নির্বেদ রায়

উত্তর রোডেশিয়ার লিভিংস্টোন নামক অঞ্চলটিতে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে যে পুলিশ কর্মচারীটি নিয়োজিত হয়েছিলেন, তাঁর নাম মিঃ জ্যাকোয়েস্ট। কিন্তু স্থানীয় অঞ্চলের শান্তিরক্ষার কাজে ব্যাপৃত হয়ে, মাত্র দিনকয়েকের মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করলেন যে, এই সব জায়গায় যে মানুষগুলো শান্তিভঙ্গ করে তারা স্বভাবতই খুব শান্তশিষ্ট, ভদ্র এবং বিনীত চরিত্রের নয়। এইসব দুর্বিনীত মানুষদের শায়েস্তা করতে গিয়ে দণ্ডদাতাকেও মাঝে মধ্যে বেশ খেসারত দিতে হয়। এমনকী, পুলিশ নামক আইনরক্ষাকারী জীবদেরও এরা যে সবসময়ে খুব রেয়াত করে চলে এ কথা বললে সত্যি কথা বলা হয় না। বিপদে পড়লে তারা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে পুলিশ কর্মচারীর উপর তাদের অভ্যস্ত হাতের প্রচণ্ড মুষ্টিযোগ অথবা হস্তধৃত অস্ত্র প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করে না।
একটি ছোটখাটো ঝামেলার মধ্যে দিয়ে মুখের সামনের দিকের চার-চারটি দাঁত খুইয়ে এই কথা ক'টি জ্যাকোয়েস্ট অচিরে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করলেন।
কথায় বলে—'দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না'; জ্যাকোয়েস্টের ক্ষেত্রে প্রবচনটা অক্ষরে অক্ষরে ফলল। ডাক্তার নকল দাঁতের পাটি জুড়ে দিয়ে জ্যাকোয়েস্টের মুখের পুরোনো আদল ফিরিয়ে দিল বটে; কিন্তু নকল দাঁতের উপসর্গ নিয়ে বেচারা পুলিশ কর্মচারীটি পড়ল খুবই অস্বস্তিতে। চিবোতে গেলে বিপত্তি, হাঁ করতে গেলে বিপত্তি, খাওয়ার কথা মনে হলেই তার গায়ে জ্বর আসতে লাগল।
কিন্তু দাঁতের চিন্তা করলে তো আর দাঁত ফিরে আসবে না। সুতরাং সে চিন্তায় ইস্তফা দিয়ে জ্যাকোয়েস্ট ছুটলেন তাঁর কার্যক্ষেত্রে। শান্তিভঙ্গকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় দণ্ডবিধান করতে—পুলিশ কর্মচারী হিসাবে এটা তাঁর কর্তব্য।
পুলিশ-স্টেশনে ঢোকার মুখে কয়েকজন স্থানীয় লোক দল বেঁধে দাঁড়িয়ে জটলা করছিল। প্রতিদিনের মতো আজও তারা জ্যাকোয়েস্টকে অভিবাদন জানাল—'ম্যুতিন্দে ম'কোয়ে'। বাংলায় তর্জমা করলে যার অর্থ দাঁড়ায়—'হে মহান ব্যক্তি! আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন।'
পুলিশ কর্মচারী হিসাবে কর্মরত থাকাকালীন স্থানীয় অধিবাসীদের এই সুন্দর অভিবাদনটি জ্যাকোয়েস্টের খুব প্রিয় ছিল। গোটা উত্তর রোডেশিয়া জুড়ে বহু জায়গায় তিনি এই শব্দ দুটি শুনেছেন, কিন্তু কোনোদিনই তাঁর পুরোনো মনে হয়নি।
স্থানীয় লোকেদের সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে সেগুলো জানা প্রয়োজন। দোভাষীকে ডেকে পাঠালেন জ্যাকোয়েস্ট। দোভাষী এল, কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জ্যাকোয়েস্ট প্রথমেই অপ্রস্তুত হলেন। তাঁর মুখ দিয়ে কোন পরিষ্কার কথা নির্গত হল না—কেবল কয়েকটি অস্ফুট শব্দ। সন্দেহ নেই যে ওই ধ্বনিবিকৃতির কারণ—নকল দাঁতের পাটি। সুতরাং, উপায়ান্তর না দেখে, মুখগহ্বর থেকে কৃত্রিম দন্তপংক্তি অপসারিত করে পুনরায় বাক্যালাপ করতে সচেষ্ট হলেন জ্যাকোয়েস্ট। তাঁর এই অদ্ভুত কার্যকলাপ এবং মুখমণ্ডলের আকস্মিক বিকৃতি অপেক্ষমান স্থানীয় অধিবাসীদের দৃষ্টি আকর্যণ করে থাকবে। ফলে তাদের মধ্যে একটা সমবেত হাসির রোল পড়ে গেল। জ্যাকোয়েস্ট তাকিয়ে দেখলেন, হাসতে হাসতে তারা একে অপরের গায়ে লুটিয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি হাস্যকর বটে, কিন্তু জ্যাকোয়েস্টের মনে হল স্থানীয় লোকগুলো তাঁকে নিয়ে যেন একটু বাড়াবাড়ি ধরনের রঙ্গ-রসিকতা শুরু করেছে। একজন ক্ষমতাশালী পুলিশ কর্মচারীর কাছে এ ধরনের বেয়াদবি অসহ্য। দাঁতের পাটি মুখে পুরে নিয়ে রাগে লাল হয়ে তিনি উঠে গেলেন পাশের ঘরে।
জ্যাকোয়েস্টের ঘরের পাশের ঘরটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট লসনের কার্যালয়। সুপারিন্টেন্ডেন্ট লসনের বয়স হয়েছে। মাথার চুলে সাদা পাক ধরেছে। উত্তর রোডেশিয়া পুলিশবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ কর্মচারী তিনি। কর্মরত সময়ে বহুদিন ধরে স্থানীয় অঞ্চল এবং অধিবাসীদের সংস্পর্শে থাকার ফলে তাদের আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি প্রভৃতি তাঁর নখদর্পণে।
ক্ষিপ্ত জ্যাকোয়েস্টের সমস্ত অভিযোগ মন দিয়ে শুনলেন তিনি। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে অভিযোগকারীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন—'আচ্ছা, লোকগুলো যখন তোমার দিকে চেয়ে হাসতে শুরু করল, তার আগে তারা কিছু বলাবলি করছিল বলে তোমার মনে পড়ে?'
চিন্তায় পড়লেন জ্যাকোয়েস্ট। প্রথমত, স্থানীয় ভাষা তিনি বোঝেন না, ফলে তাদের উচ্চারিত শব্দের অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোনো উপায়েই তাঁর পক্ষে লসনকে সাহায্য করা সম্ভব নয়; দ্বিতীয়ত, তাঁর এখন মাথা গরম, স্থির হয়ে কিছু চিন্তা করা তাঁর পক্ষে কঠিন। তবু অল্প-সল্প কিছু মনে পড়ল জ্যাকোয়েস্টের—'হ্যাঁ! কী যেন ''বা-ইলা'' বা ওই ধরনের কোন শব্দ তারা উচ্চারণ করছিল বটে।'
চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল সুপারিন্টেন্ডেন্ট লসনের, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু হাসির রেখা,—'ওই জন্যে, তাই বল!'
তারপর একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন তিনি,—'বুঝলে! এখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা খুব সরল বা সাদাসিধে। সামান্য মজার ব্যাপার হলেও এরা সেটাকে চূড়ান্তভাবে উপভোগ করে। আর সবচেয়ে মজা হয় যখন সেই আমোদের কারণ ঘটায় কোনো শ্বেতাঙ্গ।'
'কিন্তু আসল মজাটা যে কী তা তো বুঝলাম না।' জ্যাকোয়েস্ট বেশ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত।
সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রৌঢ সুপারিন্টেন্ডেন্ট এগিয়ে গেলেন ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো বড় মানচিত্রটার দিকে। মানচিত্রটা স্থানীয় অঞ্চলসমূহকে নির্দেশ করে অঙ্কিত।
'দেখ! এই যে জায়গাটা দেখছ', লসনের আঙ্গুল মানচিত্রের উপর একটি বড় ভূখণ্ডকে নির্দিষ্ট করে, ''এই জায়গাটার নাম 'বারোৎসে অঞ্চল', আমরা বলি 'সিংহের দেশ'। আর এই অঞ্চল জুড়ে বাস করে একদল বিচিত্র মানুষ—'বা-ইলা' উপজাতি। কিন্তু এই উপজাতিটির সম্বন্ধে কিছু জানবার আগে প্রথমে ওই 'বারোৎসে অঞ্চল'-এর একটা সংক্ষিপ্ত ভৌগোলিক বিবরণ তোমার জানা প্রয়োজন।''
''জাম্বেসী নদীর প্রবল বন্যায় বছরের মধ্যে একটা সময় এই অঞ্চলটির দুই-তৃতীয়াংশ প্লাবিত হয়। সেই সময়ে বন্যার জলে তাড়িত হয়ে 'বারোৎসে অঞ্চলের' সমস্ত প্রাণী আশ্রয় গ্রহণ করে পাহাড়ি উচ্চভূমির উপর। তারপর বেশ কিছুদিন পরে জল সরে যায়—বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আত্মপ্রকাশ করে পলিমাটি সমৃদ্ধ উর্বর ভূভাগ—'বারোৎসে সমভূমি'। উর্বর জমির বুকে দ্রুত দেখা দেয় সবুজের সমারোহ, আফ্রিকার তৃণভূমির নিবিড় স্নিগ্ধ শ্যামলিমা। পাহাড়ের উপর থেকে দলে দলে পশুরা নেমে আসে সমতলভূমির বুকে। তৃণভোজী প্রাণীদের খোঁজে তখন উপত্যকার বুকে এসে হাজির হয় সিংহের পাল। ফলে, এই সময় পশুরাজের আক্রমণ থেকে নিজেদের গৃহপালিত পশুদের রক্ষা করতে প্রায়ই সমভূমির অধিবাসীদের যুদ্ধঘোষণা করতে হয় সিংহের বিরুদ্ধে।
বিস্তীর্ণ এই স্থানীয় অঞ্চল জুড়ে বাস করে তিয়াত্তরটি উপজাতি। কিন্তু অন্যান্য বাহাত্তরটি উপজাতির তুলনায় 'বা-ইলা'-রা এক বিরাট ব্যতিক্রম। দুর্জয় সাহসী এবং একগুয়েঁ প্রকৃতির এই উপজাতিটি স্বভাব-চরিত্রে একেবারেই স্বতন্ত্র।
'বা-ইলা'-দের পূর্বকথা আমরা প্রায় কিছুই জানি না। আর খুব অল্পসংখ্যক 'বা-ইলা'-কেই আমরা উত্তর রোডেশিয়ার পুলিশ বাহিনীতে নিযুক্ত করে থাকি। তার কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত এদের একগুঁয়েমি, আর দ্বিতীয়ত এদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ। শ্বেতাঙ্গদের নিয়মকানুন এদের একেবারেই অপছন্দ।' একটু থামলেন সুপারিন্টেন্ডেন্ট।

নড়ে চড়ে বসলেন জ্যাকোয়েস্ট। নকল দাঁতের পাটি মুখ থেকে খুলে নিয়ে ততক্ষণে তিনি পকেটে পুরেছেন। যদিও ওই দাঁতের পাটির সঙ্গে 'বা-ইলা' উপজাতির কী সম্পর্ক থাকতে পারে সে কথা তখনও তাঁর মাথায় ঢোকেনি।
সুপারিন্টেন্ডেন্ট লসন আবার শুরু করলেন,—'কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করার বয়ঃসন্ধিকালে বা-ইলা যুবকদের এক ভয়ংকর পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। নিজের পৌরুষ প্রমাণ করার জন্য একা একা তাকে একটি সিংহের সম্মুখীন হতে হয়, এবং কেবলমাত্র একটি বল্লমাকৃতির বংশদণ্ডের সাহায্যে ওই সিংহটিকে শিকার করতে হয়। ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বা-ইলা যুবকের মুখের সামনের দিকের দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়। এটি তার কষ্টসহিষু�তার পরীক্ষা এবং সিংহজয়ী পুরুষের প্রতীকচিহ্ন। ওই চিহ্ন তাকে বালক এবং কিশোরদের থেকে আলাদা করে দেয়।
তুমি ওই 'বা-ইলা'-দের অনুকরণ করেছ মনে করেই স্থানীয় অধিবাসীরা তোমাকে দেখে হেসেছে।''
জ্যাকোয়েস্ট স্বস্তি পেলেন। বুঝেসুঝে বোকা হওয়া অস্বস্তির ব্যাপার সন্দেহ নেই, কিন্তু না বুঝে বোকা সাজা তো রীতিমতো শাস্তি!
তখনকার মতো আশ্বস্ত হলেও, লসনের কথাগুলো জ্যাকোয়েস্টের মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল। সিংহবিক্রম 'বা-ইলা'-দের দেখার প্রবল ইচ্ছা তাঁকে পেয়ে বসল।
সুযোগও এসে গেল মাসকয়েক বাদে...
পুলিশের প্রথামত অঞ্চল পরিদর্শনের জন্য সুপারিন্টেন্ডেন্টে লসন দায়িত্ব দিলেন জ্যাকোয়েস্টের উপর। জ্যাকোয়েস্টের কৌতূহলের কথা তাঁর মনে ছিল। সঙ্গে দেওয়া হল একজন সার্জেন্ট ও ছ'টি কনস্টেবল। সার্জেন্টটি স্থানীয় অধিবাসী। ফলে 'গাইড' হিসাবেও মন্দ নয়।
যাত্রাপথে মূল পরিবহন নৌকা, সুতরাং ভাড়া করা ছাড়া উপায় নেই। স্থানীয় অধিবাসীরা 'ম্যূকোয়া' গাছের কাঠ দিয়ে বিশেষ একধরনের নৌকা প্রস্তুত করে। তারই একটা ভাড়া করে ছোট দলটির যাত্রা শুরু হল জাম্বেসীর বুকে। বিস্তৃত নদী জাম্বেসী। একবার নৌকা উলটে গেলে নদীবক্ষে দলে দলে বিচরণশীল কুমির অথবা জলহস্তীর জলযোগে পরিণত হওয়াও আশ্চর্য নয়...
নদীপথে গন্তব্যস্থান ছিল 'মংগু' নামক একটি ছোট শহরতলি। অতঃপর স্থলপথে 'ম্যাংকোয়া' পর্যন্ত।
যাত্রাপথ মোটামুটি নির্বিঘ্নেই কাটল। পাঁচদিনের 'জলবিহার' শেষে জ্যাকোয়েস্ট তাঁর দলবল নিয়ে এসে পৌঁছলেন 'মংগু'-তে।
ছোট শহরটির শাসনকার্য পরিচালনা করেন জনৈক ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার। জ্যাকোয়েস্ট তাঁর সঙ্গে আলাপ করলেন। ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার মিঃ সিম্পসন নিঃসন্দেহে যোগ্য ব্যক্তি। ভদ্রলোক যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং তাঁর আওতায় গোটা অঞ্চলটি সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। এছাড়া জনৈক ডাক্তার এবং কয়েকজন সরকারি কর্মচারীর দেখা পেলেন জ্যাকোয়েস্ট। স্থানীয় পসারিদের মধ্যে অধিকাংশই গ্রিসদেশীয় অথবা ভারতীয়।
সরকারি অতিথিশালায় থাকার বন্দোবস্ত ছিল, কিন্তু মিঃ সিম্পসনের আমন্ত্রণে তাঁর বাড়িতেই আতিথ্যগ্রহণ করলেন জ্যাকোয়েস্ট।
ওইদিন বিকেলে কথায় কথায় স্থানীয় অধিবাসীদের প্রসঙ্গ উঠল। জ্যাকোয়েস্ট তাঁর কৃত্রিম দন্তপংক্তির ইতিহাস বিবৃত করতে গিয়ে, সিম্পসনকে তাঁর কৌতূহল এবং আগ্রহের কথাও জানালেন। প্রত্যুত্তরে মিঃ সিম্পসন যে প্রস্তাব রাখলেন সেটি চমকপ্রদ—
মাইল ত্রিশেক দূরে একটা 'বা-ইলা' গ্রামে, মোড়লের ছেলে বয়ঃসন্ধিতে উত্তীর্ণ হয়েছে, এবং এই সময়টি যেহেতু পশুরাজের মিলনকাল বা mating season, সেই কারণে ওই বিশেষ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে সুবর্ণসময়। জ্যাকোয়েস্ট ইচ্ছা করলে, তিনি তাঁকে উক্ত অনুষ্ঠানটি দেখবার জন্য ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
এ যেন 'মেঘ না চাইতে জল পাওয়া'। তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন জ্যাকোয়েস্ট।
পরদিন প্রত্যুষে আফ্রিকান সার্জেন্টকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাকে চড়ে পূর্বে উল্লিখিত 'বা-ইলা' গ্রামটির দিকে যাত্রা করলেন তিনি। সার্জেন্টটি স্থানীয়, ফলে দোভাষীর কাজ দেবে। উপরন্তু, মিঃ সিম্পসন যে ট্রাকচালকটিকে সঙ্গে দিয়েছিলেন, পথপ্রদর্শকের কাজও সে বেশ ভালোমতো চালাতে সক্ষম।
গন্তব্যস্থলে পৌঁছে কিন্তু প্রথমে বেশ কিছুটা অবাক হলেন জ্যাকোয়েস্ট। গ্রামের মধ্যে একটিও পুরুষের চিহ্ন নেই। কেবল স্ত্রীলোকেরা দুপুরের খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে কতগুলো উচ্ছিষ্ট-লোভী কুকুর। আর কোনো প্রাণের সাড়া চোখে পড়ে না।
জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল যে গ্রামের সমস্ত পুরুষ ও যুবকরা জঙ্গলে গেছে সিংহের খোঁজ করতে, ফলে গ্রামে এখন কেউ নেই। তবে 'বাওয়ানা' (সাহেব) যদি অপেক্ষা করেন তাহলে দুপুরেই তাদের সঙ্গে দেখা হতে পারে।
দেখতেই এসেছেন জ্যাকোয়েস্ট, ফলে তিনি বিশ্রামের উদ্যোগ করলেন।
বেলা যত বাড়তে লাগল, ছোট ছোট দল বেঁধে কিশোর অথবা যুবকরা গ্রামে ফিরতে শুরু করল। বিকেল পড়তে পড়তে প্রায় সবাই গ্রামে ফিরে এল।
গ্রামের মোড়লের ছেলে 'চুলা'। তাকে ডেকে পাঠালেন জ্যাকোয়েস্ট। সে এল। হ্যাঁ! জরীপ করার মতোই একখানা চেহারা বটে! তার আপাদমস্তকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন জ্যাকোয়েস্ট। উদ্ধত, বলিষ্ঠ 'বা-ইলা' যুবক। উন্নত ললাটের নীচে একজোড়া চোখের দৃষ্টি শীতল। মুখের আদল মোটেই প্রতিবেশী উপজাতিদের সদৃশ নয়—পাথর কেটে খোদাই করা মুখাবয়বের সঙ্গে আরবদেশীয়দের আর্শ্চয সাদৃশ্য বর্তমান। বলিষ্ট দেহ জুলু যোদ্ধাদের মতো ছিপছিপে। তার কাছে জ্যাকোয়েস্ট জানতে পারলেন যে আজ সারাটা দিন খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে একটি সিংহীর দেখা পাওয়া গেছে। গ্রাম থেকে অদূরবর্তী একটা জলাশয়ের ধারে একটা জেব্রা শিকার করে নিয়ে এসে সে আস্তানা গেড়েছে। খাদ্য এবং জলের প্রাচুর্য থাকায় সে অন্তত দিন দুই ওই আস্তানা গোটাবে বলে মনে হয় না। সুতরাং, পর দিন ভোরবেলা 'চুলা' ওই সিংহীটার মুখোমুখি হবে।
সে দিন সারারাত আশেপাশের গ্রাম থেকে ক্রমাগত দলে দলে লোক এসে জমায়েত হতে লাগল এই গ্রামটিতে। সারারাত ধরে মশালের আলোয় চলল অবিরাম মদ্যপান। বহু চেষ্টা করেও জ্যাকোয়েস্ট দু-চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। গ্রামের অধিবাসীদের উত্তেজনা তাঁকেও স্পর্শ করেছিল।
জ্যাকোয়েস্টের ঘড়িতে তখন ভোর চারটে।
পথপ্রদর্শক এসে জানাল সময় হয়ে গেছে। তৈরিই ছিলেন জ্যাকোয়েস্ট। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে গাইডের অনুসরণ করলেন। গ্রামের মধ্যে থেকে এক জনস্রোত এগিয়ে চলেছে অরণ্যের পথে। তাদের সঙ্গে, প্রায় পাঁচফুট লম্বা একটা বাঁশ হাতে চলেছে এক অপরূপ মূর্তি—'চুলা'।
বেশ কিছুটা পথ চলার পর এক বিরাট উইঢিপির সামনে এনে জ্যাকোয়েস্টকে দাঁড় করাল পথপ্রদর্শকটি। পর্যবেক্ষণের উপযুক্ত স্থান। উইঢিপিটার উপর থেকে অগ্রবর্তী সব কিছুই সহজে দৃষ্টিগোচর হবে। ধীরে ধীরে জ্যাকোয়েস্ট ঢিপিটার উপরে উঠে পড়লেন। আফ্রিকার সমতলভূমি তখনও নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা।
প্রায় ঘণ্টাখানেক উইঢিপির উপর দাঁড়িয়ে আছেন জ্যাকোয়েস্ট—
প্রথম উষার আলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠল দিগন্তজুড়ে। সাদা-কালোর আঁচড়ে ফুটে উঠতে লাগল বিভিন্ন দৃশ্যপট। সম্মুখের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, ইতস্তত ছড়ানো দু-চারটে গাছ, উঁচু উইঢিপি। নীচে দৃষ্টিপাত করলেন জ্যাকোয়েস্ট।
বিস্তীর্ণ তৃণভূমির উপর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে এক চলন্ত বৃত্ত—'বা-ইলা' যোদ্ধাদের সারি। প্রায় দুশো গজ ব্যাসযুক্ত সেই বৃত্তের মধ্যস্থলে একটি ঝোপ জ্যাকোয়েস্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ঝোপের আড়ালে শায়িত একটি ধূসর দেহ। এত দূর থেকেও জ্যাকোয়েস্টের পক্ষে বস্তুটির স্বরূপ উপলদ্ধি করতে বিলম্ব হল না—ঘুমন্ত সিংহী!
ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এল বৃত্তাকারে সারিবদ্ধ যোদ্ধার দল। নিস্তব্ধ, নীরব তৃণাচ্ছাদিত প্রান্তরের বুকে শুধু মন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে চলেছে একদল মানুষ।
ঘুমন্ত সিংহীকে কেন্দ্র করে ক্রমশ ছোট, আরও ছোট হয়ে এল বেষ্টনী। তারপর হঠাৎ প্রত্যুষের শান্ত নীরবতাকে খান খান করে দিয়ে প্রান্তরের বুকে জেগে উঠল সহস্র উন্মত্তকণ্ঠের বীভৎস ঐকতান। যেন এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে প্রতিটি 'বা-ইলা' যুবকের রক্তে জেগে উঠেছে বন্য হিংসা, দেহের প্রতিটি স্নায়ুতন্ত্রীতে জেগেছে হত্যার উন্মাদনা। টিনের ক্যানেস্তারা পিটিয়ে বিকট চিৎকার করতে করতে তারা এগিয়ে চলল সিংহীটার দিকে। জ্যাকোয়েস্টের মনে হল তাঁর সামনে নরকের সব ক'টা দরজা যেন কেউ একমুহূর্তে খুলে দিয়েছে...
ঝোপের আড়ালে উঠে দাঁড়াল ক্রুদ্ধা সিংহী। নিদ্রাভঙ্গের বিরক্তি এবং আক্রমণের আকস্মিক ধাক্কায় সে খানিকটা বিচলিত। আন্দোলিত সুদীর্ঘ লাঙ্গুল, ত্রস্তদৃষ্টি, অভিব্যক্তিতে ভয় এবং ঘৃণার ভাব পরিস্ফুট।
শ্বাপদের মতো ঋজু পদক্ষেপে চুলা প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হল। তার দৃঢমুষ্টিতে বল্লমের মতো সুতীক্ষ্ন বংশদণ্ড শক্ত করে ধরা। দু-চোখের তীক্ষ্ন দৃষ্টি শত্রুর গতিবিধির উপর সতর্ক পরীক্ষায় নিবদ্ধ। সিংহীও ততক্ষণে তার প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বীকে আবিষ্কার করে ফেলেছে—তার শীতল, ধূসর দুটি চোখ আর ত্রস্ত নিরীক্ষণে ব্যস্ত নয়, চুলার উপর স্থির। সম্মুখ দ্বৈরথের জন্য প্রস্তুত হল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী—
হঠাৎ যেন মন্ত্রবলে থেমে গেল সমস্ত কোলাহল। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই, প্রান্তরের বুকে পুনরায় বিরাজ করতে লাগল স্তব্ধতার রাজত্ব।
প্রতিটি মুহূর্ত এক একটা যুগ মনে হচ্ছে জ্যাকোয়েস্টের। নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছেন তিনি। অজানিত আশংকা নিয়ে এ এক আশ্চর্য প্রতীক্ষা...
ধীরে ধীরে সতর্ক পায়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে এগিয়ে এল চুলা, দুজনের মধ্যে দূরত্ব হবে আর বড়জোর পনেরো ফুট। চুলার দু-হাতে শক্ত করে ধরা ছুঁচোল বাঁশের দণ্ডটি শত্রুর দিকে আনত...
সিংহীর উন্মুক্ত ওষ্ঠের ফাঁকে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করল তীক্ষ্ন দন্তের সারি, কণ্ঠদেশ থেকে নির্গত হল অবরুদ্ধ গর্জনধ্বনি। তার প্রকাণ্ড শরীরের সমস্ত মাংসপেশিগুলো সংকুচিত হয়ে এল। আক্রমণের পূর্বসংকেত!
চুলার ছিপছিপে বলিষ্ঠ দেহ ধনুকের মতো বেঁকে গেল চরম মুহূর্তের প্রতীক্ষায়।
মুহূর্তের অপেক্ষা...
তারপরই প্রচণ্ড গর্জনে বনভূমি প্রকম্পিত করে সিংহী লাফ দিল। একটা ধূসর বিদ্যুৎ উড়ে এল চুলার দিকে।
এক ইঞ্চি নড়ল না 'বা-ইলা' যুবক।
জ্যাকোয়েস্টের মনে হল চুলার হাতের 'অস্ত্রের' নাগাল এড়িয়ে সিংহী তার প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর এসে পড়েছে—আর মাত্র কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যে নখ ও দাঁতের ক্ষিপ্র সঞ্চালনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে হতভাগ্য বা-ইলা যুবকটির দেহ।
কিন্তু ভুল ভাঙতে দেরি হল না।
দু-হাতের প্রাণপণ শক্তিতে চুলা তখন বাঁশটাকে ধরে রেখেছে মাটিতে ঠেস দিয়ে। আর তার মাথার উপর বাঁশের ছুঁচোল ফলায় বিদ্ধ হয়েছে সিংহীর কণ্ঠদেশ।
কৌশল, শক্তি এবং বুদ্ধির জোরে চুলা উত্তীর্ণ হয়েছে তার যৌবনের অগ্নিপরীক্ষায়।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন