দমকা হাওয়া

পল্লবী সেনগুপ্ত

তারিখ : ১২.০৩.২০০৫

—‘ঠিক সময়ে পৌঁছে যাস কিন্তু...’ স্কুল থেকে বেরোবার মুখেই কথাটা ছুঁড়ে দিল সুজিত৷ অল্প ঘাড় নেড়ে সায় জানাল দীপ৷ ঘড়ির কাঁটা চার ছুঁই ছুঁই৷ তার মানে আরও দু-ঘণ্টা পর থেকে নতুন কোচিং-এর সময়৷

তাহলে কি বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো? নিজের মনেই প্রশ্ন করল দীপ৷

—‘নাঃ...’ বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ঠেলে জবাবটাও ফিরে এল আপনা থেকেই৷ প্যান্টের পকেট থেকে ঠিকানা লেখা কাগজটা বের করে একবার আলতো চোখ বুলিয়ে হাঁটা শুরু করল ধীর পায়ে৷ বাস নিয়ে তো লাভ নেই৷ সময় তো অনেকটাই বাকি৷

পুরো পথটা হেঁটে যখন দীপ পৌঁছল ঠিকানায় তখন ঘড়িতে পাঁচটা পাঁচ৷

ঘামে ভিজে জামা প্রায় নেতা৷ গলা শুকিয়ে পুরো কাঠ৷ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে হঠাৎই ওর চোখে পড়ল একটা ছোটো মতো কাফে৷ নাম বৈশাখী কেবিন৷ আধুনিক কাফে টাইপ কিছু নয়৷ খুব-ই সাদা মাঠা৷ এ সি নেই৷

দীপ ভিতরে গিয়ে বসে একটা পেপসি অর্ডার দিল৷ কাফেটা ওর বয়সের ছেলে মেয়েদের ভিড়ে ঠাসা৷

সবই প্রায় কম বয়সি যুগল৷ ওর জীবনটাও যদি আর সবার মতো হত তাহলে হয়তো...

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে পেপসিটা শেষ হয়ে গেল৷ দীপ উঠে গেল কাউন্টারে৷ কাউন্টারে বসে রয়েছে একটা মেয়ে৷ পরনে মলিন সালোয়ার৷ গায়ের রং চাপা, সাধারণ চেহারা, তবুও কেন যেন চোখ সরাতে পারল না দীপ৷ কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল ওর মা, চুম্বকের মতো আটকে গেল ওর চোখ৷

—‘কি হল আপনি ঠিক আছেন তো?’ মেয়েটার গলার স্বরেই চমক ভাঙল দীপের৷

ইশশশ! মেয়েটা বুঝতে পেরে গেছে৷ নিজের স্বভাব অনুযায়ী খুব নার্ভাস হয়ে গেল দীপ৷ কি করবে বুঝতে পারল না৷ আমতা আমতা স্বরে বলল—

—‘না না মানে আসলে...৷’ মেয়েটা খুব সুন্দর করে হেসে ওর হাত থেকে টাকাটা নিল৷ বলল ‘না না, ঠিক আছে৷ আমি বুঝতে পেরেছি৷’

ব্যালেন্সটা ফেরত দেবার সময় ওর হাতটা ছুঁয়ে গেল দীপ এর হাত৷ জীবনে প্রথম বার কোনো নারীর স্পর্শ... একটা অদ্ভুত অচেনা শিহরন অনুভব করল দীপ সারা শরীরে...৷

তারিখ: ১৫.০৪.২০০৫

—‘উফফফ! পয়লা বৈশাখ এর দিন কি পড়তে আসতে ভালো লাগে বল?’ মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে কথাটা বলল রূপক৷

—কেন ভাই ভালোই তো হল, তুমি তোমার করিনা কাপুরের দেখা পেয়ে গেলে... চোখ টিপে মুচকি হেসে বলল সুমন৷

—‘এই, কেবল চরণ আজ কেমন ঝিল্লি মেরে এসেছিল দেখলি?’ বলে উঠল এবার নয়ন৷

—‘তাতে আর নতুন কী এখন? আজকাল তো দীপ কুমার এর প্রচুর কেতা বেড়েছে৷ মনে হয় কোন ভালো মেয়ে পটিয়েছে আর তাই...’ রূপককে কথা শেষ করতে না দিয়ে সুমন বলল—

—‘খেপলি নাকি? দুনিয়ার কোনো মেয়ে ওকে পাত্তা দিতে পারে বলে তোর মনে হয়?’

—‘প্লিজ তোরা থামবি?’ সুজিত একটু চেঁচিয়ে উঠল৷ তারপর স্বর একটু নরম করে বলল—

—‘দেখ ভাই, তোরা এভাবে বলিস না৷ ও আমাদের পাড়াতেই তো থাকে তাই আমি সত্যি জানি ওর কষ্টের অনেকটাই৷ তোদের তো আগেও বলেছি জন্মের পরই ওর মা মারা যায়৷ ওর বাবা ওকে ছুঁয়েও দেখেননি৷ ওকে অপয়া ভাবতেন৷ ওকে নিয়ে যান ওর দিদা৷ বছর দুয়েক এর মধ্যে বিয়ে করেন ওর বাবা৷ ওর খবরও নিতেন না৷ তারপর ওর যখন চার বছর বয়স তখন ওর দিদা মারা গেলে ওর বাবা ওকে নিয়ে আসেন৷ ওর সৎ মা ওকে আসবাব ছাড়া আর কিছু ভাবেননি কোনোদিন৷ ওর বাবার ও ছেলের প্রতি টান নেই বিশেষ৷ ওর ছোটো ভাইটাও মুখ ঝামটা দেয় কথায় কথায়৷ এরকম যার জীবনকাহিনী সে ছেলে কীভাবে আর পাঁচটা ক্লাস নাইনের ছেলের মতো হবে বল৷ কিন্তু ওরও অনেক গুন আছে৷ অনেকেই হয়তো সেটা জানে না৷ দারুন লেখে ছেলেটা৷’

—‘প্লিজ, আর বোর করিস না৷’ চেঁচিয়ে উঠল নয়ন৷

—‘জলদি পা চালা৷ ওই নতুন যে শরবতের দোকানটা খুলেছে ওখানে যেতে হবে৷ আমার লেটেস্ট ক্রাশ মিলি আজ আসবে ওখানে, তোদের সাথে আলাপ করাব৷ আর ওই ঝিঙ্কু মামনি আরও দুজন সুন্দরীকে আনবে৷’

—‘বলিস কি রে!’ একসাথে উল্লাসে ফেটে পড়ল সব৷

এক ঝাঁক কিশোর উল্লাসে মুখরিত হয়ে গেল নববর্ষের সকাল৷

তারিখ : ১৬.০৫.২০০০৫

দীপ বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল৷ আজ তিন সপ্তাহ হল বিছানায় শয্যাশায়ী ও৷ অসময়ে চিকেন পক্স আর টাইফয়েড একসাথে৷ সবাই বেশ ভয় পেয়ে গেছে এবার৷ বাবাও প্রতিদিন এসে বসছেন দীপ এর কাছে৷ ঘন ঘন ফোন করছেন ডাক্তার কাকুকে৷ আর দীপ ছটফট করছে, শরীরের থেকেও অনেক বেশি মনের কষ্টে৷

আজ তিন সপ্তাহ হয়ে গেল বৈশাখীর সাথে দেখা নেই৷

হ্যাঁ, মনে মনে এই নামটাই ওর রেখেছে দীপ৷ আসল নাম যাই হোক না কেন বৈশাখী কেবিনের ওই মায়াবিনী তো কালবৈশাখীর হাওয়ার মতোই আচমকা আছড়ে পড়েছে দীপের জীবনে৷

সেই প্রথম দেখার পর অদ্ভুত এক অচেনা ভালো লাগা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল দীপ৷ রাতে ভালো করে ঘুমাতেই পারেনি৷ পর দিন আবার ছুটে গেছিল অদ্ভুত এক টানে ওই কাফেতে৷ যথারীতি পেপসি নিয়ে বসেছিল এমন একটা টেবিলে যেখান থেকে অস্পষ্ট হলেও দেখা যায় ওর মুখ৷ ছোটোবেলা থেকে দীপ এর জীবনে নানা বিপর্যয় গেছে৷ তাই আত্মবিশ্বাসটা ওর একটু কমই৷ ও জানে স্কুলে সবাই ওকে কেবলা চরণ বলে৷ সব মেয়েরা ওকে জোকার ভাবে কারণ ও আর সবার মতো ঝকঝকে নয়৷ তাই এদিনও সাহস করে ও মেয়েটার দিকে তাকাতে পারছিল না কিছুতে৷

এভাবেই প্রায় মিনিট পনেরো কেটে গেল৷ শেষে অতি কষ্টে ঠাকুরের নাম জপে ও দৃষ্টি ঘোরাল মেয়েটার দিকে৷ আর তাকিয়েই চমকে গেল৷ দেখল সেও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দীপ এর দিকেই৷ দীপ কক্ষনো মেয়েদের সাথে মেশেনি সেভাবে৷ তবু আজ ওর বুঝতে ভুল হল না যে এই দৃষ্টি মোটেই কোনো জোকার ছেলেকে দেখার মতো দৃষ্টি নয়, অন্য এক জাদু মাখা এ দৃষ্টি৷ দীপ অবশিষ্ট পেপসি কোনোমতে শেষ করে দাম চোকাতে গেল তাড়াতাড়ি৷ আর আজ ও একই ভাবেই ছুঁয়ে দিল দীপ এর হাত৷ এর পর থেকে কেটে গেছে প্রায় দু-মাস৷ কোচিং থাক বা না থাক নানা অছিলায় দীপ বার বার ছুটে গেছে ওই কাফেতে৷ একই ভাবে তাকিয়ে থেকেছে ওর দিকে আর বুঝতে চেষ্টা করেছে ওর চোখ দুটোর ভাষা৷ কোনোদিন হয়তো হালকা হাসি উপহার পেয়েছে মেয়েটার থেকে৷ আবার কোনদিন ও একটু বেশি গভীর ভাবে ছুঁয়ে গেছে দীপের হাত৷ দীপের যেন বিশ্বাসই হয় না তাহলে ওকেও ভালো লাগতে পারে কোনো মেয়ের? নাকি সবটাই ওর বিভ্রম? না না তাই বা হবে কেমন করে? সব তো দিনের আলোর মতোই সত্যি৷ দীপও আস্তে আস্তে বদলেছে এই দু-মাসে অনেক৷ এখন বেশ তকতকে থাকার চেষ্টা করে ও৷ নিজের মধ্যেকার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসটা যেন আজকাল আবার একটু একটু করে ফিরে পাচ্ছে৷ কিন্তু শত চেষ্টা করেও ওর সাথে কথা বলে উঠতে পারেনি৷ ওই বা বলে না কেন কে জানে৷ বোধ হয় ও খুব লাজুক দীপ এরই মতো৷ হ্যাঁ দীপ বুঝতে পেরেছে ও অনেকটা দীপ এর মতো৷ ওর চোখ দেখে দীপ বুঝতে পারে ওরও অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে ওই দু-চোখের গভীর নদীতে৷ অবশেষে সেদিন একটা সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিল দীপ৷ পেপসি খেয়ে টাকা দেবার সময় নিজের মোবাইল নম্বরটাও গুঁজে দিয়েছিল বৈশাখীর ডেস্কে৷

আর কিছু লিখবে ভেবেও লিখে উঠতে পারেনি৷ ইশশ! কী ভালো হত যদি দীপ ওর ক্লাসের সুমন, তমাল এদের মতো হতে পারত৷

কিন্তু দীপ এর ভাগ্য তো বরাবরই ওর শত্রু৷ এবারও ভাগ্য ওর প্রতিকূলেই গেল৷ এই সাহসী কাজটা করার পরদিন থেকেই দীপ জ্বরে পড়ল৷ আর তারপর চিকেন পক্স আর টাইফয়েড ধেয়ে এল একসাথে৷ ও বিছানায় বন্দি হয়ে গেল৷ না, ওর অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসেনি৷ কী হল? বৈশাখী কি রেগে গেল? নাকি বুঝতে পারল না? নাকি ওই নাম্বার লেখা কাগজটা কোনোভাবে অন্য কারো কাছে চলে গেল? ওর কোনো বিপদ হবে না তো? উফফ! কবে যে ঠিক হবে দীপ? অহস্য লাগছে এই অবস্থাটা৷

তারিখ: ০৩.০৬.২০০৫

দীপ এখন একটু সুস্থ হয়েছে৷ আজই প্রথম বাড়ি থেকে বের হল দীর্ঘ অসুস্থতার পর৷ আর প্রথমেই এসেছে বৈশাখী কেবিন৷ রোজকার মতোই বিকেলের ভিড়ভাট্টা৷ আজ বাইরে বেশ মেঘ হয়ে রয়েছে৷ মনে হয় বৃষ্টি হবে জোর৷ তাই ওকেও ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি৷ শরীর বেশ দুর্বল৷ কিন্তু বৈশাখী কোথায় আজ? ও তো নেই কাউন্টারে৷ এই দু-তিন মাসে তো এমন কোনোদিন দেখেনি দীপ৷ গলা ব্যথা তাই আজ কফি নিয়েছে৷ সেটা শেষ হয়ে গেল দেখতে দেখতে৷ তবু তার দেখা মিলল না৷ অগত্যা আর একটা কফির অর্ডার দিল দীপ৷ এদিকে বাইরে বেশ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে আর কাফেতেও ভিড় বাড়ছে৷ দ্বিতীয় কফিটাও শেষ হয়ে গেল৷ ওর ভিতরে যেন কেউ হাতুড়ি পিটাতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে৷ গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল দীপ৷ কাউন্টারে আজ মোটা মতো একটা লোক৷ কোনোমতে তাকে দাম মিটিয়ে খুব কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে নিল দীপ৷ না, ওকে আজ পরতেই হবে৷

—‘দাদা ওই মেয়েটা আজ আসেনি?’

—‘কে?’ রুক্ষ স্বরে জবাব দিয়ে টেরচা চোখে তাকাল লোকটা৷

—‘ওই যে যিনি কাউন্টারে থাকতেন...’ অল্প কেঁপে গেল দীপ এর গলা৷

—‘অ, বকুল এর কথা বলছ? তো তাকে দিয়ে তোমার কী দরকার হে?’ দীপ থতমত খেয়ে গেল লোকটার রুক্ষ ব্যবহারে৷

—‘ও তো কাজ ছেড়ে দিয়েছে এ মাস থেকে৷ ও দেশে চলে গেল৷ ওর বিয়ে হয়ে গেল কিনা৷’ বিরাট কান ফাটানো শব্দে বাজ পড়ল কোথাও৷

মোটা লোকটা চেঁচিয়ে উঠল—

—‘ওই ছেলে তোমার ব্যালেন্সটা তো নিয়ে যাও...’

বৃষ্টির মধ্যে পাক খেতে খেতে হারিয়ে গেল শব্দগুলো৷ আর সবাই দেখল কালবৈশাখী ভেজা বিকালে উদভ্রান্তের মতো দৌড়াচ্ছে একটা ছেলে৷ কিন্তু সেই ছেলেটার চোখের জল কেউ দেখল না, সেটা যে মিশে গেছে বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটার সাথে৷

তারিখ: ২৪.০৪.২০১৮

হুহু করে হাইওয়ে দিয়ে ছুটছে গাড়িটা৷ গাড়ির পিছনের সিটে বসে রয়েছেন সাম্প্রতিক কালের অন্যতম খ্যাতনামা লেখক দীপ মুখোপাধ্যায়৷ ভদ্রলোকের পেশা অধ্যাপনা, আর নেশা কলমের আঁচড়ে ছবি আঁকা৷ সকলে বলেন ওনার কলম নাকি কথা বলে, অদ্ভুত এক যাদু আছে নাকি এই লেখকের কলমের ভাষায়৷

সম্প্রতি ওনার উপন্যাস ‘ভালোবাসার নানা রং’ নিজের ঝুলিতে সংগ্রহ করেছে বেশ অনেকগুলো পুরস্কার৷

—‘দাদা মনে হচ্ছে ঝড় বাদল আসবে৷’

—‘হ্যাঁ? কী বললি?’ ড্রাইভারের ডাকে যেন ভাবনার ঘোর ছিঁড়ে বেরিয়ে এলেন দীপ৷ মানুষটা ভাবের জগতেই যেন মিশে থাকেন৷ শুধু মাঝে মাঝে প্রকৃতির টানে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন৷ এই যেমন এখন ফিরছেন বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে৷

—‘মানে বলছিলাম যে আকাশের অবস্থা ভালো নয়৷ মনে হচ্ছে কালবৈশাখী হবে৷’

—‘তা ভালোই তো৷ হোক না কালবৈশাখী৷ আজকাল তো হয়ই না প্রায়৷’ অল্প হেসে বললেন দীপ৷

—‘কি বলছেন দাদা! কালবৈশাখী ঝড় কখনো ভালো হয় নাকি? বিচ্ছিরি খ্যাপাটে ঝড়, বৃষ্টির তাণ্ডব৷ কত গাছ পড়ে৷ কত কাঁচা বাড়ির ছাদ উড়ে যায়৷ একদম ধ্বংস করে দেয় কালবৈশাখী ঝড়ের দাপট৷’

—‘কে বলেছে যে কালবৈশাখী শুধু ধ্বংস করে? অনেক সময় পাগলা ঝোরো বাতাস আর দমকা হাওয়া কত কিছু আমূলে সব পাল্টে ফেলে আবার সব নতুন করে সাজিয়ে দেয় জানিস?’ আর বেশি কথা বাড়াল না ড্রাইভার৷ দাদা লেখক মানুষ৷ সব ভাবনা চিন্তার ধরনই আলাদা৷ গাড়ির জানালার কাঁচ খানিকটা নামিয়ে দিল দীপ৷ ঝড়টা শুরু হচ্ছে৷ ঠাণ্ডা হাওয়া গাড়ির জানালার ফাঁক গলে ছুঁয়ে দিল দীপকে আর অমনি দীপ পৌঁছে গেল অনেকগুলো বছর আগে৷ ঠিক এমনই এক কালবৈশাখীর বিকালে হুট করে ওর জীবন থেকে হারিয়ে গেছিল সেই মেয়েটা যে কিনা পাগলা ঝরো হাওয়ার মতোই একদিন আছড়ে পড়েছিল ওর জীবনে৷ তার উপস্থিতিটাই কেমন যেন একটু একটু করে বদলে দিয়েছিল দীপকে৷ হারানো আত্মবিশ্বাস আবার খুঁজে পেয়েছিল দীপ, আবার নতুন করে বাঁচার, ভালো থাকার ইচ্ছে ফিরে এসেছিল ওর মধ্যে৷ বৈশাখী না না বকুল দীপের জীবন থেকে হারিয়ে গেলেও ওর চোখ দুটো যেন আজও অনুসরণ করে দীপকে৷ তাইতো আজ সেই কেবলা দীপ হতে পেরেছে সমাজের একজন সফল মানুষ দীপ মুখোপাধ্যায়৷ পুরোনো দীপের খোলনালচে বদলে যাবার সেই একমাত্র কারণটা আজ গোটা পৃথিবীটা না জানলেও দীপ নিজে তো হাড়ে হাড়ে জানে৷ আর তাই ও বিশ্বাস করে সব ঝড় ভাঙতে আসে না, কিছু কিছু ঝড় ভেঙে গড়তেও আসে৷

—‘এই গাড়ি থামা, গাড়ি থামা৷’ দাদার ডাকে ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে গাড়ি থামাল রঘু৷

—‘কী হল দাদা? গাড়ি কেন থামাতে বলছেন বৃষ্টি হচ্ছে যে৷’

রঘুর কথা কানে পৌঁছাল না দীপের৷ ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে ও৷ হাইরোডের মাঝে একটা ছোটো মতো খাবারের দোকান, দীপ বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখতে মাখতে পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছে সেই দিকে৷

প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল রঘু, তারপর দাদার পিছু নিল সেও৷ খাবারের দোকানটার নাম বৈশাখী টিফিন সেন্টার৷

বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করছে দীপের৷ দোকানের সামনে গিয়েই আরও চমকে উঠল ও৷

কাউন্টারে বসে একটা মেয়ে৷ মুখ নীচু করে হিসাব লিখছে সে৷

—‘এক্সকিউজ মি...’ ধরা গলায় বলল দীপ৷

—‘হ্যাঁ বলুন’ মেয়েটা তাকাল এবার দীপের দিকে৷ আর অমনি চমকে উঠল দীপ৷ আরে! এ তো সেই... সেই মেয়েটা৷ দীপের বৈশাখী৷ সেই মলিন সালোয়ার, চোখে উদাস দৃষ্টি৷

—‘বলুন স্যার কী লাগবে?’ মেয়েটা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে দীপের দিকে৷

—‘কোক লাগবে আর সাথে যদি ফ্রাইটাই...’ দীপ বলল একটু ঢোঁক গিলে৷

—‘হ্যাঁ হয়ে যাবে দশ মিনিটে৷ আপনি একটু বসুন৷’

দীপ বসল একটা চেয়ার টেনে৷ বাইরে বৃষ্টির দাপট আরও বাড়ছে৷

না, এই মেয়েটাও বৈশাখী নয়৷ শুধু ওর মতোই চোখে একটা উদাস দৃষ্টি আছে এরও৷ চেয়ারে বসে দু-হাতে মাথার রগ টিপল দীপ৷ ও তো জানে বৈশাখীকে আর কোনোদিনই নিজের চোখের সামনে দেখতে পাবে না৷ তবুও কেন যে বৈশাখী কাফে, বৈশাখী টিফিন, বৈশাখী স্টোর এমন কোনো দোকান দেখলেই আজও এমন আকুল হয়ে ওঠে...

দীপ এবার আস্তে আস্তে আর একবার তাকাল মেয়েটার দিকে৷ মেয়েটা কার দিকে যেন একটা দেখছে৷ দীপের দৃষ্টিও ঘুরল আবার সেই দিকে৷

আরে! এ তো দীপই৷ সেই ভীতু চাহনি, পাতলা চেহারা৷ সেই ছোটোবেলার দীপই তো বসে আছে একটা চেয়ারে আর তার দিকেই তো তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটা৷ আর সেই পুরোনো দীপও একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটার দিকে৷

আবার চোখে রগড়ে সেদিকে তাকালেন একবার খ্যাতনামা লেখক দীপ মুখোপাধ্যায়৷ না, দীপের ছোটোবেলার চেহারার সাথে মিল থাকলেও ওই ছেলেটা দীপ নয়৷ আর হবেই বা কি করে!

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপ মুখোপাধ্যায়৷ হন হন করে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছেন নিজের গাড়ির দিকে৷

—‘স্যার... স্যার কী হল? আপনার খাবার হয়ে গেছে স্যার...’ চিৎকারটা ক্রমেই ফিকে হয়ে এল দীপের কানে৷

—‘রঘু তাড়াতাড়ি চল৷ খুব তাড়াতাড়ি৷ একটা খুব জরুরি কাজ মনে পড়ে গেছে...’ গাড়িতে উঠেই বললেন লেখক তথা অধ্যাপক বাবু৷

গাড়ি স্টার্ট দিল রঘু৷ আবার ছুটছে গাড়ি৷

হ্যাঁ সত্যি কাজটা শুরু করবে দীপ আজ থেকেই৷ বাংলার সবচেয়ে নাম করা পূজা বার্ষিকী ‘আমার দেশ’ এর জন্য উপন্যাসটা লিখতে হবে৷ আর আজ থেকেই শুরু হবে নতুন উপন্যাস ‘দমকা হাওয়া’৷ না দীপ জানে না এক্ষুনি দেখা ছেলে-মেয়ে দুটোর মধ্যে কি আছে, না ও জানে না ওরা শেষ অবধি মিলবে কিনা তবে ‘দমকা হাওয়া’ উপন্যাসে মিলিয়ে দেবে দীপ ওদের গল্পটা৷ আর এভাবেই পরিণতি না হয় পাক অনেক বৈশাখী, আর অনেক দীপের অসমাপ্ত গল্পগুলো৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%