'বেসার বুয়াইয়া!'

নির্বেদ রায়

মালয় দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত সেলানগর উপদ্বীপ। আর এই উপদ্বীপকে বেষ্টন করে চলে গিয়েছে বারজুনটাই নদী। অন্যান্য ঋতুতে ধীরে প্রবাহিনী স্রোতস্বিনী বলে মনে হলেও, বর্ষাকালে তরঙ্গ-ভয়াল খরস্রোতা এই নদীর ভিন্ন রূপ।

১৯২৭ সালের জুলাই মাসে, এই বারজুনটাই নদীর উপর একটি সেতু তৈরির কাজ চলছিল। কাঠের গুঁড়ির উপর সাময়িকভাবে সেতুটার প্রাথমিক কাঠামো স্থাপন করা ছিল। এই কাজে কয়েকজন অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং অভিজ্ঞ চিনা কুলি নিযুক্ত করা হয়েছিল, এবং সমস্ত সেতুটির তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিলেন দুই শ্বেতাঙ্গ কুশলী ইঞ্জিনিয়ার—এন্সান স্মিথ এবং জনৈক রুশ—'ডি'। কাহিনির বর্ণনা দিতে গিয়ে স্মিথ সাহেবও ওই রুশ ইঞ্জিনিয়ারের নাম গোপন করে গিয়েছেন, বিশেষ কোনো কারণে তাঁকে ওই 'ডি' নামেই অভিহিত করেছেন পুরো ঘটনায়। এই রুশ ইঞ্জিনিয়ারটি বহু দিন চিন দেশে বসবাস করেছিলেন, ফলে স্থানীয় চিনা কুলিদের দিয়ে তিনি খুব ভালোভাবে কাজ করিয়ে নিতে পারতেন এবং তাঁর নির্দেশমতোই তারা পরিচালিত হত। এন্সান স্মিথের তার ফলে বেশ খানিকটা সুবিধাই হয়েছিল। কিন্তু একটি ব্যাপারে মাঝে-মাঝেই কাজ ব্যাহত হত। আর সেটি হল চিনা কুলিদের অহিফেনের প্রতি প্রবল আসক্তি। আফিমের ধূম্পান, অর্থাৎ চলতি কথায় যাকে 'চণ্ডু' বলা যেতে পারে, স্থানীয় চৈনিক শ্রমিকরা সেই কড়া নেশা গ্রহণ করতে অভ্যস্ত ছিল। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষকে দিয়ে তো আর কাজ হয় না, সুতরাং বাধ্য হয়েই দুই শ্বেতাঙ্গকে সেতুর কাজ বন্ধ করতে হত। মাঝে-মাঝেই হয় স্মিথ সাহেব, নয় ওই 'ডি' নামক ভদ্রলোক কুলিদের আস্তানায় হানা দিতেন এবং আফিম পেলেই তা বাজেয়াপ্ত করতেন—কারণ, তাঁদের ধারণা ছিল যে গরিব কুলিদের কাছ থেকে নেশার ওই পদার্থটিকে বাজেয়াপ্ত করতে পারলে পয়সার অভাবে তাদের পক্ষে বারবার কিনে নেশা করা সম্ভব হবে না, ফলে কাজের মধ্যে এই মন্থরতার ভাব স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। দুই শ্বেতাঙ্গের ধারণা ভুল নয়। ক্রমান্বয়ে কয়েকদিন কুলিবস্তিতে হানা দেবার পর যদিও কুলিরা সতর্ক হয়ে গেল, কিন্তু নেশার ব্যাপকতাও হ্রাস পেল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে—কাজও আশানুরূপ ভাবে চলতে লাগল।

বারজুনটাই নদীগর্ভে সে দিন একটা বড় খুঁটি স্থাপন করার কাজ চলছিল। দুই শ্বেতাঙ্গই কাজের তত্ত্বাবধান করছিলেন। অকস্মাৎ 'ডি' নামধারী রুশটির চোখে পড়ল দূরে নদীবক্ষে ভাসমান তিনটি সচল গোলাকৃতি বস্তুর উপর। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেই দিকে স্মিথ সাহেবের মনোযোগ আকর্ষণ করলেন। ততক্ষণে, ধীরে-ধীরে নদীর উপর ভেসে উঠেছে সরীসৃপের অতিকায় দেহ। প্রথমটায় জলের উপর দৃশ্যমান তার দুটো চোখ আর নাকের সম্মুখভাগই চোখের পড়েছিল রুশ ইঞ্জিনিয়ারের। এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো যে, বারজুনটাই নদীতে কুমির কোনো নতুন বাসিন্দা নয়, মালয়ের বহু নদীর মতো এখানেও মাঝে মাঝে ওই অনড়-দৃষ্টি অতিকায় সরীসৃপের দেখা মেলে। সুতরাং, কুমির দেখে আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা কিছু ঘটেনি, কিন্তু নদীর উপর যে মুহূর্তে সম্পূর্ণ দেহটা ভেসে উঠল, স্তম্ভিত বিস্ময়ে দুই শ্বেতাঙ্গ তাকিয়ে রইলেন সেই দিকে। স্মিথের মুখ থেকে নিজের অজ্ঞাতসারেই বেরিয়ে এল দুটি স্থানীয় শব্দ—'বেসার বুয়াইয়া', যার অর্থ দানব-কুমির।

—'সত্যিই বিরাট কুমির ওটা!' 'ডি' সম্মতি জানালেন সঙ্গীর কথায়।

—'কখনো শিকার করতে চেষ্টা করেছ?' প্রশ্ন করলেন স্মিথ, তাঁর চোখ দূরে নদীবক্ষে ভাসমান বিরাট সরীসৃপটার উপর নিবদ্ধ।

—'ওটা অসাধারণ ধূর্ত—বুনো মোষের মতো', দৃশ্যমান প্রাণীটি সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন করলেন 'ডি'। 'তবে আজ সূর্যাস্তের আগে আলো থাকতে থাকতে একটা চেষ্টা করলে হয়।'

সঙ্গীর প্রস্তাব মন্দ ঠেকল না এন্সান স্মিথের। ফলে একটু পরেই দুই ইঞ্জিনিয়ার নদীর পাড় দিয়ে সতর্ক পায়ে এগিয়ে চললেন সেই দিকে, যেখানে আস্তানা গেড়েছে বিশাল সরীসৃপটা। খানিকটা পথ অতিক্রম করার পর পাতার ফাঁক দিয়ে নজরে পড়ল, প্রায় শ-দুই গজ দূরে নদীর তীরবর্তী জমির উপর বিশ্রামরত কুমিরের দেহ। তার বিরাট চাবুকের মতো লেজ ধীরে ধীরে আন্দোলিত হয়ে মাঝে-মাঝে আছড়ে পড়ছে মাটির উপর। নদীর পাড়ে কালো মাটির সঙ্গে মিশে গেছে তার চামড়ার রং। অগ্রবর্তী 'ডি'-এর নির্দেশে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে এগোলেন স্মিথ। কুমির এবং দুই শ্বেতাঙ্গ শিকারির মাঝে নদীর একটা বাঁক। অতি সাবধানে নিঃশব্দে সেই বাঁকটা অতিক্রম করলেন দুই জনে।

'প্লপ!'

মুখ তুললেন দুজনেই। কিছুদূরে ধীরে-ধীরে জলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে জলবাসী দানবের দেহ। শিকার হাতছাড়া হতে দেখে আড়াল ছেড়ে দুই শিকারি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যখন নদীর তীরে গন্তব্যস্থলে এসে পৌঁছলেন তখন জলের মধ্যে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়েছে 'বেসার বুয়াইয়া'। নদীর তীরে ওই জায়গায় কতকগুলো বড় বড় গাছ ঝুঁকে পড়েছে জলের উপর। ভালোভাবে সমস্ত জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করে দুই 'শিকারি' যখন নিরাশ হয়ে ফিরে চলেছেন, বারজুনটাই-এর জলে তখন অস্তমিত সূর্যের শেষ আভা লাল আবির ছড়িয়ে দিয়েছে।

এত সহজে হাল ছাড়লে চলে না। তাই ওইদিন রাত্রেই 'সাম্পানে' চড়ে দুই শ্বেতাঙ্গ শিকারি বের হলেন কুমিরের খোঁজে। সঙ্গে নিলেন উচ্চশক্তির টর্চলাইট এবং রাইফেল। 'সাম্পান' মালয়ে প্রচলিত এক ধরনের মজবুত নৌকা। তাতে চড়েই নদীবক্ষে দুই তত্ত্বাবধায়ক বেরিয়ে পড়লেন কুমির-সন্ধানে।

টর্চের আলোর রেখা প্রথম কুমিরটাকে আবিষ্কার করল সেতুর সাময়িক কাঠামোর ঠিক নীচে। কিন্তু না, সেটা তাঁদের অভিপ্রেত কুমির নয়। অনাবশ্যক কুমির শিকার করতে শিকারিদের আদৌ কোনো আগ্রহ ছিল না। সুতরাং, সাম্পান এগিয়ে চলল। এরপর মাঝে-মাঝেই টর্চের আলোতে ধরা পড়ছিল জোড়ায়-জোড়ায় অনড় রক্তচক্ষু, কিন্তু আসলটার খোঁজ মিলল না। সারা রাত ধরে অনুসন্ধান-পর্ব চালিয়ে প্রত্যুষে যখন তাঁরা ফিরলেন, তখন তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে একদল চিনা ও স্থানীয় কুলি। তাদের বক্তব্য অতি সহজ এবং সরল।

তাদের মতে, 'তুয়ান বেসার' অর্থাৎ স্মিথ সাহেব এবং 'তুয়ান কিচি', অর্থাৎ 'ডি' নামক রুশ ব্যক্তি যে কুমিরটাকে শিকার করবার চেষ্টা করছেন সেটি আদৌ কোনো সাধারণ কুমির নয়—ওটা আসলে নদীর দেবতারই সরীসৃপ রূপ। এর আগেও অনেক শিকারি ওই বিশেষ কুমিরটাকে মারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং, তারা যখন জানতেই পেরেছে, তখন তাদের অনুরোধ যে দুই 'তুয়ান' যেন আর ওই চেষ্টা না করেন।

কিন্তু এরপরেও যখন 'তুয়ান'-দের মধ্যে ভাবান্তর এল না, উপরন্তু 'টোপ' হিসাবে ব্যবহার করার জন্য তাঁরা যখন ওই কুলিদের কাছেই একটা জ্যান্ত কুকুর তাঁদের জোগাড় করে দিতে বললেন, তখন তারা 'তুয়ান'-দের অনুরোধ রাখল বটে কিন্তু বিশেষ খুশি হয়েছে বলে মনে হল না।

পরবর্তী অভিযানে দুই ইঞ্জিনিয়ার সাম্পানে চড়ে যেখানে এসে নামলেন কুমিরটা সেই জায়গায় দুপুরবেলা বিশ্রামসুখ উপভোগ করত। সঙ্গে যে কুকুরটাকে তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন সেই হতভাগ্য জন্তুটাকে সুবিধামতো একটা জায়গায় বেঁধে রেখে দুই শিকারি রাইফেল হাতে আড়াল থেকে প্রস্তুত হয়ে রইলেন।

বেলা বাড়তে লাগল। জুলাই-এর গনগনে সূর্য যখন মধ্য আকাশে আগুন ছড়িয়ে পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ল, স্মিথ সাহেবের ঘড়িতে তখন বেলা দুটো। কিন্তু তখনও, কুমির তো দূরের কথা তার লেজের ডগাটুকুও চোখে পড়ল না। শিকারিরা উভয়েই তাঁদের ধৈর্যের শেষসীমায় এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় নদীর অপর পাড়ে জলের উপর ভেসে উঠল তিনটি কালো গোলাকৃতি পদার্থ। একবার দেখেই সিদ্ধান্তে এসে গেলেন এন্সান স্মিথ—কোনো ভুল নেই, 'বেসার বুয়াইয়া'-ই গা ভাসিয়েছে নদীর জলে। উভয় শিকারি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন অতিকায় জলবাসী দানবের জন্য। প্রায় মিনিট পাঁচেক জলের উপর স্থির হয়ে রইল তিনটি বিন্দু—একাগ্র দৃষ্টিতে কুমির তাকিয়ে আছে কুকুরটার দিকে। তারপর হঠাৎ পুনরায় অদৃশ্য হল জলের তলায়। আর তাকে দেখা গেল না। বহুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে উঠে পড়লেন দুই শিকারি। ইঙ্গিতে দূরে অপেক্ষমান সাম্পান-চালককে নৌকা কাছে আনতে বললেন, তারপর কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গেলেন তাঁদের আস্তানায়। অফিসে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাল সহাস্যবদন একদল কুলি। তাদের হাবভাবে বোঝা গেল যে 'তুয়ান'-দের বিফলতা তাদের মোটেই বিস্মিত করেনি। বরং এটাই স্বাভাবিক তারা ধরে নিয়েছিল।

মধ্যাহ্নভোজ সমাধা করতে করতে দুই শিকারি সিদ্ধান্তে এলেন যে, কুকুরের টোপ দিয়ে সরীসৃপটাকে সম্ভবত প্রলুব্ধ করা সম্ভব হবে না। সুতরাং কুকুরটা কুলিদের ফিরিয়ে দিয়ে নতুন কোনো ফাঁদের বা কৌশলের আশ্রয় নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে তাঁদের মনে হল।

পরের সপ্তাহে শনিবার। এক নতুন পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে দুই সঙ্গী কুমিরটার আস্তানায় হানা দিলেন। নদীর পাড়ে নেমে, প্রথমে বর্শার ফলার মতো দু-মুখো ছুঁচোলো এবং আড়াই ফুট আন্দাজ লম্বা শক্ত গাছের ডালের সঙ্গে তাঁরা একটা লোহার তার বাঁধলেন। তারপর এক খণ্ড ছাগলের মাংসের মধ্যে ডালটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে পুরো বস্তুটাকে জলের নীচে প্রায় দু-হাত মতো ডুবিয়ে দেওয়া হল। তারের অপর প্রান্ত বাঁধা হল নদীর পাড়ে জলের উপর ঝুঁকে পড়া একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে। সমস্ত ব্যাপারটা দাঁড়াল টোপ-সংলগ্ন একটা বিরাট বঁড়শির মতো। অর্থাৎ, মাংসের খণ্ডটা উদরস্থ করতে গেলেই কুমিরের গলায় দু-মুখো ছুঁচলো গাছের ডালটা আটকে যাবে এবং তখন সরীসৃপটাকে গুলি করার যথেষ্ট সময় পাবেন শিকারিরা। উভয়েই আড়াল থেকে অপেক্ষা করতে লাগলেন কুমিরের জন্য, কিন্তু জুলাই মাসের প্রখর রৌদ্র যখন পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্তের স্নিগ্ধ কতকগুলো লাল রশ্মিতে পরিণত হল, তখনও কুমিরটার দেখা মিলল না।

অল্প সময়ের মধ্যেই অফিস থেকে বিকালের জলখাবারের পর্ব সেরে আবার শিকারিরা ফিরে এলেন পূর্বের স্থানে। কিন্তু গন্তব্যস্থলে পৌঁছে সর্বপ্রথম যে জিনিসটা তাঁরা আবিষ্কার করলেন সেটি হল নদীবক্ষে ভাসমান টোপহীন বঁড়শি। তাঁদের এই স্বল্প সময়ের অনুপস্থিতির সুযোগেই ঘটনাটা ঘটে গেছে। সামান্য পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে স্মিথ সিদ্ধান্তে এলেন যে কাজটা স্থানীয় কুলিদের ছাড়া আর কারও নয়। আজ রাতের ভোজটা তাদের বেশ ভালোই জমবে। 'ডি'-এর সন্দেহ কিন্তু অন্য—তাঁর ধারণা ধূর্ত কুমিরটাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু সঙ্গীর এই সিদ্ধান্ত অমূলক বলে স্মিথ যখন উড়িয়ে দিলেন, রুশ ব্যক্তিটি তখন অন্য প্রমাণের ব্যবস্থা করলেন।

আশেপাশের গাছগুলোর উপরে অনেক বানর অবস্থান করছিল, তারই একটাকে গুলি করে মেরে পুনরায় টোপের জায়গায় রেখে শিকারিরা স্থানত্যাগ করলেন। কিছু পরে ফিরে আসতেই দেখা গেল পূর্ব ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার স্মিথেরও আর সন্দেহ রইল না। বানরের মাংস আহারে কুলিরা অভ্যস্ত নয়, সুতরাং এ কাজ নিঃসন্দেহে কুমিরটার।

এই শিকার অভিযানের দিন কয়েক পরে, রুশ ইঞ্জিনিয়ারটির উপর কাজকর্ম তত্ত্বাবধানের সমস্ত ভার দিয়ে স্মিথ সাহেব জরুরি প্রয়োজনে কুয়ালালামপুরের হেড অফিসে চলে গেলেন। কয়েক দিনের মধ্যে কাজের চাপে কুমিরের ঘটনা তাঁর আর মনে রইল না। এরমধ্যে একদিন 'ডি' এসে জানালেন যে, বর্ষায় বারজুনটাই নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে, এবং তাঁর আশঙ্কা সেতুর সাময়িক কাঠামো নদীর ওই তীব্র স্রোত সামলাতে না পেরে যে কোনো সময়ে ভেঙে পড়তে পারে। কথাটায় স্মিথ সাহেব বিশেষ কোনো আমল দিলেন না, কারণ তাঁর ধারণামতো বড় কোনো ভূমিকম্পের সৃষ্টি না হলে ওই কাঠামো ভাঙার সম্ভাবনা নেই। স্মিথের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গেলেন রুশ সহকর্মীটি।

কিন্তু মাত্র দিন কয়েকের মধ্যেই স্মিথের অফিসে তাঁর পুনরাগমন ঘটল। নাঃ! এবার কোনো সেতু সংক্রান্ত ব্যাপারে নয়; এবারে তিনি নিয়ে এসেছেন এক আশ্চর্য খবর। বারজুনটাই নদীর 'সরীসৃপ দেবতা' মারা পড়েছে। যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক সংবাদ! সুতরাং পুরো ঘটনার বিবরণ শুনতে উৎসুক স্মিথ সাহেব তাঁর রুশ সহকর্মীটিকে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে এসে আশ্রয় নিলেন স্থানীয় একটি ক্লাবে।

'স্পটেড ডগ' ক্লাব।

ক্লাবের মধ্যে কফিপান করতে করতে 'ডি' যে রোমাঞ্চকর অদ্ভুত ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেলেন সেটি আমি নিচে তুলে দিলাম।

স্মিথসাহেব সেলানগর থেকে চলে আসার পর ইদানীংকালে 'চণ্ডু'-র নেশা কুলিদের মধ্যে আবার ব্যাপকহারে চালু হয়েছিল। ফলে মাঝে-মাঝেই কাজ ব্যাহত হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত একদিন অতিষ্ঠ হয়ে 'টিফিনের' সময় 'ডি' গিয়ে হাজির হলেন কুলিদের আস্তানায়। ওই সময় যে তাঁর আগমন ঘটতে পারে সে সম্পর্কে কেউই ঠিক ধারণা করতে পারেনি, ফলে বেশ কয়েক পাউন্ড আফিং-এর একটা বড় দলা অচিরেই 'ডি'-এর হস্তগত হল। কলাপাতায় মুড়ে ডেলাটা পকেটে ঢুকিয়ে 'ডি' স্থানত্যাগ করলেন।

বর্ষার জলে কানায়-কানায় পূর্ণ বারজুনটাই নদী তখন উত্তাল, উদ্দাম, খরস্রোতা। তীব্র বেগে ধাবমান নদীর জলে ভেসে চলেছে অসংখ্য কাঠের খণ্ড, ছোট-বড় গাছ, পাথরের বড় বড় টুকরো ইত্যাদি। আর সেই দুর্বার স্রোতে থরথর করে কাঁপছে সেতুর কাঠামো।

কুলিদের আস্তানা থেকে বেরিয়ে রুশ ব্যক্তিটি ওই সেতুর উপর ফিরে গিয়ে পুনরায় কাজের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হলেন। হঠাৎ, নদীর জলে ভেসে আসা প্রকাণ্ড একটা গাছের সঙ্গে সংঘাত হল নদীবক্ষে প্রোথিত একটা কাঠের খুঁটির। প্রচণ্ড ধাক্কায় থর-থর করে কেঁপে উঠল সেতুর কাঠামো আর 'ডি' যেখানে দাঁড়িয়ে কাজ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, সেতুর সেই অংশটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল নদীর জলে।

তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ বারজুনটাই-এর দুরন্ত স্রোতে দক্ষ সাঁতারুর পক্ষেই টিঁকে থাকা কষ্টকর। কিন্তু, ভাগ্যক্রমে 'ডি' তাঁর হাতের নাগালে ভেঙে পড়া একটা চৌকোণা কাঠের কাঠামো পেয়ে গেলেন। ভারী কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি খাঁচার মতো আকৃতি বিশিষ্ট সেই কাঠামোটাকে আশ্রয় করে ভেসে চললেন তিনি।

স্রোতে পাক খেতে খেতে, একজন যাত্রীকে বহন করে কাঠের কাঠামো শেষ পর্যন্ত পাড় স্পর্শ করল। কিন্তু জায়গাটা ঠাহর করে 'ডি' শিউরে উঠলেন। সর্বনাশ! এ তো 'বেসার বুয়াইয়া'-র বাসস্থল। কাঠের কাঠামোর মধ্যে বন্দি অবস্থায় 'ডি' পাড়ের যে জায়গাটিতে এসে পৌঁছেছেন, দিন কয়েক আগে এখানেই বাঁধা হয়েছিল জ্যান্ত কুকুরটাকে। একটু পরেই সমস্ত চিন্তার অবসান হল। কাঠের খাঁচা থেকে বেরোবার জন্য 'ডি' সবে উঠে দাঁড়িয়েছেন, হঠাৎ একটু দূরে নদীর তীরবর্তী কালো মাটির একটা বিরাট অংশ যেন নড়েচড়ে তাঁর দিকে এগিয়ে এল। 'দানব সরীসৃপ—বেসার বুয়াইয়া'। আতঙ্কে পাথর হয়ে জমে গেলেন 'ডি'।

ধীরে-ধীরে অতিকায় সরীসৃপটা এগিয়ে এল কাঠের খাঁচাটার দিকে, তারপর হঠাৎ তার মুখটা দ্রুতবেগে ধাবিত হল 'ডি'-এর প্রতি। উন্মুক্ত মুখগহ্বরের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করল ক্ষুরধার দাঁতের সারি। কিন্তু কুমিরের ভাগ্য বাদ সাধল। শিকারের নাগাল পাওয়া কুমিরের পক্ষে অতটা সহজ হল না। আড়াআড়িভাবে আটকানো কাঠের তক্তায় আটকে গেল কুমিরের বিরাট চোয়াল। কিন্তু মুখের সামনে সহজলভ্য শিকারকে এই সামান্য বাধার জন্য ছেড়ে দিতে কুমির রাজি নয়। 'প্রাণ-রক্ষক' কাঠের কাঠামো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল সরীসৃপের প্রচণ্ড আঘাতে। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়লেও, 'ডি' কিন্তু স্থানু হয়ে বসেছিলেন না। প্রাণভয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ক্রমান্বয়ে লাথি চালাচ্ছিলেন কুমিরের নাকে এবং মুখের সামনের দিকে নরম অংশে। ফলে মাঝে-মাঝে সরীসৃপটা তার কুৎসিত মুখ টেনে নিচ্ছিল খাঁচার বাইরে।

এর মধ্যেই ঘটল সেই অদ্ভুত ঘটনা। প্রচণ্ডভাবে এলোপাথাড়ি হাত-পা ছোঁড়ার ফলে 'ডি'-র কোটের পকেট থেকে ছিটকে পড়ল কুলিবস্তি থেকে বাজেয়াপ্ত করা আফিমের ডেলা, তার পরই আর এক লাথিতে সেটা গড়িয়ে কাঠের খাঁচার বাইরে চলে গেল। 'ডি' ব্যাপারটা কতখানি খেয়াল করেছিলেন তা বলা কঠিন, কিন্তু কুমির ডেলাটা বাইরে আসামাত্রই গলাধঃকরণ করল, এবং তারপর পুনরায় মনোযোগ দিল তার শিকারের প্রতি।

অন্যদিকে 'ডি'-র পরিত্রাণের আশা ক্রমেই লোপ পাচ্ছিল। কারণ, আর কতক্ষণ জলবাসী দানবের প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করে কাঠের কাঠামো টিঁকে থাকতে পারবে, সে সম্বন্ধে জোর করে কিছুই বলা যায় না। কুলিদের ডাকাও নিরর্থক। নদীর কল্লোলে ভেসে যাবে তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠ। অতএব, স্নায়ু এবং আত্মবিশ্বাসের উপর নির্ভর করে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য উপায় খুঁজে পেলেন না 'ডি'।

পরিত্রাণের আশা নেই। কিন্তু আতঙ্কিত 'ডি'-র কাছে কুমিরের আচরণ হঠাৎ কেমন যেন একটু অস্বাভাবিক ঠেকল। ক্রমশ যেন নিশ্চল হয়ে আসছে অমিতশক্তির অধিকারী অতিকায় কুমিরটার আস্ফালন। তার সমস্ত দেহ যেন শ্রান্তিতে শুয়ে পড়তে চাইছে নদীর পাড়ে মাটির বুকে। বিদ্যুৎচমকের মতো একটা সম্ভাবনার কথা রুশটির মাথায় খেলে গেল। আর সেই সঙ্গে মুক্তির আলোও দেখতে পেলেন তিনি।

অল্পক্ষণ পরেই কুমিরটা আক্রমণে ইস্তফা দিল। তারপর আস্তে আস্তে তার প্রকাণ্ড শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেল নদীর পাড়ে। অসীম ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো বুজে এল। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে বারজুনটাই নদীর তিরে পড়ে রইল নদীর 'সরীসৃপ দেবতা'।

একদৌড়ে 'ডি' যখন অফিসে এসে পৌঁছলেন, জলে কাদায় তখন তাঁর সর্বাঙ্গ মাখামাখি।

—'কুমিরটা এখনও আছে। আমার বন্দুকটায় গুলি ভরো।' এর চেয়ে বেশি কথা বেরুল না তাঁর মুখ দিয়ে।

সাম্পানে চড়ে গোটাকয়েক কুলি সঙ্গে নিয়ে 'ডি' যখন অকুস্থলে এসে পৌঁছলেন, তখনও নদীর পাড়ে জলবাসী দানবের বিরাট দেহ লম্বমান। জন্তুটার থেকে মাত্র দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে পরপর দুটো গুলি করলেন 'ডি'। তীব্র যন্ত্রণায় একবার মোচড় দিয়েই শান্ত হয়ে গেল কুমিরের দেহ।

কুমিরটা মৃত, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর কুলিরা নেমে এল সাম্পান থেকে। অবশ্য, সামান্য কিছুক্ষণ মৃতদেহটাকে পরীক্ষা করেই তারা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে এটা সেই 'নদীর দেবতা'-টা নয়, বরং তার ভাই হতে পারে!!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%