নির্বেদ রায়

সৌন্দর্যের প্রতীক হরিণ। যুগ যুগ ধরে কবির সৃষ্টিতে, লেখনীতে, কাব্যে হরিণের উল্লেখ ঘটেছে রূপ বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক উপমা হিসাবে। তপোবনের যুগ থেকে আজও হরিণ মানুষের প্রিয় পোষ্য।
স্বভাব চরিত্রের দিক দিয়ে হরিণ নিতান্তই নিরীহ, ভীতসন্ত্রস্ত প্রাণী। অরণ্যে, শিং, দাঁত এবং নখের রাজত্বে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এই প্রাণীটির সম্বল শুধুই গতি, সুতরাং পালিয়ে বাঁচা ছাড়া নিজেকে রক্ষা করার দ্বিতীয় কোনো অস্ত্র হরিণের একরকম নেই বললেই চলে। কিন্তু এগুলো হল সাধারণ নিয়মের কথা। শহরের বুকে চিড়িয়াখানার আবদ্ধ গণ্ডি পেরিয়ে অরণ্য সাম্রাজ্যের মুক্ত পটভূমিতে যেখানে নিয়মের রাজত্বে মাঝে মাঝেই ব্যতিক্রমের দেখা মেলে, সেখানে আমাদের পূর্বোক্ত কথাগুলো হয়তো বহু ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। নীচে আমি সেরকম দুটি ঘটনার বিবরণী পেশ করলাম। লক্ষণীয় বিষয়, উক্ত কাহিনিকারদের ধারণার সঙ্গে আমাদের প্রাথমিক ধারণা এবং অভিমত সম্পূর্ণ পৃথক।
জীবনতত্ত্বর একটি সাধারণ কথা এইখানে জানিয়ে রাখা উচিত, নচেৎ প্রতিশব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। 'ডিয়ার' এবং 'অ্যান্টিলোপ', এই দুইটি প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশব্দের প্রচলন বাংলা ভাষায় নেই, ফলে উভয় ক্ষেত্রেই 'হরিণ' কথাটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 'অ্যান্টিলোপ' এবং হরিণের মূল আকৃতিগত পার্থক্য তাদের শিং-এ। হরিণের শিং ডালপালা ছড়ানো গাছের মতো, ইংরেজিতে বলে 'অ্যান্টলার'। অ্যান্টিলোপের শিং অপেক্ষাকৃত সোজা, ধারালো, ডালপালাহীন, ইংরেজি প্রতিশব্দ 'হর্ন'। অধিকন্তু, হরিণের শিং খসে পড়ে এবং পুনরায় নির্গত হয়, অ্যান্টিলোপের শিং একবারই ওঠে, খসে না। কাহিনি পড়বার সময় এই ক'টি মনে রাখতে হবে।
চিন-মুলুকের শয়তান
না, বই পড়ে শিকার হয় না। বই পড়া আর শিকার করা দুটো পুরোপুরি আলাদা ব্যাপার। 'ইয়াংজে' নদীর তীরবর্তী উপত্যকায় একটা 'সেরাও' অ্যান্টিলোপ শিকার করতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গ শিকারি ক্রিশ্চিয়ান কোহল যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ওই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার যে বিবরণ পেশ করেছিলেন, নীচে তার কিছু অংশ তুলে দিলাম।
'ইয়াংজে নদীর তীরেই আমি প্রথম সেরাও দেখলাম। তার আগে চিড়িয়াখানাতেও কোনোদিন ওই দুর্লভ প্রাণীটিকে চাক্ষুষ দেখবার সৌভাগ্য হয়নি। শিকারের নেশা আমাকে পেয়ে বসবার আগে ওই বিষয়ে যাবতীয় বই নিয়ে আমি বিস্তর পড়াশুনা করেছিলাম এবং প্রাণীবিষয়ক আমার সেই পুস্তকলব্ধ জ্ঞানের তালিকায় 'সেরাও' নামক বিশেষ শ্রেণির অ্যান্টিলোপটিও বাদ পড়েনি। ফলে এই ঘটনার আগে কোনোদিন সেরাও না দেখলেও, প্রাণীটির আকৃতি, প্রকৃতি, মুখাবয়ব প্রভৃতি সম্পর্কে আমি বেশ ওয়াকিবহাল ছিলাম। শুধু দুটি বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা ছিল না। প্রথমত, ওই প্রাণীটির ভয়ংকর স্বভাব চরিত্র এবং দ্বিতীয়, সাঁতারে তার অসাধারণ দক্ষতার কোনো উল্লেখই বইয়ে ছিল না। আর এই দুটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকার ফল হয়েছিল প্রাণঘাতী, মর্মান্তিক!'
'ন'গেই-লাই-ৎজে'।
আক্ষরিক অর্থে পাহাড়ি গাধা। এই হল সেরাও অ্যান্টিলোপের চিনে নাম। জন্তুটির প্রধান চারণক্ষেত্র পূর্ব হিমালয়ের সুউচ্চ শিখরদেশে। প্রায়শই দশ হাজার ফুট অথবা তদুর্দ্ধ উচ্চতায়। ভয়ংকর গিরিখাত ও তুষারঢালের বুকে এরা স্বচ্ছন্দ দ্রুততায় ঘুরে বেড়ায়, সমতল উপত্যকার বহু বিপদের সীমানা এড়িয়ে।
মহাযুদ্ধের কিছু আগে। চিনের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ইয়ুনান প্রদেশের কুনমিঙ অঞ্চলে আমাদের কাহিনিকার মিঃ ক্রিশ্চিয়ান কোহল ব্যবসার প্রয়োজনে ঘুরছিলেন। শিকার ছিল কোহলের সবচেয়ে প্রিয় নেশা। ফলে ব্যবসার কাজে ঘুরলেও চিন দেশের উক্ত অঞ্চলে, ব্যাপক অংশ জুড়ে তিনি বহু দুষ্প্রাপ্য জাতের ছাগল এবং হরিণ ওই সময়ে শিকার করেছিলেন। আমরা যে সময়ের কথা বলছি তখন কোহল একটি 'সেরাও' শিকারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পূর্ব-হিমালয়ের দুরারোহ শিখরে শিখরে। কিন্তু আশ্চর্য, পর্বত-চূড়ায় সেরাও-এর দেখা মিলল না, দেখা পেলেন অদ্ভুতভাবে 'ইয়াংজে' নদীর তীরবর্তী সমতল উপত্যকার বুকে। বিচিত্র এই অনুসন্ধানের ইতিহাস।
স্থানীয় গাইড বা পথপ্রদর্শক 'চেন'-কে সঙ্গে নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চিয়ান কোহল দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে কুনমিঙ-এর সন্নিহিত পর্বত শিখরগুলির সুউচ্চ চূড়ায় ঘোরাঘুরি করেছিলেন। হাল্কা বাতাসে শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গকে আগ্রাহ্য করেও তাঁরা ওই দুর্লভ প্রাণীটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। চেন-এর প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু ভাগ্য মন্দ। জন্তুগুলোর খুরের ছাপ মিললেও, চাক্ষুষ দর্শন মিলল না।
একটি দিনের কথা। শ্বেতাঙ্গ কোহল এবং চেন উভয়ে দুটি পর্বতশিখরের মধ্যবর্তী কয়েকশো ফুট গভীর সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের পাশে কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। হঠাৎ শিষের মতো তীক্ষ্ন এক নাসিকাধ্বনি কোহলের কানে এল, এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা পাথর আলগা হয়ে মাথার উপর থেকে গড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য হল গিরিখাতের অতলে। এক জীবন্ত ছায়ামূর্তি উপরের একটি গিরিশিখর থেকে অন্য পবর্তচূড়ায় লাফ দিয়ে চলে গেল।

'লাই-ৎজে'! চেন-এর কণ্ঠস্বর উত্তেজিত। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর প্রায় চোদ্দো দিন ধরে বহু খোঁজাখুজির পরও সেরাও-এর দেখা পাওয়া তো দূরের কথা, কোনো হদিসই পেলেন না তাঁরা। পরিশেষে হাল ছেড়ে দিলেন কোহল। সেরাও খোঁজার ইস্তফা দিয়ে সমতলভূমিতে নেমে আসাই সমীচীন মনে হল তাঁর।
কুনমিঙে ফেরার পথে হোয়াইলি নামক একটি স্থানে রাত কাটাতে হল কোহলকে। চেন-এর জনৈক আত্মীয় ছিল স্থানীয় অধিবাসী। হোয়াইলি অঞ্চলের অনতিদূরে বয়ে চলেছে পীত রঙের ইয়াংজে নদী। সেই ইয়াংজের তীরবর্তী অঞ্চলেই উক্ত আত্মীয়টির বাসস্থান। কোহলের অনুমতি নিয়ে সে রাত্রেই চেন তার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
পরদিন ভোরে সে যখন ফিরে এল, তখন সে উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে। তার দীর্ঘ বক্তব্যের সারমর্ম হিসাবে কোহল বুঝলেন যে, ইয়াংজে নদীর পার্শ্ববর্তী উপত্যকায় প্রায়শই একটা সেরাও-এর আবির্ভাব ঘটে বলে চেন-এর আত্মীয়টি তাকে জানিয়েছে। প্রায় দিনই সে নাকি ক্ষেতে কাজ করতে করতে জন্তুটাকে দেখতে পায়। খাবার লোভে জন্তুটা রাত্রে নদী পার হয়ে এ পারে আসে এবং সারারাত ধরে ভোজনপর্ব সমাধা করে ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাঁতরে নদী পার হয়ে অপর পারে পাহাড়ের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যায়।
চেন-এর কথায় বেশ এটু চমকে গেলেন কোহল। কারণ, দশ হাজার ফুটের নিরাপদ উচ্চতা ছেড়ে হঠাৎ কী কারণে একটা সেরাও সমতলভূমির বুকে অবতীর্ণ হতে পারে, সেটা তাঁর মাথায় ঢুকছিল না। কিন্তু কোহলের মনে সন্দেহ থাকলেও, চেন তার বিশ্বাসে অটল। শেষ পর্যন্ত সে তার আত্মীয়টিকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। সম্পর্কে সে হল চেন-এর এক নিকট সম্পর্কের ভাই।
সাহেব এবং তার ভাই-এর কথোপকথনের মধ্যে চেন দোভাষীর ভূমিকা নিল। কোহল তাকে জন্তুটার বর্ণনা দিতে অনুরোধ করলে সে যা বলল, তার ফলে আর কোনো সন্দেহ থাকার কারণ ছিল না। চেন-এর ভাইয়ের বর্ণনা অনুসারে প্রাণীটা বেঁটে কিন্তু বলিষ্ঠ গড়নের, ছাগলের আকৃতি বিশিষ্ট। ওজনে হবে প্রায় দুশো পাউন্ড। গায়ের চামড়া লাল রঙের—রোমশ। ছোট ছোট দুটি শিং সোজা এবং ধারালো। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য জন্তুটার কান দুটো। খাড়া ছুচোলো—একদম গাধার মতো। কোহলের পক্ষে এই বর্ণনা যথেষ্টরও বেশি। নাঃ, চেন-এর ধারণা অভ্রান্ত; ওই গাধার কানওয়ালা মাথাটিই স্মারকচিহ্ন হিসাবে কোহলের প্রয়োজন। এই প্রাণীটার খোঁজেই এতদিন ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন তাঁরা।
চেন-এর ভাই কোহলকে আরও জানাল যে, নদীর অপর পাড়ে জন্তুটার যাতায়াতের পথে একটা গর্তের ফাঁদ কেটে সে ওটাকে ধরার চেষ্টা করেছিল। গর্তের মুখ নমনীয় গাছের ডাল এবং পাতা প্রভৃতি দিয়ে এমনভাবে ঢাকা ছিল যার ফলে কোনো মতেই ফাঁদের হদিশ পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু আশ্চর্য অনুভূতি বলে হরিণটা আজও নাকি গর্তটাকে এড়িয়ে চলাফেরা করে চলেছে।
কথাবার্তা শেষে কোহল 'আত্মীয়টির' কাছে একটা প্রস্তাব রাখলেন। হরিণটাকে মারলে কেবলমাত্র মাথাটাই তিনি নেবেন, বাকি দেহাংশ হবে ওই আত্মীয়টির প্রাপ্য। উত্তম প্রস্তাব। গররাজি হওয়ার মতো কিছু দেখতে পেল না চেন-এর ভাই। সে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল।
পর দিন সকালে অকুস্থলে পৌঁছে ক্রিশ্চিয়ান কোহল এবং চেন উভয়েই 'সাম্পানে' চড়ে নদী পার হলেন। সাম্পান চিনদেশের এক ধরনের নৌকা। অপর পাড়ে অবতীর্ণ হয়ে সামান্য অনুসন্ধানেই নজরে পড়ল সেরাওটার যাতায়াতের পথ। মসৃণতা দেখে বোঝা যায় যে পথটি বহু ব্যবহৃত। প্রায় শ-খানেক গজ এগিয়ে গিয়ে ফাঁদটাও আবিষ্কার করলেন তাঁরা দুজন। ছড়ানো-ছিটানো গাছের ফাঁকে ফাঁকে চলে যাওয়া পথের উপর লতাপাতা দিয়ে ঢেকে রাখা একটি গর্ত!
দুজনেই ঠিক করলেন যে, পরদিন প্রত্যুষে নদীর যে পারে হরিণটা খাদ্য সংগ্রহের জন্য আসে অর্থাৎ চেন-এর আত্মীয় যে পারে বাস করে; সেইখানেই তাঁরা জন্তুটার জন্য অপেক্ষা করবেন। সমতলভূমির উপর হরিণ শিকার অবশ্যই কোনো রোমাঞ্চকর ঘটনা নয়; কিন্তু সেরাও-এর সন্ধানে কোহল যে পরিমাণ নাজেহাল হয়েছিলেন, তাতেই সে আপশোষটুকু পুষিয়ে গিয়েছিল।
পরদিন ভোর...
ইয়াংজের পীতরঙের জলে সূর্যোদয়ের লাল আলো তখনও বিচিত্র বর্ণচ্ছটার সৃষ্টি করেনি। নদীর পারে একটা পাতাঝোপের আড়ালে আশ্রয় নিলেন কোহল এবং তাঁর সঙ্গী। ধীরে ধীরে সময় কাটতে লাগল। ক্রমে কেটে গেল সুদীর্ঘ কয়েকটি ঘণ্টা। শিকারিদের সতর্কতা এবং মানসিক চাপেও ঢিলে পড়তে লাগল। কোহলের তো বেশ একটু গা-ছাড়া দেবার ভাব এসে গিয়েছিল। এমন সময় অল্প দূরে গাছপালার সঙ্গে কোনো সচল বস্তুর ঘর্ষণের খসখস শব্দ কানে ভেসে এল, তারপরই শিকারিদের উন্মুক্ত দৃষ্টিপথে নদীর তীরবর্তী জমির উপর আবির্ভূত হল একটা বেশ বড়সড় সেরাও। অদ্ভুত আকৃতির মাথাটা উপর নীচে করতে করতে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিল নদীর দিকে।
বিগত ঘণ্টা কয়েকের নিষ্ক্রিয়তা কোহলের মধ্যে সাময়িক আলস্য এনে দিয়েছিল, ফলে বন্দুকের লক্ষ্য স্থির করতে যে সময়টুকু গেল তার মধ্যে হরিণটা সচকিত হয়ে এক বিরাট লাফে প্রায় পনেরো ফুটের মতো জমি পেরিয়ে নদীর জলে গিয়ে পড়ল। স্বাভাবিক কারণেই শিকারির গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। নদীবক্ষে অর্ধনিমজ্জিত জন্তুটার মাথার অল্প দূর দিয়ে কোহলের বুলেট জল ছিটকে বেরিয়ে গেল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে নিজের ভাগ্যকেও ধন্যবাদ দিলেন কোহল। আরেকটু হলেই সর্বনাশ হয়েছিল আর কি! যে স্মৃতিচিহ্নর জন্য এত পরিশ্রম, সেই মাথাটাই তিনি অল্পের জন্য গুঁড়িয়ে দিতে বসেছিলেন। সে যাই হোক, তখনকার মতো আর গুলি করার সুযোগ পেলেন না কোহল। একমাত্র উপায় নৌকায় চড়ে জন্তুটার পশ্চাদ্ধাবন করা।
'সাম্পান'!
আড়াল ছেড়ে লাফিয়ে উঠে কোহল ছুটলেন নদীর দিকে। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে নৌকা খুলে দুজনেই তাড়া করলেন জন্তুটার পিছনে। কিন্তু চেন নৌকার গতি বৃদ্ধি করতে সর্বশক্তি নিয়োজিত করলেও খানিকক্ষণের মধ্যেই কোহলে বুঝতে পারলেন যে, এইভাবে সেরাওটার নাগাল পাওয়া অসম্ভব, কারণ অসাধারণ দৈহিক পটুতায় সে ক্রমেই নৌকার সঙ্গে তার নিজের ব্যবধান বাড়িয়ে চলেছে। সেরাও যখন অপর পাড়ে প্রায় পৌঁছে গেছে, কোহলের সাম্পান তখন তার দুশো ফুট পিছনে। বাধ্য হয়েই কোহল তাঁর মত পালটালেন। তিনি ঠিক করলেন যে, হরিণটা নদীর পাড়ে উঠলেই গুলি করবেন।
কোহল বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত হলেন, কিন্তু হরিণ জমির উপর উঠল না। হঠাৎ ঘুরে সাঁতার কেটে এগিয়ে এল নৌকার দিকে। জন্তুটার অকস্মাৎ মতি পরিবর্তনের কারণ কোহল তখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি, যদিও চেন তৎক্ষণাৎ সাম্পানটার গতিপথ পরিবর্তন করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল। চেন-এর প্রচেষ্টা আংশিক সফল হলেও লাভ বলতে তেমন কিছু হল না, নিজস্ব ভরবেগের ধাক্কায় নৌকা এগিয়ে গেল নিকটবর্তী নদীর পারের দিকে। দ্রুতগতিতে জল কেটে নৌকার নিকটবত. হল ছাগলের মতো আকৃতি বিশিষ্ট জন্তুটা, শুধুমাত্র তার অদ্ভুত মাথা এবং দেহের উপরিভাগের কিছু অংশ জলের উপরে দৃশ্যমান। কোহলের যথেষ্ট সুযোগ ছিল গুলি করার, কিন্তু মৃতদেহটা গভীর নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে এই আশঙ্কায় তিনি বিরত হলেন। সেরাওটা ততক্ষণে নৌকার একদম পাশে এসে পড়েছে। জন্তুটার গতিবিধি কোহলের ভালো ঠেকছিল না, বন্দুকের কুঁদোর সাহায্যে জন্তুটাকে নৌকার পাশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি সচেষ্ট হলেন।
এমন সময় ঘটল সেই অঘটন। কোহলের হস্তধৃত বন্দুকের বাঁট সেরাওয়ের দেহ স্পর্শ করার আগেই হতচ্ছাড়া জানোয়ারটা অকস্মাৎ সামনের পা-দুটো জলের উপরে তুলে চকিতের মধ্যে একজোড়া ভারী হাতুড়ির মতো প্রচণ্ড জোরে আঘাত হানল সাম্পানটার এক পাশে। পরমুহূর্তে উলটে যাওয়া নৌকার পাশে জলের উপর ছিটকে পড়লেন কোহল এবং তাঁর চৈনিক সঙ্গী চেন।
সঙ্গীন মুহূর্ত! ঘটনার আকস্মিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে কোহল প্রাণপণে সাঁতার কাটতে লাগলেন পাড়ের দিকে, নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে অন্য কোনো দিকে তাকাবার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই তাঁর ছিল না। এমন সময় চেন-এর অসহায় আর্তনাদ তাঁর কানে প্রবেশ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে কোহলের মনে পড়ে গেল—চেন সাঁতারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। একটু দূরে তখন সে প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছে কোনোক্রমে জলের উপরে ভেসে থাকতে। কোহল ফিরলেন।
চেন-কে সঙ্গে নিয়ে সাঁতার কাটা দুজনের পক্ষেই বিপজ্জনক। সামনে ভাসছিল উলটে যাওয়া সাম্পান, চেনকে সেটা আশ্রয় করে ভেসে থাকবে বলে কোহল পুনরায় সাঁতার কেটে এগিয়ে চললেন পাড়ের দিকে। হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল তীক্ষ্ন শিষের মতো নাসিকাধ্বনি। সেই সঙ্গীন মুহূর্তেও কোহলের মনে পড়ে গেল পূর্ব-হিমালয়ের একটি গিরিখাতের পাশে দাঁড়িয়ে অবিকল এইরকম শিসের শব্দই শুনেছিলেন তিনি। পিছনে তাকিয়ে দেখলেন স্ফুরিতনাসা উন্মত্ত অ্যান্টিলোপ জল কেটে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। একটা তিক্ত শপথবাক্য নির্গত হল কোহলের মুখ দিয়ে, সর্বশক্তি নিয়োগ করে তিনি সাঁতরে চললেন পাড়ের দিকে। কোহল অবশ্য বুঝেছিলেন যে, উলটে যাওয়া নৌকায় সংলগ্ন চেন-এর চেয়ে তাঁর দিকেই হরিণটার দৃষ্টি পড়া স্বাভাবিক, কিন্তু যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে সাঁতরে যাওয়া ছাড়া আত্মরক্ষার অন্য কোনো উপায় তখনকার মতো তাঁর মনে পড়ল না। কোহল জন্তুটার অসাধারণ দৈহিক পটুতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন, ফলে প্রতি মুহূর্তেই তিনি তাঁর পিঠ অথবা কাঁধের উপর দুটো খুরের প্রচণ্ড আঘাত আশঙ্কা করছিলেন। কিন্তু নদীর পাড়ের বালি যখন কোহলের পায়ে ঠেকল, কোনো অজানিত কারণে তখনও তাঁর দেহ সম্পূর্ণ অক্ষত। আতঙ্কিত কোহল এবার চেষ্টা করলেন প্রাণপণে দৌড়ে জীবনরক্ষা করতে, কিন্তু বালিতে পা হড়কে বারবার তার গতি রুদ্ধ হতে লাগল।
আচম্বিতে নদীবক্ষ থেকে ভেসে এল এক তীক্ষ্ন আর্তনাদ! ঘুরে নদীর দিকে চোখ ফেরাতেই কোহলের নজরে পড়ল এক মর্মন্তুদ দৃশ্য!
কোহলকে তাড়া করার পরিবর্তে জন্তুটা উলটে যাওয়া সাম্পানটার দিকে এগিয়ে এসে আঘাত করল সেটার পৃষ্ঠদেশে। ফোয়ারার মতো জল ছিটকে উঠল উপরে এবং নৌকা ও তার সঙ্গে সংলগ্ন চেন কয়েক মুহূর্তে ভেসে উঠল বটে, কিন্তু বেশ কয়েক গজ দূরত্বে। প্রাণরক্ষার প্রচেষ্টায় চেন-এর পাগলের মতো হাত-পায়ের সঞ্চালন সহজেই উন্মত্ত হরিণটার দৃষ্টিগোচর হল। কৌতূহলী হয়ে সে এগিয়ে এল তার দিকে। হরিণটাকে দেখামাত্রই হতভাগ্য চেন-এর গলা দিয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কে বেরিয়ে এল তীক্ষ্ন আর্তনাদ, কিন্তু শুধু চিৎকার করে আত্মরক্ষা করা যায় না। অ্যান্টিলোপের সামনের দুটো পা জলের উপর একবার দৃশ্যমান হল, তারপরই নির্ভুল লক্ষ্যে নেমে এসে আঘাত হানল শিকারের দেহে। চেন-এর আর্তনাদ পরিণত হল একটা অস্ফুট ঘড়ঘড় শব্দে তারপর তার দেহ অদৃশ্য হল নদীগর্ভে। সঙ্গীর জীবন রক্ষার শেষ প্রচেষ্টায় কোহল নদীর পাড় থেকে কতকগুলো পাথরের টুকরো তুলে নিয়ে ক্রমাগত ছুড়তে লাগলেন সেরাওটাকে লক্ষ্য করে। উদ্দেশ্য, যদি চেনকে ছেড়ে কোহলের দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এমনকী শেষ পর্যন্ত পাগলের মতো নদীতে ঝাঁপ দিয়ে কোহল সাঁতরে সঙ্গীর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইয়াংজের হলুদ জলে দাঁড়িয়ে সঙ্গীর মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করা ছাড়া অসহায় কোহলের করার মতো আর কিছুই নেই।
বারকয়েক নদীর জলে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সেরাও, কিন্তু চেন-এর কোনো সন্ধান মিলল না কোথাও। নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ ফেরাতে এবার তার নজর পড়ল স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা কোহলের উপর। নাক দিয়ে শিসের মতো শব্দ করে সে তার ক্রোধের অভিব্যক্তি প্রকাশ করল, তারপর তীরের মতো জল কেটে এগোল তাঁর দিকে।
বিপদ আসন্ন!
কোহল বুঝলেন যে এবার তাঁর পালা। নিরস্ত্র, অসহায় কোহল আত্মরক্ষার্থে সচেষ্ট হলেন। সাম্পান উলটে যাওয়ার সময় রাইফেল তলিয়ে গেছে নদীবক্ষে, সুতরাং নাগালের মধ্যে যে গাছগুলো রয়েছে তারই একটাতে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ বলে তাঁর মনে হল। অনতিদূরের অরণ্য ঘন সন্নিবিষ্ট নয়, এধারে ওধারে ছড়ানো বড় বড় গাছের সমাবেশে গঠিত। তার মধ্যে, ওক, চেস্টনাট এবং পাইন গাছই বেশি। প্রথম দুটি জাতের গাছ অত্যন্ত শক্ত হলেও, তাড়াতাড়ি ওঠার পক্ষে সুবিধাজনক নয়। ফলে কাছে একটা পাইন গাছের নীচে ঝুঁকে পড়া ডাল ধরে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন কোহল। কিন্তু নিরাপদ উচ্চতায় আরোহণ করলেও, গাছে উঠে কোহল আবিষ্কার করলেন যে, আশ্রয়ের পক্ষে গাছটি ঠিক উপযুক্ত নয়। ডালগুলো বেশ নরম এবং পলকা, কিন্তু নতুন করে অন্য কোনো গাছের কথা চিন্তা করার মতো সময় তখন আর নেই। ওরই মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্ত একটা গাছের ডালকে আশ্রয় করে কোহল বসে রইলেন।
নদীর জলে আলোড়ন তুলে তীরে উঠে এল ক্রুদ্ধ সেরাও। গাছের ডালে বসে কোহল নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ করে রইলেন। কিন্তু জন্তুটার চোখ এবং কানকে ফাঁকি দিলেও ঘ্রাণশক্তিকে ফাঁকি দিতে পারলেন না তিনি।
বাতাসে ঘ্রাণ নিতে জন্তুটা পাইন গাছের খানিকটা দূরে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সন্দেহের দৃষ্টি দিয়ে গাছটাকে খানিকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে পিছিয়ে এল সে। তারপর সমস্ত শক্তি সংগ্রহ করে দুরন্ত বেগে ছুটে গেল গাছটাকে লক্ষ্য করে। একটা প্রচণ্ড ঢুঁ-এ থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা গাছটা, কিন্তু সেই সঙ্গে একটা যন্ত্রণার অভিব্যক্তিও ফুটে উঠল হরিণের দেহে। আবার পিছিয়ে গেল উন্মত্ত অ্যান্টিলোপ, এবং কোহল সভয়ে আবিষ্কার করলেন যে, তিনি যে ডালটিকে আশ্রয় করে বসে আছেন, সেটি এর মধ্যেই চিড় খেতে শুরু করেছে। আর একমুহূর্তও এই গাছটাকে আশ্রয় করে বসে থাকা সম্ভব নয়।
অদূরবর্তী একটা ওক গাছকে আশ্রয়ের জন্য মনে মনে নির্বাচিত করলেন কোহল। কিন্তু নীচে অপেক্ষমান শৃঙ্গী, মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে গাছটায় আশ্রয় নেওয়া খুব সোজা কাজ নয়। সুযোগ খুঁজতে লাগলেন কোহল।
প্রথম সংঘাতের যন্ত্রণায় জন্তুটা গাছের থেকে খানিকটা দূরে পিছিয়ে গিয়েও, তেড়ে আসার বদলে স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। এই সুযোগ কোহল হাতছাড়া করলেন না। গাছের উপর থেকে মাটিতে লাফিয়ে পড়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলেন ওক গাছটার দিকে। মাটির উপর ভারী বস্তুর পতনের শব্দে যেন সম্বিত ফিরে এল জন্তুটার। বিদ্যুৎগতিতে সে ছুটে গেল পলায়নে তৎপর শিকারের দিকে। নাঃ, ওক গাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেন না কোহল। মাঝপথে দুটো শিং-এর মারাত্মক সংস্পর্শ অনুভূত হল তাঁর কটিদেশের নিম্নভাগে, তারপরেই শূন্যপথে উৎক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর দেহ, আছড়ে পড়ল বেশ কয়েক গজ দূরে জমির উপর। পতনের আঘাতে সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এল কোহলের চোখের সামনে। শিরদাঁড়ায় তীব্র যন্ত্রণা—পিঠটা ভেঙে গেছে বলে মনে হল তাঁর।
আবার সেই তীক্ষ্ন শিস। দারুণ আতঙ্ক এবং ভয় কোহলকে তাঁর দুটো হাঁটুর উপর দাঁড় করিয়ে দিল, কিন্তু দৌড়ানো দূরের কথা, এক পা এগোবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি; ফলে ওই অর্ধেক বসা অবস্থায় তিনি প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষা করতে লাগলেন চরম আঘাতের জন্য। কিন্তু আঘাত এল না, পরিবর্তে ভেসে এল সংঘাতের ভারী শব্দ। কোহল আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলেন যে তাঁকে ছেড়ে দিয়ে হরিণটা ওই পাইন গাছের কাণ্ডে ক্রমাগত গুঁতো মেরে চলেছে। সম্ভবত সংঘর্ষের যন্ত্রণায় পাগল হয়ে সে গাছটাকেই তার প্রধান শত্রু বলে মনে করেছে। অবশ্য, সেই সঙ্গে কোহলের বুঝতে ভুল হল না যে, তাঁর এ নিষ্কৃতি সাময়িক। গাছের উপর রাগ মিটিয়ে জন্তুটা একটু পরেই তাঁর দিকে ছুটে আসবে। এই কথাটা উপলদ্ধি করে, অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও কোহল ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে হরিণটার দৃষ্টির আড়ালে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট হলেন।
কিছুটা পথ ওইভাবে অতিক্রম করার পর হাতে ঠেকল নরম এবং নমনীয় ডালপালা ছড়ানো জমি, আর ভালোভাবে একটু পর্যবেক্ষণ করেই জায়গাটার স্বরূপ চিনতে ভুল হল না কোহলের। ডালপালা দিয়ে আচ্ছাদিত একটা গর্ত—চেন-এর ভাইয়ের পাতা ফাঁদ! ধীরে ধীরে শরীরটাকে ফাঁদের অন্য ধারে টেনে নিয়ে গেলেন কোহল, তাঁর মাথায় তখন এক চমকপ্রদ চিন্তার তরঙ্গ। সেরাও এবং কোহলের মাঝখানে ওই ফাঁদ। একটা মারাত্মক ঝুঁকি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন কোহল।
সমস্ত প্রাণশক্তি জড়ো করে সোজা হয়ে বসে তারস্বরে চিৎকার করতে করতে হাত দুটো নাড়াতে লাগলেন কোহল। উদ্দেশ্য হরিণটার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। গাছে ঢুঁ বন্ধ করে ফিরে তাকাল রক্তচক্ষু হরিণ। তারপরই জ্যা মুক্ত তিরের মতো ছুটে এল কোহলের দিকে। তীব্র উত্তেজনার মধ্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন কোহল। সেরাও যদি ফাঁদের হদিশ পেয়ে যায় তাহলে শিং এবং খুরের নিষ্ঠুর আঘাতে কোহলের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী—কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন। ঝড়ের বেগে ছুটে আসা হরিণের সামনের গোটা দেহ অদৃশ্য হল কোহলের চোখের সামনে থেকে। গর্তের মধ্য থেকে শুধু ভেসে আসতে লাগল ক্রুদ্ধ অ্যান্টিলোপের তীক্ষ্ন নাসিকা ধ্বনি এবং গর্তের চারিধারে মাটির দেওয়ালে অধৈর্য খুরের আঘাতের শব্দ।
অর্ধ-অচেতন অবস্থায় গর্তের ধারে থাকতে থাকতে প্রায় আধঘণ্টা বাদে কোহলের কানে ভেসে এল স্থানীয় চিনাভাষায় কয়েকজন লোকের কথাবার্তার শব্দ। সাহায্যের জন্য চিৎকার শুনে তারা অবশেষে এসে কোহলকে আবিষ্কার করে। উদ্ধারকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিল চেন-এর ভাই। সাম্পান নিয়ে চেন এবং কোহল যাত্রা করার বহুক্ষণ পরেও কোনোরকম খবর না পেয়ে সে প্রতিবেশীর নৌকায় চড়ে সন্ধান করতে বেরিয়ে পড়ে।
হোয়েইলীতে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে কোহল সাংহাইতে এসে পৌঁছোলেন এবং সেই সময়ে ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা যায় যে মেরুদণ্ড নয়, ভেঙেছে তাঁর নিতম্বদেশের হাড়। শল্যচিকিৎসার সাহায্যে তিনি আরোগ্যলাভ করেন।

পরিশিষ্ট না বললে বর্তমান কাহিনি অসমাপ্ত থেকে যায়—শিকারি ক্রিশ্চিয়ান কোহলের বিবরণী থেকে আমি এই অংশটি তুলে দিচ্ছি।
'হোয়েইলীতে থাকতে থাকতেই আমি চেন-এর মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদ তার আত্মীয়দের দিয়েছিলাম এবং ঘটনারও বিবরণ দিয়েছিলাম! তার কয়েকদিন পরে সেরাওটার মাথা স্মারক হিসাবে সংগ্রহ করতে গিয়ে শুনলাম যে ওই হরিণটাকে নাকি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস উক্ত ''ন'গেই-লাই-ৎজে'', চেনকে হত্যা করে নিঃসন্দেহে কোনো দৈবশক্তির অধিকারী হয়েছে।
মহাযুদ্ধের যবনিকা তখন ধীরে ধীরে চিনের উপর নেমে আসছে, কিন্তু আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনোদিন যদি আমার নিম্নাঙ্গের সচলতা ফিরে আসে, তবে সেদিনই আমি ইয়াংজে নদীর পাড়ে একটা সেরাও অ্যান্টিলোপের সঙ্গে আমার কিছু বাকি হিসাব চুকাতে যাব। তা সে দৈবশক্তির অধিকারী হোক বা নাই হোক।'
সুদানের খুনি
আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় জমে গেলেন রয় হেলভিন। যদিও তাঁর সতর্কবাণী আয়োমকে মৃত্যুর কবল থেকে ছিনিয়ে আনতে পারত না, কিন্তু সেটুকু আওয়াজও তার গলা দিয়ে বেরুল না। সুদানের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে নিরস্ত্র, অসহায় হেলভিনকে প্রত্যক্ষ করতে হল, উপকথার জগৎ থেকে নেমে আসা এক বিচিত্র প্রাণীর ভয়াবহ আক্রমণে সঙ্গী আয়োমের মর্মান্তিক মৃত্যু।
স্থানীয় সুদানীদের দৈহিক পটুতা অসাধারণ। আয়োমের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। এক ঝলক কালো বিদ্যুতের মতো সে দৌড়ে চলেছিল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা টাক থেকে একটা রাইফেল সংগ্রহ করে আনতে। অপেক্ষমান লরিটির কাছে তার আর পৌঁছনো হল না। কি ঘটতে চলেছে তা বোঝবার আগেই পিছন থেকে প্রচণ্ড আঘাতে দুটো শিং তার দেহটাকে গেঁধে ফেলল। পরক্ষণেই দুটো শিকে গাঁথা ঝলসানো মাংসপিণ্ডের মতো শূন্যে ঝুলতে লাগল আয়োমের দেহ। আতঙ্কিত হেলভিন দেখলেন, পাঁজরের ঠিক নীচে দিয়ে দু-দুটো শিং-ই দেহটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে গেঁথে ফেলেছে। আয়োমের তীব্র যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ ক্রমে স্তিমিত হয়ে এল। তারপর একসময় স্তব্ধ হয়ে গেল—সব শেষ! হেলভিন বুঝলেন, ফুসফুসে রক্ত প্রবেশ করেছে।
তবে কেবল হেলভিন নয়, আয়োমের হত্যাকারীও বুঝতে পেরেছিল সে কথা। তার ঘাড় ও গলার শক্তিশালী পেশির একটিমাত্র সঞ্চালনে শিং-এ বিদ্ধ আয়োমের প্রাণহীন দেহ প্রায় ফুট বারো দূরের মাটির উপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। হত্যার উন্মাদনা তখনও জন্তুটার সম্পূর্ণ মেটেনি। স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে হেলভিন দেখলেন, দুটি বিশাল বর্শাফলকের মতো শিং-এর ক্রমাগত আঘাতে কেমন করে কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যে আয়োমের মৃতদেহ পরিণত হল একটি রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডে।
পাঠক-পাঠিকাকে আপাতত এইখানে রেখে আমরা চলে যাব কাহিনির প্রারম্ভে।
মাত্র মিনিট কয়েক আগের ঘটনা। শিকারি রয় হেলভিন এবং তাঁর স্থানীয় সুদানী অনুচর আয়োম তাঁবু থেকে মাত্র শ-খানেক গজ দূরে প্রবহমান ক্ষীণ জলধারাটির পাড়ে, ঘোর বাদামি রঙের একটা সুদৃশ্য অ্যান্টিলোপের মৃতদেহ থেকে চামড়া সংগ্রহ করার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। এই ধরনের কাজগুলো হেলভিন নিজে বিশেষ দেখতেন না, তার জন্য আলাদা লোক নিযুক্ত ছিল, কিন্তু সম্প্রতি একটা লেপার্ডের চামড়া ছাড়াতে গিয়ে তারা অত্যন্ত কাঁচা হাতের কাজ দেখায়। ছাড়ানো চামড়াটার মধ্যে লেপার্ডের চোখ এবং ঠোঁটের অংশে খুঁত থেকে যায়। অপূর্ব চামড়াটার ক্ষতি হওয়ার ফলে, হেলভিন ঠিক করেন যে এর পর থেকে তিনি স্বয়ং উপস্থিত থেকে ওই কাজের তত্ত্বাবধান করবেন। দুয়েক দিনের মধ্যেই খুঁজে পেতে তিনি নতুন একটি দক্ষ ব্যক্তিকে ওই কাজের জন্য সংগ্রহ করেন। সেই হল আয়োম। হেলভিন এবং আয়োম যে মৃতদেহটি থেকে চামড়া সংগ্রহ করছিলেন, সেটি প্রায় চার ফুট উঁচু, একটা ঘোর বাদামি রঙের অ্যান্টিলোপ। জন্তুটার প্রত্যেকটা শিং-এর দৈর্ঘ প্রায় দু-ফুট করে। শিকারির সংগৃহীত স্মারক হিসাবে অপূর্ব, সন্দেহ নেই।
ছ'জন ভৃত্যের সাহায্যে প্রায় পাঁচশো পাউন্ড ওজনের মৃতদেহটা যখন স্রোতস্বিনীর পাড়ে এনে রাখা হল তখনই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। নদীর পাড়ে কাজটা সারবারও একটা কারণ ছিল। প্রথমত পরিত্যক্ত শবদেহটা যাতে জলের স্রোতে বহুদূরে চলে যায়, এবং দ্বিতীয়ত মাংসের লোভে তাঁবুর আশেপাশে রাত্রে যেন কোনো 'অবাঞ্ছিত অতিথির' আবির্ভাব না ঘটে। একটু পরেই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসবে। হেলভিন এবং আয়োম উভয়েই অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দ্রুত কাজ সারছিলেন।
হঠাৎ হেলভিন আবিষ্কার করলেন যে তাঁদের পায়ের তলার মাটি কাঁপছে এবং দূর থেকে সমুদ্র গর্জনের মতো ভেসে আসছে অস্ফুট শব্দের তরঙ্গ। প্রথমে দুজনের কেউই বিশেষ গা দিলেন না ব্যাপারটায়, কিন্তু তরঙ্গধ্বনি ক্রমশ স্পষ্ট এবং নিকটবর্তী হতে, কৌতূহল নিরসনের জন্য হেলভিনই প্রথম উঠে দাঁড়ালেন।
সম্মুখবর্তী লম্বা ঘাসের জঙ্গল। তার উপর দিয়ে চোখ চালিয়ে নজরে পড়ল দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একদল শৃঙ্গী প্রাণী। আফ্রিকার অরণ্যে শিং-এর বাহকের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু কালোমাটি আর ঘাসজঙ্গলের পটভূমিতে প্রায় মিশে যাওয়া জন্তুগুলো নিকটবর্তী হলে, হেলভিন দেখলেন তাদের প্রত্যেকের মুখমণ্ডল বেষ্টন করে চলে গেছে একটা কালো দাগ। দুটি শিং যেন দুটি বিরাট সমান্তরাল সরলরেখা—অরিক্স! চিনতে ভুল হল না হেলভিনের, সংখ্যায় প্রায় গোটা চব্বিশ। আফ্রিকার জঙ্গলে এই দুর্লভ শ্রেণির অ্যান্টিলোপের দলকে এত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য খুব কম শিকারির জীবনেই আসে। অরণ্যআদিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমির বুকে সারি সারি শিং-এর সঙিন উচিয়ে ছুটে চলেছে শরীরী সৌন্দর্যের এক বিচিত্র তরঙ্গ। অপূর্ব! অদ্ভুত! মূগ্ধ বিস্ময়ে রয় হেলভিন নিরীক্ষণ করছিলেন সেই সৌন্দর্যপ্রবাহ, আয়োমও ততক্ষণে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে উঠেছে। সঙ্গীর চাপা সতর্ক কন্ঠস্বরেই চমক ভাঙল হেলভিন।
—'সিংহ'!
চোখ ফেরাতেই নজরে পড়ল, ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবমান অরিক্সের দলটির বেশ খানিকটা পিছনে ক্রমশ নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছে একটি উড়ন্ত ধুলোর মেঘ। আর সেই ধুলোর আস্তরণের মধ্যে হালকা বাদামি রঙের একটি পরিচিত অবয়ব আবিষ্কার করলেন হেলভিন—হ্যাঁ, সিংহই বটে!
'রাইফেল! শিগগির!' মাত্র দুটি শব্দ নির্গত হল আয়োমের গলা দিয়ে।
ততক্ষণে সে দৌড় শুরু করেছে অদূরে অপেক্ষমান 'সাফারী টাক'-এর দিকে। উদ্দেশ্য একটা রাইফেল সংগ্রহ করে আনা। কিন্তু হেলভিন তাকে ডেকে ফিরিয়ে আনলেন। কারণ, প্রথমত সিংহের মনোযোগ পলায়নে তৎপর অরিক্সের দলটির উপরই নিবদ্ধ এবং দ্বিতীয়ত নিজেরা কোনোরকম দৌড়ঝাঁপ করে সিংহের দৃষ্টি আকর্ষণ করার সদিচ্ছা হেলভিনের ছিল না। অরণ্য নাটকের এই বিরল মুহূর্তগুলি নিরীক্ষণ করার সৌভাগ্য থেকে তিনি নিজেকে বঞ্চিত করতে চান না।
ততক্ষণে মাত্র দেড়শো গজ দূরে এসে পড়েছে দলটি। রাইফেল সংগ্রহে ইস্তফা দিয়ে আয়োম এসে দাঁড়াল হেলভিনের পাশে।
সম্মুখে দুটি মনুষ্যমূর্তির অবস্থিতি! নতুন বিপদের আশঙ্কায় তৎক্ষণাৎ গোটা দলটা গতির সমতা বজায় রেখে বাঁ-দিকে মোড় নিল। কেবল দলের শেষভাগে একটা অ্যান্টিলোপের কাছে চমকটা একটু বেশি হয়ে থাকবে। আকস্মিক বিস্ময়ে সে সামনের দুটো পা ঘাসজমির উপর আটকে কোনোক্রমে তার দুরন্ত গতি রুদ্ধ করল। দেহভার ন্যস্ত হল পিছনের দুটি পায়ের উপর। একটা অপূর্ব পুরুষ হরিণ। কিন্তু জঙ্গলের প্রাণীদের বেশিক্ষণ বিস্মিত হওয়ার অবকাশ মেলে না। নাগালের মধ্যে শিকার—কালো ঘাসগুলির উপর চমকে উঠল ধূসর বিদ্যুৎ। পশুরাজ আক্রমণ করল...
প্রসঙ্গত, এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে, সিংহ শিকার ধরবার জন্য একটি বিশেষ পন্থা অবলম্বন করে। শিকারের পিছনে তাড়া করতে করতে সে হঠাৎ শিকারের পিঠে লাফিয়ে ওঠে এবং তার ঘাড় প্রচণ্ড দংশনে চেপে ধরে মাটির উপর পেড়ে ফেলে। তারপরই স-নখ থাবার একটিমাত্র আঘাতে হতভাগ্য প্রাণীটির কণ্ঠনালি ছিন্ন হয়ে যায়।
কিন্তু এই ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটল।
প্রাণভয়ে মরিয়া হয়ে, আক্রমণে উদ্যত সিংহের দিকে রুখে দাঁড়াল বিপুলবপু অরিক্স। সিংহ এই অভাবনীয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না, ফলে চার ফুট করে লম্বা দু-দুটো ক্ষুরধার সঙ্গিনের মারাত্মক সান্নিধ্য এড়িয়ে যাওয়া তার পক্ষে বহু চেষ্টা করেও সম্ভব হল না। পশুরাজের গতিরুদ্ধ হওয়ার আগেই একটা শিং তার কণ্ঠদেশ বিদ্ধ করে ঘাড় ও গলার সন্ধিস্থল দিয়ে নির্গত হল, এবং অপরটি প্রায় আমূল প্রবিষ্ট হল তার বুকে। ঘাড় ও মাথার দ্রুত সঞ্চালনে অরিক্স তার শিং দুটো মুক্ত করে নিল, তারপর পুনরায় আঘাত হানল শত্রুর দেহে। চরম আঘাত—সিংহের নরম উদরে বিদ্ধ হল দুটি বিশাল শৃঙ্গ। পশুরাজের প্রাণহীন দেহ গড়িয়ে পড়ল বিস্তীর্ণ তৃণভূমির বুকে।
ঘটনা প্রবাহের নাটকীয়তা রয় হেলভিন ও তার সঙ্গী আয়োমকে সম্মোহিত করে দিয়েছিল। নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে ছিলেন দুজনে।
অরিক্স শিকারের আশা হেলভিনের বহুদিন লালিত। কিন্তু শিকার করা তো দূরের কথা, অধিকাংশ সময়েই সদাসতর্ক এই প্রাণীগুলিকে রাইফেলের পাল্লার বাইরে, বাইনোকুলারের কাচে পর্যবেক্ষণ করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু আজকের দিনটির কথা স্বতন্ত্র। সিংহদমন অরিক্সের এ এক বিচিত্র রূপ—সিংহের মতো তার সুদীর্ঘ লাঙ্গুল এবং প্রান্তদেশের রোমগুচ্ছ আন্দোলিত হচ্ছে অধীর উন্মাদনায়, পরিশ্রম এবং অবরুদ্ধ ক্রোধে বাদামি হলুদ চামড়ার উপর ফুটে উঠছে সুগঠিত পাঁজরের তরঙ্গ; বুনো ঘোড়ার মতো বলিষ্ঠ পেশিবহুল কাঁধ। একটি মাত্র সরলরেখায় স্থাপিত দু-দুটো বিরাট শিং, পাশ থেকে অন্তত সেরকমই মনে হল হেলভিনের।
খুব চেনা ওই মুখ—কোথায় যেন একই রকম মুখের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন তিনি! মনে পড়ল, মধ্যযুগের নাইট যোদ্ধাদের ঢালের উপর উৎকীর্ণ একশৃঙ্গ মৃগ 'ইউনিকর্ণের' মুখ। ইউনিকর্ণ তাহলে উপকথা নয়, বাস্তব। আর সেইসঙ্গে ছোটবেলার স্মৃতি হাতড়িয়ে আর একটি রূপকথার ছবি ভেসে উঠল হেলভিনের মানসপটে। সিংহের যুদ্ধরত ইউনিকর্ণের ছবি। কি অদ্ভূত মিল!
কিন্তু খুব বেশিক্ষণ রূপকথার জগতে বাস করা সম্ভব হল না রয় হেলভিনের পক্ষে। আতঙ্কিত হেলভিন আবিষ্কার করলেন যে উন্মত্ত অরিক্সের দৃষ্টি তাঁদের প্রতি নিবদ্ধ হয়েছে। স্ফীত নাসারন্ধ্র, জলন্ত চক্ষু এবং মাথা পিছনে হেলিয়ে দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখে তিনি বুঝলেন গতিক সুবিধার নয়। হত্যার উন্মাদনা পেয়ে বসেছে ওই 'নিরীহ' জন্তুটাকে। সম্মুখে দুটি মানুষের উপস্থিতি এখন আর তার কাছে ভীতিপ্রদ নয়, বরং তার উন্মত্ত হত্যালীলার আগামী শিকার।
—'শিগগির রাইফেল আনো, ততক্ষণ আমি এটাকে দেখছি।' আয়োমকে নির্দেশ দিলেন হেলভিন। বিগত কয়েকটি মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ রয় হেলভিনের স্নায়ুযন্ত্রের উপর যে চাপ সৃষ্টি করেছিল, তার প্রভাবে তিনি স্থাণুর মতো প্রান্তরের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাহেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়োম প্রাণপণে দৌড়ল ট্রাকের দিকে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধাবমান আয়োমের দেহ লক্ষ্য করে দুরন্ত গতিতে ছুটে গেল প্রকাণ্ড অ্যান্টিলোপ।
মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে ফেললেন হেলভিন। অরিক্সের দৃষ্টি এড়িয়ে যে করে হোক আয়োমকে 'টাকে' পৌঁছনোর সুযোগ করে দিতে হবে তাঁকে। আয়োম এবং হরিণটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে জন্তুটার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি। মারাত্মক ঝুঁকি! কিন্তু এ ছাড়া আর কোনো সহজ উপায় নেই। শেষ মুহূর্তে যদি অ্যান্টিলোপের গতিপথ থেকে হেলভিন সরে যেতে না পারেন তাহলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু দুর্ভাগ্য আয়োমের। উন্মত্ত অরিক্স হেলভিনের দিকে মনোযোগ দিল না, ঝড়ের মতো তাঁর ডান দিক দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল অদূরে ধাবমান হতভাগ্য সুদানীটিকে লক্ষ্য করে।
পরবর্তী ঘটনা আমরা জানি। দুটি নিষ্ঠুর শিং-এর ক্রমাগত আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল আয়োমের দেহ। বীভৎস দৃশ্য! হেলভিন বুঝলেন যে, এবার তাঁর পালা। দৌড়ে পরিত্রাণ পাওয়ার আশা দুরাশা মাত্র, অন্তত হতভাগ্য আয়োমের পরিণাম তাঁকে সেই শিক্ষাই দেয়।
একটু দূরে পড়ে আছে গাঢ় বাদামি রঙের হরিণটার মৃতদেহ, অর্ধেক চামড়া ছাড়ানো। আর তার পাশে মাটির উপর ছাল-ছাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত বড় ছুরিটা হেলভিনের নজরে পড়ল। নীচু হয়ে ছুরিটা তুলে নিলেন হেলভিন, যদিও তিনি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে অরিক্সের জোড়া সঙ্গিনের বিরুদ্ধে সেটা তাঁকে কতটুকু সাহায্য করতে পারে। ছোরা হাতে উঠে দাঁড়াতেই ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন হেলভিন। তাঁর সামান্য নড়াচড়া জন্তুটার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে। অরিক্সের রক্তচক্ষু তাঁর উপর স্থির। হাতে সময় খুবই অল্প। এক আশ্চর্য পরিকল্পনা নিলেন রয় হেলভিন।
ততক্ষণে খুব কাছে এসে পড়েছে ধাবমান অরিক্স। ঝটিতি মাটিতে শুয়ে পড়ে গুঁড়ি মেরে হেলভিন আশ্রয় নিলেন হরিণের মৃতদেহটার আড়ালে। ঝড়ের বেগে ছুটে এল শৃঙ্গধারী শয়তান। দুটি বিশাল ছুরিকার আঘাতে বিভক্ত হয়ে গেল মৃত হরিণের উদর। শুধু অল্পের জন্য হেলভিন বেঁচে গেলেন সে যাত্রায়। তীব্র গতি এবং ভরবেগের প্রাবল্যে অরিক্স হেলভিনকে অতিক্রম করে তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। এই ক্ষীণ সুযোগটুকু হাতছাড়া করতে চাইলেন না শ্বেতাঙ্গ শিকারি। তৎক্ষণাৎ আড়াল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে দৌড়লেন অদূরবর্তী গাড়ির উদ্দেশ্যে।
আয়োম টাক-এ পৌঁছতে পারেনি। হেলভিন কি পারবেন! পিছনে ছুটে আসছে শরীরী মৃত্যু, রক্তলোলুপ হিংস্র অ্যান্টিলোপ।
গাড়িটা ক্রমশ হেলভিনের নিকটবর্তী হচ্ছে। কাছে! আরও কাছে! আর মাত্র কয়েক ফুট—তা হলেই নিরাপদ তিনি। একবার মনে হল প্রাণপণে সমস্ত শরীরটা নিয়ে লরি চারটি মধ্যবর্তী জমির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেই চেষ্টা থেকে বিরত হলেন হেলভিন। প্রায় গাড়ির কাছে এসে পড়েছেন আতঙ্কিত শিকারি, একবার মুহূর্তের জন্য মাথাটা ঘুরিয়ে পিছনে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন তিনি।
দশ থেকে বারো ফুটের মধ্যে এসে পড়েছে আনতশৃঙ্গ উন্মত্ত অ্যান্টিলোপ। শেষ মুহূর্তে জন্তুটার গতিপথ থেকে কোনোক্রমে নিজেকে সরিয়ে আনলেন হেলভিন, কিন্তু ভুল করলেন শিং দুটোকে ধরে আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে। একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় তাঁর দেহ শূন্যপথে উৎক্ষিপ্ত হয়ে ছিটকে পড়ল মাটির উপর।
পতনের আঘাতে সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল হেলভিনের চোখের সামনে, হাত এবং কাঁধের সন্ধিস্থলে অনুভব করলেন তীব্র যন্ত্রণা। চোখের সামনে ঝাপসা একটা বিরাট কাঠামোর অস্তিত্ব বুঝতে পারলেন তিনি। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার হয়ে আসতে কাঠামোটার সঠিক স্বরূপ নির্ধারণ করলেন হেলভিন,—'সাফারী টাক'। মস্তিষ্কের কোশগুলি পুনরায় কার্যক্ষম হয়ে উঠলে হেলভিন আরও বুঝলেন যে উন্মত্ত অ্যান্টিলোপের শিং তাঁকে গাড়ির এক পাশ থেকে অন্য পাশে চালান করে দিয়েছে, অর্থাৎ তিনি শূন্যপথে গোটা গাড়িটাই টপকে এসে মাটিতে ছিটকে পড়েছেন। তৎক্ষণাৎ, লাফিয়ে উঠে পড়ে হেলভিন দৌড়ে গাড়ির মধ্যে আশ্রয় নিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাপদ। হেলভিনের মনে হল তিনি বোধহয় আনন্দে পাগল হয়ে যাবেন। কিন্তু অরিক্সটা গেল কোথায়! লরির অপর দিকে জানলা দিয়ে দেখলেন হেলভিন। ওই তো! অদূরে আয়োমের তালগোল পাকানো রক্তাক্ত মৃতদেহের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে শয়তান খুনিটা। রয় হেলভিন গাড়ির মধ্যে রাখা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তুলে নিলেন।
রাইফেলের ভারী বুলেট অরিক্সের কাঁধের ঠিক নীচে মৃত্যুচুম্বন এঁকে দিল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন