মলিন মর্ম মুছায়ে

পল্লবী সেনগুপ্ত

সাজটা পুরো কমপ্লিট করে যখন গায়ে পারফিউম ছেটাতে যাবে মিতা ঠিক তখনই দরজায় ধাক্কা দিল মানু৷

—‘বউদি একজন লোক এসেছে দেখা করতে৷ দাদাবাবুকে খুঁজছে৷’

বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেল মিতার৷ ঝাঁঝ মেরে বলল—

—‘কে এল এখন? আর ওকে তুই ঢুকতেই বা দিলি কেন? জানিস না তোর দাদা শহরে নেই এখন? তা ছাড়া সোহম কি বাড়িতে যার তার সাথে দেখা করে নাকি? যা ভাগিয়ে দে৷’

—‘না মানে বউদি লোকটা বলছে ওকে নাকি তপনদা পাঠিয়েছে...৷’

—‘উফফফফ৷’

বিরক্তিটা আরও বেড়ে গেল মিতার৷ একে তো ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে বিশাখার ছেলের বার্থ ডে পার্টির জন্য৷ ড্রাইভার কতক্ষণ থেকে ওয়েট করছে, তাইতে উটকো ঝামেলা৷ আর মানুটাও হয়েছে তেমন৷ কোনো কাজ ঠিক ঠাক পারে না৷ অবশ্য লোকটা কে ওর মামাতো ভাসুর পাঠিয়েছেন যখন... কিন্তু বড়দা অফিসে না পাঠিয়ে বাড়িতে কেন লোক পাঠাবেন? আর সোহম তো ফোনে কিছু বলল না৷

বসার ঘরে এসে লোকটাকে দেখল মিতা৷ আগন্তুক এর পরনে একটা ময়লা জামা, রোদে পোড়া গায়ের রং, লম্বা লোকটা বেশ সংকুচিত হয়েই বসে আছে৷

ওকে দেখেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ গলা খাকরে বলল ‘কেমন আছিস... মানে আছ?’ চেহারার অনেক পরিবর্তন হলেও চিনতে অসুবিধা হল না মিতার৷ আর সাথে সাথে ওর বিরক্তি আর খারাপ লাগার অনুভূতিটা আরও শতগুণ বেড়ে গেল আর তার সাথে জড়ো হল একরাশ বিস্ময়৷ নিজের তিক্ত মনোভাব আর অবাক লাগাটা লোকাবার কোনো চেষ্টা না করে ও গলা ঝাড়ল—

—‘তুমি? এখানে কি করতে? আর কেন-ই বা আর কীভাবে-ই বা...’

—‘সব বলছি...’ ওকে থামিয়ে দিল লোকটা৷

—‘তুই তো মানে তুমি তো খুব ভালো আছ দেখতেই পাচ্ছি৷ আমি বোধ হয় খুব অসময়ে এসে পড়লাম না?’

—‘আমি এখন বেরোব৷ সোহম কলকাতার বাইরে গেছে৷ তপনদা পাঠিয়েছেন শুনে আমি শুধু কথা বলছি তোমার সাথে৷ যাই হোক সোহম পরের সপ্তাহে ফিরবে, তখন অফিসে চলে যেও৷’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দিল মিতা৷

—‘আমার খুব বিপদ মিতা৷ প্লিজ দশ মিনিট সময় দাও আমায়৷ আর আজ আমি তোমার সাথেই দেখা করতে এসেছি, যদিও তোমায় দেখতে পাব কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই এসেছিলাম৷’ —‘তার মানে?’ ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল মিতা৷

হায়ার সেকেন্ডারি তে রেজাল্ট খারাপ হয়নি৷ তাই সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম৷ বছর খানেক যেতে না যেতেই বাবা চলে গেলেন৷ কোনোরকমে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলাম৷ তারপর বিয়ে হল দাদার৷ অভাব তো ছিলই কিন্তু দাদার বিয়ের পর সব ছবি বদলে গেল৷ বউদি আমাদের সহ্য করতে পারে না৷ দাদা যেটুকু টাকা দিত তাও বন্ধ হল৷ তারপর একদিন আমার অনুপস্থিতে দাদা বউদি মা-কে মারধোর করে জোর করে বাড়িটা লিখিয়ে নিল৷ সেই থেকে আমি মা আর বোন একটা সস্তার ভাড়া বাড়িতে আছি৷ বাড়িওয়ালা লোকটা ভালো নয়৷ তাই বোনকে নিয়ে বড়ো ভয়ে থাকি৷ আমি টিউশন করে কোনোরকমে আমাদের খাওয়া জোগাড় করি৷ গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট ভালো হয়নি৷ চাকরি আর কে দেবে বল? বোনটার পড়াশোনাও ছাড়িয়ে দেব হায়ার সেকেন্ডারির পর৷ তবু যা হোক করে চালিয়ে নিতাম, কিন্তু গত মাসে মা এর ক্যান্সার ধরা পড়েছে৷’

—‘আর জিনিয়া?’ লোকটার কথা মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠল মিতা৷

এবার খুব অদ্ভুত ভাবে হাসল লোকটা৷ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—‘জীবনটা যে রূপকথা নয় সেটা আমরা বড়ো হবার সাথে সাথে বুঝতে পারি৷ আর তখনই রূপকথার জল পরীরা হারিয়ে যায়৷ জিনিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে৷ ও এখন মুম্বাইতে৷ তবে খুব অবুঝ ছিল মেয়েটা৷ বিয়ে ঠিক হবার পর আমায় বলেছিল ওকে নিয়ে পালিয়ে যেতে৷’ আবার অদ্ভুত ভাবে হাসল লোকটা৷

—‘এখানে কী মনে করে? তপনদা-কেই বা কীভাবে চেনা?’ আরও রুক্ষ হল মিতার স্বর৷

টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটা থেকে এক চুমুক জল খেল লোকটা৷ তারপর বলল তপন স্যার এর বাচচাটাকে আমি পড়াতে যাই৷ সেখান থেকেই চেনা৷ আমার বিপদের কথা বলেছিলাম ওনাকেও৷ তাই গত মাসে উনি বললেন আমার ভাইয়ের একটা ছোটোখাটো কোম্পানি আছে৷ মোটামুটি ১০০ মতো লোক কাজ করে৷ ওখানে আমার নাম করে গিয়ে একদিন দেখা কর৷ হয়তো কোনো চাকরি জুটে যেতে পারে৷ সেটা শুনে পরদিনই যাই৷ কিন্তু লাভ হয়নি৷ সোহম স্যার আমায় স্পষ্ট করে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেননি৷ শুধু বললেন মাস খানেক পর আবার এসে দেখা করবে৷ এখন ব্যস্ত আছি বলে আমায় ভাগিয়ে দিলেন প্রায়৷ আমি খুব নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছিলাম৷ তারপর ফেসবুকে সোহম স্যার এর প্রোফাইলে ডিজিট করে দেখলাম যে উনি তোমার হাজব্যান্ড তাই...৷’

—‘তো? আমি কী করব?’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মিতা?

—‘সব-ই তো শুনলে৷ প্লিজ আমায় একটু দয়া কর৷ তুমি সোহম স্যারকে বলে দিলেই হয়ে যাবে...৷’

হয়তো আরও কিছু বলত লোকটা, কিন্তু তার আগেই বেজে উঠল মিতার মোবাইল৷ চাপা স্বরে দু-একটা কথা বলে ও বলল—

—‘আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ এবার আমি যাব৷ কথাটা বলেই হন হন করে বেড়িয়ে গেল অভিজাত বাড়ির দামি শাড়ি পরা বউটা৷

মলিন জামা পড়া সংকুচিত চেহারার আগন্তুক প্রার্থীও বেরিয়ে পড়ল পিছু পিছু৷

ভূগোল ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজার পর আর মিনিট পাঁচেক পড়ালেন বিমলাদি৷

তারপর বেড়িয়ে গেলেন আর ওমনি কোয়েল এক খোঁচা মারল সুস্মিতাকে৷

—‘কিরে মিতা, ভূগোলের একটা লাইনও কি শুনলি নাকি সব গোল গোল হয়ে মিশে গেল তোর মনের আকাশে?’

—‘শুধু কি ভূগোল? সব ক্লাসেই তো মিতা এখন আকাশে উড়ছে৷’ বলেই হি হি করে হেসে উঠল তনুজা৷

—‘থামবি তোরা?’ ছদ্ম কোপে চোখ বড়ো বড়ো করল মিতা৷

ওমনি দ্বিগুন হাসিতে ফেটে পড়ল কোয়েল, তনুজা আর নীহাররা৷

এবার নিজেও হেসে ফেলল মিতা৷

উফফফ! কী যে হয়েছে ওর কে জানে! নিজের মন নিজের বশেই থাকছে না আকাশকে দেখার পর থেকে৷ যদিও ও জানে যে এখন ক্লাস নাইন, মাধ্যমিক এসেই যাচ্ছে দেখতে দেখতে৷ তার মধ্যে মন বসাতে পা পারলে পড়ায়, চরম বাজে ব্যাপার হবে৷ কিন্তু মন তবুও মানছে না৷ বার বার মন শুধু আকাশ আকাশ করছে৷

যদিও আকাশ এর সাথে ওর পরিচয় মাত্র মাস চার পাঁচ এর৷ প্রথম দেখা অঙ্ক কোচিং-এ৷ নাইনে ওঠার পরই বাবা ভর্তি করে দিয়েছিলেন এলাকার নামজাদা অঙ্ক স্যার অরূপ বাবুর কাছে৷ প্রথম দিন ওখানে গিয়েই ওর চোখ আটকে গেছিল একটা ছেলের দিকে৷ পাশে বসা আর একটা ছেলেকে কোনো অঙ্ক বোঝাচ্ছিল সে৷ বসা অবস্থাতেই বোঝা যাচ্ছে বেশ লম্বা সে৷ ফর্সা গায়ের রং আর লম্বাটে মুখে বুদ্ধির ছাপ৷

প্রথম নজরেই ভালো লেগেছিল মিতার ছেলেটাকে৷

তারপর সময়ের সাথে সাথে পরিচয়, তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হয় আকাশের সাথে৷ বেশ ভালো বন্ধুত্ব দানা বাঁধে আকাশ আর মিতার৷ এখন আর শুধু অঙ্ক নয়, বায়োলজি, ইংলিশ, ভূগোলও এক কোচিং-এ পড়ে ওরা৷

সপ্তাহে পাঁচ দিন দেখা হয় আর বাকি যে দুটো দিন দেখা হয় না, সে দু-দিন যেন কেমন অস্থির লাগে ওর, কিছু ভালো লাগে না৷ আকাশ এখন ওর প্রতিটা ভাবনায় মিশে গেছে যেন৷ ও বোঝে আকাশও ওর প্রতি দুর্বল৷ এখন শুধু একটাই অপেক্ষা আকাশ এর প্রপোজ করার৷ মিতা মনে মনে কল্পনা করেই কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে যায় আকাশ এর ওকে প্রপোজ করার সেই স্বপ্নিল মূহূর্তটা৷

কাল ভ্যালেন্টাইন ডে৷ আর আজ কিছু একটা এসপার ওসপার করতেই হবে ওকে৷ লাস্ট তিন চার মাসে কেমন যেন বদলে যাচ্ছে আকাশ৷ ওর সাথে আর আগের মতো প্রাণ খোলা হয়ে সহজ ভাবে মিশছে না৷ কেমন যেন এড়িয়ে এড়িয়ে চলছে৷ মিতা ভালোই বুঝতে পারছে এর কারণটা৷ ওই জিনিয়া বলে মেয়েটাই এর কারণ৷ ইংলিশ কোচিং-এ প্রথম ওদের সাথে পরিচয় মেয়েটার৷ খুব সাধারণ চেহারা৷ মিতার মতো সুন্দরী তো নয়ই, মোটামুটি দেখতেও নয়৷ এমনিতে চুপচাপ থাকে তবে আকাশের সাথে খুব কথা বলার ঝোঁক৷ আকাশও যে কেন পাত্তা দিচ্ছে আজকাল ওকে কে জানে! মিতা খবর পেয়েছে ও আকাশ এর ফিজিক্স আর হিস্ট্রি কোচিং-এও পড়ে এখন৷ জিনিয়ার স্কুলের নিশা ওকে বলেছে আকাশকে নাকি কয়েক বার দেখা গেছে জিনিয়ার স্কুলের বাইরেও৷

অনেক হয়েছে৷ আর নয়৷ আজ অরূপ স্যারের কোচিন শেষে ও তাই আসতে বলেছে আকাশ কে ওই খাল পাড়ের দিকের মাঠটায়৷ সন্ধ্যার পর জায়গাটা নির্জন থাকে৷ তাই...

মিতা আর তনুজা দাঁড়িয়ে ছিল৷ ওই তো আসছে আকাশ৷ ও কাছাকাছি এসে পড়তেই তনুজা চলে গেল৷

—‘বল কী বলবি? আর এরকম একটা জায়গায় আমায় ডেকে এনে কী কথা বলার থাকতে পারে তোর?’

—‘তুই কি সত্যি জানিস না, কি বলতে চাই আমি? তুই কি সত্যি বুঝিস না যে তোকে আমি...’

—‘প্লিজ আর বলিস না৷ আমি আন্দাজ করেছিলাম তুই হয়তো এরকম কিছু একটাই বলবি তাই আসতে চাইনি৷ তুই আমার খুব ভালো বন্ধু, কিন্তু ওই ধরনের কোনো নজরে আমি তোকে দেখিনি আর দেখতেও পারব না৷’

—‘মানে?’

—‘মানেটা খুব সোজা মিতা৷ আমি জিনিয়াকে পছন্দ করি৷ দিন কয়েক আগে আমি ওকে কমিট করেছি৷’

—‘জিনিয়া! জিনিয়ার মতো একটা মেয়ের জন্য তুই আমায় প্রত্যাখ্যান করছিস? কি আছে ওর? না আছে রূপ আর না আছে গুন৷’

—‘একদম চুপ৷’

গর্জে উঠল আকাশ৷ তারপর কয়েক মুহূর্ত থেমে একটু গলা নরম করে বলল—

—‘তুই খুব ভালো মেয়ে মিতা৷ এভাবে নিজেকে নীচে নামাস না প্লিজ৷’

মিতার সামনে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠল যেন হঠাৎ করে যেন৷ যা ঘটছে, যা শুনছে তার কিছুই যেন ও বিশ্বাস করতে পারছে না৷ মেনে নিতেই পারছে না কোনোভাবে৷

কোনো কিছু না ভেবে আকাশকে হুট করে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল ও৷ জোর করে নিজের ঠোঁট ঘষে দিতে চাইল আকাশ এর ঠোঁটে৷

‘ছাড়... ছাড় বলছি আমায়...’

এক ধাক্কায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল আকাশ৷ ঘৃণা ভরা একটা চাহনি মিতার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল নির্জন মাঠটা থেকে৷

বসন্তের সন্ধ্যায় পাক খেতে থাকল একটা তিতকুটে নীলচে বাতাস৷

মাঘ মাসের শেষ৷ ঠাণ্ডাটা যাব যাব করেও যায়নি পুরোটা৷ তবুও অল্প অল্প ঘাম হচ্ছিল মিতার৷ এসিটা চালিয়ে দিল ও৷ ঘড়ি বলছে রাত দুটো৷ কিন্তু ঘুম আসছে না মিতার চোখে৷ বারবার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো সামনে চলে আসছে পুরোনো কিছু স্মৃতি৷ অপমানে ঢাকা এরকমই একটা বসন্তের সন্ধ্যা৷ সেই অপমানের সন্ধ্যাটা মিতাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত বহু দিন৷ আকাশ সেই ঘটনার মাস দুয়েকের মধ্যে ছেড়ে দেয় ওদের সব কটা কমন কোচিং৷ সেই অপমানের পর মিতাও আর কক্ষনো কথা বলেনি আকাশের সাথে৷ আকাশ ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাবার পরও ভুলতে পারেনি সেই অপমানের জ্বালা৷ প্রতি মুহূর্তে মনে হত যদি একটা, শুধু একটা সুযোগ পেত ও ওই অপমানের প্রতিশোধ নেবার৷ কিন্তু সেটা যে চরম অবাস্তব একটা ভাবনা তা বুঝতে বুঝতে মিতার লেগে গেছিল অনেকগুলো বছর৷

কিন্তু গতকাল কী হল? হঠাৎ আকাশকে আচমকা এত বছর পর নিজের সাম্রাজ্যতে দেখে আবার তাজা হয়ে উঠল ওর সব পুরোনো ক্ষত৷ ওর ক্ষয়ে যাওয়া প্রতিশোধের ভাবনাটা আবার বেঁচে উঠেছে একটু একটু করে৷ চাকরি নেই ছেলেটার৷ দীনহীন অবস্থা৷ এই অবস্থায় আশার আলো হিসেবে সে দেখছে তপন দার সুপারিশ করা সোহমের কোম্পানির চাকরিটা৷ ওর আশার আলো এক ফুঁতে আজ নিভিয়ে দিতে পারে মিতা৷

কিন্তু কার ওপর নেবে প্রতিশোধ? ওই জীর্ণ, জীবন যুদ্ধে নুব্জ লোকটার ওপর? আর তা ছাড়া আজ ওর প্রতিশোধ তো শুধু আকাশকে ডোবাবে তা নয়, আরও অন্ধকারে ঠেলে দেবে আকাশের বোন আর ওর মা-এর জীবনও৷ ওরা তো একেবারেই নিরপরাধ৷ এটা কি তবে পাপ হবে না মিতার? আজ সব আছে ওর, কি তুলনা আজ ওর আর আকাশের৷ তবে আর কীসের প্রতিশোধ! কিন্তু ওর অপমান মিতার জীবনে ক্ষতি করেছিল অনেক৷ মাধ্যমিকের খারাপ রেজাল্ট, ভালো স্কুলে তারপর চান্স না পাওয়া বড়ো ক্ষতি নয় এগুলো? না কিচ্ছু মাথায় আসছে না ওর৷ কান মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ৷ ভেবেই চলেছে মিতা উথাল পাথাল৷ কিচিমিচি শুরু হচ্ছে জানলার ওপারের পৃথিবীতে৷ রাতও ফুরিয়ে আসছে জানান দিচ্ছে পাখির ডাক৷

ডিনার টেবিলে খাবার বাড়ছিল মিতা৷ কাল ফিরেছে সোহম৷ আজ একটু অন্যমনস্কও৷ পাতে চিকেন কারি মিতা ঢেলে দিতেই যেন চমক ভাঙল সোহম এর৷ গলা ঝাড়ল—

—‘আচ্ছা আকাশ রায় নামে কি ছোটোবেলায় কোনো বন্ধু ছিল তোমার?’

—‘মানে? কেন?’ আমতা আমতা মিতার স্বর৷

—‘আরে লোকটা তপনদা-র রেফারেন্স নিয়ে এসেছিল চাকরির জন্য আমার কাছে৷ আমার একদম ঠিকঠাক লাগেনি৷ কিন্তু খুব নাছোড়বান্দা৷ আমি ওকে ভাগিয়েই দিয়েছিলাম৷ তাও আজ আবার এসেছিল৷ বলে তুমি নাকি ওর ছোটোবেলার বন্ধু৷ বাড়িতেও নাকি এসেছিল একদিন৷ তুমি নাকি ওকে বলেছ দেখবে ওর ব্যাপারটা৷ তুমি তো আগে জানাওনি আমায় তাই আমি... তা তুমি চাইলে আমি ছোটো খাটো কোনো একটা চাকরি দিয়ে দিতে পারি ওকে...৷’

কথা শেষ হল না সোহমের৷ তার আগেই বেজে উঠল মোবাইল ফোন৷

—‘বলুন মি. দাশ...’ টেবিল ছেড়ে উঠে গেল সোহম৷

শরীরে একটা কাঁপুনি লাগল মিতার৷ হঠাৎ খুব শীত করল যেন৷ আচমকাই ঝন ঝন শব্দে হাত ফস্কে পড়ে গেল পোর্সিলিন এর দামি গ্লাসটা৷ মেঝেতে এলোমেলো ছড়িয়ে গেল একরাশ ভাঙা কাচের টুকরো৷

চেয়ার ছেড়ে উঠল মিতা ধীরে ধীরে৷ পা দুটো হঠাৎ কাঁপছে খুব৷ ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে গিয়েই চমকে উঠল মিতা৷ যেন হাই ভোল্টেজ শক ধাক্কা দিল ওকে৷ ছড়িয়ে পড়া ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর প্রতিটা থেকে বিচ্ছুরিত এক একটা আলাদা আলাদা দৃশ্য৷

বারো বছর আগের মিতা, আর অপমানে কুঁচকে যাওয়া মুখের সেই মেয়েটার ছবি ফুটে উঠেছে একটা টুকরোয়৷ ঠিক তার পাশের টুকরোতেই আবার অন্য ছবি৷ জিনিয়া আর সেই পুরোনো দিনের আকাশের একটা ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত৷ জীবন সংগ্রামে বিধ্বস্ত আকাশ আর তার অসুস্থ অসহায় বৃদ্ধা মা জেগে রয়েছে অপর আর এক টুকরোয়৷ উফফফ! কী করুন ওই বয়স্কা মানুষটার চোখ দুটো৷ একটা সুস্থ জীবন পাবার অনাবিল আকুতি ঝরে পড়েছে ওই দু-চোখ থেকে৷ অনেক আশা নিয়ে শুধু মিতার দিকেই যেন তাকিয়ে আছে ওই দুটো চোখ৷

—‘কী হল মিতা? এ বাবা! গ্লাসটা ভাঙলো কী করে? আরে! তুমি তুলছো কেন? মানুকে ডাক৷ ওই পরিষ্কার করে দেবে৷’ ফোনে কথা সেরে আবার ডিনার টেবিলে ফিরে এসেছে সোহম৷

—‘হ্যাঁ মানে না...’ কেমন যেন থতমত খাচ্ছে মিতা৷

—‘মানু... কাঁচগুলো তুলে নিয়ে যা তো৷’ হাঁক ছাড়ল জোরে ও৷ গুটি গুটি পায়ে উঠে আবার বসলো ডিনার টেবিলে৷

—‘তা যেটা বলছিলাম, ওই আকাশ রায়ের কেসটা কী বল তো? তুমি কি সত্যি চাও যে ওকে কোনো কাজ দিই আমি?’ জিজ্ঞাসু দুটো চোখ মেলে বউয়ের দিকেই তাকিয়ে আছে সোহম৷

বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুড়ি পিটাচ্ছে মিতার৷ উফফফ ভগবান! এ কেমন মুহূর্ত! তবে কি সত্যি এবার মিতাকে দিতেই হবে কোনো একটা রায়!

না মিতা পিশাচ নয় যে নিষ্ঠুর দানবের মতো কেড়ে নেবে একজন অসহায় মানুষের এক টুকরো বাঁচার আশা৷ শুধু অতীতের কয়েকটা কথা ভেবে অনেকগুলো অসহায় মানুষকে এক ধাক্কায় এভাবে আরও বেশি অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া কি আদৌ উচিত হবে?

তবে এটাও তো ঠিক যে মিতা কোনো ভগবান নয়৷ ও একজন রক্ত মাংসের সাধারণ মানুষ৷ আর সব মানুষই চায় নিজের অপমান আর অসম্মান এর বদলা নিতে৷ মিতাও তাই চেয়ে এসেছে এতদিন৷ আর আজ অপ্রত্যাশিত ভাবে পরিস্থিতি ওকে দিয়েছে সেই সুযোগ৷ এই সুবর্ণ সুযোগ হারানোটা কি আদৌ বোকামো হবে না? জীবন তো আর বারবার সুযোগ দেয় না৷ না আর ভাবতে পারছে না মিতা৷ মাথাটা বনবন ঘুরছে ওর প্রচন্ড বমি পাচ্ছে৷ নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয়ে আসছে...

—‘সোহম!’ অস্ফুটে একটা গোঙানি শুধু বেরিয়ে এলো ওর মুখ থেকে৷

—‘মিতা, এই কী হয়েছে তোমার?’ সোহম ছুটে আসছে ওর দিকে৷

একচাপ কালো অন্ধকার নেমে আসছে মিতার চোখের সামনে৷ মিতা বুঝতে পারছে, জ্ঞান হারাচ্ছে ও৷

—‘বউদি... বউদি... তুমি কি ঘুমাচ্ছ?’

মানুর ডাকে ঘুমটা ভাঙল মিতার৷

—‘ডাকছিস কেন? বিকেল হয়ে গেছে বুঝি?’ জড়ানো গলায় বলল ও৷

—‘হ্যাঁ গো দুপুর গড়িয়ে তো বিকেল হয়ে গেছে৷ তাই তো ডাকছি তোমায়৷ ফলের রস করে এনেছি, খেয়ে নাও৷’

—‘দূর আমার ইচ্ছে করছে না৷’ নাক কুঁচকে বলল মিতা৷

—‘তা বললে হবে নাকি? দাদা খুব রাগ করবে কিন্তু৷ এই আমি রেখে গেলুম, তুমি খেয়ে নিও৷’ জোর করে গ্লাসটা রেখে গেল মানু৷

উফফ! এই হয়েছে জ্বালা এখন মিতার৷ যবে থেকে জানাজানি হয়েছে যে সন্তান আসছে ওদের, তবে থেকেই সোহম পাগল করে দিচ্ছে ওকে ফল, ফলের রস, হেলথ ড্রিংক এসব খাইয়ে৷ মিতার পাগলের মতো এখন খেয়াল করছে সোহম৷

ঢক করে রসটুকু শেষ করা মাত্রই বেজে উঠল মিতার মোবাইল৷ স্ক্রিনে ভাসছে অচেনা নম্বর৷

—‘হ্যালো...’ ফোন কানে চেপে বলল মিতা৷

—‘মিতা, আমি আকাশ বলছি...’

আরে! আবার কী চায় ও? একটু বিব্রত হল মিতা৷

হ্যাঁ আকাশ এখন সোহমের কোম্পানিতেই চাকরি করে ছোটো একটা পোস্টে৷

প্রতিশোধ আর মানবিকতার দোলাচলে মানবিকতা জিতেছিল শেষমেশ৷

মিতাই বলেছিল সোহমকে—

—‘হ্যাঁ সোহম আকাশ আর আমি স্কুল জীবনে একসাথে কোচিং-এ পড়তাম৷ ও এখন খুব বিপদের মধ্যে আছে শুনেছি৷ ওপেনিং থাকলে ওকে দিও কোনো ছোটো খাটো কাজ৷ ছেলেটা ভালো৷’

—‘হ্যালো মিতা, শুনতে পাচ্ছ?’ মিতার নীরবতায় একটু অধৈর্য হয়েছে বোধ হয় আকাশ৷

—‘তুমি আমার মোবাইল নম্বর কোথায় পেলে?’ গম্ভীর গলায় বলল মিতা৷

—‘শিউলির থেকে পেয়েছি৷ কোচিং-এ সেই যে আমাদের কমন ফ্রেন্ড ছিল’... একটু থতমত খেয়ে বলল আকাশ৷

—‘ফোন করেছ কেন?’ আবার গম্ভীর গলা মিতার৷

—‘আসলে আজ আমার চাকরির তিন মাস পূর্ণ হল৷ আমি কনফার্মেশন পেয়ে গেলাম৷ আর আজকের এই দিনটা তো শুধু তোমার জন্যই আমি দেখতে পেয়েছি মিতা৷ তুমি যদি আমায় দয়া না করতে তবে আমার কোনোদিন এ চাকরি হত না আমি জানি৷ আমি মায়ের চিকিৎসাও করতে পারতাম না৷ তোমার কাছে যে ঋণের আমার শেষ রইলো না৷’ বড্ড আর্দ্র শোনাচ্ছে স্বর আকাশের৷

—‘এসব কথা ছাড়৷ তুমি মন দিয়ে কাজ করো৷’

—‘সে তো করবোই৷ তবে তোমায় ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার আজ সত্যি নেই৷ তোমাকেও অনেক অভিনন্দন৷ শুনলাম নতুন অতিথি আসছে৷ সেদিন সোহম স্যার অফিসের সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালেন৷’

—‘হুমমম৷’ ছোটো করে বলল মিতা৷

—‘যদিও জানি আমি খুব তুচ্ছ মানুষ, তবুও বলছি আমার অনেক আশীর্বাদ আর ভালোবাসা রইলো মিতা নতুন মানুষটার জন্য৷ আমি জানি ও অনেক বড়ো হবে, জগৎ জোড়া নাম হবে ওর৷

—‘থ্যাংকস৷ তুমিও ভালো থেকো৷ আর প্লিজ আমায় এভাবে আর কখনো ফোন কোরো না৷ আশা করি বোঝাতে পারলাম৷’ একটু ভারী চালে বলল মিতা৷

—‘বেশ তাই হবে৷ ভালো থেকো৷’ বলে ফোন কেটে দিল আকাশ৷

না আজ আর কোনো রাগ নেই মিতার আকাশের প্রতি৷ আকাশ ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক এটাই আজ চায় ও৷ একটু আগে আকাশের সাথে কথা বলে মনে হল ভালোই আছে ও এখন আগের থেকে৷

বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি আজ টের পাচ্ছে মিতা৷ প্রতিশোধ নিয়ে যে আরামটা ও একদিন পাবে বলে ভেবেছিল, আজকের শান্তি আর ভালো লাগাটা তার থেকে অনেক অনেক গভীর৷

না প্রতিশোধের বিষ নয়, মনুষ্যত্বের উষ্ণতাটাই একমাত্র নেভাতে পারে বুকের আগুন এটা আজ জীবন থেকে শিখেছে ও আর এই শিক্ষাটাই ও দেবে ওর আসন্ন সন্তানকেও৷

ছেলে বা মেয়ে যাই হোক, মিতা তাকে তৈরি করবে একজন ক্ষমাশীল আর মানবিক মানুষ৷ কারণ প্রতিহিংসার আগুনকে জয় করে মানবিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়াতেই যে আসলে লুকিয়ে থাকে সত্যিকারের বিজয়ের সুখ৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%