পল্লবী সেনগুপ্ত
—‘এইবার শুরু হচ্ছে সেকেন্ড ব্যাচের অঞ্জলি৷ যারা যারা অঞ্জলি দেবেন এইদিকে এগিয়ে এসে ঝুড়ি থেকে ফুল নিয়ে নিন প্লিজ...’ মাইক ছাড়াই বেশ গমগমে শোনাল অরণ্যের গলাটা৷ মাইক ছাড়াই মাইক ফিটিং গলা ওর৷ প্রতি বছরই তাই পাড়ার যে কোন পুজোর অঞ্জলিকালীন অ্যানাউন্সমেন্টের দায়িত্বটা ওকেই সামলে দিতে হয়৷ আর সরস্বতী পুজো তো বটেই৷ অরণ্য জন্ম থেকেই এই পাড়াতে৷ উত্তর কলকাতার এই দিকগুলোতে পাড়া কালচারটা এখনও বেশ ভালোভাবেই বিদ্যমান৷ তবে হ্যাঁ পুরোনো সব জিনিসই তো আস্তে আস্তে ভাঙনের পথে হাঁটছে পাশ্চাত্য ভাবধারার অবাধ অনুপ্রবেশে, তাই হয়তো একদিন এই ছোটো পাড়াটার সব মানুষগুলোর এই এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে থাকাটাও ইতিহাস হয়ে যাবে৷ কিন্তু অরণ্য ভাবতে চায় না সেই দিনটার কথা, ভাবতে পারে না৷ এই পাড়া, পাড়ার বন্ধুরা, একসাথে শীতকালে ক্রিকেট খেলা, পিকনিক করা, দল বেঁধে সরস্বতী পুজোর চাঁদা তোলা, প্যান্ডেল বেঁধে পুজো করা, ঠাকুর আনা, বিজয়ী সম্মিলনী, দূর্গাপূজার হইহই, কালীপূজার বাজি ফাটানো, একসাথে পাড়ার মোড়ে আড্ডা, মেয়েদের দেখে হাঁ করে ঝারি মারা সব রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে ওর৷ এগুলো বাদ দিয়ে অরণ্যর কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে নাকি! আর এখন... এখন তো এই পাড়াটাই ওর কাছে স্বর্গ, স্বপ্ন সব কিছু৷ তাকে দেখার পর থেকে অরণ্য কি ছাই আর নিজের মধ্যে আছে নাকি!
হ্যাঁ এই কয়েক মাস ধরে অরণ্যের যে কি হয়েছে সেটা ও নিজেই বুঝতে পারছে না৷ লেখাপড়ারও তেমন হনু না হলেও মেয়েদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে কোনোদিনই ওর তেমন অসুবিধা হয়নি, আর তার প্রধান কারণই ছিল ওর বেজায় সুন্দর চেহারাটা৷’ পেহেলে দর্শনধারী ফির ফি গুনবিচারি’ এই প্রবাদটা বারবার সত্যি হয়েছে অরণ্যর কাছে৷ তাই ওর বাকি বন্ধুরা মেয়েদের নিয়ে যেমন হ্যাংলাপনা করে তেমনটা ওকে কোনোদিনই করতে হয়নি৷ মেঘ না চাইতেই জল যার জন্য সব সময় মজুত তার আর চাতক হবার কিই বা প্রয়োজন আছে৷
—‘এই অরণ্য দেখ রে, কে আসছে!’ ওর নিজের ভেতর থেকেই কে যেন ছুঁড়ে দিল কথাটা আর অমনি ওর শরীরের সব কটা স্নায়ু টানটান হয়ে গেল ভরপুর উত্তেজনায়৷
হ্যাঁ সে আসছে৷ বাসন্তী রঙের শাড়ি আর কপালে লাল টিপ৷ অরণ্যর মনে হল হঠাৎ বোধ হয় পৃথিবী তার কক্ষপথে স্থির হয়ে গেছে৷ বাতাস এক জায়গায় রুদ্ধ হয়ে গেছে৷ এক অসহ্য রকম ভালো লাগায় দমটা কেমন বন্ধ হয়ে গেল অরণ্যর৷ এত সুন্দর! এত সুন্দর কী করে লাগতে পারে কোনো মেয়েকে! বসন্ত পঞ্চমীর সকালে মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতির কোল থেকে টুপ করে খসে পড়েছে সদ্য ফোটা একটা পলাশ ফুল৷
ভ্যাবলার মতো হাঁ করে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল অরণ্য৷ ভুলেই গেল সবাইকে অঞ্জলির ফুল বিতরণ করতে৷ সাক্ষাৎ বাগান যদি এসে কারো সামনে দাঁড়ায় তাহলে সে কি করে ঝুড়ি থেকে দু-চারটে কুচো ফুল বিলি করতে পারে! সে একদম অরণ্যর কাছ ঘেঁসে এসে দাঁড়াল দু-সেকেন্ডের জন্য৷ এক মুঠো ফুল তুলে নিয়ে হাতজোড় করে ডুবে গেল অঞ্জলির মন্ত্রে৷
উফফ! ওই দু-সেকেন্ডেই যদি থেমে যেত পৃথিবীটা তাহলে বুঝি অরণ্যর সবটুকু পাওয়া হয়ে যেত৷ নিয়মমাফিক মন্ত্রোচচারণে চলছে বাগদেবীর অঞ্জলি৷ আজ প্রথমবার অরণ্য সমানে একমনে ডেকেই চলেছে শ্বেতপদ্মাসনাকে৷
—‘হে মা, আজকে তোমার পুজোর এই বিশেষ দিনে আমি যেন বিফল না হই মা৷’ আসলে অরণ্য ছোটোবেলা থেকেই পড়াশুনায় খুব একটা ভালো না৷ ছবি আঁকাই ওর নেশা৷ তাইতো মা বলেন—
—‘বাবা গরিব বিধবার ঘরের শিবরাত্তিরের সলতে তুই, পড়ায় মন দে বাবা৷ ছবি এঁকে কি আর আমাদের মতো ঘরের ছেলেদের পেট চলে রে?’ কথাটা হয়তো ঠিক, তবুও কে শোনে কার কথা৷ পেটে ভাত জুটছে দু-বেলা আরামসে, বন্ধু বান্ধব নিয়ে ফুর্তির জীবন, মেয়েদের কাছেও বেশ ভালোই পাত্তা আছে নিজের কার্ত্তিক মার্কা চেহারাটার জোরে৷ ব্যস! আর কি চাই৷ কে চাপ নেয় লাইফে৷ কিন্তু কার জন্য কি যে লেখা থাকে কে আর তা বলতে পারে৷
—‘জানিস ভাই এখন যেখানে যাচ্ছি সেখানে একটা দারুণ মেয়ে এসেছে৷’
—‘মানে?’ চোখ কুঁচকে সেদিন মনোজের কথায় প্রশ্ন করেছিল অরণ্য৷
—‘মানে এখন তো আমরা সুবীর কাকুর বাড়িতে যাচ্ছি পুজোর চাঁদা নিতে৷ ওখানে একতলায় পুরোনো ভাড়াটেরা চলে গেছে৷ তার বদলে নতুন যে এসেছে তার যা একটা মেয়ে আছে না, পুরো খাসা জিনিস৷ মনে হয় মা দুগগা ফুল অ্যাটেনশন দিয়ে পিসটাকে রেডি করেছে৷’
প্রতিবারই পাড়ায় পুজোর চাঁদা নিতে বেরিয়ে বিভিন্ন বাড়ির আইবুড়ো মেয়েদের নিয়ে নানা আলোচনাই হয় ছেলেদের মধ্যে৷ কিন্তু এসব নিয়ে তেমন মাথা কোনোদিনই ঘামায় না অরণ্য৷ তাই সেদিনও মনোজের কথায় বেশি পাত্তা দেয়নি৷ কিন্তু সুবীর কাকুর ভাড়াটের বাড়িতে কলিং বেল টেপার পর সেদিন যে দরজা খুলেছিল তাকে দেখে ব্যোমকে গেছিল অরণ্য৷ ছবির বইয়ের বাইরেও যে এত সুন্দর মেয়ে থাকতে পারে তা ধারণা ছিল না ওর৷
দুধ সাদা গায়ের রং, গোলাপি ফিনফিনে ঠোঁট, সরু ভুরু, টানা চোখ আর আকাশি সালোয়ার সব মিলিয়ে সেদিন সে সুনামির মতো আছড়ে পড়েছিল অরণ্যর বুকের ভিতর৷
—‘এই কিরে তুইও...’ অরণ্যর অল্প হা হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে সেদিন বলেছিল মনোজ৷
—‘শোন ভাই, ওর বাপটা পুরো হিটলারের জাতভাই৷ আর ওর দাদাটা পুরো খলনায়ক পার্ট টু৷ তাই বলছি শুধু দেখা ছাড়া আর কিছু ভুলেও ভাবিস না৷ দেখবি যত জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি৷ তবে এ মেয়ে নিজেও বহুত সেয়ানা৷ কাউকে পাত্তা দেয় না৷’
—‘চুপ করবি তুই?’ মনোজের ফালতু ফ্যাচ ফ্যাচ এক ধমকে থামিয়ে দিলেও নিজের মনকে সেদিনের পর থেকে আর বশে করতে পারেনি অরণ্য৷
পাড়ার সব ছেলেই বলে ও নাকি খুব দেমাকি৷ ভুল করেও কোনো ছেলের দিকে একবার তাকায় না৷ কিন্তু অরণ্যর কি তাহলে সবটাই দেখার আর বোঝার ভুল? অরণ্যর সাথে যতবারই দেখা হয়েছে তার ততবারই ও খেয়াল করেছে যে মেয়েটার চোখ ছুঁয়ে যায় ওকে৷ ওর ওই গোলাপ পাপড়ি মার্কা ঠোঁটে কেমন যেন একটা হালকা মায়াবী হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায় প্রতিবার অরণ্যকে দেখার পর৷ না এসব কথা কাউকে বলতে পারেনি অরণ্য৷ কে জানে যদি সবটাই বোঝার ভুল হয়ে থাকে৷
কিন্তু গত একসপ্তাহের ব্যাপারটা? হঠাৎ গত এক সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত ব্যাপার৷ বারবার উড়ো ফোন আসছে অরণ্যদের ল্যান্ড ফোনে৷ ওপার থেকে কেউ কথা বলে না৷ চুপ থাকে৷ সে ওরা যতই হ্যালো হ্যালো করে গলা ফাটাক না কেন৷ মা তো ভারি বিরক্ত৷ কিন্তু গত পরশুদিন! ফোনটা বাজছিল অনেকক্ষণ৷ মা বাড়িতে ছিল না৷
—‘হ্যালো’ গম্ভীর স্বরে ফোন তুলেছিল অরণ্য৷ মনেই হয়েছিল নির্ঘাত ওই উড়োফোনটা৷
—‘কি শুধু ঝাড়ি মেরে মেরেই কাটিয়ে যাবে নাকি পরের স্টেপেও এগোবে?’ ফিনফিনে গলাটায় চমকে গেছিল অরণ্য৷
—‘কে? কে বলছেন?’ কেঁপে গেছিল ওর গলাটা৷
—‘সরস্বতী পুজোর দিন সন্ধ্যাবেলা, রমেনদের ফাঁকা বাড়িটার পিছনে আমি থাকব৷ ঝাড়ির পরের স্টেপে এগোতে চাইলে চলে এসো৷ একা আসবে কিন্তু৷ জানোই নিশ্চয় সরস্বতী পূজাটাই বাঙালি ছেলে-মেয়েদের ভ্যালেন্টাইন ডে৷’ কট করে কেটে গেছিল ফোনটা আর বুকে হাজার সুনামির তোলপাড় নিয়ে ধপ করে বসে পড়েছিল অরণ্য৷ গলাটা কার... কেউ কি মজা করছে ওর কোনো বন্ধুই কি? মেয়েরা ওর প্রতি বেশ মনোযোগী হয় ঠিকই তবে এভাবে ফোন! হঠাৎ মনের কোণে উঁকি দিয়েছিল সেই ভাবনাটা৷ আচ্ছা সে নয়তো? ইদানীং কালে তাকে ছাড়া আর কার দিকেই বা তাকিয়েছে অরণ্য যে ঝাড়ি মারার প্রশ্ন উঠবে৷ গোটা এক সপ্তাহ ঘুমাতে পারেনি অরণ্য৷ ফাইনালি এসেছে সেই দিন আজ৷ উফফ! কখন যে সন্ধ্যা হবে!
অঞ্জলি শেষ৷ ফুল ছিটিয়ে মণ্ডপ ছেড়ে সব বেরোচ্ছে একে একে৷ আবার! আবার তার চোখে চোখ পড়ল অরণ্যর৷ আবার সেই এক দৃষ্টি আর হাসি৷ উফফ!
—‘দাদাবাবু... পুরুত মশাই এসে গেছেন৷’ বারিনের ডাকে একলাফে বিশ বছরের পুরোনো অতীত ছিঁড়ে বাস্তবে এসে নামলেন অরণ্য বসু রায়৷
—‘হ্যাঁ আসছি বসতে বল৷’ অরণ্য বাবু একাই থাকেন৷ সঙ্গী শুধু এই বারিন৷ বিয়েটা আর করে ওঠা হয়নি৷ মা মারা যাবার পর থেকেই সেই পুরোনো ডেরা আর পাড়া ছেড়ে বাস এই নতুন ঠিকানায়৷ এখন এই আঁকার স্কুল আর এখানকার বাচচারাই অরণ্য বসু রায় এর জীবন৷ চল্লিশ ছুঁই ছুঁই অরণ্য ঘোর বাস্তববাদী আর গম্ভীর মানুষ৷ কিন্তু আজও এই সরস্বতী পূজার গন্ধটা কেমন যেন মনে কেমন করিয়ে দেয় আপাত গম্ভীর লোকটার৷ যদিও আজ কাল তো সব বড়োই মেকি, সেই আগের মতো কিছুই নেই আর৷ কিন্তু এই আঁকার স্কুলে আজও বড়ো করে সরস্বতী পূজাটা চালু রেখেছেন অরণ্য৷
প্রতিবার এই সরস্বতী পূজাটা এলেই অরণ্য যেন আবার ফিরে যান সেই পুরোনো সময়টায়৷ একটা অকৃত্রিম ভালো লাগা নিমেষের জন্য হলেও ভর করে ওকে৷ কিন্তু তারপরেই... তারপরেই ভেসে ওঠে সেই দৃশ্যটা৷
মেয়েটাকে প্রায় হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে ট্যাক্সিতে তুলছে ওর বাবা আর দাদা আর দূরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ছেলে যে বুঝতে পারছে আস্তে আস্তে অন্ধকার এবার ছেয়ে ফেলবে তার জীবন৷
রমেনদের ফাঁকা বাড়িটার পিছনে একলা দাঁড়িয়ে গোধূলির আলো গায়ে মেখে নিচ্ছিল মোহর৷ বুকের ভিতর একটু একটু ধুকপুকুনি আর অনেকটা উত্তেজনা মিশে কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর৷ কে জানে ঠিক করছে কি না ও৷ কিন্তু ও যে সত্যি বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে তাকে দূর থেকে দেখতে দেখতেই৷ কিন্তু সে এখনও আসছে না কেন? আসবে না নাকি? সবাই বলছিল আজ নাকি ওকে অসাধারণ সুন্দর লাগছে৷ মোহর জানে ও খুব সুন্দরী৷ প্রতি বছরই সরস্বতী পুজোর দিনে সাজগোজ করে ওর সেই সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ হয়৷ কিন্তু এইবার এর এই সরস্বতী পুজোর দিনটার তো ব্যাপারই আলাদা৷ তাই খুব যত্ন নিয়ে নিখুঁত ভাবে সেজেছে ও আজ৷ কিন্তু যার জন্য এত কিছু সেই যদি...
মোহরের মনটা বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে৷ উড়ে উড়ে যাচ্ছে তাকে চেনার জানার সেই শুরুর দিকের সময়টাতে৷ এই তো কয়েকমাস আগেরই কথা ছিল—
—‘মোহর, এই মোহর... মোহর...’ রিমিদি’র বাজখাঁই চিৎকারে অঙ্কের খাতা থেকে মুখ তুলল মোহর৷ রিমিদি সুবীর কাকু মানে ওদের বাড়িওয়ালার মেয়ে৷ এই বাড়িতে সবে কয়েক মাস হল এসেছে ওরা৷ আর আসতেই ওর খুব ভাব হয়ে গেছে রিমিদের সাথে, যদিও রিমিদি ওর থেকে বছর কয়েকের বড়ো৷ ওর বিয়ের কথা চলছে এখন৷
—‘কী হয়েছে রিমিদি?’
—‘আরে! তুই এখনও এখানে কী করছিস? বিজয়া সম্মিলনীর ফাংশানে যাবি না?’
—‘না রিমিদি৷ আমি গান, নাচ, আবৃত্তি কিছুই পারি না৷ তাই আমি গিয়ে কী করব বল৷ তা ছাড়া বাবা অনেক অঙ্কের টাস্ক দিয়ে গেছে৷’
—‘আরে নাচ গান পারিস না তো কি হয়েছে তুই এমনি চল৷ তা ছাড়া তুই তো সুন্দর আঁকিস তোর আঁকা দে৷’
—‘বিজয়া সম্মিলনীতে আঁকা? মানে?’
—‘আরে হ্যাঁ রে যেখানে ফাংশান হচ্ছে, তার পিছনেই ছোটো একটা জায়গা ঘিরে আমাদের অরণ্য এর আঁকার এক্সিবিশন করছে পাড়ার কাকুরা৷ অরণ্য আমাদের পাড়ার একমাত্র মাইকেল অ্যাঞ্জেলো কিনা... তা সেখানেই না হয় তুইও... চল চল দেখবি চল৷ তোর দেখতে ভালো লাগবে৷ আরে শিল্পীর কদর তো শিল্পীই বোঝে৷’
ওর হাত ধরে সেদিন হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেছিল রিমিদি৷ আসলে মোহরও আঁকতে খুব ভালোবাসে৷ লুকিয়ে লুকিয়ে আঁকেও মাঝে মাঝে৷ অদ্ভুত একটা আনন্দ হয় গোটা একটা ছবি তৈরি হয়ে যাবার পর৷ সাদা খাতার পাতায় নিজের মনের ভাবনা আর রং তুলির আঁচড়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করার আনন্দই আলাদা৷
কিন্তু বাড়িতে মা ছাড়া কেউ জানেন না ওর এই আঁকার বাতিকের কথা৷ বাবা জানলে খুব রাগ করবেন৷ এই সব অর্থহীন বিলাসিতা বাবার পছন্দ না৷
—‘উফফ! ছবিগুলো কি দারুণ গো রিমিদি৷ বিশেষ করে মডার্ন আর্ট এর থিম আর ভাবনাগুলো অসাধারণ৷ পুরো পেশাদার লেভেলের৷ এত ভালো কে আঁকে গো?’
—‘ওই তো অরণ্য৷ আমাদের পাড়ার গ্রেট শিল্পী৷’ রিমিদি সেদিন যে ছেলেটাকে আঙুল তুলে দেখিয়েছিল তাকে দেখে একটু চমকে গেছিল মোহর৷ বাদামী টি-শার্ট আর ছাই রঙের জিন্স পরা ওই ছেলেটাকে তো ও চেনে৷ এ আবার এমন আঁকতেও পারে! এই হ্যানডু মার্কা ছেলেটাই তো সেদিন ওদের বাড়িতে দুর্গা পূজার চাঁদা চাইতে গিয়ে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়েছিল৷ পুজোর প্রায় সব দিনেই মোহর লক্ষ্য করেছিল ছেলেটা নিখুঁত ভাবে ঝাড়ি মারছে ওকে৷ মোহর এমনিতে এই সব ঝারিবাজদের পাত্তা না দিলেও একে বেশ ভালোই লেগেছিল কেন কে জানে৷ বোধ হয় এই ছেলেটারই সেদিন পাড়ার মোড়ে পড়ে থাকা ওই বুড়ি ভিখারিটা বমি করছে দেখে ওকে ওষুধ খাওয়ানোর দৃশ্যটা দেখে মোহরের ভালো লেগে গেছিল৷ এই ছেলেটা আবার এত ভালো আঁকে?
সেদিনের পর থেকেই মোহরের মনটা বেশ বেয়াড়াপনা শুরু করেছিল৷ আর ও ছেলেও তো আর কম না৷ যখনি যেখানে দেখা হচ্ছে হাঁ করে মন্ত্র মুগ্ধের দৃষ্টি ছুঁড়ে দিচ্ছে মোহরের দিকে৷ এদিকে আবার তার মেয়ে বন্ধুরও শেষ নেই৷
সে তো মোহরকে কিছু বলবে না বুঝে গেছিল মোহর৷ এদিকে ওর সাথে প্রেম করার ইচ্ছাটাও আর চেপে রাখতে পারছিল না ও৷ তাই নিজেই ফন্দি বের করেছিল একটা৷ সেই ফন্দি মতোই প্রথমে ওর বাড়ির ফোন নম্বর জোগাড় করে শুধু ব্ল্যাঙ্ক কল, আর অবশেষে নিজের পরিচয় গোপন রেখে এই অভিসারের আমন্ত্রণ৷ কিন্তু সে আসবে তো?
হঠাৎ একটু চমকে উঠল মোহর৷ হ্যাঁ সে আসছে৷ এগিয়ে আসছে এদিকেই৷ মোহরের বুকের ভিতর যেন দামামা বাজছে এবার৷ ও ভীষণ রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে৷ প্রেম তো দূর, কোনোদিন কোনো ছেলের সাথে ভালো করে কথাই বলেনি; শুধু বন্ধুদের মুখে তাদের প্রেমের আর প্রেমিকদের গল্প শুনতে শুনতে নিজের মনের মানুষের ছবি সাজিয়েছে নিজেরই হূদয়ের ক্যানভাসে৷ আর সেই ছবিটাই কেমন যেন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে আজ অরণ্য বলে এই ছেলেটার সাথে৷
অরণ্য এসে থমকে দাঁড়াল এবার৷ ভেবলে যাওয়া আর হাঁ করা মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে মোহরের দিকে৷ যেন সব কথা হারিয়ে গেছে ওর৷
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মোহরই মুখ খুলল—
—‘আমায় আশা করনি বুঝি? অন্য কাউকে আশা করেছিলে? এমন কেউ যাকে খুব পছন্দ তোমার? আমায় পছন্দ নয় তাই তো?’
—‘না মানে... আসলে...’ কথা জোগাচ্ছে না ছেলেটার মুখে৷
—‘তাহলে কি? শোন আমার তোমাকে ভালো লাগে৷ সেটা বলতেই ডেকেছি আজ৷ জানি না তোমার আমায় ভালো লাগে কি না...’
—‘লাগে... আমারও তোমায় খুব ভালো লাগে মোহর৷ মানে আমি তোমায় ভালোবাসি মোহর৷’ অরণ্যর কথাটা বলার ধরনে এবার হেসে ফেলল মোহর৷ সেই দেখে যেন আর ও ঘাবড়ে গেল ছেলেটা৷
মোহর এবার ছুটে গিয়ে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অরণ্যকে৷ অরণ্যও আস্তে আস্তে আঁকড়ে ধরেছে মোহরকে৷ একটা ফিকে আলোর বাসন্তী বিকেল আর পলাশ ফুলের গন্ধ সেই সাথে একটু দূর থেকে মাইকে ভেসে আসা বাংলা ছবির গান— এই নিয়েই শুরু হয়ে গেল প্রেমটা৷ অরণ্য আর মোহরের ভালোবাসার গল্প৷
বিচ্ছিরি ক্যাঁচক্যাঁচ করে ব্রেক কষল ওলাটা৷ ঝাঁকুনিতে কেঁপে গেলেন মোহর দত্ত৷ বহু বছর পর আবার এই সরস্বতী পূজার গন্ধ স্পর্শ করছে মোহরকে৷ তাই হুড়মুড় করে অতীত মনের জানলার কাঁচ ভেঙে আছড়ে পড়ছে হূদয়ে৷ মোহর দত্ত বেঙ্গালোরেই থাকেন৷ একটা নামি কর্পোরেট কোম্পানির উচচপদে আসীন৷ একা৷ হ্যাঁ মোহর একদম একা৷ বাবার পছন্দে বিয়ে করেছিল ও৷ কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি৷ তারপর থেকে ওই কেজো শহরে কাজ নিয়ে একা থাকতেই ভালোবাসে ও৷ বাবা মা-ও আর নেই এখন৷ আর দাদা বউদির সাথে তো ওর কোনোদিনই বনে না৷ আজ বেশ অনেকগুলো বছর পর কলকাতায় এসেছে৷ রুমলি আর চিনির কথায়৷ রুমলি মোহরের বেস্ট ফ্রেন্ড সেই কলেজ থেকে আর চিনি ওর মেয়ে৷ ওরা আগে বেঙ্গালোরেই থাকত৷ সম্প্রতি ফিরেছে এখানে৷ চিনিকে ও বড্ড ভালোবাসে আর চিনিও ওকে৷ সেই চিনিরই দশ বছরের জন্মদিনে না এসে কি আর উপায় আছে মোহরের৷ তা যে যতই কাজ থাক৷ কাল জন্মদিন মেয়েটার৷ তাই আজ চিনিকে নিয়ে বেশ করে শপিং করবে ও৷ কিন্তু আজ এই সরস্বতী পূজার দিনে আবার এই কলকাতার গন্ধ আর না পেলেই বোধ হয় ভালো হত৷ হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবি, হাতে হাত চোখে চোখ উনিশ কুড়ি গুলো যে ওকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিশ বছর আগে৷ ও যে সত্যি আর মনে করতে চায় না ওই মেরুদণ্ডহীন, কাপুরুষ কীটটাকে৷ কেন যে মনটা এত অবুঝ!
এই কাপুরুষটাকেই ভালোবেসেছিল একদিন মোহর৷ ভিক্টোরিয়ার মাঠে বসে প্রথম চুমু খেয়েছিল, হাতে হাত রেখেছিল৷ ছ-ছটা মাস প্রেম করার পরেও কি মোহর নিজের হয়নি তার? না হয়নি নিশ্চয়৷ তাহলে কি সেদিন বিনা প্রতিবাদে সে মোহরকে ওভাবে হারাতে পারত? না পারত না৷ কিছু একটা করতই? মোহরের চোখের একলক্ষ আকুতিকে এভাবে নস্যাৎ করে দিতে সে পারত না সেদিন৷
—‘ম্যাডাম আ গেয়া৷’ ওলা ড্রাইভারের ডাকে আবার বাস্তবে ফিরলেন মোহর দত্ত৷ ভাড়া মিটিয়ে নেমে এলেন রাস্তায়৷ হ্যাঁ এই তো সবুজ সাথী ক্লাব৷ এর দুটো বাড়ি পরই তো বলল রুমলি৷ আসলে প্ল্যানটা মোহরেরই বানানো৷ চিনির এখানেই আঁকার স্কুল৷ আজ কি সব ফাংশান আছে এখানে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে৷ তাই চিনিকে এখান থেকে পিক করেই সোজা ও চলে যাবে শপিং এ৷ উফফ! না৷ এই বসন্ত পঞ্চমীর বাসন্তী বিকেলের বাতাসটা আর গন্ধটা নিতে পারছে না মোহর৷ এবার তাড়াতাড়ি চিনিকে পিক করে নিয়েই দৌড় লাগাতে হবে ওকে মেকি শৈত্য ঘেরা, কাঁচ ঘেরা আধুনিক শপিং মলের জঙ্গলে৷
—‘ও স্যার, চলো না যাবে না৷’ ...আবার সেই একই বায়না আরাত্রিকার৷
—‘তুই যা বাবু, আজ আমার সত্যি কাজ আছে৷ পরে না হয় অন্য দিন...’
—‘ধুর পরে অন্যদিন কি আর সিন্ডারেলা আন্টি আসবে নাকি আমার! সিন্ডারেলা আন্টি তো বেঙ্গালুরুতে থাকে৷ একা একা৷ জানো তো সিন্ডারেলা আন্টির কেউ নেই৷ খুব কষ্ট ওর৷ তাও তুমি যাবে না একবার?’ এবার মুখ ভার আরাত্রিকার৷
—‘আচ্ছা চল৷ একবার দেখা করে আসি৷’ অরণ্য এবার পা বাড়ালেন ছাত্রীর পিছু পিছু৷ আসলে এই মেয়েটাকে বড্ড ভালোবাসেন অরণ্য বসু রায়৷
নিজের ছবির দুনিয়া আর নিজের হাতে গড়া ‘জলছবি’ এই দুই নিয়েই এখন অরণ্যর জীবন৷ এই অঙ্কন একাডেমির প্রতিটা ছাত্র ছাত্রীকেই খুব ভালোবাসেন অরণ্য৷ তবুও কেউ কেউ একটু বেশি প্রিয় তো হয়েই যায়, যেমন এই আরাত্রিকা৷ নতুন ছাত্রী হলেও বড্ড মায়া পড়ে গেছে মেয়েটার ওপর৷
প্রতি বছরের মতো এবারও সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ‘জলছবি’তে বেশ কিছু অনুষ্ঠান আর খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছিলেন অরণ্য৷ এই আরাত্রিকা আজ এসে থেকেই বায়না জুড়েছে সকাল থেকে তার কোন সিন্ডারেলা আন্টি নাকি আসবে আজ তাকে নিতে, তার সাথে একবার দেখা করতেই হবে অরণ্যকে৷
সিঁড়ি দিয়ে খটখট করে নামছিলেন অরণ্য৷ শেষের স্টেপে এসে হঠাৎ কেমন স্থবির হয়ে গেল পা৷ কে দাঁড়িয়ে সামনে৷ সে! এত বছর পর আজ এখানে এভাবে...! সব গুলিয়ে যাচ্ছে অরণ্যর৷ হাঁটু দুটো কাঁপছে৷
ধাঁ করে অনেক পুরোনো কিছু দৃশ্যের কোলাজ ফুটে উঠছে চোখের সামনে৷
উনিশ বছরের অরণ্য আর তার সামনে তার স্বপ্ন৷ অরণ্য তার হাত ছুঁয়ে বসে আছে কফি হাউসে৷ উফফ! অসাধারণ অনুভূতি৷ কেমন যেন স্বপ্ন আর বাস্তবের মিশেল লাগছে সবটা৷ সত্যি তাহলে মোহর আজ শেষ পর্যন্ত অরণ্যর ক্যানভাসেরই ছবি! না বিশ্বাসই হয় না যেন মাঝে মাঝে৷
ষোল বছরের মেয়েটা অনেক কথা বলে চলেছে হাবিজাবি৷ সব মাথায় ঢুকছেও না অরণ্যর৷ ও তো শুধু ডুবে আছে ওই দীঘির মতো গভীর আর স্বচ্ছ চোখ দুটোতে৷ ও তো শুধু কয়েদ করতে চাইছে মোহরের ওর হাত ছুঁয়ে থাকা মুহূর্তটাকে নিজের হূদয়ের মধ্যে৷
—‘এই তুই মোহর না? মৃণালের বোন না তুই?’ হঠাৎ ছন্দপতন৷ ওদের টেবিলের সামনে হঠাৎ এগিয়ে এসেছে রুক্ষ আর কঠিন চেহারার দুটো ছেলে৷
মোহরের মুখ পলকে শুকিয়ে আমসি৷
—‘কে দাদা আপনারা?’ বেশ তেজ নিয়েই বলল অরণ্য৷
—‘ওরা আমার দাদার বন্ধু৷’ উত্তর এল মোহরের কাছ থেকে৷
ছেলেগুলো একটা অদ্ভুত দৃষ্টি হেনে চলে গেল এবার৷ সাথে সাথে মোহরও প্রায় ছুট লাগাল৷
—‘আমি আসি আজ৷ মনে হয় আজ আমার কপালে খুব দুঃখ আছে৷’
না অরণ্য তখনও জানত না এই মোহরের শেষ কথা ওর জন্য৷ ও তখনও জানত না পরিস্থিতি ঠিক কতটা খারাপ হতে চলেছে৷ ওর জীবনে যে অন্ধকার নামতে চলেছে সেটা সেদিন রাতে প্রথম বুঝেছিল ও৷
রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ হঠাৎ দরজার ধাক্কা৷ মা তো মারাত্মক ভয় পেয়ে গেলেন৷ দরজা খুলে অরণ্য দেখল বেশ ষণ্ডা টাইপ কয়েকটা ছেলে৷
—‘এই শোন মৃণালের বোনের সাথে একদম বেশি বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করবি না বুঝলি৷ মেরে পুরো তোর মুখের জিয়োগ্রাফি পাল্টে দেব শয়তান৷ বেশি হিরোগিরি দেখাবে কি মরবে... বুঝেছ?’
—‘একী! কে আপনারা? এভাবে কথা বলছেন কেন?’
অরণ্যর কথার উত্তর না দিয়ে গলা তুলে তারা বলল—
—‘শুনুন মাসিমা ছেলেকে সামলান৷ ভুল জায়গায় হাত দিয়েছে এবার৷ মোহরের দিকে আর তাকালে ওকে আর ছবি আঁকতে হবে না, আমরাই ছবি করে আপনার দেওয়ালে টাঙিয়ে দেব ওকে৷’
যেমন হুড়মুড় করে এসেছিল ওরা, তেমনি হুড়মুড় করে চলে গেল৷
ঘরের ভিতর এসে অরণ্য দেখেছিল অপমান আর আতঙ্কে কালো হয়ে গেছে মায়ের মুখ৷ সেদিন আর একটাও কথা বলেনি মা৷ সোজা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷
অরণ্যও নিজের বিছানায় শুয়ে খানিকক্ষণ ছটফট করে ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়৷
—‘অরণ্যদা, অরণ্যদা সর্বনাশ হয়ে গেছে জান৷’ ভোর হতেই ঘুম ভেঙেছিল পাড়াতুতো ভাই সমীরের ডাকে৷
ধড়মড় করে উঠে বসেছিল অরণ্য৷
—‘কী হয়েছে বল?’
—জানো মোহরদি-কে জোর করে ওর বাবা আর দাদা অনেক দূরে ওর পিসির বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে৷ তুমি শিগগির চল৷ কিছু একটা কর৷ মোহরদি পাগলের মতো কাঁদছে৷’
—‘হ্যাঁ এখুনি চল৷’ বেরোচ্ছিল অরণ্য৷
—‘শুনে যা...’ মায়ের গম্ভীর গলায় বেরোতে গিয়েই থমকে গেছিল অরণ্য৷
—‘যদি তুই মোহরকে আটকাতে একটা কিচ্ছু করিস তাহলে জানবি মরা মুখ দেখবি তুই আমার৷ শেষ করে দেব আমি নিজেকে যদি আর কোনো ঝামেলায় নিজেকে জড়াস তুই৷’
—‘মা একী বলছ তুমি?’ আর্তির মতো করে বলেছিল অরণ্য৷ কিন্তু মা ততক্ষণে ঘরে ঢুকে দরজা আবার বন্ধ করে দিয়েছে৷
অরণ্য ঘর থেকে বেরিয়েছিল ধীর পায়ে৷ মোহরদের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখেছিল হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে ওকে ট্যাক্সিতে তুলছে ওর বাবা আর দাদা৷ অঝোরে কাঁদছে মেয়েটা৷ অরণ্যকে দেখেই চিকচিক করে উঠেছিল ওর চোখ, একটুকরো ভরসার আশায়৷
কিন্তু না৷ ও তো সেদিন দেখতেই পায়নি অরণ্য বাঁধা ছিল অদৃশ্য শেকলে৷ তাই অরণ্যর চোখের সামনে থেকেই সেদিন চিরতরে হারিয়ে গেছিল মোহর৷
—‘স্যার এটাই আমার সিন্ডারেলা আন্টি৷’ আরাত্রিকার ডাকে আবার ফিরল অরণ্য থেকে অরণ্য বসু রায়৷
এই তাহলে আরাত্রিকার সিন্ডারেলা আন্টি, যে একা আর খুব দুখী৷ কিন্তু কেন? কে দুঃখ দিতে পারল এমন সোনার প্রতিমাকে৷ বয়সের ভারে অল্প স্থুল আর চুলে দু-একটা রুপালী রেখা লেগেছে বটে, কিন্তু এখনও যে কোনো লোকেরই চোখ ফেরানো দায় হবে৷ সিন্ডারেলা! একদম ঠিক নাম দিয়েছে ওর আরাত্রিকা৷ সত্যি যেন রূপকথার গল্প থেকে উঠে আছড়ে পড়েছিল সে অরণ্যর জীবনে৷
তার চোখে কি জল চিকচিক করছে? নাকি অরণ্যর দেখার ভুল এটা?
—‘মোহর... মোহর... তুমি? মানে আমি...’ সব কথা হারিয়ে গেছে অরণ্যর? ঠিক বিশ বছর আগের এমনই একটা সরস্বতী পূজার বিকেলে যেভাবে সব কথা হারিয়ে ফেলেছিল অরণ্য৷
মোহর বোধ হয় এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না নিজেকে৷ কোনোভাবে কান্না চাপছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷
—‘কেমন আছ? বউ বাচচা নিয়ে বেশ সুখে আছ তাই না?’
—‘না৷ সুখ কি করে পাব বল৷ সুখ তো বিশ বছর আগেই আমায় ছেড়ে চলে গেছিল আর আমি তাকে আটকাতেও পারিনি অদৃশ্য এক শেকলে আটকা পরে৷ যাক সে কথা, আমি জানি তুমি আমায় ঘেন্না কর৷ আমায় মেরুদণ্ডহীন ভাব৷ আমি হয়তো সত্যি তাই৷ সেই জন্যই তো আজও একা বসে প্রতিটি রাতে শুধু নিজের মনকে খুঁড়ি আর বারবার হতাশায় আছড়ে পড়ি৷ কিন্তু তবুও আমি... মানে আমি...’ গলা বুজে গেছে এবার অরণ্যর৷
মোহরের চোখের সামনে ফুটে উঠছে আস্তে আস্তে একটা মুখ৷ বিশ বছর ধরে ওর মনে বারবার উঁকি মারা একটা মুখ, যে মুখটা অযত্নে, হতাশায় আজ পুরোপুরি বিধ্বস্ত৷
—‘ভেতরে আসবে না? আমার ঘরে লক্ষ্মী এসে ধরা না দিলেও সরস্বতীকে এনে পূজা করি প্রতিবছর৷’ অরণ্য বলল কাঁপা গলায়৷
আরাত্রিকা মানে চিনি খুব অবাক হয়ে দেখছে দুজনের দিকে৷
—‘চল৷’ ছোটো করে বলল মোহর৷ কিন্তু ঢুকতে গিয়েই চৌকাঠে আটকে গেল পা-টা৷ আসলে শাড়ি পরার অভ্যাসটা চলে গেছে তো৷ পড়েই যাচ্ছিল মোহর৷ কিন্তু তক্ষুনি... তক্ষুনি এসে হাত ধরে ওকে সামলে নিল ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই ছেঁড়া পাতাটা, যে পাতাটায় লেখা ছিল মোহরের প্রেমের গল্পটার শেষ লাইনগুলো৷ আস্তে আস্তে কোথা থেকে যেন ঢুকে পড়ছে নাম না জানা ফুলের গন্ধ৷ কেমন যেন বসন্ত বাতাস এর অস্তিত্ব টের পাচ্ছে প্রাণের ভেতর মোহর৷ আর অরণ্য? অরণ্য বুঝতে পারছে হ্যাঁ বসন্ত পঞ্চমীটাই বাঙালির সত্যিকারের ভ্যালেন্টাইন ডে৷ ভালোবাসাকে নিজের করে পাবার দিন৷ ভালোবাসার তো কোনো বয়স হয় না, সময় হয় না৷ ভালোবাসা তার নিজের নিয়মেই চিরসবুজ৷ তাই আজ আবার ওদের বাসন্তী রঙে রঙিন হবার দিন৷ পুরোনো রং-কে ফিরে পেয়ে সেজে ওঠার দিন৷
অরণ্য দেখতে পাচ্ছে ওর মনের ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে একটা ছবি৷ পলাশ রঙের শাড়ি পরে একটা মেয়ে আর হলুদ পাঞ্জাবি পরা একটা ছেলে বসে রয়েছে একে অপরের হাত ছুঁয়ে৷ তাদের চুলে রূপালী রেখা, কিন্তু হূদয় জুড়ে অনন্ত সবুজের ছড়াছড়ি৷
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন