নির্বেদ রায়

গ্রিক পুরাণের নায়ক হারকিউলিস।
দেবরানি জুনোর চক্রান্তে মানবশ্রেষ্ঠ হারকিউলিসকে বরণ করতে হয়েছিল 'আর্গোর' সম্রাটের দাসত্ব। কিন্তু ভৃত্যের মতো নতশিরে রাজাদেশ পালন করার ব্রত নিয়ে পৃথিবীর বুকে বজ্রপেশি হারকিউলিসদের জন্ম হয় না; 'আর্গোর' সম্রাটও বুঝতে পারলেন সে কথা।
কিন্তু এত সহজে হারকিউলিসকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে রাজি হলেন না তিনি—আরোপ করলেন এক কঠিন শর্ত।
শর্তানুসারে, হয় সম্রাটের প্রদেয় বারোটি দুঃসাধ্য কার্য সম্পাদন করে হারকিউলিস আপন দাসত্ব-শৃঙ্খল মোচন করবেন; নচেৎ, চিরদিনের মতো তাকে হয়ে থাকতে হবে সম্রাটের আজ্ঞাবহ।
হারকিউলিস নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন সেই শর্ত—তারপর!
গ্রিস দেশের উপকথায় বর্ণিত আছে, তারপর কেমন করে হারকিউলিস তাঁর অসীম শক্তি এবং তীক্ষ্ন বুদ্ধির সাহায্যে একে একে সম্পাদিত করেছিলেন আর্গোর রাজার দেওয়া বারোটি দুরূহ কাজ। কেমন করে আপন ক্ষমতাবলে মোচন করেছিলেন আপনার দাসত্ব।
কিন্তু এ তো গেল পুরাণের কথা—তবে, হারকিউলিসদের দেখা শুধু পুরাণের পাতাতেই মেলে না।
যুগে যুগে পুরাণ বা উপকথার জগৎ থেকে হারকিউলিসের দল নেমে আসে বাস্তবের পৃথিবীতে—অসীম শক্তি এবং বুদ্ধিবলে এই বৃষস্কন্ধ মানুষগুলো জীবন সংগ্রামের বন্ধুর, কঠিন পথে রচিত করে যান আশ্চর্য সব অবিশ্বাস্য কাহিনি সভ্য সমাজের হাজারো নিয়মের মাঝখানে, যার ফলে এদের মনে হয় খাপছাড়া, বেমানান, দুর্বিনীত!
এমনই দুটি ব্যতিক্রম চার্লস কটার ও বিলি প্যারোট। আমাদের প্রথম কাহিনিটির নায়ক চার্লস কটার নামক একটি অদ্ভুত মানুষ, মানুষ না বলে বরং যাকে 'অমানুষিক মানুষ' আখ্যা দেওয়া যেতে পারে; অন্তত কাহিনির মধ্য দিয়ে বারবার আমাদের একথাই মনে হবে বলে আমার বিশ্বাস।
চার্লস কটার
বিখ্যাত শিকারি নজ হান্টারের জীবনকাহিনির পাতা থেকে আমাদের বর্তমান ঘটনাটি এখানে বিবৃত করা হল—এছাড়া ছোট্ট একটি ঘটনা চার্লস কটারের পুত্র শিকারি বাড কটারের বিবরণী থেকে সংগৃহীত।
'শ্বেত শিকারির' পেশা অবলম্বন করে আফ্রিকায় জীবিকানির্বাহ করলেও চার্লস কটারের জন্মভূমি ছিল আমেরিকার ওকলাহামা প্রদেশে। এমনকী আফ্রিকায় আসার আগে বেশ কিছুদিন সে ওকলাহামা প্রদেশের শেরিফের পদেও নিযুক্ত হয়েছিল।
যে সময়কার কথা বলছি, সে সময়ে ওই অঞ্চলে যারা বাস করত তাদের মোটেই 'অত্যন্ত ভদ্র এবং সজ্জন ব্যক্তি' বলে অভিহিত করা যায় না, বিশেষ করে যখন তাদের অধিকাংশের জীবনদর্শন, মুখনিঃসৃত বাক্যের বদলে কোমরে ঝোলানো রিভলভার অথবা মুষ্টিবদ্ধ হস্তের মুষ্টিযোগের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। ওই চমৎকার অঞ্চলটিতে নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঠিক যে ধাঁচের মানুষ প্রয়োজন, চার্লস কটার ছিল অবিকল সেই ধাঁচের। তার জীবনদর্শনেও বিশেষ কোনো জটিলতা ছিল না, এবং স্থানীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের মতে সেও ছিল সমানভাবে বিশ্বাসী। কিন্তু আশ্চর্য! তা সত্ত্বেও ওকলাহামার গুন্ডারা কটারকে বিশেষ পছন্দ করত না। বরং অচিরেই তারা বুঝে নিয়েছিল যে চিতাবাঘের মতো চটপটে, ছ'ফুট চার ইঞ্চি লম্বা মানুষটা যতদিন শেরিফ রয়েছে, ততদিন একটু চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ফলে, 'শ্বেতশিকারির' পেশাকে আশ্রয় করে এবং শেরিফের পদে ইস্তফা দিয়ে চার্লস কটার যখন আমেরিকা থেকে আফ্রিকার বুকে পাড়ি জমাল তখন স্বাভাবিক কারণেই ওকলাহামার গুন্ডারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল।
শ্বেতশিকারির পেশায় পয়সা থাকলেও জীবনের ঝুঁকি বড় বেশি।
শিকারের নেশায় কিম্বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের আশায় প্রতি বছরই বহু বিদেশি বা ধনী ব্যক্তিদের আগমন ঘটে আফ্রিকার অরণ্য প্রদেশে। অরণ্যের অভ্যন্তরে অজস্র জানা-অজানা বিপদের করল থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাঁরা নিয়োগ করেন পেশাদার দক্ষ শিকারিদের। নিয়োগকর্তার সম্পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পিত থাকে ওই পেশাদার শ্বেতশিকারিদের উপর।
কটারের কাছে এই বিপজ্জনক পেশা ছিল তার মনের মতো চাকরি।
শিকারিজীবনে একটি জানোয়ারের প্রতি কটারের তীব্র ঘৃণা ছিল এবং সেটি হল আফ্রিকা মহারণ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক জানোয়ার—লেপার্ড বা চিতাবাঘ।
প্রসঙ্গক্রমে এইখানে জন্তুটার একটু পরিচয় দেওয়া যাক। হলদের ওপর কালো বুটিদার গাত্রচর্মের অধিকারী এই জন্তুটির গড় ওজন প্রায় দুশো পাউন্ডের মতো হয়ে থাকে। বিড়ালগোষ্ঠীর প্রাণীদের মধ্যে বিপুলবপুর অধিকারী না হলেও ক্ষিপ্রতা এবং আক্রমণের কৌশলগত দিক দিয়ে বিচার করলে লেপার্ড অদ্বিতীয়।
বিড়ালগোষ্ঠীতে বুটিদার জানোয়ারের সংখ্যা একাধিক। শুধুমাত্র লেপার্ড-ই নয়, জাগুয়ার, প্যান্থার এবং 'চিতা'-র গায়েও রয়েছে হলদে-কালোর নামাবলী।
প্যান্থার এবং লেপার্ডের মধ্যেকার পার্থক্য জীবতত্ত্বের নিখুঁত গবেষণার বিষয়, যা অজ্ঞাত থাকলেও আমাদের আপাতত খুব বেশি ক্ষতি বৃদ্ধি ঘটবে না। জাগুয়ার দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দা, আকৃতিগত দিক দিয়েও লেপার্ডের সঙ্গে জাগুয়ারের বৈসাদৃশ্য অনেক। সাঁতারে সুদক্ষ জাগুয়ারের মুখটা গোল হাঁড়ির মতো, লেপার্ডের তুলনায় সে খানিকটা উঁচুও বটে। কিন্তু ভারতবর্ষে 'লেপার্ড' প্রধানত চিতাবাঘ নামেই পরিচিত। আর যাঁরা প্রকৃতিপড়ুয়া বা জীবতাত্ত্বিক নন, তাঁদের অনেকেই এই নামটিকে কেন্দ্র করেই 'চিতা' এবং চিতাবাঘের বা লেপার্ডের মধ্যে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলেন।
ভারতবর্ষেও লেপার্ড বাস করে এবং তাদের আকৃতি বৃহৎ, কিন্তু 'চিতা' বা 'Cheeta' নামক যে জীবটি আফ্রিকার অরণ্যে ঘুরে বেড়ায় তার সঙ্গে লেপার্ডের কোনো তুলনাই হয় না।
দ্রুতগামী, লাজুক এবং খানিকটা ভীরু প্রকৃতির 'চিতা' বিড়াল ও কুকুর উভয় গোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। ফলে, গাত্রচর্ম বা মুখাবয়ব অতিকায় মার্জারদের মতো হলেও পেশির বিন্যাস বা পায়ের থাবা তার সারমের সদৃশ। অন্য দিকে সুঠাম গঠনের লেপার্ডের পেশিতে ও থাবায় খুঁজে পাওয়া যায় হিংস্র শ্বাপদ-ক্ষিপ্রতা। দেহচর্মের বিচারেও লেপার্ড ও চিতার পার্থক্য লক্ষণীয়—লেপার্ডের দেহকে আবৃত করে হলুদ জমির উপর রয়েছে কালো চাকা চাকা দাগের আলপনা, ইংরেজিতে যাকে বলে 'রোসেট' বা 'রোজেট', পক্ষান্তরে চিতার দেহের শ্রীবৃদ্ধি করেছে অজস্র কালো কালো ফোঁটা, যার ইংরেজি পরিভাষা 'স্পটস'। চিতার দু-চোখের কোণ দিয়ে মুখের উপরিভাগ পর্যন্ত নেমে এসেছে দুটি কালো দাগ, যা কিনা লেপার্ডের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
সুতরাং, নামের জন্য ভুল হলেও, আকৃতি বা প্রকৃতির দিক দিয়ে 'লেপার্ড এবং চিতা' দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জানোয়ার। কিন্তু তা বলে এই লেপার্ডের উপর কটারের তীব্র বিদ্বেষ এবং ঘৃণার কারণ কী?
কটারের অস্বাভাবিক লম্বা এবং বলিষ্ঠ দুটি নগ্ন বাহুকাণ্ডের উপর দৃষ্টিপাত করলেই কারণ বুঝতে দেরি হয় না। হিংস্র লেপার্ডের নখ ও দাঁতের হৃদ্যতাপূর্ণ আলিঙ্গনের ফলেই যে সুদীর্ঘ এবং গভীর ক্ষতচিহ্নগুলির সৃষ্টি হয়েছে, অভিজ্ঞ মানুষ মাত্রই সে কথা উপলব্ধি করেন।
কিন্তু এ তো হল লড়াইয়ের পরিণাম।
লড়াইয়ের বিবরণীর সন্ধান পেতে হলে আমাদের আশ্রয় করতে হবে জনৈক শ্বেতশিকারির আত্মকথা, যাঁর নাম আমরা কাহিনির প্রারম্ভেই উল্লেখ করেছি—
কুকুরের মাংস লেপার্ডের খুব পছন্দ। শিকারিরাও তাই মরা কুকুরের টোপ দিয়ে লেপার্ড শিকার করে থাকেন। কটারেরও অজানা ছিল না কথাটা।
তাই একদিন বনের মধ্যে একটা গাছের উপর মরা কুকুরের দেহটাকে ঝুলিয়ে রেখে কাছেই একটা ঝোপের আড়ালে রাইফেল হাতে নিয়ে আত্মগোপন করে শিকারের অপেক্ষা করছিলেন কটার। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মরা কুকুরের গন্ধ ছড়িয়েছে বনের মধ্যে, আর সেই গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে একটু পরেই অকুস্থলে এসে হাজির হল একটা লেপার্ড।
কটারের খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু জন্তুটাকে দেখামাত্রই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। জন্তুটার গায়ের চামড়াটা মোটেই লোভনীয় নয়, কেমন ফ্যাকাসে। তার মানে বাঘটা লোকালয়ের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়, গভীর অরণ্যের বাসিন্দাদের মতো উজ্জ্বল দেহচর্মের মালিকানা থেকে এ বঞ্চিত।
লেপার্ড কিন্তু এত সব মোটেই ভাবছে না। তার ভাবার কথাও নয়, কারণ তার নাগালের মধ্যে বৃক্ষশাখায় সংলগ্ন হয়ে ঝুলছে একটি মরা কুকুরের দেহ, আর সেই লোভনীয় মাংসে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে তখন তার রসনা ক্রমেই লালায়িত হয়ে উঠছে।
কিন্তু চিতাবাঘ বড় চালাক জানোয়ার। ভালো করে চারদিক দেখে শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে তবেই সে কুকুরটার দিকে চোখ দিল। ধীরে ধীরে গুঁড়ি মেরে জমির উপর বসে পড়ে সে লাফ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হল।
ওদিকে চার্লস কটারের মেজাজ তখন ক্রমেই সপ্তমে চড়ছে। সে প্রথমে ভেবেছিল যে, হতভাগা বিড়ালটা বোধহয় একটু দেখে-টেখে তারপর চলে যাবে, কিন্তু লেপার্ডটা যখন কুকুরের মৃতদেহটাকে গাছের উপর থেকে নামিয়ে আনতে উদ্যোগী হল তখন আর কটারের সহ্য হল না।
হাতের রাইফেল মাটিতে নামিয়ে রেখে সে ছুটে গিয়ে পিছন থেকে লেপার্ডটার দুটো পা চেপে ধরল, আর তার পরই এক প্রচণ্ড আছাড়।
কটার ইচ্ছা করলে জন্তুটাকে অনায়াসে গুলি করে মারতে পারত। কিন্তু সম্ভবত জানোয়ারটার উপর প্রচণ্ড আক্রোশ পোষণ করার ফলেই সে খালি হাতে ছুটে গেছিল।
আছাড় খেয়ে লেপার্ডটা হতভম্ব হয়ে গেছিল। তার পিতৃপুরুষের কাছে কোথাও সে এই ধরনের অভিজ্ঞতার গল্প শোনেনি। এই আক্রমণের কায়দাটা তার কাছে একেবারেই নতুন, বিশ্রী।
কিন্তু আফ্রিকা মহারণ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক জানোয়ার লেপার্ড নিরস্ত্র মানুষের হাতে আছাড় খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার পাত্র নয়।
মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে বিদ্যুতের মতো সে প্রতি-আক্রমণ করল। এই আক্রমণের চকিত ক্ষিপ্রতায় শিকারি তার রাইফেল তুলবার সময় পায় না, দ্রুতগতি বেবুন বৃক্ষশাখা থেকে লুটিয়ে পড়ে ভূমিপৃষ্ঠে গরিলার চোখের উপর দিয়ে উধাও হয়ে যায় ভূমিষ্ঠ শিশু, কিন্তু এবার লেপার্ড শত্রুর নাগাল পেল না।
বজ্রের মতো দুটি অস্বাভাবিক লম্বা হাত চিতাবাঘের কণ্ঠনালী চেপে ধরল। ঝটাপটি করতে করতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীই গড়িয়ে পড়ল মাটির উপর। স-নখ থাবার দ্রুত সঞ্চালনে রক্তাক্ত হয়ে উঠল কটারের দুটো হাত ও নিম্নাঙ্গ, কিন্তু তার হাতের চাপ একটুও শিখিল হল না।
মানুষের আদিমতম অস্ত্র এবং অরণ্যচারী পশুর বন্যবিক্রমের দ্বৈরথে অবশেষে চার্লস কটারই জয়ী হল।
বজ্রমুষ্টির কঠিন নিষ্পেষণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করল লেপার্ড। যুদ্ধ শেষ।
কিন্তু কটার তখন রীতিমতো আহত।
তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ঝরে পড়ছে উষ্ণ রক্তের ধারা, লেপার্ডের শাণিত নখর দেহের একাধিক স্থানে সৃষ্টি করেছে সুদীর্ঘ ও গভীর ক্ষতচিহ্নের। ফলে বাড়ি ফিরে এখনই ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, না হলে ক্ষত বিষিয়ে যেতে পারে—তারপর আপাতত বেশ কিছুদিন টানা বিশ্রাম।
কিন্তু আমরা তো বলতে বসেছি চার্লস কটারের কথা। ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে নিয়মগুলো প্রযোজ্য কটারের ক্ষেত্রে সেগুলো খাটে না।
তাহলে কটার কি করল।
ক্ষতস্থানগুলোতে একটা মোটামুটি ব্যান্ডেজ মতো করে সে অপেক্ষা করতে লাগল পরবর্তী শিকারের জন্য।
অবশ্য এবার আর তাকে হতাশ হতে হয়নি। কুকুরের মাংসের গন্ধে এবার যে লেপার্ডটা এসে আবির্ভূত হল, সেটা আকৃতিতে যেমন বড়সড়ো, তেমনি গায়ের চামড়াটিও তার ভারী সুন্দর। রাইফেলের একটি গুলিতেই শিকারপর্ব সমাধা হয়ে গেল।
জীবজগতে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বহু ক্ষেত্রেই এ ধরনের কাহিনির খোঁজ মেলে। আমাদের পূর্বোক্ত ঘটনার বেশ কয়েক দিন পরে কটার যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পেলেও তাকে প্রতিশোধ চরিতার্থ করার প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়।
সে দিন জঙ্গলের পথ দিয়ে হাঁটছিলেন কটার। আচম্বিতে পিছন থেকে দুটি ছোট জাতের লেপার্ড তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। জন্তুদুটো কটারের মাথার উপরে বৃক্ষশাখায় লতাপাতার আড়ালে আত্মগোপন করে ছিল। এমন অতর্কিত আক্রমণের জন্য কটার প্রস্তুত ছিল না। সে বুঝতে পারল যে হাতের রাইফেল আর তার কাজে লাগবে না। উপরন্তু ততক্ষণে শ্বাপদের দাঁত ও নখের আক্রমণে তার সর্বাঙ্গ হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত।
উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে কটার চকিতে পালটা আক্রমণ করল। তার আগেই সে রাইফেল ফেলে দিয়ে হাত দুটোকে মুক্ত করে নিয়েছিল। বাঘ দুটো এই দ্রুত প্রতি-আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, শত্রুর পায়ের কাছে জমিতে তারা ছিটকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে নীচু হয়ে কটার একটা লেপার্ডের গলা চেপে ধরল। বজ্রপেষণে লেপার্ডটার চোখে তৎক্ষণাৎ রক্ত জমে গেল, কিন্তু শাণিত কিরীচের মতো তার নখগুলো নিশ্চেষ্ট রইল না। কটারের সর্বাঙ্গ হয়ে উঠল রক্তাক্ত।
কটার একটা লেপার্ডের সঙ্গে লড়াই করছে, এমন সময়ে পিছন থেকে দ্বিতীয় লেপার্ডটা শত্রুর পৃষ্ঠদেশ লক্ষ্য করে লাফ দিল। মুহূর্তের জন্য লড়তে লড়তে কটার একটু ঝুঁকে পড়েছে, ফলে লেপার্ডের লাফটা ফসকে গেল। কটারের পিঠে না পড়ে সে এসে পড়ল তার আক্রান্ত সঙ্গীর পিছনের পায়ের উপর। কটারের কবলে তখন লেপার্ডটা ছটফট করছে মুক্তি পাওয়ার জন্য। স-নখ থাবার একটি আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল দ্বিতীয় চিতাবাঘটার পেট। কটার এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ল না। আরেকটা হাত দিয়ে দ্বিতীয় জন্তুটাকেও প্রাণপণে চেপে ধরল জমির উপর।
কিন্তু আকৃতির অনুপাতে অনেক বেশি শক্তিশালী লেপার্ডের পেশিগুলো স্প্রিং-এর মতো মাটি থেকে ঠেলে উঠতে সচেষ্ট হল। ফলে চার্লস কটারের পক্ষেও দু-দুটো জন্তুকে চেপে ধরে রাখা সম্ভব হল না। ফলে কটারকে দাঁড়িয়ে উঠতে হল ঠিকই, কিন্তু তার লৌহ অঙ্গুলির বন্ধন জন্তুদুটোর গলার উপর এতটুকুও শিখিল হল না।
কটারের বাহু এবং কাঁধের ক্ষতস্থান থেকে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। কিন্তু অবিরাম রক্তক্ষরণে অবসন্ন হয়ে আসার বদলে, সে যেন রক্তলোলুপ বাঘের মতোই দ্বিগুণ শক্তিতে লড়তে লাগল। দু-হাত দিয়ে দুটো লেপার্ডকে শূন্যে তুলে ধরে সে ক্রমাগত দুটোর মাথা ঠুকে দিতে লাগল। অবিশ্বাস্য দৃশ্য!

কটারের সঙ্গে যে নিগ্রো সঙ্গীরা ছিল, তারা প্রথমে পালিয়ে গিয়েছিল, এতক্ষণে তারা ফিরে এসেছে। গুলি করবার উপায় নেই, নিক্ষিপ্ত বুলেট কটারের গায়ে লাগতে পারে। বিস্ফারিত ভীত দৃষ্টিতে তারা নিশ্চেষ্ট হয়ে দেখতে লাগল মহাকায় এক মানুষের সঙ্গে দু-দুটো হিংস্র শ্বাপদের মরণপণ লড়াই। এক নিদারুণ সহ্যশক্তির পরীক্ষা।
চার্লস কটারের রক্তস্নাত দেহে অফুরন্ত শক্তির জোয়ার। একটু পরেই তার মনে হল লেপার্ড দুটো কেমন যেন অবসন্ন হয়ে আসছে। তাদের থাবার অথবা দাঁতের জোর যেন কমে এসেছে।
বিজয়ীর আনন্দে চিৎকার করে উঠল কটার।
বিদীর্ণ উদর লেপার্ডটার ক্ষতস্থান দিয়ে অবিরাম রক্ত ঝরে পড়ছিল রণস্থলের ঘাসজমির উপর, শ্বাসনলীর উপর কঠিন নিষ্পেষণে অন্যটিও অবসন্ন হয়ে পড়েছিল।
লড়াইয়ের কায়দাটা এবার একটু পালটে কটার মাটির সঙ্গে সমান্তরাল করে দুই বাহুকে সোজা করে সে দাঁড়িয়ে উঠল, ফলে লেপার্ড দুটো আর তার শরীর স্পর্শ করতে পারল না। তারপর অদূরবর্তী একটা গাছের কাছে গিয়ে গুঁড়িতে জন্তু দুটোর মাথা ঠুকতে লাগল সমস্ত শক্তি দিয়ে।
মাথার উপর প্রচণ্ড আঘাত—কণ্ঠনালিতে লৌহকঠিন নিষ্পেষণে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল দুটি শ্বাপদ।
মৃতপ্রায় জন্তুদুটোকে মাটিতে আছড়ে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল কটার।
যুদ্ধ শেষ!
চার্লস কটার অসাধারণ মানুষ। সে নিয়মেরই ব্যতিক্রম নয়, সে ব্যতিক্রমেরও ব্যতিক্রম।
চার্লস কটারের দুই পুত্র মাইক এবং বাড কটার পিতার মতোই 'শ্বেতশিকারির' পেশা গ্রহণ করেছিল। মাইক কটারের স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়েই আমরা চার্লস কটার নামক নরদানবের আর একটি ছোট্ট কাহিনি জানতে পারব।
''কেপ-বাফেলো''—আফ্রিকা মহারণ্যের দুর্বিনীত, অবাধ্য সন্তান।
কালবৈশাখীর মেঘের মতো গায়ের রং, পেশিবহুল প্রশস্ত কাঁধ, বিপুল বপু—ওজনে প্রায় একটনের কাছাকাছি, মাথায় মধ্যযুগীয় যোদ্ধাদের শিরস্ত্রাণের মতো হাড়ের আবরণ (Boss of the horn), আর সেই শিরস্ত্রাণের দুই প্রান্ত শোভিত করে বিস্তৃত দুটি ভয়ংকর শিং।
এ তো গেল আকৃতি। আফ্রিকার কেপ-বাফেলোর প্রকৃতি আরো ভয়াবহ।
গন্ডার বা হাতি অতিকায় দেহের অধিকারী হলেও তাদের দৃষ্টিশক্তি খুবই ক্ষীণ, পক্ষান্তরে লেপার্ড বা সিংহ প্রভৃতি হিংস্র শ্বাপদের চোখ এবং কান অত্যন্ত প্রখর হলেও ঘ্রাণশক্তি খুবই কম। বন্যমহিষের ঘ্রাণ, শ্রবণ এবং দৃষ্টির প্রখরতায় রচিত হয়েছে মারাত্মক ত্র্যহস্পর্শ। সম্পূর্ণ অকারণে আক্রমণ করে বুনো মহিষ তার হত্যালীলা মিটিয়েছে এমন ঘটনা বিরল নয়। প্রথম আক্রমণের মুখে শত্রুকে আঘাত হানতে না পেরে গন্ডার বা হাতি অনেক সময়েই ঘুরে এসে পুনরায় আক্রমণ করে না, কিন্তু কেপ-বাফেলো সে পাঠশালার ছাত্র নয়, বিদ্যুদ্বেগে তার বিশাল দেহটাকে সঞ্চারিত করে বারংবার সে শত্রুর দেহে আঘাত হানে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যু সম্পর্কে সুনিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ তার আক্রমণে ভাটা পড়ে না।
'কেপ-বাফেলো'-র বুদ্ধি কিন্তু তার দেহের স্থূলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বুনো মহিষ অতি ধূর্ত জানোয়ার। ঘন জঙ্গলের মধ্যে আত্মগোপন করে সে অস্ত্রধারী মানুষকে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর একসময় অতর্কিতে ঝড়ের মতো আক্রমণ করে বসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকারি রাইফেল তোলার অবকাশ পায় না, নিষ্ঠুর শিং-এর আঘাতে ধরাপৃষ্ঠে লম্বিত হয় তার রক্তাক্ত মৃতদেহ।
চার্লস কটার খুব ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন বুনো মহিষ বা ম'বোগো (স্থানীয় ভাষা) সম্পর্কে, কিন্তু অরণ্যপথে চলতে চলতে মহিষটা যখন তাঁকে অভাবিতভাবে আক্রমণ করে বসল, তখন ওই পুস্তকলব্ধ জ্ঞান তাঁর বিশেষ কাজে লাগল না। ঝড়ের মতো ছুটে এল মহিষ—মুহূর্তের জন্য কটারের দৃষ্টিপথে ধরা দিল এক কৃষ্ণবর্ণ জান্তব বিভীষিকা। হত্যার উদগ্র উন্মাদনায় উন্নীত দুটি বিশাল শৃঙ্গ। বন্দুক তুলে নিশানা করার সময় পেলেন না কটার, কোনোক্রমে ট্রিগারে চাপ দিলেন।
গুলি মহিষের মর্মস্থানে কামড় বসাল না—লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। পরক্ষণেই প্রচণ্ড আঘাতে কটার ছিটকে পড়লেন।
নিশ্চিত মৃত্যু।
আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শিং ও খুরের নিষ্ঠুর আঘাতে পিষ্ট হয়ে যাবে তাঁর দেহ। আফ্রিকার নিষ্করণ প্রান্তরের বুকে শিকারির দুর্ভাগ্যের চিহ্ন হিসাবে শুধুমাত্র পড়ে থাকবে রক্তাক্ত এক তাল মাংসপিণ্ড এবং ছিন্নবিছিন্ন পরিধেয়। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে কটার তাঁর পিঠের নীচে অনুভব করলেন তৃণভূমির ঘাসে ঢাকা জমি।
কিন্তু নিশ্চিতকে অনিশ্চিত প্রমাণ করতেই কটারের জন্ম—এত সহজে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে তিনি রাজি হলেন না।
মহিষ তখন কটারের উপর এসে পড়েছে। চরম আঘাত হানবার জন্য শূন্যে আন্দোলিত হল যমদণ্ডের মতো দুটি শিং। তারপর নেমে এল শত্রুর ভূপতিত দেহ লক্ষ্য করে। পশুরাজ সিংহের স-নখ থাবার প্রচণ্ড চপেটাঘাতে যে স্ফীত স্কন্ধদেশে সামান্য কয়েকটা আঁচড়ের বেশি কিছু কাটতে অক্ষম, 'কেপ-বাফেলো'র শৃঙ্গাঘাতের সেই উৎসশক্তি, এবার কিন্তু শিকারির দেহ স্পর্শ করতে পারল না। মহিষের শৃঙ্গ শোভিত মস্তক এবং ভূপতিত মনুষ্যদেহের মাঝখানে প্রাচীর সৃষ্টি করতে সক্রিয় হল দুটি বলিষ্ঠ পা।
মুখের উপর পড়ছে উন্মত্ত মহিষের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস। দুটো পা মহিষের কাঁধ ও গলায় স্থাপন করে আঘাত প্রতিহত করার ফাঁকেই এক হাতে রাইফেল তুলে নিলেন কটার।
না, এবার আর ভুল হল না। একটি গুলিতেই মৃত্যুবরণ করল আফ্রিকার মহিষাসুর।
দুর্দম শক্তিধর কটার। আক্রমণোদ্যত কেপ-বাফেলোকে দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করে আটকে রাখার কাহিনি পৃথিবীতে বিরল। হারকিউলিস, স্যামসন, ইউলিসিস বা টারজান কি কটারের চেয়েও শক্তিশালী?—কাহিনির পাঠক পাঠিকারাই সে বিচার করবেন।
সৃষ্টিছাড়া চার্লস কটারের মৃত্যুও হয়েছিল অস্বাভাবিকভাবে—একটা সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে। 'অমানুষিক মানুষ'টির কথা বলতে বসে উপসংহারে এই কাহিনিটি না বললে হয়তো অনেক কিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পৃথিবীতে যে মানুষ যত গতানুগতিক নিয়মতান্ত্রিকতাকে অতিক্রম করে চলে, ভাগ্যদেবীও বোধ করি তার ললাটে ততই দুর্জ্ঞেয়, রহস্যময় লিপি লিখে যান। কটারের জীবনদীপ নির্বাপিত হওয়ায় কাহিনি তাই অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর।
বুকে ক্যামেরা ঝুলিয়ে রাইফেল হাতে কটার জঙ্গলে ঘুরছিলেন, উদ্দেশ্য অরণ্য জীবনের কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তকে চিরতরে ধরে রাখবার যদি কিছু সুযোগ মেলে। সোজা কথায় 'ফটো তোলা'।
ক্যামেরার যে অংশের মধ্য দিয়ে বিষয়বস্তু বা তার প্রতিচ্ছবির প্রতি দৃষ্টি সঞ্চালিত করা হয় তাকে বলে ভিউ-ফাইন্ডার (View-Finder)। কটারের ক্যামেরার ওই ভিউ-ফাইন্ডারটা খারাপ ছিল। সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে ক্যামেরার মালিকও বিশেষ মাথা ঘামায়নি, কিন্তু তার ফল হল মর্মান্তিক।
জঙ্গলের পথে চলতে চলতে হঠাৎ কটারের চোখে পড়ল একটা গন্ডার। আকারে বেশ বড়সড়। রাইফেল রেখে তিনি জন্তুটার ছবি তুলতে সচেষ্ট হলেন।
বদমেজাজি বলে গন্ডারের খুব অখ্যাতি নেই। কিন্তু একটা অদ্ভুত ধরনের জিনিস তাক করে ধরে কটারের বিচিত্র অঙ্গভঙ্গির রকমটা ভালো লাগল না তার। সে তাড়া করে এল কটারের দিকে।
ক্যামেরার যন্ত্র-চক্ষুর মধ্য দিয়ে চার্লস দেখছে। গন্ডার অনেক দূরে আছে, কিন্তু আসলে তখন জন্তুটা খুব কাছে এসে পড়েছে। কটার যখন তার বিপদ উপলব্ধি করল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। গন্ডারের খড়্গ প্রায় তার দেহ স্পর্শ করেছে।
একবার মাত্র গুলি চালাবার সুযোগ পেয়েছিল কটার। তারপরই গন্ডারের সুদীর্ঘ খড়্গ তার দেহটাকে বিদ্ধ করে দিল।
জীবনযুদ্ধের বিজয়ী সৈনিক চার্লস কটার মৃত্যুর কাছেও পরাজয় বরণ করেনি।
একটিমাত্র গুলিতেই কটারের মৃত্যুদূত ভূমিশয্যা গ্রহণ করেছিল।
ওকলাহামার দুর্ধর্ষ মানুষটি অবশেষে চিরশান্তি লাভ করল আফ্রিকা মায়ের কোলে।
বিলি প্যারোট
টোয়েনকে ডিডল ওঃ! টোয়েনকে ডিডল ওঃ! টোয়েনকে ডিডল ইডল ইডল ও!
না, কোনো সাংকেতিক ভাষা নয়—বিলি প্যারোট-এর প্রিয় গানের ছত্রের দুটি লাইন। গান বহুজনেরই প্রিয় এবং প্রত্যেকেরই দুটি বা একটি বিশেষ গান অপেক্ষাকৃত বেশি প্রিয় হয়ে থাকে, কিন্তু বিলি প্যারোট নামক খর্বাকৃতি মানুষটা যখনই অন্যমনস্ক হয়ে এই গানটার কলি মনে মনে গুণ গুণ করে গাইত—তখনই সম্ভবত তার মনে ভেসে উঠত এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা—বাঁকুড়া জেলার নিবিড় অরণ্যানীর পটভূমিতে এক হিংস্র শ্বাপদ ও একটি দরিদ্র, মিষ্টভাষী, খর্বাকৃতি মল্লযোদ্ধার মধ্যে সংঘটিত বিচিত্র এক দ্বৈরথের কাহিনি।
অরণ্যজীবনকে কেন্দ্র করে যে ইতিহাস, রক্তজমানো কাহিনির সংকলন হিসাবে যুগে যুগে লেখা হয়েছে, বৈচিত্র্যের বিচারে আমাদের বর্তমান কাহিনির স্থান অবশ্যই সেই ঐতিহাসিক সূচীপত্রের উপরের ভাগে।
এখন, কে এই বিলি প্যারোট?
পাঠকের কাছে এখনও তার পরিচয় অজ্ঞাত। কিন্তু কাহিনির সূচনায় পাঠক-পাঠিকার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া বোধ করি আবশ্যক এবং প্রসঙ্গতই হবে।
বন্ধু প্যাট-এর কাছে স্মৃতিচারণের অবসরে বিখ্যাত শিকারি জেমস ইংলিস বিলি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সুন্দর বর্ণনা রেখেছেন। এইখানে বলে রাখা ভালো যে, শিকারি জেমস ইংলিস-এর মাতৃভূমি হচ্ছে সুদূর নিউজিল্যান্ড। নীলের ব্যবসা করতে তিনি ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন উনিশ শতকের শেষভাগে। ব্যবসায় তিনি কতটা সাফল্য লাভ করেছিলেন তা আমাদের কাছে অজ্ঞাত, কিন্তু সমকালীন ভারতবর্ষের বহু অরণ্যের পটভূমিতে ইংলিশ সাহেবের কৌতূহলী শিকারি মন যে সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছিল, পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিচারণের অবসরে লেখা সেই সব কাহিনির বর্ণনায় আমরা কখনো হয়েছি বিস্মিত, কখনো মুগ্ধ অথবা কখনো শিহরিত। বিলি প্যারোটের সঙ্গে ইংলিশ সাহেবের পরিচয় ওই সময়েই।
বিলি জাতিতে ছিল স্কচ। পেশায় কামার। কিন্তু কোনো পেশাকেই অবলম্বন করতে তার আপত্তি ছিল না। শোনা যায়, প্রথম জীবনে নাবিক হয়ে সে বিশ্বভ্রমণ করেছিল। তারপর, সে কাজে ইস্তফা দিয়ে গোটা পঞ্চাশেক টাকা মাইনেয় কলকাতার ট্যাঁকশালে চাকরিতে ঢোকে। পরে জনৈক 'হেনরী' নামক শ্বেতাঙ্গের মালবাহক হিসাবে মাসিক একশো পঞ্চাশ টাকা মাইনের বিলি 'তিরহাট' এসে পৌঁছোয়। শিকারি ইংলিস সাহেবের সঙ্গে বিলির পরিচয় এই তিরহাটেই। ছোট্টখাট্ট অথচ পেশিবহুল চেহারার, মিষ্টি স্বভাবের এই মানুষটি ইংলিস সাহেবের খুবই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। উপরন্তু, বিলি ছিল অসীম শক্তিশালী একজন ওস্তাদ মল্লযোদ্ধা। যদিও তার চেহারার বা ব্যবহার আপাতভাবে তার কোনো ছাপই পড়তো না। শরীরে শক্তিসঞ্চয় করতে বিলি প্যারোট যে বিভিন্ন পন্থার আশ্রয় নিত, তার মধ্যে একটি ছিল সত্যিই অভিনব। যেমন, বিলির একটা পোষা ভেড়া ছিল এবং মালিকের নির্দেশ অনুযায়ী সেটা শিং বাগিয়ে সবেগে ছুটে এসে বিলির দেহের বিভিন্ন অংশে পাথরের মতো শক্ত মাংসপেশিগুলোর উপর প্রচণ্ড জোরে ঢুঁ মারত। এই আশ্চর্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলি নিজের দেহে শক্তিসঞ্চয় করত এবং একই সঙ্গে দেহের মাংসপেশিগুলিকে করে তুলত আঘাতসহ।
ছোট্ট মানুষটির শুধুমাত্র একটি ব্যাপারেই দুর্বলতা ছিল, এবং সেটি হল মদ্যপানে তার প্রবল অনুরাগ। শিকারি ইংলিস সাহেব পরিচয়ের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে গিয়েছিলেন বিলির এই দুর্বলতার কথা, কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি আপত্তিকর কিছু খুঁজে পাননি। কিন্তু পরবর্তীকালে আপত্তি নয়, বিপত্তি ঘটেছিল, এবং তা হল শুধুমাত্র বিলির সুরার প্রতি তীব্র ওই আসক্তির জন্যই।
বিলির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই ইংলিস সাহেব ভালুক শিকারের এক নিমন্ত্রণ পেলেন, বাঁকুড়া জেলায় বাসরত তাঁর এক বন্ধু—প্রাক্তন পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট-এর কাছ থেকে। অবশ্যই সখের শিকার। কিন্তু আয়োজনের ত্রুটিমাত্র ছিল না। বিলিকে সঙ্গেই নিয়ে এসেছিলেন সাহেব। এছাড়া 'শিকারি' বলতে ছিলেন কলকাতা থেকে আগত দু-একজন ব্যারিস্টার, জনৈক ডাক্তার, স্থানীয় জেলা জজ এবং মিঃ ইংলিস-এর সহযাত্রী এক বন্ধু—'পীলার'। ওই 'পীলার' নামেই সম্ভবত ভদ্রলোক বন্ধুমহলে পরিচিত ছিলেন, কারণ, ইংলিস সাহেবও অন্য কোনো নামে তাঁর পরিচয় দেননি।
স্থানীয় পুলিশদের দিয়ে নিকটবর্তী জঙ্গলের মধ্যে গাছের উপর মাচাগুলো বাঁধা হয়েছিল পরস্পরের মধ্যে গজ-পঞ্চাশেকের মতো ব্যবধান রেখে। দলের মধ্যে অভিজ্ঞ শিকারি হিসাবে মিঃ ইংলিস এবং আমাদের পূর্বপরিচিত ওই মিঃ পীলার। তারা দুজনে উঠলেন একদম ডান দিকের মাচায়। বিলি উঠল একেবারে বাঁ-দিকেরটায়। অন্যান্যরা আশ্রয় নিলেন মধ্যবর্তী মাচাগুলোয়।
'বীটার'-দের 'বীট' আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। সার বেঁধে শব্দ করতে করতে তারা গোটা অঞ্চলের পশু-পক্ষী তাড়িয়ে আনছিল অপেক্ষমান শিকারিদের দিকে। যদিও মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ভালুক-শিকার, কিন্তু শিকার করার ব্যাপারে কোনো পশুপাখির উপরেই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল না, ফলে 'বন-তাড়ুয়াদের' তাড়ায় পলায়নপর অসংখ্য পাখি, হরিণ, বনমোরগ বা খরগোশের মতো ছোটখাটো জন্তুগুলির উদ্দেশ্যে প্রায়ই শিকারিদের বন্দুক অগ্নিবর্ষণ করতে লাগল। ইংলিস সাহেব এবং তাঁর বন্ধু পীলার-এর যৌথ প্রচেষ্টায় অল্পক্ষণের মধ্যেই ধরাশয্যা গ্রহণ করল একটা হরিণ, গোটাকয়েক বনমোরগ এবং ছোটখাটো আরও কিছু প্রাণী। কিন্তু ভালুকের সন্ধান মিলল না।
সুতরাং, দ্বিতীয়বার 'বীট' আরম্ভ হল ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। মাচার উপর রাইফেল রেখে দিয়ে, শুধুমাত্র কোমরে ঝোলানো রিভলভার নিয়েই জেমস বীট পর্যবেক্ষণ করতে গাছ থেকে নেমে মাটিতে এসে দাঁড়ালেন। বিভিন্ন দিক থেকে বিকট আওয়াজ করতে করতে বীটাররা নিকটবর্তী হচ্ছিল। হঠাৎ জেমস-এর সামনে একটা ঝোপ নড়ে উঠল। সেই সঙ্গে কাঠকুটো মাড়িয়ে কিছু একটা এগিয়ে আসার সন্দেহজনক শব্দও কর্ণগোচর হল। মুহূর্তের মধ্যে নিজের অসহায় অবস্থা উপলদ্ধি করলেন জেমস, কিন্তু বিচলিত হলেন না। কোমরের খাপ থেকে রিভলভার টেনে তৈরি হলেন যে-কোনো আকস্মিক মুহূর্তের জন্য। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝোপের মধ্য থেকে আত্মপ্রকাশ করল—নাঃ, ভালুক নয়, বিলি প্যারোট!!!
—'শুকিয়ে চুনের ভাটি হয়ে গেলাম জেমস। এক চুমুক না হলে তো আর চলছে না।'
বিলি তার আবির্ভাবের কারণ জানাল।
—'এখন যে কোনো সময়ে ভালুক বেরোতে পারে, আর তুমি কি না গলা ভেজাতে, খালি হাতে মাচা ছেড়ে নেমে চলে এলে!'—ইংলিস সাহেব বেশ খানিকটা বিস্মিত হয়েই প্রশ্ন করলেন।
—'দুত্তোর তোমার ভালুক। আপাতত তর্ক না করে আমাকে আগে বোতলটা দাও।' বিলি যেন একটু বিরক্তই হল।
সুরাসক্ত বেঁটে মানুষটার সঙ্গে তর্ক করার পক্ষে স্থান ও কালটা ঠিক উপযুক্ত নয়, সম্ভবত এই প্রকার কিছু চিন্তা করেই মাচার উপর থেকে জেমস-এর জনৈক শ্বেতাঙ্গ বন্ধু বোতলটা নীচে বিলির উদ্দেশ্যে নামিয়ে দিল। বিলিও অহেতুক সময় নষ্ট না করে দু-তিনটি লম্বা লম্বা চুমুকে বেশ কিছুটা তরল পদার্থ গলাধকরণ করে বোতলটা ফেরত দিল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাঁ-দিকের অদূরবর্তী মাচার উপর থেকে ভেসে এল স্থানীয় জেলা-বিচারপতির আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর—
'দেখুন! দেখুন! ওই যে! একটা ভালুক।'
পরিস্থিতি চিন্তা করার সময় ছিল না। চকিতে জেমস ছুটলেন নিকটবর্তী গাছটার দিকে। বিলিও তাঁকে অনুসরণ করল।
—'আরে ওই তো শয়তানটা।' বিলিই প্রথমে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল আর তার কথা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পলায়নে তৎপর মানুষ দুটির সামনে আবির্ভূত হল একটা প্রকাণ্ড ভল্লুকী। তার পৃষ্ঠদেশ আশ্রয় করে ঝুলছে একটি ছোট্ট শাবক। মুহূর্তের ব্যবধানে রিভলভার টেনে নিয়ে গুলি চালালেন জেমস। গুলি শ্বাপদের চোয়াল বিদ্ধ করল ঠিকই কিন্তু তার গতি রুদ্ধ হল না, ঘুরে দাঁড়িয়ে সে তাড়া করল বিলি প্যারোটকে।
পলায়নে সচেষ্ট বিলি প্যারোটের উদ্দেশ্যে সাহায্যের চেষ্টায় জনৈক শ্বেতাঙ্গ শিকারি মাচার উপরে শুয়ে পড়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন, যাতে ভল্লুকীকে ফাঁকি দিয়ে বিলি গাছে উঠে পড়তে পারে।' ইংলিস সাহেব দৌড়তে দৌড়তেই শুনতে পেলেন বিলির উদ্দেশ্যে উচ্চারিত উক্ত শিকারিটির সতর্কবাণী—'জলদি বিলি, জলদি। আর একটু জোরে, নইলে শয়তানটা তোমায় নির্ঘাত ধরে ফেলবে!'
কিন্তু বিলি নিষ্কৃতি পেল না। প্রাণপণ চেষ্টা করেও সহযোগী শিকারিটির এগিয়ে দেওয়া হাতটি সে হস্তগত করতে পারল না। ফলে শেষ মুহূর্তে খর্বকায় মানুষটি ঘুরে পালাবার চেষ্টা করল বটে কিন্তু সেই সঙ্গীণ পরিস্থিতিতে দুর্ভাগাক্রমে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল একটা বড় গাছের শিকড়ে পা আটকে। সঙ্গে সঙ্গেই ভল্লুকী ঝাঁপিয়ে পড়ল বিলির উপর।
শ্বাপদে ও দ্বিপদে শুরু হল এক বিচিত্র মল্লযুদ্ধ। ভয়াবহ মৃত্যু-আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে দুই অ-সম প্রতিদ্বন্দ্বী গড়িয়ে চলল এক নিশ্চিত পরিসমাপ্তির দিকে। হ্যাঁ, 'নিশ্চিত পরিসমাপ্তি' কথাটা বলা হল এই কারণে যে, একটি অতিকায় ভল্লুকীর সঙ্গে নিরস্ত্র একটি মানুষের দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিণাম যে কি হতে পারে শিকারিদের সে সম্পর্কে সম্যক ধারণাই ছিল। বন্দুক হাতে মিঃ ইংলিস এবং তাঁর বন্ধুরা তাই নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এক বিস্ময়কর দ্বৈরথের করুণ পরিণতি। গুলি চালানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না, কারণ নিক্ষিপ্ত গুলি ভল্লুকী ও বিলি দুজনের যে কাউকেই আঘাত করতে পারে। সুতরাং, নিশ্চেষ্ট হয়ে দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভূমিকা তাঁদের ছিল না।
ভল্লুকীর দাঁত বড় সাংঘাতিক অস্ত্র। কিন্তু জেমস-এর রিভলভার থেকে নিক্ষিপ্ত গুলি তার নীচের চোয়াল উড়িয়ে দিয়েছিল, ফলে বিলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার সে অস্ত্র তখন হয়ে পড়েছিল অকেজো। কিন্তু দাঁতই ভালুকের একমাত্র অস্ত্র নয়। তাই বিলির শরীরকে ছিন্নভিন্ন করতে নিয়োজিত হল ভল্লুকীর মারাত্মক নখরযুক্ত থাবা। পাথরের মতো কঠিন উইঢিবি যে নখের আঘাতে নরম মাটির স্তূপে পরিণত হয়, মানবদেহের পরিণতি সেই সারিবদ্ধ কৃপাণের সান্নিধ্যে এলে কি হতে পারে তার ধারণা সম্ভবত বিলির চিন্তাতেও এসেছিল, তাই তার শক্তিশালী দুই পায়ের নিপুণ প্রয়োগকৌশলে ভল্লুকীর পিছনের পা এবং থাবা দুটোকে সে করে দিয়েছিল সম্পূর্ণ অকেজো। অন্যদিকে, শত্রুর মুখের তলায় নিজের বাঁ-হাতটাকে এক অদ্ভুত কৌশলে স্থাপন করে সে ভল্লুকীর মুখে, পাঁজরে এবং অন্যান্য দুর্বলস্থানে অবিশ্রান্ত ভাবে প্রয়োগ করে চলেছিল তার মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণ হস্তের শক্তিশালী মুষ্টিযোগ। সেই সঙ্গে উপযুক্ত সংগতে তার মুখ থেকে অবিরাম নির্গত হচ্ছিল ইংরেজি, স্কচ এবং হিন্দুস্থানী ভাষায় যাবতীয় অকথ্য গালিগালাজ।
ইংলিস সাহেব বিলির এই অদ্ভুত আচরণে স্থান-কাল ভুলে হেসে উঠলেন হো হো করে। যুদ্ধরত বিলির কানেও সম্ভবত সেই হাস্যধ্বনি গেছিল; কারণ, মুহূর্তের জন্য সে গালাগালি দেওয়া বন্ধ করল। তারপর আবার শুরু করল অবিরাম ধারায়, এবং এবারের লক্ষ্য আর কেউ নয়, স্বয়ং জেমস ইংলিস। বলা বাহুল্য, বিলির উচ্চারিত শব্দগুলি একজন ভদ্রলোকের পক্ষে আদৌ সম্মানজনক ছিল না, ফলে অচিরেই জেমস অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেলেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলেন।
ক্রমাগত গড়াতে গড়াতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর দেহ এগিয়ে চলেছিল নিকটবর্তী একটা খাদের দিকে। আর মাত্র যখন ফুট কয়েকের ব্যবধান, এমন সময় স্থানীয় জেলা জজের আক্ষেপ-উক্তিতে স্থানুবৎ দণ্ডায়মান শিকারিদের যেন সম্বিত ফিরল।—'হায় ভগবান! ওর বাঁচার কোনো উপায় নেই।' একইসঙ্গে ইংলিস সাহেবের সতর্কবাণীও উচ্চারিত হল বিলির উদ্দেশ্যে। কিন্তু আর মাত্র একটি পাক। তারপরই ভল্লুকী ও বিলির আলিঙ্গনাবদ্ধ দেহ অদৃশ্য হল খাদের গহ্বরে। উপর থেকে শিকারিরা দেখলেন বিদ্যুদ্বেগে শূন্যে অবতরণশীল একটি কালো বস্তু খাদের গায়ে একটি প্রস্তরখণ্ডে সজোরে ধাক্কা খেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল গভীরতর শূন্যতায়।
সবাই নির্বাক, বিমূঢ়, স্তম্ভিত! ঘটনার করুণ পরিণতি কেমন যেন অসুস্থ করে তুলেছিল পরিবেশকে। বিশেষত মিঃ ইংলিস মনে মনে নিজেকেই দায়ী করেছিলেন এই বিয়োগান্ত পরিণতির জন্য। কেন যে তিনি বিলিকে সঙ্গে আনতে গেলেন; তখন যদি তিনি এই ধরনের ঘটনার কোনো রকম পূর্বাভাস পেতেন, তাহলে আজকে হয়তো তাঁকে এই নির্মম মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকতে হত না। বিবেকের কাছে নিজেকে এখন বারবারই তাঁর অপরাধী বোধ হতে লাগল।
অস্বস্তিকর এই নীরবতাকে প্রথমে কাটিয়ে উঠলেন জনৈক শ্বেতাঙ্গ, বললেন,—'যাক যা হওয়ার তা হয়েছে। এখন আমাদের বোধহয় উচিত হবে, বিলির দেহটার সন্ধান করা।' কথার বাস্তবতা ও যুক্তি অনস্বীকার্য। উপরন্তু বর্তমান পরিবেশটাকে পালটানোর প্রয়োজন সকলেই বোধ করছিলেন। সুতরাং বিলির দেহ অনুসন্ধান করতে খাদের নীচে যাওয়াই সাব্যস্ত হল।
দুর্গম পাহাড়ি পথ নেমে গিয়েছে নীচের দিকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পথের নিশানা হয়েছে অদৃশ্য। সেখানে অবলম্বন শুধু ঘাসের চাপড়া অথবা পাথরের খাঁজ। তারই মধ্যে শিকারিরা হরিণের পায়ে চলার একটা পথ খুঁজে বের করলেন। কিন্তু এই পথ ধরে কিছুটা নামার পরই স্থানীয় জেলা জজ এবং কলকাতাবাসী ব্যারিস্টারগণ উপলব্ধি করলেন যে, এই বন্ধুর ভ্রমণে ইস্তফা দিয়ে আপাতত আপন আপন পৈতৃক প্রাণরক্ষায় সচেষ্ট হলে হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক লোকহিতকর কাজ করার সুযোগ পাওয়া যাবে। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিযাত্রীদলের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়াল দুই-এ। অবশিষ্ট রইলেন কেবলমাত্র শিকারি ইংলিস সাহেব এবং তাঁর সহযোগী বন্ধু 'সি-'। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে, ওই 'সি-' নামেই ইংলিস সাহেব আমাদের কাছে তাঁর বন্ধুর পরিচয় দিয়েছেন।
বেশ খানিকটা পথ অতিক্রম করার পর শিকারি দুজন সামান্য বিশ্রামের জন্য একটি সমতল পাথরের উপর এসে দাঁড়ালেন। এমন সময়ে, অকস্মাৎ তাঁদের কর্ণেন্দ্রিয়কে স্পর্শ করল এক ক্ষীণ সঙ্গীতধ্বনি।
'টোয়েনকে ডিডল ওঃ! টোয়েনকে ডিডল ওঃ...।'
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন দুজনে। ভুল শুনছেন না তো তাঁরা! এ কী করে সম্ভব!! অত উঁচু থেকে পাথরের উপর ছিটকে পড়ে মানুষ তো দূরের কথা, কোনো পার্থিব প্রাণীর পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, সুতরাং—, কিন্তু ওই তো! ওই যে আবার সেই কণ্ঠস্বর, এবার আরও স্পষ্ট, আরও জোরালো। পথের শেষ বাঁকটুকু ঘুরতেই চোখ-কানের বিবাদ মিটল। এক আশ্চর্য্য দৃশ্য! ভল্লুকীর তালগোল পাকানো বিশাল মৃতদেহের উপর জাঁকিয়ে বসে গান ধরেছে বিলি প্যারোট—'টোয়েনকে ডিডল ওঃ!...।'
বিলির দেহ ছিল প্রায় অক্ষত। শুধু মল্লযুদ্ধের সময় মারাত্মক নখ তাঁর কাঁধে ও বাহুতে এঁকে দিয়েছিল কয়েকটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। এ ছাড়া জানুর কাছে অপর একটি দীর্ঘ ক্ষতও অবিরাম রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছিল।
প্রাথমিক চিকিৎসার পর বিলিকে ব্র্যান্ডি এবং দুধ খাইয়ে দেওয়া হল।
পরে বিলির মুখেই শোনা গেল তার এই আশ্চর্য পরিত্রাণের কাহিনি।
প্রচণ্ড বেগে খাদের মধ্যে পড়ার সময় ভল্লুকীর দেহ প্রথমে পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং মাটিও প্রথমে স্পর্শ করে। ফলে, ভল্লুকীর দেহসংলগ্ন বিলি রক্ষা পেয়ে যায় অভাবিতভাবে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন