার টানবার আগেই বিদ্যুতের মতো আর একটা দেহ যেন উড়ে গেল বাঘটার দিকে। পরক্ষণেই কানে এল দুটো ভারী শরীরের সঙ্ঘর্ষের শব্দ। তারপর আবার সব চুপচাপ!

কী ব্যাপার? প্যান্থারটা আবার কোথায় লুকোলো? অথচ লুকোবার জায়গাও তো নেই ধারে কাছে। টর্চের আলোতে ছাগলটাকে দেখা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাঘটা?

প্রশ্নের উত্তর ভেসে এল আরও খানিকক্ষণ বাদে নীচে নদীর বুক থেকে—ঝপাস! এবার আর সন্দেহ নেই—মা-ছাগল তার বাচ্চাকে ঠিকমতোই আগলেছে বটে।

পর দিন সকালে গ্রামবাসীদের নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে কিন্তু নিরাশ হতে হল। নিরাশ হওয়ারই কথা, ততক্ষণে পাহাড়ি নদীর দুরন্ত স্রোত বাঘের মৃতদেহ কোথায়, কতদূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কে জানে?

'শ্যুটিং ট্রিপ' শেষ করে ফিরে এসেছি, সঙ্গে বয়ে এনেছি স্মৃতি। হিমালয়ের কোলে পর্বতবাসিনী পার্বতীর সেই রুদ্ররূপ আমার মনে চিরদিন গেঁথে থাকবে। বাহাদুর সিং-এর একান্ত অনুরোধে আমি সেই মা-ছাগলটিকে তার বাচ্চাসমেত কিনে নিয়েছিলাম গ্রামবাসীদের কাছ থেকে। ওরা এখন বহাল তবিয়তে বাহাদুরের জিম্মায়।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%