পল্লবী সেনগুপ্ত
তারিখ: ২৫ মে
লিলির কথা
সুলেখা ম্যাডামের লেকচারের বিন্দু বিসর্গও কানে ঢুকছিল না লিলির৷ ভীষণ উশখুশ করছে মনটা, বার বার চোখ চলে যাচ্ছে ঘড়ির দিকে৷ ক্লাসটা শেষ হলেই আগে গিয়ে একবার খোঁজ নিতে হবে অভীকের৷ আজ তিনদিন হল অভীক আসছে না কলেজে৷ কি যে হল ছেলেটার কে জানে! ও তো এমন হুট হাট করে কামাই করে না৷ কাল দু-বার ফোন ও করেছিল লিলি৷ কিন্তু ধরেনি ও৷ কল ব্যাকও করেনি৷ একদম ভালো লাগছে না লিলির৷ এমনিতেই অভীকের সাথে একদিন দেখা না হলেই ওর ভীষণ অস্থির লাগে সেখানে এভাবে তিন দিন কোনো খবর নেই...৷ তবে এই তিন দিনে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে লিলি৷ ও বেশ বুঝতে পেরেছে যে এখন ও অভীককে সত্যি খুব ভালোবেসে ফেলেছে৷ তাই অনেক হয়েছে এই মনের কথা চেপে রাখা৷ এবার ও মনের কথা জানিয়েই দেবে দু-বছর সিনিয়র ছেলেটাকে৷
লিলি আবার ঘড়ি দেখল৷ ক্লাসটা শেষ হতে আর মিনিট সাতেক বাকি আছে৷ আনমনে জানলার বাইরে চোখ ফেরাল লিলি৷ বাইরে করিডোরের প্যাসেজ থেকে ঝট করে সরে গেল একটা লাল টি-শার্ট৷ কেউ কি লুকিয়ে দেখছিল লিলিকে বাইরে থেকে? কে? ওই লাল টি-শার্ট এর মালিক? ওরকম একটা লাল শার্ট তো অভীকই পরে তাই না? তার মানে কি অভীকই? লিলির সারা শরীর জুড়ে যেন এক লক্ষ-প্রজাপতি উড়ে গেল৷ আর ঠিক তখনই ওর নাকে এসে ঝাপটা মারল খুব পরিচিত এক মুঠো মাস্কের গন্ধ৷ আর কোনো সংশয় রইল না লিলির৷ হ্যাঁ সে...৷ হ্যাঁ এটা সেই...৷ খুব কাছেই রয়েছে সে৷ লিলি দু-চোখ বন্ধ করে বড়ো করে নিশ্বাস নিল একটা৷
কিন্তু... কিন্তু...৷ মাস্কের সুন্দর গন্ধটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে...৷ কেমন যেন বিটকেল গা গুলানো একটা গন্ধে বদলে যাচ্ছে গন্ধটা৷ কীসের গন্ধ এটা? চোখ খুলল ও৷
উফফ! বাসে বসে বসেই চোখটা বুজে এসেছিল লিলির৷ আসলে শরীরটা বড্ড খারাপ আজ৷ এই বিদঘুটে গরম, চারপাশের উৎকট ঘামের গন্ধ তবুও তন্দ্রা এসে গেছিল৷ আর তার সাথে চলে এসেছিল অনেকগুলো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটা দিনের স্বপ্ন৷
এমনিতেই অফিস থেকে ডিরেক্ট এই বাসটা ধরে বাড়ি ফিরতে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা লেগে যায় লিলির৷ তার মধ্যে আজ আবার কি একটা রাজনৈতিক দলের মিছিল টিছিলের জন্য সেই সময়ের মেয়াদটা আরও বাড়ল৷ বাস যেন আর নড়ছেই না আজ৷ ঘামে ভিজে সপ সপ করছে লিলির কুর্তিটা৷ আজ আসলে অফিস থেকে একটা হাফ ডে অফ নিয়েছে ও৷ মামা আর মামি আসবেন আজ ওদের ছেলের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে৷ অনেক দূর থেকে আসবেন ওরা৷ তাই রাতে ওদের ডিনার করে যেতে বলেছে লিলি৷ আর সেই জন্যই আজ অফিস থেকে একটা হাফ ডে অফ নেওয়া৷ অফিসের কথা মনে পড়তেই দাউ দাউ করে আবার মাথায় আগুন জ্বলে গেল৷ কি অকথ্য অপমান আজ করল ওকে প্রবীর দত্ত৷ বস হয়েছে বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে? গত সপ্তাহে জ্বরের জন্য দুটো ছুটি নিতে হয়েছিল লিলিকে এটাই যে লোকটার গায়ের জ্বালার আসল কারণ সেটা ভালোই জানে লিলি৷ কিন্তু বলার সময় সেটা একবারও বলল না৷ আঁতে ঘা দেওয়া যত রকম কথা হয় সেগুলোই বলল৷ লিলির পারফরমেন্স বাজে, টার্গেট রিচ করতে ও ফেল করে, ও ক্লায়েন্টের সাথে ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে জানে না৷ ওকে রেখে কোম্পানির নাকি কোনো লাভই হচ্ছে না এই সব যত রকম বাজে কথা হয় আর কি...৷ অপমানে কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে লিলির৷ ঝাড়া দুটো বছর মন প্রাণ ঢেলে কাজ করার এই পুরস্কার! এই অফিসে কাজের জন্য বাবলার সাথেও কত বার ঝগড়া হয়েছে৷ বাবলা হয়তো অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ঘুরতে যেতে বলেছে কিন্তু ও যায়নি৷ অফিসের বেশির ভাগ লোকই সারাক্ষণ প্রবীর দত্তকে গালিগালাজ করে আর অভিশাপ দেয়৷ কিন্তু লিলি তেমনটা কোনোদিনই করেনি৷ কারণ এসব জিনিস লিলির ঠিক ভালো লাগে না৷ যাই হোক, লোকটা পয়সা তো দিচ্ছে৷ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যে সত্যি সবাই ঠিকই করে ওকে অভিশাপ দিয়ে৷ সব সময় উল্টো পাল্টা টার্গেট আর প্রেশার দিয়ে নরক করে দিয়েছে সবার জীবন আর লিলির তো বটেই৷ এর আগেও বহু বার উল্টো পাল্টা নানা অপমান করেছে লোকটা লিলিকে, কিন্তু এবারটার বুঝি আর তুলনা হয় না৷ নাঃ, যে ভাবেই হোক লিলিকে ছাড়তেই হবে প্রবীর দত্তের অফিস৷ না হলে ও পাগল হয়ে যাবে৷ ইচ্ছা তো লিলির করছিল আজই লোকটার মুখে ছুঁড়ে দিতে রেজিগনেশান৷ কিন্তু...৷ না, এমনিতে চাকরি লিলির না করলেও চলে৷ কারণ ওর বাবা যথেষ্ট ভালো ভাবে প্রতিষ্ঠিত৷ কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়৷ একে তো লিলি খুব কেরিয়ারিস্ট আর ওর আত্মসম্মানও প্রবল৷ বরের টাকায় ফুটুনি বেশিদিন ওর পোষাবে না৷ আর সব চেয়ে বড়ো প্রবলেম হল বাবলার মা৷ ওই মহিলার সাথে এক ফোঁটাও বনে না লিলির৷ সব কিছতেই লিলির খুঁত খুঁজে নিয়ে লিলির সমালোচনা করাটাই ওই মহিলার হবি৷ কিন্তু কে সেটা বোঝাবে বাবলাকে? সত্যি বাবলার মতো মায়ের ভেড়া জীবনে কোনোদিন দেখেনি লিলি৷ যাই হোক, এখন তবু চাকরির অজুহাতে বরের সাথে কলকাতায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে পারে ও৷ কিন্তু চাকরি না থাকলে তো নিশ্চয় ওকে বাবলাদের দেশের বাড়িতে গিয়ে মানে শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলবে সবাই৷ আর মাতৃ ভক্ত বাবলা যে ওর মায়ের হ্যাঁ-তেই হ্যাঁ মিলাবে সেটা ভালোই জানা আছে লিলির৷ সত্যি, দিন দিন বাবলার সাথে সম্পর্কটা বড্ড বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে পারিপার্শ্বিক নানা কারণে৷ ছোটো ছোটো ভালো লাগা, প্রাণের আরাম সব হারিয়ে যাচ্ছে একে একে৷ যান্ত্রিক অভ্যাসের মতো চলছে ওদের সম্পর্ক৷ আর সাথে উপরি পাওনা শুধু নিত্য দিনের ঝগড়া ঝাটি৷ আর তার জন্যই বোধ হয় পুরোনো দিনের কথা, কলেজের সেই অভীকের সাথে কাটান মুহূর্তগুলোর কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে আজকাল৷
বাসটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলছে৷ কতক্ষণে পৌঁছাবে কে জানে! জৈষ্ঠ্যের প্রখর তাপ জ্বালিয়ে দিচ্ছে সবার শরীর৷
পিনপিন করে লিলির ব্যাগের মধ্যে বেজে উঠল ওর মোবাইল৷ ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে বাবলার ফোন নম্বর৷
—‘বল...’ শুকনো গলায় বলল লিলি৷
—‘আমার আজ ফিরতে অনেক রাত হবে৷ আমার অফিসের একটা জরুরি কাজ আছে৷ তাই আমি বেরোতে পারব না৷’ রুক্ষ স্বর বাবলার৷
—‘তার মানে?’ দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠল লিলি৷
—‘তুমি জান না আজ আমার মামারা আসবেন, ভাইয়ের বিয়ের নেমন্তন্ন দিতে৷ তুমি থাকবে না মানে?’
—‘আমার কিছু করার নেই লিলি৷ তুমি শোন...’
—‘কী শুনব আমি?’ কবে থেকে বলে রেখেছিলাম আমি আজকের দিনটার কথা? পারতে এটা তোমার মায়ের সাথে করতে? আমি বুঝেছি তোমার মা বারণ করেছে আমার মামাদের সাথে দেখা করতে...’
কেটে গেল ফোনের লাইন৷ বাবলা কেটে দিয়েছে৷ কান্না পেয়ে গেল লিলির৷ কী বাজে এই বাবলা! লিলির একটা কথারও কোনোদিন দাম দেবে না ও৷ শুধু মায়ের কথায় চলবে! না, সত্যি আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না লিলির৷ চোখের কোল বেয়ে অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ল ওর৷ পরমুহূর্তেই খেয়াল হল বাস শুদ্ধ লোক তাকিয়ে আছে ওর দিকে৷
না, শক্ত হতেই হবে ওকে৷ লড়াই করতে হবে একলাই এই নিঠুর, কঠিন দুনিয়াটার সাথে৷
তারিখ: ২৫ মে
বাবলার কথা
দিন দিন বড়ো বেশি অসহ্য আর ইনসেনসিবল হয়ে উঠছে লিলি৷ নইলে কেউ রাস্তার মধ্যে এভাবে চেঁচায়? ফোনটা কেটে দেবার পরেও কান মাথা জ্বলছিল বাবলার৷ হ্যাঁ এটা ঠিক যে আজকের দিনটার ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই বলে রেখেছিল ও, কিন্তু বাবলাই বা কী করবে? সব কিছু তো আর বাবলার হাতে নয়৷ অফিসের এম ডি-র মা মারা গেছে আজ হঠাৎ করে৷ কোম্পানির সিনিয়র পজিশনের সকলেই তাই যাচ্ছে আজই দেখা করতে, সেখানে বাবলা কীভাবে এড়াবে এটা? শঙ্খ চ্যাটার্জী লোকটা এমনিতেই যথেষ্ট খ্যাপাটে আর খামখেয়ালী৷ ছোটো ছোটো ব্যাপারে লোকটা যে কারো সম্বন্ধে যেকোনো ধারণা তৈরি করে নেয়, এমত অবস্থায় এই সেনসেটিভ একটা ইস্যুকে কি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায়? আর লোকটার বাড়ি এতটাই দূরে যে গাড়িতে যাতায়াত করেও তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরাটা অসম্ভব৷ কিন্তু লিলি এতটাই জেদি আর অবুঝ যে এসব ও বুঝবে না৷ ও কোনো ভাবেই বুঝবে না যে আজ ও না গেলে এখানে ওর বিরুদ্ধে পলিটিক্স করার কত বড়ো সুযোগ পেয়ে যাবে রনেন্দ্র, জগমোহন এর মতো কলিগ শত্রুরা৷
মনটা ভীষণ তিক্ত লাগছে বাবলার৷ লিলির সাথে সম্পর্কটা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে৷ হাজার চেষ্টাতেও যেন কিছু ঠিক হচ্ছে না৷ কোনো কিছুই বুঝতে চায় না ও৷ শুধু নিজের জেদ আর ইগো৷ না বাবলার অফিসের সমস্যা বোঝে না বাড়ির৷ মায়ের সাথে বিন্দুমাত্র বনিবনা নেই৷ সব সময় নানা অভিযোগ৷ কে জানে মা সত্যি কি ওকে কিছু বলে নাকি সবটাই ওর কল্পনা৷ এদিকে বউ আর মায়ের এই অশান্তির মাঝখানে পড়ে বাবলার যে সত্যি কি অবস্থা হচ্ছে তা যদি কেউ বুঝত৷ সব সময় লিলির একই অভিযোগ, বাবলা ওকে বোঝে না; কিন্তু লিলি নিজে কি আদৌ বোঝে বাবলাকে? কোনোদিন নিজের ভাবনার বাইরে এসে বোঝার চেষ্টা করে বাবলা কি চায়? সারাক্ষণ শুধু নিজের জগত নিয়েই তো ব্যস্ত ও৷ না, বাবলার আর কোনো গুরুত্বই বোধ হয় বাকি নেই ওর কাছে৷
শঙ্খ চ্যাটার্জীর বাড়ির দিকে ছুটে চলা গাড়িটা হঠাৎ ব্রেক কষে থামল৷ সামনে একটু জ্যাম৷ গাড়ির এসিটাও চলছে না ঠিক ঠাক৷ তাই জানলার কাঁচ নামিয়ে দিল বাবলা৷ কাঁচ নামাতেই এক দলা গরম শুকনো বাতাস এর সাথে একটা দৃশ্য এসে ঝাপটা মারল ওর চোখে৷ চমকে উঠল বাবলা৷ একটা মেয়ে৷ রাস্তার ধারের ছোটো সিনেমা হলটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ মনে হয় অপেক্ষা করছে কারোর জন্য৷ পরনে হালকা সবুজ সালোয়ার৷ গরমের শুকনো হাওয়ার দমকে খোলা চুল কপালের উপর উড়ছে এলোমেলো৷ গাড়ি থেকে মেয়েটার মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু তবুও মেয়েটা যে হুবহু প্রিয়াঙ্কার মতো সেটা বুঝতে পারল বাবলা৷
জ্যাম ছাড়তেই আবার এগিয়ে গেল গাড়িটা৷ মেয়েটা চলে গেল বাবলার দৃষ্টি সীমার বাইরে৷ কিন্তু বাবলা ভুলতে পারল না৷ মেয়েটা যেন অবিকল প্রিয়াঙ্কার ছায়া৷ এক লহমায় বাবলার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল অনেকগুলো পুরোনো ছবি৷ প্রিয়াঙ্কার সেই ছেলেমানুষি মাখানো ভালোবাসার স্মৃতি হঠাৎ যেন জেগে উঠছে হূদয়ের প্রকোষ্ঠে বহু বছর পর৷ ঠিক এভাবেই প্রিয়াঙ্কা অপেক্ষা করত ওর জন্য বিকেলগুলোতে সিনেমা হল বা কফিশপে৷ বাবলার দেরি করে পৌঁছানোর পর ও কোনোদিন খুব বেশি বকত না ওকে৷ বাবলা একটু রাগ করতেই কেঁদে ফেলত ছোটো বাচচা মেয়ের মতো৷ সেই প্রিয়াঙ্কাই হারিয়ে গেল বাবলার জীবন থেকে৷ হারিয়ে গেল ওর ভালোবাসা৷ কিন্তু কেন? কেন প্রিয়াঙ্কা হারিয়ে গেল এভাবে? বাবলা তো অনেক চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু একের পর এক ভুল বোঝা বুঝি, প্রিয়াঙ্কার বদলে যাওয়া কেন হল এ সব? নাকি বাবলারও দোষ ছিল অনেকটাই? কোনো সম্পর্কই কি একা কারোর দোষে নষ্ট হয়?
টিং টিং.. টিং টিং... ম্যাসেজ টোনের শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ল বাবলার৷ মোবাইলের দিকে দৃষ্টি ফেরাল ও৷ অপ্রয়োজনীয় একটা ম্যাসেজ৷ কিন্তু মোবাইলে ফুটে ওঠা আজকের ডেটটার দিকে চুম্বকের মতো কেমন যেন দৃষ্টিটা আটকে গেল ছেলেটার৷ আজ ২৫ মে, শুক্রবার৷ তার মানে এই বছর আবার ২৭ মে রবিবার পড়ছে৷ আবার...৷ এত বছর পর সেই এক রকম...৷
বাবলার মন এক লাফে পিছিয়ে গেল অনেকগুলো বছর আগে৷ একটা ভীষণ গরম জড়ানো একটা দিনের শেষে বিকেলের দিকে ছাদে বসে ছিল বাবলা৷ একটু ঠাণ্ডা হাওয়ায় জুড়িয়ে নিতে চাইছিল প্রাণটা৷ হঠাৎ থর থর করে কেঁপে উঠল ভাইব্রেশন মোডে রাখা মোবাইল যন্ত্র৷
—‘হ্যাঁ বল প্রিয়াঙ্কা...’
—‘কি করছিস? ব্যস্ত?’
—‘হ্যাঁ ভীষণ ব্যস্ত ছাদে বসে হাওয়া খেতে... হে হে...’
—‘শোন খুব দরকারি কথা৷ অনেকদিন থেকে বলব ভাবছি কিন্তু কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না৷ আসলে আমি মানে আমি...’
—‘আরে! এত কিন্তু কিন্তু করছিস কেন? বল না কী বলবি...’
—‘মানে... আমি তোকে লাইক করি বাবলা, মানে ভালোবাসি বলতে পারিস৷ তুইও আমায় পছন্দই করিস যদি আমি খুব ভুল না বুঝে থাকি৷ কিরে তাই তো? প্রেম করবি আমার সাথে?’
খুব হতচকিত হয়ে গেছিল বাবলা সেদিন৷ তবে সাথে খুশিও হয়েছিল বেশ৷ না, প্রিয়াঙ্কার প্রেমে পড়ে ও খাবি খাচ্ছে এমন কোনো ব্যাপার নেই ঠিকই, কিন্তু প্রিয়াঙ্কাকে খারাপ ওর লাগে না৷ দেখতে খারাপ না, পড়াশুনাতেও ভালো৷ এই বাজারে প্রেমিকার চয়েস হিসাবে মন্দ কি!
—‘হুম৷ এক কাজ কর৷ আজকের দিনটাকে আমাদের লাভ অ্যানিভারসারি হিসাবে মার্ক করে রাখ৷’ খুব ছোটো উত্তর দিয়েছিল বাবলা৷
হ্যাঁ লাভ অ্যানিভারসারি৷ ২৭ মে দিনটা ছিল ওদের লাভ অ্যানিভারসারি৷ আচ্ছা, একবার নতুন করে ফিরে যাওয়া যায় না প্রিয়াঙ্কার কাছে? সব ভুল বোঝাবুঝিকে ভুলে নতুন করে কি একবার সব শুরু করা যায় না? প্রিয়াঙ্কা কি ফিরিয়ে দেবে? এই ২৭ মে কি আবার একবার নতুন করে শুরু করা যায় না?
মনের মধ্যে চোরা একটা স্রোতের কুলকুল টের পাচ্ছিল বাবলা৷ শুকনো, জ্বলন্ত দিনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমে৷ একটা স্নিগ্ধ বিকেল উঁকি মারছে আকাশের ফাঁক থেকে৷
তারিখ: ২৬শে মে
গভীর রাতের কালো চাদরে মুড়ে থাকা একটা শুকনো রাত৷ বিছানায় মুখ গুজে হাপুস নয়নে কাঁদছে লিলি৷ শেষ পর্যন্ত বিয়েটা ভেঙেই গেল ওর৷ আসলে বাবলার সাথে সম্পর্কের সুতোটা ঢিলে হয়ে গেছিল বেশ অনেক দিন থেকেই এটা ঠিক, কিন্তু তা বলে সেটা যে পুরোপুরি ভাবে ছিঁড়ে যাবে চিরতরে এত তাড়াতাড়ি সেটা ভাবেনি মেয়েটা৷ সব কিছুর জন্য ওই বাবলার মা’টাই দায়ী৷ সব সময় লিলির বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়ে বাবলার মাথাটা খারাপ করেছে ওই মহিলাই সেটা বেশ জানে লিলি৷ অবশ্য বাবলা নিজেও কিছু কম যায় না৷ কোনোদিনই ও লিলিকে ভালোওবাসেনি আর বোঝার চেষ্টাও করেনি৷ সব সময় শুধু লিলিকে ভুল বুঝে গেছে, নিজের মায়ের পক্ষ সমর্থন করে ওর সাথে ঝগড়া করে গেছে আর লিলিকে দোষারোপ করেছে স্বার্থপর বলে৷ একবারও ভাবেনি প্রবীর দত্তের মতো একজন অত্যাচারী বসের আন্ডারে কাজ করাটা কত কঠিন, একবারও কোনোদিন জানতে চায়নি নিধি, নিশা আর অরিজিতদের নিত্যদিনের অফিস পলিটিক্স বাঁচিয়ে কাজ করাটা কত খানি শক্ত৷ কোনোদিন বুঝতেই পারেনি যে দিনের পর দিন অফিস করে এসে, ঘরের সব কাজ সেরে, পড়ার বইতে মুখ গুঁজে থাকার পর ও সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোয় একের পর এক অসফল হবার যন্ত্রনা ঠিক কতখানি৷ কোনোদিন বোঝেনি বাবলার মায়ের করা প্রতিটা অসম্মানজনক কথা কতটা কষ্ট দেয় লিলিকে৷
রাতের অন্ধকার চিরে ছড়িয়ে পড়েছে লিলির কান্না৷ চোখের জল যেন বাঁধ মানছে না কিছুতেই৷ সব শেষ হয়ে গেল! কেন যে কাল এত খানি মাথা গরম হয়ে গেল লিলির৷ কাল রাত দশটার পরে বাড়ি ফিরেছিল বাবলা৷ মামা মামিরা ততক্ষণে চলে গেছেন নিমন্ত্রণ করে৷ বাবলাকে দেখেই লিলির মাথায় যেন দাবানলের আগুন জ্বলে উঠেছিল৷ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ও৷
—‘কি মনে করে ফিরে এলে বাড়িতে? যেখানে আশনাই করতে গেছিলে সেখানের পিরিত শেষ হয়ে গেল বুঝি?’ বিকট চিৎকার করে উঠেছিল লিলি৷
বাবলা মেজাজ ঠিক রেখেছিল তখনও৷ শান্ত অথচ কঠিন স্বরে বলেছিল— ‘না জেনে ভুল ভাল কথা বলবে না লিলি৷ আগে শোন কী ঘটেছিল...’
—‘কী শুনব? যে মিথ্যাগুলো শিখিয়ে পাঠিয়েছে তোমার প্রেমিকা সেগুলোই শোনাবে তো? শুনব না আমি৷ বেরিয়ে যাও তুমি আমার চোখের সামনে থেকে...৷ দেখতে চাই না আমি তোমার মুখ...৷’ হিস্টিরিয়া রোগীর মতো চিৎকার করে উঠেছিল লিলি৷ আর কথা বাড়ায়নি বাবলা৷ বেরিয়ে গেছিল বাড়ি ছেড়ে৷ আর ফিরে আসেনি৷ কাল সারা রাত, আজ সারা দিন কেটে গেছে৷ তবুও ফেরেনি বাবলা৷ ফোন বন্ধ ওর৷ পাগল পাগল লাগছে লিলির৷ এমন তো কোনোদিন হয়নি আগে৷ সারাদিন লক্ষ বার ঘর-বার করেছে ও৷ ফোন করেছে সম্ভাব্য সব জায়গায়৷ না কোথাও যায়নি সে৷ তাহলে কি হল মানুষটার? সত্যি কি তাহলে নতুন কেউ এসেছে বাবলার জীবনে?
নাঃ, আর ভাবতে পারছে না লিলি৷ উফফ! কেন যে গতকাল এত রাগারাগি করতে গেল৷ তবে শুধুই কি কাল? সম্পর্কের এই অবনতির পিছনে লিলি কি নিজের সব টুকু দায় সত্যি এড়াতে পারে? আজ নিজের কাছেই যেন প্রশ্নটা জেগে উঠেছে৷ নিজের কাজ, অফিস, কেরিয়ার, পড়াশুনো এগুলো নিয়ে ব্যস্ত হতে হতে বাবলার কথা ভাবতে, বাবলাকে সময় দিতে সত্যি কি একটুও অবহেলা করেনি লিলি?
নাঃ, এসব ভাবার, বিশ্লেষণ করার জন্য বোধ হয় সত্যি অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ অনেক অনেক দূরে চলে গেছে মানুষটা৷ ফাঁকা, শূন্য ফ্ল্যাটের নীরবতাকে ছিন্ন করে আর্তনাদ করে উঠল লিলি৷
—‘বাবলা, ফিরে এসো... ফিরে এসো প্লিজ...৷’ কংক্রিটের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে শব্দগুলো পাক খেতে লাগল চার দেওয়ালের ফ্ল্যাটটার মধ্যে৷ দূরে কোথায় যেন কেঁউ করে ডেকে উঠল একটা কুকুর, ঝট পট করে ডানা ঝাপটাল কোনো একটা নিশাচর পাখি৷ রাত আরও গভীর হচ্ছে... আরও গভীর হচ্ছে...৷
তারিখ: ২৭ মে
আজ সকাল থেকেই গুমোট আর মেঘলা একটা ভাব আবহাওয়ার, ঠিক লিলির মনের মতোই৷ আজকের দিনটারও বিকেল গড়িয়ে গেল৷ তবুও ফিরে এল না সে৷ কেঁদে কেঁদে দুই চোখ সাংঘাতিক ফুলে গেছে লিলির৷ মাথা কাজ করছে না আর৷ এবার তো কিছু একটা করতেই হবে৷ পুলিশে যেতে হবে কি? সবাইকে তো জানাতে হবে৷ কিন্তু কাকে জানাবে? কিই বা জানাবে? বাবলার মা বাবা কি বলবে এবার? আর লিলির নিজের মা বাবা? উফফ! আর পারছে না যে ও৷
টিং টং... বেলের শব্দে চমকে উঠল লিলি৷ দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল ও৷ বাবলা কি? নাঃ৷ বাবলা নয়৷ একটা অচেনা লোক দরজার বাইরে৷
—‘ম্যাডাম, আপনার একটা পার্সেল আছে৷’
—‘আমার পার্সেল? ভীষণ অবাক হল লিলি৷ তা ছাড়া আজ তো রবিবার৷ আজ কি কুরিয়ার কাজ করে নাকি? লিলির অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে লোকটাও একটু চমকে গেল বোধ হয়৷ কোনোমতে প্যাকেটটা নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিল সে৷
ভিতরে এসে প্যাকেটটায় প্রেরকের নাম দেখেই চমকে উঠল লিলি৷ অভীকের নাম লেখা যে৷ অভীক? এত বছর পর... হঠাৎ...
পাগলের মতো ব্যস্ত হাতে পার্সেলটা খুলল লিলি৷ ভিতরে রয়েছে একটা লাল গোলাপ দেওয়া মস্ত বড়ো কার্ড আর ওর খুব প্রিয় লাল সাদা ছোট্ট টেডি৷
কার্ডটা খুলল লিলি৷ অনেক বড়ো চিঠি সেখানে৷
আমার পাগলি,
জানি আজকের দিনটা তুই ভুলে গেছিস, ঠিক যে ভাবে আমিও ভুলে গেছিলাম আগের বেশ কয়েকটা বছর৷ আমি জানি তুই আমায় ছাড়া ভালো নেই, যেমন আমিও তোকে ছাড়া বড্ড কষ্ট পাচ্ছি৷
আমাদের সবার জীবনেই অনেক সমস্যা থাকে, আর আমরা বড়ো হবার সাথে সাথে সেগুলোও বড়ো হতে থাকে৷ সেগুলোকে কাটিয়ে ওঠা সব সময় আমাদের হাতে থাকে না এটা ঠিক, কিন্তু তাই বলে শুধু সেগুলোকেই আঁকড়ে থেকে আর শুধু সেগুলোকে নিয়েই ভাবতে থেকে আমরা যদি আমাদের ছোট্ট ছোট্ট ভালো লাগা, জীবন, ভালোবাসা এগুলোকেই ভুলে যাই তাহলে বেঁচে থাকাটা যে বড়ো অর্থহীন হয়ে যায় রে৷ পুরোনো সোনালী দিন, পুরোনো সুন্দর সময় হয়তো আর ফেরে না, কিন্তু সেই পুরোনো মাধুর্যকে একটু কষ্ট করে যদি সম্পর্কে বাঁচিয়ে রাখা যায় তাহলে সম্পর্ক পুরোনো আর জীর্ণ হয় না৷ আমি জানি তুই কাঁদছিস, তাই বলছি কাঁদিস না৷ দেখা হবে শিগগির৷
তোর অভীক৷
সত্যি চোখের জলে সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে লিলির৷ সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো অনেক পুরোনো দৃশ্য ফুটে উঠছে লিলির চোখের সামনে৷ তিন বছর আগের একটা দিন৷ লিলির ফুলশয্যার দিন৷ সব রিচুয়াল শেষে একান্তে অভীক এসেছিল লিলির কাছে৷ আর ওমনি খড় খড় করে উঠেছিল লিলি৷
—‘এই তোর ডাক নাম বাবলা? এত দিন বলিসনি তো? কী ফানি নাম রে৷ হিহি...৷’
—‘এই বাজে বকিস না৷ বাজে বকলে কিন্তু তোকে আর এই আংটিটা দেবই না৷ আর তুই বলছিস কেন আমায়৷ এখন থেকে আমি তোর বর৷ সম্মান দে৷ তুমি করে বল৷
—‘আচ্ছা৷ আজ থেকে তুমি৷ আর অভীক নয়, বাবলা৷ কী সুইট নাম৷ তুমিও আমায় কিন্তু তুমি বলবে আজ থেকে৷ আর হ্যাঁ নট এনি মোর পাগলি৷’ আদুরী স্বর লিলির৷
—‘পাগলি নামটা বাতিল হয়ে গেল? বেশ৷ কি আর বলব! আমিও তাহলে না হয় এবার থেকে আর সবার মতো পোশাকি নাম প্রিয়াঙ্কাটাই ব্যবহার করব৷’
—‘না, না, না৷ লিলি৷ এটাই আমার ডাক নাম অ্যান্ড আই লাভ দিস নেম৷ এবার থেকে শুধু বাবলার লিলি৷’
—‘ওকে ডান৷ তুমি বলব৷ কিন্তু আমার দেওয়া পাগলি নামটা ছেড়ে দেওয়াটা আমার কিন্তু একদম ভালো লাগল না৷’ গোমড়া মুখে বলেছিল ছেলেটা৷
—‘হ্যাঁ ছাড়বই তো৷ ইশশ! পচা নাম৷ আর বেশি বদমাইশি করলে আমি তোমাকেও ছেড়ে দেব বুঝলে মশাই৷’ হাসতে হাসতে বলেছিল লিলি৷ না, সেদিন সেই মুহূর্তে ওরা কেউই বোঝেনি৷ বোঝেনি নাম বদলে নেবার এই মজার খেলাটা আস্তে আস্তে বদলে দেবে ওদের সম্পর্কের সমীকরণটাও৷ সময়ের সাথে সাথে নানা পারিপার্শ্বিক কারণে ওদের ভালোবাসা বদলে গিয়েছে৷ লিলির বারবার মনে হয়েছে প্রেমিক অভীক আর বর বাবলা যেন দুটো আলাদা মানুষ৷ হয়তো অভীকের ও এভাবেই অচেনা লেগেছে পাগলি থেকে বদলে যাওয়া লিলিকে৷
দুমদম একটা শব্দে সম্বিৎ এল লিলির৷ খুব ঝড় উঠেছে বাইরে৷ খোলা জানালা দিয়ে ছুটে আসা পাগলা হাওয়ার দমকা ওলট পালট করে দিচ্ছে লিলির বেড রুম৷ ব্যস্ত হাতে জানলা বন্ধ করতে গিয়ে নীচের তলায় চোখ গেল লিলির৷ হ্যাঁ তাকে দেখতে পাচ্ছে লিলি৷ ফ্ল্যাটের মেন গেট খুলে ঢুকছে সে৷ কয়েক মিনিটের মধ্যেই কলিং বেলের শব্দ৷ হুড়মুড় করে দরজা খুলল লিলি৷ সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে৷ বাবলা কি অভীক জানা নেই৷ শুধু এটুকু জানে লিলি যে এই মানুষটাকে ছাড়া একটুও চলবে না ওর৷
সে ঘরে ঢুকতেই দু-হাতে তাকে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল লিলি৷ না, কোনো কথা বলতে পারছে না ও৷ সব কথাই আজ শুধু খুঁজে নিয়েছে অশ্রুর ভাষা৷ সেও হাত বুলিয়ে দিচ্ছে লিলির মাথায় ঠিক আগের মতোই৷
না, সব শব্দ থেমে থাক৷ শুধু অনুভূতিটুকু থাক বেঁচে৷ বাইরের দুনিয়ার চাপ, প্রবীর দত্তের অফিস, নিধিদের পলিটিক্স, কেরিয়ারের ইঁদুর দৌড়, পারিবারিক জটিলতা এগুলো তো জীবনের একমাত্র সত্যি নয়, তার থেকে আরও অনেক বেশি সত্যি যে এই মুহূর্তটা৷ লিলি বুঝতে পারছে ওর বুকের খাঁচায় আটকে থাকা ধূসর অনুভূতিগুলো আবার রঙের ছোঁয়া পাচ্ছে একটু একটু করে সেই আগের মতোই৷ বাইরে ঝম ঝম বৃষ্টি শুরু হয়েছে ধুয়ে যাক পৃথিবী, ধুয়ে যাক সব না পাওয়ার ব্যথা৷
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন