নির্বেদ রায়

আধ-ইঞ্চি! হ্যাঁ, মাত্র আধ-ইঞ্চি।
আর ওই আধ-ইঞ্চির জন্যই মৃত্যু-বরণ করতে হল শ্বেতাঙ্গ শিকারি রবিনসনকে। যদিও তাঁর মৃত্যুর জন্য তাঁর নিজের গোয়ার্তুমিও অনেকটাই দায়ী, তবু মাত্র আধ-ইঞ্চির লক্ষ্যভ্রষ্টতার জন্য বন্ধুর শোচনীয় মৃত্যুর কথা চিন্তা করেই উইলসনের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
প্রকৃত ঘটনার শুরু ব্রহ্মদেশের এক কাঠের গুদামে একজন মানুষের একটা সামান্য ভুলকে কেন্দ্র করে, কিন্তু বর্তমানে আমরা ব্রহ্মদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি 'ক্লাব'-এর পটভূমি থেকেই আমাদের কাহিনি শুরু করব।
''বোহমিওর স্টেশন ক্লাব''—
বার্মা বা ব্রহ্মদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই ক্লাবটিতে সেদিন বেশ জনসমাগম হয়েছিল একটি পার্টি উপলক্ষে। ওই পার্টিতে অন্যান্য অভ্যাগতদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বনবিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী মিঃ উইলসন এবং প্রতিবেশী একটি কাঠের গুঁড়ির গুদামের মালিক মিঃ রবিনসন। ব্রহ্মদেশে কাঠের গুঁড়ির ব্যবসা বহুল প্রচলিত এবং লাভজনক। কিন্তু রবিনসন শুধু ব্যবসাদার ছিলেন না, একজন আদৃত শিকারি হিসাবেও তাঁর যথেষ্ট নামডাক ছিল।
পা. চলাকালীন জনৈক তরুণ সামরিক অফিসার, শিকারে ঠিক কোন শ্রেণির রাইফেল বা বন্দুক ব্যবহার করা শ্রেয় সে সম্পর্কে ওই দুই অভিজ্ঞ ব্যক্তির মতামত জানবার জন্য খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। স্বভাবতই, নবীন অফিসারটির শিকারের সখ ছিল প্রবল। মিঃ রবিনসনকে তাঁর মতামত ব্যক্ত করতে অনুরোধ করা হলে, তিনি যে মত প্রকাশ করলেন তার সারমর্ম দাঁড়ায়, নিজের স্নায়ুযন্ত্র ও লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ থাকলে শিকারে সবসময়েই হালকা রাইফেল ব্যবহার করা উচিত। প্রসঙ্গক্রমে রবিনসন .৩০৩ বোরের রাইফেল ব্যবহারের কথা পর্যন্ত উল্লেখ করলেন। .৩০৩ আগ্নেয়াস্ত্র বড় জন্তু শিকারের পক্ষে অবশ্যই খুব হালকা যদিও ব্যবহারের পক্ষে যে কোনো ভারী রাইফেলের থেকে অনেক সুবিধাজনক।
মিঃ উইলসন কিন্তু বন্ধুর এই মতে সায় দিলেন না। তাঁর মতে, অধিকাংশ নবীন শিকারি বড় জন্তু শিকারের ক্ষেত্রে নিজেদের স্নায়ুকে আয়ত্তে রাখতে পারেন না, অন্তত সম্পূর্ণভাবে তো নয়ই, ফলে সেসব ক্ষেত্রে হালকা রাইফেল ব্যবহারের ঝুঁকি যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ, হালকা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে নিক্ষিপ্ত গুলি শিকারের মর্মস্থানে আঘাত না করলে প্রায় সবক্ষেত্রেই শিকারিকে নিজের প্রাণ দিয়ে তাঁর সেই লক্ষ্যভ্রষ্টতার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। পক্ষান্তরে ভারী রাইফেল—ব্যবহারের পক্ষে ততটা সুবিধাজনক না হলেও, শিকারি তার ভুল সংশোধন করার মতো অন্তত আরেকটি সুযোগ পান, কারণ ভারী বন্দুকের গুলি শিকারের মর্মস্থানে আঘাত না করলেও সাময়িক ভাবে তার আক্রমণকে অথবা আক্রমণের গতিকে স্তব্ধ করে দেয়। সেইসময়ে শিকারি তাঁর সংশোধনের সুযোগ পেয়ে থাকে। ফলে যুক্তিযুক্ত কারণেই উইলসনের বক্তব্যে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার কথা সুবিধাজনক বলে বিবেচিত হল।
—'স্নায়ুকে বশে এনে গুলি চালাতে না পারলে তাকে তো শিকারি বলে স্বীকার করাই কঠিন।' রবিনসনের ভারী গলায় উত্তেজনার ছোঁয়া। স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, উইলসনের কথা তাঁর ভালো লাগেনি।
—'কিন্তু আমার বক্তব্য ছিল শিক্ষানবিশদের ক্ষেত্রে; তাদের সম্পর্কেও কি তোমার একই মত?' ঠান্ডা নিরুত্তাপ গলায় উইলসনের প্রশ্ন ভেসে এল টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে।
ততক্ষণে এই দুই অভিজ্ঞ শিকারিকে ঘিরে বেশ কয়েকজন উৎসুক ও কৌতূহলী ব্যক্তির ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে। সঙ্গত কারণেই, তাদের অধিকাংশের মতো গেল উইলসনের বক্তব্যের স্বপক্ষে, কিন্তু তার ফলে রবিনসনের মেজাজ চড়ে গেল সপ্তমে। ফলে, মত বিনিময়ের এখানেই সমাপ্তি ঘটল, এবং মিঃ রবিনসন তাঁর বন্ধুবরকে অনুরোধ জানালেন যে তাঁকে প্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়া হলে তিনি ওই হালকা রাইফেলের সাহায্যেই সম্প্রতি 'গুণ্ডা' হয়ে যাওয়া হাতিটাকে শিকার করে তাঁর বক্তব্যের বাস্তব সত্যতা প্রমাণ করতে আগ্রহী। উইলসন বন্ধুর এই প্রস্তাবে সাগ্রহে তাঁর অনুমতি প্রদান করলেন কিন্তু রবিনসনের পরবর্তী কথাগুলোর জন্য তিনি মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না।
পার্টিতে আমন্ত্রিত অন্যান্য যেসব কৌতূহলী ব্যক্তি এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নিজেদের মতামতও সুবিধামতো ব্যক্ত করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য করে রবিনসন এবার বলে উঠলেন—'আশা করি এবার আমি আমার কথার সত্যতা বাস্তবে প্রমাণ করতে সক্ষম হব। মাত্র .৩০৩ বোরের রাইফেলের সাহায্যেই আমি ''গুণ্ডা'' হাতিটাকে শিকার করব। আমার সাফল্য সম্পর্কে যদি কেউ সন্দিহান হন তাহলে তাঁর সঙ্গে আমি একশো টাকা পর্যন্ত বাজি ফেলতে রাজি আছি।' রবিনসনের বক্তব্যে প্রচ্ছন্ন দম্ভের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কয়েকজন তাঁর ওই বাজির চ্যালেঞ্জ সানন্দে গ্রহণ করলেন।
চমকে উঠলেন উইলসন।
সর্বনাশ! এ কী ধরনের বাজি ধরছেন রবিনসন। .৩০৩ বোরের রাইফেল সম্বল করে হাতি শিকার করতে যাওয়া তো একরকম আত্মহত্যারই নামান্তর। বন্ধুকে এই সাংঘাতিক ঝুঁকি না নেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করলেন তিনি। কিন্তু রবিনসন অটল। শিকার সম্পর্কে ধারণাহীন এই লোকগুলোর আনাড়ি মন্তব্যের উপযুক্ত জবাব দিতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফলে, কয়েকবার অনুরোধ করার পর নিজের সম্মানার্থে উইলসন বিরত হলেন।
ক্লাবের মধ্যে তখনকার মতো চুপ করে গেলেও উইলসনের সারারাত সেদিন দুশ্চিন্তায় কাটল। হাজার হলেও রবিনসন তাঁর অন্তরঙ্গ সুহৃদ। সেই কারণে, পরদিন সকালেই উইলসন বন্ধুবরের মত পরিবর্তন করার জন্য তাঁর বাসগৃহের উদ্দেশ্যে চললেন। শেষবারের মতো একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি? বলা যায় না, হয়তো ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে রবিনসন তাঁর মতো পাল্টালেও পাল্টাতে পারেন।
কিন্তু গন্তব্যস্থানে পৌঁছে বন্ধুবরের দেখা মিলল না। পরিবর্তে হস্তগত হল একটি চিঠি। চিঠির বক্তব্য সরল। রবিনসন একজন মাত্র সঙ্গীকে নিয়ে ইতিমধ্যেই হাতির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। দিন সাতেকের মধ্যেই তিনি ফিরছেন। পশ্চাদ্ধাবন করা বৃথা, অতএব নিরাশ হয়েই ফিরতে হল উইলসনকে।
পাঠক-পাঠিকাকে আপাতত এইখানে রেখে আমরা পিছিয়ে যাব কয়েকটি মাসের ব্যবধানে ঘটনার গৌরচন্দ্রিকায়, কাহিনির প্রাথমিক পর্যায়ে।
মাহুত মাউঙ-সেন-এর একটা ভুলের মধ্যে দিয়েই ঘটনার সূচনা। গণ্ডগোলটা সে-ই প্রথমে বাঁধায়।
এন্সান স্মিথ নামে একজনের তত্ত্বাবধানে ব্রহ্মদেশের একটি কাঠের গুঁড়ির গুদামে হস্তিচালকের কাজ করত মাউঙ-সেন। অভিজ্ঞ মাহুত মাউঙ-সেনের উপর স্মিথেরও ছিল প্রগাঢ় আস্থা ও বিশ্বাস। কারণ তার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের কথা—তবু এই মাউঙ-সেনই ভুলটা করে বসল মারাত্মকভাবে।
ঘটনাটা আপাতদৃষ্টিতে খুবই সামান্য।
সেদিন মাউঙ-সেনের মেজাজটা কোনো কারণে সপ্তমে চড়েছিল। গুদামে এসে নিত্যনৈমিত্তিক কাজে যখন সে যোগ দিল তখনও তাঁর মাথা বেশ গরম। হাতিটা সামান্য কিছু ভুল করলে বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে সে জন্তুটার প্রতি অত্যন্ত নির্দয় ব্যবহার করছিল। এরই মধ্যে একসময় হঠাৎ একটা কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে মাউঙ-সেন সজোরে আঘাত করে বসল জন্তুটার পায়ে নীচের দিকের নরম অংশে। হাতিটার এমন কিছু দোষ ছিল না। রাগ পড়ে যেতে মাউঙ-সেনও বুঝল যে লঘু দোষে এতটা গুরু দণ্ড দেওয়া তার পক্ষে ঠিক হয়নি। তখনকার মতো কিছু ঘটল না বটে—কিন্তু হাতির স্বভাবচরিত্র সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল অভিজ্ঞ মাহুতের বুঝতে বাকি রইল না যে, সে নিজেই নিজের কত বড় বিপদ ডেকে এনেছে। সে সাবধান হল!
মাউঙ-সেনের ধারণা যে অভ্রান্ত, মাস কয়েক পরের একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে তার প্রমাণ মিলল...
হাতিটাকে খাবার দেওয়ার সময় সেদিন মাউঙ-সেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। কাজ করতে-করতে যেই সে হাতিটার দিকে পিছন ফিরেছে, সঙ্গে-সঙ্গে সেই সামান্য সময়টুকুর মধ্যে, জন্তুটা তার বিরাট মাথা সামনের দিকে অল্প হেলিয়ে নিয়ে এক প্রচণ্ড আঘাতে হতভাগ্য মাহুতকে তার একটা দাঁতে গেঁথে ফেলল, এবং কোনোরকম জানাজানি হওয়ার আগেই চম্পট দিল জঙ্গলের পথ ধরে।
স্মিথ যখন এই দুর্ঘটনার খবর পেল তখন সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। কিন্তু বিমূঢভাব কাটিয়ে উঠে, প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সে কয়েকটা হাতি এবং প্রয়োজনীয় লোকজন জোগাড় করে নিয়ে ধাওয়া করল খুনি হাতিটার পিছনে। স্মিথের এই সাময়িক বিহ্বলতার কারণও ছিল যথেষ্ট। প্রথমত, ওই খুনি জন্তুটা ছিল গুদামের সবচেয়ে কর্মক্ষম আর দামি হাতি এবং দ্বিতীয়ত, মাউঙ-সেনের মতো দ্বিতীয় একটি মাহুত খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।
স্মিথের পক্ষে এই বিরাট ক্ষতি স্বীকার করে নেওয়া একটু কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। ফলে যতটা সম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে হাতিটার খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ল একটা গোটা দল। কিন্তু কাজটা অত সহজ হল না। পলাতক হাতিটার পায়ের ছাপ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল যে, দাঁতে গেঁথে নেওয়া মাউঙ-সেনের মৃতদেহ বহন করে হাতিটা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে এবং একটুও না থেমে। সুতরাং অনির্দিষ্ট দূরত্বের পশ্চাদ্ধাবন পালা সাঙ্গ করে বাধ্য হয়েই স্মিথকে তাঁবুতে ফিরতে হল দলবল নিয়ে।
ভোর রাত্রি...
স্মিথের ঘুম ভেঙে গেল তীব্র শাঁখের আওয়াজের মতো হস্তীকণ্ঠের বৃংহণ ধ্বনিতে। সমাগত বিপদের ভয়াবহ আশঙ্কা নিয়ে স্মিথ তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসার পরমুহূর্তে উন্মত্ত হাতির সঙ্গে সংঘাতে পাটকাঠি আর কাগজের তৈরি কাঠামোর মতো তাঁবুটা ভেঙে পড়ল। ভাগ্য ভালো, সামনে একটা বড় গাছ নাগালের মধ্যে পেয়ে গেলেন স্মিথ। গাছের উপরে এরইমধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল একটি ব্রহ্মদেশীয় কুলি। সাহেবকে গাছে উঠতে দেখে সে হাত বাড়িয়ে উঠতে সাহায্য করল। তার সাহায্যে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি গাছে উঠে স্মিথ জীবনরক্ষা করলেন।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর কানে ভেসে এল একটা তীব্র আর্তনাদ। সূর্যের আলো তখনও ফোটেনি। দূরের গাছপালা স্পষ্ট চোখে পড়ে না। সেই আবছা অন্ধকারের মধ্যে এক বীভৎস দৃশ্য চোখে পড়ল স্মিথ সাহেবের। অদূরবর্তী একটা গাছে উঠতে সচেষ্ট জনৈক হতভাগ্য বহু চেষ্টাতেও হাতিটার নাগালের বাইরে যেতে পারল না। ফলে...
না, বর্ণনা দেবার মতো তেমন কিছু দেখেননি স্মিথ সাহেব। শুধু দেখলেন মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি মানুষকে, এক দলা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়ে যেতে। জমির উপর শিকার পর্যাপ্ত সংখ্যায় পাওয়া যাচ্ছে না, এই কথাটা একটু পরেই খেয়াল হল হাতিটার এবং এবার সে নজর দিল বৃক্ষবাসী মানুষগুলোর উপর। প্রবল ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল বিশাল গাছগুলো, কিন্তু বৃক্ষারোহী মানুষগুলোর সৌভাগ্যক্রমে উন্মত্ত দানবের সঙ্গে প্রচণ্ড সংঘাতের পরও তারা মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রইল। বহুক্ষণ চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে অবশেষে 'গুন্ডা'টা যখন জঙ্গলে ফিরে গেল, আকাশে তখন দুপুরের গনগনে সূর্য।
এই ঘটনার পরেই উপদ্রুত অঞ্চলে হাতিটা 'নরঘাতক' হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করল। বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত, বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রায় পঞ্চাশ মাইল জায়গা জুড়ে তার কবলে প্রাণ হারাল বহু মানুষ। কিন্তু স্থানীয় শিকারিরা অথবা স্মিথ কেউ তার কোনো নাগাল পেত না। নরখাদক বাঘের মতোই জন্তুটা হয়ে উঠেছিল অসম্ভব চালাক।
প্রায় মাস আষ্টেক পরের ঘটনা। দাঁতালটাকে মারবার জন্য তখন বেশ মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অথবা গুদাম-মালিকদের তরফ থেকে।
সেই সময় পূর্ব-ব্রহ্মের বোহমিও স্টেশন ক্লাবে একটি পার্টিতে বেশ কিছু আমন্ত্রিত ব্যক্তির সমাগম হয়েছিল। উইলসন এবং রবিনসন ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ওই দুই শিকারির মধ্যে মত বিনিময় এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাদানুবাদের কথা আমরা আগেই জেনেছি; এবং এখন সম্ভবত আমরা আঁচ করতে পারি যে কোন 'গুন্ডা' হাতিটার পশ্চাদ্ধাবন করে শিকার করতে বেরিয়েছিলেন রবিনসন।
সাতদিনের নোটিশ বন্ধুকে চিঠি লিখে মিঃ রবিনসন তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হাতির খোঁজে। নিরাশ হয়ে দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ফিরে এলেন উইলসন। কিই বা এখন করণীয় আছে তাঁর, একমাত্র অপেক্ষা করা ছাড়া।
কাটল একটা-দুটো-তিনটে দিন...
কোনো খবরই নেই রবিনসনের। অবশেষে চতুর্থ দিন সংবাদ নিয়ে এল বার্তাবাহক। উইলসন সে সময় তাঁর অফিসে কাজে ব্যস্ত। বার্তাবহনকারী ব্যক্তিটিকে চিনতেন উইলসন—রবিনসনের একজন সহকর্মী। অত্যন্ত উদ্বিগ্নভাবে সে এসে জানাল যে, রবিনসনের তিন ভৃত্য ষ্ট্রেচারে করে যে ব্যক্তিটিকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে সে লোকটিই ছিল রবিনসনের হাতিশিকারের সঙ্গী। প্রচণ্ড আঘাতে তাঁর সম্পূর্ণ দেহ পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গেছে। আর রবিনসন সম্ভবত আর বেঁচে নেই, যদিও ঘটনার পুরো বিবরণী তাঁর অজ্ঞাত।
উইলসনের স্নায়ুকেন্দ্রে একটা তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি হল সাময়িককালের জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন তাঁর অভিজ্ঞ মন। বুঝলেন, মানসিক ভারসাম্য হারাবার সময় এটা নয়। ফলে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব দুই ব্যক্তি রওনা হলেন হাসপাতালের দিকে।
হাসপাতালে পৌঁছে ডাক্তারের কাছ থেকে উইলসন ও তাঁর সঙ্গী জানতে পারলেন যে, আহত ব্যক্তির অবস্থা খুবই সঙ্গীন। আঘাতের তীব্রতায় তাঁর দেহের নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতে সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিটিকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, তাঁর দেহের অভ্যন্তরে বহু ক্ষতস্থান থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে। তবে, এখনো তাঁর জ্ঞান রয়েছে—ইচ্ছা করলে তাঁরা দুজন, রুগির কাছ থেকে ঘটনার আনুপূর্বিক বিবরণ জানতে পারেন।
উইলসনকে দেখে কাতর অনুরোধ জানিয়ে রবিনসনের সঙ্গী ব্যক্তিটি ওই হাতিটাকে মারবার জন্য বারবার মিনতি করতে লাগল। কারণ, তার দৃঢ বিশ্বাস, ওই হাতিটার উপর কোনো শয়তান অপদেবতা ভর করেছে। তাঁর এই বিশ্বাস প্রমাণ করতে সে যে কাহিনির বর্ণনা দিল, তা যেমন ভয়াবহ, তেমনই করুণ—
'টাটকোন' গ্রামের কাছ থেকে সে এবং রবিনসন গুন্ডাটার পায়ের ছাপ খুঁজে পায়। কিন্তু সেদিনটা তাদের পুরোই ব্যর্থতায় কাটে, অর্থাৎ হাতিটার আর কোনো হদিসই পাওয়া যায়নি। সে রাত্রিটা গ্রামে কাটিয়ে পরদিন সকালেই আবার জন্তুটার পিছনে ধাওয়া শুরু হয়। প্রায় ঘণ্টা তিনেক ধরে চলে এই পশ্চাদ্ধাবন-পর্ব...
দুই শিকারি ক্রমে প্রবেশ করেন ঘন ঘাসে ঢাকা তৃণভূমির মধ্যে। চারিদিকে মানুষ সমান উঁচু ঘনসন্নিবিষ্ট 'এ্যালিফ্যান্ট গ্রাস'-এর জঙ্গল। বড়জোর দশ-বারো গজের মতো সোজা দৃষ্টি চলে; ধীরে ধীরে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে এগোতে হচ্ছিল তাদের। এমন সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে একটা মাছি উড়ে এসে পড়ল রবিনসনের চোখে। 'এ আপদ আবার কোথা থেকে এসে জুটল এ সময়ে!' রবিনসন তাঁর সঙ্গীকে বললেন খুব তাড়াতাড়ি পোকাটাকে চোখ থেকে বার করতে। এমন সময়ে তাদের ডানদিকে একটু দূরে জেগে উঠল এক ভয়ংকর বৃংহণধ্বনি। চোখ ফেরাতেই ঘাস-জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে দৃষ্টিগোচর হল ঝড়ের বেগে ধাবমান উন্মত্ত গজরাজের ক্ষিপ্ত মুর্তি। এক ঝটকায় রাইফেল টেনে নিয়ে গুলি চালালেন রবিনসন। স্থির লক্ষ্যে শিকারির হাতের আগ্নেয়াস্ত্র গর্জে উঠল, ধাবমান অতিকায় জন্তুটাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু, বড় দেরি হয়ে গেছিল তাঁর। পরমুহূর্তে উন্মত্ত হাতির একটা প্রকাণ্ড পায়ের তলায় পিষে গেলেন হতভাগ্য শিকারি। সঙ্গী প্রাণপণে দৌড়ল প্রাণ বাঁচাবার জন্য, কিন্তু ক্ষিপ্ত হাতির শুঁড়ের প্রচণ্ড আঘাতে তাঁর দেহ শূন্যপথে উড়ে গিয়ে পড়ল গজ-দশেক দূরে। হত্যার উন্মাদনায় উন্মত্ত হাতিটা আবার ফিরে গেল রবিনসনের দেহটার কাছে, তারপর প্রচণ্ড আক্রোশে শুঁড় এবং পায়ের সাহায্যে সেটাকে একটা আকারবিহীন মাংসের দলায় পরিণত করল কয়েক মিনিটের মধ্যে। তারপর ফিরে চলে গেল জঙ্গলের পথে। কাহিনি শেষ করে থামল রবিনসনের পঙ্গু সঙ্গী।
ততক্ষণে কর্তব্য ঠিক করে ফেলেছেন উইলসন। সামরিক অফিসারটিকে সঙ্গে নিয়ে একটু পরেই তিনি রওনা হলেন ওই 'টাটকোন' গ্রামের দিকে। 'সঙ্গীর' জবানবন্দি মতো ওই গ্রামেরই অনতিদূরে খুনি হাতিটার কবলে প্রাণ হারিয়েছেন মিঃ রবিনসন। সুতরাং, আশা করা যায়, ধারে কাছেই 'খুনি'-টার সন্ধান মিলবে।
কিন্তু কাজটা যতটা সোজা ভেবেছিলেন উইলসন, বাস্তবে কিন্তু ঠিক ততটা সোজা হল না। দীর্ঘ সাতদিন ধরে ক্রমান্বয়ে 'গুন্ডা' হাতিটার পায়ের ছাপ ধরে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে দুই শিকারি 'খুনি'-টার সাক্ষাৎ পেলেন।
ঝড়ের মতো আক্রমণ করল নরঘাতক হাতি—কিন্তু, এবার তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে অগ্নিবর্ষণ করল দু-দুটো ভারী রাইফেল। প্রথম গুলির প্রচণ্ড ধাক্কায় জন্তুটার আক্রমণের গতিপথ বেঁকে গেল। দ্বিতীয় গুলি হাঁটুতে লাগল—হাতি হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দু-পায়ের উপর। তৃতীয় গুলি তার মর্মস্থান ভেদ করল। দাঁতালটার অতিকায় দেহ গড়িয়ে পড়ল বিস্তীর্ণ প্রান্তরের বুকে।
দুই শিকারি পরীক্ষা করে দেখলেন যে মাত্র আধ-ইঞ্চির জন্য রবিনসনের গুলি হাতির মর্মস্থল ভেদ করতে অসমর্থ হয়। আর সেই বুলেট ছিল .৩০৩ বোরের। অর্থাৎ, নিজের কথার খেলাপ করেননি রবিনসন!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন