নির্বেদ রায়

শেমবেক, ও'সুলিভান, দে'রুবেনপ্রে—
তিন বন্ধু—!
তিন দেশের—কাউন্ট শেমবেক, পুরো নাম স্টানিসলাউস শেমবেক জার্মানির বাসিন্দা; ও'সুলিভান অর্থাৎ বেভিস ও'সুলিভান আয়ার্ল্যান্ডের লোক আর দে'রুবেনপ্রে থাকেন ফ্রান্সে।
এই তিন বন্ধু মিলে এসেছেন পূর্ব আফ্রিকায়। পয়সাকড়ির অভাব নেই, তিনজনের শখও সেইরকম। ছোট শিকারে মন নেই, যে শিকারে উত্তেজনা কম সে জন্তু শিকার করে কী হবে? বড়, ভারী জন্তু, যারা আফ্রিকার জঙ্গল দাপিয়ে বেড়ায়—তিনজনের লক্ষ্য সেই দিকে।
একদিকে মহারণ্য, অন্যদিকে বিশাল মরুভূমি। আর সেই অরণ্য আর বালির সাম্রাজ্য জুড়ে মাঝেমধ্যে পাহাড় আর বিরাট বিরাট সব নদী আর জলপ্রপাত। এই মহাদেশের কথা যখন বলছি, তখন এ 'অন্ধকার দেশ', 'ডার্ক কন্টিনেন্ট'।
আর এই অন্ধকার মহাদেশ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় অজস্র জীবজন্তু। তার মধ্যে সিংহ থেকে বুনো মোষ, জিরাফ থেকে গন্ডার—কী নেই এই দেশ জুড়ে!
শুধু আফ্রিকা নয়, এই অরণ্য সন্তানের দল ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর অন্তত আরও দুই প্রান্তে, প্রান্তে না বলে দেশে বলাই ভালো। একটা ভারত, আমাদের ভারতবর্ষ, আর দুই আমাজন উপত্যকা অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকা। কিন্তু আপাতত আমরা আফ্রিকার কথা বলছি—
সময়টা বিশ শতকের প্রথম দিক। ঘটনা ঘটেছে ঊনিশ শতাব্দীর শেষ ভাগে, কিন্তু পৃথিবী জানাল বিশ শতকে এসে। এভাবে বললেই ঠিক হবে।
আপাতত তিন বন্ধু এসেছেন পূর্ব আফ্রিকায়। পূর্ব আফ্রিকা বলতে অনেক বড় অঞ্চল আর দেশ বোঝায়, আসলে এসেছেন কেনিয়ায়।
কেনিয়া-পাহাড় থেকে নেমে যে নদী ইওয়ামো ন্যিয়ারো নাম নিয়ে মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে, তার পাড় জুড়ে তখন বন্যজন্তুর সমারোহ। কারণ আছে—ইওয়ামো ন্যিয়ারো যেমন সমুদ্রে মেশার আগে জুব্বা নদ আর হ্রদের শরীর স্পর্শ করে গেছে, তেমনি কেনিয়া-পর্বত থেকে যে হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার থেকে সে বেরিয়েছে, তার কারণেই সারা বছর জুড়ে এই নদীতে জলের যোগান থাকে। ফলে জীবজন্তু, পশুপাখি সবাই এপথের কাছে থাকতে পছন্দ করে।
শিকারীরা এ কথা জানে, তাই তারা এসে তাঁবু ফেলেছে এই নদীর ধারে। সঙ্গে এনেছে এই দেশের কালো মানুষের ছোট একটা দল। যারা জীবজন্তুর যাতায়াত, গতিবিধি সাদা মানুষের থেকে ভালো বোঝে। রান্নাবান্না করতে, মাল বইতেও কাজে লাগে তারা, আর লাগে পথ দেখাতে...কিন্তু ওদের গল্প শুনতে অদ্ভুত লাগে, ডাকিনি-পিশাচ আর রক্তচোষা বাদুড়ের গল্প বলে রাতে ঘুমোতে যায়, দিনের বেলাতেও যতটুকু ফুরসত পায়, তখনও এই সমস্ত গল্পই চলে ওদের মধ্যে—
ওরা এসেছে গন্ডার শিকার করতে। সাহেবদের মনের ইচ্ছা অন্তত সেরকম, সঙ্গে লোক-লশকর যারা এসেছে, তারাও জানে কী কাজ—কিন্তু তা সত্ত্বেও এতবড় ভুল কী করে হয়ে গেল, সেটা বুঝতে গিয়ে, ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আর তাদের কিছু করার ছিল না। যখন বোঝা গেল, তখন যা ঘটনার, তা ঘটে গেছে—আর কিছু করার নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে সাবধান হয়েছেন তিন সাদা চামড়ার শিকারি, সতর্ক হয়েছে সঙ্গের স্থানীয় মানুষরাও, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
মূল কাহিনিতে আসা যাক—

আমার দুই বন্ধু রুবেমপ্রে আর ও'সুলিভান একটা আগুনের কুণ্ড তৈরি করেছিল, আমরা তিনজনই সেটাকে ঘিরে বসেছিলাম। আমাদের সঙ্গীরা আর একটু দূরে আরেকটা আগুনের কুণ্ড ঘিরে বসেছিল, বসেছিল না বলে রঙ্গ-তামাশায় ব্যস্ত ছিল বললে ঠিক হবে।
আমার ঘুম আসছিল। একটু আগে ভরপেট খাওয়া-দাওয়া হয়েছে; চোখ জড়িয়ে এসেছে, এমন সময় এক বিকট চিৎকার...ঘুম ভেঙে গেল...বিছানায় উঠে বসে দেখলাম রুবেনপ্রে আর ও'সুলিভান দুজনে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে, দুজনের পরনেই রাতে শোয়ার জন্য পরা পোষাকটুকু, আর কিছু নেই। মনে রাখতে হবে যে, ওরা দুজনেই ওস্তাদ শিকারি, জঙ্গল চেনে, পাতার খসখস আওয়াজে ভয় পেয়ে পালাবার ছেলে নয়। আর যেভাবে দৌড়চ্ছে, যেন অলিম্পিকের রেস দিচ্ছে দুজন মিলে...আমার পাশ দিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল বটে, কিন্তু যাওয়ার সময় আমাকে কিছু একটা বলে গেল—যেটা আমার ঘুম ভেঙে ওঠা অবস্থায় আর ওদের উত্তেজনায় মিলেমিশে একটা শব্দও বোধগম্য হল না। বাকরুদ্ধ অবস্থায় কোনোরকমে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম।
আমার দুই শাগরেদ ততক্ষণে, আমাদের তাঁবুর মাথার উপর যে বিশাল গাছটা রয়েছে, মেপল গাছ—তার প্রকাণ্ড গুঁড়ির আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছে। আর অন্যদিকে তাকিয়ে দেখি আমাদের তাঁবুর এই প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড জন্তু, বেশ দ্রুতগতিতেই ঘোরাফেরা করছে—একটা বিশাল গন্ডার। ঘুম ভাঙা চোখে এতবড় 'দুঃস্বপ্ন'...আমি আর কোনোদিকে না তাকিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়লাম আমার বন্ধুরা যে পথে গেছে সেই দিকে, মেপল গাছে গিয়ে পৌঁছে গেলাম কয়েকমুহূর্তে! কিন্তু রাইফেল কোথায়?
না, কারো কাছেই রাইফেল নেই, প্রাণ বাঁচাতেই দৌড়েছি আমরা তিনজন, রাইফেলের কথা আর মনে পড়েনি।
কিন্তু, দরকারও হল না রাইফেলের। একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে হঠাৎ গন্ডার অদৃশ্য হল জঙ্গলের মধ্যে। রেখে গেল সামান্য দুয়েকটা স্মৃতি—আমাদের আগুনের কুণ্ডতে যে ক'টা জায়গায় আগুন জ্বালানো ছিল, তার একটা গণ্ডারের পায়ের চাপে নিভে গেছে, আর আমাদের লটবহরের যে সমস্ত বাক্স ছিল তার কয়েকটা এই দু'টন ওজনের পায়ের চাপে একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে আছে।
যাক, আস্তে আস্তে উত্তেজনা কমল, সময় এগিয়ে যেতে লাগল, তাঁবুও শান্ত হয়ে এল...স্বপ্ন দেখলাম, এক গুলিতে এক একটা গন্ডার মেরে ফেলছি, যেভাবে বুনো মোরগ মারি, অনেকটা সেভাবে...
কিন্তু সে রাত স্বপ্ন দেখার রাত ছিল না। ঘুম ভাঙল, আমার নাম ধরে কেউ ডাকছে শুনে, চোখ খুলে দেখলামে রুবেনপ্রে আমার উপরে ঝুঁকে আছে। বুঝলাম, চিৎকার করে নামও এখন ডাকা যাবে না...ফিসফিস করে রুবেনপ্রে বলল, 'চেয়ে দেখো, গন্ডার তার গোটা পরিবার শুদ্ধু এসে হাজির হয়েছে।'
'আরে ছাড়ো তো, তোমার গন্ডার!' বিরক্ত হয়ে ঘুরে শুয়েছি। কিন্তু ফরাসি বন্ধুকে বিরত করা যায়নি। আমাকে ঠেলে তোলে সে। খুব বিরক্ত হয়েই উঠেছি।
চাঁদের আলো আফ্রিকার অরণ্যে চারদিক ঝকঝকে করে তুলেছে—সে আলোয় জীবন্ত ট্যাঙ্কের সারির মতো গন্ডারের দল চোখে পড়ল।
এই দৃশ্য অবাক করা দৃশ্য, ভয়ের দৃশ্য নয় একেবারেই। কিন্তু আমি ভয় পেলাম, দীর্ঘদিনের শিকারের অভিজ্ঞতা আছে বলেই ভয় পেলাম। ঠিক যে কারণে আমার ফরাসি বন্ধু রুবেনপ্রে ভয় পেয়েছে, তারও শিকারীর অভিজ্ঞতা কম নেই।
ভয়ের কারণ, গন্ডারগুলোর দৃষ্টি—
চাঁদের আলোয় যতটা দেখা যায়, তার মধ্যেই দেখেছি—গন্ডারগুলো আমাদের তাঁবুর দিকেই তাকিয়ে আছে। এরপর আর ক্যাম্পে শুয়ে থাকা যায় না, হাতে ভারী বন্দুক আর কার্তুজ নিয়ে দৌড়েছি গাছটার দিকে—একটু আগে যে গাছটায় আশ্রয় নিয়েছিলাম।
মেপল গাছে পৌঁচেছি, ফিরে দেখলাম চারদিকে অন্ধকার, চাঁদ মেঘে ঢাকা পড়েছে। ব্যস, রাইফেলের আর কোনো কাজ রইল না। এমনিতেই রাতের বেলা গন্ডার-শিকারের শ্রেষ্ঠ সময় নয়, তার উপর এটা একটা দল—এই অন্ধকারে নিশানা নির্ভুল করে দলের মধ্যে একটা যে কোনো গন্ডারকে মারা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হল আমার, ও'সুলিভান আর রুবেনপ্রে-র মতও একই রকম হওয়া উচিত বলে মনে হল। কিন্তু ভুল...। বিশেষ করে ও'সুলিভান, তার আইরিশ মানসিকতা বিপদের গুরুত্ব বুঝতে দেয়নি, না বিপদের মুখে তার ব্যবহার ওইরকম—সেটা খুঁটিয়ে বোঝার সময় এটা নয়...কারণ সেই বিরাট বাহিনীর মধ্যে এতক্ষণ বাদে একটা নড়াচড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেন একটা সারির মতো শ্রেণিবদ্ধ হচ্ছে তারা। রুবেনপ্রে চাপা গলায় বলল, 'চার্জ অব বালাক্লাভা'—
এখানে আমাদের পাঠকা-পাঠিকার জন্য একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ১৮৫৪ সালের ২৫ অক্টোবর ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ইংরেজ সেনা এই আক্রমণ চালিয়েছিল রাশিয়ার সৈন্যদলের উপর—টেনিসনের বিখ্যাত কবিতা নিশ্চয়ই অনেকে পড়েছ। সেই আক্রমণকে 'চার্জ অব বালাক্লাভা' বলা হয়, রুবেনপ্রে তারই উল্লেখ করছিল।
কিন্তু প্রায় আধঘণ্টা ধরে এই রকম ঘোরাঘুরি চলল, গন্ডারের দল ঘুরছে-ফিরছে, আমাদের তাঁবু বা তার চারপাশে কিন্তু কাছে আসছে না, আবার ফিরেও যাচ্ছে না, ওই জায়গাতেই চলাফেরা করছে; মাঝে মাঝে কোনো কিছুর গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা করছে...
ওইরকম চলার পর হঠাৎ আমাদের এক সঙ্গীর চিৎকার ভেসে এল। সে দৌড়ে আমাদের গাছের দিকে আসছে। খুব জোরে দৌড়চ্ছে। স্থানীয় মানুষ—তার ভাষায় যা বলছে তার অর্থ—ওরা আসছে!
ঠিক কথা, ওরা আসছে এবার...আমাদের স্থানীয় সঙ্গী ছাড়া তিনজন বন্ধুই গাছে উঠলাম তড়িঘড়ি, সঙ্গে রাইফেল...ও'সুলিভান বলল, 'আসছে এবার...ছ'শো বীর সৈনিক।'
বুঝলাম 'চার্জ অব দ্য লাইট ব্রিগেড' ওর মাথা থেকে যায়নি।
গন্ডারের দল এল। এল না বলে পথের সমস্ত কিছু, গাছ লতা-পাতা, পাথর সব কিছু 'ধ্বংস' করে এল বলাই ভালো। যেখানে এক মিনিট আগে গাছাপালা ঢাকা অরণ্য ছিল, সেটা এক মিনিটের মধ্যে একটা রাস্তা হয়ে গেল, ভাঙাচোরা গাছ পড়ে রইল তার পাশে।
'যাক, তাহলে রাস্তা হয়ে গেল,' ও'সুলিভান বলে চলেছে, 'এবার ওদের কবর খুঁড়তে লোক যাবে', কথা বলতে বলতে গাছের উপর থেকে রাইফেল তুলল, লক্ষ্য স্থির করে প্রথম গুলি—অভ্রান্ত লক্ষ্য; গন্ডার পড়ল, মাটি কেঁপে উঠল বুঝতে পারলাম, ধূলোর মেঘ উড়ল আকাশে।
'শেমবেক, এবার তোমার পালা, গুলি চালাও।' সুলিভান আমাকে বলল।
গুলি চালালাম বটে কিন্তু কপাল মন্দ। যে জন্তুটাকে লক্ষ্য করে গুলি চালালাম, সেটা হঠাৎ তার সামনে পড়ে থাকা একটা গাছের গুঁড়িতে বাধা পেয়ে হাঁটু নীচু করে বসে পড়ল, ফলে গুলি তার চওড়া পিঠে গিয়ে বিঁধল, আহত হল বটে কিন্তু গুরুতর কিছু বলে মনে হল না...এবার আমি দেখি, তোমার কপাল খারাপ, সুলিভান ফায়ার করল, লক্ষ্য দলের সর্দার গন্ডারটা, পাহাড়ের মতো দেহটা মাটিতে পড়ল তবে সঙ্গে সঙ্গে মরল না—মাটিতে বিরাট শরীরটা পড়ে ছটফট করতে শুরু করল। তার সঙ্গে এক অদ্ভুত শব্দ বেরোতে লাগল জন্তুটার গলা থেকে। আর একই সঙ্গে সমস্ত দলটা উন্মক্ত হয়ে উঠল। আমাদের তাঁবু বিছানাপত্র, বাক্স সমস্ত চুরমার করে দিল জন্তুগুলো। আমরাও সমস্ত অবস্থা দেখে আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে অনেকগুলো গুলি ছুঁড়ে ফেললাম; সমস্ত ঘটনা শেষ হলে পড়ে রইল পাঁচ-পাঁচটা গন্ডারের মৃতদেহ। কিন্তু তার আগে ঘটে গেল আরও কিছু অঘটন।

এতক্ষণ তাঁবু থেকে বিছানা পর্যন্ত সমস্ত জড়বস্তুর উপর আক্রমণ চালিয়ে, এবার জন্তুগুলো জীবিত মানুষের খোঁজ শুরু করল। প্রথম লক্ষ্য হল একজন স্থানীয় মানুষ, যে দূরত্ব বা অন্য কোনো কারণে গাছে উঠতে পারেনি। একটা বড় ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ঘটনা দেখছিল। একটা গন্ডার তাঁকে খুঁজে পেল—
খুঁজে পেল বলতে সরাসরি লোকটাকে গন্ডারটা দেখেনি, কিন্তু গন্ধ পেয়েছে। আকাশের দিকে নাক তুলে শুঁকতে শুঁকতে ওই লোকটার গন্ধ পায় গন্ডার—লোকটা তখন উঁচু ঘাসের জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল। মাঝে মাঝে মাথা তুলে দেখছিল—গন্ডারটা সেইদিকে ছুটল। আর লুকিয়ে থাকার মানে হয় না। এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠে লোকটা প্রাণপণে ছুটল আমাদের গাছটার দিকে, পিছনে জীবন্ত ট্যাঙ্কের মতো গন্ডার। লোকটার কপাল খুবই ভালো। আমি যদিও তাকে সাহায্য করতে গাছ বেয়ে খানিকটা নীচে নেমে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম, তবু গন্ডারটা হঠাৎ একটু দাঁড়াল, তারপর পা দিয়ে মাটি থাবড়ে আবার দৌড়ল লোকটার দিকে—এই দাঁড়ানোটাই বাঁচিয়ে দিল লোকটাকে। আমার হাত ধরে সে গাছে উঠে পড়ল—বললাম—'যতটা পারো গাছটার উপরে উঠে যাও', সে উঠে গেল—এবার গন্ডারটার দিকে দেখলাম।
গন্ডার ঝড়ের মতো ছুটে এসে হঠাৎ আমরা যে গাছটায় চড়েছিলাম তার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গেল, বোধহয় সামনের মানুষটা কোথায় অদৃশ্য হল সেটা ভেবেই দাঁড়াল। আমি অল্প খানিকটা উপরে ছিলাম, সাবধানে আর একটু নেমে রাইফেলের নল জন্তুটার কানের পাশে ঠেকিয়েই প্রায় গুলি করলাম। জন্তুটা মাটিতে পড়ল, কিন্তু গাছের কাণ্ডটার উপর। গাছটা ভেঙে পড়ল না ঠিকই, কিন্তু ধনুকের মতো বেঁকে গেল। আমি পড়তে পড়তে আরেকটা ডাল ধরে বাঁচলাম, কিন্তু একটা কিছু পড়ার শব্দ কানে এল...কিছু একটা উপর থেকে পড়ছে বলে মনে হল। গন্ডারটাকে গুলি করার আগের মুহূর্তে সেটা খড়্গ বাগিয়ে আমার গাছটার দিকে এক প্রবল ঢুঁ মারার ব্যবস্থা করছিল। ঢুঁ গাছে লাগলে আমি অথবা যে মানুষটাকে উপরে তোলার ব্যবস্থা করেছিলাম, গাছের উপর থেকে এই দুজনই গন্ডারের সামনে ছিটকে পড়তাম। তারপর কী হতো আন্দাজ করা কঠিন নয়। সেই ভয়েই গুলি করা, কিন্তু এখন কীসের আওয়াজ আসছে...
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম। ধপাস...একটা আস্ত মানুষ গাছ থেকে মাটিতে পড়ল, গন্ডারের পাশে। বুঝলাম যে মানুষটা গাছে উঠেছিল, গাছ গন্ডারের মৃতদেহের ধাক্কায় বেঁকে যেতে সেই মানুষটাই হাত ফসকে পড়েছে। উঁচুতে উঠেছিল তাই ডালপালায় ধাক্কা খেতে খেতে পড়েছে, তাই খানিকক্ষণ ধরে শব্দটা আসছিল বটে।
কিন্তু এখন যদি আর একটা গন্ডার এসে পড়ে, তাহলে?
বেশি ভাবতে হল না, লোকটা মাটি ছেড়ে উঠল আর দৌড়ে চলে গেল ঝোপের দিকে, গাছের দিকে ফিরেও তাকাল না। একটু খোঁড়াচ্ছিল মনে হল...অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায় আর কি!
গন্ডারগুলো এবার আমাদের লোহার ওয়াগনের দিকে দৃষ্টি দিল। প্রথমে আমাদের তাঁবুগুলো, বিছানা, জিনিসপত্র, তারপর মানুষের খোঁজ, তারপর এবার ওয়াগন—পরপর সব খুঁজে দেখছে জন্তুগুলো, অনেকগুলো গন্ডার—যেন তাদের সহযোগীদের মৃত্যুর কারণটাও খুঁজে বের না করে শান্ত হবে না...
অনেকক্ষণ এইভাবে কাটবার পর আস্তে আস্তে তারা ফিরল।
রুমেনপ্রে আর ও'সুলিভান বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই গন্ডারের দলটার পিছন পিছন গেল। আর আমি গাছ থেকে নেমে যত স্থানীয় মানুষ আমাদের সঙ্গে এসেছিল তাদের ডেকে ডেকে এক জায়গায় জড়ো করলাম।
জড়ো করার সময় ভাবলাম, হঠাৎ আমাদের উপর এতগুলো গন্ডারের চড়াও হওয়ার কারণ কী?
গন্ডার মানুষখেকো জন্তু নয়, সাধারণভাবে নির্বিরোধী; তার উপর আক্রমণ না হলে পারতপক্ষে আক্রমণ করে না। দু-চারটে ঘটনার কথা হয়তো জানি, কিন্তু সাধারণভাবে দলবদ্ধ আক্রমণের কথা শুনিনি। কারণ জানার ইচ্ছেটা তাই হচ্ছিল...বুঝতে পারলাম আমার দুই বন্ধু ফিরে আসার পর। তারপর আরও পরিষ্কার করে বুঝলাম পরেরদিন সকালে।
রুবেনপ্রে আর সুলিভান ফিরে এল খানিকক্ষণ বাদে। ওরা গন্ডারগুলো বেশ খানিকটা পিছন থেকে দেখতে দেখতে যাচ্ছিল, কিছুটা দূরে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে; ওরা জানত ওটাই ইওআমো নিয়্যারো, বলা হয় যার জল কখনও শুকোয় না।
গন্ডারের দল সেই নদী থেকে জল খেয়ে, তারপর অন্য পথ ধরে ফিরল।
মাথায় চিন্তা নিয়েই শুতে গেলাম, রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। তবে চিন্তার একটা সুতো বোধহয় মাথায় ঢুকছে।
পরদিন সকালে উঠে মরে পড়ে থাকা বিশাল বিশাল জন্তুগুলোকে ভালো করে দেখলাম, আর ভালো করে খেয়াল করতে নজরে এল একটা লম্বা শুঁড়িপথের মতো রাস্তা, ঘাসে-জঙ্গলে ঢাকা পড়ার জন্য খেয়াল করতে পারিনি, আর স্থানীয় লোকগুলোও খেয়াল করেনি।
ওটা গন্ডারদের নদীতে জল খেতে আসার পথ, আর সেই পথের উপরেই আমরা দিব্যি তাঁবু খাটিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে, যত জিনিসপত্র নিয়ে এসে বসেছি। ফলে যা ঘটার তাই ঘটেছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন