লৌকিকের মাঝে

পল্লবী সেনগুপ্ত

—‘মাম, মাম আমি মরে যাব৷ ও আমায় মেরে ফেলবে৷ তুমি অফিস যেও না৷’ অফিস যাবার মুখেই আমাকে আঁকড়ে ধরল মিলু মানে আমার আট বছরের মেয়ে৷

আমার বুকের ভিতরটা আবার ধক করে উঠল৷ কী হচ্ছেটা কী ওর? সত্যি কি তবে আমার মেয়েটা মানসিকভাবে আরও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে?

মনের সব উদ্বেগকে চেপে ধরে মিলুকে কাছে টানলাম৷ ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম—

—‘এসব কী বলছিস মা? কে মারবে তোকে?’

—‘বিন্নি মাজী আমায় মেরে ফেলবে৷ ও শানুকেও মেরে ফেলেছে৷ আমি নিজে দেখেছি মাম৷’ দেখছি ভয়ে শুকিয়ে গেছে মিলুর মুখ৷

আমি একবার তাকালাম বিন্নির দিকে৷ বেচারি মুখ চুন করে দেওয়ালে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে৷ আমি ওর দিকে তাকাতেই কাঁদ কাঁদ গলায় বলে উঠল—

—‘বউদিদি আমি চলে যাই গো৷ আমার আর এখানে কাজ করা হবে না৷ মিলু আমায় কেন যে রাক্ষসী ঠাউরেছে আমি তো তার কিছুই বুঝতে পারছি নে৷’

আমি চোখের ইশারায় বিন্নিকে আশ্বস্ত হতে বললাম৷

—‘না রে মা৷ বিন্নি মাসি খুব ভালো৷ ও তো তোকে খুব ভালোবাসে৷ ও তো তোর সাথে অনেক খেলা করবে৷ তোকে ভালোবাসবে৷’ নানা কথায় ভোলাবার চেষ্টা করতে শুরু করলাম আমি আমার মেয়েটাকে৷ কিন্তু মিলু যেন কিছুই মানতে নারাজ৷ শুধু কেঁদেই চলেছে হাপুস নয়নে৷

ঘড়ির দিকে এবার তাকালাম ঝট করে একবার৷ সময় দৌড়চ্ছে নিজের গতিতে৷ এবার বেরোতে না পারলে অফিসে আবার আজ লেট হয়ে যাবে৷

—‘বিন্নি ওকে বোঝা একটু৷ আমি বেরোলাম৷’ মেয়েটার কান্না কতকটা উপেক্ষা করেই বেরিয়ে পড়লাম আমি৷

ভাড়া করা ক্যাবে বসে যাত্রা করলাম অফিস অভিমুখে৷ মনের ভিতরটা বড্ড হুহু করছে৷ মিলু আরও কাঁদছে কিনা কে জানে! মিলু আমার এমনিতে খুব বুঝদার আর শান্ত মেয়ে৷ কিন্তু ইদানীং কেন যে এমন একটা অদ্ভুত ভয় ওকে পেয়ে বসেছে সত্যি আমি তার কিছুই বুঝতে পারছি না৷ শানুর অস্বাভাবিক মৃত্যুই কি এর জন্য দায়ী? নাকি আমাদের মুর্শিদাবাদ ট্যুর এর মূল কারণ? ওই গল্পটাই কি খুব বেশি প্রভাব ফেলল ওর শিশু মনে?

আসলে মিলুর মতো বাচচারা যাদের সারাদিনটাই প্রায় একা একা কাটাতে হয় ওদের মনের মধ্যে হয়তো নানা রকম শেড তৈরি হয়ে যায় আর যার প্রতিফলন ঘটে এভাবে৷

আমি সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকি, মিলুর বাবা মানে আমার স্বামী আছেন কর্মসূত্রে দিল্লিতে৷ আর আমার বাবা মা শ্বশুর শাশুড়ি এরাও সবাই কলকাতার বাইরে৷ নিজেদের আদি বাড়িতে৷ তাই মিলুকে সারাদিনই থাকতে হয় কাজের লোকের কাছে৷ হয়তো একাকীত্বই কোনোভাবে ওকে মানসিক রোগী বানিয়ে তুলছে৷ নাঃ৷ আমি আর ব্যাপারটা অবহেলা করব না৷ আমি দেখা করব আজই আমার ছোটোবেলার বন্ধু কেয়ার সাথে যে এখন শহরের নাম করা শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ৷

—‘এই যে সমাধিটা দেখছেন এটা হল কলিজা খাকি বেগমের সমাধি৷ কলিজা খাকি বেগম মানে কে জানেন তো ভাবিজী? বেগম হলেন মুর্শিদাবাদের পহেলা নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এর মেয়ে আজমউন্নিসা৷’

—‘কিন্তু একে কলিজা খাকি বেগম কেন বলছেন?’ গাইড কে একরাশ কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল আমার ননদ রিনা৷

—সে তো অনেক বড়ো কাহানি বহেনজি৷ আমি তাও বলছি একটু৷ সে অনেক দিন আগের কথা৷ মুর্শিদকুলি খাঁ এর বেটি আজমউন্নিসার তখন সবে সাদি হয়েছে সুজাউদ্দালার সাথে৷ তো সেই সময় বেগম সাহেবাকে ধরল এক আজিব ব্যামো৷ দিল কা বিমারি যেটাকে কিনা এখন আমরা বলি হার্টের অসুখ৷

অনেক জায়গা থেকে অনেক কবিরাজ, হেকিম সবাই এলেন৷ কিন্তু কেউ সারাতে পারলেন না বেগম সাহেবার সেই আজিব বিমারি৷ সবার তো খুব পরেশানি হয়ে গেল৷ সেই সময় এলেন কোথা থেকে এক বুড়ো হেকিম সাহেব৷ তিনি বাতলালেন উপায়৷ বেগম সাহেবাকে এমন এক দাওয়া খেতে হবে যেটা কিনা তৈরি হবে ইনসান এর বাচচার কলিজা থেকে৷’

—‘মানে? সে কি সাংঘাতিক কথা? দেখলাম শিউরে উঠেছে রিনা৷

—‘আরে বহেন এখনি এত তাজ্জব হবেন না৷ তাজ্জব হবার তো আরও বাকি আছে৷ তো বেগম সাহেবার জন্য ব্যবস্থা করা হল সেই অদ্ভুত দাওয়াই৷ আর সেই দাওয়াই আসর করল৷ ফল দেখাল৷ বেগম সাহেবা সুস্থ হয়ে গেলেন৷ কিন্তু ওনার নেশা লেগে গেল৷ কলিজার স্বাদ ওনার এমন জবরদস্ত লেগে গেল যে উনি সেই নেশা আর ছাড়তে পারলেন না৷ উনি হুকুম দিলেন ওনার রোজ নাস্তা করার জন্য চাই একটা করে মানুষের বাচচার কলিজা৷ আর বেগম সাহেবার হুকুম না মানে কার এত হিম্মত! ব্যস! চলতে লাগল বেরেহেমি কা মওত৷ রোজ দিন মরতে লাগল বাচচা৷ আর তাদের কলিজা পেয়ে খুশি হতে থাকলেন বেগম সাহেবা৷ সেই জন্যেই তো ওনার আর এক নাম কলিজা খাকি বেগম৷

কিন্তু এই রাজ বেশিদিন চাপা থাকল না৷ জানাজানি হয়ে গেল৷ আর সবটা জানার পর মুর্শিদকুলি খাঁ জিন্দা জ্বালিয়ে দিলেন নিজের বেটিকে৷ এই জায়গাতেই জিন্দা জ্বালান হয় উনাকে৷ তবে কেউ কেউ বলেন যে ওনাকে জিন্দা জ্বালিয়ে ছিলেন উনার পতি সুজাউদ্দলা৷ তাই এখানেই তৈরি হয় ওনার সমাধি১৭৩৪ সালে৷

—‘কিন্তু আমি একটা রিসার্চ পেপারে পড়েছিলাম যে আজমউন্নিসাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ব্যাপারটা নাকি আদপেও সত্যি নয়৷ এটা নাকি পুরোপুরি মিথ৷ আসলে নাকি সত্যিটা জানাজানি হবার পর আজমউন্নিসাকে উড়িষ্যায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷ পরে মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর আবার এই মুর্শিদাবাদেই ফিরে আসে আজমউন্নিসা৷ কালের প্রভাবে এক সময় মারা যায় সে৷ আর তারপরই তাকে সমাধিস্থ করা হয় এখানে৷’

গাইডের গল্প উপেক্ষা করেই সেদিন বলেছিলাম আমি৷

—‘না ভাবিজী ইতনা ভি আসান কুছ নেহি থা৷ বেগম কা বেরহমি কা উয়ও মওত আর উনকা চিখ আজও এই মুলুকের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়৷ অমাবস কি রাত মে এখনও শুনাই দেয় চিখ৷ অনেক ঘর থেকে আজও গায়েব হয়ে যায় বাচচা৷ সবাই বলে বেগম! বেগমের কলিজার নেশা আজও মরেনি৷ তাই তো আজও সে ফিরে ফিরে আসে নিজের পিয়াস বুঝাতে৷’

গাইডের হিসহিসে গলার স্বর, পড়ন্ত বিকালের ফ্যাকাসে আলো আর প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী মুর্শিদাবাদের বাতাস সব মিলিয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠেছিল আমার সেদিন৷ আর তখনই লক্ষ্য করেছিলাম এই গল্প শুনতে শুনতে ভয়ে আর আতঙ্কে কেমন পাংশুবর্ণ হয়ে গেছে মিলুর মুখটা৷ হঠাৎ দৌড়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে বলেছিল—

—‘মাম আমার খুব ভয় করছে৷ প্লিজ এক্ষুনি বাড়ি চল৷’

এতটা বলে আমি থামলাম৷ তাকালাম কেয়ার দিকে৷

—‘হুম৷’ একটা গম্ভীর শব্দ করল কেয়া৷ আমার দিকে তাকিয়ে বলল—

—‘তুই ঠিক কি বলতে চাইছিস?’

—‘আমার মনে হয় এই গল্পটা শুনে মিলু সেদিন খুব ভয় পেয়েছিল৷ আর তাই এই গল্পটা কোনোভাবে ওর শিশুমনে গেঁথে গিয়ে খুব প্রভাব ফেলেছে৷ যার বহিঃপ্রকাশেই...’

—‘বিন্নি আর শানু... এবার এই দুটো ফ্যাক্টর এর ডিটেল দে আমায়৷’ আমার কথা মাঝপথে থামিয়েই বলল আবার কেয়া৷

—‘দ্যাখ তুই তো জানিসই আমি মিলুকে নিয়ে কলকাতায় একাই থাকি৷ আমার সারাদিন কেটে যায় অফিসে৷ আর তাই মিলুকে আমায় রেখে যেতে হয় কাজের লোকের ভরসাতেই৷ মিলুকে দেখাশুনা করত নোলক মাসি নামে এক মহিলা৷ কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য হঠাৎ করে নোলক মাসি কাজ ছেড়ে দেওয়ায় আমি বেশ মুশকিলে পড়েছিলাম৷ তাই জন্য সেই বার আমাদের মুর্শিদাবাদ ট্যুরের সময় আমি কথা প্রসঙ্গেই আমাদের গেস্ট হাউজের কেয়ার টেকারকে বলেছিলাম যদি কোনো ভালো বিশ্বাসী কাজের মেয়ে তার সন্ধানে থাকে, যে কিনা কলকাতায় থেকে কাজ করতে চায় তাহলে সে যেন আমায় জানায়৷

তাই আমাদের কলকাতা ফেরার দিন সকালেই সেই কেয়ার টেকার নিয়ে আসে বিন্নিকে৷ বিন্নি ওখানকার লোকাল মেয়ে৷ খুব গরিব৷ তিনকুলে কেউ নেই৷ তাই সে চায় কলকাতায় একটা ভালো কাজ আর খাওয়া পরার আশ্রয়৷ সেদিন বিন্নিকে দেখে আর ওর সাথে কথা বলে আমার বেশ ভালোই লেগেছিল৷ তাই আমি ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসি কলকাতায়৷

বিন্নি বেশ চটপটে আর কাজেরও৷ ব্যবহারটাও চমৎকার৷ আমার ওকে ভালোই লেগে যায় প্রথম দিন থেকেই৷ কিন্তু আমি লক্ষ্য করছিলাম মিলু কেমন যেন আড়ষ্ট থাকে বিন্নির কাছে৷ সর্বদা এড়িয়ে চলতে চায় ওকে৷ অথচ বিন্নি মিলুকে বেশ ভালোবাসে৷ কিন্তু তবুও ওর এমন ব্যবহারের কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না৷ তাই একদিন বিন্নির আড়ালে আমি মিলুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন মিলু এড়িয়ে চলতে চায় ওকে? তখন মিলুর উত্তর শুনে আমি শিউরে উঠেছিলাম আর সেদিনই প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম বোধ হয় মিলুর মানসিক কিছু সমস্যা হচ্ছে৷’

—‘কী বলেছিল মিলু?’ প্রশ্ন করল কেয়া৷

—‘মিলু বলেছিল বিন্নির গা থেকে নাকি ও মানুষের রক্তের গন্ধ পায়৷ ওর মনে হয় বিন্নি নাকি মানুষের রক্ত খেকো একটা পিশাচ৷’

সেদিন ওর এ হেন উত্তর শুনে ওকে এক দফা ধমকে দিয়েছিলাম৷ কিন্তু তখন কি আর জানতাম যে আরও বড়োসড়ো কিছু ঘটতে চলেছে! একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার৷

—‘কী হয়েছিল?’

—‘আমাদের এপার্টমেন্টের বেশির ভাগ বাচচাগুলোই ওয়ার্কিং প্যারেন্ট এর চাইল্ড৷ এরা প্রায় সবাই কাজের লোকদের কাছেই থাকে৷ প্রতিদিন বিকালের দিকে এরা সবাই ছাদে যায় খেলা করতে৷ সেদিনও খেলছিল ওরা৷ জানি না ঠিক কীভাবে ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে সেদিন পড়ে যায় শানু৷ পা পিছলে হয়তো৷ ঠিক বলতে পারব না৷ শানু আমাদের এপার্টমেন্টেরই একটা বাচচা৷ শানুর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে সবাই আমরা খুব ভেঙে পড়েছিলাম৷ থানা পুলিশও হয়েছিল৷ কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আসে যে এটা দুর্ঘটনাই৷

শানুর মৃত্যুর পর থেকেই মিলু খুব অস্বাভাবিক ব্যবহার করতে শুরু করে৷ সব সময় ভয় পেতে থাকে৷ আর বারবার বলতে থাকে একটাই কথা৷ ও নাকি দেখেছে শানুকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে বিন্নি৷ আর ওকে ঠেলে ফেলার সময় নাকি বিন্নি বলছিল চাই চাই... আমার তোর কলজেটা চাই৷

প্রথমবার এসব শুনে আমি খুব বকি মিলুকে৷ কিন্তু দিনদিন পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে রে কেয়া৷ মিলু বেশি করে আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে৷ ভয়টা আরও বেশি যেন পেয়ে বসছে ওকে৷ আমার মনে হয় মুর্শিদাবাদে শোনা ওই কলজে খাকি বেগমের গল্প, শানুর মৃত্যু আর নতুন বিন্নির এখানে আসা সব মিলিয়ে মিলু...’

আমার লম্বা ভাষণের শেষে একরাশ আশা নিয়ে তাকালাম কেয়ার দিকে৷

—‘আজকাল চাইল্ড সাইকোলজি অনেক বেশি জটিল হয়ে যাচ্ছে রে৷ আজকাল বাচচারা অনেক লোনলি হয়ে যাচ্ছে৷ ভার্চুয়াল জগতেই বেশি আটকে পড়ছে ওরা৷ বাবা মা আত্মীয় স্বজনদেরও কাছে থেকে সেভাবে পায় না ওরা৷ যাই হোক, তুই একদিন ওকে নিয়ে আয় আমার কাছে৷ আমি কথা বলব৷’

—‘আচ্ছা পরের সপ্তাহে নিয়ে আসব৷’ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম আমি৷ দেখলাম কেয়ার ভুরুতে একটা গম্ভীর ভাঁজ৷ কেন ঠিক বুঝতে পারলাম না৷

আমি বেরিয়ে যাবার মুহূর্তেই পিছু ডাকল কেয়া৷

—‘ভালো কথা, ওই বিন্নি বলে মেয়েটার পরিচয় পত্র মানে আধার বা ভোটার কার্ডের কপি কাছে রেখে দিয়েছিস তো?’

চমকে উঠলাম প্রশ্নটায়৷ না এটা তো হয়নি৷ মাথায়ই আসেনি, যদিও আসা উচিত ছিল৷

—‘না রে মানে সেটা হয়নি৷ আসলে এত হুড়োমুড়ি করে ওকে নিয়ে এলাম৷ তখন একটা লোকই বেশি দরকার ছিল৷ তাই আর খেয়াল হয়নি৷’ বললাম আমতা আমতা করে৷

—‘উঁহু৷ এটা ঠিক করিসনি৷ অচেনা একটা মেয়ে৷ তাকে এভাবে কি কেউ বাড়িতে রাখে নাকি?’

কেয়ার গলাটা ভীষণ রকম গম্ভীর শোনাল৷

কেঁপে উঠল আমার বুকটা৷ কেন বুঝতে পারলাম না৷ হঠাৎ মনে হল বিন্নি সত্যি ভালো মেয়ে তো? সত্যি ওর মধ্যে কোনো গণ্ডগোল নেই তো? আজকাল তো কত কী হয়!

ধুর! এসব কি ভাবছি আমি! বিন্নি যে কতটা নিরীহ আর গোবেচারা আমি তো নিজেই জানি৷ নিজের মনকেই নিজে শাসন করলাম আমি৷

ক-দিন ধরেই আমরা মনটা খুব বেশি অশান্ত৷ জানি না কেন৷ গত পরশু কেয়ার সাথে কথা বলে আসার পর থেকেই বেড়েছে মনের এই উচাটনটা৷ যদিও এর কোনো যুক্তিপূর্ণ কারণ নেই৷ কিন্তু তবুও...

আজ মিলুকে নিয়ে যাবার কথা কেয়ার কাছে৷ তাই একটু আগে আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছি৷ জানি না কেন একটা অজানা আশঙ্কায় সকাল থেকেই বারবার বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে আজ৷ কেন কে জানে শুধু মনে হচ্ছে আজ যেন খুব খারাপ কিছু একটা ঘটবে৷ ঘটবেই৷

সুরমা এপার্টমেন্ট মানে নিজের বাসস্থলের কাছাকাছি আসতেই ধক করে উঠল বুকের ভিতরটা৷ একী! এপার্টমেন্টের সামনে এত লোকের ভিড় কেন? সবাই এত উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত পা নেড়ে কী বলছে?

আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন ফিসফিস করে উঠল বিপদের বার্তা নিয়ে৷ পড়িমরি করে দৌড়ে গেলাম আমি ভিড়ের কাছে৷

—‘কী হয়েছে? কী হয়েছে এখানে?’ পাগলের মতো করছি আমি৷ আমার স্নায়ু আর আমার বশে নেই৷

—‘মা তোর যে সর্বনাশ হয়ে গেল রে৷ ছাদের ভাঙা পাঁচিল গড়িয়ে শানুর মতো তোর মিলুও...’ আর্তনাদ করে উঠলেন আমার এক পরিচিত মুখ৷

এবার আমার চোখ দেখল সেই মারাত্মক দৃশ্যটা৷ আমার মিলু... আমার মিলুর থ্যাঁতলানো দেহটা পড়ে রয়েছে নীচে৷

আমার পা এর নীচের মাটি কাঁপছে বুঝতে পারলাম৷ বুঝতে পারলাম আমার গলার কাছটা শুকিয়ে খটখটে হয়ে গিয়েছে৷

—‘বিন্নি কোথায়?’ নিজের বশের বাইরে গিয়েই যেন ঠোঁট ঠেলে বেরিয়ে এল কথাগুলো৷

কেউ হয়তো শুনতে পেল না৷ কিংবা কেউ হয়তো উত্তর দিল আমি শুনলাম না৷

পড়িমরি করে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় লাগালাম আমি৷ নিমেষের মধ্যে আছড়ে পড়লাম নিজের ফ্ল্যাটের দরজায়৷

দরজা খোলা৷ খাঁ খাঁ করছে খালি ফ্ল্যাটটা৷ বাইরে বিছিয়ে যাওয়া সন্ধ্যার অন্ধকার ছুঁয়ে দিচ্ছে ফ্ল্যাটের কোণাগুলো৷

—‘বিন্নি... বিন্নি... বিন্নি....’ উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করলাম আমি৷ না, কোনো উত্তর এল না৷

—‘বিন্নিইইই...’ আবার মরণ চিৎকার দিলাম আমি৷

এবার অন্ধকার ঠেলে সামনে এগিয়ে এল সে৷ পরনের শাড়িতে রক্তের ছিটে৷

—‘কেন? কেন? কেন করলি এটা বল?’ তীব্র আস্ফালন আর আর্তনাদ মিশে কেমন যেন একটা স্বর বেরোল আমার গলা চিরে৷

ততক্ষণে অনেকেই চলে এসেছেন আমার পিছনে৷

—‘মা বিন্নি তো পাগলের মতো করছে এটা হবার পর থেকেই৷ আসলে ও একটু বোধ হয় অন্যদিকে গেছিল তখনই...’

না কারো কথা শুনতে পাচ্ছি না আমি৷ না আমি শুনব না৷

বিন্নি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে৷ আমি এগিয়ে গেলাম ওর দিকে৷ পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করলাম আমি বিন্নিকে৷ পাগলের মতো চড় মারছি ওকে৷

—‘দে৷ ফিরিয়ে দে আমার মিলুকে৷’

হঠাৎ শরীরে একটা অন্যরকম কিছু টের পেলাম৷ বিন্নি চেপে ধরেছে আমার হাত৷ উফফ! কী ভয়ানক সেই স্পর্শ৷ যেন অপার্থিব কোনো দানবীয় শক্তি ছুঁয়ে যাচ্ছে আমায়৷

—‘বিন্নি... ছাড়...’ বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না৷

ওর দু-চোখের মণির রং বদলে গেচে৷ কালো মণির জায়গায় দুটো আগুনের গোলা৷

—‘আমি কলজে চাই৷ মিলুর কলজে খাব আমি৷ আমার যে বহু দিনের নেশা৷’ হিসহিস করে বলল বিন্নি৷ না আমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না ওর সেই ফিসফিসে রাক্ষুসে স্বর৷

চকিতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম আমি৷ তার মানে ওই মেরেছে আমার মেয়েটাকে৷ একদম ঠিক বলত মিলু৷ শুধু আমি বুঝতে পারিনি৷ আমার ভুলের জন্যই আমার মেয়েটা...

মুহূর্তের মাঝে ঘটে গেল কাণ্ডটা৷ আমি দুরন্তগতিতে টেবিল থেকে উঠিয়ে নিলাম সদ্য কিনে আনা চকচকে ফল কাটার ছুরিটা আর নিজের শরীরের সব শক্তি সহযোগে ঢুকিয়ে দিলাম সেটা বিন্নির পেটের ভিতর৷

—‘আআ’... তীব্র আর্তনাদ করে বিন্নি লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে৷

—‘একী করলে তুমি? একী? একী?’ অনেকগুলো গলার স্বর৷ আর সেই স্বরগুলো ছাপিয়েও শুনতে পেলাম পুলিশের গাড়ির সাইরেন৷

আমার বিচার চলছে৷ আমি তো খুন করেছি তাই৷ আমার মেয়ে মিলু নাকি অসাবধানতাবশে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে৷ অন্তত ডাক্তারি রিপোর্ট তাই বলছে৷

আর আমি নাকি হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে বাড়ির গরিব কাজের মেয়েকে সবার সামনে খুন করেছি৷

মিলুর কলজে খাওয়ার কথাটা, যেটা বিন্নি বলেছিল সেটা নাকি আমি ছাড়া কেউ শোনেনি৷ সবাই বলছে আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছি৷ তাই হয় কে নয় আর নয়কে হয় করছি৷

এমনকী কেয়াও নাকি তাই বলেছে৷ সেও বলেছে মিলুর পাওয়া শেষ কয়দিনের ভয় আর মিলুর মৃত্যু সব মিলিয়ে নাকি আমি পাগল হয়ে গেছি৷

আমার মানসিক চিকিৎসাও চলছে৷ জানি না আমার কি হবে? হয়তো ফাঁসি হবে৷ কিংবা হয়তো জেল৷ কিংবা হয়তো উন্মাদাশ্রমে জায়গা হবে আমার৷

কিন্তু না৷ আমি পাগল নই৷ বিশ্বাস করুন আমি পাগল নই৷ কলজে খাকি বেগমের গল্প শেষ হয়নি৷ সত্যি আজও বেঁচে আছে তার শতাব্দী প্রাচীন কলজের নেশা৷ সেই এসেছিল বিন্নির রূপ ধরে আমার স্থির বিশ্বাস৷

কিন্তু না আমি জানি কেউ মানবে না একথা৷ সবাই আমায় পাগল প্রমান করেই ছাড়বে৷ এটাই তো আমরা৷ কেউ অলৌকিককে মানি না, শুধু বড়ো বড়ো বুলি কপচাই বিজ্ঞানের ধব্জা তুলে৷ আমিও তো সেদিন মানিনি মিলুর কথা৷ মানলে তো আজ আমার মেয়েটাও থাকত বেঁচে৷ তাই মাঝে মাঝে মানতে হয়৷ মাঝে মাঝে বুঝতে হয়৷ বিশ্বাস করতেই হয় লৌকিকের মাঝেই লুকিয়ে থাকে অলৌকিক৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%