হিয়ার প্রেম

পল্লবী সেনগুপ্ত

প্রতীমের শোবার ঘরে ঢুকেই ওর বুকে আছড়ে পড়ল নিশা৷ পাগলের মতো নিজের ঠোঁট আর নাক ঘষতে শুরু করল প্রতীমের বুকে আর মুখে৷ উফফ! কী শান্তি৷ ফাইনালি প্রতীম এখন পুরোপুরি ওর জিম্মায়৷ প্রতীমও সাংঘাতিক ভাবে নিজেকে মিশিয়ে দিচ্ছে নিশার মধ্যে৷ হ্যাঁ, এই মুহূর্তটার স্বপ্নই তো চাকরিতে জয়েন করার সেই প্রথমদিন থেকে দেখ এসেছিল নিশা৷ ওই ঘ্যান ঘ্যানে জঘন্য মেয়েটার কবল থেকে ছাড়িয়ে প্রতীমকে পুরোপুরি নিজের করে নেবে ও৷ আর আজ সেটা ও সত্যি করেছে৷ ইশশ! খুব গর্ব ছিল ওই মেয়ের৷ প্রতীম নাকি ওর ছোটোবেলাকার প্রেম৷ ওরকম অনেক ছোটোবেলার প্রেম দেখা আছে নিশার! প্রতীম-এর মতো স্মার্ট ছেলে, যে কিনা ওর বস আর যাকে পটিয়ে বিয়ে করতে পারলে তরতর করে নিশার কেরিয়ার গ্রাফ মই বেয়ে উঠবে, তাকে কি কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যায়৷

টিং টং৷ হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল প্রতীমের ফ্ল্যাটের৷ ইশশ! এই সব সময়ে এভাবে ছন্দপতনের কোনো মানে হয়!

—‘উফফ! কে আবার এল এই সময়? আজ তো সানডে৷’ বিরক্ত মুখে বলল প্রতীম৷

—‘তুমি বস৷ আমি দেখছি৷’ গায়ে হাউস কোট চড়াতে চড়াতে জবাব দিল নিশা৷

দরজা খুলতেই একরাশ বিরক্তি আর খারাপ লাগা এসে ঝাপটা মারল ওকে৷

—‘কী ব্যাপার তুমি এখানে?’ খুব কড়া গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল নিশা আগত অতিথির দিকে৷

—‘কে এসেছে নিশা?’ ভিতর থেকেই হাঁক ছাড়ল প্রতীম৷

—‘তোমার প্রাক্তনী৷’ মুখ বিকৃত করে ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে জবাব দিল নিশা৷

ইতিমধ্যে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েই গেছে প্রতীম৷ এসেই প্রায় হুংকার দিয়ে উঠল ও৷

—‘আবার? আবার এসেছ তুমি? নির্লজ্জ বেহায়া৷ তোমায় এত করে বলেছি না একদম বিরক্ত করবে না আর তুমি আমায়৷ তাও আবার এসেছ? বেরোও৷ বেরিয়ে যাও বলছি৷’

—‘প্লিজ প্রতীম৷ প্লিজ এভাবে বোলো না৷ আমি তোমায় ছাড়া কীভাবে বাঁচব বল৷ তুমি তো জানো তোমায় আমি কতটা...৷ আমার পৃথিবীর সবটুকু জুড়ে রয়েছ তুমি৷ প্লিজ এভাবে আমায় নিঃস্ব করে দিও না৷ তুমি জানো আমি গত সাত রাত দু-চোখের পাতা এক করিনি৷ তুমি জানো, আমি কি ভীষণ মানসিক অশান্তিতে আছি৷ আমার মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাব৷ প্লিজ তুমি আমার কাছে ফিরে এসো৷ আমি কথা দিচ্ছি তুমি যা বলবে আমি তাই করব৷ সব কথা শুনব তোমার৷’ এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল প্রতীমের প্রাক্তনী৷

—‘দেখো বোকার মতো কথা বোলো না৷ আমি তোমাকে আগেও বলেছি, আবারও বলছি এই সম্পর্কটা আমি আর রাখব না কারণ আমি আর এটা থেকে কোনো এক্সাইটমেন্ট পাচ্ছি না৷ তুমি মেনে নাও সেটা৷ মেনে তো তোমাকে নিতেই হবে৷ তুমি নিজেও শান্তিতে বাঁচ৷ আর আমাকেও শান্তি দাও৷ আর আমি তো যতদূর শুনেছি তোমায় কাছে পেতে চায় এমন কোন নতুন মানুষেরও আবির্ভাব হয়েছে তাই না? প্লিজ তুমি যাও না সেখানে৷’ এবার আগের থেকে একটু সুর নরম করে বলল প্রতীম৷

—‘উফফ! প্রতীম প্লিজ৷ এই মেয়েটাকে প্লিজ ভাগাও৷ আমি আর নিতে পারছি না এই সব নাটক৷’ রুক্ষ স্বরে কথাগুলো ভাসিয়ে দিয়ে দুপদাপ করে ভিতরে চলে গেল নিশা৷ মেজাজ দেখিয়ে দুম করে বন্ধ করে দিল শোবার ঘরের দরজা৷

—‘এই তুমি যাও তো এবার৷’ আবার হুংকার ছাড়ল প্রতীম৷

—‘না প্রতীম না এত সহজে তো নয়৷’ এবার দাঁতে দাঁত ঘষে হিসহিসিয়ে উঠল মেয়েটা৷

—‘আমার সাথে বিগত বারো বছর প্রেম করে আজ যেই শখ মিটে গেল অমনি ফেলে দেবে আমায়? না এত সহজে আমি তো ছাড়ার পাত্রী নই প্রতীম দেব৷’

—‘তো কি করবে তু...’ প্রতীম নিজের কথাটা শেষ করতে পারল না৷ কারণ তার আগেই ও দেখতে পেয়ে গেল ওর প্রাক্তনীর হাতে ঝলসে উঠেছে চকচকে একটা ধারালো ফলার ছুরি৷ প্রতীম কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা বিদ্যুৎ বেগে সেই ছুরি তাক করে দৌড়ে এল প্রতীমের দিকে৷

‘আ আ আ আ...’ তীব্র আর্তনাদ রবিবারের সন্ধ্যার নির্জন ফ্ল্যাটের সমস্ত নৈঃশব্দকে খান খান করে দিল মুহূর্তের মাঝে৷ গোটা ফ্ল্যাটের সারা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল আর্তনাদ আর গোঙানির বিষাক্ত গন্ধ৷

চোখটা হালকা লেগে গেছিল হিয়ার৷ কিন্তু একটা দুঃস্বপ্ন এসে ছিঁড়ে খুঁড়ে দিল হিয়ার সেই তন্দ্রা৷ ধড়মড় করে জেগে বিছানায় উঠে বসল ও৷ অন্ধকার ঘর আবছা রাত বাতির আলোয় মাখামাখি৷ হিয়া বিছানায় একা৷ দীপ্ত পাশে নেই৷ বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল হিয়ার৷ পর মুহূর্তেই দু-চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু-ফোঁটা জল৷ না, এভাবে নিজের সবটুকু নিজের চোখের সামনে ও শেষ হয়ে যেতে দেবে না৷ শোবার ঘর সংলগ্ন ব্যালকনিতে এবার চোখ রাখল হিয়া৷ হ্যাঁ ও যা ভেবেছে ঠিক তাই৷ দীপ্ত ওখানেই৷ কানে ফোন চেপে গভীর আলাপে মগ্ন৷ আসলে যে ও আলাপ কী, আর কার সাথে এখন যে সেটা আর অজানা নেই হিয়ার৷ দীপ্ত ঈশিতার সাথে কথা বলছে৷ প্রেম করছে৷ অথচ এ তো সেই দীপ্ত৷ সেই দীপ্ত যে হিয়ার মুখের এক চিলতে হাসি দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত এক সময়ে৷ এ তো সেই দীপ্ত যে হিয়ার সাথে শুধু একটিবার কথা বলার জন্য কত পাগল ছিল৷ এ তো সেই দীপ্ত যে না থাকলে হিয়া হয়তো আজ বন্ধ থাকত কোনো অন্ধ কূপের ঘুপসিতে৷ সেই সময়ে সেই ঘটনার পরে দীপ্ত যদি সেদিন সবটুকু দক্ষ হাতে না সামলাত তাহলে কি আজকের এই দিনটা, এই স্বাভাবিক জীবনটা পেত হিয়া? না পেত না৷ সেটা হিয়াও জানে৷ অথচ সেই দীপ্তই কিনা আজ প্রতারণা করছে হিয়ার সাথে! দিনের পর দিন ঠকাচ্ছে হিয়াকে একের পর এক মিথ্যা বলে, সেই মিথ্যার আড়ালে নিজের অবৈধ সম্পর্ককে চাপা দিয়ে৷ প্রথম যেদিন হিয়া টের পেল এই ব্যাপারটা হিয়া সেদিন পাগলের মতো কেঁদেছিল৷ ঠিক করেছিল নিজেকে শেষই করে ফেলবে৷ করতও হয়তো তাই, যদি না

দীপ্তর প্রতারণার আসল উদ্দেশ্যটা জেনে ফেলত ও৷ দীপ্ত তো আসলে দীপ্তই নয়৷

বিছানা থেকে পা টিপে টিপে নামল হিয়া৷ ব্যালকনির দরজাটা হালকা ফাঁক করে কান পাতল৷

দীপ্ত ফোনে কথা বলছে৷

—‘হ্যাঁ হ্যাঁ৷ আমি সব সামলে নেব৷ আমি আছি তো নাকি? বিশ্বাস কর আমি সব সময় পাশে আছি তোমার৷ তুমি শুধু ভরসাটা রেখ আমার প্রতি৷’ চমকে উঠল হিয়া৷ হাড় হিম করা হিমেল একটা স্রোত খেলে গেল হিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে৷ এই গলার স্বর দীপ্তর নয়৷ এ গলার স্বর অন্য কারোর৷ আর এই গলার স্বর যে ভীষণ চেনা হিয়ার৷ খুউউব চেনা৷

সে ফিরে এসেছে৷ সে প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছে৷ দীপ্তর শরীরকে ভর করেছে সে৷ প্রতি রাতে সে ফিরে আসে দীপ্তর মধ্যে৷ আবার সেই বিশ্বাসঘাতকতা৷ আবার সেই ধোঁকা৷ আবার তার না মেলা হিসাবগুলো বোধ হয় এভাবেই সে মিটিয়ে নেবে ঠিক করেছে৷ দীপ্তকে ওর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায় সে৷ তাইতো সে বেছে নিয়েছে দীপ্তর শরীরটাই৷ কিন্তু সে জানে না এবার হিয়া একা নয়৷ এবার বটবৃন্দ বাবা আছে হিয়ার সাথে৷ খবরের কাগজে প্রথম এই বটবৃন্দ বাবার ব্যাপারে জানতে পেরেছিল হিয়া৷ আগে কোনোদিন এ সব বাবা টাবায় বিশ্বাস ছিল না হিয়ার৷ কিন্তু ওই যে বলে মানুষ খারাপ সময়ে খড়কুটকেও আঁকড়ে ধরে৷ হিয়ার অবস্থাও সেদিন ছিল কতকটা সেরকমই৷ প্রথম প্রথম দীপ্তর বদলটায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল হিয়া৷ সেই সময়তেই একদিন কি যেন একটা মনে করে ছুটে গেছিল খবরের কাগজের ওই ঠিকানাটায় দীপ্তর একটা ছবি সাথে নিয়ে৷

—‘উয়ও লট আয়া হ্যায় বেটি৷ তেরি পতি কে শরীর পে আব ও অয়াপাশ আ গ্যায়া হ্যায়৷’ প্রথম যেদিন এই কথাটা শুনেছিল সেদিন তোলপাড় হয়ে গেছিল হিয়ার মধ্যে৷ সে ফিরে এসেছে৷ মৃত্যুর পরেও এভাবে ফিরে আসা যায়? মনে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের নিদারুণ টানাপোড়েন অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল ওকে৷ অবশেষে ওর চোখের সামনেই একটু একটু করে কাটল সব কুয়াশা৷ এখন তো ওর চোখের সামনেই রয়েছে পুরো স্পষ্ট ছবিটা৷ দীপ্ত প্রতিদিন একটু একটু করে আরও বেশি প্রতীম হয়ে উঠছে৷ সেই কথা বলা, সেই হাসি, সেই গলার স্বর, সেই আদপ কায়দা এমনকী সেই গায়ের গন্ধটাও৷ তিন বছর আগে মরে যাওয়া মানুষটাই যেন প্রতি মুহূর্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওর চোখের সামনে দীপ্তর ছদ্মবেশে৷ প্রতি মুহূর্তে এখন সতর্ক থাকতে হয় হিয়াকে৷ কারণ ও জানে ওর সাথে এখন দীপ্ত নয়, থাকে প্রতীম৷ প্রতীম এসেইছে হিয়াকে মেরে নিজের বদলা নিতে৷ আর তাই ফিরে এসেছে ওর প্রতারণাও৷ তবে এখন হিয়া জানে কীভাবে নিজের ঘর বাঁচাতে হবে ওকে৷ বটবৃন্দ বাবা যে পথ দেখাচ্ছেন ওকে৷ আগামী অমাবস্যাই যে সেই বিশেষ দিন যেদিন ওকে করতে হবে আসল কাজটা৷ সেদিনই তো ওই ফিরে আসা প্রতারকটার ছায়াকে শেষ করে আবার নিজের দীপ্তকে ফিরিয়ে আনবে ও নিজের কাছে, নিজের করে৷ সেই পুরোনো ছন্দে৷ বটবৃন্দ বাবার প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে ও৷

—‘হিয়া জেগে গেছে৷ আমি রাখছি৷’ ফোন রেখে দিল দীপ্ত থুড়ি প্রতীম৷ হিয়া তড়াক করে ফিরে এল বিছানায়৷

—‘একী তুমি জেগে বসে আছ৷’ কথাটা বলল দীপ্তর আড়ালে থাকা প্রতীম৷

—‘তুমি কার সাথে কথা বলছিলে?’ জিজ্ঞাসা করল হিয়া৷

—‘জানোই তো হিয়া, আমি আই টি সেক্টরে কাজ করা মানুষ৷ তাইতে আবার প্রোজেক্ট ম্যানেজার৷ রাত বিরেতে ক্লায়েন্ট কল বা বাকি টিম মেম্বারদের সাথে দরকারে কথা যে বলতেই হবে৷’

সেই এক মিথ্যা কথা৷ কি ভাবছে এই লোকটা? এভাবেই একের পর এক মিথ্যা বলে ক্রমাগত ভাবে হিয়াকে বোকা বানিয়ে ওকে মেরে ফেলাটা খুব সহজ হবে? না৷ না না না৷ এখন সবটা জেনে গেছে হিয়া৷ সবটুকু৷ হিয়া এবার হাসবার চেষ্টা করল একটু৷ লোক দেখানি মেকি একটা সহজ হাসি৷

দীপ্ত মানে দীপ্তর আড়ালে থাকা প্রতীম এসে বসল এবার হিয়ার পাশে৷ হাত রাখল হিয়ার কোমরে৷ নিজের মাথাটা গুঁজে দিতে চেষ্টা করল হিয়ার বুকে৷ চমকে উঠল হিয়া৷ বুকের রক্ত হিম হয়ে এল ওর৷ না, এ স্পর্শ ওর দীপ্তর নয় তো৷ তবে অচেনা স্পর্শও নয় যে এটা৷ এ স্পর্শ প্রতীমের৷ এবার একটা বোটকা গন্ধ পেল হিয়া৷ কীসের গন্ধ এটা? কোনো পচনশীল জৈব পদার্থ না? আর তার সাথে মিশে কীসের গন্ধ এটা? এটাই তো প্রতীমের সেই পারফিউম৷ এ গন্ধ কি কোনোদিন ভুলতে পারে হিয়া? কতবার ও নিজে হাতে গিফট করছে প্রতীমকে এই পারফিউম৷ কিন্তু দীপ্ত তো এটা মাখে না৷ তবে? তবে যে কি সেটা সত্যি আজ আর অজানা নেই হিয়ার৷

—‘কী হল হিয়া? তুমি কি রেগে আছ আমার ওপর?’ প্রশ্নটা শুনেই কেমন যেন বিবশ হয়ে এল হিয়ার সারা শরীর৷ গলার আওয়াজটা দীপ্তর নয়৷ এটা প্রতীমের৷

—‘কেন প্রতীম কেন? কেন এভাবে আমার দীপ্তকে আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছ তুমি? প্লিজ তুমি চলে যাও৷ আবার নতুন সর্বনাশ কর না আমার৷’ বলতে গিয়েও কথাগুলো বলতে পারল না হিয়া৷ ওর কথা আটকে এল৷ ওর উলটো দিকে মানুষটার চোখের মণি কালো থেকে আস্তে আস্তে সবুজ হয়ে যাচ্ছে৷

—‘নাঃ৷ না...৷’ কোনোমতে বলল ও৷ হাত পা অবশ হয়ে আসছে হিয়ার৷ কারণ ওর ঘরে ওর খাটে ওর সাথে এখন যে রয়েছে সে দীপ্ত নয়, সে প্রতীম৷ সেই মুখ, সেই হাসি৷ হ্যাঁ এটা সেই প্রতীম যাকে তিন বছর আগে নিজের হাতে খুন করেছিল হিয়া৷ মৃত্যুর পরেও শেষ হয়নি ওর প্রতিশোধ স্পৃহা৷

নিজের আতঙ্কটা যথাসম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করল হিয়া৷ না একে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না৷ তাহলেই আবার সতর্ক হয়ে যাবে এ৷ যা করার সবটা ওকে খুব সাবধানে করতে হবে আগামী অমাবস্যায়৷ প্রতীম এবার সুইচ টিপে বন্ধ করে দিল ঘরের আবছা রাতবাতিটাও৷ সারা ঘর ভেসে গেল নিকষ কালোতে৷ বুকে অসম্ভব তোলপাড় চলছে হিয়ার৷ ও যে দেখতে পাচ্ছে প্রতীমের ওই সবুজ চোখের তারায় গন গন করছে প্রতিহিংসার লেলিহান শিখা৷

ঘড়িতে ঢং ঢং করে একটা বাজতেই ঘুমটা ভেঙে গেল হিয়ার৷ উফফ! আজকেও এভাবে ঘুমিয়ে পড়তে পারল ও! নিজের ওপরই নিজের নিদারুণ রাগ হল৷ যদি ঠিক সময়ে ঘুমটা না ভাঙত! আজই যে সেই দিন৷ আজই যে হিয়ার সেই বহু প্রতীক্ষিত অমাবস্যার রাত৷ হিয়া আস্তে আস্তে উঠে বসল বিছানার ওপর৷ আজ যে ওকে পারতেই হবে৷ ওকে যে আজ পারতেই হবে আবার দীপ্তকে ফিরিয়ে আনার কাজটা করতে৷ বটবৃন্দ বাবার কথামতো কাজ সেরে ফেলতে হবে আবার৷ যথারীতি রাতবাতির অস্পষ্ট আলোতে মাখামাখি সারা ঘর৷ হিয়া এবার তাকাল বিছানার ওইপাশের লোকটার দিকে৷ আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে প্রতীম৷ মানে দীপ্তর আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রতীম৷

বিছানা থেকে এবার নেমে পড়ল হিয়া৷ সন্তর্পণে ডায়াল করল বটবৃন্দ বাবার ফোন নম্বর৷

—‘হাঁ রে বেটি৷ বোল তু...’

—‘বাবা, বাবা আমি পারব তো বাবা?’ গলা কাঁপছে এবার হিয়ার৷

—‘তুই পারবি বেটি৷ নিজের পেয়ার, নিজের পতিকে ওয়াপাশ আনার জন্য তোকে যে পারতেই হবে৷’ কেটে গেল ফোনের লাইন৷ নিজের সবটুকু সাহস একত্র করেছে এবার হিয়া, যেমনটা সেই দিনে করেছিল৷ সেই তিন বছর আগে৷ এবার আলমারি খুলে ও বের করল সেটা৷ বটবৃন্দ বাবার দেওয়া সেই মন্ত্রপুত অস্ত্র, এই অস্ত্রের দ্বারাই যে ওকে শেষ করতে হবে প্রতীমকে৷ আবার দীপ্ত ফিরে আসবে ওর কাছে সেই আগের মতো নিজস্ব ছন্দে৷

খাটের দিকে আস্তে আস্তে ধীর পায়ে এগোচ্ছে হিয়া আর ওর হাতে ঝলসে উঠছে চকচকে শান দেওয়া একটা ছুরি৷ এবার একদম কাছে ও ঘুমন্ত লোকটার৷ চোখ বুজে সপাং করে ও বসিয়ে দিল অস্ত্রটা দীপ্তর বুকে, না না প্রতীমের বুকে৷

একবার... দু-বার... তিনবার... ব্যস! শেষ প্রতীম৷ আমি পেরেছি... পেরেছি... পেরেছি... একটা পৈশাচিক নারকীয় উল্লাস খান খান করে দিল রাতের নৈঃশব্দকে৷ ছুরি হাতে জয়ের আনন্দে পাগলের মতো নাচছে হিয়া৷ কিন্তু ও বুঝতে পারল না তখনও ওকে জরিপ করে চলেছে দুই জোড়া চোখ৷

সব নার্সিং হোমেই বোধ হয় সংলগ্ন একটা মন্দির বা ঠাকুর ঘর থাকে৷ এখানেও তাই৷ আর সেই মন্দিরেই বসে নীরবে চোখের জল ফেলছে দীপ্ত৷ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে টুকরো টুকরো পুরোনো স্মৃতির কোলাজ৷ ভেসে উঠছে ওর ভালোবাসার মুখ৷ হিয়ার মুখ৷ কলেজের সেই প্রাণোচ্ছল মেয়েটা যে ছিল খুব হাসি খুশি, প্রাণখোলা আবার তেমনই পরোপকারী৷ যে কারোর যে-কোনো সমস্যায় আগে এগিয়ে যেত হিয়া, তা সে সমাধান ওর কাছে থাকুক বা না থাকুক৷ হিয়ার সেই প্রাণ খোলা স্বভাবটাই মন কেড়েছিল দীপ্তর৷ তাই নিজের ডিপার্টমেন্টের এই মেয়েটার সাথে খুব বন্ধুত্ব না থাকলেও একদিন সাহস করে গিয়ে নিজের মনের কথা বলেই দিয়েছিল দীপ্ত, আর নিজের মনটাও ওর ভেঙেছিল সেইদিনকেই৷

—‘তুই খুব ভালো ছেলে রে দীপ্ত৷ কিন্তু তোর প্রস্তাব আমার পক্ষে মানা সম্ভব নয়৷ কারণ আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্য কারোর প্রতি৷’

—‘কে সে? আমাদের কলেজেরই কেউ কি?’ বুকে একরাশ কষ্ট নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল দীপ্ত৷

—‘না৷ সে আমাদের পাড়ার একজন৷ ছোটোবেলা থেকেই আমাদের প্রেম৷ যদিও সে বড়ো আমার থেকে প্রায় ন-বছরের তবুও সেই আমার কাছে সব৷’ সেদিনই জেনেছিল দীপ্ত প্রতীম আর হিয়ার প্রেমের কথা৷ প্রতীম ব্যবসা শুরু করেছে৷ কোম্পানি খুলেছে কিছু একটা৷ তবে হিয়ার সাথে প্রেম না হলেও আস্তে আস্তে কীভাবে যে ও খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছিল দীপ্তর৷ প্রাণ খোলা মেয়েটা যেন সত্যি সবার থেকে অনেকখানি আলাদা৷ কিন্তু সেই মেয়েটাই হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করল কলেজের ফাইনাল ইয়ার থেকে৷ খুব চুপচাপ হয়ে গেছিল হিয়া হঠাৎ৷ কিছু বলতেও চাইত না ও স্পষ্ট করে৷ তবে তবুও আস্তে আস্তে দীপ্ত অনেকটা জেনে নিচ্ছিল ওর থেকে৷ আর বুঝতে পারছিল প্রতীম ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে হিয়ার থেকে আর যেটা মানতে পারছে না কিছুতেই হিয়া৷ প্রতীমের জীবনে বাসা বেঁধেছে অন্য কেউ৷ এভাবেই তাও কেটে গেল বছর দেড়েক৷ প্রতীমের শোকে হিয়া তখন প্রায় পাগল৷ ফাইনাল পরীক্ষাও দিল না৷ ইতিমধ্যে চাকরি পেয়ে গেছিল দীপ্ত৷ তবুও সব দিক ম্যানেজ করে হিয়াকে সাধ্যমতো সামলে রাখার চেষ্টা করছিল ও৷ তবুও হল না আর শেষ রক্ষা৷ হিয়ার মানসিক অবসাদ এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে একদিন প্রতীমের বাড়িতে ওকে খুন করতে চড়াও হয়েছিল হিয়া৷ কীভাবে যে সেই পরিস্থিতি থেকে হিয়াকে টেনে বার করেছিল দীপ্ত সেটা শুধু দীপ্তই জানে৷

—‘দীপ্ত, প্লিজ নিজেকে সামলা ভাই৷’ পিঠে হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠল দীপ্ত৷ মানস এসে দাঁড়িয়েছে৷

—‘মানস, ও ভালো হবে তো রে? আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে তো?’ কান্নায় ভেঙে পড়ল এবার দীপ্ত৷ মানস শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ওকে৷ মানস, মানে দীপ্তর স্কুল জীবনের বেস্ট ফেন্ড মানস৷ এই মানসই তো এখন দীপ্তর একমাত্র ভরসা৷ মানসই তো প্রথম বলে যে হিয়া ক্যাপগ্রাস ডিলিউসন নামক বিরলতম মানসিক ব্যাধির শিকার৷

বিয়ের পর মোটামুটি সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল দীপ্ত আর হিয়ার জীবনে৷ কিন্তু সমস্যাটা শুরু হল মাস ছয়েক আগে থেকে মানে যবে থেকে দীপ্ত প্রোজেক্ট ম্যানেজারের প্রমোশন পেল তবে থেকে৷ নতুন পদের খাতিরে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে ইউ এস ছকের সময়মতো কথা বার্তা বলতেই হবে৷ তাই মাঝ রাত্তিরে কল নেওয়া শুরু হল দীপ্তর৷ কথা বলতে হত নিজের টিমের অন্য মহিলা আর পুরুষ কিছু কলিগদের সাথেও প্রয়োজনে৷ এই সব দেখে কীভাবে যেন হিয়া ভেবে বসল দীপ্ত বুঝি অন্য কোনো সম্পর্কে আসক্ত৷ আসলে হিয়ারও দোষ নেই, ও যে বড্ড বড়ো আঘাত পেয়েছে একবার৷ প্রথম প্রথম দীপ্ত ওকে বুঝিয়ে বলত৷ কিন্তু কিছুই কাজ হয়নি তাতে৷ উল্টে তাতে হিয়ার ঘ্যানঘ্যানানি আরও বেড়েছিল৷ ফলত দীপ্ত নিজেও মেজাজ হারিয়েছে কখনো সখনও৷ আর তাতেই ফল হয়েছে আরও খারাপ৷ হিয়ার মনে এই ধারণা জন্ম নিয়েছে যে প্রতীম আসলে বাসা বেঁধেছে দীপ্তর শরীরের আড়ালে৷ মৃত্যুর পর ফিরে এসেছে ও আবার নিজের প্রতিশোধ নিতে৷ প্রথমদিকে দীপ্ত ভেবেছিল হয়তো ও নিজেই হ্যান্ডেল করে নিতে পারবে হিয়াকে৷ কিন্তু যখন ও বুঝতে পারল হিয়ার মানসিক পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন ও মানসকে জানায় সবটা৷ আসলে মানস যেমন একাধারে দীপ্তর বন্ধু, তেমনই নামকরা সায়কায়াট্রিস্ট৷ দীপ্তর মুখে সব কথা শুনে আর হিয়াকে দু-একবার ভিজিট করে মানস বলে হিয়া ক্যাপগ্রাস ডিলিউসন নামক বিরল মানসিক রোগের কবলে পড়েছে৷ এই রোগে আক্রান্ত মানুষ নিজের কাছের লোকেদেরই শত্রু ভেবে বসে৷ তারা মনে করে তার কাছের লোকটার আড়ালেই ঘাঁটি গেঁড়ে রয়েছে কোনো প্রতারক শয়তান৷ মানস চেষ্টা করছিল কাউন্সেলিং করে, ওষুধ পত্র দিয়ে হিয়াকে সারিয়ে তোলার৷ কিন্তু হিয়া কোনো সহযোগিতা করলে তো! উল্টে আরও জটিল হচ্ছিল ওর অবস্থা৷ ক্যাপগ্রাস ডিলিউশন-এর সাথে যোগ হল হিয়ার হ্যালুসিনেশন আর স্কিতজোফ্রেনিয়ার জটিলতা৷ হিয়ার জীবনে আবির্ভাব হল কাল্পনিক বটবৃন্দ বাবা৷ যাকে হিয়া মনে করছিল নিজের রক্ষাকর্তা৷ বটবৃন্দ বাবার সাথে সারাদিন কাল্পনিক সংলাপেই হিয়া ব্যস্ত তখন৷ সারাদিন ফোন কানে চেপে চলছে দীপ্ত রূপী প্রতীমের আত্মা নিধনের প্ল্যান৷ কারো কোনো কথাই কানে তোলে না সে৷ সারাদিন বোবা আর নিথর মুঠো ফোন কানে চেপে বাড়িময় ঘুরছে সে৷ কিন্তু মাসখানেক আগের হিয়ার একটা কাল্পনিক সংলাপ চমকে দিয়েছিল দীপ্তকে৷ আগামী অমাবস্যার রাতে কোনো মন্ত্রপুত ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রতীমের আত্মা তথা দীপ্তর শরীরকে এফোঁড় ওফোঁড় করার প্ল্যান করছে হিয়া৷

—‘ভাই এবার কী করব আমি?’ ভয়ে আর আতঙ্কে আবার সেদিন মানসের দ্বারস্থ হয়েছিল দীপ্ত৷

‘ভয় পাস না৷ আমি যা বলছি তাই কর৷ আমিও থাকব সেদিন তোর সাথে৷ হ্যাঁ দীপ্ত সেদিন মানসের কথামতোই চলেছিল৷ সেই বিশেষ দিনটায় হিয়ার ডিনারে হাল্কা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিল দীপ্ত৷ তারপর হিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর নিজের বিছানায় নিজের শোবার জায়গায় বেশ পরিপাটি করে সাজিয়ে দিয়েছিল কয়েকটা বালিশ৷ যাতে হিয়া দেখে বুঝতেই না পারে যে দীপ্ত নেই ওখানে৷ তারপর ও আর মানস লুকিয়ে পড়েছিল ওদেরই অন্ধকার ঢাকা ফ্ল্যাটের একটা জুতসই আড়াল খুঁজে৷ সেই আড়াল থেকেই তারপর দেখেছিল ওরা কি পৈশাচিক বর্বরতায় হিয়া প্রতীম ভেবে ছুরির আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করছে বালিশগুলো৷ তারপর উন্মাদিনীর মতো জয়ের আনন্দে নাচছিল হিয়া৷ নাচতে নাচতেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এক সময়৷ সেই থেকে ও অজ্ঞানই রয়েছে টানা বিগত ছত্রিশ ঘণ্টা৷

হাঁটতে হাঁটতে মানসের সাথে নার্সিং হোমের লবিতে চলে এল দীপ্ত৷ এসেই থমকাল একটু৷ এ কাকে দেখছে ও! তার পর মুহূর্তেই মনে পড়ল একে তো ওই ডেকেছিল মানসের কথায়৷ দীপ্তকে দেখেই একটু গলা খাঁকড়াল প্রতীম৷

—‘দীপ্ত তুমি আমায় ডেকেছ?’ গলা ঝাড়ল প্রতীম৷

—‘প্লিজ প্রতীমবাবু৷ প্লিজ আপনি আমায় একটু হেল্প করুন হিয়াকে সুস্থ করে তোলার ব্যাপারে৷’

—‘আমি সব সময় হিয়ার ভালোই চাই দীপ্ত৷ সেদিন... সেদিন যেটা হয়েছিল সেটাও নেহাত অ্যাক্সিডেন্ট ছিল৷ আমি সত্যি হিয়াকে আঘাত করতে চাইনি৷ কিন্তু ও আমায় এমনভাবে সেদিন অ্যাটক করতে এসেছিল যে...’

প্রতীমের কথায় আবার দীপ্তর মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠে জেগে উঠল তিন বছর আগের সেই ভয়ানক ঘটনার দিনটা৷ হিয়ার মানসিক স্থবিরতা তখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে৷ সেই উন্মত্ত অবস্থায় ও একদিন চড়াও হয়েছিল প্রতীমের নতুন কেনা ফ্ল্যাটটায় কিছু একটা এসপার ওসপার করতে৷ হয় প্রতীমকে নিশার কবল থেকে ছাড়িয়ে আনবে ও, নয়তো প্রতীমকে খুন করে ও প্রতিশোধ নেবে৷ সেদিন কিছুটা বচসা হয়েছিল ওর প্রতীমের সাথে৷ তারপরই উন্মত্তের মতো ধারালো অস্ত্র নিয়ে ও ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় প্রতীমের ওপর৷ প্রতীম শক্তিশালী পুরুষ৷ অবস্থা হাতের বাইরে যেতে পারে বুঝে সে আচমকা এক হ্যাঁচকা টান মারে সেই মুহূর্তে হিয়ার হাত ধরে৷ ঠিক টাল সামলাতে পারেনি হিয়া আচমকা ধাক্কাটায়৷ তাই বেসামাল হয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ে যায় ও, তীব্র আর্তনাদ করে৷ আর নিজের চেতনাও হারায় সেই মুহূর্তেই৷ প্রতীম তারপর খবর দেয় হিয়ার বাড়িতে, আর দীপ্তকেও৷ প্রায় গোটা দু-দিন অচেতন ছিল হিয়া৷ তারপর যখন ওর জ্ঞান ফিরল তখন দেখা গেল যে মুছে গেছে হিয়ার স্মৃতির বেশ বড়ো একটা অংশ৷ সেই সময় ডাক্তার বললেন আচমকা পড়ে গিয়ে আঘাত লেগেছে হিয়ার মস্তিষ্কের বিশেষ একটা অংশে৷ মানসিক আঘাতের অভিঘাত আর ব্রেনের সেই আঘাত লেগেই মুছে গেছে হিয়ার কিছু স্মৃতি৷ ট্রিটমেন্ট শুরু হল হিয়ার৷ কিছুদিনের মধ্যে ফিরল হিয়ার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি৷ কিন্তু তার সাথে উপস্থিত হল এক নতুন উপসর্গ হিয়ার মধ্যে৷ ও বারবার বলতে শুরু করল ও নাকি খুন করে ফেলেছে প্রতীমকে৷ আর দীপ্ত বা হিয়ার বাড়ির লোকেরা যখনই বোঝাতে চেষ্টা করে যে প্রতীমের কিছু হয়নি, একদম ভালো আছে সে সেটা শুনতেই চায় না হিয়া৷ উল্টে আরও যেন হিংস্র হয়ে ওঠে ও ওর কথার প্রতিবাদ করে অন্য কিছু বোঝাতে গেলে৷ সেই সময়ে ডাক্তার বলেছিলেন ওই বিশেষ প্রসঙ্গে যেন কোনো বাদানুবাদ না করা হয় হিয়ার সাথে৷ ও ওই ব্যাপারে কোনো কথা বলতে গেলেও যেন কোনোভাবেই উৎসাহ না দেওয়া হয় ওকে কোনোভাবেই৷ ডাক্তারের কথামতো চলে লাভও হয়েছিল৷ আস্তে আস্তে ওই প্রসঙ্গ ভুলেই গেছিল হিয়া৷ কিন্তু না, আসলে ও ভোলেনি কিছুই৷ সেটা তো আজ বোঝা যাচ্ছে হাড়ে হাড়ে৷ হিয়ার মনের মধ্যে এই ধারণা বেঁচেই ছিল যে নিজের হাতে খুন করেছে ও প্রতীমকে৷ সেইজন্যই তো আজ হিয়ার মনের অবদমিত সেই ভাবনা চিন্তাগুলো জন্ম দিয়েছে হিয়ার এই অসুখের৷ ক্যাপগ্রাস ডিলিউশন৷

—‘দীপ্ত, ডক্টর মানসের সাথে কথা হয়েছে আমার৷ সত্যি আমার ভাবতে খুব খারাপ লাগছে যে হিয়ার আজ এই অবস্থা৷ আমার দিক থেকে সব রকম সহযোগিতার জন্য রেডি আমি৷ যদি আমি গিয়ে হিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে বোঝাই সবটা, যদি ও দেখে আমি সুস্থ হয়ে বেঁচে রয়েছি তাহলে নিশ্চয় ওর সব ভুল ধারণা কেটে যাবে৷ আমি বেঁচে থাকলে আমার আত্মা বা সেই আত্মার তোমার মধ্যে ভর করার পুরো ব্যাপারটাই তো বাতিল হয়ে যায় তাই না? নিশ্চয় ও সুস্থ হয়ে উঠবে তাহলে৷ বিশ্বাস কর দীপ্ত আমি আর নিশা যেমন সুখে ঘর করছি, আমি চাই তেমন ভাবে হিয়াও সুখী হোক তোমার সাথে৷’ এবার দীপ্তর হাত জড়িয়ে ধরল প্রতীম৷

—‘হিয়া ব্যানার্জীর হাজব্যান্ড কে আছেন?’ নার্সের কণ্ঠস্বরে চমকে তাকাল দীপ্ত৷

—‘আমি৷ কেন কী হয়েছে?’ একরাশ উদ্বেগ নিয়ে বলল দীপ্ত৷

—‘পেশেন্ট-এর অল্প সেন্স এসেছে৷ উনি খুঁজছেন স্বামীকে৷’

দীপ্ত ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নার্সের পিছু পিছু হিয়ার কেবিনে৷

প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে হিয়া৷ বুকটা খুব জোরে জোরে ওঠানামা করছে ওর৷ ঠোঁট নড়ছে অল্প অল্প৷ কি যেন বলছে মেয়েটা বিড়বিড় করে৷ দীপ্ত শোনার চেষ্টা করল কি বলছে হিয়া৷

—‘দীপ্ত, দীপ্ত তুমি ফিরে এসেছ আমার কাছে! আমি জানতাম আমি পারব৷ আমাকে তো পারতেই হত বলো নিজের পুরোনো দীপ্তকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে৷ সব বাধা আমাকে তো পার করতেই হত বলো৷ আবার আমরা একসাথে আনন্দে বাঁচব দীপ্ত৷ সেই পুরোনো দিনগুলোর মতো আবার খুব আনন্দে থাকব আমরা৷’

দীপ্তর চোখ ভরে উঠল জলে৷ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে পুরোনো হিয়ার সেই হাসি মাখা উজ্জ্বল মুখটা৷ দীপ্তর চোখ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল হিয়ার চিবুকে৷ হিয়া টেরও পেল না৷ এবার হিয়ার কপালে পরম স্নেহে হাত রাখল দীপ্ত৷

—‘তুমি ঠিক বলেছ হিয়া আবার আমরা আগের মতো খুব আনন্দে বাঁচব৷ আর আমাকেও যে পারতেই হবে আমার পুরোনো হিয়াকে আবার ফিরিয়ে আনতে৷ তাই সব বাধা জয় করবই আমি৷ তোমাকে আমি সুস্থ করে তুলবই হিয়া৷’

কেউ শুনতে পেল না দীপ্তর দৃঢ় অঙ্গীকারে উচচারিত শব্দগুলো৷ সাক্ষী থাকল শুধু আকাশ, বাতাস আর উপরের সেই লোকটা, যাকে এই পৃথিবীর মানুষ ভগবান নামে চেনে৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%