ওরা কেউ ফেরেনি

নির্বেদ রায়

'বুনোটা বোধহয় আরও খাবার-দাবার আনতে গেল,' নিজের পেটের উপর হাত বুলিয়ে এনে তৃপ্তির সঙ্গে কথাটা বলল মোজানো। কিন্তু বাতিস্তা কোনো উত্তর দিল না, আসলে মোজানোর কথা তার কানেই যায়নি। তার কান তখন অন্যদিকে।

পূর্ণিমার রাত। আকাশে প্রকাণ্ড রূপোর থালার মতো চাঁদ। সমস্ত জঙ্গল আর গ্রামটাকে ঘিরে যেন বয়ে চলেছে সেই বনজ্যোৎস্নার স্রোত। একটু দূরে রিও কাট্রিমানি নদীর বুকেও সেই রূপোগলা ঢল নেমেছে। মাঝে মাঝে একটানা পোকার গুঞ্জন আর রাত চরা পাখি কি ছোটখাটো বাঁদর জাতীয় প্রাণীর দুয়েকটা ডাক ছাড়া আর কিছু সেই অদ্ভুত পরিবেশের মাঝে কানে শোনার নেই। বাকিটা শুধু দেখার।

রূপকথার প্রকাণ্ড দৈত্যের মতো আকাশছোঁয়া গাছগুলো সেই চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে ভূতুড়ে ছায়া ফেলে। তার ফাঁকে বেশ কিছুটা দূরে দূরে দেখা যাচ্ছে এক একটা পাতায় ছাওয়া কুটীর। গোটা গ্রামটা ছড়িয়ে আছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। গ্রামের এককোণে ওইরকম পাতায় ছাওয়া একটা কুটীরে আপাতত বাতিস্তাদের থাকবার ব্যবস্থা।

ঘরের মেঝে মাটির। ঠান্ডা একটু বেশি ঠেকে। নইলে আর কোনো অসুবিধে নেই। খাবার-দাবারের ঢালাও ব্যবস্থা, যে যত খুশি খাও। অমন যে পেটুক মোজানো, সেও খেয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। অবশ্য একা মোজানোর দোষ দিয়ে লাভ নেই, অন্যরাও এই ক'দিন গোগ্রাসে গিলেছে—যেন দুর্ভিক্ষের পল্টন। আর খাবে নাই বা কেন? রবারগাছের জঙ্গল খুঁজতে খুঁজতে তারা পথ হারিয়ে ফেলেছিল সে আজ কমদিন হল না, তারপর থেকে ভয়ংকর ব্রাজিলের জঙ্গলে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে দিশেহারা হয়ে।

পৃথিবীর এমন কোনো বিপদ নেই যার খোঁজ এ অঞ্চলে মেলে না। প্রাণের ভয় একদিকে আর অন্যদিকে একটুকরো খাবারের খোঁজে গোটা দলটাকে ঘুরতে হয়েছে হন্যে হয়ে। শেষপর্যন্ত 'আমেরিকার বাঘ' জাগুয়ারের কবলে পড়ে কি তার চেয়েও হিংস্র অসভ্য উপজাতিদের হাতেই প্রাণটা খোয়াতে হত, নয়তো যেত খিদের জ্বালায়—কিন্তু এভাবে মৃত্যু বোধহয় তাদের কপালে নেই, তাই শেষ পর্যন্ত কাট্রিমানি উপজাতির একটা ছোট দল তাদের দেখতে পায়। দলটা বেরিয়েছিল শিকারের খোঁজে। তারাই ন'জন মুমূর্ষু মানুষকে নিজেদের গ্রামে নিয়ে আসে। সেই থেকে থাকা-খাওয়ার এলাহি ব্যবস্থা। সুতরাং এই ক'টা দিন লোকগুলো যে গা এলিয়ে দিয়েছে সেটা স্বাভাবিক।

সর্দার তসুরা নিজে বসে এতক্ষণ খাওয়ার তদারকি করছিল। একটু আগে উঠে বাইরে গেছে। খাবার আনতে নিশ্চয়ই নয়, কারণ খাবার অনেক রয়েছে, তবে পানীয় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। মধু দিয়ে এরা যে বেশ কড়াধাতের একটা পানীয় তৈরি করে, তার পাত্রটায় আর শুধু তলানিটুকু পড়ে আছে। সম্ভবত তাই নিয়ে আসতে বেরিয়ে গেল তসুরা। অবশ্য মোজানোর তাতে বিশেষ উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই, তার পেটে এখন এককুচো সুপুরিও ঢোকানো মুশকিল। তাই পরিতৃপ্ত ভুঁড়িটার ওপর একটু হাত বুলিয়ে এনে সে বাতিস্তার উদ্দেশ্যে একটা কথা নিছকই ছুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাতিস্তার দিক থেকে সে কথার কোনো উত্তর এল না। বাতিস্তা অর্থাৎ অ্যালেজো বাতিস্তা, ন'জনের এই ছোট্ট দলটার নেতা তখন কান খাড়া করে একটা অন্য শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল।

দূর থেকে জঙ্গলের হাওয়ায় ভর করে ভেসে আসছে একটানা অদ্ভুত করুণ এক বাঁশির সুর। সে সুর কোনো মানুষের পৃথিবীর নয়, কোনো জীবিত প্রাণীকে সে সুর কাছে ডাকে না, অমানুষিক কোনো অশরীরী পৃথিবী জেগে ওঠে সে বাঁশির মূর্ছনায়। প্রেতলোকের ওপার থেকে সব অপার্থিব অতিথিরা এসে সারি বেঁধে দাঁড়ায় সে ডাকে। প্রকাণ্ড অজগর সাপের মতো এঁকেবেঁকে ধীরে ধীরে সে বাঁশির সুর উদারা, মুদারা হয়ে তারায় আছড়ে পড়ছে বিচিত্র এক শিহরণ তুলে। বহুক্ষণ ধরে বাঁশি বাজছিল। তারপর একসময় সেই সুরে তাল মিলিয়ে ভেসে আসতে লাগল জংলি ঢাকের শব্দ—দ্রিম, দ্রিম, দ্রিম...।

'বোধহয় কোনো উৎসবের ব্যবস্থা হচ্ছে।' মনোযোগ সরিয়ে এনে বলল বাতিস্তা।

'একবার ঘুরে এলে হয় না? জংলিদের উৎসব দেখার সুযোগ তো বড় একটা জোটে না।' উত্তর করল প্যাট্রিজ।

'কথাটা মন্দ নয়', মনে মনে ভাবল বাতিস্তা। সর্দার তসুরার কথামতো আর দু-চারদিনের মধ্যে জলপথে রিও কাট্রিমানি ধরে তাদের আমাজনের দিকে যাত্রা করার কথা। তার জন্য একটা 'কয়ূকা'র ব্যবস্থাও করে দেবে বলেছে তসুরা। 'কয়ূকা' হল রেড ইন্ডিয়ানদের তৈরি একধরনের ছোট কাঠের নৌকা। ফলে, উৎসব দেখার সুযোগ যে আর পাওয়া যাবে না, এ কথা ঠিক।

ওদিকে জুয়ান প্যাট্রিজ কিন্তু এতসব ভাবেনি, ততক্ষণে সে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এসেছে কুটীর থেকে। কুটীরের বাইরে অনেকটা খালি জমি, তারপরে প্রকাণ্ড সব গাছের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে পথ। জ্যোৎস্না আর ঝাঁকড়া-মাথা গাছগুলোর ছায়ায় মিলেমিশে আলো-আঁধারী এক ভূতুড়ে পরিবেশ। জঙ্গলে রাত্তিরে ঘোরাফেরা করার অভ্যস্ত চোখ নয় প্যাট্রিজের, তবু পূর্ণিমার রাত বলেই বিশেষ অসুবিধা হচ্ছিল না। কুটীরের সামনে উঠোনটুকু পেরিয়ে এসে গাছের সারির মধ্যে ঢুকতেই তার ডানদিকে একটা ছায়া নড়ে উঠল। দৈত্যের মতো একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে তসুরা এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল এই সুযোগের জন্য। প্যাট্রিজ তাকে পেরিয়ে যাওয়া মাত্রই পিছন থেকে সে আঘাত করল। অভ্রান্ত লক্ষ্য। তার ডানহাতের ভারী ছোরা চাঁদের আলোয় একবার ঝিকমিকিয়ে উঠে নেমে এল প্যাট্রিজের ঘাড় লক্ষ্য করে; আবার যখন উঠল তখন তার ফলায় আর চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে না—রক্ত! প্যাজের ধড়টা গাছের তলাতেই গড়িয়ে পড়ল। মুণ্ডুটা একটু দূরে।

পরের শিকার হল ফ্রেডরিক। প্যাট্রিজের খানিক বাদে বেরিয়ে ক'পা এগোতেই তার নজরে পড়ল সামনে আধো-আলো আধো-অন্ধকারের মধ্যে বড়সড়ো পুঁটলির মতো কি একটা পড়ে আছে। পরীক্ষা করার জন্যে হাঁটু গেড়ে বসল ফ্রেডরিক। আর উঠল না। পুঁটলির মতো গুটিয়ে পড়ে থাকা প্যাজের মৃতদেহের পাশে তার দেহটাও গড়িয়ে পড়ল নিঃশব্দে। চওড়া তলোয়ারের গায়ে লেগে থাকা রক্ত ফ্রেডরিকের শার্টেই মুছে তসুরা আবার মিলিয়ে গেল গাছের আড়ালে।

পরপর আরও পাঁচজনের একই পরিণতি হল এক ঘণ্টার মধ্যে। একে একে তারা বেরিয়ে এসেছে কুটীরের বাইরে আর গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সর্দার তসুরা নিঃশব্দে তার কাজ করে গেছে একের পর এক। এত নিঃশব্দে, এত দ্রুতগতিতে আর এত চকিতে যে মরবার আগে টুঁ শব্দ পর্যন্ত কারো মুখ দিয়ে বেরোয়নি।

কুটীরের মধ্যে বসে বসে পানীয়ের বাকি তলানিটুকু এতক্ষণে শেষ করল বাতিস্তা। তারপর উঠে দাঁড়াল—'চলো হে মোজানো, বাইরে একটু ঘুরে আসা যাক। এরা তো সব জংলিগুলোর নাচ-গান দেখতে গেছে বেশ খানিকক্ষণ হল। এখনো ফিরছে না যখন, তার মানে মজার কোনো ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে, দেখে আসলে মন্দ হয় না, কি বলো?'

'চলো'। উঠে পড়ল মোজানোও।

হালকা, ফুরফুরে মেজাজেই ঘর থেকে বেরোল দুজনে; কিন্তু অসাধারণ তীক্ষ্নদৃষ্টি মোজানোর। এতদূর থেকেই তার চোখে পড়ল সঙ্গীদের ছড়িয়ে পড়ে থাকা দেহগুলো। তা সত্ত্বেও মোজানো মারাত্মক ভুল করে বসল। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে সে প্রাণপণে দৌড় দিল সামনের দিকেই। তসুরা গাছের আড়ালেই অপেক্ষা করছিল। পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে 'ম্যাচেট' চালাল। মুণ্ডুটা ছিটকে পড়ল তৎক্ষণাৎ কিন্তু দৌড়বার গতিতে মুণ্ডহীন ধড়টা আরও কয়েক পা ছুটে গিয়ে তারপর মাটিতে পড়ল। পুরো ঘটনাটাই ঘটল বাতিস্তার চোখের সামনে।

দৃশ্যটা ভালো নয়। বোকার মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাটা আর সুবিধের বোধ হল না বাতিস্তার। সে ঘুরে দৌড়ল পিছনের ঘন জঙ্গলের মধ্যে, তসুরার আয়ত্বের বাইরে। অবশ্য বেশিদূর যেতে হল না। কুটীর ঘিরে প্রতিটা গাছের আড়ালেই দাঁড়িয়ে এক-একজন কাট্রিমানি যোদ্ধা। ভারী একটা কাঠের মুগুর সজোরে নেমে এল বাতিস্তার মাথার উপর। কাটা কলাগাছের মতো সে ছিটকে পড়ল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান।

বাতিস্তার জ্ঞান ফিরে এল যখন, তখন তার অবস্থা সঙ্গীন। হাত-পা এতটুকু নাড়াবার উপায় নেই। ইংরেজি 'এক্স' অক্ষরের মতো আড়াআড়ি ভাবে আটকানো কাঠের খুঁটিতে তার হাত-পা টানটান করে বাঁধা। সামনে জ্বলছে প্রকাণ্ড আগুনের কুণ্ড, আর সেই কুণ্ড ঘিরে উন্মত্তের মতো নেচে চলেছে কাট্রিমানি নারী পুরুষের দল। অনেকক্ষণ আগেই শুরু হয়েছে নাচ, কারণ মানুষগুলোর গা দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ছে। বাজনার তালে তালে নাচতে থাকা তাদের সেই ঘাম-চকচকে শরীরের উপর কেঁপে কেঁপে নাচছে অগ্নিকুণ্ডের আভা। নিজেকে ধাতস্থ করতে বেশ খানিকটা সময় লাগল বাতিস্তার। সে যে সত্যিই বেঁচে আছে, প্রথমে একথাটা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছিল না। মনে হচ্ছিল, তার সামনে একসঙ্গে সাত-সাতটা নরকের দরজা কেউ এক ধাক্কায় খুলে দিয়েছে।

হঠাৎ থেমে গেল জংলি ঢাক। থেমে গেল বাঁশির সুরও। যেন কোনো যাদুমন্ত্রে বোবা হয়ে গেছে সবাই। অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করতে লাগল গোটা জায়গাটা জুড়ে। তারপর সেই নীরবতার মাঝে পাতায় হাওয়া খেলে যাওয়ার মতো একটা চাপা ফিসফিসানি শোনা গেল—'ওয়েসোলি! ওয়েসোলি! 'বাতিস্তা তাকিয়ে দেখল অন্ধকার থেকে আলোর কুণ্ডর আওতায় এসে দাঁড়িয়েছে এক অপরূপা নারীমূর্তি।

নারীমূর্তির মাথায় রং-বেরংয়ের লম্বা লম্বা পালকে তৈরি সুন্দর শিরস্ত্রাণ, আর সেই শিরস্ত্রাণের দু-প্রান্তে শোভা পাচ্ছে মোষের শিংয়ের মতো দুটো প্রকাণ্ড কাঠের শিং। তবে তার গলার হার, হাতের কঙ্কণ আর পায়ের নূপুর দেখে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল বাতিস্তা। গয়নাগুলোর সবক'টাই তৈরি মানুষের গলার হাড় দিয়ে।

দৃপ্ত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে সেই নারীমূর্তি আগুনের কুণ্ডকে বেড় দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এল বাতিস্তার দিকে। জংলিসমাজ নিয়ে বিশদ পড়াশোনা নেই বাতিস্তার, কিন্তু ওই দৃপ্ত ভঙ্গি আর অন্য স্ত্রী-পুরুষদের শ্রদ্ধা মেশানো ভয়ের চাউনি দেখে নারীমূর্তির স্বরূপ চিনতে তার দেরি হল না—ডাকিনীবিদ্যার প্রধান বিদ্যেধরী, ওঝা ওয়েসোলি! দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সর্দার তসুরা পর্যন্ত যার কথা অমান্য করতে সাহস করে না, যার নির্দেশ হল এ সমাজের একমাত্র আইন।

বাতিস্তার সামনে এগিয়ে এসে তার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল ওয়েসোলি। সেই দৃষ্টিতে সাদা মানুষের উপর যে ভয়ঙ্কর ঘৃণা ফুটে উঠছিল আধো-অচেতন ঝাপসা চোখেও সেটা বুঝতে কষ্ট হল না বাতিস্তার; ভয়ে কাঠ হয়ে গেল সে। এবার মাথার পিছন থেকে শিরস্ত্রাণে গোঁজা লম্বা ছুরির মতো এক টুকরো জাগুয়ারের হাড় খুলে আনল ওয়েসোলি। শুরু হল এক নিষ্ঠুর অত্যাচারের পর্ব।

অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসকের মতোই পাকা হাত ওয়েসোলির। তফাত শুধু এই যে চিকিৎসকের ছুরি রোগীর ক্ষত নিরাময় করে আর ওয়েসোলির হাতের হাড়ের টুকরো বন্দির সারা দেহে সৃষ্টি করে চলেছিল একের পর এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। তার মুখ ভাবলেশহীন, দৃষ্টি স্থিরনিবদ্ধ। শুধু তার অভ্যস্ত হাত আর আঙুলগুলোর সামান্য নড়াচড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহ্য যন্ত্রণায় যখন বন্দির গলা থেকে ঠেলে বেরোচ্ছিল অমানুষিক চিৎকার, তখন তার দুটো ঠোঁটের ফাঁকে জেগে উঠছিল এক অদ্ভুত হাসি। নারী যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে বাতিস্তার ধারণা ছিল না। তবু ভাগ্য ভালো বলতে হবে, বেশিক্ষণ এই যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হয়নি, খানিক বাদেই সে জ্ঞান হারাল।

সর্দার তসুরা কিন্তু কথার খেলাপ করেনি। কয়েকদিন বাদে ব্রাঙ্কো নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে দুজন রেড ইন্ডিয়ান জেলে একটা ছোট্ট ডিঙি ভেসে আসতে দেখে। সেই ডিঙি থেকে তারা অ্যালেজো বাতিস্তাকে উদ্ধার করে—সঙ্গে তার আটজন সঙ্গীর ছিন্নমুণ্ড। বাতিস্তা তখনো বেঁচে, কিন্তু এর থেকে না বাঁচাই বোধহয় ছিল ভালো। ক'খানা চামড়ায় মোড়া হাড় ছাড়া তার শরীরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। চোখের দৃষ্টি শূন্য। অনবরত প্রলাপ বকছে বিড়বিড় করে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল ঠিকই, কিন্তু তার সমস্ত জীবনশক্তি ততদিনে নিঃশেষ হয়ে এসেছিল। বাতিস্তা বাঁচল না।

আমাজনের পাড়ে মোয়েরি গোরস্থানে একটা পাথরের ফলকের তলায় আজ চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে অ্যালেজো বাতিস্তা। তার পাশেই কবর দেওয়া হয়েছে তার আটজন সঙ্গীকে...না, ভুল বলা হল, আসলে আটজনের কাটা মুণ্ডুকে। তবে শুধু ওই আটটা মুণ্ডুই নয়, আশেপাশের কবরখানা খুঁজলে এইরকম আরও নরমুণ্ডের খোঁজ পাওয়া যাবে। যেমন মানাউ কবরখানায় এইভাবেই মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে জুয়ান বিয়েনভেনিডোস আর তার দুই সঙ্গীর ছিন্নমুণ্ড। এরা সবাই কাট্রিমানি উপজাতির শিকার। তবে লেফটেন্যান্ট বিয়েনভেনিডোসের কাহিনি শোনার আগে বোধকরি পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম আর ভয়ঙ্কর এই উপজাতিটি সম্পর্কে কয়েকটা কথা জানা প্রয়োজন।

একদিকে কুরুপুরা পাহাড়ের শ্রেণি দাঁড়িয়ে আছে পাঁচিল তুলে, অন্যদিকে রিও কাট্রিমানি ছুটে চলেছে সীমানা বেঁধে দিয়ে, আর এই দুই নদী-পাহাড়ের মাঝে জলে-জঙ্গলে দুর্ভেদ্য এক লক্ষ আশি হাজার বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে একটি মাত্র রেড ইন্ডিয়ান উপজাতি। কাট্রিমানি নদীর অববাহিকায় বহুদিন ধরে এদের বাস, তাই বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন কাট্রিমানি উপজাতি। এই নাম দেওয়া ছাড়া অন্য উপায়ও অবশ্য নেই। গত চারশো বছর ধরে এই দুর্ধর্ষ উপজাতির একটা মানুষকেও ধরে সভ্যজগতে আনা যায়নি যে তাদের স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার কি আদব-কায়দার আন্দাজ পেয়ে নৃতাকিরা অন্য কোনো নাম ঠিক করতে পারেন। ওই অঞ্চলে পা দিয়ে আজ পর্যন্ত ক'জন ভাগ্যবান মানুষ কাঁধের উপর মাথাটাকে আস্ত রেখে লোকালয়ে ফিরতে পেরেছে, তাদের বিবরণ খুবই ভাসা-ভাসা, অস্পষ্ট। আসলে কাট্রিমানিদের হাত থেকে মাথা বাঁচিয়ে পালাবার তাগিদে কেউ আর তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করার জন্য সময় ব্যয় করাটা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেনি।

নিষিদ্ধ পৃথিবীর এই গোপন অন্তঃপুরে প্রথম যে সভ্য মানুষ পা দিয়েছিল বলে জানতে পারি, তার নাম ক্যাপ্টেন লোপো। পেরুর বাসিন্দা। সময়টা ছিল আজ থেকে চারশো বছরেরও আগে, ১৫৬০ সাল।

গোটা ইয়োরোপ আর আমেরিকা জুড়ে ভাগ্যান্বেষী মানুষের চোখে তখন এক স্বপ্ন। সে স্বপ্ন সোনার শহর 'এল ডোরাডোর'। দক্ষিণ আমেরিকার দুর্গম বনের আড়ালে কোথাও লুকিয়ে আছে সেই বিরাট সোনার ভাণ্ডার। যে স্বর্ণভাণ্ডারের মালিক হতে পারলে গোটা পেরুকেই কিনে নেওয়া যেতে পারে।

আশিজন সঙ্গী সমেত ক্যাপ্টেন লোপো সেই পথে যাত্রা শুরু করল। সঙ্গী না বলে বরং তাদের সৈন্যই বলা উচিত। এই সৈন্যদের তদারকের জন্য সে নিজে ছাড়া আরও দুটি মানুষ ছিল। এরা হল ফার্ণিনান্ড গুসমাও আর পেড্রো উরসুয়া।

আমাজনের অববাহিকায় পৌঁছে ফার্ণিনান্ড লক্ষ্য করল যে এই বিশাল সমতলভূমিটি একেবারেই বেওয়ারিশ। শুধুমাত্র কিছু রেড-ইন্ডিয়ান উপজাতি ছাড়া সভ্য মানুষের চিহ্নমাত্র নেই। এই অববাহিকা জুড়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের পত্তন করতে সে হল দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ। পেরুর রাজপুত্র 'প্রথম ফার্ণিনান্ড' নামে সে নিজেকে ওই অঞ্চলের সম্রাট বলে প্রচার করতে শুরু করল।

কিন্তু ক্যাপ্টেন লোপো পাণ্ডববর্জিত এলাকায় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার ছেলেমানুষি পরিকল্পনা নিয়ে এতদূর আসেনি। 'ভালো পাগলের পাল্লায় পড়া গেল'—মনে মনে ভাবল লোপো, কিন্তু পাগলামি নিয়ে সময় নষ্ট করতে সে রাজি হল না। খুব তাড়াতাড়ি সে নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলল এবং এক রাত্তিরে যখন সবাই ঘুমোচ্ছিল তখন সে একইসঙ্গে 'রাজপুত্র' আর সঙ্গী পেড্রো উরসুয়াকে হত্যা করে ঝামেলা চুকিয়ে দেয়। লোপো জানত, যে বেপরোয়া মানুষগুলোকে সাথী করে সে এ পথে পা বাড়িয়েছে তারা মনের ক্ষোভটুকু সামান্যতম সুযোগ পেলেই মিটিয়ে নিতে দ্বিধা করবে না। ফলে কোনোরকম ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।

আমাজনের তীর ধরে এবার ঝটিকাবাহিনীর মতো এগিয়ে চলল ক্যাপ্টেন লোপো আর তার দলবল। বাধা যে এল না তা নয়, কিন্তু বর্বর রেড ইন্ডিয়ানদের সেই বর্শা আর তিরের বাধা তাদের বন্দুকের সামনে ঝড়ের মুখে কুটোর মতোই উড়ে যেতে লাগল। যাত্রাপথের চারদিকে অকৃপণ ভাবে পরিবেশিত হল মৃত্যু—জঙ্গলের বাতাস ভারী হয়ে উঠল রক্ত আর বারুদের গন্ধে।

সভ্য মানুষের এই লোভ আর চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা বোধহয় এতক্ষণে মহাবিচারককে রুষ্ট করেছিল। তাই ক্যাপ্টেন লোপো যখন তার দলবল নিয়ে কাট্রিমানিদের এলাকায় পা দিল তখন তাদের এত দিনের দেনা-পাওনা চুকোবার দিন এল।

পাওনা যে ভালোমতোই চুকেছিল তার প্রমাণ, লোপো যখন তার অভিযানে দাঁড়ি টেনে ভেনিজুয়েলায় সভ্যজগতের সংস্পর্শে আবার ফিরে আসে তখন তার সঙ্গে ছিল মোটে সাতজন সঙ্গী। কিন্তু লোকালয়ে এসেও সে নিস্তার পায়নি। এবার তার দায়িত্ব নিল দেশের আইন। ফার্ণিনান্ড আর পেড্রোকে খুন করার অপরাধে লোপোর মৃত্যুদণ্ড ধার্য করা হয়।

কিন্তু এ তো গেল লোপোর কথা। বাকি তিয়াত্তর জন সঙ্গীর কি হল সে সম্পর্কে আমাদের কিছু কৌতূহল থেকে যায়। মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরী হওয়ার আগে যে ক'দিন ক্যাপ্টেন লোপো নির্জন কারাকক্ষে কাটিয়েছিল, সেই সময়ে রাজার কাছে লেখা এক চিঠিতেই সেই বিবরণ জানিয়ে দিয়ে যায় সে।

মান্যবরেষু,

আপনাকে আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, কাট্রিমানি নদীর পাড়ে যে উপজাতিটি বাস করে, তাদের উচ্ছেদ করতে গেলে আপনার গোটা সেনাবাহিনীও যথেষ্ট কিনা সন্দেহ। প্রমাণ হিসাবে আমার অভিজ্ঞতাই ধরুন।

আমাজনের শাখা নদী পার হয়ে আমি যখন দলবল সমেত ওই অঞ্চলে পা দিলাম তখনই ওরা আমাকে বাধা দিতে এল। সংখ্যায় ওরা নেহাত কম ছিল না, কিন্তু এর আগে বহুবার এরকম অসম যুদ্ধে আমরা জিতেছি। ফলে কিছুক্ষণ অস্ত্র-বিনিময় হওয়ার পরই ওরা রণে ভঙ্গ দিয়ে যে যেদিকে পারল জঙ্গলের মধ্যে পালাল। আমার লোকজনও তৎক্ষণাৎ নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে ওদের তাড়া করল। কিন্তু এটাই হল মারাত্মক ভুল, আমরা ওদের ফাঁদে পা দিলাম। তবে ভুল বুঝলেও তখন আর প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ নেই। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যেই আমাদের লোকেরা ওদের পিছনে তাড়া করে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল, অমনি চারদিক থেকে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কাট্রিমানি যোদ্ধারা। সেই ঘন জঙ্গলে দিনের বেলা পাঁচ হাত দূরে চোখ চলে না, তারই সুযোগ নিয়ে ঝোপ-জঙ্গলের আড়াল থেকে আশপাশ, উপর-নীচ সব দিক দিয়ে আক্রমণ চালাল তারা। যে তিয়াত্তর জন ওদের পিছনে তাড়া করে গিয়েছিল তাদের একজনও ফিরল না। গতিক সুবিধের নয় বুঝে অবশিষ্ট যে সাতজনকে নিয়ে আমি নৌকো পাহারা দিচ্ছিলাম, তাদের সঙ্গে নিয়ে কোনোক্রমে পালিয়ে এসেছি প্রাণ বাঁচিয়ে।

আমার মতে, যত রেড ইন্ডিয়ান উপজাতি আমি জীবনে দেখেছি তারমধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর আর ভয়ঙ্করই শুধু নয়, সবচেয়ে ধূর্ত উপজাতিও হল এই কাট্রিমানিরা। আর গণ্ডগোলটা সেখানেই।

আপনার একান্ত বিশ্বস্ত

লোপো

চিঠির প্রয়োজনীয় অংশটুকুর বয়ান এইরকম। আর তারপর প্রায় দুশো বছর ধরে যে সব আমেরিকা, ব্রিটিশ, ডাচ, পর্তুগিজ এবং স্প্যানিয়ার্ড পর্যটকেরা আমাজন কি তার অসংখ্য শাখানদীর কোনো কোনোটা ধরে অভিযান চালিয়েছে, ক্যাপ্টেন লোপোর স্বীকারোক্তি মাথায় রেখে তারা কেউই আর কাট্রিমানি উপজাতির ধারে-কাছে যাওয়ার কথা চিন্তা করেনি।

কিন্তু তবু কেউ কেউ চিন্তা করে। তাই ১৭৭২ সালে এক জেসুইট পাদ্রী অগাস্টিনোর কানে এই উপজাতিটির কথা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঠিক করলেন যে এদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে সভ্য জগতের সংস্পর্শে নিয়ে আসবেন। পাদ্রী অগাস্টিনো শুধু সাহসীই ছিলেন না, ধর্মপ্রচারের কাজেও তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। মানাউ-এ পৌঁছবার পর স্থানীয় মানুষজন তাঁকে সাবধান করে দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু অগাস্টিনো তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিল যে মানবপ্রেমের বাণী প্রচার করে শয়তানকেও হিংসা থেকে বিরত করা যায়। ফলে মোয়েরিতে পৌঁছে তিনি স্থানীয় দুজন রেড ইন্ডিয়ান সঙ্গী জোগাড় করে নদী-পথ ধরে কাট্রিমানি এলাকার দিকে যাত্রা করেন।

একথা মনে রাখতে হবে যে, প্রথমে কোনো লোকই পাদ্রীসাহেবের সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি। কিন্তু তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আর বক্তৃতার জোরেই তিনি শেষে ওই দুটি লোক জোগাড় করে ফেলেন। এটা নেহাত কম কৃতিত্বের কথা নয়।

পুরোপুরি একমাসও কাটেনি, তার মধ্যেই ব্রাঙ্কো নদীর জলে ভেসে আসা আরেকটা 'কয়ূকা'-র মধ্যে পাওয়া যায় তিনটি ছিন্নমুণ্ড। তার মধ্যে একটি পাদ্রী অগাস্টিনোর, বাকি দুটো তাঁর দুই সঙ্গীর। সেগুলোকে তখন মুণ্ডু না বলে খুলি বলাই ভালো—জঙ্গলের বড় বড় ডেঁয়ো পিঁপড়ে মাংস আর চামড়ার কিছু অবশিষ্ট রাখেনি।

এবার সরকারি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল। যেহেতু কাট্রিমানিদের এলাকায় যারাই গেছে, তাদের ছিন্নমুণ্ড ছাড়া আর কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি, কর্তৃপক্ষের ধারণা হল যে এই উপজাতিরা নিশ্চয়ই নরখাদক এবং সেই অনুযায়ী সমস্ত অভিযাত্রীদের ওই অঞ্চল সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়। পরে অবশ্য জানা যায় যে, কাট্রিমানিরা নরখাদক নয়, কিন্তু তার জন্য সরকারি নোটিশের কোনো তারতম্য ঘটেনি। কারণ, ঘাড়ের উপর থেকে মাথাটা যদি নিতান্তই স্থানচ্যুত হয় তাহলে ধড়টা কবরখানায় যাবে না রান্নাঘরে ঢুকবে তাই নিয়ে বিবাদ করার সুযোগ কোথায়!

তারপর কেটে গেছে একশো বছরেরও বেশি সময়। এই বিরাট সময় ধরে কাটিমানি সম্পর্কে অভিযাত্রীদের মনে আতঙ্কও কমে এসেছে ধীরে ধীরে। অনেকেই ভুলে গেছে পাদ্রী অগাস্টিনোর কাহিনি কিংবা ক্যাপ্টেন লোপোর সৈন্যদলের পরিণতি। তার উপর শুরু হল 'রাবার বুম'।

কী এই 'রাবার বুম'?

উনিশ শতকের শেষাশেষি সময়ে অর্থাৎ আঠারোশো আশি সাল নাগাদ উত্তর আমেরিকা জুড়ে যেমন শুরু হয়েছিল 'গোল্ড রাশ'—রাশি রাশি সোনার খোঁজে অজস্র মানুষ ছুটেছিল পশ্চিমে নদীগুলোর পাড়ে, তেমনি দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, ইকোয়েডরের মানুষ তখন আমাজনের অববাহিকা ধরে ছুটেছিল 'সেলভজ'-এর গভীর অরণ্যে রবার গাছের সন্ধানে।

বাইরের পৃথিবীতে রবারের চাহিদা তখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। 'রবার' গাছের গুঁড়ি ফুটো করে যে ঘন আঠা বেরোয় তার থেকেই তৈরি হয় রবার। ফলে ওই 'রাবার বুম'-এর সূত্র ধরেই আবার সাদা মানুষের দল পা দিল কাট্রিমানিদের গোপন অন্তঃপুরে। তবে এবার আর একজন-দুজন নয়, জনা পঞ্চাশ-ষাটের বড় বড় দলে তারা হানা দিতে লাগল রবার বনের খোঁজে। তার ফলে ফারাক হল একটাই—একজন দুজনের বদলে এবার গোটা দলটাই উধাও হতে শুরু করল। তাদের কাটা মুণ্ডুগুলোও আর ফিরে আসত না। বোধহয় অতটুকু ছোট নৌকায় অতগুলো মুণ্ডু ধরে না বলেই কাটিমানিরা সে পাট চুকিয়ে দিয়েছিল।

মানুষের পয়সার লোভ থাকতে পারে কিন্তু প্রাণের মায়া নিশ্চয়ই আরো বেশি। তাই নরমুণ্ড-শিকারিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে ক'দিনের মধ্যেই রবার-শিকারিরা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হল।

কাটিমানিদের সঙ্গে পরের যোগাযোগের অধ্যায় শুরু হয় তারও প্রায় ষাট বছর বাদে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।

মালয় থেকে রবারের চালান তখন বন্ধ; শুধু মালয়ই বা বলি কেন, গোটা দূর প্রাচ্যের কোনো অঞ্চল থেকেই আর রবার আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে এবার সরকারি উদ্যোগে চার-চারটে দেশ মিলে তৈরি করা হল পঞ্চাশ হাজারের এক বাহিনী।

কিন্তু সংখ্যাটাই তো আর সব জায়গায় শেষ কথা নয়। সমতলভূমিতে অথবা ছোটখাটো চড়াই-উৎরাইয়ের পথে দশ হাজারের বিরুদ্ধে এক হাজারের লড়াই দেওয়া কঠিন কাজ সন্দেহ নেই, কিন্তু যেখানে দিনমানে পাঁচ ফুট দূরের মানুষ চেনা যায় না সেখানে হাজারও যা দশ হাজারও তাই। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না, ওই পঞ্চাশ হাজারের যে অংশটাকে প্রথমে পরিস্থিতি দেখে শুনে আসবার জন্য পাঠানো হয়েছিল, তাদের মধ্যে একটা লোকও যখন ফিরে এল না তখনই সোজা কথাটা বোঝা গেল।

সরকারি কর্তৃপক্ষ এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তাদের দোষ নেই, কারণ এক লক্ষ আশি হাজার বর্গমাইল জুড়ে কাট্রিমানিদের ওই বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রবার গাছ। এদিকে রবারের বাজার-জোড়া চাহিদা, অথচ জোগান দেওয়ার উপায় নেই।

শেষ পর্যন্ত সবাই হাত গুটিয়ে নেওয়ার পর এগিয়ে এল একজন সামরিক বাহিনীর মানুষ—কর্নেল জুয়ান বিয়েনভেনিডোস। বেশি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয় বলে কর্নেলের বিশ্বাস ছিল। তাতে না হয় কোনো কাজের কাজ, মাঝখান থেকে একগাদা লোকের প্রাণ নিয়ে টানাটানি। কর্নেল ঠিক করল, মাত্র তিনজন সঙ্গী নিয়ে সে কাট্রিমানিদের এলাকায় হানা দেবে। না, রবারের খোঁজে নয়, তারা যাবে মানুষের খোঁজে। তক্কে-তক্কে থেকে একটা কাট্রিমানিকে ধরে নিয়ে আসতে পারলেই কাজ হবে। তারপর ভাবে ভঙ্গিতে কথাবার্তা চালিয়ে তাদের চলাফেরা আদব কায়দার কিছুটা বুঝতে পারলেও অন্তত পরের অভিযানগুলো অনেক নিরাপদে করা যেতে পারে।

কর্নেলের পরিকল্পনায় ভুল ছিল না, সমস্যার আসল গিঁটটাকেও সে খুঁজে বার করেছিল—সত্যিই তো, যে শত্রুর সম্পর্কে কোনো তথ্যই জানা যায় না, তার সঙ্গে যুদ্ধের কৌশল ঠিক করাও মুশকিল; কিন্তু একটা জায়গায় শুধু তার ফাঁক থেকে গেছিল। চারশো বছর আগে লেখা ক্যাপ্টেন লোপোর চিঠির শেষ দুটো লাইন বোধহয় তার মনে পড়েনি—'...যত রেড ইন্ডিয়ান উপজাতি আমি জীবনে দেখেছি তার মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর আর ভয়ংকরই শুধু নয়, সবচেয়ে ধূর্ত উপজাতিও হল এই কাট্রিমানিরা।' মনে পড়লে হয়তো কর্নেল বিয়েনভেনিডোস আরো একটু সাবধান হত।

১৯৫৫ সালের গোড়ার দিকে তিনজন সঙ্গী নিয়ে কর্নেল যাত্রা করল কাট্রিমানিদের এলাকায়। ক'দিন নদীর বুকে নৌকা চালিয়ে শেষে কাট্রিমানি গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে পৌঁছে জঙ্গলের বুকে তাঁবু ফেলল তারা। সেখান থেকে পালা করে লোক পাঠিয়ে নজর রাখত গ্রামের উপর।

একদিন সকালবেলায় হঠাৎ দৌড়তে দৌড়তে তাঁবুতে ফিরল রবার্টো লিমন। সেদিন ছিল তার পাহারাদারী। সে এসে জানাল, আজ সকালেই গোটা গ্রামের পুরুষরা দল বেঁধে বেরিয়েছে জাগুয়ার শিকারে। থাকার মধ্যে রয়েছে জনাকয় বুড়োবুড়ী, মেয়ে আর বাচ্চারা, যদি কিছু করতে হয় তো এই সুযোগ।

সুযোগ তো বটেই! কর্নেল আর দেরি করল না। লিমনকে মালপত্র আর তাঁবুর পাহারায় রেখে দুই সঙ্গীসমেত সে গ্রামের পথে বেরোল। 'ঘণ্টা দু-তিনেকের ব্যাপার তো হবেই, সুযোগ-সুবিধামতো একটা লোককে বন্দি করে আনা নেহাত সহজ কাজ নয়,' এই ভেবেই লিমন তাঁবুর বাইরে একটা ক্যাম্পখাটের উপরে জাঁকিয়ে বসে বেশ আয়েশ করে চুরুটে আগুন ধরাল।

তবে দু-তিন ঘণ্টা নয়, আস্তে আস্তে গোটা দিনটাই যখন কেটে গেল, তখন লিমনের চিন্তাগুলো ক্রমে দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে। পরের দিন রাতের বেলায় তাই বাধ্য হয়ে লিমন গাছের আড়াল দিয়ে গুঁড়ি মেরে মেরে কাট্রিমানি গ্রামের দিকে এগোল।

জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা—মাঝখানে গ্রাম। জন্তু-জানোয়ারের উৎপাতের জন্য চারিদিকে বেড়া দেওয়া, নইলে কাট্রিমানিদের শত্রু বলতে এই অঞ্চলে আর কোনো উপজাতি নেই।

গাছের আড়ালে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে না করতেই হঠাৎ লিমন দেখল গ্রামের প্রধান দরজাটা খুলে যাচ্ছে। তারপর তার চোখের সামনে কর্নেল আর তার দুই সঙ্গীকে পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এল দশ-বারোজন নারী। না, একজনও পুরুষ কাট্রিমানি যোদ্ধা চোখে পড়ল না লিমনের। এবার শুরু হল এক অমানুষিক অত্যাচারের পালা।

লিমন দুগ্ধপোষ্য শিশু নয়, জীবনের অনেক নির্মম দিক সে দেখেছে, কিন্তু চোখের সামনে এই অত্যাচারের দৃশ্য তার বুকের রক্ত হিম করে দিল। শেষপর্যন্ত সর্দারণীর ইঙ্গিতে একে একে তিনজন বন্দিরই মুণ্ড ছিন্ন হল ধড় থেকে। লিমন তখনো জানত না যে ওই সর্দারণীই হল 'ওয়েসোলি'।

রবার্টো লিমন অবশ্য কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছিলে; আর তারপর থেকে নদীর জলে ভেসে আসা কোনো কয়ূকা-র মধ্যে ছিন্নমুণ্ড পাওয়া গেলে তার আর দুঃখ হত না, বরং কিছুটা যেন আশ্বস্ত বোধ করত সে। কারণ, জিজ্ঞাসা করলে বলত, 'কাট্রিমানিদের হাতে ধরা পড়ে তাদের অত্যাচার সহ্য করার চেয়ে মৃত্যু অনেক অনেক বেশি সুখের, আর যদি ওদের মেয়েদের হাতে বন্দি হও তাহলে তো কথাই নেই। সে অত্যাচার আমি দেখেছি, তাই আমি আশ্বস্ত হই, তুমি দেখলে তুমিও হতে।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%