'এবার আমার পালা!'

নির্বেদ রায়

অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ শিকারির কাছে একান্তই নিরীহ গোছের ভূখণ্ড। গোটা মহাদেশটা জুড়ে রোমাঞ্চের কোনো স্বাদ-গন্ধ নেই বললেই হয়। এখানে নেই 'কেপ-বাফেলোর' মতো ভয়ঙ্কর বুনো মোষ, কি জীবন্ত ট্যাঙ্কের মতো খড়্গধারী গন্ডার—এখানে ঝোপঝাড়ে সবুজ মরকত মণির মতো জ্বলে ওঠে না পশুরাজ সিংহ, কেঁদো বাঘ, লেপার্ড কি জাগুয়ারের হিংস্র চোখ—অথবা বিরাট থামের মতো গাছ শুঁড়ের টানে মাটিতে নামিয়ে আনে না কোনো দাঁতাল হাতি; মোট কথায় হিংস্র শ্বাপদ কিম্বা অতিকায় তৃণভোজী গোষ্ঠীর কোনো কুলীনরাই এই দেশে ঘর বাঁধেনি। সুতরাং এরকম একটা নিরামিষ জায়গাকে আর যে বিশেষণেই ভূষিত করা হোক, অন্তত 'শিকারির স্বর্গভূমি' তো আর বলা যায় না।

তবু বিপত্তি ঘটে মাঝে মাঝে। আর সেই বিপত্তির ঠেলা সামলাতে তখন অসমসাহসী পেশাদার শিকারিরও বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়; তখন আর মুহূর্তের জন্য মনে হয় না যে এই মহাদেশটা নিতান্তই নিরীহগোছের, বরং মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নগুলো যেন সশরীরে এখানে এসে বাসা বেঁধেছে দলে দলে। শরীরী দুঃস্বপ্নের মতো অষ্ট্রেলিয়ার এই আতঙ্কের কারণ যে প্রাণী, তার নাম—'ডিংগো'। এক ভয়ঙ্কর জাতের বুনো কুকুর।

এই ডিংগো শিকার করতে গিয়েই এই শোচনীয় আর ভয়ঙ্কর স্মৃতি নিয়ে অষ্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে এসেছিল আমেরিকান শিকারি হ্যারি হফম্যান। হফম্যানের সেই কাহিনিই এখন আমরা শুনব—

মজার কথা হল, খাস মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা হ্যারি হফম্যানের সঙ্গে সাগরপাড়ে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার ওই বুনো কুকুরদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। এমনকী, বন্দুক রাইফেলে হাত পাকাবার সময়েও কোনোদিন হ্যারি ওই হতচ্ছাড়া কুকুরগুলোকে শিকার করার কথা ভাবেনি। কিন্তু নিয়তির বিধান এড়াবে, এমন সাধ্য কার?

ঘটনার শুরু ১৯৫৯ সালের মে মাসে—

মার্কিন মুলুকে একটা খামার তত্ত্বাবধানের কাজ করত হ্যারি হফম্যান। খামারে গরু-ভেড়া-ছাগল এই সব জন্তুগুলোকে দেখাশোনা করার সাথে সাথে আরও একটা কাজ ছিল তার। শিকারের লোভে খামারের চারপাশে হানা দিয়ে ফেরে ক্ষুধার্ত নেকড়ের দল। আকারে-আয়তনে উত্তর আমেরিকার 'টিম্বার উলফের' মতো বড় না হলেও এদের স্বভাব-চরিত্র সুবিধার নয়। এদের বলে 'কয়োট'।

এই হিংস্র শ্বাপদগুলোকে নিরস্ত করার একটাই উপায় জানা ছিল হফম্যানের, তা হল নিজের রাইফেলটার সদ্ব্যবহার করা। কয়েকটা সঙ্গীর মৃতদেহ লুটিয়ে পড়তে দেখলে তখন জন্তুগুলো সরে পড়ত। দিন কয়েকের জন্য কমত তাদের দৌরাত্ম্য। কিন্তু সে আর কতদিনের জন্য? আবার দু-দিন যেতে না যেতেই হানা দিত নেকড়ের দল, হফম্যানকে আবার বেরোতে হত বন্দুক হাতে। এইভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু কপাল মন্দ হ্যারি হফম্যানের। খামারের মালিক খামার বেচে দিল অন্য লোকের কাছে। নতুন মালিক এসে বেশ কয়েকজনকে ছাঁটাই করল; ভাগ্যদোষে হফম্যানও তাদের মধ্যে পড়ে গেল।

চাকরি যাওয়া সোজা, কিন্তু পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে হফম্যান আবার বিবাহিত, সুতরাং সংসারের দায়িত্ব রয়েছে তার। ফলে খানিকটা দুশ্চিন্তায় তাকে পড়তে হল বইকী। এইসময়ই প্রথম তার মাথায় চিন্তাটা আসে।

কদিন আগে 'ডেনভার পোস্ট' কাগজে একটা খবর বেরিয়েছিল। অষ্ট্রেলিয়ায় ইদানীংকালে ডিংগোর উৎপাত নাকি খুব বেড়ে গেছে। অষ্ট্রেলিয়ার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা হল পশুপালন। এখন ওই শয়তান কুকুরগুলোর জ্বালায় খামারের মালিকদের প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার বাছুর আর ভেড়া মারা যাচ্ছে ডিংগোর কবলে।

দিন নেই, রাত নেই, যখন-তখন এসে হানা দিচ্ছে নেকড়ের মতো ভয়ঙ্কর ওই বুনো কুকুরের পাল; খামারের লোকজন সতর্ক হয়ে বাধা দেবার আগেই কাজ শেষ করে তারা গা-ঢাকা দিচ্ছে আশেপাশের জঙ্গলে। শুধু তাদের উপস্থিতির কথা জানাতে খামারের এখানে ওখানে পড়ে থাকছে কয়েকটা মরা ভেড়া কি বাছুরের রক্তাক্ত দেহ। দিনের পর দিন এই ভাবে আর কত সহ্য করা যায়, ফলে খামারের মালিকরা ছাড়াও সরকারকে এ ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হয়েছে। কিন্তু অনেক মাথা ঘামিয়েও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি।

বুনো কুকুরগুলো অষ্ট্রেলিয়ার সরকারকে মেনে চলতে রাজি নয়। বুদ্ধির পাল্লাতেও তারা কম যায় না। ফাঁদ পেতে কুকুর ধরার চেষ্টা হয়েছে, সযত্নে তারা সেই ফাঁদ এড়িয়ে গেছে। খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে রাখলে তারা সে খাবার স্পর্শমাত্র করেনি। আরও কত রকমের যে চেষ্টা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু কোথায় কি? সরকার আর খামার মালিকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে কুকুরগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে একটানা। শেষ পর্যন্ত সরকারকে শিকারিদের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। প্রতিটা কুকুরের মাথার দাম হিসাবে সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে এক পাউন্ড বা প্রায় 'ষোলো টাকার' (সেদিনের হিসাব) মতো।

এই পুরস্কারের ব্যাপারটাই মনে ধরল হফম্যানের। খামারের কাজ করার সময় নেকড়ে মেরে হাত পাকিয়েছে সে, ফলে ওই বুনো কুকুরগুলোকে শিকার করা তার কাছে খুব একটা কঠিন কাজ বলে মনে হল না। অস্ট্রেলিয়ায় ডিংগোর অভাব নেই। এমনকী দিনে গোটা পঞ্চাশেক করে শিকার করাও অসম্ভব কিছু নয়। অর্থের দিক দিয়ে সেটা রীতিমতো লাভজনক।

অস্ট্রেলিয়ায় যাবার আরও একটা কারণ ছিল হফম্যানের। স্ত্রী ম্যাডালীন হল অষ্ট্রেলিয়ারই মেয়ে। তার বাবা-মা সেখানেই থাকেন। অনেকদিন হল বাবা-মাকে দেখেনি ম্যাডালীন, হফম্যানও যথেষ্ট সময় করে উঠতে পারেনি তাকে নিয়ে যাবার জন্য। এখন রথ দেখা আর কলা বেচা দুই-ই চলতে পারে। ম্যাডালীন যাবে বাবা-মাকে দেখতে, আর হফম্যান উপার্জনের চেষ্টায়। দেখা যাক, সেরকম রোজগার-পত্তর হলে আমেরিকায় ফিরে নিজের নামেই একটা খামার কিনে নেবে'খন হফম্যান। মোটামুটি এই ধরনের একটা পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে ষাট সালের গোড়ার দিকে প্লেনে চড়ে হ্যারি হফম্যান সস্ত্রীক পাড়ি জমাল অষ্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে।

এগারোই জানুয়ারি ব্রিসবেনে এসে নামল হফম্যান আর ম্যাডালীন। ম্যাডালীনকে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে হফম্যান এসে দেখা করল ব্রুস ক্যাভানোর সাথে। ক্যাভানো প্রৌঢ় মানুষ। ক্ষেতখামারের সংরক্ষণের কাজে সরকারের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী।

আন্তরিকভাবেই হফম্যানকে অভ্যর্থনা জানালেন ক্যাভানো। তারপর আলোচনার শুরুতেই বললেন, 'কুকুরগুলোর সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য আগে শুনে নিন, তারপর আপনার পথ আপনি ঠিক করবেন।'

'সত্যি বলতে কি, শয়তানগুলো আমাদের জ্বালিয়ে খেল মশাই, নইলে সরকার কি দানসত্র খুলে বসেছে যে কুকুর মারলে টাকা দেবে। চেষ্টা হয়েছে হাজার রকমের, কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হচ্ছে না, তাই শেষমেষ এখন এই পথই ধরতে হয়েছে আমাদের। অন্য আর উপায় কি বলুন? কিন্তু এতেই বা বিশেষ সুবিধে হচ্ছে কই?'

'এখানকার আদিবাসী শিকারিরাও হয়েছে তেমনি। গোটাকয়েক কুকুর মেরে যেই কিছু টাকা পেল, অমনি রইল তার শিকার, বাবু বেরিয়ে পড়লেন ফূর্তি করতে; শত চেষ্টা করেও আর তাদের আপনি ধরে রাখতে পারবেন না। অথচ ওদের বাদ দিলেও চলে না, এখানে ওদের সাহায্য ছাড়া আপনি একটা কুকুরের টিকি খুঁজে বার করতে পারবেন না, শিকার তো দূরের কথা।'

'বুনো কুকুরগুলো ঝোপঝাড় আর পাথরের চাঁই-এর আড়ালে এমন ভাবে লুকিয়ে থাকে, যে হাজার চেষ্টা করলেও কোনো বিদেশি শিকারির পক্ষে ওদের খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। ওদের খুঁজতে দরকার স্থানীয় আদিবাসীদের বনে-জঙ্গলে অভ্যস্ত সতর্ক চোখ। তাই শ্বেতাঙ্গ বা অন্যান্য বিদেশি শিকারিরা যখন ডিংগো মারতে আসেন, তখন তাদের সঙ্গে আমরা একজন করে স্থানীয় আদিবাসী শিকারি দিয়ে দিই। কুকুর-পিছু টাকা পায় বিদেশি শিকারি, আদিবাসীটি মাস-মাইনেতে কাজ করে। আপনাকেও আমরা একজন সঙ্গী দিয়ে দেব।' একটু থামলেন ক্যাভানো তারপর বললেন, 'তবে একটু সাবধানে থাকবেন মিঃ হফম্যান, ডিংগোর দাঁতে বড় মারাত্মক বিষ। একবার কামড়ালে আর রক্ষা নেই—সঙ্গে সঙ্গে ঠিকমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা না হলে মানুষটাকে বাঁচানো খুবই কঠিন। তাই একটু বাঁচিয়ে চলবার চেষ্টা করবেন।'

পরদিন সকালে প্লেনে করে হফম্যান তার আদিবাসী সঙ্গীকে নিয়ে পাড়ি দিল উত্তর-পশ্চিম কুইন্সল্যান্ডের দিকে। ক্যাভানোর কথামতো এই জায়গাতেই এখন ডিংগোর দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। পথে যেতে যেতে সঙ্গীটির সঙ্গে বেশ আলাপ জমে গেল হফম্যানের। তার নাম 'টমি'। লোকে ডাকে 'ন্যাটা টমি' বলে। বয়স হবে বছর সাতাশ। পড়াশোনাও করেছে সরকারি স্কুলে, ফলে কথাবার্তা চালাবার মতো চলনসই ইংরেজি জানা আছে তার। হফম্যানের কোনো অসুবিধাই হচ্ছিল না কথাবার্তা বলতে।

খানিকক্ষণের মধ্যেই প্লেন এসে নামল এক বিরাট খামারের মাঝখানে। ওদের দুজনকে নামিয়ে দিয়ে আবার উড়ে চলে গেল। খামারের মালিক মিঃ উইলোবি জাতে ইংরেজ, অষ্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ধনী খামার-মালিকদের একজন।

বিরাট খামার, লোকলস্কর, গাড়ি-ঘোড়া নিয়ে বেশ একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চল গড়ে তুলেছেন উইলোবি। সব কিছুই পাওয়া যায় এখানে।

খামারের মাঝখানে বেশ সুন্দর একটা বাংলো-ধাঁচের বাড়ি। উইলোবির সঙ্গে কথা হচ্ছিল ওই বাংলোর বারান্দায় বসে। হঠাৎ কথা বলার মাঝখানে লাফিয়ে উঠলেন উইলোবি। অনেকটা দূরে ঘাসজমির উপর চরে বেড়াচ্ছে ষাঁড় আর গরুর পাল। খানিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'শয়তানগুলো আবার হানা দিয়েছে', বলেই বারান্দার দেয়ালে ঝোলানো বন্দুকটা এক ঝটকায় টেনে নিয়ে ছুটলেন বাইরের দিকে। টমি আর হফম্যানও তাঁর পিছনে পিছনে বেরিয়ে এল—

দূরে, বেশ কিছুটা দূরে যেখানে খামারের জন্তুগুলো চরে বেড়াচ্ছে সেইদিকে তাকিয়ে হফম্যানের চোখে পড়ল কতগুলো বাদামি রঙের ছোট ছোট প্রাণী লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলেছে পালটার দিকে। বাংলোর বাইরে ঘোড়া রাখা ছিল। চটপট উঠে পড়ে ঘোড়া ছোটাল তিনজন। মিনিট পাঁচকের মতো সময় লাগল অকুস্থলে পৌঁছতে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। কাজ সমাধা করে ডিংগোর দল গা-ঢাকা দিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। ঘাসজমির উপর পড়ে রয়েছে কয়েকটা অল্পবয়সি ষাঁড়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ—পেট চিরে ফেলে তাদের 'লিভার' গুলো উদরস্থ করেছে খুদে শ্বাপদের দল। 'গাছে না উঠতেই এক কাঁদি', মনে মনে ভাবল হফম্যান; পৌঁছতে-না-পৌঁছতেই ডিংগোর সঙ্গে ভালোমতো আলাপ-পরিচয় হয়ে গেল।

পরের দিন সকালেই টমিকে সঙ্গে নিয়ে হফম্যান বেরিয়ে পড়ল ডিংগোর খোঁজে—

ডিংগোর দল সাধারণত গরু কিংবা ভেড়ার পালের কাছাকাছি সুযোগের অপেক্ষায় ঘুরঘুর করে বেড়ায়। সেই আন্দাজমতো দূরে যেখানে উইলোবির খামারের একপাল গরু-ভেড়া চরছিল সেদিকে এগিয়ে গেল শিকারি দুজন। কিছুটা গিয়ে একটা বড় ইউক্যালিপটাস গাছ। হফম্যানকে অপেক্ষা করতে বলে টমি তরতর করে গাছ বেয়ে উঠে গেল উপরে, তারপর সেখান থেকে সতর্ক চোখে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল চারদিক। এদিক-ওদিক খানিকক্ষণ চোখ ঘোরাবার পর হঠাৎ তার দৃষ্টি এক জায়গায় এসে আটকে গেল। অনেকটা দূরে ঝোপের মধ্যে একটা কিছুর নড়াচড়া তার চোখে পড়েছে। লালচে বাদামি রঙের কয়েকটা সচল বস্তু—ডিংগো!

মাটির উপর দিয়ে দৌড়ে গেলে কুকুরগুলো দেখতে পেয়ে পালাবে, তাই ঝোপঝাড়ের আড়ালে হামাগুড়ি দিতে দিতে তারা এসে পৌঁছল গরু-ভেড়ার পালটার কাছাকাছি। মাটির উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই টমি তার রাইফেলের সেফটি ক্যাচ টেনে তৈরি হয়ে নিল। হফম্যানও প্রস্তুত হল।

খানিকক্ষণ বাদে হঠাৎ পাশের জঙ্গল থেকে মাঠের উপর বেরিয়ে এল একটা বাদামি রঙের কুকুর। মুখের আদল অবিকল নেকড়ের মতো, সতর্ক চলাফেরা। তার পিছনে আর একটা, আরও একটা, আরও আরও আরও...প্রায় গোটা বারো জন্তু আত্মপ্রকাশ করল মাঠটার উপর সরীসৃপের মতো মসৃণ, সতর্ক গতিতে তারা এগিয়ে চলল গরুর পালটার দিকে। মৃত্যু-দূতের দল!

কানের কাছে একটা ফিসফিসে গলা শুনতে পেল হফম্যান, 'সাহেব, গুলি চালাও।' সঙ্গে সঙ্গে একটা রাইফেলও গর্জন করে উঠল। কথা বলতে বলতেই গুলি চালিয়েছে টমি।

অভ্রান্ত লক্ষ্য। কপালের ঠিক মাঝখানে মৃত্যুচুম্বন নিয়ে লুটিয়ে পড়ল একটা ডিংগো। আবার গর্জে উঠল টমির রাইফেল। আরো একটা কুকুর লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। ততক্ষণে হফম্যানও শুরু করে দিয়েছে। বারবার দুজনের হাতের রাইফেল আগুন ঝরিয়ে ধমকে উঠছে আর মাটিতে শুয়ে পড়েছে একটার পর একটা জন্তু। কিন্তু তার ফলে গোটা দলটা এক মুহূর্তের জন্যেও থমকে দাঁড়াচ্ছে না; গরম সীসার মৃত্যুঝড়কে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছে কুকুরগুলো। পাশের সঙ্গী শুয়ে পড়ছে মাটিতে, তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রক্ষেপ নেই কারো। স্থির লক্ষ্যে তারা এগিয়ে চলেছে শিকারের দিকে।

এক এক করে সবক'টাকে মেরে রাইফেল নামাল দুজনে। খানিকটা খুশি হয়েই বলল হফম্যান 'জন্তুগুলো রাইফেলকে ভয় পায় না, দেখছি। তাহলে ওদের মারতে তো কোনো অসুবিধাই নেই।'

উত্তরে মৃদু হাসল টমি, 'ঠিকই বলেছেন; কিন্তু অন্য দিকটা বোধহয় আর ভেবে দেখেননি। ভগবান না করুন, তবে যদি কখনো সাত-আটটা কুকুর একসাথে আপনাকে তাড়া করে বন্দুকের কথা ছেড়ে দিন, রিভলবারের ছ'ছটা গুলিতে ছ'টাকে মেরেও আপনি নিষ্কৃতি পাবেন না। সাত নম্বরটা আপনাকে র্নিঘাত কামড়াবে, গুলি ভরারও সুযোগ মিলবে না তখন। আর একবার কামড়ালে কী হয়, তা তো জানেনই।'

না, বিপদের দিকটা একেবারেই ভেবে দেখেনি হফম্যান, কথাগুলো শুনতেও খুব একটা ভালো লাগল না তার, ফলে সে চুপ করে গেল। টমি নেহাত মিথ্যে বলেনি, বিনা ঝুঁকিতে শুধু শুধু এতগুলো টাকা সরকারের দিতে দায় পড়েছে। নিজের মনেই ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরল হফম্যান, 'আর একটু সাবধান হতে হবে।'

মাঝে কেটে গেল বেশ ক'টা দিন। এইভাবেই ক্রমাগত ডিংগো মেরে চলল দুই শিকারিতে মিলে। টমি ডিংগোর দল খুঁজে বের করত, তারপর দুজনে মিলে সেগুলোকে সাবাড় করা হত। প্রতিদিন প্রায় পনেরো থেকে কুড়িটা ডিংগোর মাথার ছাল জমা হতে লাগল তাদের থলিতে। ক'টা ডিংগো মারা হল চামড়াগুলো তার প্রমাণ। পরে ওই চামড়াগুলোকে সরকারি অফিসে জমা দিয়ে টাকা নিয়ে নিত হফম্যান। চামড়া পিছু এক পাউন্ড।

কয়েক সপ্তাহ টানা শিকারপর্ব চালিয়ে কিছু টাকা রোজগার হলে হফম্যান মাঝে মাঝে ব্রিসবেনে স্ত্রীর সঙ্গে ক'টা দিন কাটিয়ে আসত। ফিরে এসে আবার শুরু হত কুকুর মারার পালা।

এইভাবে প্রায় মাস চারেক চলার পর হঠাৎ উইলোবির খামার থেকে উধাও হয়ে গেল কুকুরের দল। ফলে তাদের খোঁজে হফম্যান আর টমিকেও সরে যেতে হল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কাইনুনা অঞ্চলে। এর মধ্যে তিন-তিনটে ঘোড়া কিনে ফেলেছিল হফম্যান। দুটো তার আর টমির চড়বার জন্য, অন্যটার পিঠে চাপত মালপত্র।

কিন্তু কাইনুনায় এসে হফম্যানকে অন্য উপদ্রবের মুখোমুখি হতে হল। জায়গাটা বিষাক্ত পোকামাকড়ে ভর্তি, বিশেষ করে ইঞ্চি-দুয়েক লম্বা 'ফানেল-ওয়েব স্পাইডার' বলে এক ধরনের মাকড়শার জন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হত। ওই বিষাক্ত মাকড়শা কামড়ালে আর রক্ষা নেই—যত বড় জোয়ান হোক না কেন, দশঘণ্টার মধ্যে অনিবার্য মৃত্যু! তার উপর এখানে দিনের বেলায় যেমন গরম, রাতে তেমনই শীত। তবু এত সব অসুবিধা হফম্যান মানিয়ে নিয়েছিল একটা মাত্র কারণে—এখানে ডিংগো প্রচুর, শিকারও চলছিল মহাউদ্যমে। সপ্তাহ শেষে অতগুলো করে টাকা পাওয়ার জন্যই বোধহয় অসুবিধাগুলো গা-সওয়া হয়ে গেছিল।

এরই মধ্যে একদিন শিকারে বেরিয়ে দেখা হল আর এক শ্বেতাঙ্গ শিকারির সঙ্গে। তার সাথেও রয়েছে একজন আদিবাসী। দুজনে চলেছে জিপগাড়িতে চড়ে। হফম্যানকে দেখে সাদাচামড়ার শিকারিটি গাড়ি থামাল। খানিকক্ষণ আলাপ-পরিচয়ের পর কথায় কথায় বলল, 'আরে মশাই, মাটিতে হেঁটে ডিংগো মারছেন কেন? একটা জিপ কিনে ফেলুন। কুকুরগুলোর মজা হল, গাড়ি দেখলেই পাশে পাশে ছুটতে থাকে—আর গুলি করলে যে পালায় না সে-কথা তো নিশ্চয়ই জানেন। সুতরাং এবার মেরে যান যতগুলো ইচ্ছে। দেখুন না আমার থলিটা, তাহলেই বুঝবেন।'

কথাটা মনে ধরল হফম্যানের। দিন কয়েকের মধ্যেই একটা জিপগাড়ির বন্দোবস্ত করে ফেলল সে। কাছাকাছি অঞ্চলেরই একজনের কাছ থেকে চলনসই গোছের দামে গাড়িটা পাওয়া গেল।

ফল ফলল একেবারে হাতেনাতে। জিপে ঘুরে দিনে প্রায় ষাটটা করে কুকুর মারতে শুরু করল হফম্যান আর টমিতে মিলে। রোমাঞ্চ আর টাকার নেশা পেয়ে বসল হফম্যানকে। সপ্তাহ ধরে চলতে লাগল শিকার।

হিসাব করে হফম্যান দেখল এইভাবে চললে আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই মার্কিন মুলুকে ফিরে গিয়ে সে অনায়াসে একটা ছোটখাটো খামার কিনে নিতে পারবে। সেই পরিকল্পনা মতো অন্তত আর কয়েকটা সপ্তাহ অস্ট্রেলিয়ায় কাটিয়ে যেত হফম্যান, যদি না তাকে এর মধ্যে এক ভয়ঙ্কর ঘটনার সাক্ষী হতে হত।

১৯৬০ সালের ১৯শে জুন।

সেদিন বৃহস্পতিবার। সকাল দশটা নাগাদ টমিকে সঙ্গে নিয়ে শিকারে বেরিয়েছিল হফম্যান।

পাহাড়ি পথ বেয়ে জিপ ছুটে চলেছে টিলার উপরে। খুব বড় গোছের টিলা নয়, ছোট পাথুরে স্তূপমতো। মোটা, শক্ত গোড়া-ওয়ালা কাঁটা গাছ ছাড়া আর কোনো উদ্ভিদের পক্ষে পাথুরে মাটির বুক ফাটিয়ে এখানে মাথা তোলা কঠিন। টিলার উপর থেকে নীচে অনেকদূর অবধি চোখ যায়।

টিলার মাথায় পৌঁছে গাড়ি থামাল হফম্যান। নীচে বিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্র, সবুজ মাঠ আর ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে বড় বড় পাথরের চাঁই। নীচে বেশ কিছুটা দূরে বয়ে যাচ্ছে সরু রূপোলি ফিতের মতো মিচেল নদী। তার মধ্যে কোথায় ডিংগো লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষ কাছে থেকেই তা বুঝতে পারবে না, আর এতদূর থেকে তো কোনো প্রশ্নই নেই। তবে টমির কথা আলাদা।

জিপের উপর উঠে দাঁড়িয়ে শিকারি বাজপাখির মতো তীক্ষ্নদৃষ্টি মেলে সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করল চারিদিক, তারপর এক সময় নীচে মিচেল নদীর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, 'ওইদিকে চলুন।'

টমির এ ব্যাপারে বিশেষ ভুল-টুল হয় না। তার কথামতো হফম্যান জিপ নামিয়ে আনল টিলার উপর থেকে সমতলভূমিতে; উইঢিবি, ঝোপঝাড় আর পাথর ডিঙিয়ে জিপ নামল এসে হাঁটু-সমান উঁচু ঘাসঝোপের মধ্যে। টমির কথামতো কুকুরগুলোর ওই ঘাসঝোপের মধ্যেই থাকার কথা।

জিপ চলছে,—হঠাৎ একটা বাদামি রঙের কুকুর লাফিয়ে উঠল ঝোপের মধ্যে থেকে? তারপর আর একটা, আশেপাশে আরও দু-চারটে দেখা দিল। শেষমেষ অনেকগুলো কুকুর জিপটাকে ঘিরে ছুটতে আরম্ভ করল। ডিংগোরা দল বেঁধে থাকে। এই দলটায় ছিল প্রায় গোটা বারো কুকুর।

ব্রেক চেপে গাড়ি থামাল হফম্যান। কুকুরগুলোও জিপটাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে পড়ল—কেউ কেউ জিপের চারপাশে ঘুরে ঘুরে শুঁকতে লাগল, আবার কেউ কেউ খুদে খুদে সবুজ চোখ মেলে চেয়ে রইল।

পাশে ঝোলানো রাইফেল হাতে তুলে নিল শিকারি দুজন। শুরু হল কুকুর মারার পালা। এমনিতে খুবই সোজা কাজ, তবে একটু দেখেশুনে গুলি ছুড়তে হয়। কুকুরগুলোর দু-চোখের মাঝখানে ইঞ্চি-দুয়েক চওড়া কপালের মতো জায়গাটাতে গুলি করাই ভালো, তাহলে আর চিন্তার কিছু নেই। নইলে আহত ডিংগো বড় মারাত্মক—তখন হয় সে নিজে মরবে, নয় শিকারিকে মারবে। কিন্তু আপাতত সেরকম অসুবিধার কারণ নেই। কারণ, প্রথমত হফম্যান আর টমি দুজনেই পাকা বন্দুকবাজ, দ্বিতীয়ত ডিংগোগুলো একদম হাতের আওতার মধ্যে প্রায় স্থির হয়েই বসে আছে। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সবক'টা জন্তু মারা পড়ল। এইবার চামড়া ছাড়ানোর কাজ—অবশ্য পুরো চামড়া নয়, কুকুরগুলোর মাথার চামড়াটুকু ছাড়িয়ে নিলেই হবে। রাইফেল রেখে দিয়ে ছুরি হাতে টমি লাফিয়ে পড়ল সেই কাজ করতে। হফম্যানও বন্দুকটা জিপের মধ্যে রেখে একটা বড় ছুরি হাতে নেমে এল টমিকে সাহায্য করতে। এই কাজটা তার একেবারে ধাতে সয় না। কিন্তু তবু একজনের কাজ দুজনে করলে অনেকটা সময় বাঁচে, আর হফম্যানের কাছে এখন সময় মানেই টাকা।

তিনটে কুকুরের চামড়া ছাড়িয়ে সবে চার নম্বরটায় ছুরি লাগিয়েছে হফম্যান, এমন সময় একটা তীব্র আর্তনাদ তার কানে ভেসে এল। টমির আর্তনাদ। ঘুরে তাকিয়ে হফম্যানের চোখে পড়ল এক ভয়াবহ দৃশ্য—

টমিকে আক্রমণ করেছে আর একপাল ডিংগো। একটা কুকুর লাফিয়ে উঠে তার গলায় কামড় বসিয়েছে, গলার শ্বাসনালির উপর চেপে বসেছে দু-জোড়া শ্ব-দন্ত। টমি দু-হাত দিয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছে সেই মরণ-কামড় ছাড়াতে। অন্য ডিংগোগুলোও চুপ করে বসে নেই। তাদের মধ্যে দুটো কামড় বসিয়েছে টমির দু-পায়ের গোড়ালিতে, আরেকটা তার হাঁটুর কাছে প্যান্টটাকে কামড়ে ধরেছে। তার মধ্যেই টমি মাঝে মাঝে যন্ত্রণার গোঙানির মতো চিৎকার করে উঠছে। ডিংগোগুলোর মুখে কিন্তু এতটুকু শব্দ নেই। রক্ত-লোলুপ প্রেতমূর্তির মতো নীরবে তারা তাদের কাজ করে চলেছে।

যে দুটো কুকুর টমির গোড়ালিতে কামড় বসিয়েছিল, তারা এবার জোরে টান মারল। এক-একটা ঝটকায় গোড়ালির পেছনের রগ-দুটো গেল ছিঁড়ে। সঙ্গে সঙ্গে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে ছিটকে পড়ল টমির গোটা দেহ। তৎক্ষণাৎ একসঙ্গে সমস্ত কুকুরগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার পেটের উপর। মুহূর্তের মধ্যে তীক্ষ্ন দাঁতের মারাত্মক কামড়ে ছিন্ন হয়ে গেল পেটের নরম মাংস। এতক্ষণ যে কুকুরটা টমির গলা কামড়ে ঝুলছিল সেটাও গলা ছেড়ে দিয়ে এসে কামড় বসাল পেটের উপর। তীব্র একটা চিৎকার বেরিয়ে এল টমির গলা থেকে, তারপর হঠাৎ থেমে গেল। নিশ্চল হয়ে গেল তার দেহ।

এতক্ষণ পরে হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরল হফম্যানের, টমির বীভৎস মৃত্যু তাকে পাথরের মতো নিশ্চল করে দিয়েছিল। নড়াচড়া করার শক্তি পর্যন্ত ছিল না তার। কিন্তু, এবার নিজের অবস্থাটা একটু বিচার করে দেখা দরকার।

রাইফেল জিপের মধ্যে, হাতে অস্ত্র বলতে চামড়া ছাড়াবার একটা বড় ছোরা, কিন্তু এতগুলো জন্তুর বিরুদ্ধে সেটা বিশেষ কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। এখন ওরা টমির দেহটাকে নিয়ে ভোজ লাগাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু একটু পরেই ওরা খেয়াল করবে এ দিকে। তাহলে আর নিস্তার নেই। তারও দশা হবে টমির মতো। ভাবতেই সারা শরীর বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল হফম্যানের।

কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে জিপগাড়িটা। ওখানে একবার পৌঁছতে পারলে আর ভয় নেই। কিন্তু শয়তান কুকুরগুলোর চোখ এড়িয়ে এতদূর কী পৌঁছতে পারবে হফম্যান? তবে এছাড়া উপায়ই বা কী? চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না। কুকুরগুলোর দিকে একবার তাকাল হফম্যান। না, এখনো ওরা টমির মৃতদেহ নিয়ে ব্যস্ত, এদিকে বিশেষ কারও দৃষ্টি নেই। সঙ্গে সঙ্গে জিপের দিকে ছুট লাগাল সে।

জিপের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছে হফম্যান। আর মাত্র চার গজ, এইটুকু পথ পেরোলেই সে নিরাপদ। কিন্তু ভাগ্য খারাপ—একটা কুকুর দেখে ফেলল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে সে জিপটাকে আড়াল করে দাঁড়াল হফম্যানের সামনে। অপেক্ষা করার মতো সময় নেই, তাহলে অন্য কুকুরগুলো এসে পড়বে। হাতের ছুরিটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে শ্বেতাঙ্গ হ্যারি হফম্যান তৈরি হল লড়াই-এর জন্য।

মাটির উপর গুঁড়ি মেরে এগিয়ে এল ডিংগো। ছুরি হাতে হফম্যান সতর্ক হল। চকিত বন্য ক্ষিপ্রতায় লাফ দিল ডিংগো, লক্ষ্য শত্রুর তলপেট। কিন্তু কুকুরের দাঁত হফম্যানের তলপেট স্পর্শ করতে পারল না। তার আগেই শিকারির হাতের ছোরা ছোবল মারল ডিংগোর একটা চোখের উপর। মাটিতে ছিটকে পড়ল আহত ডিংগো। কিন্তু পরক্ষণেই ঘুরে এসে চোখের পলক ফেলার আগেই আবার আক্রমণ করল সে। এবার লক্ষ্য শত্রুর কণ্ঠনালি। এক ঝটকায় সরে গেল হফম্যান, তবে গলা বাঁচলেও আক্রমণের ধাক্কাটা পুরোপুরি এড়ানো গেল না। ডিংগোর মারাত্মক দাঁত চেপে বসল তার গালের উপর। সঙ্গীন-মুহূর্তে কিন্তু বুদ্ধি হারাল না হফম্যান। অব্যর্থ লক্ষ্যে তার হাতের ছোরা নেমে এল বুনো কুকুরটার বুক আর পেটের উপর। ডিংগোর প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

তাড়াতাড়ি জিপে উঠে ঝড়ের মতো গাড়ি চালিয়ে দিল হফম্যান। তার গালের উপর অনেকটা জায়গা জুড়ে কেটে বসেছে ডিংগোর দাঁত। ক্ষত বিষিয়ে উঠলে আর রক্ষে নেই। কাছাকাছি এক সরকারি প্রতিনিধির নিজস্ব প্লেন রয়েছে, সেটা নিয়েই হাসপাতালে পৌঁছতে হবে।

হাসপাতালে যখন হফম্যান এসে পৌঁছল, তখন তার সমস্ত মুখ ফুলে ঢোল; জ্বরে প্রায় বেহুঁশ, হাতে পায়ে খিঁচুনি শুরু হয়েছে।

পাঁচ সপ্তাহ। দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হল হফম্যান। ভাগ্য ভালো তার।

তারও প্রায় সপ্তাহখানেক বাদে ব্রিসবেনে এসে হফম্যান সস্ত্রীক দেখা করল মিঃ ক্যাভানোর সাথে।

'যথেষ্ট হয়েছে মশাই, আর এখানে থাকতে চাই না', গালের শুকিয়ে আসা ক্ষতচিহ্নটা দেখিয়ে বলল হফম্যান।

—'আর আপনার ভয়ের কিছু নেই। একবার ডিংগোর কামড় থেকে বেঁচে আসলে, পরে কামড়ালেও আর কোনো ক্ষতি হয় না। অনেকটা ওই 'টিকা'র মতো ব্যাপার আর কি। সুতরাং থেকে যান, আমাদেরও সুবিধা হবে, আর আপনারও ভালোই রোজগার হবে।'

উত্তরে মৃদু হাসল হফম্যান, 'আচ্ছা মিঃ ক্যাভানো, আপনি কখনো একপাল ডিংগোর কবলে কোনো মানুষকে মারা পড়তে দেখেছেন, দেখেছেন কীভাবে শয়তান কুকুরগুলো তার পেট চিরে লিভারটা খেয়ে ফেলে; শুনেছেন কখনো সেই হতভাগ্য মানুষটার আর্তনাদ? বোধ হয় কোনদিন শোনেননি, তাই না?'

ক্যাভানো মাথা নাড়লেন অর্থাৎ না, তিনি দেখেননি বা শোনেননি।

—'কিন্তু আমি দেখেছি। সেইজন্যেই আর একমুহূর্তও থাকতে চাই না এ দেশে।'

দশ দিন পরে ম্যাডালীনকে নিয়ে আমেরিকাগামী বিমানে চড়লেন হ্যারি হফম্যান।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%