প্রতিধ্বনির অভিশাপ

নির্বেদ রায়

আফ্রিকা। রহস্যময়ী আফ্রিকা। পূব ও পশ্চিমের বহু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের কাছে এই মহাদেশের রূপ নিত্যনতুন; কিন্তু শিকারির চোখে আফ্রিকা চিরআদিম, চিরন্তনী!

এই মহাদেশের এক দিকে যেমন বিরাজ করছে বিরাট মরুভূমি, অন্য দিকে তেমনি বিশাল অরণ্যের বিস্তার—আর এই প্রাকৃতিক পটভূমিকে আশ্রয় করে গড়ে উঠছে সভ্য সমাজ। রাজনীতিবিদরা আপাতত এই সভ্য মানুষদের নিয়ে ভাবুন; আমরা চলে যাই বরং অরণ্যের অধিবাসীদের খবর নিতে।

আফ্রিকা মহারণ্যের মাঝখানে রয়েছে যে সব ঘাসে ঢাকা বিশাল তৃণভূমি সেখানে চড়ে বেড়ায় কালো মেঘের মতো যে মোষের পাল তাদের সঙ্গে আমাদের চেনা-পরিচিত মোষদের কিছু তফাত রয়েছে। আফ্রিকার বিভীষিকা এই মহিষাসুর হল 'কেপ-বাফেলো।'

বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্র আর অসম্ভব ধূর্ত এই জানোয়ারের প্রধান অস্ত্র তার দুটি শিং এবং দুজোড়া শক্তিশালী পায়ের খুর। প্রকৃতি এই চতুষ্পদকে সাজিয়েছে আরও একটি অভিনব অস্ত্রে—'কেপ-বাফেলো'র মাথায় ঠিক যোদ্ধাদের 'হেলমেট' বা শিরস্ত্রাণের মতোই রয়েছে একটি অত্যন্ত পুরু হাড়ের আবরণ, যার নাম 'বস অফ দ্য হর্ণ'। পৃথিবীর অন্য মহিষদের এই শিরস্ত্রাণ নেই। বন্দুকের গুলিও এই হাড়ের দুর্গকে ভেদ করে মোষের মাথায় কামড় বসাতে পারে না।

পেশাদার শিকারিদের কাছে তাই 'কেপ-বাফেলো' শিকার এক দুর্লভ প্রাপ্তি, এক স্বপ্নের সাফল্য। সুতরাং, ন'জুই নামে আফ্রিকান সহচরটির মুখে 'মবোগো-ইয়া-মংগু' অর্থাৎ যমের বাহনের মতো বিশাল মোষটার কথা শুনে শিকারি স্নিলকের রক্ত স্বাভাবিক কারণেই গরম হয়ে উঠেছিল। রক্ত গরম হওয়ার আর একটা সঙ্গত কারণ অবশ্য এই যে, মোষটা এরমধ্যেই শ'খানেকের উপর মানুষ মেরেছে।

মোষ সাধারণত বাঘ বা সিংহের মতো মানুষ মারে না। কারণ সহজ, মানুষ তার খাদ্য নয়। কিন্তু এই মোষটার কথা আলাদা—নিছক হত্যার আনন্দেই নয়-নয় ক'রে অন্তত শ'খানেক মানুষকে এরই মধ্যে সে যমের দুয়ারে পাঠিয়েছে অথচ একটা তীর অথবা বল্লমের ফলা তার শরীর স্পর্শ করতে পারেনি, বন্দুকের গুলি তো দূরের কথা। স্থানীয় উপজাতিদের কাছে মোষটা ক্রমে হয়ে উঠেছে একটা অলৌকিক জন্তু, দেবতার বাহন। তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে, 'দেবতার বাহনকে' মানুষের পক্ষে মারা সম্ভব নয়।

স্নিলক কিন্তু তাদের বিশ্বাসে সায় দিতে পারেনি, না পারারই কথা। অলৌকিকতার চেয়ে তার বেশি বিশ্বাস হাতের বন্দুকের উপর। তাই ন'জুই চুপ করলে সে বলেছিল, 'এবার তা হলে আমি নিজেই একবার মোষটাকে মারার চেষ্টা করে দেখি, কি বলো?'

শুনে যেন আঁতকে উঠেছিল ন'জুই, 'সে কী! এত কথা শোনার পরও তুমি যাবে 'বাওয়ানা'? না, না, যেওনা; এভাবে আত্মহত্যা করার কোনো মানে হয় না।' শেষে স্নিলককে নিরস্ত করতে না পেরে হতাশভাবে মাথা নেড়েছিল, 'তা হলে তোমায় একাই যেতে হবে বাওয়ানা, তোমার সঙ্গে আর কেউ পাগলের মতো মরতে যাবে না...'

ন'জুইকে কথা শেষ করতে না দিয়েই এবার উত্তর দিয়েছে স্নিলক, চাপা বিদ্রপ ফুটেছে স্পষ্ট তার গলায়, 'পাগলামি না ভয়? সত্যি কথাটাই বরং বলো ন'জুই। এতবড় জোয়ান লোকগুলোর বুকের মধ্যে কি মুরগির কলজে ভরে দিয়েছে ভগবান, কি হে?'

ভীতু! কাপুরুষ! নিমেষে আগুন ধরে গেছে ন'জুই-এর আদিম রক্তে। বাওয়ানার কথায় দপ করে জ্বলে উঠে সে জবাব দিয়েছে, 'ভয়? ভয় এ বান্দা কাউকে পায়না বাওয়ানা; শুধু যার সঙ্গে লড়াই দেওয়া যায় না, তাকেই আমি ভয় পাই। তবু চলো, তুমি যখন যাবেই বলছ, তখন ন'জুইও তোমার সাথে থাকবে।'

চুপ করল ন'জুই। সমস্ত জায়গাটা জুড়ে একটা ভারী নিস্তব্ধতা। স্নিলক একদৃষ্টে চেয়ে আছে সামনে আগুনের কুণ্ডটার দিকে; ন'জুই-এর দু-চোখ তখন প্রসারিত খানিকদূরের 'সিডার' বনের সীমানায়—কেনিয়ার সিডার বন!

'প্রতিধ্বনিমুখর মৃত্যু-উপত্যকা!'

নামটা এইরকমই বটে। আফ্রিকার মহা অরণ্যের মাঝখানে ঘাসে ঢাকা বিরাট তৃণভূমি; মাঝেমধ্যে দু-চারটে বড় গাছ মাথা তুলেছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। উজ্জ্বল সবুজের সেই সমারোহের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ জুড়িয়ে যায়, মন উদাসী হয়, বুলেট আর রক্তের কথা মানুষ ভুলতে চায় তখন।

স্নিলকও বোধহয় ভুলতে বসেছিল, অন্তত দেখেশুনে ন'জুই-এর সেরকমই মনে হয়ে থাকবে; ভারী গলায় সে বলল, 'সাহেব, এই হল মৃত্যু-উপত্যকা!'

যেন সম্বিত ফিরে স্নিলক থমকে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে পড়ল গোটা দলটা। দল বলতে অবশ্য তিনটে মানুষ—স্নিলক, ন'জুই, ন'জুই-এর ভাই কেপেজ আর ছ'টা 'মংগ্রিল' কুকুর'। হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত ন'জুই শুধু একাই আসেনি, সঙ্গে নিয়ে এসেছে ভাই কেপেজকেও। খুব ইচ্ছা যে ছিল এমন নয়, কিন্তু সাহেবের কাছে সম্মানরক্ষার প্রশ্নটা তার কাছে অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্নিলক অবশ্য এসব চিন্তায় মাথা ঘামাচ্ছে না আপাতত—উপত্যকায় পৌঁছে প্রথমটা তার রূপে মুগ্ধ হলেও এখন সে কাজের কথা ভাবতে চায়, নইলে 'যমের বাহনের' আস্তানায় দাঁড়িয়ে তাঁর অবস্থাও যদি আগের শ'খানেক হতভাগ্য মানুষের মতো হয়ে যায়, তখন আপশোষের সময় মিলবে না।

উপত্যকার চারদিক জুড়ে চলে গেছে অজস্র মোষের পায়ের ছাপ, তার মধ্যে থেকে একটা কোনো বিশেষ মোষকে খুঁজে বের করা মুশকিল। খড়ের গাদায় ছুঁচ খুঁজে বের করার কথাই মনে হয়ে থাকবে স্নিলকের, কিন্তু মাথা নীচু করে সেই ছাপগুলোকে শিকারি কুকুরের মতো খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ ন'জুই চেঁচিয়ে উঠল, 'বাওয়ানা, এই যে পাওয়া গেছে! এদিকে এসো।'

খানিকটা অবিশ্বাস নিয়েই এগোল স্নিলক, কিন্তু কাছে এসে তাঁর বুঝতে দেরি হল না যে ন'জুই অভ্রান্ত—অত বড় ছাপ মোটামুটি অন্ধ না হলেই খুঁজে বার করা যায়। প্রমাণ আকারের খাবার প্লেটের মাপের সেই ছাপের মালিকের চেহারাখানা মনে মনে চিন্তা করে একবার বোধহয় শিউরে উঠল স্নিলক। আশপাশের খুরের দাগগুলো ওর পাশে নেহাতই বামন মনে হচ্ছে। ন'জুই-এর কথা কানে এল—'বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে মোষটা এখান দিয়ে গেছে, চলো আরো এগিয়ে দেখা যাক।'

খুনি মোষটার পদচিহ্ন হারাবার কোনো আশঙ্কা নেই। সেই নিশানা ধরে ক্রমে ক্রমে প্রায় মাইল তিনেক পথ পেরিয়ে আসার পর দেখা গেল সামনে বুনো ঝোপঝাড়ে জঙ্গল তিনভাগে ভাগ হয়ে গেছে। হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে ছাপটাকে ভালো করে পরীক্ষা করে নজুই উঠে দাঁড়াল—'মোষটা ওই প্রথম ভাগের জঙ্গলটার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে বাওয়ানা। সবসময়ই দেখেছি ও এই তে-ফলা জঙ্গলটার মধ্যে গিয়ে ঢোকে।'

প্রথম ভাগের জঙ্গলটার ঠিক মুখে একটা বড় ঝোপ। 'ম্যানলিকার' রাইফেলে গুলি ভরে সেই ঝোপটার কাছে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল স্নিলকের মাথায়—না, মহিষটাকে তাড়া করে নয়, বরং সেটাকেই ডেকে আনতে হবে এখানে, তাহলে বিপদ অনেক কম।

একটা আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য আছে এই উপত্যকার, এখানে কোনো আওয়াজ করলে সেটা প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে-ফিরে আসে চারদিক থেকে আর আশ্চর্যের ব্যাপার হল শয়তান মোষটা সে কথা জানে। তাই শত্রুকে বা শিকারকে ওই প্রতিধ্বনিতে বিভ্রান্ত করে হত্যা করাটাই তার রেওয়াজ। ন'জুই-এর কাছেই স্নিলক কথাটা শুনেছিল। এখন উল্টে মোষটাকেই বিভ্রান্ত করার চিন্তা মাথায় আসতে তাই কেপেজকে ডেকে সে বলল একটু দূরে গিয়ে চিৎকার করতে। আগে দেখে নেওয়া যাক আসল ঘটনাটা কি?

চিৎকার শোনা গেল কেপেজের একটু বাদেই, আর কি আশ্চর্য, তারপরই গোটা উপত্যকা জুড়ে যেন ধাক্কা খেয়ে খেয়ে ভেসে আসতে লাগল তার রেশ; ডাইন-বাঁয়ে, সামনে-পিছনে সব দিকে থেকে।

ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে স্নিলক এবার পরিকল্পনা ঠিক করল। বুনো ঘাসঝোপে লুকিয়ে গুলি চালানো সহজ হতে পারে কিন্তু ভুললে চলবে না যে, 'কেপ বাফেলো' হল পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান জন্তুদের মধ্যে একটা, তাই তার গতিবিধি দেখে সময়মতো যাতে তাকে সাবধান করে দিতে পারে সেইজন্য কেপেজ আর ন'জুই-কে স্নিলক দুটো উঁচু জায়গায় উঠে আস্তানা গাড়তে বলল। কেপেজ গিয়ে উঠল একটা নেড়া টিলার উপর, আর ন'জুই সামনের একটা গাছে। ঘাসঝোপের মধ্যে থেকে ন'জুইকে চোখে পড়ছে না বটে কিন্তু কেপেজের কালো শরীর স্পষ্ট চোখে পড়ছে; সেই দিকে চেয়ে স্নিলক এবার অপেক্ষা করতে শুরু করল।

কুকুরগুলো ডেকেই চলেছে; প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটার পর হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল কেপেজের। চমকে উঠে হাতের রাইফেল তুলে সামনের দিকে তাকাল স্নিলক। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।

জঙ্গলের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বেরিয়ে এল চারটে মোষের একটা দল। চলেছে তারা তিন নম্বর ভাগটার দিকে। পেছনে চিৎকার করে তাড়া করছে কুকুরবাহিনী, কিন্তু সে দিকে বিশেষ ভ্রক্ষেপ নেই মহিষপ্রবরদের। শুধু মাঝে-মাঝে খুব বেশি বিরক্তি বোধ করলে প্রতিবাদ জানাচ্ছে প্রকাণ্ড শিং জোড়া নীচের দিকে নেড়ে আর তৎক্ষণাৎ ছিটকে আওতার বাইরে সরে যাচ্ছে কুকুরের দল—তারা বিলক্ষণ জানে ওই শিং-দুটোর মর্ম; দেখেশুনে রাইফেল নামাল স্নিলক; না, এদের খোঁজে সে এখানে আসেনি।

মোষগুলো ঢুকে গেল জঙ্গলের ফালিটার মধ্যে। বেশ খানিকক্ষণের বিরতি আবার। তারপর একসময় ফের শোনা গেল কেপেজের গলা—'কামাতা! কামাতা!' অর্থাৎ 'ধরো! ধরো!'

আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসল স্নিলক। আর একটা মোষের দল। প্রথমে স্ত্রী-মহিষটাকে দেখে একটু হতাশ হয়েছিল বটে কিন্তু তারপরেই... হ্যাঁ, চোখ চেয়ে দেখবার মতো একখানা চেহারা বটে! কালো মেঘের মতো চামড়ায় মোড়া আঁটোসাটো প্রকাণ্ড শরীর, জোড়া-সঙিনের ফলার মতো আকাশের পটে আঁকা বিরাট দুটো শিং, চলাফেরায় রাজকীয় মহিমা, সত্যিকারের 'যমের বাহন'ই বটে!

দেখেশুনে খানিকটা হতভম্ব হয়ে গেছিল স্নিলক, ঘোর কাটল যখন, তখন মোষ আর তার মাঝখানে মাত্র পনেরো গজের জমি। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল মোষটা; কে জানে হয়তো বনের বাতাস তার নাকে বয়ে এনেছে শত্রুর গন্ধ? স্নিলক কিন্তু আর সময় নষ্ট করা সুবিধের বলে মনে করল না। মোষের গলা আর ঘাড়ের সন্ধিস্থল নিশানা করে বন্দুকের ঘোড়া টিপল।

খুব রয়ে-সয়ে নিশানা করবার সুযোগ ছিল না; গুলি তাই একেবারে মর্মস্থানে কামড় বসিয়ে মোষকে তৎক্ষণাৎ পেড়ে ফেলতে পারল না মাটিতে, যদিও জখম করল ভালোভাবে। কিন্তু জখম মোষ বড় ভয়ংকর জানোয়ার। স্নিলকের ভাগ্যে হয়তো অনেক দুর্গতিই লেখা থাকত যদি না এবার নিজের আস্তানার ফাঁদেই ধরা পড়ত মোষটা।

বন্দুকের আওয়াজ নিস্তব্ধ উপত্যকার বুকে বাজ-পড়ার মতো শোনাল, প্রতিধ্বনির ঢেউ উঠল চারদিক থেকে আর সেই ভেসে আসা শব্দ শুনে দিক ভুল করে রাগে অন্ধ মোষটা বিদ্যুতের মতো ছুটে পেরিয়ে গেল প্রায় একশো গজ জমি—স্নিলক যেখানে লুকিয়ে ছিল ঠিক তার উলটো দিকে। শত্রুর সন্ধানে ফেরা হিংস্র দুটো শিং খুঁজে পেল শুধুই বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা উপত্যকার বাতাস। ততক্ষণে স্নিলক মোষের পেটে আর একটা গুলি পরিষ্কার নিশানায় বর্ষণ করেছে।

দু-নম্বর গুলিটা খেয়ে মোষ এবার যুদ্ধকৌশল পালটাল, আত্মগোপন করল ঝোপের আড়ালে। আহত মোষটাকে অনুসরণ করতে স্নিলককে এবার বেরোতে হল ঝোপের আড়াল ছেড়ে, বেরোতেই ন'জুই-এর চিৎকার কানে এল তার। গাছের উপর থেকে সে তারস্বরে বারণ করছে স্নিলককে, কিন্তু স্নিলকের কানে সে চিৎকার কতগুলো অর্থহীন শব্দ ছাড়া তখন আর কিছু নয়। শিকারির দায়িত্ব স্নিলককে পালন করতেই হবে, নইলে জখম হওয়া মোষ আরও কত মানুষ খুন করবে কে জানে? শেষপর্যন্ত সাহেবকে না থামাতে পেরে ন'জুই নিজেই নেমে এল গাছের উপর থেকে।

সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ন'জুই। স্নিলকের খুবই আপত্তি ছিল এইভাবে তাঁর আশ্রয় ছেড়ে নেমে আসার ব্যাপারে কিন্তু এখন তর্ক করার পক্ষে সময়টা সুবিধের নয়—আহত কেপ বাফেলো ঝোপের আড়াল থেকে আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে; এক মুহূর্তের দাম এখন অনেক। দুজনে মিলে তন্নতন্ন করে গোটা জঙ্গলটা খুঁজতে শুরু করল—কিন্তু কোথায় মোষ? অত বড় পাহাড়ের মতো শরীরটা যেন উবে গেছে কর্পুর হয়ে।

'পালাও বাওয়ানা, পালাও!' হঠাৎ ন'জুইয়ের চিৎকার শুনে পিছনে ঘুরল স্নিলক। ন'জুই ততক্ষণে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিয়েছে। মাত্র তিরিশ গজ দূরে মূর্তিমান ধ্বংসের মতো ছুটে আসছে আহত মোষ। রক্তাক্ত দেহ, দুটো প্রকাণ্ড শিং হেলে পড়েছে পিছন দিকে এক জোড়া নিষ্ঠুর তরোয়ালের মতো, চোখ রক্তের মতো লাল, প্রকাণ্ড রেল ইঞ্জিনের মতো মাটি কাঁপিয়ে ধেয়ে আসছে 'কেপ বাফেলো'।

দনন! দননন!! উপত্যকার বুকে প্রতিধ্বনি তুলে গর্জন করে উঠল শিকারির হাতের রাইফেল। পরপর দুবার। থমকে দাঁড়াল মোষ, তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাটির উপর। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। চার-চারটে গুলি খেয়েও আবার উঠে দাঁড়াল সেই দুর্দান্ত জানোয়ার, আবার গিয়ে লুকোলো একটা ঝোপের আড়ালে।

সঙ্গে সঙ্গে আবার গুলি ভরে তৈরি হল স্নিলক। তবে এবার আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটু পরেই ভেসে এল ন'জুই-এর চিৎকার—আর্তস্বর নয়, উল্লাসধ্বনি! কপালের ঘাম মুছে পাইপ ধরাল স্নিলক।

প্রায় একশো মানুষের হত্যার নায়ক 'মবোগো-ইয়া-মংগু'র বিশাল শিং দুটো স্মারক হিসাবে সংগ্রহ করে আনতে ভুল হয়নি স্নিলকের। এক একটা শিং-এর মাপই ছিল তার পঁয়তাল্লিশ ইঞ্চির মতো। অমূল্য স্মৃতি, সন্দেহ নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%