নির্বেদ রায়

ফ্লোরিডা—
আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে একটি রাজ্য, যেন দ্বীপের মতো সমুদ্রের বুকে ভেসে আছে।
দ্বীপ বলা যাবে না, কারণ এই অঞ্চল আমেরিকার সঙ্গে সংযুক্ত, একেবারে দক্ষিণ-পূর্বের শেষ প্রান্তে মূল ভূখণ্ড থেকে বেরিয়ে এসে, একদিকে আটলান্টিক মহাসাগর আর অন্যদিকে মেক্সিকো উপসাগরের মধ্যে এসে পড়েছে।
জায়গাটা স্পেনের সংস্কৃতি আর কথাবার্তার প্রভাবে প্রভাবিত। আমেরিকার একটি রাজ্যও বটে।
রাজ্য জুড়ে কুমিরের বসবাস। কুমির বলতে 'ক্রোকোডাইল' আর 'এ্যালিগেটর' দুটোকেই বোঝায়। বাংলায় অবশ্য দুটোই 'কুমির', কিন্তু এককথায় এ্যালিগেটর একটু থ্যাবড়া মুখের জন্তু, আর ক্রোকোডাইল ছুঁচোলো মুখ দেখে চেনা যায়। আর ক্রোকোডাইল সমুদ্রের পাড়ে দেখা যায়, অর্থাৎ নুনজলে তার অসুবিধা হয় না, কিন্তু এ্যালিগেটর মিষ্টি জল পছন্দ করে, তাই ফ্লোরিডার নদী-নালা বা পুকুরের মধ্যে এদের দেখা মেলে। এটাই ঝুঁকির ব্যাপার—অনেক সময় রাস্তাঘাট হেঁটে পার হয়ে এরা এক পুকুর থেকে অন্য পুকুরে, অথবা খাবারের খোঁজে এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে যায়। তখন পথের মাঝখানে পড়ে গেলে বিপদ—এ্যালিগেটর-কুমিরের খাওয়া নিয়ে বিশেষ বাছবিচার নেই।
আমরা যখন এই কাহিনির বিবরণ শুনছি, তখন ঊনিশ শতক শেষ অথবা বিশ শতকের শুরু।
ফ্লোরিডায় তখন এত মানুষের বসবাস নয়, নদী-নালা-পুকুরগুলো তুলনায় ফাঁকা—
এ্যালিগেটর সম্পর্কে আর একটা কথা জেনে রাখা দরকার, যদিও এটা জন্তুটার একার গুণ নয়। ওই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আরও কিছু জন্তুর আছে—আছে না বলে বরং তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে বললেই ঠিক হয়।
এ্যালিগেটরের খাবারে বিশেষ বাছাবাছি নেই, এ কথা আমরা জেনেছি, কিন্তু সেই খাবারের পাতে যদি মানুষ এসে যায়, মানে কুমির যদি কোনোক্রমে 'নরখাদক' হয়ে ওঠে, তাহলে তার স্বভাবচরিত্র আমূল বদলে যায়।
তখন কুঁড়ে, কিন্তু সতর্ক, মানুষ সম্পর্কে একটু ভীত জন্তুটা একদম পালটে যায়। হয়ে ওঠে সাংঘাতিক বুদ্ধিমান এক হত্যাকারী, পুরো অঞ্চলের মানুষের কাছে ত্রাস।
যেমন নরখাদক বাঘ হয়ে ওঠে।
তখন একটা মাত্র পথ খোলা থাকে—হয় মারো, নয় মরো। আর একটা পথ অবশ্য থাকে—পারলে পালাও! পালালে নিজের প্রাণ হয়তো বাঁচে, কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীর প্রাণ বাঁচে কি? সবাই কি পালাতে পারে? সাধারণত যারা পর্যটক বা বেড়াতে আসে তারা এ পথ বেছে নিতে পারে, কিন্তু যাদের ঘরবাড়ি ওই অঞ্চলে তারা!
নাঃ, হেনরি ক্লার্ক যে ঘটনার কথা বলেছেন, তার চেহারা-চরিত্র একটু অন্যরকম। নরখাদক কুমির এত চতুর, এত বুদ্ধিমান হয়, ক্লার্ক সে কথা বুঝতে পারেননি। অন্তত প্রথম দিকে তো নয়ই। আর যে ভাবে কুমিরের থেকে মুক্তি পাওয়া গেল, সেটাও অদ্ভুত, সমস্ত চিন্তা ও ধ্যানধারণার বাইরে।
ঘটনার শুরু এইভাবে—
হেনরি ক্লার্ক ফ্লোরিডায় কুড়ি একর মতো জমি কেনেন। জমিটা ছিল একটা ছোট টিলার গায়ে, পাশ দিয়ে একটা জলাশয়। জলাশয় না বলে পুকুর বলাই ভালো। বড় পুকুর।
জমিতে একটা বাংলো বানিয়েছিলেন ক্লার্ক—সামনে গাড়িবারান্দা, বারান্দাটা ঢাকা। জমিতে কমলালেবুর গাছও পুঁতেছিলেন। বারান্দায় বসে ছোট গাছগুলোকে বড় হতে দেখতেন। আর রোজ পুকুরের ঠান্ডা জলে নামতেন স্নান করতে। বড় ভালোবাসতেন ক্লার্ক এই স্নান করা ব্যাপারটাকে। সঙ্গে আর একটা আনন্দের ব্যাপারও ছিল—সেটা নিশ্চয়ই পুকুরে কুমিরের কোনো খোঁজ নেই, দেখা নেই বলে...কিন্তু কপাল খারাপ হেনরি ক্লার্কের—
নিয়মমতো একদিন বারান্দায় বসে আছেন ক্লার্ক—চারদিকে গাছ-পালা আর ছোট্ট পাহাড়ি ঢাল, সাজানো লেক...এই সব দেখতে দেখতে তার চোখ আটকে গেল অপরিচিত এক বস্তুতে—হ্রদের উল্টোদিকের পাড়ে একটা কালো রঙের কিছু পড়ে আছে—লম্বাটে কিছু, আর গতকালও ওটা ওখানে ছিল না—এটা জোর দিয়েই বলতে পারেন হেনরি।
কী হতে পারে? একটু আগ্রহ হল ভালো করে দেখবার, সেই আগ্রহের আতিশয্যে বাড়ির ভিতর থেকে বাইনোকুলার আনিয়ে দেখতে গিয়ে একেবারে চমকে উঠলেন হেনরি ক্লার্ক। প্রকাণ্ড এক কুমির!
চুপচাপ শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে—যেন তার বহুদিনের বসবাস এখানে—দেখে অন্তত তাই মনে হল ক্লার্কের। আর সেইসঙ্গে স্বপ্নটাও এক ঝটকায় ভেঙে গেল। সেই যে কুমির-ছাড়া হ্রদের জলে নিরুপদ্রবে স্নান করার সুন্দর স্বপ্ন—ফ্লোরিডায় বসে এই স্বপ্ন দেখার সৌভাগ্য খুব বেশি মানুষের হয় না। ক্লার্ক সেই স্বপ্ন বেশ কিছুদিন ধরে দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নটা ভেঙে গেল...
একটু সাবধান হয়েই এর পর থেকে জলে নামতেন ক্লার্ক, তবে বেশ কিছুদিন এ্যালিগেটর তাকে কোনোরকম বিরক্ত করেনি, দূরে দূরেই ছিল। হেনরিও সাবধানেই সাঁতার কাটতেন—
হেনরির একটা গরু আর ভেড়ার খামার ছিল। সে খামারে শুয়োর ছাড়া অন্য পশুপাখি থাকত। নিগ্রো ছেলেমেয়েরা সেটা দেখাশোনা করত। নিগ্রোরা কখনো সামনের জলাশয়ে নেমে স্নান করেনি, করতে অভ্যস্তও ছিল না। তারা ফার্ম-হাউস থেকে প্রায় দু-মাইল দূরে একটা পুকুরে স্নান করতে যেত।
এর মধ্যে কুমিরটাকে মারার জন্য বহু চেষ্টা হয়েছে। ঠিক তখনই বোঝা গেছে যে এটা সাধারণ এ্যালিগেটর নয়, অসাধারণ বুদ্ধি আর শত্রুকে চেনার ক্ষমতা তার আছে—আর শুধু তাই নয়, আছে শত্রুর সমস্ত কৌশল এড়িয়ে চলার ক্ষমতা। বার বার ব্যর্থ হতে হতে মারার উদ্যোগটাও কমে এসেছে হেনরি বা অন্য 'শিকারিদের'। তার একটা বড় কারণ হল, কুমিরের কবলে তখনো পর্যন্ত কোনো মানুষ মারা যায়নি, যদিও জন্তুটার চালচলন নরখাদকের মতোই সতর্ক! বন্দুক হাতে কুমিরের আধ-মাইলের মধ্যে যাওয়া সম্ভব হয়নি—তার আগেই সে জলে নেমে পড়েছে! আর জলের মধ্যে তার ভেসে থাকা অথবা ডুবে যাওয়ার ঘটনাও যেন কারো নির্দেশে ঘটে যাচ্ছে, শিকার করতে যাওয়া মানুষটা বুঝতেও পারেনি—কখন যে ভেসে থাকা বিশাল জন্তুটা হ্রদে সামান্য ঢেউ না তুলেই অদৃশ্য হয়ে গেছে!
একদিন দলের মধ্যে একটা শুয়োরের খোঁজ পাওয়া গেল না। কয়েকদিন বাদে আরেকটা, দু-তিন দিন বাদে আরও একটা—এইভাবে প্রতি সপ্তাহে একটা, দুটো করে শূয়োর অদৃশ্য হতে শুরু করল। প্রথমে সন্দেহ হয়নি। কারণ, শূয়োর হ্রদের দু-দিক থেকেই হারিয়ে যাচ্ছিল। আর কোনো চিহ্নও ছিল না, যার ফলে বোঝা যায় যে কুমির ধরেছে বা খেয়ে ফেলেছে।
একদিন প্রমাণ মিলল। কিন্তু প্রমাণ মেলার আগে একটা বাছুরের দেহ পাওয়া গেল জলার কাছে। জায়গাটা জল-কাদা আর বনবাদাড়ে ঘেরা। বাছুরটা হেনরির খামারে থাকত, সন্দেহ নেই—পাওয়া গেল যখন তার মৃতদেহ, তখন শরীরে একটা পা নেই, আর দেহটা ছিন্নভিন্ন।
সন্দেহ দৃঢ় হল। তার কয়েকদিন বাদেই প্রমাণ পাওয়া গেল; আমি চোখের সামনে দেখলাম কুমির অন্য আর একটা বাছুরকে ধরল একেবারে আমার ফার্ম হাউসের কাছে হ্রদের মধ্যে। বাছুরটা জলে নেমে দাঁড়িয়েছিল, মাত্র এক হাঁটু জলে। হঠাৎ, একটা আলোড়ন উঠল জলে, তারপর বাছুরের আর্ত চিৎকার; চোখের সামনে বিশালকায় কুমিরের দুটো চোয়াল খুলল আর বন্ধ হল। বাছুর হারিয়ে গেল জলের নীচে—একটু জলের আলোড়নে বোঝা গেল বাছুর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সে সামান্য সময়ের জন্য—তারপর জল শান্ত হয়ে এল—সব শেষ!

চোখের সামনে এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে দেখে হেনরি আর তার সঙ্গীসাথীরা স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন—হুঁশ ফিরতে, সবাই মিলে একসঙ্গে ঠিক করলেন—আর নয়, এবার কুমিরটাকে মারতে হবে! চেষ্টাও চলল সবাই মিলে, কিন্তু অসম্ভব চালাক জন্তুটার দেখা পাওয়া যেত বটে, কিন্তু কাছে গিয়ে গুলি চালানো বা ফাঁদ পেতে ধরার কোনো কৌশল কাজ করল না।
এইভাবে সময় কাটছিল। মাঝেমধ্যে গরু-ভেড়া-বাছুর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। হেনরি ক্লার্ক বুঝছিলেন, যে এ কাজ কার? কিন্তু সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না—
সবকিছুর একটা সীমা থাকে, এবার কুমিরটা সেই সীমা ছাড়িয়ে গেল—
এই অঞ্চলে তার খাদ্যের অভাব ছিল না, সে গৃহপালিত জন্তুদের মধ্যে থেকে খাবার জোগাড় করে নিচ্ছিল, আতঙ্কের কারণ ছিল না, কুমিরটা অসম্ভব বুদ্ধিমান ছিল—এমনকী দূর থেকে ছোঁড়া কোনো গুলি বা ছররা-র টুকরো কোথাও তার বেঁধেনি।
তা সত্ত্বেও একদিন কাজটা করে বসল সে—
সেদিন আমি বারান্দাতেই বসেছিলাম। সামনে হ্রদের জলে একটা নিগ্রো মেয়ে জামাকাপড় কাচছিল, খামারের লোকজনের জামাকাপড়—অনেকক্ষণ ধরে কাপড় কাচার কাজ করছিল মেয়েটা। সঙ্গে তার বাচ্চাটাকে নিয়ে এসেছে, বাচ্চাটা হ্রদের পাড়ে শুয়ে আছে, হাত-পা নেড়ে খেলছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর মেয়েটা কাচা কাপড়গুলো গুছিয়ে নিতে জলের দিকে যেই পিছন ফিরেছে, তৎক্ষণাৎ জলে একটা ঢেউ উঠল, বিপদের সম্পর্কে মেয়েটা কিছু জানত না বলেই মনে হল ক্লার্কের, কিন্তু বাচ্চার চিৎকার শুনে সে ঘুরে দাঁড়াল। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, যা হওয়ার তা ঘটে গেছে—বাচ্চাটাকে মুখে নিয়ে কুমির ডুব দিয়েছে জলের গভীরে!
'আমার চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটল, আর সারাজীবনে আমি এই ঘটনার কথা আর সেই ছবি ভুলতে পারিনি', হেনরি ক্লার্ক বলেছেন।
কুমির নরখাদক হয়ে উঠল। এই শিকার তাকে নরমাংসের স্বাদ জানাবে, তখন অন্য মাংসের থেকে সহজলভ্য এই রক্ত-মাংস তাকে লোভী করে তুলবে। সুতরাং ফার্ম হাউসের যত বাসিন্দা সবাই এখন কুমিরের শত্রু, তার শিকার। কেউ মুক্ত নয়, সকলকে সাবধানে কাজের সময় কাটাতে হবে, বিশ্রামের সময়ও সতর্ক থাকতে হবে। এ্যালিগেটর জলে-ডাঙায় সমান আনাগোনা করতে পারে। গোটা পরিস্থিতি পালটে গেল। বাড়ির আওতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এক নরখাদক, অথচ তাকে হত্যা করা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে। হেনরি ক্লার্ক মরিয়া হয়েই উঠলেন। গুলি-বন্দুকে হবে না, বহুবার সে চেষ্টা করেছেন—তাহলে?

যৌবনে যে নেশা একদিন তাঁকে চেপে ধরেছিল, সেই পথেই ফিরলেন—বঁড়শি! এছাড়া আর কিছু খুঁজে পেলেন না হেনরি। তবে যে সে বঁড়শি নয়, হাঙর ধরার বঁড়শি—বড়, শক্ত, চওড়া। সঙ্গে বঁড়শি-র দড়ি হিসাবে 'ম্যানিলা' রজ্জু।
'টোপ হিসাবে ফ্লোরিডার দেশি, নেড়িকুকুর বেছে নিলাম।
কুমির খিদে পেলে তবেই আক্রমণ করবে, সেই হিসাবে দু-চার দিন অপেক্ষা করে কুকুরটার গলায় একটা শক্ত বকলেশ বাঁধলাম, তারপর ওই বকলেশের সঙ্গে বাঁধলাম বঁড়শি—এমনভাবে বাঁধা হল যে বঁড়শি যেন ছিঁড়ে না যায় কোনোক্রমে। বঁড়শির সঙ্গে বাঁধা রইল ম্যানিলা দড়ি। এইভাবে সব সাজিয়ে গুছিয়ে, কুকুরটাকে জলের ধারে নিয়ে গেলাম। কুকুরটা চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল বটে, কিন্তু সেটা 'টোপ' হিসাবে ওকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে নয়, গলায় যে ভারি বঁড়শি ঝোলানো আছে তার জন্য—আমি জলের ধারে তাকে বেঁধে দিতে আস্তে আস্তে চিৎকার কমল।
শুরু হল প্রতীক্ষা—
বেশ খানিকক্ষণ সময় কেটে গেল। জলে একটা বুদবুদ ভেসে উঠতেও দেখা গেল না। বাধ্য হয়েই কুকুরটাকে অন্য একটা জায়গা দেখে বাঁধতে হল। কিন্তু সেখানেও চুপচাপ। আবার হ্রদের পাড়ে জায়গা বদল করতে হল।
এভাবে এখান থেকে ওখানে, বারবার জায়গা বদলে বদলে কুকুরটাকে নিয়ে গিয়ে বাঁধার ব্যবস্থা করার মধ্যে একটা বিরক্তি কাজ করে। বিরক্তি আসে হতাশা থেকে, তার সঙ্গে পরিশ্রম—আর এই সব কিছুর সঙ্গে মিশে আছে আতঙ্ক, মৃত্যুভয়।
এইভাবে জায়গা পালটে পালটে যেতে যেতে একসময় জন্তুটা দেখা দিল। কুকুরটা যেখানে বাঁধা ছিল সেখানে জলে একটা আলোড়ন উঠল, কুকুরের একটা আর্তচিৎকার শোনা গেল, তারপর শিকার আর শিকারী দুই-ই অদৃশ্য হল জলের গভীরে...
আমি ঘড়ি ধরে পুরো পাঁচমিনিট অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার শরীরে যত শক্তি আছে, সব একত্র করে দড়িতে টান দিলাম। টান দিয়ে বুঝলাম দড়ি আটকেছে, যেখানে ভেবেছিলাম সেখানেই বঁড়শি আটকেছে, বেশ শক্ত ভাবে আটকেছে। সম্ভবত কুমির যে কুকুরটাকে খেয়েছে তার সঙ্গে টাকরায় গিয়ে বড়শি আটকেছে—তবে বেশ শক্ত ভাবে। তাড়াতাড়ি দড়িটার অন্য প্রান্ত একটা বড় তালগাছের গোড়ায় বেঁধে, দৌঁড়লাম, জন্তুটাকে মাটিতে টেনে তোলার ব্যবস্থা করতে—
ছুটতে ছুটতেই বাড়ি পৌঁছলামে। আস্তাবলের কাছে একটা টানা-গাড়িতে দুটো বড় 'খচ্চর' বাঁধা আছে। খচ্চর আসলে ছোট ঘোড়া বিশেষ, যদিও গাধার চেয়ে বড়, শক্তিশালী জন্তু।
গাড়ির চাকা দুটো আর এই দুটোকে জোড়া দেবার লম্বা কাঠ যাকে 'এক্সেল' বলে সেগুলো খুলে নিয়ে তার সঙ্গে খচ্চর দুটোকে বেঁধে দিলাম। তারপর ছুটলাম হ্রদের দিকে। হ্রদের কাছে এসে এক্সেল-এ ম্যানিলা দড়িটা গাছ থেকে খুলে নিয়ে ভালো করে বাঁধলাম। তারপর খচ্চর দুটোকে তাড়া দিলাম, সামনের দিকে যেতে—
দশ ফুট লম্বা বিরাট এ্যালিগেটর তার নিজের রাজত্ব 'জলের' মধ্যে বসে। চার পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে জলের তলার কাদা—তাকে টেনে তোলা দুরূহ কাজ।
তবু টাকরায় বা শরীরের অন্তস্থলে কোথাও আটকে থাকা বঁড়শি আর দুটো শক্তিশালী খচ্চরের টান একসঙ্গে মোকাবিলা করা তার পক্ষে মুশকিল বোধ হল।
ধীরে ধীরে এ্যালিগেটর জলে ভেসে উঠল, তারপর ডাঙায়—
এতক্ষণ খচ্চর দুটো কি টানছে দেখতে পায়নি, কিন্তু ডাঙায় উঠে কুমিরের ডাক শুনে তারা পেছনে তাকাল—ব্যস; তারপরে আর আমাকে ওদের তাড়া করতে হয়নি। ভয়ে দুটো খচ্চর প্রাণপণে দৌঁড়েছে জীবন বাঁচাতে। প্রতিমুহূর্তে মনে হয়েছে কুমির ওদের পিছনে তাড়া করে আসছে...কুমির ওদের পিছনে আসছে ঠিক, কিন্তু তাড়া করে নয়, পাথুরে রাস্তায় প্রচণ্ড টানে ওলট-পালট খেতে খেতে—
শেষ পর্যন্ত পাঁচ মাইল পথ এভাবে দৌড়ে যখন খচ্চর দুটো থামল, তখনও পিছনে দশ ফুটের এ্যালিগেটর—সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত, শরীরের বিভিন্ন অংশ রাস্তায় পড়ে আছে, রক্তাক্ত গোটা দেহ আর নিশ্চিতভাবে মৃত!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন