নির্বেদ রায়

'আমেরিকার ছয় শিকার।'
শিকারিদের মধ্যে চালু কথা। কিন্তু ওই কথা পর্যন্তই, না-হলে বৈঠকখানার দেওয়ালে পরপর ওই ছয় কুলীনের গায়ের চামড়া কি ফ্রেমে-আটকানো মাথা টাঙিয়ে রাখার সৌভাগ্য হয়েছে খোদ আমেরিকারই বা ক'জন শিকারির। তিন-চারটে অবধি সংগ্রহ করে তারপর বাকি দুটোর জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেও আর হয়নি, এমন লোকের সংখ্যা প্রচুর। আবার শুরুতেই মন্দভাগ্য—পৃথিবীর আলো আর দেখা হয়ে ওঠেনি, এমন লোকের খোঁজও কম মিলবে না।
এই ছ'জনের প্রত্যেকেই নিজের নিজের পরিবারের কর্তাব্যক্তি—হরিণ পরিবারের 'মুজ', ফোঁটা-কাটা বাঘেদের পরিবারে 'জাগুয়ার', ভেড়া আর ছাগল পরিবারের দুই পাহাড়ি সভ্য আর সবশেষে ভালুক পরিবারের বিশিষ্ট দুজন—'মেরুভালুক' আর ভয়ংকর 'গ্রিজলী'।
এদের মধ্যে কেউই বন্দুকের নিশানার মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে অভ্যস্ত নয়। স্বভাব-চরিত্রের দিক দিয়েও এদের কাউকে নিরীহ, শান্তশিষ্ট বলে সার্টিফিকেট দেওয়া চলে না। আস্তানাও এদের দুর্গম সব অঞ্চলে। এই তিন গুণের ত্র্যহস্পর্শে তাই এরকম ছ'টা শিকার এক জীবনে করে ওঠা দুষ্কর। তবে একবার করে ফেললে আর কথা নেই। নিজের বন্দুকটাকে তখন পৃথিবীর প্রথম সারির শিকারিদের বন্দুকগুলোর পাশে ঝুলিয়ে রাখা যেতে পারে নিশ্চিন্তে।
রে এটকিনসের হয়েছিল চারটে। বাকি ছিল জাগুয়ার আর মেরুভালুক। জাগুয়ারের খোঁজ মেলে আমেরিকায়, তাছাড়া জাগুয়ার শিকারে ঝামেলা বেশি; তাই সেটা ছয় নম্বরে তুলে রেখে পাঁচের খোঁজে বেরিয়েছিল এটকিনস।
জন্মসূত্রে টেক্সাসের বাসিন্দা, কিন্তু উত্তর আমেরিকার পাহাড়ের ঢালে নীল মেঘের মতো পাইন গাছের বনে বন্দুকের গুলিতে বিরাট এক গ্রিজলীকে শুইয়ে দেওয়ার পর থেকেই এটকিনসের খোঁজ শুরু হয়েছিল পাঁচ নম্বরের জন্য। গ্রিজলী ছিল চারের বাজি!
আলাস্কায় বেশ কিছু ঘোরাঘুরি করে খবর যা পাওয়া গেল, তা সুবিধের নয়। সাদা বরফের মতো তুষারভালুক প্রায় নিপাত্তা হতে বসেছে এ অঞ্চল থেকে। কপাল ঠুকে যদি বা এক-আধটার দেখা মেলে তো তার জন্যে স্লেজগাড়িতে ঘুরতে হবে হন্যে হয়ে। ঘুরলেও যে খোঁজ মিলবে এমন কথা হলপ করে বলবে না কেউ, অথচ চেষ্টার ক্রটি রাখলেও চলবে না—এ যেন বুনো হাঁসের পিছনে ঘুরে মরা।
দেখে শুনে যখন হাল ছেড়ে দেবার অবস্থা, তখনই মুশকিল আসান করতে এসে পৌঁছল বেনেট ট্র্যাভেল ব্যুরোর চিঠি। সম্ভব-অসম্ভব যত জায়গা রয়েছে হাতের কাছে, এটকিনস তো আর খোঁজ করতে বাকি রাখেনি কোথাও—ট্র্যাভেল ব্যুরোর চিঠি তারই ফলশ্রুতি। চিঠির ভাষা পরিষ্কার—আগামী সপ্তাহ কয়েকের মধ্যে একটা সাদাভালুক শিকার-অভিযানের বন্দোবস্ত করেছে বেনেট কোম্পানি। যেতে হবে অবশ্য একটু দূরে—প্রায় হাজার ছয় মাইল পাড়ি দিয়ে উত্তর ইয়োরোপে; নরওয়ের প্রান্তসীমায়। তবে শিকারের ব্যাপারটা প্রায় হাতের মুঠোয়—স্পিটসবারগেল দ্বীপমালায় তুষারভালুকের নাকি গাদাগাদি ভিড়। অভিযাত্রীদের মাথাপিছু ভাড়া একহাজার ডলার।
মনস্থির করতে এক সেকেন্ডও লাগল না।—হাতের কাজগুলো কোনোরকমে সেরে নিয়েই এটকিনস চড়ে বসল প্লেনে।
নরওয়ের রাজধানী অসলো-য় নেমে ট্রমসোতে যেতে হয়। ট্রমসো হল উত্তর মেরুবৃত্তের প্রায় দুশো মাইল ভেতরে। ট্রমসো থেকে যাত্রা শুরু জলপথে।
একটা ডিমকে লম্বালম্বি আধখানা করলে যা হয়, সাতান্ন ফুট লম্বা জলপোত 'হাভেলা' দেখতে ঠিক সেইরকম। কারণ, ঝোড়ো হাওয়ায় বরফের চাঙ্গড় ভেসে এসে যদি দুপাশ থেকে জাঁতাকলের মতো ছোট্ট জাহাজটাকে চেপে ধরে তাহলে ভেঙে চুরমার হওয়ার বদলে যেন বরফের উপরেই সেটা পিছলে উঠে যায়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। ইঞ্জিন ছোটখাটো দেখতে হলেও জোরালো। ডিজেলে চলে।
কার্ল নিকোলিয়েসন বলে যে চালকটিকে 'হাভেলা'র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, বরফের চাঁই-ভাসা সমুদ্রের সে একজন দক্ষ নাবিক। মেরুর প্রচণ্ড তুষারবাত্যায় যখন ছোটখাটো পাহাড়ের মতো হিমশৈল চারিদিক থেকে ভেসে আসে কিম্বা গোটা সমুদ্র জমে বরফের প্রান্তরে পরিণত হয় তখন তার মধ্যে দিয়ে সরু সরু গলির মতো খাঁড়ি খুঁজে জাহাজ চালাতে গিয়ে সাধারণ নাবিক থই পায় না। তার জন্য চাই বরফের রাজ্য ঢুঁড়ে আসা মানুষ। কার্ল ছিল সেই মানুষ।
যাত্রা শুরু করার দুদিন বাদেই এল ঝড়। দূরবিনে চোখ রেখে কার্ল তাকিয়ে ছিল খাঁড়ির দিকে—হঠাৎ তার কপালে ফুটে উঠল উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার ভাঁজ। সর্বনাশ! হাওয়ার তোড়ে দুপাশের বরফ ভেসে আসছে খাঁড়ির মুখ বন্ধ করে দিতে। একবার এর মাঝে আটকে পড়লে আর রক্ষা নেই—হতাশ হয়ে অপেক্ষা করে থাকতে হবে যতদিন বরফ না সরে। কবে সে বরফ সরবে তাও কেউ জানে না, আর ততদিনে রসদ যদি ফুরিয়ে যায় তো চমৎকার! একেবারে সোনায় সোহাগা।
আর একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে পূর্ণশক্তিতে জাহাজ ছোটাল কার্ল। থরথর করে কাঁপতে লাগল গোটা 'হাভেলা'। চারদিন ধরে ছুটল জাহাজ, বরফের পাহাড়ের গা ঘেঁষে, পাড় ছুঁয়ে, সরু খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে মাছের মতো পথ করে।
শেষে পাঁচ দিনের মাথায় থামল ঝড়। ভালো করে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়াও হল সে দিন। কেবিনে গিয়ে গা এলিয়ে দিতেই এটকিনস ডুবে গেল ঘুমের গভীর অতলে।
ঘুম ভাঙল যখন, দূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে বলে মনে হল এটকিনসের। একটু ধাতস্থ হতে অস্পষ্ট আওয়াজটা ক্রমে একটা শব্দে পরিণত হল। কেউ যেন বারবার বলে চলেছে ইসবর্ণ! ইসবর্ণ!
চোখ খুলল এটকিনস। না, দূরে কোথাও নয়—তার কেবিনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে অ্যাগে; অ্যাগে রাভোল্ট। জাতে নরউইজিয়ান। ক্রমাগত বলে চলেছে সেই—ইসবর্ণ! ইসবর্ণ!
কিন্তু এই ইসবর্ণ পদার্থটা কি? একবিন্দু মাথায় ঢুকছে না এটকিনসের। না ঢোকারই কথা অবশ্য। কারণ অ্যাগে একবর্ণ ইংরেজি জানে না, এটকিনস জানে না নর্সভাষার ক-অক্ষর।
তবু ভাবভঙ্গি বুঝে পিছন পিছন বাইরে বেরোল এটকিনস। 'হাভেলা' দাঁড়িয়ে আছে নোঙর ফেলে—শান্ত, স্থির। ডেকের উপর এসে দূরবিনটা হাতে তুলে নিল অ্যাগে। সেই দূরবিনে চোখ রেখে অ্যাগের নির্দেশমতো তাকিয়ে প্রথমে সাদা বরফের রাজ্যের মাঝে কয়েকটা কালো পাহাড়ের গা ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ল না বটে কিন্তু দূরবিনটা তারপর এক জায়গায় স্থির রাখতে ব্যাপারটা নজরে এল। কালো পাহাড়ের গায়ে একটা সাদা বিন্দু নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে যেন! এতক্ষণে ইসবর্ণ এর মানে বুঝল এটকিনস—নরওয়ের ভাষায় তুষারভালুক হল ইসবর্ণ।
জনাকয় নাবিককে নৌকা নামাতে বলে এটকিনস তখনি কেবিনে ছুটল বন্দুক আর ক্যামেরা নিয়ে আসতে।
কালো পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এক এক জায়গায় জমে আছে সাদা পেঁজা তুলোর মতো বরফ। গত চার দিনের দুরন্ত ঝড়ের পর হাওয়া আজ পড়ে এসেছে, সমুদ্রও স্থির।
হাওয়া চলাচল স্বাভাবিক হলে পাথরের খাঁজ থেকে বাইরে আসে 'সীল'-এর দল আর তার পিছনে শিকারের জন্য দেখা দেয় মেরুভালুক। ছোট-বড় সব পাথরের চাঁই ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে; তারই আড়ালে গা-ঢেকে শুধু বাতাসে ভেসে আসা গন্ধ শুঁকে এগিয়ে আসে ভালুক।
এই চারদিন যেভাবে ঝড় চলেছে তাতে একটা সীল-এরও দেখা মেলেনি। তাই পাঁচদিনের দিন শ'খানেক গজ দূরে দু-দুটো প্রকাণ্ড সীল-এর দেখা পেয়ে বাতাসে গন্ধ শুঁকে এগোল বিরাট স্ত্রী-ভালুকটা। হঠাৎ একটা অদ্ভূত শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল ভালুক। সীল তো এভাবে ডাকে না কখনো। কিন্তু শুধু আওয়াজে ঘাবড়াবার পাত্রী নয় মেরুরাজ্যের মহারানি—সামলে উঠে তখনি সে আবার এগোল সামনের দিকে।
সীল দুটো ও দিকে তখন মুভি ক্যামেরা চালিয়ে ভালুকের ছবি তুলতে ব্যস্ত। আওয়াজটা ওই ক্যামেরার। প্রায় আশি গজের আওতায় যখন এসে পড়েছে ভালুক, তখন ক্যামেরা নামিয়ে রাইফেলটা তুলে নিল এটকিনস। অ্যাগে রাভোল্ট আগেই তৈরি হয়েছিল কোমরের পিস্তল খুলে নিয়ে চরম মুহূর্তের জন্য—যদি রাইফেলের গুলি ফসকায়!
কিন্তু তার আর প্রয়োজন হল না। একটাই গুলি, তাতেই কেল্লা ফতে! সামনে গিয়ে শিকার দেখে খুশিই হল এটকিনস। মাঝারি আকারের স্ত্রী-ভালুক একটা।
কিন্তু আনন্দ করার সময় বিশেষ পাওয়া গেল না—বেশ কিছুটা দূরে একটা কিছুর নড়াচড়া ডান চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ্য করল রে এটকিনস। বন্দুকে গুলি ভরে ফিরতে হল সেই দিকে।
আরেকটা তুষার ভালুক! আকারে রীতিমতো দশাসই। পাথরের চাঁই-এর আড়াল নিয়ে এ দিকেই এগোচ্ছে সে।
সম্ভবত বন্দুকের আওয়াজ তার কানে গিয়ে থাকবে, তাই এই কৌতূহল। এখানকার ভালুকগুলোর অনেকেই জীবনে মানুষ দেখেনি, বন্দুকের আওয়াজ শোনা তো দূরের কথা। অপরিচিত আওয়াজ বা আকার দেখলে তাই খাবার জিনিস বলেই তারা ঠাহর করে একমাত্র।
বেশ রয়ে-সয়ে এটারও ছবি তুলল এটকিনস, তারপর একটি গুলির তো মামলা! খানিকক্ষণ বাদে আর একটা ভালুক—এটা ছোটখাটো, নেহাতই নাবালক গোছের।
মোটামুটি ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে গোটা একটা তুষারভালুকের পরিবার শিকার করে পরিতৃপ্ত মনে জাহাজে ফিরল রে এটকিনস। বেনেট কোম্পানি ধাপ্পা দেয়নি। আসতে হয়েছে তাকে অনেকটা পথ বটে, নইলে বৈঠকখানায় বসে বই পড়ার মতোই সহজে হয়েছে শিকার।
পাঁচ নম্বরের বাজি জিতে খুশি হয়েছিল এটকিনস। ভাগ্যবান মানুষ হিসাবে ছ'নম্বরও একদিন জুটেছিল তার কপালে। টেক্সাসে সম্ভবত এটকিনস প্রথম মানুষ যার বৈঠকখানায় ঝুলেছিল ছ'ছটি মূল্যবান শিকারের স্মৃতি।
কিন্তু উল্টোদিকের কথাটাও একটু জানা দরকার। এই দিকে এটকিনসের মতো শৌখিন মানুষ, অন্য দিকে তুষার ভালুকের চামড়া ও বাচ্চা চড়াদামে বেচে যারা প্রচুর টাকার ব্যবসা করছে তাদের দৌলতে পৃথিবীর বুকে এই অপুর্ব সুন্দর জন্তুটি আর কতদিন হেঁটে চলে বেড়াবে কে জানে?
মানুষের শখ আর লোভ মেটাতে এইভাবেই তো নয়-নয় করে প্রায় আড়াইশো জাতের পশুপাখি সবুজ বন আর নীল আকাশের চৌহদ্দি থেকে বিদায় নিয়েছে চিরদিনের মতো। এখন তাদের দেখা মিলবে শুধু পৃথিবীর যত বড় বড় জাদুঘরে আলোছায়া-মাখা, ঠান্ডা, নিস্তব্ধ কুঠরিতে। তুষার ভালুকও কি তাদের সাথী হতে চলেছে?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন