রেড কিলার

নির্বেদ রায়

'রেড কিলার' নামে অভিহিত খুনিটার হত্যার সংখ্যা সামান্য কয়েক মাসের মধ্যেই একক, দশকের সীমারেখা ছাড়িয়ে যখন দুশো-র আওতায় গিয়ে পৌঁছল, তখন তার মাথার দাম উঠল ত্রিশ পাউন্ড।

'রেড কিলার!'

'লাল আতঙ্ক!'

মাত্র দুটি শব্দ।

কিন্তু পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি জুড়ে একদিন ওই দুটি শব্দ যে ভয়াবহ আতঙ্ক এবং ত্রাসের সঞ্চার করেছিল, বাস্তব সত্য হলেও সে কাহিনি আমাদের কাছে আপাতভাবে অবিশ্বাস্য বোধ হওয়া স্বাভাবিক।

অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ।

ভূগোল ও জীবতত্ত্বের বিচারে নিতান্তই নিরীহ গোছের ভূখণ্ড। পৃথিবীর এই মহাদেশটির বুকে অবাধে বিচরণ করে না ভয়ংকর মাংসাশী অতিকায় মার্জারকুল অথবা হিংস্র তৃণভোজীর দল। বিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্রে ঘুরে বেড়ায় না 'কেপ-বাফেলো', গন্ডার অথবা গুন্ডা হাতির পাল—জেব্রার পিছনে গুঁড়ি মেরে ঝোপে-ঝাড়ে জ্বলে ওঠে না পশুরাজ সিংহ অথবা লেপার্ডের হিংস্র সবুজ চোখ। এমনকী 'আলাস্কান ব্রাউনি' অথবা 'গ্রিজলী-বীয়ার'-দের মতো অতিকায় ভাল্লুকরাও এখানে অনুপস্থিত।

ফলে পাঠকপাঠিকার মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—কে এই খুনি! জীবতত্ত্বের কোন গোষ্ঠিতে মিলবে এর পরিচয়?

প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা ফিরে যাব আমাদের কাহিনির স্থান, কাল ও পরিবেশে।

পুবের আকাশে তখন সূর্যোদয়ের রক্তিম আভা। পাণ্ডুর কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তে ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে রাতজাগা তারার দল!

নিস্তব্ধ, সুন্দর ওয়ারুনা উপত্যকার বুক চিরে জেগে উঠল মেষশাবকের করুণে আর্তনাদ। অতঃপর সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশকে কলঙ্কিত করে একাধিক মেষকণ্ঠে শুরু হল এক ভয়ার্ত চিৎকারের ঐকতান। প্রচণ্ড আতঙ্কে তারা আশ্রয় নিয়েছে খোঁয়াড়ের এক কোণে।

কিন্তু কেন এই আতঙ্ক!!!

উপত্যকার বুকে চোখ ফেরালে বোঝা যায় তার কারণ—এখানে ওখানে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি ভেড়া। জীবিত নয়, মৃত। সংখ্যায় প্রায় তেইশটা। প্রত্যেকটা মৃত ভেড়ার গলার কাছে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। মাত্র চারটির বৃক্ক বা কিডনি, হত্যাকারী অথবা হত্যাকারীরা খেয়ে ফেলেছে। বাকি ভেড়াগুলোর মৃতদেহ প্রায় অক্ষত। বোঝা যায়, নিছক হত্যার আনন্দ চরিতার্থ করার খেয়ালেই খুনি এতগুলো নিরীহ পশুকে হত্যা করেছে।

উপত্যকার রক্ষক সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বুঝলেন যে জন্তুগুলোর হত্যাকারী একটি বা দুটি বিশালাকৃতি ডিংগো। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল লৌহবেষ্টনীর মাঝখানে যে ছিদ্রপথ দিয়ে 'ডিংগো' তৃণভূমির মধ্যে প্রবেশ করেছে সেই ছিদ্রটি একটি ষাঁড়ের কীর্তি। হতভাগা ষাঁড়টাকে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হল এবং ছিদ্রটিও মেরামত করা হল।

কিন্তু এই ঘটনার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই একজন অশ্বারোহী মেষরক্ষক লৌহজালিকার গায়ে আর একটি নতুন ছিদ্র আবিষ্কার করে, এবং এবার বোঝা যায় যে সেটি কোনো অসাধারণ শক্তিশালী ডিংগোর কীর্তি। কারণ, সাধারণ কোনো ডিংগোর পক্ষে এই লোহার জাল দাঁত দিয়ে কেটে ফেলা সম্ভব নয়। অভিজ্ঞ মেষপালক বুঝলেন যে, একই ডিংগো অনুরূপ পন্থায় বারবার আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ওয়ারুনা তৃণক্ষেত্রের ভেড়াগুলোর উপর। কারণ, কোনো ডিংগো একবার যেখানে শিকারের জন্য হানা দেয়, দেড় মাসের মধ্যে সেই জায়গায় সে পুনর্বার ফিরে আসবেই, এবং এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে বেষ্টনীর মধ্যবর্তী ছিদ্র মেরামত না করে, আগত রাত্রে খুনি অথবা খুনিদের অভ্যর্থনার জন্য বেড়ার সামনে পাতা হল ইস্পাতের ফাঁদ এবং মৃত ভেড়াগুলোর 'কিডনি'-তে প্রবেশ করিয়ে রাখা হল প্রচুর পরিমাণে 'স্ট্রিকনিন' বিষ। ওয়ারুনার মালিক সমস্ত আয়োজন শেষ করে নিশ্চিন্ত হলেন বটে, কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না যে, তাঁর সুদীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায়, সাধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মগুলিই শুধু তিনি জেনেছেন। সে নিয়ম ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা চলে না।

পরদিন প্রত্যুষে আশাভরা মন নিয়ে ছুটে এলেন পশুপালক। কিন্তু বেড়ার পাশে পাতা ইস্পাতনির্মিত ফাঁদের কাছে আসতেই চমকে উঠলেন তিনি। অবিশ্বাস্য!!!

ফাঁদে আটকে আছে লালচে-বাদামি রংয়ের কনুই পর্যন্ত কাটা একটা বাঁ-পা। সন্দেহ নেই কর্তিত পা-টির মালিক একটা ডিংগো, কিন্তু ফাঁদে আটকা পড়ে যে জন্তু, নিজের পা ছাড়াতে না পেরে, নিজে চিবিয়ে কেটে ফেলে চম্পট দেয়, সে কি ধরনের ভয়ংকর এবং নৃশংস প্রাণী!

লালচে বাদামি রঙের 'কাটা পা'-এর জন্যই উপত্যকায় ডিংগোটা পরিচিতি লাভ করল 'রেড কিলার' নামে—আক্ষরিক অর্থে যার মানে দাঁড়ায় 'লাল খুনি'। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে 'রেড কিলার' ওয়ারুনার বুকে তার নৃশংসতার প্রথম স্বাক্ষর রাখল।

যারা এই কাহিনি পড়ছেন, আমি এইখানে তাঁদের কৌতূহল নিরসনের প্রয়োজনে 'ডিংগো' নামক প্রাণীটির একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানিয়ে রাখছি।

শ্বাপদবিরল অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে 'ডিংগো' নামক এক ধরনের বুনো কুকুরই একমাত্র বড়সড় শ্ব-দন্তী, মাংসাশী প্রাণী। এই হিংস্র সারমেয় বাহিনীর কবলে প্রতি বছরই প্রাণ হারায় বেশ কিছু সংখ্যক নিরীহ গৃহপালিত পশু। প্রধানত পশুপালনের উপর নির্ভর করেই যে সব পশুরক্ষক জীবননির্বাহ করে তারাও এই স্বাভাবিক ক্ষতিটা স্বীকার করে নিয়েছিল। উপরন্তু, মাঝেমধ্যে তাদের পাতা ফাঁদে হামলাকারী দু-চারটে ডিংগো প্রায়শই ধরা পড়ত। তাই যদিও এই ছিঁচকে খুনিগুলোকে নিয়ে তাদের ব্যতিব্যস্ত থাকতে হত, তবু এই বুনো কুকুরগুলো কখনোই উপত্যকায় ব্যাপক আতঙ্কের কারণ হয়নি। কিন্তু এই গতানুগতিক ধারাকে একটু পালটাতে ওয়ারুনার উপত্যকার বুকে আবির্ভূত হল ত্রাস সঞ্চারকারী বর্ণসঙ্কর একটা বিশালাকৃতি বুনো কুকুর —আমাদের কাহিনির নায়ক 'রেড কিলার'। কুকুর প্রজাতিতে, আমাদের আলোচ্য ডিংগোটা স্বভাবচরিত্রের দিক দিয়ে ছিল এক বিরাট ব্যতিক্রম। কাহিনির পরবর্তী পর্যায়ে তার আরও পরিচয় মিলবে।

দৈনন্দিন নিয়ম অনুসারে জনৈক ব্যক্তি একদিন সকালে দুধের বালতি হাতে নিয়ে গোয়ালে গিয়েছিল। কিন্তু গোয়ালের দরজা খুলতেই যে ভয়াবহ দৃশ্য তার দৃষ্টিগোচর হল তার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। গোয়ালের মধ্যে গরুটা রক্তাক্ত দেহে কোনোরকমে শ্বাস টানছিল আর তার পাশেই মাটিতে পড়ে ছিল মৃত গো-শাবকটির দেহ। প্রায় অক্ষত বাছুরটার মৃতদেহের থেকে কেবলমাত্র হৃৎপিণ্ডটি হত্যাকারী উপড়ে তুলে নিয়ে ভক্ষণ করেছে। শাবকটিকে হত্যাকারীর কবল থেকে বাঁচাবার চেষ্টায় গরুটিও অক্ষত নেই। গোয়ালঘরের জমি পর্যবেক্ষণ করে জানা গেল যে হত্যাকারী মাত্র তিনটি পায়ের অধিকারী, অর্থাৎ আবার পুনরাবির্ভূত হয়েছে 'রেড কিলার'।

এই সময়ে অস্ট্রেলীয় সরকারও 'ডিংগো' সম্পর্কে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ ওই হতচ্ছাড়া কুকুরগুলোর জন্য প্রতিবছরই সরকারকে বেশ কিছু আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছিল। খুনি কুকুরগুলোর মাথাপিছু তাই সরকারের তরফ থেকে তিন পাউন্ড করে পুরস্কার ঘোষণা করা হল। সেই সঙ্গে ওয়ারুনার মালিক এবং প্রতিবেশী অপর দুই পশুপালকের ঘোষিত পুরস্কারের অঙ্ক মিলিয়ে 'রেড কিলার'-এর মাথার দাম গিয়ে উঠল পনেরো পাউন্ডে।

অর্থের পরিমাণ খুব সামান্য নয়। ফলে দলে দলে পেশাদার ও অপেশাদার শিকারিরা এসে ভিড় জমাতে লাগল ওয়ারুনা উপত্যকায়, কিন্তু 'বিষাক্ত মাংসের টোপ' অথবা বিশেষভাবে পাতা ফাঁদ কোনো কিছুতেই প্রলুব্ধ হয়ে বা ভুলক্রমে ধরা পড়ল না তে-ঠেঙা শয়তানটা, বরং শিকারিদের সমস্ত কৌশল ব্যর্থ করে একটানা চলতে লাগল তার হত্যালীলা। শিকারিদের কৌশল এবং জন্তুটার সতর্কতার এই প্রতিযোগিতা এই ভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত কি হত বলা যায় না, কিন্তু এরই মাঝে সমস্ত উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে জন্তুটা হঠাৎ ওয়ারুনার বুক থেকে উধাও হল। বেশ কিছুদিন তার আর কোনো হদিস মিলল না। মেষ-পালকের দলও আস্তে আস্তে 'রেড কিলার'-এর অস্তিত্বের কথা ভুলে যেতে শুরু করেছিল, কিন্তু শয়তান ডিংগো-টা যে তার নিগ্রহের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়নি, সে কথা বুঝতে তাদের তখনও কিছু দেরি ছিল।

লাল খুনি-টার পুনরাবির্ভাবের ঘটনাটি যেমন ভয়ংকর, তেমনই চমকপ্রদ। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে কুকুরটা সেই সময় হয়ে উঠেছিল সাংঘাতিক বেপরোয়া এবং অবশ্যই বিপজ্জনক।

ঘটনার দিন জনৈক ব্যক্তি একটি ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে ওয়ারুনা উপত্যকার একটি প্রান্তে পরিত্যক্ত ঘাসজমির আগাছা পরিষ্কার করছিল। লোকটির সাথী ছিল তার পোষা টেরিয়ার কুকুর। কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে লোকটি কুকুরটার অদ্ভুত আচরণে মাঝে-মাঝে অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করছিল। একটা বিশেষ ঝোপের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে টেরিয়ারটা মাঝে মাঝেই চিৎকার করে উঠছিল ভয়ার্তস্বরে। ফলে, দু-একবার কৌতূহলী হয়ে লোকটি ঝোপের মধ্যে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল ঠিকই কিন্তু একটা গিরগিটি ছাড়া সন্দেহজনক আর বিশেষ কিছু তাঁর চোখে পড়ল না। সুতরাং, সে সেদিকে আর বিশেষ লক্ষ্য না রেখে পুনরায় তাঁর কাজে মন দিল। একটু পরে, জমির একদিকের জঞ্জাল সাফ করা হয়ে গেলে, গাড়িটাকে জমির অন্য প্রান্তে নিয়ে যাবার জন্য ঘুরতেই তাঁর চোখ পড়ল অদূরবর্তী ঝোপটার দিকে। সঙ্গে-সঙ্গেই সে বুঝতে পারল তাঁর পোষা কুকুরটার আতঙ্কের কারণ। ঝোপের মধ্যে থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে লালচে বাদামি রঙের এক অতিকায় সারমেয় দানব। হ্যাঁ কুকুর বটে, কিন্তু কোনোক্রমেই সেই কদাকার জীবটাকে চতুষ্পদের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না, কারণ লোকটি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল যে জন্তুটার সামনের দিকের বাঁ-পা প্রায় কনুই পর্যন্ত কাটা, পক্ষান্তরে এটাকে ত্রি-পদ বলে অভিহিত করা যেতে পারে স্বচ্ছন্দে। বিগতদিনের অভিজ্ঞতায় লোকটির বুঝতে দেরি হল না যে, ওটাই ওয়ারুনার জান্তব বিভীষিকা—সেই কুখ্যাত 'রেড কিলার'। জন্তুটার অবয়বে 'ডিংগো' এবং অস্ট্রেলিয়ার শিকারি কুকুর 'ক্যাঙারু-ডগ'-এর সাদৃশ্য প্রমাণ করছিল যে বিশালাকৃতি কুকুরটা একটা বর্ণসঙ্কর।

লোকটির উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ক্ষিপ্রগতিতে জন্তুটা এগিয়ে গেল টেরিয়ারটার দিকে। নিকটবর্তী হয়ে সে প্রথমে তার ঘ্রাণ গ্রহণ করল বারকয়েক, তারপরই প্রচণ্ড দংশনে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতি কুকুরটার কণ্ঠনালি চেপে ধরে এক ঝটকায় শূন্যে তুলে নিল। কয়েকটি করুণ মুহূর্ত। তারপরই হতভাগ্য টেরিয়ারটার মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল সম্মুখবর্তী জমির উপর।

পোষা কুকুরটার এই শোচনীয় মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে হতভম্ব মানুষটির সম্বিত ফিরে এল এতক্ষণে। হাতের সামনে অস্ত্র বলতে তাঁর ছিল একটা লোহার 'স্প্যানার' অর্থাৎ বল্টু খোলার যন্ত্র। সেটিকে হস্তগত করে সে ছুটে গেল এবং একের পর এক আঘাত হানতে লাগল আক্রমণকারী ডিংগো-টার মাথায়। 'স্প্যানার'-এর কঠিন আঘাত বুনো কুকুরটাকে বিশেষ কাবু করেছে বলে কিন্তু মনে হল না, কারণ সেই আঘাতকে অগ্রাহ্য করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভয়ংকর কুকুরটা টেরিয়ারের মৃতদেহটাকে পরিণত করল কয়েকটি মাংসের ফালিতে।

কিন্তু অল্পসময়ের মধ্যেই আক্রমণকারী মানুষটির প্রতি ডিংগোটার মনোযোগ আকৃষ্ট হল। অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় ঘুরে দাঁড়িয়ে এবার সে আততায়ীর কণ্ঠদেশ লক্ষ্য করে লাফ দিল। কোনোক্রমে নিজের বাঁ-হাত দিয়ে কুকুরটার মারাত্মক আক্রমণ প্রতিহত করে, প্রাণপণ শত্তিতে মানুষটি তার ডান হাতে ধরা ভারী স্প্যানারটা ক্রমান্বয়ে প্রয়োগ করে চলল 'খুনি'-টার মাথায় এবং দেহের উর্ধ্বাংশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধাতব আলিঙ্গনের যন্ত্রণাময় অনুভূতি থেকে পরিত্রাণ পেতে ডিংগো-টা অদূরবর্তী একটা ঝোপের মধ্যে দিয়ে পালালো দূরবর্তী জঙ্গলের আশ্রয়ে। শুধু তার আবির্ভাবের প্রমাণস্বরূপ পড়ে রইল বাচ্চা কুকুরটার ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিটির দেহে শ্বাপদের নখ ও দাঁতের সংস্পর্শে সৃষ্ট কয়েকটি কুৎসিত ক্ষতচিহ্ন। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের এই আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে গোটা ওয়ারুনার বুকে তীব্র উত্তেজনার সঞ্চার করে আবার গা-ঢাকা দিল আমাদের কাহিনির নায়ক 'রেড কিলার'।

তবে বেশিদিনের জন্য নয়। মাত্র দিনকয়েকের মধ্যেই সে আবার হানা দিল উপত্যকার বুকে। এবার সে সঙ্গে করে জুটিয়ে এনেছিল তার এক সঙ্গিণীকে—সম্ভবত শিকারে তার এই একাকিত্ব আর ভালো লাগছিল না।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায় যে এই সময় ভেড়াগুলোর পানীয় জল সরবরাহের জন্য একটি কূপ নির্মাণের কাজ চলছিল। কাজটির তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন মিঃ ডাউনি নামে একজন সাহেব।

একদিন সকালবেলা মিঃ ডাউনি অশ্বারোহণে যখন তত্ত্বাবধানের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল যে চারণভূমির উপর যে ভেড়াগুলো বিচরণ করছিল তাদের মধ্যে এক ধরনের ভয়ার্ত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মেষপালের মধ্যে এই আকস্মিক চাঞ্চল্যের কারণ অনুসন্ধান করতে তিনি সম্মুখস্থ চারণভূমির উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। প্রথমে বিশেষ কিছুই তাঁর নজরে পড়ল না। কিন্তু দৃষ্টিসীমার পরিধি খানিকটা বিস্তৃত হতেই চোখে পড়ল...

দূরে, বেশ কিছুটা দূরে, তা কম করেও আধমাইলটাক তো হবেই, দুটি সঞ্চরণশীল অবয়ব। ওই আকৃতি মিঃ ডাউনির পরিচিত। না! ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই—দুটো বিশাল আকৃতির ডিংগো। চারণভূমির সীমানা যেখানে লোহার জাল দিয়ে ঘেরা তারই ধারে ঘোরাঘুরি করছে দুটো জানোয়ার। ডিংগো দুটোর মতিগতি মোটেই সুবিধার ঠেকল না ডাউনি সাহেবের। ধীরে-ধীরে তাদের দৃষ্টির বাইরে এসেই তিনি প্রাণপণে ঘোড়া ছোটালেন স্থানীয় মেষরক্ষককে খবর দিতে। প্রসঙ্গত এইখানে উল্লেখ্য যে, মিঃ ডাউনি যে পশুপালকটিকে খবর দিতে এসেছিলেন, 'তে-ঠেঙা শয়তান'-টা তাঁর চারণক্ষেত্রেই প্রথম হানা দেয়। ডিংগো দুটোর খোঁজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই পশুপালক, মিঃ ডাউনিকে সঙ্গে নিয়ে একটা মোটরগাড়িতে চড়ে চারণভূমির দিকে দ্রুত রওনা হলেন। দুজনেই সঙ্গে নিলেন একটি করে রাইফেল।

চারণক্ষেত্রে পৌঁছে দুজনে আবিষ্কার করলেন যে, ডিংগো দুটো ততক্ষণে লৌহজালের বেষ্টনী ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়েছে এবং ইতোমধ্যেই একটা ভেড়াকে হত্যা করেছে।

অব্যর্থ লক্ষ্যে অগ্নিবর্ষণ করল মিঃ ডাউনির রাইফেল। সঙ্গে সঙ্গে তৃণশয্যা গ্রহণ করল তিন-পা ওয়ালা কদাকার জন্তুটা। আহত হলেও তার সে মূর্ছা ছিল সাময়িক। চকিত আক্রমণের প্রথম ধাক্কা সামলে নিয়েই সে তার তিন-পায়ে ভর করে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটল লৌহবেষ্টনীর দিকে এবং অপেক্ষাকৃত একটি ক্ষুদ্রাকার ছিদ্রপথ দিয়ে আশ্চর্য কৌশলে নিষ্ক্রান্ত হয়ে উধাও হয়ে গেল। আসল শিকার হাতছাড়া হয়ে যেতে শিকারিরা এবার নজর দিলেন দ্বিতীয় কুকুরটার দিকে। তৃণক্ষেত্রের উপর দিয়ে সেটাও দৌড়ে পালাচ্ছিল। তবে লোহার জালের দিকে নয়, তার উলটোদিকে। পরপর দুটি গুলি ছুড়লেন মিঃ ডাউনি। লক্ষ্য ছিল প্রায় নির্ভুল, কিন্তু আশ্চর্য তৎপরতার সঙ্গে এঁকেবেঁকে দৌড়ে ডিংগোটা দুটো বুলেটই এড়িয়ে গেল। চলন্ত মোটর থেকে লক্ষ্য নির্ভুল রেখে রাইফেল চালানো এক কষ্টকর ও শ্রমসাধ্য প্রচেষ্টা সন্দেহ নেই, তাই যে মেষরক্ষক ভদ্রলোকটি গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি এক ভিন্ন উপায় অবলম্বন করলেন। তাঁর খানিকক্ষণের প্রচেষ্টাতেই পরিকল্পনা সফল হল।

বামপ! বামপ!

গাড়ির পরপর দুটো চাকাই এক সময় ডিংগোটার গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল। মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে ডিংগোটা শেষবারের মতো চেষ্টা করল তার আততায়ী দুজনকে আক্রমণ করার। কিন্তু রাইফেলের লক্ষ্য এবার আর ব্যর্থ হল না। তপ্ত সীসার মৃত্যুদংশন কুকুরটাকে তৃণক্ষেত্রের উপর শুইয়ে দিল।

আগ্নেয়াস্ত্রের মৃত্যু আলিঙ্গন এড়িয়ে চম্পট দিল 'রেড কিলার', সঙ্গদোষে মৃত্যুবরণ করল তার সঙ্গিণী। কিন্তু সেদিনের জন্য তিন-পা ওয়ালা খুনিটার কপালে আরও কিছু দুর্ভোগ জমা ছিল।

আহত অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে জন্তুটা যখন একটা ঝোপের মধ্যে বিশ্রাম নিচ্ছিল, সেই সময়ই সে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়।

ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায় যে ওই সময়ে স্থানীয় এক কৃষক ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে শহর থেকে গ্রামের দিকে ফিরছিল। গাড়ির পাশে পাশে ছুটছিল কৃষকের পোষা ক্যাঙারু হাউন্ড—বিশালাকৃতি শিকারি কুকুর। দুর্ভাগ্যবশত ঝোপের আড়ালে বিশ্রামরত 'রেড কিলার' কৃষকের দৃষ্টিকে এড়াতে পারল না, এবং বুনো কুকুরটাকে দেখামাত্রই কৃষক তার পোষা শিকারি কুকুরকে লেলিয়ে দিল জন্তুটার দিকে। প্রভুর প্ররোচনায় হাউন্ডটাও ঝাঁপিয়ে পড়ল আহত, পরিশ্রান্ত তিনটি পা-ওয়ালা ডিংগো-টার উপর।

কিছুক্ষণ ধরে দুই সারমেয় দানবে লড়াই চলল, কিন্তু অবশেষে বণ্য হিংস্রতা এবং রণকৌশলের কাছে পরাজিত হল শিক্ষিত কুকুর। কণ্ঠদেশে গভীর ক্ষতচিহ্ন বহন করে রণে ভঙ্গ দিয়ে পিছিয়ে এল কৃষকের ক্যাঙারু-হাউন্ড। 'রেড কিলার' ততক্ষণে এগিয়ে চলেছে অদূরবর্তী জঙ্গলের দিকে। এই ধরনের বিরক্তিকর পরিস্থিতিকে বর্তমানে সে এড়িয়ে যেতে চায়।

কিন্তু কৃষক তাকে অত সহজে মুক্তি দিল না। গাড়িতে জোতা ঘোড়া খুলে নিয়ে সে জন্তুটার পশ্চাদ্ধাবন করল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। অনায়াসে অশ্বারোহী কৃষককে ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলের গভীরতর অঞ্চলে আত্মগোপন করল 'রেড-কিলার'।

পরবর্তী ক'টি মাস কাটল নির্বিঘ্নে। আঞ্চলিক অধিকাংশ মেষরক্ষকই বুঝতে পারল যে আহত অবস্থায় আত্মগোপনকালে মারা গেছে শয়তানটা। ফলে সবাই মোটামুটি কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল। কিন্তু বৃথা আশা।

পূর্ব প্রথামতো 'রেড কিলারের' অজ্ঞাতবাসের সমাপ্তি ঘটল পরপর কয়েকটি দিনের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ভেড়াকে হত্যা করে। ওয়ারুনা উপত্যকার পশুপালকদের রাতের ঘুম আবার উধাও হল।

নতুন করে জন্তুটার মাথার উপর ঘোষিত হল পুরস্কারের মোটা অঙ্ক, নতুন করে উদ্ভাবিত হতে লাগল কৌশলের পর কৌশল, নতুন করে ওয়ারুনার বুকে ভিড় জমাতে লাগল পেশাদার ও অপেশাদার শিকারির দল, কিন্তু ব্যর্থতার ক্রমান্বয় পুনরাবৃত্তি ছাড়া অন্য কিছু বাস্তব লাভ হল না।

ওয়ারুনা উপত্যকার মেষরক্ষকদের মনে তখন জমে উঠেছে হতাশার ঘন মেঘ, এমন সময় একদিন অকুস্থলে এসে হাজির হল একজন স্থানীয় শিকারি। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভালো যে এই শিকারিটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় আদিম অধিবাসী। উপরন্তু সে ছিল একজন বর্ণসঙ্কর।

'রেড কিলার' সম্পর্কে যাবতীয় ঘটনাবলী শুনে নিয়ে শিকারিটি তার প্রয়োজন জানাল—

—'গুড়! গুড় আছে?' ওয়ারুনার পশুপালককে প্রশ্ন করে লোকটি।

—'হ্যাঁ, তা আছে। কিন্তু...' হতভম্বের মতো উত্তর দেয় পশুপালক ভদ্রলোক।

—'তাহলে আর চিন্তা নেই', বেশ কিছুটা উৎফুল্লভাবেই বলে শিকারিটি, 'এবারে রেড কিলার নির্ঘাত মারা পড়বে।'

স্থানীয় শিকারির কৌশলটি ছিল অভিনব।

সেই দিন রাত্রে তাঁর নির্দেশমতো ভেড়াগুলোকে খোঁয়াড়ের মধ্যে না রেখে প্রান্তরের উপরই ছেড়ে রাখা হল। যদিও ওই প্রান্তরকে বেষ্টন করে ছিল সুকঠিন লৌহ-জালের প্রতিরোধ কিন্তু বিগতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, ওই জাল কেটে চারণভূমিতে ঢুকে ভেড়া মারতে কোনোদিনই 'রেড কিলার' অসুবিধা বোধ করেনি।

শিকারির নির্দেশে বেষ্টনীকে ঘিরে আশেপাশে অনেকখানি জায়গা জুড়ে এইবার ছড়িয়ে দেওয়া হল ঘন তরলী গুড়, যার ফলে কোনো ভূ-চর প্রাণীর পক্ষেই গুড়ের উপর পদাপর্ণ না করে ভেড়াগুলোর নাগাল পাওয়া সম্ভব ছিল না। গুড়ের উপর পা পড়লে চটচটে গুড় পায়ে আটকে যায় এবং কুকুরের স্বভাব অনুযায়ী তারা পায়ের থাবা চেটে চেটে ওই অস্বস্তিকর পদার্থটাকে দূর করতে চায়। গুড়ের মিষ্টি স্বাদ ভালো লাগার ফলে স্বাভাবিক কারণেই সে আরও বেশি গুড় চেটে চেটে খেতে শুরু করে। ঠিক এই পশু মনস্তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই স্থানীয় শিকারিটি তাঁর ফাঁদ পেতেছিল।

শিকারির নির্দেশমতো সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে ওয়ারুনার পশুরক্ষক যখন সে দিন রাত্রে শুতে গেলেন তখন তাঁর মানসচক্ষে ভেসে উঠছিল পরদিন প্রত্যুষে চারণভূমির উপর ইতস্তত ছড়ানো আরও কতকগুলি নিরীহ ভেড়ার মৃতদেহ।

সারারাত কোনোক্রমে কাটিয়ে পরদিন খুব ভোরে অনুসন্ধান দল নিয়ে চারণক্ষেত্রে ছুটে গেলেন পশুপালক। সামান্য কিছুক্ষণের অনুসন্ধানে চোখে পড়ল একটি মৃতদেহ—লৌহজালের বেষ্টনীর ঠিক পাশে।

শিকারি তাঁর কথা রেখেছে। তীব্র বিষ 'গ্রাউন্ড সায়ানাইড' মিশ্রিত গুড়ের ফাঁদে পা দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে উপত্যকার বিভীষিকা 'রেড কিলার'।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%