নির্বেদ রায়

'নীল পাহাড়!'
'ব্লু মাউন্টেন!'
আমেরিকা যুক্তরাজ্যের এই ব্লু মাউন্টেনের পেটের মধ্যে রয়েছে মন্টানা প্রদেশের সবচেয়ে বড় তামার খনি। আমাদের কাহিনি গড়ে উঠেছে আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ওই নীল পাহাড়ের খনির মধ্যে। সৃষ্টিছাড়া এই অদ্ভুত কাহিনির বিবরণ আমরা পাই এক খনিশ্রমিকের কাছ থেকে যে কি না আগাগোড়া জড়িয়ে ছিল ওই ঘটনার সঙ্গে। শ্রমিকটির নাম এডওয়ার্ড কেনেডি।
বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। ভয়ংকর এক অগ্নিকাণ্ডের কবলে পড়ে আশেপাশের আরো দু-চারটে খনির সঙ্গে এই খনিটাও একসময় খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো একজন শ্রমিকের হাতে-ধরা জ্বলন্ত মশালের আগুন অসাবধানে খনির ভিতরে স্তূপ করে রাখা কাঠের তক্তা, পরিত্যক্ত ধাতুমল আর দড়াদড়িতে লেগে গিয়েই ওই বিরাট আগুনের সৃষ্টি। সতর্ক হওয়ার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে অনেকটা এলাকা জুড়ে এবং অনেককষ্টে শেষ পর্যন্ত সেটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ক্ষতি হয়েছিল প্রচুর। তার জন্য বেশ কিছুদিন খনির কাজও বন্ধ রাখতে হয়েছিল। খনির আর নীচের দিকের সুড়ঙ্গগুলো এমন গরম হয়ে উঠেছিল তখন, যে সেই উত্তাপে মানুষের পক্ষে কাজ করা অসম্ভব। এমনকী বেশ কয়েকমাস বাদে কাজ পুরোদমে শুরু হওয়ার পরেও কয়েকটা সুড়ঙ্গে গরমের জন্য ঢোকাই যেত না।
অগ্নিকাণ্ডের পর খনির নিরাপত্তা-ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হল বটে কিন্তু আলোর অসুবিধা থেকেই গেল। খনির ভিতরে তখন বিজলী বাতির ব্যবস্থা ছিল না, জ্বলতো মোমবাতি। ধাতুর আকর স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যানবাহনের ব্যবস্থাটাও ছিল সাবেকি ধরনের—ঘোড়া আর খচ্চরে টানা ইস্পাতে তৈরি গাড়ি ব্যবহার করা হত সেজন্য। খনির ভিতরেই ছিল আস্তাবল, জন্তুগুলোর থাকা-খাওয়ার পাকাপাকি বন্দোবস্ত।
আমাদের এই কাহিনির নায়ক বব-ও ওই আস্তাবলেই থাকত। ববের ঘোড়ার কৌলিন্য ছিল না, সে ছিল নেহাতই ছোটখাটো একটা খচ্চর। আর পাঁচটা জানোয়ারের মতো সেও ছিল বেশ শান্তশিষ্ট। দানাপানি খাওয়ার সময় বা প্রয়োজনমতো রক্ষকের হুকুম তামিল করার ব্যাপারে কখনোই কোনো বেয়াদবি করতে তাকে দেখা যায়নি—তার রক্ষক স্যাম বার্টল-এরও কোনো অভিযোগ ছিল না তাকে নিয়ে এত দিন। অথচ সেই ছোটখাটো নিরীহ খচ্চরটাই একদিন হয়ে উঠল নীল পাহাড়ের আতঙ্ক। খনির কাজ পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছিল তার অত্যাচারে, ভয়ে তটস্থ হয়ে। শান্ত জানোয়ার হয়ে উঠেছিল উন্মত্ত নরঘাতক!
আশ্চর্য সেই ঘটনা শোনার আগে খচ্চরটা হঠাৎ কেন উন্মত্ত হয়ে উঠল সে সম্পর্কে দুয়েকটা কথা জানা দরকার—
যারা নিজের চোখে ঘটনা দেখেছে তাদের কারোর কারোর মতে খচ্চরটার পাগল হওয়ার কারণ খনির নীচের প্রচণ্ড উত্তাপ। কথাটা যুক্তিছাড়া নয় কারণ, খনির একেবারে নীচের স্তরে অর্থাৎ প্রায় ১৬০০ থেকে ১৮০০ ফুট তলায় সুড়ঙ্গে যে ভীষণ গরম আবহাওয়া, সেখানে সারাক্ষণ মাল বইলে মাথার গোলমাল হওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। এডওয়ার্ড কেনেডি আর তাঁর কয়েকজন সঙ্গীর মত অবশ্য আলাদা। তাঁরা বলেছে, খনির নীচে ডিনামাইট ফাটানোর সময় খুব কাছাকাছি থাকার ফলে প্রচণ্ড শব্দের ধাক্কাতেই ববের মগজ বিকৃত হয়েছিল। আমাদের কাছে দুটো মতেরই গুরুত্ব সমান, সুতরাং কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সে বিচারে না গিয়ে এবার মূল কাহিনিটাই বরং শোনা যেতে পারে।
১৯১৫ সাল—
খনির প্রায় ১৮০০ ফুট নীচে সেদিন একটা সুড়ঙ্গে ছোটখাটো বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তার আগে জন্তুগুলোকে কাছাকাছি অঞ্চল থেকে সরিয়ে আনবার সময়েই ববের আচার-আচরণের মধ্যে বেশ অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। স্যাম বার্টল গিয়ে দেখে যে খচ্চরটা একটা থামের আড়ালে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ইস্পাতের গাড়িটা পড়ে আছে আর এক দিকে। যে দড়িটা দিয়ে জন্তুটাকে গাড়িতে জোতা হয়েছিল সেটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে কামড়ে। স্যাম কাছাকাছি যেতে নাকের পাটা ফুলিয়ে আর মাটিতে পা ঠুকে বিরক্তি দেখিয়েছিল বব। তবে সেদিন বেশিক্ষণ ভুগতে হয়নি; গাড়ির সঙ্গে বব-কে আবার জুতে দিয়েছিল স্যাম। সেই শুরু।
বাকি ঘটনা এবার এডওয়ার্ড কেনেডির মুখ থেকে শোনা যাক—
''সেই রাতটার কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি। নীল পাহাড়ের উপর অন্ধকার নেমে এসেছে। এখানে-ওখানে দুয়েকটা যন্ত্রপাতির আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আমার কাজ সেদিন খনির নীচে। যথারীতি বেল্ট বেঁধে মোমবাতি আর টিফিন কেরিয়ার সঙ্গে নিয়ে কাজে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নিয়েছি। ১৮০০ ফুট নীচে যাদের কাজ, তারা প্রথমে নেমে গেল। স্যামকে দেখছি না। ও বোধহয় আস্তাবলের কাজে আগেই নীচে চলে গেছে। আমরা তিন-চারজন উঠে পড়লাম। বেশি নীচের স্তরে আজ আমাদের কাজ নেই। কাজেই আস্তে আস্তে হাঁটছি। মোমবাতি জ্বালিয়ে সুড়ঙ্গের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে সবে একটা বাঁক পেরিয়েছি, হঠাৎ দেখি স্যাম বার্টল ছুটে আসছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। ভয়ে মুখ কাগজের মতো সাদা, চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে। আমাদের সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল স্যাম। মুখে কথা জোগাচ্ছে না আতঙ্কে।
মিনিট দুই বাদে কথা বলল সে, 'বব! খচ্চরটা! ওটাকে শয়তানে ভর করেছে! আমাকে তাড়া করেছিল, কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছি!' একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল স্যাম, তারপর খানিকটা দম নিয়ে ঘটনার যে বিবরণ দিল তা ভয়ানক—
অন্য দিনের মতো আজকেও আস্তাবলের কাজে নেমে জন্তুগুলোর তদারক করতে গিয়ে তার খেয়াল হয় ববকে পাওয়া যাচ্ছে না; তার দড়িটাও ছেঁড়া। আশেপাশে কোথাও আছে, এই ভেবে খানিকটা খোঁজাখুঁজি করে যখন পাওয়া গেল না, তখন স্যাম পশ্চিমের সুড়ঙ্গে নেমে যায়। পশ্চিম সুড়ঙ্গের খানিকটা গিয়েই উত্তপ্ত 'হট বক্স মাইন'; ভীষণ গরম। ওই উত্তাপে কোনো জন্তুর পক্ষে সেখানে ঘোরাফেরা করা একরকম অসম্ভব বললেই হয়, তাই খানিকটা খোঁজাখুঁজি করেই স্যাম ফিরে আসছিল, এমন সময় একটা তীব্র চিৎকার তার কানে আসে। খচ্চরের ডাক চিনতে তাঁর ভুল হয়নি, কিন্তু চিৎকারটা কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকে তাঁর কাছে। ডাকটা আসছে ওই উত্তপ্ত অঞ্চল থেকে। মনে মনে অবাক হয়েই স্যাম এগিয়ে যায় বটে সেদিকে, কিন্তু একটু গিয়ে তাঁকে থমকে দাঁড়াতে হয়—সুড়ঙ্গের আবছা-আলো আবছা-অন্ধকারের মাঝখানে উন্মত্ত খচ্চরের চেহারাটা চোখে পড়তেই সে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়।
জন্তুটা আবার একটা ভয়ংকর চিৎকার করে ওঠে, তারপর আক্রমণ করতে ছুটে আসে স্যামকে। সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে দৌড় মারা অসম্ভব। নেহাত ভাগ্য ভালো, সামনে ছিল একটা মই। পড়ি-কি-মরি করে কোনোমতে সেটায় চড়ে উপরের স্তরে উঠে যায় স্যাম। সঙ্গে-সঙ্গে জন্তুটার কামড়ে আর খুরের আঘাতে মইটা ভেঙে পড়ে টুকরো-টুকরো হয়ে। আর একমুহূর্ত দেরি হলে রক্ষা ছিল না।
পালাতে গিয়ে স্যামের হাত থেকে বাতিটা পড়ে নিভে গিয়েছিল; পকেট হাতড়ে দেশলাই খুঁজে তাই জ্বালিয়ে শেষ পর্যন্ত পথ দেখে এখানে এসে পৌঁছেচে সে।
এর মধ্যে দশ-বারোজন শ্রমিক এসে গিয়েছিল। স্যামের কথা শেষ হতে তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যাপারটাকে বেশ মজার রসিকতা মনে করে হেসে উড়িয়ে দিল বটে, কিন্তু আমরা কয়েকজন অত সহজে ওড়াতে পারলাম না।
কয়েকটা স্তর নেমে এসে স্যামের কথামতো ভাঙা মইটা চোখে পড়ল। টুকরো-টুকরো হয়ে পড়ে আছে সেটা। মুখে কিছু না বললেও মনে মনে সর্তক হলাম সবাই।
সামনের দিকে কয়েক পা কেবল এগিয়েছি, হঠাৎ খনির ভেতর জেগে উঠল রক্তজলকরা চিৎকার। চিৎকারের উৎস চোখে না দেখলেও অজানা এক ভয়ে আমার শরীর বেয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল, গায়ে কাঁটা ফুটে উঠল। শুধু আমার একার নয়, তাকিয়ে দেখি সবার চোখেমুখেই ভয়ের ছায়া। এমন বীভৎস চিৎকার কোনো খচ্চরের হতে পারে ভাবা যায় না।
মনে জোর এনে মোমবাতিগুলো উঁচু করে ধরে সবাই মিলে আস্তে আস্তে আবার এগোলাম। সামনে 'হট বক্স মাইন', এখান থেকেই সমস্ত গা যেন ঝলসে দিয়ে যাচ্ছে। জন্তুটাকে এখানেই প্রথম দেখেছিল স্যাম।
'এটা কি হচ্ছে জানতে পারি?' হঠাৎ পিছন থেকে একটা রূঢ় গলা পেয়ে চমকে উঠলাম সবাই। চেয়ে দেখি এডরিক।
এড আমাদের 'শিফট বস'—শ্রমিকরা ঠিক মতো কাজ করছে কিনা, তার উপর, দেখাশোনার ভার। বলিষ্ঠ চেহারা, ভারীগোছের একটা ব্যক্তিত্বও আছে তার, কিন্তু স্বভাবটা বড় রূঢ়, কথাবার্তাও সেইরকম। কখন যে আমাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি; তাই প্রথমে হকচকিয়ে গেছিলাম।
'কাজে ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়াবার জায়গা নয় এটা, বুঝলে,' এডের গলায় স্পষ্ট বিরক্তি। আমরা সবাই মিলে তখন ওকে ববের ঘটনাটা খুলে বললাম, সবার আগে স্যাম।
কিন্তু এড আমাদের কথা বিশ্বাস করল না, উলটে স্যামকে বেশ কড়া গলায় দু-কথা শুনিয়ে দিল, 'দেখ ওসব বুজরুকি ছাড়। যদি তুমি খচ্চরটার দেখাশোনা না করতে পারো, তবে সে দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া হবে। কিন্তু গল্প ফেঁদে কাজে ফাঁকি মারা চলবে না, বুঝলে।'
স্যাম বেচারি চুপ করে রইল। আমরাও মুখ বুজে চলে এলাম।
ব্যাপারটা কিন্তু চাপা রইল না। ববের খবর ছড়িয়ে পড়ল গোটা খনি এলাকা জুড়ে।
পরের দিন রাতে গিয়ে শুনি, সকালের শিফটে যারা ১৮০০ ফুটের সুড়ঙ্গে কাজ করতে গিয়েছিল, খচ্চরটার আক্রমণে নাজেহাল হয়ে তারা পালিয়ে এসেছে, গোটা শিফটে কোনো কাজ হয়নি। শ্রমিকদের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট, চাপা গলায় ফিসফিসানি চলছে, নীচে নামতে কারোর ভরসা নেই।
খানিকক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হল এড। আজ সকালের ঘটনা ওকে বেশ বিচলিত করেছে বলেই মনে হল। সে এসে প্রথমে আজকের ব্যাপারটার আদ্যোপান্ত বিবরণ দিয়ে গেল। তারপর বলল, 'আমি ভাবছি দরকার পড়লে খচ্চরটাকে মেরে দিতে হবে। এখন তোমাদের মধ্যে যদি কারোর ইচ্ছা থাকে তো আমার সঙ্গে আসতে পারো।'
আগে খেয়াল করিনি, কিন্তু এখন লক্ষ্য করলাম এড একেবারে রণসাজে সেজে এসেছে। ডান হাতে একটা ভারী গাঁইতি আর বাঁ-হাতে ঝুলছে একগাছা দড়ির ফাঁস। সবাই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, 'আমরা যেতে পারি।'
অর্থাৎ, একা কেউ মৃত্যুপুরীর সুড়ঙ্গে নামতে রাজি নয়।
এড সব দেখেশুনে আর আপত্তি করল না।
মিনিট পনেরো বাদে আমরা পৌঁছলাম ১৮০০ ফুটের স্তরে। সামনেই 'হট বক্স মাইন'-এর সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ ধরে খানিকটা এগিয়ে যেতেই সেই বাঁকটা পড়ল, যেখান থেকে জন্তুটা এর আগে দু-দুবার আত্মপ্রকাশ করেছে।
বাঁকের মুখে এসে গোটা দলটা যেন কলের পুতুলের মতো হঠাৎ থেমে গেল। যেন একটা অজানা ভয় পায়ে বেড়ি এঁটে দিয়েছে সবার। এড ছিল সামনে। তাঁকে দেখে কিন্তু ভয় পেয়েছে বলে মনে হল না। প্রায় নিঃশব্দে সে বাঁকের মুখ ধরে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ এডের মশালের আলোয় খানিক দূরে একটা কিছু নড়ে-চড়ে উঠল। আমরা দেখলাম, অন্ধকারের মধ্যে থেকে আর একটা জমাট-বাঁধা অন্ধকার যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠছে। শিকারি বেড়ালের মতো নিঃশব্দে জন্তুটা কখন যে এত কাছে এসে পড়েছে কেউই বুঝতে পারিনি। ভয়ে আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
তৈরি হওয়ার সুযোগ পেলাম না, তার আগেই জন্তুটা আক্রমণ করল; শুধু লক্ষ্য করলাম একইসঙ্গে মশালের আলোয় ঝলসে উঠতে এডের গাঁইতিটাকে।
কিন্তু গাঁইতি খচ্চরের নাগাল পেল না, বরং পরমুহূর্তে উদ্যত খুরের আঘাতে ছিটকে পড়ল এডরিক। হাতে ধরা মশালটা এক দিকে ছিটকে পড়ে নিভে গেল।
তারপরই সুড়ঙ্গের বাঁক থেকে ভেসে এল এলোপাথারি খুরের শব্দ আর এডরিকের আর্তনাদ।
আমরা তখন মরিয়া। এডরিকের আর্তনাদ লক্ষ্য করে ছুটে গেলাম সামনের দিকে। কয়েকটা মশালের আলোয় খনিগহ্বর আলোকিত হয়ে উঠতে দেখলাম, একটু দূরেই পড়ে আছে এডের রক্তাক্ত দেহ আর শয়তান জানোয়ারটা পাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। দুটো চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে।

দল বেঁধে ছুটে গেলাম আমরা। ভেবেছিলাম, এতজনে মিলে জানোয়ারটাকে কাবু করতে পারব, কিন্তু তখন শয়তান ভর করেছে তার উপর। সঙ্গে সঙ্গে সেটা ছুটে এল আমাদের দিকে। খুরের বিষাক্ত ছোবলে কয়েকজন শ্রমিক ছিটকে পড়ল আহত হয়ে। তারপর আমাদের চোখের সামনে আবার ফিরে গিয়ে এডের আধমরা দেহটাকে খুর আর দাঁত দিয়ে ছিন্নভিন্ন করতে লাগল জন্তুটা।
বীভৎস দৃশ্য!
তিনজন আহত সঙ্গীকে নিয়ে পিছু হটে এলাম। কয়েকজন ছুটে উপরে গেল বন্দুক নিয়ে আসতে। আহত তিন সঙ্গীর মধ্যে দুজনের জ্ঞান নেই, তৃতীয়জনের কব্জির হাড় ভেঙেছে।
এর মধ্যে প্রায় একশো গজ দূর থেকে মাঝে-মাঝে ভেসে আসছে এডরিকের গোঙানি আর খচ্চরটার চিৎকার। গোঙানি ধীরে-ধীরে কমে এল, শেষে একসময় হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। বুঝলাম, বেচারি এডের জীবনদীপটুকু ক্ষীণ হতে হতে নিভে গেল।
খানিকক্ষণ বাদে কয়েকজন শ্রমিক রাইফেল নিয়ে ফিরে এল। সঙ্গে একটা পিস্তলও নিয়ে এসেছে একজন। মশালের আলোয় পথ দেখে এবার এগোলাম আমরা। কিন্তু জন্তুটা কই? শুধু এডের মৃতদেহ পড়ে আছে। কাজ শেষ করে হিংস্র শ্বাপদের মতোই গা-ঢাকা দিয়েছে জন্তুটা।
তবে পালিয়ে সে যাবে কোথায়? সুড়ঙ্গপথ সোজা চলে গেছে উত্তপ্ত খনির গর্ভে। কিছুদূর এগিয়ে কিন্তু অবাক হলাম আমরা। প্রচণ্ড উত্তাপে সারা শরীর ঝলসে যাচ্ছে আমাদের, আর এগোনো অসম্ভব। তবু সেখান থেকে মশালের আলোয় যতখানি দেখা যায় তার আওতায় খচ্চরটার কোনো চিহ্ন নেই। আরও ভিতরে কোনো ঘোড়া বা খচ্চরের পক্ষে টিঁকে থাকার কথাই ওঠে না। এটা কোনো সৃষ্টিছাড়া জানোয়ার?
বাধ্য হয়ে ফিরতে হল উপরে। সঙ্গে বয়ে আনা হল এডরিকের মৃতদেহ; দেখামাত্রই শ্রমিকদের মধ্যে প্রচণ্ড চাঞ্চল্য উঠল, ভূগর্ভে কাজে নামতে আর কেউই রাজি নয়।''
এডওয়ার্ডের বিবরণ এতক্ষণ আমরা শুনলাম। এবার দেখা যাক, কী ঘটল তারপর।
খনির পরিচালকরা স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে উঠল। স্থানীয় নিরাপত্তা শিবিরের দুজন শ্রেষ্ঠ বন্দুকবাজকে তারা নিযুক্ত করল জন্তুটাকে মারার জন্য।
নীল পাহাড়ের গর্ভে শুরু হল দ্বিতীয় অভিযান।
কয়েকজন সাহসী শ্রমিককে সঙ্গে করে দুই বন্দুকধারী নামল খনির নীচে। ১৮০০ ফুটের স্তরে এসে যখন তারা পৌঁছল তখনো গত যুদ্ধের চিহ্ন পথের মাঝে-মাঝে রয়ে গেছে। ছোটবড় রক্তের ছাপ।
উত্তপ্ত অঞ্চলের দুশো গজ দূরে এসে দলটা দাঁড়াল। বন্দুক দুটো আর একবার ভালো করে দেখে নিয়ে শিকারি দুজন সাবধানে এগোল সামনের দিকে।
উত্তাপ সবে প্রখর হতে শুরু করেছে, হঠাৎ সামনের আলো-আঁধারির মাঝে একটা জীবন্ত দেহ দুলে উঠল। মাঝখানে হিংস্র দুটো লাল চোখ!
সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল রাইফেল। তীক্ষ্ন একটা জান্তব চিৎকার জেগে উঠল খনিগুহা কাঁপিয়ে, তারপরই বন্দুকের আওয়াজ আর আগুনের ঝলক উপেক্ষা করে জন্তুটা ঝাঁপিয়ে পড়ল গোটা দলটার উপর। খুরের আঘাতে ছিটকে পড়ল কয়েকজন। ছিটকে পড়ল মশালগুলো।
আক্রমণের প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠার পর জ্বলে-থাকা একটামাত্র মশালের ক্ষীণ আলোয় দেখা গেল খচ্চরটা অদৃশ্য হয়েছে। রক্তের একটা সরু রেখা সুড়ঙ্গপথ ধরে অদৃশ্য হয়েছে 'হট বক্স মাইনের' দিকে। জন্তুটা আহত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মারাত্মকভাবে নয়।
দলটা ফিরে এল। সঙ্গে নিয়ে এল আহত কিছু মানুষ আর আতঙ্কের স্মৃতি।
পরপর দুটো অভিযান এভাবে ব্যর্থ হওয়ায় মুষড়ে পড়ল তামার খনির কর্তৃপক্ষ।
তাহলে কী উপায় হবে এই বিরাট লোকসানের? শুধু একটা খচ্চরের জন্য কাজ বন্ধ করে দিনের পর দিন গুনতে হবে হাজার হাজার ডলারের ক্ষতি?
ভাবতে ভাবতে যখন তাদের মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা, তখনই এক প্রস্তাব নিয়ে হাজির হল এডওয়ার্ড।—'হ্যাঁ, জন্তুটাকে মারা যেতে পারে বটে, কিন্তু তার জন্য ছত্রিশ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে খনির কাজ।'
'ছত্রিশ ঘণ্টা, মোটে?' হাতে যেন চাঁদ পেল কর্তৃপক্ষ। যেখানে কাজ একেবারেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম, সেখানে ছত্রিশ ঘণ্টা তো কিছু না।
—'হ্যাঁ, হ্যাঁ, থাকবে বন্ধ ছত্রিশ ঘণ্টা। মোটে তো দেড়টা দিন। কাজে হাত লাগাও এখুনি। আমরা রাজি।'
অনুমতি পেয়েই কাজ শুরু করে দিল এডওয়ার্ড।
প্রথমে সে জোগাড় করল খান-দুই বালকহেড। তারপর কয়েকজন শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে নেমে গেল খনিতে। এক একটা বালকহেড বসানো হল সুড়ঙ্গের এক এক মুখে। ফলে দু-মুখ আটকানো সুড়ঙ্গের ভিতরের প্রচণ্ড উত্তাপ আর আবদ্ধ বাতাসে আটকে গেল জানোয়ারটা।
এইবার আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসতে লাগল বালকহেড-এর মাঝের সীমানা। ছোট থেকে আরও ছোট জায়গার মধ্যে আটকে পড়তে লাগল জন্তুটা। তারপর একসময় সেই সচল পাঁচিলের গায়ে জেগে উঠল ভারী খুরের আওয়াজ। কিন্তু শক্ত পাঁচিল সে আঘাতে এতটুকু নড়ল না পর্যন্ত।
কেটে গেল পুরো দেড় দিন। ছত্রিশ ঘণ্টা। এবার সাবধানে পাঁচিল সরিয়ে ফেলতে দেখা গেল, পড়ে আছে খচ্চরটার মৃতদেহ। বদ্ধ বাতাস আর প্রচণ্ড গরমে নরক-যন্ত্রণা ভোগ করে মরেছে জন্তুটা।
খনির ভিতর থেকে উপরে নিয়ে আসা হল ববের মৃতদেহ। শ্রমিকদের উল্লাস তখন দেখবার মতো।
এডওর্য়াড পুরস্কৃত হয়েছিল ভালোমতোই।
এখন সে আর খনিশ্রমিক নয়, খনিপরিচালক।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন