পল্লবী সেনগুপ্ত
একটা মৃত্যু আর কিছু প্রশ্ন
সাদা চাদরে মুড়ে রয়েছে মৃতদেহটা৷ মিসেস বসাক যে হঠাৎ এভাবে চলে যাবেন কেউ ভাবেনি৷ খুব সুস্থ সবল ছিলেন বলেই তো মনে হত ওনাকে৷ পুরো পাড়া উপচে পড়ছে যেন৷ মিস্টার বসাক বসে আছেন পাথরের মূর্তির মতো৷ পাশে শুয়েও বুঝতে পারলেন না কখন ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে চলে গেল সাতাশ বছরের সাথী৷
উথাল পাথাল করছে মিস্টার বসাকের ভিতরটা৷ অনেক প্রশ্ন... সেগুলোর উত্তর মিলছে না যে৷
ডাক্তাররা বলেছেন গভীর রাতে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক৷ ডেথ সার্টিফিকেটেও তাই লেখা আছে৷ কিন্তু ওর তো হার্টের অসুখ ছিল না৷
আর তাই যদি হবে তাহলে কী মানে ওই চিরকুটটার? যেটা ওর বালিশের নীচে রাখা ছিল৷ ওরই হাতের লেখা, স্বামীকে লেখা শেষ চিরকুট৷
‘তুমি ওদের দেখো৷ সামলে রেখো আমার সংসার৷ আমায় যেতে হবে এবার৷ নইলে যে সব শেষ হয়ে যাবে এখানে৷ এবার যে আমার প্রায়শ্চিত্ত করার পালা৷’
কীসের প্রায়শ্চিত্ত? কোন পাপবোধে ভুগত ও? ছাবিবশ বছর আগের সেই ব্যাপারটা কি? মারা যাবার আগে কেন লিখল এমন চিরকুট? ও কি বুঝতে পারছিল যে সময় আসন্ন নাকি অন্য কিছু?
অনেক রহস্য... অনেক প্রশ্ন...
না, মিস্টার বসাক বুঝতে পারছেন না সবটা৷ জীবনে প্রথমবার ওর মনে হচ্ছে সত্যি বোধ হয় যুক্তি দিয়ে সব সময় বোঝা যায় না সবটুকু৷
—‘নীহার, দাঁড়াতে বলেছি কিন্তু আমি তোকে৷ শোন, শুনে যা বলছি’... চিৎকার করল এবার রিভু৷ কিন্তু নীহারের যেন কোন হেলদোলই নেই৷ গটগট করে হেঁটে চলেছে হাতিবাগানের ফুটপাথ দিয়ে৷
এবার হনহন পা চালাল রিভু৷ প্রায় ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল নীহারকে৷
—‘কী ব্যাপার? তোকে থামতে বলছি না?’ খপ করে নীহারের হাত ধরে ফেলে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল রিভু৷
—‘কী হবে কী থেমে? তোকে তো সাফ বললাম যে আমি আর তোর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না৷ তোর মতো নীচ মনের আর সন্দেহ প্রবণ অসুস্থ মানসিকতার ছেলের সাথে আমি কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না৷ আমি ঋষিকে ভালোবাসি৷’ ঝাঁঝাল স্বরে নিজের কথা শেষ করেই আবার এগিয়ে গেল নীহার৷ আর সাথে সাথেই মাথায় যেন ছলাৎ করে রক্ত উঠে গেল রিভুর৷
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েই ও মাঝ রাস্তায় ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল নীহারের গালে৷
—‘ঋষিই’ একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল এবার নীহার৷ উফ! কি তীব্র শিরশিরানি সেই চিৎকারে৷ পলকেই মাথার মধ্যে কেমন ঝিমঝিম করে উঠল রিভুর৷
মুহূর্তের মাঝেই দপ দপ করতে শুরু করল রাস্তার সব কটা আলো৷ আর হঠাৎই কেমন যেন বেবাক ফাঁকা হয়ে গেল মহানগরীর রাস্তা৷ আর ঠিক সেই মূহূর্তেই শিষ দিতে দিতে উল্টো দিকের রাস্তা থেকে হঠাৎ সামনে প্রতীয়মান হয়ে উঠল একটা ছায়া মূর্তি৷
রিভু ঠিক বুঝতে পারল না ও ঠিক দেখছে কিনা৷ কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্তই লাগল ওর সবটা বুঝতে৷ ছায়া মূর্তিটা স্পষ্ট ভাবে এবার এগিয়ে এল৷ সারা শরীর তার কালো পোশাকে ঢাকা৷ মুখেরও বেশির ভাগটাই ঢেকে রয়েছে চওড়া কালো হ্যাট এ৷ কিন্তু মুখ ভালো না দেখতে পেলেও রিভু জানে কে আছে ওই কালো টুপির আড়ালে৷ ওই মুখ যে ওর ভীষণ চেনা৷ সেই কোনকাল থেকেই তো রিভু দেখে আসছে ওই মুখ৷ ঠিক নিজের আয়নার ওপারে৷ হ্যাঁ রিভু জানে ঋষি আর কেউ নয়৷ সে রিভুরই ক্লোন৷ সে নিমেষে বাড়িয়ে দিল রিভুর দিকে নিজের রোমশ কালো হাত৷

সেই বিকট হাত দিয়েই এবার সে চেপে ধরল রিভুর গলা৷ দম বন্ধ হয়ে আসছে রিভুর৷
—‘আআআ... আর্তনাদ ছিটকে এল রিভুর গলা চিরে৷ ছটফট করছে ও মরণযন্ত্রণায়৷ কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্ত৷ তারপরই থেমে গেল সব ছটফটানি৷ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল রিভুর প্রাণহীন দেহটা৷
আবার শিষ দিতে শুরু করল সেই মূর্তি৷ নীহার এসে এবার জড়িয়ে ধরল লোকটার হাত৷ নিজের কালো পোশাক আর হ্যাট সে ছুঁড়ে ফেলল রিভুর মৃতদেহের পাশে৷ নির্মম ভাবে খুলে নিল রিভুর মৃতদেহের পোশাক৷
রিভুর পোশাক গায়ে চড়িয়ে নিমেষেই সে হয়ে উঠল রিভু৷ আবার স্বাভাবিক ভাবে জ্বলে উঠল মহানগরীর আলো৷ আবার কলরবে মুখরিত হল ব্যস্ত রাস্তাটা৷
রিভুর পোশাক পরে আততায়ী এবার একেবারে স্বয়ং রিভু৷ সেই চোখ, সেই মুখ, সেই হাঁটা চলা৷ বিন্দু মাত্রও পার্থক্য নেই৷ নীহারের হাত ধরে কলকাতার রাস্তায় হেঁটে চলেছে সে গুনগুন করে হিন্দি গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে৷
ধড়মড় করে জেগে উঠে বিছানায় উঠে বসল রিভু৷ উফফফ! আবার সেই বীভৎস স্বপ্নটা৷ আজ সকাল থেকেই জ্বর এসেছে ওর৷ তাই অফিস যায়নি৷ খাওয়া দাওয়া সেরে তাই শুয়ে পড়েছিল একটু৷ আর ঘুম চোখে আসতেই আবার সেই বীভৎস স্বপ্ন৷
বিছানায় কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল পাথরের মতো বসে থাকল ও৷ ঘরটা অন্ধকার ঘুটঘুট করছে, তার মানে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷
আলো জ্বালাবার জন্য সুইচ টিপল রিভু৷ না, আলো জ্বলল না৷ আবার আতঙ্কের দলা কাবু করছে রিভুকে৷ কেন আলো জ্বলছে না? তার মানে কি পাওয়ার কাট?
অস্থির লাগছে রিভুর৷ ঘামে ভিজে যাচ্ছে টি-শার্ট৷ কেমন একটা ঝিমঝিমে ভাব নিয়ে প্রায় টলতে টলতে ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল৷ একটা ভুতুড়ে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে চারিদিক৷ লোডশেডিং কাবু করেছে গোটা পাড়াটাকে৷
উদ্ভ্রান্তের মতো চোখ ঘোরাচ্ছিল রিভু এদিক ওদিক৷ হঠাৎ কেমন যেন চলকে উঠল রক্তটা৷
অন্ধকারের মধ্যে কোণার ল্যাম্প পোস্টে হেলান দিয়ে কে দাঁড়িয়ে আছে ওটা? তার জ্বলন্ত দৃষ্টিটা তো রিভুর দিকেই৷ হাতের সিগারের লাল আগুনটা যেন এক নরকের আত্মার চাহনি৷
হ্যাঁ সেই তো ওটা... হুবুবু একটা রিভু৷ তার মানে ঋষি৷
সারা শরীরে একটা অন্যরকম জোর কোথা থেকে যেন হঠাৎ টের পাচ্ছে রিভু৷
পাগলের মতো দুদ্দাড় করে ক্ষিপ্র গতিতে দৌড় লাগাল ও রাস্তার দিকে৷
—‘রিভু দাদা, রিভু দাদা... কী হল? কোথায় চললেন এভাবে?’ নাধু দা মানে বাড়ির কাজের লোকটার সবটুকু প্রতিরোধকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাগলের গতিতে ছুটতে ছুটতে রিভু নেমে এল রাস্তায়৷
আজ ও মেরেই ফেলবে ঋষিকে৷ তার পর যা হয় হবে৷ অফিস যাবার পথে, পাব-এ যাবার পথে, বাড়ির ব্যালকনির বাইরের সব জায়গায় পাগলের মতো ফলো করে চলেছে এই লোকটা রিভুকে তা প্রায় মাস তিনেক হল৷ চেহারাটা তো হুবহু রিভুর মতো৷ কিন্তু কে এ? কোথা থেকে এল? কেন এ ক্রমাগত শাসিয়ে চলেছে রিভুকে এভাবে? মুখে শুধু একটাই কথা—
—‘তোর জন্য সব হারিয়েছি আমি৷ আর এবার আমার কেড়ে নেবার পালা৷ তোর সব থেকে প্রিয় জিনিসটা কেড়ে নেব৷’
কোথা থেকে এসেছে, কেনই বা এভাবে শাসাচ্ছে রিভুকে সে বিষয়ে কিচ্ছু জানে না রিভু৷ শুধু জানে ওর নাম ঋষি৷ তবে রিভু বুঝতে পারছে কাকে কেড়ে নেবার কথা বলছে ও৷ ও নীহারের কথা বলছে৷ আচ্ছা এ কি তবে নীহারের কোনো প্রেমিক? কিন্তু তবে রিভুর মতো দেখতে কেন হুবহু? উফফ! কী হচ্ছে কী এগুলো?
অন্ধকার রাস্তায় এসেই ক্ষিপ্র গতিতে ঋষির শার্টের কলার খামচে ধরল রিভু৷
—‘শালা, কী চাস তুই? কেন? কেন এভাবে নরক করে তুলেছিস আমার জীবনটাকে? কি সমস্যা তোর?’
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে একটা সজোরে ধাক্কা মারল সে রিভুকে৷ টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে পড়ল রিভু আর অমনি একটা ক্রুর নোংরা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে৷
কি বীভৎস সেই হাসি৷ যেন কোনো নরকের জন্তুর ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে রিভুরই নিজের মুখ আর সেই মুখই ব্যঙ্গ করছে রিভুকে৷
আস্তে আস্তে সেই মূর্তিটা এগিয়ে আসছে রিভুর দিকে নিজের সাঁড়াশির মতো হাত দুটো বাড়িয়ে৷ রিভু বুঝতে পারছে ওর মৃত্যু আসন্ন৷ ওই হাত দুটো এবার নিঙরে নেবে ওর প্রাণ বায়ু৷
—‘না... না... প্লিজ...’ ভয়ে আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলল ও৷
আর ঠিক তখনই ও বুঝতে পারল ঝলমল করে জ্বলে উঠল চারিদিকে আলো৷
মনে সাহস এনে ঝপ করে চোখ মেলল রিভু৷
নাঃ৷ সে আর কোথাও নেই৷ রিভু পড়ে রয়েছে বাড়ির থেকে অল্প দূরের ফাঁকা মাঠটায়৷
এখানে কী করে এল ও? ও তো বাড়ির জাস্ট বাইরেটায় দাঁড়িয়েই ঋষির সাথে...
প্যান্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে কোনো রকমে উঠে দাঁড়াল রিভু৷ জোরে হাঁটা লাগাল বাড়ির দিকে৷
* * *
—‘কি হয়েছিল রিভু দাদা? অমন হন হন করে কোথায় বেরোলেন গিয়ে?’ একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নাধু দা৷
কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গেল রিভু৷ নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে ঝটপট ডায়াল করল নীহারের নম্বর৷ ফোন বাজল না৷ অন্য কলে ব্যস্ত নীহার? একি? ব্যস্ত কেন? এই সময়ে কার সাথে কথা বলছে ও? এখন তো ওর অফিসে থাকার কথা৷ আজকাল কেন প্রায়ই ব্যস্ত থাকে ওর ফোন? তার মানে কি রিভুর ধারণাই ঠিক? সত্যি কি ঋষির সাথে এখন একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে নীহার? আর হয়তো নেহাত কাকতালীয় ভাবেই ঋষির চেহারাটা রিভুর মতো৷
খাটের উপর ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল রিভু৷ আর ঠিক তখনই ঝংকার তুলে বেজে উঠল ওর ফোন৷
স্ক্রিনে নীহারেরই নম্বর৷
—‘হ্যালো৷’ তেঁতো স্বরে বলল রিভু৷
—‘ফোন করছিলি কেন?’ বিরস গলা নীহারের৷
—‘কেন তোর খুব অসুবিধা হল বুঝি? প্রেমালাপের বিঘ্ন ঘটল তাই তো?’
—‘রিভু আমি তোর কোনো নোংরা কথা শুনব না তোকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি আগেই৷ আর তোকে তো বলেইছি যদি ভদ্র কথা বলতে পারিস, তবেই কথা বলবি৷ নইলে ফোন করবি না আমায়৷’
—‘সেই তো৷ এখন আমি তো অভদ্র৷ আর ভদ্র কে? তোর নতুন প্রেমিক ঋষিই শুধু ভদ্র তাই তো? যে তোর প্রেমে পাগল হয়ে সর্বক্ষণ শাসিয়ে চলেছে আমায়৷ তবে শুনে রাখ নীহার শেষমেশ তোকে ফিরতে আমার কাছেই হবে৷ কেউ জানুক বা না জানুক আমি জানি যে ওই ঋষি কোনো সাধারণ মানুষ নয়৷ এ একটা সাক্ষাৎ অপদেবতা৷’
—‘কে ঋষি? কিসের ঋষি? কোনো ঋষিকে আমি চিনি না লক্ষ বার তোকে বলেছি৷ কিন্তু তুই কেন মানছিস না জানিস তো? কারণ তুই একজন অসুস্থ মানসিকতার মানুষ৷ তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস সন্দেহ করে করে৷ কিংবা তুই শয়তান৷ খুব বড়ো শয়তান৷ যাই হোক তোর সাথে কোনো সম্পর্ক আমি রাখছি না আর রাখবও না৷ আর একদম ফোন করবি না আমায়৷’ ফোন কেটে দিল নীহার৷
কিন্তু রিভুর ভ্রূক্ষেপ নেই৷ ও চিৎকার করেই যাচ্ছে পাগলের মতো৷
—‘নীহার... নীহার আই উইল কিল ইউ৷ আই উইল কিল বোথ অফ ইউ৷ আমি কাউকে ছাড়ব না৷ কাউকে না৷’ দানোয় পাওয়া শক্তির মতো করছে রিভু৷ ঠিক যেন একটা চরম বদ্ধ পাগল৷
ভেজা চোখে দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো পোস্টারটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল রঞ্জা৷ ছবিটা পুরোনো হলেও এখনও একইরকম জীবন্ত৷ যেন মনে হচ্ছে এক্ষনি কথা বলে বা খিলখিল করে হেসে উঠবে ছবিতে ডাগর চোখে হামা দেওয়া পুঁচকে দুটো৷
যেদিন প্রথম নিজের শরীরে অন্য আর একটা প্রাণের অস্তিত্ব জানতে পেরেছিল রঞ্জা সেদিনই মা বলেছিলেন ওকে দেওয়ালে ছোটো সুন্দর বাচচার ছবি এনে লাগিয়ে রাখতে৷ কচি সুন্দর মুখ ক্রমাগত দেখতে থাকলে নাকি পেটের মধ্যে বাড়তে থাকা ছোট্ট প্রাণটাও ঠিক ওইরকমই রূপ পায়৷
এটা শোনার পর থেকেই হন্যে হয়ে খুঁজেছিল রঞ্জা নিজের পছন্দমতো ছোটো শিশুর ছবি৷ জয় কত ধরনের ছবিই না এনে দিয়েছিল ওকে৷ কিন্তু ওর পছন্দ হয়নি কোনোটাই৷ অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষমেষ ও খুঁজে পেয়েছিল এই ছবিটা৷ দেখেই দারুণ পছন্দ হয়েছিল৷ সাথে সাথে কিনে নিয়েছিল ও৷
কিন্তু মুশকিল ছিল একটাই৷ ও খুঁজছিল একটা বাচচার ছবি৷ কিন্তু এই পোস্টারটায় হুবহু এক দেখতে দুটো বাচচা৷ একই দেখতে, একই রকম হাসির আর অবিকল একই পোশাক পরা ফুটফুটে দুই নবজাতক৷ কি যে পছন্দ হয়েছিল রঞ্জার ছবিটা৷
—‘দেখিস তোর যমজ বাচচা হবে, এত্ত সারাদিন জোড়া খোকাদের ছবি দেখার ফল টের পাবি তখন৷ দুই কোলে তখন বসবে তোমার দুই জগাই মাধাই’... অনেকেই কথাটা বলেছিল রঞ্জাকে ঐ ছবিটা কিনে আনার পর৷ আর রঞ্জারও সে সব শুনে শুনে মনে হত সত্যি বোধ হয় ওর শরীরে একটা নয়, একসাথে বেড়ে উঠছে দুটো প্রাণ৷
কিন্তু না৷ যমজ সন্তান হয়নি ওর৷ একটাই ছেলে এসেছিল ওর কোল জুড়ে৷ রঞ্জার সাত রাজার ধন এক মানিক রিভু৷
কিন্তু ভগবান কেন এমন করছেন আজ ওর সাথে? রিভুই যে ওর সব কিছু৷ ছেলের মুখে এক চিলতে হাসি বেশি দেখার জন্য রঞ্জা যে সব সময় এক গলা জলে দাঁড়াতেও রাজি৷ তাহলে কোথায় হল ওর ভুলটা? কেন এভাবে ওরই চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে ওর ছেলেটা?
কী হয়ে গেল হঠাৎ, কোথা থেকে? ছোটো একটা অ্যাক্সিডেন্টই তো হয়েছিল৷ তাতেই কি মাথায় চোট পেয়ে শেষ পর্যন্ত এমন হয়ে গেল ছেলেটা? তাই কি? নাকি অন্য কিছু? রঞ্জার সেই পুরোনো পাপ এর জন্য দায়ী নয় তো? ভাবনাটা মনে আসতেই অজান্তেই কেঁপে উঠল রঞ্জা৷ আবার চোখ চলে গেল দেওয়ালে ঠাঙান পোস্টারটার দিকে৷ বুকের মধ্যে কেমন একটা আতঙ্ক যেন পাক দিচ্ছে এবার৷ নাঃ, আর ওই পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না রঞ্জা৷ নিজের মুখ দু-হাতে ঢেকে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল শিশুর মতো৷ সে তো কাঁদবেই৷ ও যে মা! কোনো মা কি পারে নিজের ছেলের এমন জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকা দেখতে? হ্যাঁ ছেলেটা এখন জীবন্ত লাশই হয়ে গেছে যেন৷ সব সময় ভয় আর আতঙ্কে ছটফট করে৷ যেন প্রতি মুহূর্তেই ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে কোনো অতৃপ্ত হাতছানি৷ চাকরিটাও চলে গেছে ছেলেটার৷ প্রেমিকাও ছেড়ে চলে গেছে ওকে৷ সব সময় এখন নিজেকে ও বন্ধ করে রাখে একটা বদ্ধ ঘরে৷ কি ভীষণ ভয় যেন ওর৷ সবসময় যেন ও পালাতে চাইছে এক বীভৎস ছায়ার থেকে৷
—‘রঞ্জা, রঞ্জা কেন এমন করছ তুমি? প্লিজ নিজেকে সামলাও৷’ জয় এসে শান্ত করার চেষ্টা করছে ওকে৷
—‘না জয় না৷ আমার জন্যেই হয়েছে সব৷ আমি ঠিকমতো খেয়াল রাখতে পারিনি ওর৷ আমি ভেবেছি আমি ভালো মা৷ কিন্তু আসলে আমি চূড়ান্ত ব্যর্থ৷ আমি বোধ হয় নিজের স্কুল আর ছাত্র ছাত্রী নিয়ে এত ব্যস্ত থেকেছি যে বুঝতেই পারিনি কোথায় ফাঁক তৈরি হচ্ছে ছেলে মানুষ করায়? বুঝতেই পারিনি কতটা মানসকি ভাবে একা হয়ে যাচ্ছে আমার ছেলেটা৷’
—‘না রঞ্জা না৷ তুমি কি করবে? কেন নিজেকে দোষি বানাচ্ছ? তুমি তো সব রকম চেষ্টা করেছ ছেলেকে ভালো রাখতে৷’
—‘না জয়৷ আমি সব কিছুর জন্য দায়ী৷ আমার পাপেই... আমার পাপ৷ আমার পাপ সবটার জন্য দায়ী৷ আমার পাপের ফসলই আজ কালো ছায়া হয়ে এসে আমার ছেলেকে... তুমি দেখ জয় ওই ছবিটার দিকে তাহলেই বুঝতে পারবে আমি ভুল বলছি না৷ সত্যি আমারই পাপের ফল ভুগছে আজ রিভু৷ তুমি দেখতে পাচ্ছ জয়? তুমি দেখতে পাচ্ছ? ভালো করে দেখ জয়, ওই ছবির একটা বাচচার মুখ কেমন হিংস্র হয়ে উঠেছে... তুমি দেখতে পাচ্ছ যে দ্বিতীয়টা কেমন আগুন ঝরা চোখ নিয়ে তাকাচ্ছে প্রথমটার দিকে...’
—‘আবার? আবার ওই কথা? এসব কি বলছ তুমি বারবার বলতো? তুমি না একজন শিক্ষিত মহিলা! তুমি এমন অশিক্ষিতের মতো কথা বল কী করে? রিভুর যা হয়েছে তা আমাদের চরম দুর্ভাগ্য, কিন্তু এতে কোনো অলৌকিক কিছু নেই তোমায় তো বলেছি বল৷ রিভুর যেটা হয়েছে সেটার নাম ‘Syndrome of Subjective Delusion’৷ এমন ক্ষেত্রে রিভুর মতোই হয়৷ যার এমন হয় তার মনে হতে তাকে যে, হুবহু তারই মতো দেখতে অপর কারোর অস্তিত্ব আছে এই পৃথিবীতে, তারই চোখের সামনে৷ আর সেই একই দেখতে মানুষটা বা তার সেই ক্লোন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে বাঁচে, এমনটাই মনে করে syndrome of subjective delusion এর কবলে পড়া মানুষরা৷ রিভু ভাবছে ঋষি নামে এমন কেউ আছে যে একদম ওরই মতো আর সে অন্য একটা আলাদ সত্ত্বা৷ রিভু ভাবছে এই কাল্পনিক ঋষি বুঝি ক্ষতি করবে ওর৷ এটা খুব জটিল মানসিক অবস্থা বা ব্যাধি বলতে পার৷ কিন্তু বিশ্বাস কর আমরা সব চেষ্টা করছি৷ ও ঠিক ভালো হয়ে যাবে৷’
—‘না না না না৷ কেন হতে যাবে এই সব কঠিন মানসিক অসুখ ওর? বল কোনো কারণ আছে? কোনো সাধারণ ঘরে এসব হয়? আমি জানি এসব হয়েছে ওর আমারই পাপের জন্য৷ ওই পাপই ফিরে এসে আজ... এসব মিথ্য বলে তুমি আমায় ভুলিয়ো না৷ আমি সব বুঝি৷’ আরও জোরে কাঁদছে এবার রঞ্জা৷
—‘মিথ্যা নয় রঞ্জা৷ সব সত্যি৷ ১৯৭৮ সালে প্রথম একজন গ্রীক বৈজ্ঞানিক এই জটিল মানসিক অবস্থার ব্যাখ্যা করেন আর তার পর...’
—‘না না না৷’ ডুকরে কাঁদছে রঞ্জা৷ কোনো যুক্তি আর বুদ্ধি কাজ করছে না ওর৷ কোনো বিজ্ঞান যেন আর মানতে পারছে না ও৷
বুকের ভেতরটা দুমরে মুচড়ে খান খান হয়ে যাচ্ছে জয়েরও৷ এসব কি দুর্যোগ নেমে এল ওর সংসারেই! ও যে আর পারছে না নিজেকে সামলে রাখতে৷ ওর মনও যে ভেঙে পড়ছে৷ কিন্তু না৷ ওকে তো শক্ত হতেই হবে৷ ভালো করতেই হবে রিভুকে৷ রিভুর মন থেকে উৎখাত করতেই হবে এই কাল্পনিক ঋষির অস্তিত্বকে৷
একটা পরিত্যক্ত আত্মার মতো একলা অন্ধকার ঘরে বসে ছিল রিভু৷ আজকাল শুধু নিজের মৃত্যু ছাড়া আর কিছু ভাবে না ও৷ সত্যি রিভু আর বাঁচতে চায় না৷ এই অর্থহীন, আতঙ্কচেরা জীবনটার সত্যি এবার শেষ হওয়া দরকার৷
হাজারবার, লক্ষবার রিভু সকলকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে নিজের কথা৷ নিজের সত্যিটা৷ কিন্তু না কেউ বিশ্বাস করেনি৷ সবাই মনে করে রিভু পাগল৷ সত্যি নাকি বাস্তবে ঋষি বলে কারোর অস্তিত্ব নেই৷ সবটাই নাকি রিভুর কল্পনা৷
কিন্তু না, রিভু কী করেই বা বোঝাবে? কী করে বোঝাবে যে ঋষি কোনো কাল্পনিক সত্তা নয়৷ ঋষি বাস্তব৷ ভীষণ ভাবে বাস্তব৷ ঋষি একটা রক্ত মাংসের জলজ্যান্ত মানুষ যে সব সময় চায় রিভুকে মেরে ফেলতে৷ হ্যাঁ এটা হতে পারে যে ঋষি কোনো নারকীয় ছায়ারই প্রতিফলন, কিন্তু ঋষি চরম ভাবে বাস্তব৷
না রিভু সত্যি জানে না কে এই ঋষি? ঠিক কি চায় এ? কেন এত রাগ রিভুর ওপরই ওর? ও কি সত্যি নীহারের প্রেমিক নাকি এ আসলে রিভুরই অস্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো কালো সত্ত্বা যে হঠাৎ করে বাইরে বেরিয়ে এসে আজ ভয় দেখাচ্ছে রিভুকেই?
নাঃ কোনো উত্তর নেই৷ ঋষিকে নিয়ে যত ভাবে ততই যেন পাগল পাগল লাগে রিভুর৷ মনে হয় এতদিনের সব যুক্তি, বুদ্ধি, বিশ্বাস, অবিশ্বাস সবটা একেবারে গুলিয়ে যাচ্ছে৷
একলা ঘরে বসে বসে রিভুর বড্ড কান্না পাচ্ছে৷ নীহারও ভুল বুঝল ওকে৷ ওকে ছেড়ে চলে গেল৷ কিন্তু না না৷ আসলে মোটেই নীহার ভুল বোঝেনি রিভুকে৷ ওকে ভুল বোঝানো হয়েছে৷ ঋষিই ভুল বুঝিয়েছে নীহারকে৷ আসলে নীহারের সাথে তো এখন ঋষিরই সম্পর্ক৷ কেউ জানুক বা না জানুক, কেউ মানুক বা না মানুক রিভু সবটা জানে৷ ঠিক বুঝতে পারে ও৷ ঋষি তো ওকে বলেইছে যে ওর সব থেকে প্রিয় জিনিসটা কেড়ে নেবে ও৷ আর নীহারের থেকে বেশি প্রিয় আর কিই বা আছে ওর জীবনে? না, এখন আর এ ঘরের বাইরে বেরোয়ই না রিভু৷ ও জানে তো ঋষি ওৎ পেতে আছে আশেপাশেই৷ একবার ওকে দেখতে পেলেই ওর টুঁটি টিপে ছিঁড়ে নেবে ওর কণ্ঠনালী৷
হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা টেনে নিল রিভু৷ না, আজকাল আর এই ফোনে কোনো ফোন আসে না৷ কোনো ম্যাসেজ ঢোকে না হোয়াটসঅ্যাপে, ফেসবুক অ্যাকাউন্টটাও পড়ে আছে প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে৷
অনেকদিন পর মোবাইল থেকে গান শুনতে ইচ্ছে করছে রিভুর৷ গান চালাল ও৷ ওর অনেক স্মৃতিবিজড়িত গান৷ আতিফ আসলামের গলায় ‘দুরি সাহি যায় না৷’ খুব পছন্দের গান এটা নীহারের৷ কয়েক কলি শুনতেই চোখ জলে ভরে উঠল৷ না, এসব সুর, তাল, ছন্দ আর ওর জন্য নয়৷ গান বন্ধ করে দিল ও৷ আইকনে আঙুল ছুঁয়ে এবার চালাল অন্য জিনিস৷ গা শিরশিরে ভূতের গল্প৷ হ্যাঁ সানডে সাসপেন্সে শোনান কয়েকটা পুরোনো ভূতের গল্প মোবাইলে ডাউনলোড করে রেখেছিল ও৷
‘কে হাসে’ বলে একটা বীভৎস গল্প হয়ে চলেছে রিভুর দুই কান জুড়ে৷ রোম খাড়া করা গল্পের মাঝে বীভৎস হাসি ছলকে ছলকে উঠছে আর রিভু যেন ভীষণ উপভোগ করছে আজ এই ভয়ের নারকীয় অনুভূতিটা৷
—‘আআআ’... বাঁচাও আমায়... আআ’ হঠাৎ গল্পের তাল কেটে গেল৷ গল্পের মাঝেই হঠাৎ একটা বীভৎস নারী কণ্ঠের চিৎকার৷ প্রথমটায় ভীষণ হতচকিত হয়ে গেল রিভু৷ আরে! কি হচ্ছে এটা? আগেও তো এই গল্পটা কয়েকবার শুনেছে ও৷ না এমন কোনো চিৎকার তো গল্পের মাঝে ছিল না৷ তবে?
কয়েক মুহূর্ত নিল রিভু যেন সবটা বুঝতে নিজের ঘোর কাটিয়ে৷ আর ঘোর কাটতেই দপ দপ করে উঠল ওর মাথার শিরা৷ বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল৷ আরে! এই মেয়েটার গলা যে ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা৷ এ তো নীহারের গলা! কিন্তু প্রি লোডেড এই গল্পের মাঝে নীহারের চিৎকার এল কী করে?
হা হা হা হা হা হা হা... একটা বীভৎস কদর্য অট্টহাসি এবার আছড়ে পড়ল রিভুর দুই কানে ইয়ারপ্লাগের মধ্যে দিয়েই৷
না এটা গল্পের অন্তর্গত হাসি নয় বুঝতে পারছে রিভু৷ কারণ যে হাসছে তার গলা খুব চেনা ওর৷ এটা রিভুর নিজেরই গলা৷
—‘রিভু... রিভু... নীহার যে শেষ রিভু৷ ও যে এই জগতের মায়া কাটিয়ে ফেলবে আজকেই৷ আর এক ঘণ্টার মধ্যেই আমি যে ওকে মেরে ফেলব রিভু...’ হা হা হা৷
—‘ইউ সোয়াইন’ বেশ কয়েকটা কাঁচা ইংরাজি গালাগাল দিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিল রিভু৷ কিন্তু পারল না৷ নিভে যাওয়া, কালো হয়ে থাকা ফোন স্ক্রিন জ্বলে উঠেছে হঠাৎ৷ আর তাতে ফুটে উঠেছে একটা বীভৎস দৃশ্য৷ ঠিক যেন কোনো হরর ফিলমের ভিডিয়ো ক্লিপিং চলছে৷
নীহারের অফিসের সামনের রাস্তার মাঝে অচেতন পড়ে রয়েছে নীহার৷ সারা শরীর ওর ভেসে যাচ্ছে রক্তে৷ আর ওর সামনেই বসে রয়েছে রিভু৷ না না রিভু নয়, ঋষি৷ নীহারের মৃতদেহ থেকে খুবলে খুবলে মাংস খাচ্ছে ঋষি৷ নিজের লকলকে জিহ্বা দিয়ে চাটছে নীহারের শরীর থেকে চুইয়ে পড়া টাটকা তাজা রক্ত৷
উফফফফ! ওয়াক ওয়াক... পর পর দু-বার বমি উঠল রিভুর৷ কিন্তু পলকেই যেন নিজের সব টুকু সংযম বুদ্ধি হারিয়ে ফেলল ও৷ না ঠিক ভুলের ভাবনা আর কাজ করছে না ওর৷ এখন শুধু একটাই লক্ষ্য৷ নীহারের কাছে এক্ষুনি যেতে হবে ওকে যেভাবেই হোক৷ এখন সবে ছয়টা৷ তার মানে নীহারের অফিস থেকে বেরোতে আরও এক ঘণ্টা বাকি৷ তার আগে যেভাবেই হোক ওকে পৌঁছে বাঁচাতেই হবে নীহারকে৷ পাগলের মতো ক্ষিপ্র গতিতে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দৌড়ে বেরোবার জন্য পা বাড়াল রিভু৷
—‘রিভু, রিভু এমন পাগলের মতো কোথায় যাচ্ছিস?’ মায়ের ডাকে সাড়া দেবার সময় এখন নেই ওর৷ শুধু কোনোমতে বলল—
—‘ঋষি আজ ওর ফাইনাল চালটা দিয়ে দিয়েছে মা৷ আমার নীহারকে মারবে বলে বেরিয়ে পড়েছে ও৷ কিন্তু আমি এটা কিছুতেই হতে দেব না৷ আমি নীহারকে বাঁচাবোই৷ আর যদি বাঁচাতে না পারি তাহলে হয়তো আমিও আর কোনোদিন ফিরব না৷’ বলেই দুদ্দাড় করে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ছেলেটা৷
—‘রিভু, রিভু এসব কী বলছিস তুই? ঋষি বলে যে কেউ নেইই আসলে’... না রঞ্জার কোনো কথা পৌঁছাল না তার ছেলের কানে৷ ততক্ষণে হাই স্পিডে গাড়ি স্টার্ট করে দিয়েছে রিভু৷ ছেলেকে থামাতে গিয়ে শাড়িতে পা বেঁধে চৌকাঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ল রঞ্জা৷ বাড়িতে আজ জয় নেই৷ চাকরটাও একটু বেরিয়েছে৷ না, আজ আর কেউ বাঁচাতে পারবে না ছেলেটাকে৷ সাক্ষাৎ মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিতেই যেন আজ পা বাড়িয়েছে ছেলেটা৷
—‘মিস্টার বসাক, মিসেস বসাকের অবস্থাটা মোটেই ভালো নয়৷ সবে পাঁচ মাস আগে ওনার সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে, এর মধ্যে হুট করে আবার প্রেগন্যান্সি... অনেক জটিলতা হতে পারে৷ এমনকী লাইফ রিস্কও’...
ডাক্তারের চেম্বার থেকে কালো মুখে বেরোল জয়৷ উদ্বিগ্ন রঞ্জা এগিয়ে গেল স্বামীর দিকে৷ ও দরজার বাইরে থেকে সবটাই শুনেছে৷
—‘জয়, আমি সবটা শুনেছি৷ আর তাই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷ আমি এবোরশান করাব৷ এই বাচচাটা আমি রাখব না৷ এটা একটা অবাঞ্ছিত প্রেগন্যান্সি৷ আমি চাই না এই বাচচাটা শুধু শুধু রাখতে গিয়ে আমাদের জীবনে অহেতুক কোনো জটিলতা তৈরি হোক৷ আমার এখন মূল লক্ষ্য আমার ছেলে রিভু আর তাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে বড়ো করে তোলা৷ তাই আমি চাই না সেই ব্যাপারে কোনো মুশকিল তৈরি হোক৷’
—‘হ্যাঁ রঞ্জা তুমি ঠিক বলছ৷ আমিও তাই চাই৷ যে ব্যাপারটার জন্য তোমার রিস্ক আছে বা রিভুকে বড়ো করে তোলার ব্যাপারে সমস্যা হতে পারে সেই ব্যাপারটা আমি চাই না৷’
হ্যাঁ ছাবিবশ বছর আগে জয় আর রঞ্জা এভাবেই নিজেদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে শেষ করেছিল একটা প্রাণ৷ কিন্তু তাকে শেষ করার পর থেকেই মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত চাপ তৈরি হয়েছিল রঞ্জার৷ প্রায় ঘুমালেই একটা স্বপ্ন আসত চোখে৷ হুবহু রিভুর মতো দেখতেই একটা বাচচা৷ আর সে বারবার এগিয়ে আসছে রঞ্জার দিকে, আর রঞ্জা নিজে কুচি কুচি করে কেটে ফেলছে তাকে৷ প্রতিবারই এই স্বপ্নটা দেখার পর ঘুম ভেঙে যেত রঞ্জার আর তারপরই ওকে চেপে বসত একটা মারাত্মক কালো ভয়৷
সেই সময়ে নানা ধরণের আতঙ্ক ভর করত ওকে৷ দেওয়ালে টাঙান ওই যমজ বাচচার পোস্টারটার দিকেও কেন যেন তাকাতে পারত না ও৷ মনে হত ওই পোস্টারের একটা বাচচা যদি রিভু হয় তাহলে আর একটা যেন ওদের অনাগত সন্তান যাকে মেরে ফেলেছে রঞ্জা৷ আর তখন বারবার মনে হত ছবির দ্বিতীয় বাচচাটা যেন আগুন ধরা চোখে দেখছে ওকে৷ ও যেন বলছে—
—‘কেন? কেন মেরে ফেললে আমায়? কী দোষ ছিল আমার?’ সেই সময় অনেকবার ওই ছবিটা খুলে দেবে ভেবেছে রঞ্জা৷ কিন্তু কেন যেন পারেনি৷ যতবারই খুলতে গেছে, ততবারই কী যেন একটা অদৃশ্য শক্তি অবশ করে দিয়েছে ওর হাত৷
বেশ অনেকদিন ধরে রঞ্জার মনের এই উথাল পাতাল আর টানাপোড়েন চলেছিল৷ তারপর ঝড় স্তিমিত হয়েছিল কালের প্রভাবে৷
কিন্তু ইদানীং আবার ফিরে এসেছে রঞ্জার মনের সেই কালো ভয়৷ যবে থেকে রিভুর এই সব মানসিক সমস্যা শুরু হয়েছে তবে থেকেই যেন রঞ্জাও দেখতে পাচ্ছে এ ছবির দ্বিতীয় শিশুটার চোখে প্রতিশোধের এক অদ্ভুত আগুন৷
হঠাৎ পাগলের মতো ছবিটার সামনে ছুটে গেল রঞ্জা৷ মাথা ঠুকছে ছবিটার সামনে—
—‘বল, বল কী চাই তুই? কেন আমার রিভুকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস? কীসের এত রাগ তোর? আমার ছেলেটা এক্ষুনি পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল৷ আমি জানি এলোপাথাড়ি গাড়ি চালাবে ও৷ হয়তো আজই একটা অ্যাক্সিডেন্ট করে ও শেষ হয়ে যাবে৷ এটাই চাস তুই তাই না?’ পাগলের মতো প্রলাপ করছে রঞ্জা৷
—‘প্লিজ বাবা৷ প্লিজ ওকে ছেড়ে দে৷ আমি তো তোর অপরাধী৷ তুই আমায় টেনে নে৷ আজই টেনে নে৷ তুই আমায় শাস্তি দে৷ কিন্তু ওর ক্ষতি করিস না প্লিজ৷’ এবার বাচচা মেয়ের মতো ঝরঝর কাঁদছে রঞ্জা৷ ওর কান্নার শব্দ মিশে যাচ্ছে বাতাসের প্রতিটা অনু পরমাণুতে একটা শূন্য হাহাকারের মতো৷
বছর তিনেক পর
মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে রিভু৷ চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপ টপ৷ আজ রিভু আর নীহারের বিয়ে৷ মা থাকলে আজ কতই না খুশি হত৷
বছর তিনেক আগে একটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা যান রিভুর মা মিসেস রঞ্জা বসাক৷ আর রিভুর মনে হয় হয়তো ওর জন্যই মা এভাবে অকালে...
আসলে সেই সময় রিভুর কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল একটা ছোটো অ্যাক্সিডেন্টের পর৷ রিভু তখন নানা রকম অবাস্তব জিনিস হ্যালুসিনেট করত৷ কেমন যেন একটা কল্পনার জগতে চলে গেছিল ও৷ ওর মনে হত ওরই মতো হুবহু দেখতে কেউ যেন ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছে ওকে৷ আর সে যেন নীহারকে কেড়ে নিতে চায় ওর কাছ থেকে৷ দিনের পর দিন পাগলের মতো অবাস্তব সন্দেহের তীক্ষ্ণ ফলায় তখন ও বিদ্ধ করেছে নীহারকেও৷ কষ্ট দিত ওকে, অপমান করত ওকে বিচ্ছিরি ভাবে৷ আজ সে সব ভাবলেই অবাক লাগে রিভুর৷
এমনই একদিন বিকালে ও হ্যালুসিনেট করেছিল যে নীহারকে যেন খুন করে দিয়েছে ওর সেই ক্লোন৷ এটা দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ও সেদিন ছুটেছিল নীহারের অফিসের দিকে৷ না আসলে নীহারের কিছু হয়নি সেদিন৷ ছোটো একটা চোট লেগেছিল শুধু অফিসের বাথরুমে পড়ে গিয়ে, সেটা নীহারের অফিসে পৌঁছে জেনেছিল রিভু৷
যাই হোক নীহারের কিছু না হলেও সেদিন রাতেই মাতৃহারা হয়েছিল রিভু৷ আসলে মানসিক ভাবে অসুস্থ ছেলের হঠাৎ ওভাবে পড়িমরি করে বেরিয়ে যাওয়া, তার প্রলাপ এসব দেখে বোধ হয় বেশি টেনশন হয়ে গেছিল সেদিন মায়ের৷ আর তাই সেই রাতেই হয়তো হার্ট অ্যটাক...
কিন্তু মা চলে যাবার পর পরেই আস্তে আস্তে সুস্থ হতে শুরু করে রিভু৷ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে ও৷ চাকরি ফিরে পায়৷ নীহারও আবার ফিরে আসে ওর জীবনে৷
—‘এবার বেরিয়ে পর বাবা... নীহারের দাদা এসেছেন বর নিতে৷’ বাবার ডাকে যেন হুঁশ ফিরল রিভুর৷
—‘তুমি যাবে না বাবা?’ প্রশ্ন করল রিভু৷
—‘হুম আসছি একটু পরে...৷’
বর নিয়ে ওরা চলে যেতেই দৌড়ে শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল জয়৷
—‘রঞ্জা... রঞ্জা আজ আবার সে হিংস্র চোখে তাকাচ্ছে জান... জানি না আজ আবার কি অমঙ্গল ঘটতে চলেছে...’
হ্যাঁ রঞ্জা চলে যাবার পর থেকে জয়ও এই তিনবছরে বুঝেছে যে পোস্টারের ওই দ্বিতীয় বাচচার ছবিটা নেহাত প্রাণহীন কোনো জড় বস্তু নয়৷ জয়ও এখন বুঝতে পারে ও ছবির রং বদলায় মাঝে মাঝে, চোখের দৃষ্টিও যেন বদলায় ওই ছবির হাসিমুখের নবজাতকের৷
—‘কি চাস বল? আবার কি চাস তুই? না না৷ তুই প্লিজ আমাদের রিভুর কোনো ক্ষতি করিস না৷ ওকে ভালো থাকতে দে৷ তোর মায়ের মতো না হয় আমাকে তুই...’ ওই পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়েই পাগলের মতো বলে চলেছেন জয় বসাক৷
কিন্তু না আর বলতে পারছে না জয়৷ কথা জড়িয়ে যাচ্ছে৷ অসহ্য ব্যথা করছে বুকের বাম দিকটা৷ উফফ! যেন ভেঙে পরছে পাঁজর৷ মুখ থেকে গেঁজলা বেরোচ্ছে এবার জয়ের৷ চোখের সামনে নেমে আসছে অন্ধকার৷
—‘দাদা, দাদা... কিরে যাবি না? এই দাদা কি করছিস ভিতরে৷’ জয় শুনতে পাচ্ছে বাইরে থেকে ওকে ডাকছে ওর বোন রিমি৷
না জয়ের আর বিয়েতে যাওয়া হবে না৷ ও যে অন্য গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে৷ আস্তে আস্তে চোখ বুজে আসছে জয়ের৷ আজ ফিরবে ও রঞ্জার কাছে৷ আজ বাব মা দুজনকেই নিজের কাছে নিয়ে যাচ্ছে ওদের সেই সন্তান যাকে একদিন বিনা দোষে সরিয়ে দিয়েছিল ওরা৷ রঞ্জা আর তাকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করবে আবার জয়৷ না, রিভুর কোনো ক্ষতি আর তাকে করতে দেবে না ওরা৷ হ্যাঁ রঞ্জাকে গিয়ে আজ বলবে জয়—
—‘তোমার রিভু আজ সংসারী হল রঞ্জা৷ তুমি যেমন নিজের জীবন দিয়ে একদিন বাঁচিয়েছিলে রিভুকে, তেমনই আজ আমিও নিজের জীবন দিয়ে তাকে ছেড়ে এলাম সুখী গৃহকোণের সুরেলা পথে৷ ভালো থাক রিভু৷ শুধু এটুকুই চাওয়া আর তার জন্যই যে সব কিছু...’
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন